ইসলামবিরোধীদের প্রতি জবাব

বুখারী শরীফের হাদীসে সুলাইমান (আ.)-এর স্ত্রীদের সংখ্যা পার্থক্য: কারণ ও আপত্তির জবাব

প্রশ্নঃ নবী সুলাইমান (আ.)-এর হাদীসে বিভিন্ন রিওয়ায়েতে বিশেষ করে সহীহ বুখারীর রেওয়ায়েতে স্ত্রীর সংখ্যা ৬০, ৭০, ৯০, ৯৯, ১০০ ইত্যাদি উল্লেখ হয়েছে। আর এটিকে কিছু মানুষ “বৈপরীত্য” বা মুযতারিব বলে আপত্তি করে, এবং ইমাম বুখারীর হাদিস সংকলন এমনকি বর্ণনার বিপরীত্যের কারণে সমস্ত হাদিসের অস্বীকারের প্রতি আপত্তি তুলে এবং এক রাতে এতগুলো স্ত্রীর কাছে যাওয়া এবং মিলিত হওয়া অসম্ভব বলে উল্লেখ করে। আপনি কিভাবে এই দুটি আপত্তির জবাব দেবেন? আর ইমাম বুখারী (রহ.) একই হাদীস বিভিন্ন অধ্যায়ে বিভিন্ন সংখ্যা নিয়ে বর্ণনা করেছেন—এর পিছনে কি হিকমত রয়েছে?

জবাবঃ

হাদিসে সংখ্যার ভিন্নতা ইমাম বুখারীর কারণে?

আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াস ছলাতু ওয়াস সালামু আলা রসূলিল্লাহ। অতঃপর এটি এমন একটি হাদীস, যা দিয়ে ইমাম বুখারীর বিরোধীরা সহীহ বুখারীতে আপত্তি তোলে। অথচ তারা জানে না যে, অন্য সকল হাদীসের মতো বুখারী (রহ.) এই হাদীসটি এককভাবে বর্ণনা করেননি। বরং বুখারীর সহীহ গ্রন্থের প্রতিটি হাদীসই বুখারী ছাড়াও অন্যরা বর্ণনা করেছেন। এই বুখারী বিরোধীরা নবী সুলাইমান (আ.)-এর স্ত্রীদের উপর পরিক্রমণ সংক্রান্ত হাদীসের বিভিন্ন বর্ণনায় স্ত্রীদের সংখ্যার পার্থক্যের কথা উল্লেখ করে। কারণ, সহীহ বুখারীর একাধিক বর্ণনায় এই হাদীস এসেছে এবং সেখানে স্ত্রীদের সংখ্যার পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। কোনো স্থানে স্ত্রীদের সংখ্যা সত্তরজন[1]হাদীস নং ৩৪২৪ বলে এসেছে, কোনো স্থানে এসেছে ষাটজন[2]হাদীস নং ৭৪৬৯, কোনো স্থানে এসেছে নব্বইজন[3]হাদীস নং ৬৬৩৯, ৬৭২০, কোনো স্থানে নিরানব্বই থেকে একশতের মধ্যে সংখ্যা উল্লেখে দ্বিধার কথা এসেছে[4]হাদীস নং ২৮১৯, এবং কোনো স্থানে এসেছে একশতজন[5]হাদীস নং ৫২৪২

এই সন্দেহের জবাব হলোঃ ইমাম বুখারী (রহ.) এ বিষয়ে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে তা উল্লেখ করেছেন। এগুলো ইমাম বুখারী ছাড়াও অন্যান্য ইমামগণ বর্ণনা করেছেন। এই শব্দগত পার্থক্য সম্পর্কে বুখারী (রহ.) অবগত ছিলেন; অর্থাৎ এটি বুখারীর কোনো ভুল বা বিস্মৃতির কারণে ঘটেনি। বরং বুখারী (রহ.) এটি বর্ণনা করেছেন, কারণ হাদীসের মূলবিষয় সহীহ ও সুপ্রতিষ্ঠিত। সহীহ বুখারীতে তাঁর সাধারণ পদ্ধতি হলো, একটি হাদীস একাধিক শাইখের মাধ্যমে পুনরাবৃত্তি করে বর্ণনা করা। যেহেতু গল্পের মূল অংশ সহীহ ও নির্ভরযোগ্য, তাই তিনি সবগুলো বর্ণনাই উল্লেখ করেছেন। এমন গল্পে সংখ্যা নির্ধারণে বর্ণনাকারীদের পার্থক্য হাদীসের অর্থের ক্ষতি করে না এবং এর বিশুদ্ধতাকে প্রভাবিত করে না। বর্ণনাকারীরা মূল উদ্দেশ্য ব্যক্ত করার ক্ষেত্রে একমত হয়েছেন। আর এটি জানা বিষয় যে, উদ্দেশ্যের ক্ষতি না করলে অর্থানুসারে হাদীস বর্ণনা করা জায়েয। তাই সংখ্যার পার্থক্য নবী ﷺ কর্তৃক বর্ণিত সুলাইমান (আ.)-এর গল্পের বিশুদ্ধতাকে প্রভাবিত করে না। বুখারী (রহ.) তাঁর সহীহ গ্রন্থে এই হাদীসটি পুনরাবৃত্তি করতে গিয়ে এর জন্য ভিন্ন ভিন্ন শিরোনাম ব্যবহার করেছেন। কখনো তিনি যে অধ্যায়ে এই হাদীসটি উল্লেখ করেছেন তার নাম দিয়েছেন “জিহাদের জন্য সন্তান কামনা করা অধ্যায়”, কখনো নবীগণের বইয়ে সুলাইমান (আ.)-এর কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে, কখনো “নবী ﷺ এর শপথ কেমন ছিল” অধ্যায়ের অধীনে, কখনো “শপথে ইনশাআল্লাহ বলা” অধ্যায়ের অধীনে, কখনো “লোকের এ কথা বলা: আজ রাতে আমি আমার স্ত্রীদের কাছে ঘুরে আসব” অধ্যায়ের অধীনে এবং সর্বশেষ “ইচ্ছা ও চাওয়া” অধ্যায়ের অধীনে।

