কুরআনের অনুরূপ কুরআন বা সুরা তৈরি

প্রশ্নোত্তর (Q&A)Category: কুরআনকুরআনের অনুরূপ কুরআন বা সুরা তৈরি
jabir abdullah asked 2 দিন ago
আমি একজন মুসলিম ও আল্লাহর  প্রতি ঈমান রাখি। কিন্তু আমার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। এক নাস্তিকের সাথে কথা বলতে গিয়ে প্যাচে পড়ে গেছি। দয়া করে আমার প্রশ্নের একটা লজিক্যাল উত্তর দিবেন।    কুরআনের অনুরূপ সুরা বা ১০ আয়াত নিয়ে আসার কথা বলা আছে।  কিন্তু একটা প্রশ্ন হল, অনুরূপ মানে কি? এর মানদন্ড কি? একটা সুরার দৈর্ঘ্য ,শব্দ চয়ন, বাক্যগঠন, ছন্দ ও অন্ত্যমিল আরো অনেক কিছু আছে কোনটাকে অনুকরন করতে হবে??  যদি সব কিছুই অনুকরন করতে বলা হয় তাহলে তো শুধু কুরআন না বরং যে কোন রচনার ক্ষেত্রেই এরকম মিল পাওয়া যাবে না।  রবি ঠাকুরের গীতাঞ্জলিও তো অনবদ্য ও অননুকরনীয় গ্রন্থ যাতে আছে উন্নত ভাষা ও ভঙ্গি, সুর ও ছন্দ, প্রভাব। এর অনুরূপও তো রচনা নেই। আবার কাজি নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার মতও কোন কবিতা নেই।  আমি বলতে চাচ্ছি, ১০০% অনুকরণ তো কোন রচনারই হয় না তাহলে কুরআনের মত হওয়ার প্রশ্নই অবান্তর (নাউজুবিল্লাহ)।  সবার রচনাতেই স্বকীয়তা থাকে, অন্য কেউ চাইলেও হুবহু অনুরূপ বানাতে পারবে না। কারণ, ব্যক্তি ভেদে রুচির ভিন্নতা থাকে।  আবার ধরুন, কেউ যদি কুরআনের মত একটা অনবদ্য রচনা বানিয়েও ফেলে তাকে স্বীকৃতি দিবে কে? কোন মুসলিম তো কখনোই এটা মানবে না। যদি আগে থেকেই মুসলিম বিশ্বাসী বিচারকরা কখনোই কোনো মানবরচিত কিছুকে \"কোরআনের সমতুল্য\" বলে স্বীকার করবেন না তাহলে তো যতই রচনা বানাক কোন লাভ নেই।   যে দাবি কোনো অবস্থাতেই খণ্ডিত হতে পারে না, সেটি অভিজ্ঞতামূলক (empirical) দাবি হিসেবে অর্থবহ কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন থাকে।
2 Answers
Tahsin Arafat Staff answered 2 দিন ago
  • https://boimate.com/kathgora-kostipathor-3-pdf
  • কাঠগড়া (কষ্টিপাথর-৩) - ডা. শামসুল আরেফীন শক্তি
এই বইটির পৃষ্ঠা ১ থেকে ২৬ পর্যন্ত এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
Ashraful Nafiz Staff answered 10 ঘন্টা ago

উত্তর দিতে সাহায্য করেছেন আমাদের ফ্রম মুসলিমস এর শারয়ী সম্পাদক সেলিম উদ্দিন হাফি.

