পৃথিবী কি ‘ক্বফ’ নামক পান্নার পর্বত দিয়ে ঘেরা?
মুকাতিল ইবনে সুলাইমান রাহিমাহুল্লাহ ও তার বর্ণনা কি গ্রহনযোগ্য?

সমতলবাদীদের বিশ্বাস হল ‘পৃথিবী একটি থালার মত, এবং এর চারপাশ পান্নার পর্বত দিয়ে ঘেরা।’ (যদিও আধুনিক যুগে এসে এখন তারা বলে বরফের পর্বত)। তাদের এই বিশ্বাসের সবচেয়ে প্রাচীন ও একমাত্র দলীল হল ‘তাফসিরে মুকাতিল ইবনে সুলায়মান’ গ্রন্থের একটি ‘ইসরাঈলি’ বর্ণনা, যার কোন নির্ভরযোগ্য সনদ বা ভিত্তি এই দুনিয়ার যমিনে নেই। এমনকি লেখক ‘মুকাতিল ইবনে সুলায়মান’ নিজেও একজন অগ্রহনযোগ্য ব্যাক্তি। মুহাদ্দিসগন সকলেই তাকে পরিত্যাগ করার ব্যাপারে একমত হয়েছিলেন। অথচ, সমতলবাদীরা তার এই ভিত্তিহীন ও আজগুবি কথাকে ওহীর মত বিশ্বাস করে এবং অনলাইনে প্রচার করে।
মুকাতিল ইবনে সুলাইমান রহ. (মৃ. ১৫০ হি.) সূরা ক্বফের [৫০:০১] তাফসীরে বলেছেন:
وقاف جبل من زمردة خضراء محيط بالعالم
“এবং ক্বফ হচ্ছে সবুজ পান্নার পর্বত যা পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে।”
[তাফসিরে মুকাতিল ইবনে সুলাইমান, ৪/১০৯]
মুকাতিল ইবনে সুলাইমান তাবিঈন যুগের একজন বিশিষ্ট তাফসীরবিদ হলেও তিনি হাদিসের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য নন, বরং বাতিল। এবং তিনি আহলে কিতাবদের থেকে প্রচুর রেওয়ায়েত (ঈসরাইলিয়াত) করতেন। উক্ত বর্ননাটিও ঈসরাইলিয়াতের অন্তর্ভুক্ত। কারন এর কোন বাস্তব প্রমান নেই এবং রাসূল (সা.) থেকেও এর নির্ভরযোগ্য কোন সূত্র নেই।
মুকাতিল ইবনে সুলাইমান সম্পর্কে…
(১) ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেন,
كانت له كتب ينظر فيها إلا أني أرى أنه كان له علم بالقرآن
“তাঁর কাছে এমন কিছু কিতাব ছিল যা তিনি অধ্যয়ন করতেন, তবে আমি মনে করি, কুরআনের বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ছিল”
– তারিখে দিমাশক, ৬০/১১৭; তারিখে বাগদাদ
— ইমাম আহমাদ রহ. এর এই বক্তব্য থেকে বুঝা যায় যে, মুকাতিল ইবনে সুলাইমান এর নিকট আহলে কিতাবদের বইপত্র ছিল, যেগুলো তিনি দেখতেন এবং সেগুলো থেকে বর্ননা করতেন।
(২) আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) যখন তার তাফসির দেখলেন, তখন বললেন,
قَالَ ابْنُ المُبَارَكِ – وَأَحْسَنَ -: مَا أَحْسَنَ تَفْسِيْرَهُ لَوْ كَانَ ثِقَةً! قِيْلَ: إِنَّ
“ইমাম ইবনুল মুবারক রহ. বলেছেন, ‘তার তাফসির কতই না সুন্দর হতো, যদি সে নির্ভরযোগ্য (সিকাহ) হতো!” – ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, ‘ইবনুল মুবারক চমৎকারই বলেছেন।”
(৩) ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন,
وَمُقَاتِلُ بْنُ سُلَيْمَانَ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ مِمَّنْ يُحْتَجُّ بِهِ فِي الْحَدِيثِ – بِخِلَافِ مُقَاتِلِ بْنِ حَيَّانَ فَإِنَّهُ ثِقَةٌ – لَكِنْ لَا رَيْبَ فِي عِلْمِهِ بِالتَّفْسِيرِ وَغَيْرِهِ وَاطِّلَاعِهِ