বুখারী (রহ.)-এর এই হাদীসের জন্য ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায় শিরোনামের মাধ্যমে এটি সুস্পষ্ট যে, সংখ্যা উদ্দেশ্য নয়, বরং এই হাদীস থেকে প্রাপ্ত বিধান গ্রহণ করাই উদ্দেশ্য।

অতঃপর বুখারী (রহ.) তাঁর সহীহ গ্রন্থে সুস্পষ্ট করেছেন যে, সংখ্যা সংক্রান্ত বর্ণনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সহীহ বর্ণনা হলো নব্বইজন। সূরা সাদ-এর ৩০ নং আয়াত “আর আমি দাউদকে সুলাইমান দান করেছিলাম। কত উত্তম বান্দা সে! নিশ্চয় সে ছিল আমার প্রতি বারবার ফিরে আসা” – এ আয়াতের তাফসীর সংক্রান্ত নবীগণের হাদীস অধ্যায়ে, হাদীস নং ৩৪২৪-এ বুখারী (রহ.) একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন যাতে সংখ্যা সত্তরজন বলা হয়েছে। এরপর বুখারী বলেনঃ “আর শু‘আইব ও ইবনু আবুয যিনাদ বলেনঃ (সুলাইমান আঃ এর স্ত্রীর সংখ্যা) নব্বইজন। আর এটি অধিক সহীহ।”

এটি একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, এই হাদীসে বর্ণিত সংখ্যার ব্যাপারে বর্ণনাকারীদের মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে বুখারী (রহ.) সম্পূর্ণ সচেতন, জ্ঞানী ও অবগত ছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ[6].https://www.alukah.net/sharia/0/118236.

আমরা এই সংখ্যার পার্থক্যের দ্বিতীয় ব্যাখ্যা দিতে পারি, ঠিক যেমন হাসান আবু আল-আশবাল আয-যুহাইরী নিজে জবাবে প্রদর্শন করেছেন। তিনি বলেন—

أن هذا العدد له مفهوم يسمى عند الأصوليين: مفهوم العدد، فهل مفهوم العدد حجة؟ مذهب جماهير الأصوليين أن مفهوم العدد ليس بحجة، وإنما المراد منه الكثرة، وليس المراد اعتبار عين العدد، كما لو قلت لصاحبك: أنا اتصلت بك مائة مرة، أو أتيتك للزيارة مائة مرة ولم أجدك، وفي حقيقة الأمر أنت ما أردت تحديد العدد، أنك حقاً أتيت مائة مرة عداً، وإنما أردت أن تخبره أنك أتيته كثيراً.

إذاً: مفهوم العدد عند جماهير العلماء ليس بحجة، وإنما المراد ذكر الكثرة؛ هذا أحد وجوه الرد.

এ সংখ্যাটির একটি ধারণা রয়েছে যা উসূলবিদগণের কাছে পরিচিত: সংখ্যার ধারণা। তাহলে সংখ্যার ধারণা কি দলিল হিসেবে গণ্য? উসূলবিদদের বৃহত্তর অংশের মতে সংখ্যার ধারণা দলিল নয়; বরং এখানে উদ্দেশ্য হলো প্রচুরতার ইঙ্গিত, নির্দিষ্ট সংখ্যার বিবেচনা উদ্দেশ্য নয়। যেমন আপনি আপনার বন্ধুকে বললেন: আমি তোমার সাথে একশ’বার যোগাযোগ করেছি, অথবা আমি তোমার সাথে দেখা করতে একশ’বার এসেছি কিন্তু তোমাকে পাইনি। বাস্তবে আপনার উদ্দেশ্য সংখ্যা নির্ধারণ করা নয় যে আপনি সত্যিই একশ’বার এসেছেন, বরং আপনি তাকে এটা জানাতে চেয়েছেন যে আপনি অনেকবার এসেছেন।

সুতরাং, আলিমদের বৃহত্তর অংশের মতে সংখ্যার ধারণা দলিল নয়; বরং উদ্দেশ্য হলো প্রচুরতার উল্লেখ। এটি হলো প্রথম খণ্ডন।[7]শারহু সাহীহ মুসলিম খন্ড ১০৬, পৃষ্ঠা ৮ লেখক: হাসান আবুল আশবাল আয-যুহাইরি

বুখারীর উক্ত বর্ণনা গুলো মুযতাবির?