প্রথমে বলতে চাই, আপনার যুক্তির একটি গোপন অনুমান হলো, কুরআনের চ্যালেঞ্জ কেবল 'স্বকীয়তা' (originality) নিয়ে। কিন্তু ক্লাসিক্যাল মুসলিম আলিমদের মতে বিষয়টি তা নয়। পৃথিবীতে বহু মৌলিক সাহিত্যকর্ম আছে। কুরআনের দাবি শুধু মৌলিক হওয়া নয়; বরং ভাষা, বাগ্মিতা, অর্থের গভীরতা, বিষয়বস্তুর সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সামঞ্জস্য এসবের সম্মিলিত উৎকর্ষে সমপর্যায়ের কিছু উপস্থাপন করা।

আপনার প্রথম আপত্তি মানদণ্ড নিয়ে। কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেছে "মিসলিহি" ( مِّثْلِهِ), অর্থাৎ এর মতো বা সদৃশ। এর অর্থ "আমার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি অন্ত্যমিল, প্রতিটি অক্ষর নকল করে দেখাও" এমন না। অর্থাৎ শব্দটির অর্থ exact duplicate নয়। আরবিতে মিসলিহি মানে এমন কিছু যা সমপর্যায়ের, সমমানের, তুল্য। কেউ যদি বলে, "এই মানের একটা বাড়ি বানাও।" সে কি বোঝায় একই ইট, একই রঙ, একই জানালা? না, বরং সে বোঝায় quality, craftsmanship, design excellence এই স্তরে পৌঁছাও।

সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড না থাকাটা চ্যালেঞ্জকে বাতিল করে না, বরং চ্যালেঞ্জকে আরো কঠিন করে তুলে। আর চ্যালেঞ্জ করার উদ্দেশ্যইতো আরো কঠিন করা বা যাকে করা হচ্ছে তার পক্ষে সম্ভব না হওয়া। কুরআন নিজে কোনো চেকলিস্ট দেয়নি, তবে এর মানে এই নয় যে কোনো মানদণ্ডই নেই। ক্লাসিক্যাল আরবি বালাগাত ও সাহিত্যতত্ত্বে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কুরআনের ভাষাগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে বহু মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। আরবি সাহিত্যের বিশেষজ্ঞরা কুরআনের ভাষাগত বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছেন, ফাসাহাত (শুদ্ধতা), বালাগাত, ইজায (সংক্ষিপ্ততায় গভীরতা), নজম (শব্দের বিন্যাস) এবং অর্থের বহুস্তরীয়তা।

“التفسير المنير” এ ওয়াহবা যুহাইলি লিখেছেন:

“فليأتوا بعشر سور مثله مفتريات، تضارعه في الفصاحة والبلاغة، وإتقان الأحكام والتشريعات ... والإخبار بقصص الأنبياء والغيبيات”
অর্থাৎ: “তারা যেন এমন দশটি সূরা আনে যা ফাসাহাত-বালাগাত, বিধান-ব্যবস্থা, জীবনব্যবস্থা, নবীদের কাহিনি ও গায়েবি সংবাদে কুরআনের সমতুল্য হয়।”(التفسير المنير - الزحيلي 12/34)

এছাড়া বাকিল্লানি (রহ), রুম্মানি (রহ), আব্দুল কাদির আল জুরজানি (রহ), যামাখশারী (রহ), ফখরুদ্দিন রাজী (রহ), কুরতুবি (রহ) প্রবৃদ্ধি ওলামাদের আলোচনাগুলো দেখবেন কোরআনের,

  • ভাষার গভীরতা
  • অলঙ্কারশাস্ত্র
  • বাক্যগঠন
  • শব্দ নির্বাচন
  • অর্থের ঘনত্ব
  • ছন্দ
  • ধ্বনিগত সৌন্দর্য
  • প্রসঙ্গ অনুযায়ী শব্দের নিখুঁত নির্বাচন
  • মুখস্থ রাখার সহজতা
  • দীর্ঘ গ্রন্থ হওয়া সত্ত্বেও শৈলীর সামঞ্জস্য
  • আইন, নৈতিকতা, ইতিহাস, আখিরাত, উপদেশ সব মিলেও সাহিত্যিক উৎকর্ষ বজায় রাখা

ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেছেন। অর্থাৎ এখানে একটি বৈশিষ্ট্য নয়, বরং সম্পূর্ণ সমন্বিত গুণাবলির কথা বলা হচ্ছে। এগুলো একসাথে অর্জন করাই চ্যালেঞ্জ।