“আর মুকাতিল ইবনে সুলাইমান যদিও তিনি হাদিসের ক্ষেত্রে প্রমাণ (বা দলীল) হিসেবে গ্রহণযোগ্য কেউ নন (মুকাতিল ইবনে হাইয়্যানের বিপরীতে, কেননা তিনি নির্ভরযোগ্য বা ‘সিকা’)। তবে তাফসির এবং অন্যান্য বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ও গভীর পাণ্ডিত্যের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।”
(৪) ইমাম বুখারী (রহ.) বলেছেন,
قال ابن عُيَينة: سمعت مقاتلًا يقول: إن لم يخرج الدَّجَّال الأكبر سنة خمسين ومائة فاعلموا أني كذَّاب
“ইবনে উয়াইনাহ বলেছেন: আমি মুকাতিলকে বলতে শুনেছি: যদি একশত পঞ্চাশ সালে সবচেয়ে বড় দাজ্জাল আত্মপ্রকাশ না করে, তবে তোমরা জেনে রেখো যে, আমি একজন মিথ্যাবাদী।” (আত-তারীখুল আওসাত, ৪/৭৬৪)
ইমাম বুখারী (রহ.) বলেছেন,
مُقَاتِلٌ لاَ شَيْءَ البَتَّةَ
“মুকাতিল কিছুই নন।”
(৫) ইমাম যাহাবি (রহ.) বলেছেন,
أَجْمَعُوا عَلَى تَرْكِهِ
“নিশ্চয়ই মুহাদ্দিসগণ তাকে (মুকাতিল ইবনে সুলায়মান) বর্জন করার ব্যাপারে একমত হয়েছেন।”
(৬) ইমাম ইবনে হিব্বান (রহ.) ‘মুকাতিল ইবনে সুলাইমান সম্পর্কে বলেন,
كان يأخذ عن اليهود والنصارى علم القرآن الذي يوافق كتبهم وكان مشبها يشبه الرب بالمخلوقين. وكان مع ذلك يكذب في الحديث
“তিনি ইহুদি ও নাসারাদের কাছ থেকে কুরআনের এমন জ্ঞান (তাফসির) গ্রহণ করতেন যা তাদের ধর্মগ্রন্থের সাথে মিলে যেত। তিনি ছিলেন একজন ‘মুশাব্বিহ’, যিনি আল্লাহ’কে সৃষ্টির সাথে তুলনা করতেন। তদুপরি, তিনি হাদিসের ব্যাপারেও মিথ্যা বলতেন।”
– [আল-মাজরুহিন, ৩/১৪] — তবে তিনি ‘মুশাব্বিহ’ ছিলেন কি না এটা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
(৭) ইমাম নাসাঈ (রহ.) বলেছেন,
والكذابون المعروفون بِوَضْع الحَدِيث على رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم أَرْبَعَة
١ – ابْن أبي يحيى بِالْمَدِينَةِ
٢ – والواقدي بِبَغْدَاد
٣ – وَمُقَاتِل بن سُلَيْمَان بخراسان
٤ – وَمُحَمّد بن السعيد بِالشَّام وَيعرف بالمصلوبরাসূল (সা.) এর নামে জাল হাদিস তৈরির জন্য পরিচিত মিথ্যাবাদী হলো ৪জন:
১. মদীনায় ইবনে আবী ইয়াহইয়া।
২. বাগদাদে আল-ওয়াকিদী।
৩. খুরাসানে মুকাতিল ইবনে সুলাইমান।
৪. শামে মুহাম্মাদ ইবনে সাঈদ, যিনি ‘আল-মাসলূব’ নামে পরিচিত।
(৮) ইমাম ইবনে আদী (রহ.) বলেন,
سمعتُ ابن حماد يقول: قال السعدي مقاتل بْن سُلَيْمَان كَانَ دجالا جسورا
আমি ইবনে হাম্মাদকে বলতে শুনেছি: আস-সা’দী বলেছেন, “মুকাতিল ইবনে সুলাইমান ছিলেন একজন দুঃসাহসী ভন্ড/মিথ্যুক (দাজ্জাল)।”
(৯) ইমাম ওয়াকি (রহ.) বলেছেন,
مُقَاتِلُ بْنُ سُلَيْمَانَ كَذَّابٌ.
