ধর্ষক-ব্যভিচারীদের জন্য জান্নাত?
সহীহ বুখারীর হাদীস নিয়ে বিভ্রান্তির নিরসন

বর্তমান সময়ে ইসলামবিদ্বেষী ও নাস্তিকদের একটি বহুল ব্যবহৃত অপপ্রচার হলো—ইসলামে নাকি ধর্ষক, ব্যভিচারী ও চোরদের জন্যও জান্নাতের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে! তারা বিশেষভাবে সহীহ বুখারী -এর একটি হাদীস তুলে ধরে দাবি করে যে, “যদিও সে ব্যভিচার করে এবং চুরি করে”—এই বাক্য ইসলামে অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়। অথচ এটি হাদীসের প্রকৃত অর্থ, প্রেক্ষাপট এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের একটি অপচেষ্টা মাত্র।
বাস্তবতা হলো, ইসলাম কখনোই ধর্ষণ, ব্যভিচার, চুরি কিংবা অন্য কোনো জঘন্য অপরাধকে হালকা করে দেখেনি। বরং ইসলামী শরীয়তে এসব অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তি নির্ধারিত হয়েছে। একজন ধর্ষক বা ব্যভিচারকারী দুনিয়াতে শাস্তিযোগ্য, আর আখিরাতেও সে আল্লাহর ভয়াবহ শাস্তির মুখোমুখি হতে পারে। তবে একইসাথে ইসলামের আকীদা হলো—যে ব্যক্তি তাওহীদের ওপর মৃত্যুবরণ করবে, অর্থাৎ আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, সে শেষ পর্যন্ত চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে না। আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা করবেন, আর চাইলে তার গুনাহের পরিমাণ অনুযায়ী শাস্তি দিয়ে পরবর্তীতে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। এ বিষয়টি কুরআন, সহীহ হাদীস এবং আহলুস সুন্নাহর আকীদার অসংখ্য দলিলে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেকেই “জান্নাতে প্রবেশ করবে” কিংবা “জাহান্নামে প্রবেশ করবে না”—এ ধরনের বাক্যকে বিচ্ছিন্নভাবে উদ্ধৃত করে সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। অথচ মুহাদ্দিস ও শরাহকারগণ স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, এর অর্থ এই নয় যে গুনাহগার ব্যক্তি কোনো শাস্তি ছাড়াই সরাসরি জান্নাতে প্রবেশ করবে। বরং এর অর্থ হলো—তার চূড়ান্ত পরিণতি জান্নাত; যদিও এর পূর্বে তাকে জাহান্নামে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হতে পারে। বিশেষত ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ, যা একদিকে যিনা, অন্যদিকে জুলুম, নির্যাতন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন—এর শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ।
এ প্রবন্ধে আমরা আলোচ্য হাদীসটির সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরার চেষ্টা করব। পাশাপাশি ইমামগণের ব্যাখ্যা, আহলুস সুন্নাহর আকীদা এবং প্রখ্যাত আলেমদের বক্তব্যের আলোকে প্রমাণ করব যে, ইসলাম কখনো অপরাধকে বৈধতা দেয় না; বরং তাওহীদের মর্যাদা, আল্লাহর অসীম রহমত এবং একইসাথে তাঁর কঠিন শাস্তির বাস্তবতাকে একত্রে তুলে ধরে। ইনশাআল্লাহ, এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যাবে—নাস্তিকদের প্রচারিত অপব্যাখ্যা মূলত অজ্ঞতা, বিদ্বেষ ও বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।
গুনাগার হয়েও জান্নাত পাওয়া নিয়ে হাদিসের ব্যাখ্যা
প্রথমে আমরা হাদিস টি উল্লেখ করব
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي عَدِيٍّ، عَنْ شُعْبَةَ، عَنْ حَبِيبِ بْنِ أَبِي ثَابِتٍ، عَنْ زَيْدِ بْنِ وَهْبٍ، عَنْ أَبِي ذَرٍّ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم “ قَالَ لِي جِبْرِيلُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِكَ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ، أَوْ لَمْ يَدْخُلِ النَّارَ، قَالَ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ قَالَ وَإِنْ ”.
আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একবার জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে বললেন, আপনার উম্মাত থেকে যদি এমন ব্যাক্তি মারা যায়, যে আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করে নাই, তবে সে ব্যাক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে কিংবা তিনি বলেছেন, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদিও সে যিনা করে এবং চুরি করে। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, যদিও (সে যিনা করে ও চুরি করে তবুও)।[1]সহীহ বুখারী আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩২২২
এবার আসুন আমরা এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমামগণ কি বলেছে তা দেখেনেই
♦ ইমাম তীব্বী (রহ:) এ হাসিসের ব্যাখ্যায় বলেন,
«ثُمَّ مَاتَ عَلَى ذَلِكَ» إِشَارَةٌ إِلَى الثَّبَاتِ عَلَى الْإِيمَانِ حَتَّى يَمُوتَ، احْتِرَازًا عَمَّنِ ارْتَدَّ وَمَاتَ عَلَيْهِ، فَحِينَئِذٍ لَا يَنْفَعُهُ إِيمَانُهُ السَّابِقُ.