আপনার আরেকটি আপত্তি হলো ‘রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের রচনাও অননুকরণীয়, তাহলে পার্থক্য কী?’ দেখুন এখানে কুরআনের দাবি একটু ভুল বোঝা হচ্ছে। কুরআনের ইজাযের দাবি শুধু "সুন্দর রচনা বা ছন্দ মিল" নয়, এটি বহুমাত্রিক। বালাগাত কি, ফাসাহাত কি এসব অনেকে বুঝে না, এর কারণ হল আমাদের দেশেতো আরবি সাহিত্যিল নেই যারা এসব অনুধাবণ করতে পারবে। জাহিলি যুগে আরবি সাহিত্য বাচ্চা বাচ্চাদের কাজ ছিল, তাদের সময়ে আরবি সাহিত্য চর্চা এতটাই উচ্চ মানের ছিল যে এসবে পারদর্শী ও অপারদর্শীদের মাঝে শ্রেণী ভাগ করার মত সামাজিক কাঠামো তৈরী হয়ে গিয়েছিল।

“البرهان في علوم القرآن” এ এসেছে:

“فكان ... الفصاحة في مدة محمد ﷺ” অর্থাৎ: “মুহাম্মদ ﷺ এর যুগে আরবদের বিশেষ দক্ষতা ছিল ভাষা ও বাগ্মিতায়।”  (البرهان في علوم القرآن 2/98)

কিন্তু কোরআন এমন কিছু নিয়ে আসলো যা অন্য কোথাও নেই। চিন্তা করুন, যে সময়টাতে নীতি নৈতিকতা বলতে তেমন কিছুই ছিল না, মারামারি, হানাহানি, রাহাজানি মিলে সব দিকে ছিল বিশৃঙ্খলা। কিন্তু কোরআন এমন কি আনলো যার প্রভাবে সকলেই ভাই ভাইয়ে পরিনত হওয়া শুরু করে? কোরআনে এমন কি ছিল যার কারণে তারা যে নবীকে ঘৃণা করতো সেই নবীর জন্যই সব উজার করে দিল পরবর্তীতে। আপনি আমি হয়তো উপলব্ধি করতে পারি না, কিন্তু সেই সময়ে ঠিকই আরবরা উপলব্ধি করতে পেরেছিল। এমনও ঘটনা রয়েছে কোরআনের আয়াত শুনেই অন্তর পরিবর্তন হয়েছিল, কেউবা সাথে সাথে দ্বীন কবুল করে ফেলেছিল। কোরআনের শব্দচয়ন মানুষের আবেগ, অনুভূতি, আখলাক, বৈশিষ্ট্য, মুল্যবোধের জায়গায় স্পর্শ করতে পারতো বা এখনো পারে।

কোরআনের দাবি কি ও দাবির পিছনে উদ্দেশ্য কি আমাদেরকে বুঝতে হবে, এটা কি টিপিকাল বাঙালিদের কয়েক কোটি টাকার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মারার মত কোন কিছু নাকি এর পিছনে অ্যাকচুয়াল উদ্দেশ্য রয়েছে।

কুরআন নাযিল হয়েছিল এমন একটি সমাজে যেখানে কবিতা ও বাগ্মিতা ছিল সর্বোচ্চ শিল্প। সেই আরবরা, যারা ভাষাকে জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসত, যারা কাবাঘরে কবিতা ঝুলিয়ে রাখত। কুরআন চ্যালেঞ্জ দিয়েছিল মক্কার সেই আরবদের, যারা ছিলেন: কুরআনের বিরোধী, আরবি ভাষার সর্বোচ্চ কবি, ভাষা নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত, ইসলাম ধ্বংস করতে আগ্রহী। যদি তারা সত্যিই মনে করত "আমরা এর সমতুল্য বানিয়ে ফেলেছি" তাহলে তাদের জন্য সবচেয়ে সহজ পথ ছিল সেটি প্রকাশ করা এবং ইসলামকে বাতিল প্রমাণিত করা। কিন্তু তারা চ্যালেঞ্জ পেয়ে পারেনি এবং তারা বরং যুদ্ধ বেছে নিয়েছিল। এটা ঐতিহাসিক সত্য।