“মুকাতিল ইবনে সুলায়মান একজন মিথ্যাবাদী।”
এছাড়াও আরও অনেকে ‘মুকাতিল ইবনে সুলায়মান’ এর উপর কঠোর জারাহ করেছেন। মুকাতিল ইবনে সুলাইমান সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে লিংকগুলোতে দেখুন,
- https://shamela.ws/book/1278/10384
- https://tarajm.com/people/13812
- https://hadithtransmitters.hawramani.com/مقاتل-بن-سليمان/
- https://tafsir.net/article/5557/tfsyr-mqatl-bn-slyman-mkant-h-mwqf-al-mfs-siryn-mnh-trq-rwayt-h-mlamhh-wmwdw-at-h
(Bangla PDF) https://t.me/globeearthbd/1296
‘তাফসিরে মুকাতিল ইবনে সুলাইমান’ সম্পর্কে শাইখ উসমান আল-খামিস (হাফিজাহুল্লাহ)
প্রশ্ন: মুকাতিল ইবনে সুলাইমানের ‘তাফসির’ সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
জবাব (শাইখ উসমান আল-খামিস): মুকাতিল নামে মূলত দুজন ব্যক্তি আছেন: একজন হলেন মুকাতিল ইবনে সুলাইমান এবং অন্যজন মুকাতিল ইবনে হাইয়ান। তাফসিরের ক্ষেত্রে এই দুজনেরই বক্তব্য উল্লেখ করা হয়ে থাকে। মুকাতিল ইবনে সুলাইমানের বিরুদ্ধে মিথ্যার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে মুকাতিল ইবনে হাইয়ান হলেন অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য।
তাই কেউ যখন বলেন “এটি মুকাতিলের বক্তব্য” তখন সতর্কতার সাথে খেয়াল রাখতে হবে যে কোন মুকাতিলের কথা বলা হচ্ছে; মুকাতিল ইবনে সুলাইমান নাকি মুকাতিল ইবনে হাইয়ান। আমি আবারও বলছি, মুকাতিল ইবনে হাইয়ান নির্ভরযোগ্য ও মজবুত; আর মুকাতিল ইবনে সুলাইমান মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত। তবে তাফসিরের ক্ষেত্রে মুকাতিল ইবনে সুলাইমানের এমন কিছু বক্তব্য রয়েছে, যা অনেক সময় অন্যান্য মুফাসসিরদের বক্তব্যের সাথে মিলে যায়। কিছু আলেম তাফসিরের ক্ষেত্রে তাঁর সেই বর্ণনাগুলো উল্লেখও করেছেন। কিন্তু তিনি যদি কোনো একটি বিষয়ে একক বা ভিন্ন মত পোষণ করেন, তবে তাঁর সেই একক বক্তব্য গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে না।
‘তাফসিরে মুকাতিল ইবনে সুলাইমান’ সম্পর্কে শাইখ মুস্তফা আল-আদাওয়ী (হাফিজাহুল্লাহ)
শাইখ (শাইখ মুস্তফা আল-আদাওয়ী): আসসালামু আলাইকুম।
প্রশ্নকারী: ওয়ালাইকুমুস সালাম। মুকাতিল ইবনে সুলাইমান সম্পর্কে আমার একটি প্রশ্ন ছিল। আমি পড়েছি যে, হাদিসের ক্ষেত্রে তিনি ‘মাতরুক’ (যার হাদিস বর্জন করা হয়েছে) বা তাঁর বর্ণিত হাদিস দুর্বল। তো, আকিদা বা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে কি তিনি নির্ভরযোগ্য?
শাইখ: আমরা মুকাতিল ইবনে সুলাইমান আল-বালখির কোনো বর্ণনা গ্রহণ করি না, কারণ তিনি (মিথ্যার) অভিযোগে অভিযুক্ত। তিনি অভিযুক্ত, আর আপনি নিশ্চয়ই জানেন ‘অভিযুক্ত’ শব্দের অর্থ কি!
▪️জাযাকুমুল্লাহ খাইরান ফা-ইন্নাল্লাহা শাকিরুন।