وَقَوْلُهُ: «دَخَلَ الْجَنَّةَ» إِشَارَةٌ إِلَى أَنَّ عَاقِبَتَهُ دُخُولُ الْجَنَّةِ، وَإِنْ كَانَ لَهُ ذُنُوبٌ جَمَّةٌ، أَوْ تَرَكَ مِنَ الْأَرْكَانِ شَيْئًا، لَكِنْ أَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ، إِنْ شَاءَ عَفَا عَنْهُ وَأَدْخَلَهُ الْجَنَّةَ، وَإِنْ شَاءَ عَذَّبَهُ بِقَدْرِ ذُنُوبِهِ ثُمَّ أَدْخَلَهُ الْجَنَّةَ بِفَضْلِهِ.
قَالَ ابْنُ مَالِكٍ: حَرْفُ الِاسْتِفْهَامِ فِي قَوْلِهِ: «وَإِنْ زَنَى» مُقَدَّرٌ، وَلَا بُدَّ مِنْ تَقْدِيرِهِ، تَقْدِيرُهُ: أَوَإِنْ زَنَى أَوْ إِنْ سَرَقَ دَخَلَ الْجَنَّةَ؟
(قَض): «رَغِمَ» لَصِقَ بِالرَّغَامِ – بِالْفَتْحِ – وَهُوَ التُّرَابُ، وَيُسْتَعْمَلُ مَجَازًا بِمَعْنَى كَرِهَ أَوْ ذَلَّ، إِطْلَاقًا لِاسْمِ السَّبَبِ عَلَى الْمُسَبَّبِ.
وَفِي الْحَدِيثِ دَلِيلٌ عَلَى أَنَّ الْكَبَائِرَ لَا تَسْلُبُ اسْمَ الْإِيمَانِ؛ فَإِنَّ مَنْ لَيْسَ بِمُؤْمِنٍ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ وِفَاقًا، وَأَنَّهَا لَا تُحْبِطُ الطَّاعَاتِ؛ لِأَنَّهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَمَّمَ الْحُكْمَ وَلَمْ يُفَصِّلْ، فَلَوْ كَانَتِ الْكَبَائِرُ مُحْبِطَةً عَلَى طَرِيقِ الْمُوَازَنَةِ أَوْ غَيْرِهِ لَلَزِمَ أَنْ يَبْقَى لِبَعْضِ الزُّنَاةِ شَيْءٌ مِنَ الطَّاعَاتِ، وَالْقَائِلُ بِالْإِحْبَاطِ يُحِيلُ دُخُولَ الْجَنَّةِ لِمَنْ هَذَا شَأْنُهُ، وَأَنَّ أَرْبَابَ الْكَبَائِرِ مِنْ أَهْلِ الْقِبْلَةِ لَا يُخَلَّدُونَ فِي النَّارِ.
شرح المشكاة للطيبي الكاشف عن حقائق السنن (2/ 480
“তারপর সে এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল”—এতে ঈমানের ওপর অবিচল থাকার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি মুরতাদ হয়ে মারা যায়, তার পূর্ববর্তী ঈমান কোনো উপকারে আসবে না।
“সে জান্নাতে প্রবেশ করবে”—এর অর্থ হলো, তার পরিণতি জান্নাত। যদিও তার অনেক গুনাহ থাকে অথবা কিছু ফরজ-ও ছুটে যায়। তার ব্যাপার আল্লাহর ইচ্ছাধীন—তিনি চাইলে ক্ষমা করবেন এবং জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, আর চাইলে গুনাহ অনুযায়ী শাস্তি দিয়ে পরে নিজ অনুগ্রহে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
ইবন মালিক বলেন, “যদিও সে ব্যভিচার করে” কথাটির আগে প্রশ্নবোধক অব্যয় অনুমিত রয়েছে। অর্থাৎ, অর্থ হবে— “সে কি ব্যভিচার করলেও বা চুরি করলেও জান্নাতে যাবে?”
“রাগিমা” শব্দের অর্থ—মাটিতে লুটিয়ে পড়া। এটি রূপক অর্থে অপমানিত হওয়া বা অপছন্দ করার অর্থেও ব্যবহৃত হয়। হাদীসে প্রমাণ রয়েছে যে, কবীরা গুনাহ ঈমানের নাম সম্পূর্ণভাবে দূর করে না। কারণ, যে মুমিন নয় সে তো সর্বসম্মতিক্রমে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
এছাড়াও এতে প্রমাণ রয়েছে যে, কবীরা গুনাহ নেক আমল সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয় না। কারণ নবী ﷺ সাধারণভাবে বলেছেন এবং কোনো ব্যতিক্রম করেননি। যদি কবীরা গুনাহ সমস্ত নেকি ধ্বংস করে দিত, তাহলে এমন ব্যক্তির জান্নাতে প্রবেশ অসম্ভব হতো। অথচ আহলুস সুন্নাহর আকীদা হলো—কবীরা গুনাহকারী মুসলিম চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে না।[2]শারহুল মিশকাত’ — ‘আল-কাসিফ আন হাকায়িকিস সুনান’ ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮০
অর্থাৎ উনার এ বক্তব্য থেকে এই কথাই স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো এই হাদীসে কখনো একথা বলাই হয়নি যে কোন ধর্ষণকারী বা কোন ব্যভিচারকারী ব্যক্তি তার শাস্তি না পেয়ে জান্নাতে চলে যাবে বরঞ্চ এই হাদিস থেকে এটাই বলা হয়েছে যে ওই ব্যক্তি যদি ঈমানদার হয় তারপরও তার কৃতকর্মের শাস্তি তাকে পেতে হবে।
আরেক যায়গায় এই হাদিসের ব্যাখ্যায় পাওয়া যায়,
حديث أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم: “قَالَ لِي جِبْرِيلُ: مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِكَ لَا يُشْرِكُ باللهِ شَيْئًا دَخَلَ الجَنَّةَ، أَوْ لَمْ يَدْخُلِ النَّارَ، قَالَ: وَإِنْ زَنَى، وَإِنْ سَرَقَ؟! قَالَ: “وَإِنْ”. وسلف أيضًا في الاستقراض(5)السابع عشر:
حديث أَبِي هُرَيْرَةَ: “الْمَلَائِكَةُ يَتَعَاقَبُونَ فيكم .. ” إلى آخره.