তারপর কুরআনের দাবি শুধু সাহিত্যিক নয়। এর সাথে যুক্ত আছে ভবিষ্যদ্বাণী, আইন-নৈতিকতা, আকীদা, ঐতিহাসিক নির্ভুলতা, অতিত বর্তমান ভবিষ্যতের গায়েবী সংবাদ এবং মানবজীবনে রূপান্তরকারী প্রভাব বিস্তার, হেদায়েত ইত্যাদি সবকিছু মিলিয়ে। অর্থাৎ কোরআন শুধু ছন্দ বা অন্ত্যমিল না; বা নির্দিষ্ট কোন টপিক বৈশিষ্ট্যে সীমাবদ্ধ না, বরং বহু বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়। গীতাঞ্জলি বা বিদ্রোহী কবিতায় এই বৈশিষ্ট্য পাবেন না নিশ্চয়ই।

আপনি বাংলা কবিতা কেন আরবী কবিতাগুলোর কথাই নিন, তেমন কোন আরব অমুসলিম স্কলারও কোন কবিতাকে কোরআনের সাথে তুলনা দিয়ে বলতে পারেনি এটা কোরআনের সমমানের বা বেটার হয়েছে। অথবা অন্য ধর্মগ্রন্থগুলোর কথাই মনে করেন। সেগুলোতে তথ্য আছে, সুর নেই, অনুভূতি নেই, গল্প আছে কিন্তু কাব্যিক সৌন্দর্য নেই অথবা ধারাবাহিকতা নেই অথবা শতভাগ বিশুদ্ধতা নেই।

এজন্যই ক্লাসিক্যাল আলেমরা বলেছেন, কুরআনের ই‘জায (অলৌকিকতা) একক কোনো বৈশিষ্ট্যে সীমাবদ্ধ না। “البرهان في علوم القرآن” এ জারকাশী বলেন:

“أن وجه الإعجاز الفصاحة وغرابة الأسلوب والسلامة من جميع العيوب” অর্থাৎ: “ই‘জাযের দিক হলো ভাষার উৎকর্ষ, অভিনব শৈলী, এবং সকল ত্রুটি থেকে মুক্ত হওয়া।” (البرهان في علوم القرآن 2/98)

আরও বলেন:

“بمثل نظمه” অর্থাৎ: “কুরআনের বিশেষ নযম/বিন্যাসের অনুরূপ।

এখানে “নযম” মানে শুধু ছন্দ বা rhyme না; বরং শব্দচয়ন, বাক্যগঠন, অর্থের প্রবাহ, ধ্বনি, প্রভাব সব মিলিয়ে একটি অনন্য ভাষাগত স্থাপত্য। “شرح لمعة الاعتقاد” এ বলা হয়েছে:

“وأنّه في أعلى طبقات الكلام لفظا ومعنى بما لا يمكن أن يدرك شأوه” অর্থাৎ: “শব্দ ও অর্থ উভয় দিক থেকে এটি ভাষার এমন উচ্চস্তরে যে শ্রেষ্ঠ বাগ্মীরাও তার সমকক্ষ হতে পারে না।” (شرح لمعة الاعتقاد 6/5)

গীতাঞ্জলি বা বিদ্রোহী কবিতা এগুলো অবশ্যই অসাধারণ সাহিত্য। কিন্তু আলেমদের দাবি হলো: কুরআনের দাবি কেবল “সুন্দর সাহিত্য” হওয়া নয়। বরং এমন এক ভাষা-রূপ যা:

  • কবিতা না, গদ্যও না, তবু উভয়ের শক্তি বহন করে
  • দীর্ঘ ২৩ বছরে নাযিল হয়েও শৈলীগত বিচ্যুতি নেই
  • একইসাথে ধর্ম, আইন, ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা, বিতর্ক, ভাষাশৈলী—সব একত্র করেছে।

কোরআনের আরো কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। ততকালীন সময়ে কোরআন আরব সাহিত্যকে নতুন রুপ দিয়েছিল, নাহি গদ্য নাহি পদ্য বরং একদম নতুন জিনিস। বালাগাহ-এর উৎকৃষ্ট সংস্করণ এনেছি। নতুন নতুন শব্দ আরবি অভিধানের ভান্ডারে যুক্ত করেছিল যা অনন্য। এমনই আরো বহু জিনিস।

এই নিয়ে খুব চমৎকার একটা ঘটনা আছে। সুরা মুদ্দাছছির এ অলীদ বিন মুগীরার কথা এসেছে। সে ছিল ততকালীন সময়ে সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি এবং সবচেয়ে বিজ্ঞ কবি। সে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকটে আসেন। তখন তিনি তাকে কুরআন শুনান। তাতে তার অন্তর গলে যায়, সে কোরআনের মহিমা উপলব্ধি করতে পারে, কিন্তু অহংকার তাকে আনুগত্যের বাঁধা দেয়। বিস্তারিত কোরআনে আছে।

সবচেয়ে মজার কাহিনী হলো এই ঘটনার পর কোরআনে আল্লাহ তাকে বদদোয়া করেন, এবং তার ঠিকানা সাক্বার’ নামক জাহান্নামে নির্ধারণ করেন। আর হিজরতের তিনমাস পর সে কাফির অবস্থায় মক্কায় মৃত্যুবরণ করে। (ইবনুল আছীর, আল-কামিল ফিত তারীখ (বৈরূত : ১ম সংস্করণ ১৪১৭/১৯৯৭) ১/৬৬৯।)

সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে,

উনায়স (রাঃ) নিজেও একজন কবি ছিল। উনায়স (রাঃ) বলল, আমি অনেক গণকের কথা শুনেছি; কিন্তু ঐ ব্যক্তির কথা গণকের মত নয়। আমি তাঁর বাক্যকে কবিদের রচনার সাথে তুলনা করে দেখেছি; কিন্তু কোন কবির ভাষার সাথে তার কোন মিল নেই। আল্লাহর কসম! নিশ্চয়ই তিনি সত্যবাদী এবং ওরা মিথ্যাবাদী। তিনি বললেন, আমি বললাম, তুমি আমার সংসার দেখাশোনা কর এবং আমি গিয়ে একটু দেখে নিই। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ফাউন্ডেশন, ৬১৩৫)

তুফাইল বিন আমর আদ দাউসী (রা) এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনাতো সকলের কাছেই প্রশিদ্ধ। তিনি মক্কায় আসার পর মুশরিকরা উনাকে বলছিল মুহাম্মদ সা. এর কাছে না যেতে, কারন মুহাম্মাদের কথা নাকি “যাদুর মতো”, যা মানুষকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এ কারণে তুফাইল রা. কানে তুলা পর্যন্ত ঢুকিয়ে রাখেন যাতে কোরআনের কিছু না শুনতে হয়। পরবর্তীতে নিজেই চিন্তা করলেন যে তিনি তো একজন বুদ্ধিমান ও কবি মানুষ; ভালো-মন্দ বিচার করতে সক্ষম। তাই তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কথা শোনার সিদ্ধান্ত নেন। তারপর নবী ﷺ তাঁর সামনে ইসলাম পেশ করেন এবং কোরআন তিলাওয়াত করেন। তখন তুফাইল রা. গভীরভাবে প্রভাবিত হন। এক বর্ণনায় এসেছে,

“فَعَرَضَ عَلَيْهِ الْإِسْلَامَ، وَتَلَا عَلَيْهِ الْقُرْآنَ، فَقَالَ: لَا وَاللَّهِ مَا سَمِعْتُ قَوْلًا قَطُّ أَحْسَنَ مِنْ هَذَا، وَلَا أَمْرًا أَعْدَلَ مِنْهُ، فَأَسْلَمْتُ” অর্থাৎ: “নবী ﷺ তাঁর সামনে ইসলাম পেশ করলেন এবং কোরআন তিলাওয়াত করলেন। তখন তুফাইল বললেন: ‘আল্লাহর কসম! আমি এর চেয়ে সুন্দর কথা কখনও শুনিনি এবং এর চেয়ে ন্যায়সঙ্গত বিষয়ও কখনও দেখিনি।’ এরপর আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম।” (عيون الأثر في فنون المغازي والشمائل والسير 1/162 ; سبل الهدى والرشاد 6/336)