سلف في الصلاة(1)، وفي حديث أبي ذر إثبات دخول ونفي دخول، وكل (واحد)(2) منهم متميز عن الآخر بنعت ووقت، والمعنى: أن من مات على الإسلام من أهل هذِه الصفة فمصيره الجنة يخلد فيها، وإن ناله قبل ذلك من العقوبة ما ناله.
وأما قوله: (“ولَمْ يَدْخُلِ النَّارَ”) فمعناه: دخول تخليد، ولا بد من هذا التأويل؛ لورود الآثار الكثيرة في الوعيد.
وقال الداودي: قوله: (“لَمْ يَدْخُلِ النَّارَ”) يحتمل أن يعصم جميعهم منها، ويحتمل أن يعصم بعضهم من النار التي أعدت للكافرين ويصيبه من غيرها، ثم يصير إلى الجنة.
وفي هذا بيان لقوله: “لا يزني الزاني حين يزني وهو مؤمن، ولا يسرق حين يسرق وهو مؤمن” أنه لا يخرجه ذلك من (الإيمان)(3)؛ لقوله: “وإن”.
ولأن العقوبات في السرقة والزنا مختلفة، وليس عقوبة من خرج من الإيمان إلى الكفر إلا القتل.
التوضيح لشرح الجامع الصحيح (19/ 91
আবূ যর (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসঃ নবী ﷺ বলেছেন—
“জিবরীল আমাকে বলেছেন, ‘তোমার উম্মতের যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরীক না করে মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’ অথবা ‘সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।’ আমি বললাম, ‘যদিও সে ব্যভিচার করে এবং চুরি করে?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, যদিও সে তা-ই করে।’”
এ হাদীসটি পূর্বেও “ঋণ গ্রহণ” অধ্যায়ে উল্লেখ হয়েছে।
এরপর সপ্তদশ হাদীসঃ
আবূ হুরাইরা (রাঃ)-এর হাদীস—
“ফেরেশতাগণ তোমাদের মাঝে পালাক্রমে আগমন করেন…” শেষ পর্যন্ত।
এটিও পূর্বে সালাত অধ্যায়ে এসেছে।
আবূ যর (রাঃ)-এর হাদীসে “জান্নাতে প্রবেশ করবে” এবং “জাহান্নামে প্রবেশ করবে না”—দুটি বাক্যই প্রমাণিত হয়েছে। তবে উভয়ের অর্থ ও সময় ভিন্ন ভিন্ন। এর অর্থ হলো—যে ব্যক্তি ইসলামের ওপর এ গুণে মৃত্যুবরণ করবে, তার চূড়ান্ত পরিণতি জান্নাত, যেখানে সে চিরস্থায়ী হবে; যদিও এর আগে সে শাস্তি ভোগ করে থাকে।
আর “সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না”—এর অর্থ হলো, স্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে না। এ ব্যাখ্যা গ্রহণ করা অপরিহার্য; কারণ ভয় প্রদর্শনমূলক বহু হাদীস ও আছার বর্ণিত হয়েছে।
দাউদী বলেনঃ
“সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না”—এর সম্ভাব্য অর্থ হলো, আল্লাহ তাদের সবাইকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন। আবার এও হতে পারে যে, তাদের কাউকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করবেন যা কাফিরদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে; তবে অন্য কোনো শাস্তি তাকে স্পর্শ করতে পারে, তারপর সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
এ হাদীসে নবী ﷺ-এর এ বাণীর ব্যাখ্যাও রয়েছে—
“ব্যভিচারকারী যখন ব্যভিচার করে তখন সে পূর্ণ মুমিন থাকে না, এবং চোর যখন চুরি করে তখন সে পূর্ণ মুমিন থাকে না।”
অর্থাৎ, এ গুনাহগুলো তাকে ঈমান থেকে সম্পূর্ণ বের করে দেয় না। কারণ নবী ﷺ বলেছেন, “যদিও সে ব্যভিচার করে বা চুরি করে।”
আরও প্রমাণ হলো—চুরি ও ব্যভিচারের শাস্তি ভিন্ন ভিন্ন নির্ধারিত হয়েছে। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি ঈমান থেকে বের হয়ে কুফরিতে প্রবেশ করে, তার শাস্তি তো একটাই—হত্যা।[3]আত-তাওযীহ লি শারহিল জামি‘ আস-সহীহ, ১৯তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯১
♦ উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যা করে শাফেয়ী মাজহাবে প্রখ্যাত ইমাম ইবনুল মুলাক্কিন (রহ:) বলেন
(دخل الجنةَ): وهذا أمرٌ مقطوعٌ به.
(أو لم يدخل النار): ظاهرُه متروك؛ لثبوت (2) أن طائفةً من عُصاة هذه الأمة لا بدَّ من دخولهم النارَ، لكنهم لا يُخلدون فيها، فيحتاج إلى تأويل قوله: “لم يدخل النار” على أن المرادَ: لم يدخلها دخولَ تخليدٍ فيها؛ جمعاً بين الأحاديث
مصابيح الجامع (7/ 58)
“সে জান্নাতে প্রবেশ করবে”—এটি এমন একটি বিষয়, যা নিশ্চিত ও চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত।
“অথবা সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না”—এর বাহ্যিক অর্থ সরাসরি গ্রহণ করা হয় না। কারণ প্রমাণিত হয়েছে যে, এ উম্মতের কিছু গুনাহগার ব্যক্তি অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে। তবে তারা সেখানে চিরস্থায়ী থাকবে না। তাই “সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না”—এ কথার ব্যাখ্যা করতে হবে এভাবে যে, উদ্দেশ্য হলো—সে সেখানে চিরস্থায়ীভাবে প্রবেশ করবে না। এভাবে বিভিন্ন হাদীসের মধ্যে সমন্বয় করা হয়।[4]মাসাবীহুল জামে‘ ৭/৫৮
অর্থাৎ উনার বক্তব্য থেকে ওই স্পষ্ট ভাবে প্রমাণিত হয় যে আল্লাহর রাসূলের বক্তব্য সে জাহান্নামের প্রবেশ করবে না এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ওই ব্যক্তি চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না তবে অবশ্যই সে জাহান্নামের প্রবেশ করবে তার কৃতকর্মের ফল ভোগ করার পর সে ইনশাআল্লাহ জান্নাতে প্রবেশ করবে।
♦ আব্দুল্লাহ বিন বাজ (রহ:) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন
وهَذَا كَالأَحَادِيثِ السَّابِقَةِ -أَحَادِيثِ الرَّجَاءِ وأَحَادِيثِ التَّبشِيرِ بِالجَنَّةِ لِأهلِ التَّوحِيدِ- هَذِه الأَحَادِيثُ تَدلُّ على أن أَصْلَ الدِّينِ وأَصلُ السَّعَادَةِ هو تَوحِيدُ اللهِ والإِخلَاصُ له، وأنَّ مَنْ مَاتَ عَليهِ سَالِمًا منَ الشِّركِ فَإنَّه مِنْ أَهْلِ الجَنَّةِ، وإن كَانَتْ له ذُنُوبٌ وسَيِّئاتٌ؛ ولِهذَا قَالَ: «وإن زَنَى وإِن سَرَقَ» قَالَ: «وإن زَنَى وإِن سَرَقَ»، وفي اللَّفظِ الآخَرِ: كَرَّرَها ثَلَاثًا ثم قَالَ: «على رَغمِ أَنفِ أَبِي ذَرٍّ».
فهَذَا كُلُّهُ يَدُلُّ على أنَّ الْمُوحِّدِينَ مَصِيرُهُم إلى الجَنَّةِ، وأنَّ ارْتِكَابَ الذُّنُوبِ والْمَعَاصِي التي قد يَمُوتُ عليها بَعضُهُم تَحتَ مَشِيئةِ اللهِ لا تَمنَعُهُم مِنْ دُخُولِ الجَنَّةِ، وإنْ جَرَى عَلَيهِم خُطُوبٌ قَبلَهَا وأُمُورٌ من عَذَابٍ وشِدَّةةٍ وغَيرِ ذَلكَ، لكنَّهَا لَا تَمنَعُهُم مِنْ دُخُولِ الجَنَّةِ في المُنتَهَى والمَصِيرِ، فمنهم من يَتُوبُ اللهُ عليه قبلَ المَوتِ فَيَسْلَمُ مِنْ شَرِّهَا، وَمِنهُم من تَكُونُ له أَعمَالٌ صَالِحَةٌ عَظِيمَةٌ تَرجُحُ بِسَيئَاتِهِ، ومِنهم يَشفَعُ فيه الشُّفعَاءُ ككَنَبِيِّنا صلى الله عليه وسلم وغَيرُهُ كَالمَلَائِكَةِ والمُؤمِنِينَ والأَفْرَاطِ؛ فَيُغفَرُ له، وَمِنهُم من يُعَذَّبُ على قَدرِ مَعَاصِيهِ كمَا تَقَدَّمَ في حَدِيثِ شَفَاعَتِهِ صلى الله عليه وسلم في أَهْلِ المَعَاصِي، وَأنَّه يَشفَعُ فِيهِمْ فَيُحَدُّ له حَدٌّ … إلى آخره، عِدةَ مَرَّاتٍ.