এমনকি ইসলামের চরম শত্রু ছিল তাদের থেকেও এমন মন্তব্য এসেছে,

٣٥٤٣ - عن سعيد بن المسيب أن أبا سفيان وأبا جهل والأخنس اجتمعوا ليلا يسمعون القرآن سرا ... فذكر القصة، وفيها أن الأخنس أتى أبا سفيان، فقال: ما تقول، قال: أعرف وأنكر، قال أبو سفيان: فما تقول أنت؟ ، قال: أراه الحق.

** الذهبى فى الزهريات

(الإصابة في تمييز الصحابة ٣٦/١)

** إسناده صحيح

৩৫৪৩ – সাঈদ ইবনে মুসায়্যিব (রহ.) থেকে বর্ণিত যে, আবু সুফিয়ান, আবু জাহল ও আখনাস রাতে গোপনে কুরআন শোনার জন্য একত্রিত হন ... অতঃপর তিনি (ঘটনার) বিবরণ উল্লেখ করেন। তাতে আছে যে, আখনাস আবু সুফিয়ানের কাছে এসে বললেন: ‘আপনি কী বলেন?’

আবু সুফিয়ান বললেন: ‘আমি (কুরআন) চিনতে পারি এবং কিছু অস্বীকার করি।’

আবু সুফিয়ান আবার বললেন: ‘তুমি কী বল?’

আখনাস উত্তর দিলেন: ‘আমি এটাকে সত্য বলে মনে করি।’

উৎস: আজ-যাহাবী (رحمه الله) তাঁর ‘আজ-যুহরিয়্যাত’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

গ্রন্থসূত্র: ‘আল-ইসাবাহ ফী তাময়ীযিস সাহাবাহ’ (১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬)।

সনদের অবস্থা: إسناده صحيح (এর সনদ সহীহ।

আরবরা কুরআনের কোনো আয়াত শোনার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে যেত যে এই কিতাব কোনো কাব্যগ্রন্থ নয়। কেরআন হলো যা এই পৃথিবীকে পরিবর্তন করতে এসেছে এবং একটা পর্যায়ে গিয়ে এই কিতাব ও কিতাবের দ্বীন অবশ্যই প্রচলিত অবস্থা ও শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াবে।

মানুষ বলে তারা এখন অলৌকিক কিছু দেখতে পায় না, কিন্তু এটা ভুল। কোরআনে আল্লাহ বলেছেন তিনি কোরআন সংরক্ষণ করবেন, তিনিই একে সহজ করেছেন, আর দেখুন আজো লক্ষ লক্ষ হাফেজ বের হচ্ছে প্রতি বছর, স্মরণে রাখছে সর্বদা, এমন স্থান ও পাত্রদের নিকটও পৌঁছে দিয়েছে স্মৃতির শক্তি দ্বারাই যারা পড়তেও জানে না, লিখতেও জানে না। কুরআন শব্দ নিজেই একটা অলৌকিক শব্দের ন্যায়, এর অর্থ অধিক পঠিত, যা বারবার পড়া হয় বা আবৃত্তি করা হয়। আর দেখুন বিশ্বে মুসলিম অমুসলিম সকলেই প্রতিদিন কোরআন পড়ছে। কেউ সওয়াবের জন্য, কেউ আমলের জন্য, কেউ নামাজে, কেউ রুকইয়ার জন্য, কেউ গবেষণার জন্য, কেউ শিখার জন্য, কেউ শিখানোর জন্য, কেউ আলোচনার জন্য, কেউ সমালোচনা করার জন্য, কেউ ভুল বের করার জন্য ইত্যাদি বহু কারণে। কুরআন এখনো অধিক পঠিত কিতাব, ইতিহাসে সবচেয়ে অধিকই ছিল।