شرح كتاب التوحيد من صحيح البخاري – ابن باز (ص269)
এ হাদীসটি পূর্ববর্তী আশাব্যঞ্জক হাদীসসমূহ এবং তাওহীদপন্থীদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদবাহী হাদীসগুলোর মতোই। এসব হাদীস প্রমাণ করে যে, দ্বীনের মূল ভিত্তি এবং সৌভাগ্যের আসল উৎস হলো আল্লাহর তাওহীদ ও তাঁর জন্য একনিষ্ঠ ইখলাস। আর যে ব্যক্তি শিরক থেকে নিরাপদ অবস্থায় এ আকীদার ওপর মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হবে—যদিও তার গুনাহ ও অসৎকর্ম থেকে থাকে।
এ কারণেই নবী ﷺ বলেছেনঃ
“যদিও সে ব্যভিচার করে এবং যদিও সে চুরি করে।”
অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি এ কথাটি তিনবার পুনরাবৃত্তি করেছেন, তারপর বলেছেনঃ
“আবূ যরের অপছন্দ সত্ত্বেও।”
এসবই প্রমাণ করে যে, তাওহীদপন্থীদের চূড়ান্ত গন্তব্য জান্নাত। আর গুনাহ ও অবাধ্যতা—যার ওপর তাদের কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করতে পারে—তা আল্লাহর ইচ্ছাধীন। এসব গুনাহ তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত করবে না; যদিও জান্নাতে প্রবেশের আগে তাদের ওপর বিপদ, শাস্তি, কঠোরতা বা অন্য কোনো কষ্ট আসতে পারে। তবে শেষ পরিণতিতে এগুলো তাদের জান্নাতে প্রবেশে বাধা হবে না।
তাদের মধ্যে কেউ এমন আছে, যার তাওবা আল্লাহ মৃত্যুর আগে কবুল করেন; ফলে সে এসব গুনাহের অনিষ্ট থেকে রক্ষা পায়। আবার কেউ এমন আছে, যার অনেক বড় বড় নেক আমল থাকে, যা তার গুনাহের ওপর প্রাধান্য লাভ করে। কেউ এমনও আছে, যার জন্য সুপারিশকারীরা সুপারিশ করবে—যেমন আমাদের নবী ﷺ, ফেরেশতাগণ, মুমিনগণ এবং অল্প বয়সে মৃত্যুবরণকারী সন্তানরা; ফলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে।
আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ তাদের গুনাহের পরিমাণ অনুযায়ী শাস্তি ভোগ করবে। যেমন পূর্বে নবী ﷺ-এর শাফাআতের হাদীসে এসেছে—তিনি গুনাহগারদের জন্য সুপারিশ করবেন, আর তাঁর জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হবে… এভাবে বহুবার।[5]সহীহ বুখারীর ‘কিতাবুত তাওহীদ’-এর ব্যাখ্যা — শাইখ ইবন বায পৃষ্ঠা ২৬৯
সৌদি আরবের বিখ্যাত ফতোয়া বোর্ডের ফতোয়ায় ধর্ষক ও বলতকারীর শাস্তি
শরিয়া আইন নিয়েতো আমাদের দেশে ইসলাম বিদ্বেষীদের অভিযোগের অভাব নেই, তাই যেই দেশে আসলেই শরিয়া আইন রয়েছে সেরকম একটি দেশের ফতোয়া বোর্ডের ফতোয়া দেখে নেওয়া যেতে পারে।
الحمد لله، والصلاة والسلام على رسول الله، وعلى آله وصحبه، أما بعد:
فإن كان المراد بالاغتصاب: إكراه ذكر على ارتكاب فاحشة اللواط معه، فعقوبة ذلك قتل المكره (بكسر الراء)؛ لقول النبي صلى الله عليه وسلم: من وجدتموه يعمل عمل قوم لوط فاقتلوا الفاعل والمفعول به. رواه أحمد وأبو داود والترمذي وابن ماجه. وراجع الفتوى رقم: 1869. ولا فرق في عقوبة الفاعل بين ما إذا كان المفعول به طائعا أو مكرها.
قال أبو الحسن المالكي في (كفاية الطالب الرباني): ومن عمل عمل قوم لوط بذكر بالغ أطاعه رُجما، أحصنا أو لم يحصنا.
فقال العدوي في حاشيته: وقوله: “أطاعه” شرط أيضا في رجم المفعول به احترازا عما لو أكرهه فإنه لا شيء عليه، وأما الفاعل فإن كان بالغا فإنه يرجم مطلقا، سواء كان المفعول به بالغا أو غير بالغ، طائعا أو مكرها. اهـ.
وأما إن كان المراد به: إكراه أنثى على الزنا، فإن كان المغتصب محصنا فعقوبته القتل رجما. وإن كان غير محصن فعقوبته: جلد مائة وتغريب عام. ويضاف إلى ذلك ما يتعلق بكون الأمر وقع اغتصاباً، وهو: مهر المثل لهذه المرأة، يدفعه إليها الغاصب، وراجع في ذلك الفتويين: 94334، 19424. ولمزيد الفائدة يمكن الاطلاع على الفتويين: 24127، 48270.