রবীন্দ্রনাথের "গীতাঞ্জলি" অসাধারণ। এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কখনো বলেননি, "সমস্ত মানুষ ও জিন একত্র হয়ে এর মতো একটি বই লিখে দেখাও।" তিনি বলেননি, "তোমরা পারবে না।" তিনি বলেননি, "১৪০০ বছর চেষ্টা করো।" তিনি বলেননি, "তোমাদের ধর্ম সত্য হলে এর মতো বানিয়ে আনো।"
অর্থাৎ এ ধরনের সর্বজনীন সাহিত্যিক চ্যালেঞ্জ তারা দেননি কিন্তু কুরআন দিয়েছে। কেন দিয়েছে?

কারণ দ্বীন ইসলামই একমাত্র স্রষ্টার মনোনিত, আর স্রষ্টা নিজে এই দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নবী ও কুরআন দ্বারা সেটাই এখানে মূখ্য। যা এই কোরআন নাজিলের পর আর অন্য কোন ধর্মের বেলায় আর কখনো পাওয়া সম্ভব হবে না, কারণ নবুয়তের রাস্তা বন্ধ। যদি মুশরিকদের উপাস্যরা বাস্তব হয়ে থাকে তাহলে তারা আনুক এমন ১০টি সুরা বা ১ সূরা। কোরআনেই আল্লাহ বলেছেন,

নাকি তারা বলে, ‘সে তা বানিয়েছে’? বল, ‘তবে তোমরা তার মত একটি সূরা (বানিয়ে) নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পারো ডাক, যদি তোমরা সত্যবাদী হও’। (সূরা ইউনুস ১০:৩৮)

কিন্তু তখনকার আরব মুশরিকরা এটি করতে পারে নি।যারা ভাষার সেরা বিশেষজ্ঞ, তারা নিজেরাই মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে, যদিও তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে কুরআনকে মিথ্যা প্রমাণ করার প্রবল প্রেরণা ছিল।

আপনার তৃতীয় আপত্তিটি হলো ‘মুসলিমরা কখনো স্বীকার করবে না, তাহলে চ্যালেঞ্জ কি unfalsifiable?’ এটা একটু জটিল জিনিস বলা যায়, তারপরও নিজের সাধ্যমতো বলার চেষ্টা করি।

প্রথমত, কুরআন বলেনি "মুসলিমরা স্বীকার করবে।" বলেছে পুরো মানবজাতি ও জিন মিলে চেষ্টা করলেও পারবে না। বিচারক মুসলিম নয়, বরং সত্যিকারের আরবি ভাষা বিশেষজ্ঞরা।

দ্বিতীয়ত, ইতিহাসে অমুসলিম আরবি পণ্ডিতরাও কুরআনের ভাষাগত অসাধারণত্ব স্বীকার করেছেন। যেমন শুনেছি মিশরের খ্রিস্টান সাহিত্যিক জুরজি যাইদান কুরআনের বালাগাতকে আরবি সাহিত্যের সর্বোচ্চ শিখর বলেছেন। আপনি আরবির উপর অসাধারণ পান্ডিত্য রাখেন এমন অসংখ্য অমুসলিম স্কলার পাবেন যারা একই রকম ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন কোরআন সম্পর্কে।

এটা অবশ্যই ঠিক যে, একজন committed মুসলিম কুরআনকে divine ধরে নেয়। কিন্তু এজন্য challenge পুরো meaningless হয়ে যায় না। কারণ বিচার কেবল ধর্মবিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; ভাষাবিদ্যা, সাহিত্য, ইতিহাস এসবও এখানে ফ্যাক্টর। এবং অনেক অমুসলিম আরব সাহিত্যিকও কুরআনের ভাষাশক্তিকে অসাধারণ বলেছেন, যদিও তারা ইসলাম গ্রহণ করেননি।