وأما إن كان المقصود هو الإكراه على ما هو دون الوطء من أنواع الاستمتاع، فهذا وإن كان غاية في الحرمة، إلا أن مرتكبه لا يعاقب بالحد الشرعي السابق، وإنما يعزر بقدر ما يراه القاضي من العقوبة زاجرا له ولأمثاله، وراجع الفتوى رقم: 36587.
وأما ما روي عن رسول الله صلى الله عليه وسلم في حق من أكره امرأة على الزنا، فمنه حديث علقمة بن وائل بن حجر الكندي عن أبيه أن امرأة خرجت على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم تريد الصلاة فتلقاها رجل فتجللها فقضى حاجته منها، فصاحت فانطلق، ومر عليها رجل فقالت: إن ذاك الرجل فعل بي كذا وكذا، ومرت بعصابة من المهاجرين فقالت: إن ذاك الرجل فعل بي كذا وكذا. فانطلقوا فأخذوا الرجل الذي ظنت أنه وقع عليها وأتوها فقالت: نعم هو هذا. فأتوا به رسول الله صلى الله عليه وسلم فلما أمر به ليرجم قام صاحبها الذي وقع عليها فقال: يا رسول الله أنا صاحبها. فقال لها اذهبي: فقد غفر الله لك. وقال للرجل قولا حسنا، وقال للرجل الذي وقع عليها: ارجموه. وقال: لقد تاب توبة لو تابها أهل المدينة لقبل منهم. رواه أحمد والترمذي وقال: حسن غريب صحيح، وعلقمة بن وائل بن حجر سمع من أبيه وهو أكبر من عبد الجبار بن وائل، وعبد الجبار لم يسمع من أبيه. اهـ. وحسنه الألباني.
وروى مالك في موطئه عن ابن شهاب أن عبد الملك بن مروان قضى في امرأة أصيبت مستكرهة بصداقها على من فعل ذلك بها.
وبوَّب عبد الرزاق في مصنفه بابا في المستكرهة، أسند فيه عن حجاج أن حبشيا استكره امرأة منهم, فأقام عليه عمر بن عبد العزيز الحد، وأمكنها من رقبته.
وهذا كله إن وقعت الجريمة على وجه المخادعة والإسرار، وأما إن كانت على سبيل المكابرة والمجاهرة والمغالبة، فهذا يقام فيه حد الحرابة المذكور في قوله تعالى: إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خِلَافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ [المائدة: 33].
ولمجلس هيئة كبار العلماء برئاسة الشيخ عبد العزيز بن باز قرار في هذا الشأن، جاء فيه: إن جرائم الخطف والسطو لانتهاك حرمات المسلمين على سبيل المكابرة والمجاهرة من ضروب المحاربة والسعي في الأرض فسادا المستحقة للعقاب الذي ذكره الله سبحانه في آية المائدة، سواء وقع ذلك على النفس أو المال أو العرض، أو أحدث إخافة السبيل وقطع الطريق، ولا فرق في ذلك بين وقوعه في المدن والقرى أو في الصحارى والقفار كما هو الراجح من آراء العلماء رحمهم الله تعالى. قال ابن العربي يحكي عن وقت قضائه: رفع إلي قوم خرجوا محاربين إلى رفقة فأخذوا منها امرأة مغالبة على نفسها من زوجها ومن جملة المسلمين معه، فاحتملوها، ثم جد فيهم الطلب فأخذوا وجيء بهم، فسألت من كان ابتلاني الله به من المفتين فقالوا: ليسوا محاربين! لأن الحرابة إنما تكون في الأموال لا في الفروج! فقلت لهم: إنا لله وإنا إليه راجعون! ألم تعلموا أن الحرابة في الفروج أفحش منها في الأموال؟! وأن الناس كلهم ليرضون أن تذهب أموالهم وتحرب من بين أيديهم ولا يحرب المرء من زوجته وبنته، ولو كان فوق ما قال الله عقوبة لكانت لمن يسلب الفروج. اهـ.
والله أعلم.