তৃতীয়ত, "unfalsifiable" আপত্তি উল্টো দিকেও যায়। নাস্তিক যদি বলে "ঈশ্বর নেই" এটাও কি falsifiable? অনেক দার্শনিক দাবিই সরাসরি পরীক্ষাযোগ্য নয়, তবুও যুক্তির আলোকে মূল্যায়নযোগ্য, সব meaningful claim empirical claim নয়।

অবশ্যই এটা স্বীকার করার মত যে, চ্যালেঞ্জটি আসলেই falsifiable ছিল এবং আছে। যদি কেউ সত্যিই এর সমতুল্য কিছু উপস্থাপন করতে পারত এবং আরবি ভাষার বিশেষজ্ঞরা তা স্বীকার করতেন সেটাই হতো falsification। কিন্তু ১৪০০ বছরে তা হয়নি।

আপনি ঠিকই বলেছেন, aesthetic judgement আংশিক subjective। কিন্তু পুরোপুরি subjective না। সাহিত্য সমালোচনায় কিছু intersubjective মানদণ্ড থাকে, যেমন coherence, originality, rhetorical force, linguistic economy, semantic density ইত্যাদি।

কুরআনের challenge-কে মুসলিম স্কলাররা pure laboratory test হিসেবে দেখেন না; বরং cumulative case হিসেবে দেখেন: ভাষাগত বৈশিষ্ট্য, ঐতিহাসিক প্রভাব, সংরক্ষণ, অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য, আরবদের অক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সব মিলিয়ে।

তাই “যেহেতু ১০০% identical imitation সম্ভব না, তাই challenge meaningless”—এই সিদ্ধান্তটা পুরোপুরি সঠিক না। কারণ challenge “identical duplication” নিয়ে না; বরং comparable mastery নিয়ে। এটা ঠিক যে এখানে কিছুটা মূল্যায়নমূলক দিক আছে, pure mathematics-এর মতো objective না। কিন্তু তাই বলে একে পুরো meaningless বলা ঠিক হবে না।

সাহিত্য, সংগীত, দর্শন এসব ক্ষেত্রেই মানবসমাজ কিছু মানদণ্ডে উৎকর্ষ বিচার করে, যদিও তা গণিতের মতো rigid না। সবশেষে, মুসলিম ঐতিহ্যে কুরআনের ই‘জায শুধু “সাহিত্যিক সৌন্দর্য” দিয়ে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তারা এটাকে বহুস্তরীয় phenomenon হিসেবে দেখেছেন। তাই গীতাঞ্জলি বা বিদ্রোহী কবিতার সাথে তুলনা পুরোপুরি সমান্তরাল হয় না।

সব শেষে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, একটা লিখায় দেখেছি তারা বলতে চাচ্ছিল, 'যে মানদন্ড মানুষেরা বানাচ্ছে তা কেন আমরা মানবো, এসবতো কোরআনে নেই' তাহলে এর উত্তরে বলাই যায়, যে আরবরা আরবী, ব্যকরণ, বালাগা, সাহিত্য আপনার আমার চাইতে বেশি বুঝে, যারা কোরআনের শানে নুজুল, প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য আপনার আমার চাইতে বেশি বুঝেছেন তাদের কথা না মেনে কি জার্মানে, অ্যামেরিকায়, ব্রিটেনে, ভারতে বসে এআই দিয়ে আর্টিকেল লেখা প্রতিবন্ধিদের মানদন্ড মানতে হবে? তাদের ব্যাখ্যা অনুসারে ইসলামকে বুঝতে হবে? এটা চিন্তা করাটাইতো চরম মুর্খতা ছাড়া আর কিছু না।

যাইহোক নতুন সুরা তৈরীর চেষ্টা নিয়ে নিছের লিংকগুলো চ্যাক করতে পারেন, ভালো ভালো জিনিস জানতে পারবেন ইনশাআল্লাহ

এছাড়া বই আছে আরবীতে সেগুলা পড়তে পারেন, যেমন

Back to top button