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। রাসূলুল্লাহ ﷺ, তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবিদের প্রতি শান্তি ও সালাম বর্ষিত হোক। অতঃপর—
যদি “ধর্ষণ” বলতে বোঝানো হয় কোনো পুরুষকে জোরপূর্বক সমকামিতার (লূত সম্প্রদায়ের কাজ) কাজে বাধ্য করা, তবে জোরকারী ব্যক্তির শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড। কারণ নবী ﷺ বলেছেন:
“তোমরা যাকে লূত সম্প্রদায়ের কাজ করতে দেখবে, তবে কর্তা ও যার সাথে করা হয়েছে—উভয়কে হত্যা করো।”
এ হাদিসটি আহমদ:2732 , আবু দাউদ:4462, তিরমিযি:1523 ও ইবনে মাজাহ;2561 বর্ণনা করেছেন।এ ক্ষেত্রে যার সাথে কাজটি করা হয়েছে সে রাজি ছিল কি জোরপূর্বক বাধ্য করা হয়েছে—তা কর্তার (যে ব্যক্তি ধর্ষণ করেছে) শাস্তির ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করে না।
মালিকি আলেম আবুল হাসান আল-মালিকি তাঁর কিফায়াতুত তালিবুর রাব্বানী গ্রন্থে বলেন:
“যে ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সাথে লূত সম্প্রদায়ের কাজ করবে এবং সে এতে সম্মত থাকবে, তবে উভয়কে রজম করা হবে; তারা বিবাহিত হোক বা না হোক।” . (2/ 326)
এর ব্যাখ্যায় আল-আদাউই বলেন: “‘সে সম্মত ছিল’—এই শর্তটি যার সাথে কাজটি করা হয়েছে তার রজম হওয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অর্থাৎ যদি তাকে জোর করা হয়, তবে তার উপর কোনো শাস্তি নেই। কিন্তু কর্তা যদি প্রাপ্তবয়স্ক হয়, তবে তাকে সর্বাবস্থায় রজম করা হবে—অপর ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক হোক বা অপ্রাপ্তবয়স্ক, সম্মত হোক বা বাধ্য।”
حاشية العدوي على كفاية الطالب الرباني (2/ 326)
আর যদি উদ্দেশ্য হয় কোনো নারীকে জোরপূর্বক ব্যভিচারে বাধ্য করা, তবে—
ধর্ষক যদি বিবাহিত হয়, তার শাস্তি রজম করে হত্যা।
আর অবিবাহিত হলে, তার শাস্তি ১০০ বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন।
এর সাথে আরও যোগ হবে, যেহেতু এটি ধর্ষণের ঘটনা, তাই সেই নারীকে “মোহরে মিসল” (সমপর্যায়ের নারীদের সমপরিমাণ মোহর) প্রদান করতে হবে, যা ধর্ষক পরিশোধ করবে।
আর যদি উদ্দেশ্য হয় সহবাসের নিচের পর্যায়ের কোনো যৌন নির্যাতন বা অসদাচরণে বাধ্য করা, তবে তা অত্যন্ত হারাম হলেও এর জন্য উপরের নির্ধারিত শরিয়তি হদ কার্যকর হবে না। বরং বিচারক পরিস্থিতি অনুযায়ী উপযুক্ত তাআযীর (শাস্তিমূলক ব্যবস্থা) নির্ধারণ করবেন, যাতে অপরাধী ও অন্যরা নিবৃত্ত হয়।
হাদিসের আলোকে ধর্ষণের শাস্তি
নারীকে জোরপূর্বক ব্যভিচারে বাধ্য করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে:
এক নারী নামাজে যাওয়ার পথে এক ব্যক্তি তাকে আক্রমণ করে ধর্ষণ করে। পরে লোকেরা ভুল ব্যক্তিকে ধরে আনে। তখন প্রকৃত অপরাধী নিজে স্বীকার করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ নারীকে বলেন:
“তুমি চলে যাও, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করেছেন।”
এবং অপরাধী সম্পর্কে বলেন:
“তাকে রজম করো।”
তিনি আরও বলেন:“সে এমন তওবা করেছে, যদি মদিনাবাসী এমন তওবা করত তবে তা কবুল করা হতো।” – আবু দাউদ : 4379
ইমাম মালিক তাঁর মুয়াত্তা গ্রন্থে ইবনে শিহাব থেকে বর্ণনা করেন যে, আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান এক ধর্ষিতা নারীর জন্য অপরাধীর উপর মোহর নির্ধারণ করেছিলেন। – মুয়াত্তা :703
আর আব্দুর রাজ্জাক তাঁর মুসান্নাফ গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, এক হাবশি ব্যক্তি এক নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করলে উমর ইবনে আবদুল আজিজ তার উপর শরিয়তি শাস্তি কার্যকর করেন। – مصنف ابن أبي شيبة (15/ 409 ت الشثري)
তবে এসব তখন, যখন অপরাধটি গোপনে বা প্রতারণার মাধ্যমে সংঘটিত হয়। কিন্তু যদি প্রকাশ্যে শক্তি প্রয়োগ, অস্ত্রের ভয় দেখানো, সন্ত্রাস সৃষ্টি বা দস্যুতার মতোভাবে সংঘটিত হয়, তবে তা “হিরাবাহ” (সশস্ত্র সন্ত্রাস ও সমাজে বিপর্যয় সৃষ্টি) হিসেবে গণ্য হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি হলো—তাদের হত্যা করা হবে, অথবা শূলীতে চড়ানো হবে, অথবা তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলা হবে, অথবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে…” — [সূরা মায়িদা: ৩৩]
শাইখ আব্দুল আজিজ বিন-এর সভাপতিত্বে সৌদি আরবের “হাইআতু কিবারিল উলামা” এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয় যে, অপহরণ, ডাকাতি ও মানুষের ইজ্জত-সম্মান লঙ্ঘনের উদ্দেশ্যে সশস্ত্র আক্রমণ—সবই “হিরাবাহ” ও “পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি”-এর অন্তর্ভুক্ত। তা ব্যক্তি, সম্পদ বা সম্ভ্রম—যার বিরুদ্ধেই হোক না কেন।
ইবনে আরাবি বলেন:
“আমার বিচারকালে কিছু লোক একদল যাত্রীর উপর আক্রমণ করে তাদের মধ্য থেকে এক নারীকে জোরপূর্বক অপহরণ করেছিল। পরে তাদের গ্রেপ্তার করা হলে কিছু মুফতি বললেন:
‘এরা মুহারিব নয়; কারণ হিরাবাহ কেবল সম্পদের ক্ষেত্রে হয়, সম্ভ্রমের ক্ষেত্রে নয়!’ তখন আমি বললাম: ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন! তোমরা কি জানো না, সম্ভ্রমের ক্ষেত্রে হিরাবাহ সম্পদের চেয়েও ভয়াবহ? মানুষ তার সম্পদ হারানো সহ্য করতে পারে, কিন্তু স্ত্রী-কন্যার সম্ভ্রমহানি সহ্য করতে পারে না। আল্লাহ যা বলেছেন তার চেয়েও কঠিন শাস্তি যদি থাকত, তবে তা সম্ভ্রম লুণ্ঠনকারীদের জন্যই উপযুক্ত হতো।’”
আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।[6]. https://isla.mw/2aftue .
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, আলোচ্য হাদীসকে কেন্দ্র করে ইসলামবিদ্বেষী ও নাস্তিকদের প্রচারিত অপপ্রচার মূলত হাদীসের প্রকৃত অর্থ, প্রেক্ষাপট এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বিশুদ্ধ আকীদা সম্পর্কে অজ্ঞতা কিংবা ইচ্ছাকৃত বিকৃতিরই বহিঃপ্রকাশ। “যদিও সে যিনা করে এবং চুরি করে”—এই বাক্য কখনোই ব্যভিচার, ধর্ষণ, চুরি বা অন্য কোনো কবীরা গুনাহকে বৈধতা দেয় না; বরং এটি তাওহীদের মহান মর্যাদা এবং আল্লাহর অসীম রহমতের দিকটি তুলে ধরে।
ইমাম তীব্বী, ইবনুল মুলাক্কিন, দাউদী, ইবনু বাযসহ অসংখ্য মুহাদ্দিস ও আকীদাবিদ স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, এ হাদীসের উদ্দেশ্য হলো—যে ব্যক্তি শিরকবিহীন ঈমানের ওপর মৃত্যুবরণ করবে, সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সে তার অপরাধের শাস্তি থেকে মুক্ত থাকবে। বরং আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা করবেন, আর চাইলে তার গুনাহ অনুযায়ী কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন, এরপর শেষ পরিণতিতে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
বিশেষত ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ ইসলামে শুধু যিনাই নয়; এটি জুলুম, নির্যাতন, মানবিক মর্যাদাহানি এবং সমাজ ধ্বংসের একটি ভয়াবহ অপরাধ। ইসলামী শরীয়তে এর জন্য কঠোর দণ্ড নির্ধারিত হয়েছে। সুতরাং, ইসলামের বিরুদ্ধে “অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়” —এমন অভিযোগ বাস্তবতা ও শরীয়তের মূলনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।
আহলুস সুন্নাহর আকীদা হলো—কবীরা গুনাহ ঈমানকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে না, তবে তা মানুষকে আল্লাহর ভয়াবহ শাস্তির মুখোমুখি করতে পারে। একইসাথে কোনো গুনাহগার মুসলিমকে চিরস্থায়ী জাহান্নামী মনে করাও খারিজী চিন্তাধারার অন্তর্ভুক্ত। ইসলাম সর্বদা আশা ও ভয়ের মধ্যে ভারসাম্য শিক্ষা দেয়—একদিকে আল্লাহর রহমতের আশা, অন্যদিকে তাঁর কঠিন শাস্তির ভয়।
অতএব, একজন মুমিনের কর্তব্য হলো—এসব বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে কুরআন, সহীহ সুন্নাহ এবং সালাফে সালিহীনের ব্যাখ্যার আলোকে দ্বীনকে বুঝা। কারণ সত্যিকার ইসলাম কখনো অপরাধকে সমর্থন করে না; বরং তাওহীদ, ন্যায়বিচার, তাকওয়া ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে একটি পবিত্র সমাজ গঠনের শিক্ষা দেয়। ইনশাআল্লাহ, সঠিক জ্ঞান ও প্রমাণভিত্তিক আলোচনা এ ধরনের অপব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তির মূলোৎপাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
Footnotes
| ⇧1 | সহীহ বুখারী আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩২২২ |
|---|---|
| ⇧2 | শারহুল মিশকাত’ — ‘আল-কাসিফ আন হাকায়িকিস সুনান’ ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮০ |
| ⇧3 | আত-তাওযীহ লি শারহিল জামি‘ আস-সহীহ, ১৯তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯১ |
| ⇧4 | মাসাবীহুল জামে‘ ৭/৫৮ |
| ⇧5 | সহীহ বুখারীর ‘কিতাবুত তাওহীদ’-এর ব্যাখ্যা — শাইখ ইবন বায পৃষ্ঠা ২৬৯ |
| ⇧6 | . https://isla.mw/2aftue . |