(সুলাইমান আঃ এর হাদীসে) নারীদের সংখ্যায় (ইদতিরাব): তিনি বলেছেন:

ومثل هذا الاختلاف في عدد النساء ورد أيضاً في الروايات المختلفة لهذا الحديث في البخاري … ولكن الإشكال في متن هذا الحديث غير مقتصر على الاضطراب في عدد النساء، بل فيه إشكالات أهم بكثير

“এবং নারীদের সংখ্যায় এই ধরনের পার্থক্য বুখারীতেও এই হাদীসের বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে… কিন্তু এই হাদীসের মূল পাঠে জটিলতা শুধু নারীদের সংখ্যায় বিপর্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এতে আরও গুরুত্বপূর্ণ জটিলতাসমূহ রয়েছে।”[8]নাহওয়া তাফ’ইল কাওয়াইদ নাকদি মতনিল হাদীস’ (১৮৮)।

এই জটিলতার উত্তর:

সুলাইমান (আ.)-এর স্ত্রীদের সংখ্যা সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনায় পার্থক্য রয়েছে এবং এর সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ: (ষাট,সত্তর, নব্বই, নিরানব্বই এবং একশ)। এই পার্থক্য রাবীদের দিক থেকে, যেমন ইবনে হাজার বলেছেন:

وذكر أبو موسى المديني … أن في بعض نسخ مسلم عقب قصة سليمان هذا الاختلاف في هذا العدد، وليس هو من قول النبي صلى الله عليه وسلم وإنما هو من الناقلين

“আবু মূসা আল-মাদীনী উল্লেখ করেছেন… যে মুসলিমের কিছু কপিতে সুলাইমানের ঘটনার পর এই সংখ্যার পার্থক্য উল্লেখ করা হয়েছে, এবং এটি নবী (সা.)-এর বাণী নয়; বরং তা বর্ণনাকারীদের দিক থেকে।”[9]ফাতহুল বারী: ১১/৬১৪

কারদী এই পার্থক্যকে হাদীসের মূল পাঠে দুর্বলতামূলক মুযতারিব (বিশৃঙ্খলা/গড়মিল) বলে গণ্য করেছেন। এর জবাব নিম্নরূপ দেওয়া যেতে পারে:

সমন্বয় বা প্রাধান্য নির্ধারণের সম্ভাবনা মুযতারিবকে বাতিল করে

আলেমগণ বলেছেন যে, যা সমন্বয় বা প্রাধান্য নির্ধারণ করা সম্ভব, তাতে মুযতারিব প্রযোজ্য হয় না।

হাফিয ইবনুস সালাহ বলেছেন:

” المضطرب من الحديث هو : الذي تختلف الرواية فيه، فيرويه بعضهم على وجه، وبعضهم على وجه آخر مخالف له . وإنما نسميه مضطرباً إذا تساوت الروايتان. أما إذا ترجحت إحداهما بحيث لا تقاومها الأخرى … فالحكم للراجحة ولا يطلق عليه حينئذ وصف المضطرب ولا حكمه”

“হাদীসের মুযতারিব হলো: যার বর্ণনায় পার্থক্য থাকে; কেউ তা একভাবে বর্ণনা করেন, অন্যরা অন্যভাবে যা তার বিপরীত। আমরা তাকে মুযতারিব বলি যখন বর্ণনাগুলো সমান হয়। কিন্তু যখন একটির প্রাধান্য এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় যে অন্যটি তার সাথে তুলনীয় নয়… তখন সিদ্ধান্ত প্রাধান্যযুক্তটির পক্ষে হয় এবং তখন তাকে মুযতারিব বলা যায় না এবং তার বিধানও প্রযোজ্য হয় না।”[10]মুকাদ্দিমাতু ইবনিস সালাহ: ১২২

এবং ইবনে কাসীর বিপর্যয় (মুযতারিব) এর সংজ্ঞায় বলেছেন:

وهو أن يختلف الرواة فيه على شيخ بعينه، أو من وجوهٍ أخر متعادلة لا يترجح بعضها على بعض

“এটি হলো এমন (হাদীস) যাতে রাবীগণ কোনো নির্দিষ্ট শাইখের বর্ণনা অথবা অন্যান্য সমতুল্য পন্থায় এমনভাবে ভিন্নভিন্ন বর্ণনা করেন, যা একটিকে অন্যটির উপর প্রাধান্য দিতে দেয় না।”[11]ইখতিসার ‘উলুমিল হাদীস ওয়া মা’আহুল বায়িসুল হাসিস: ১/২২১

আহমাদ শাকির বলেছেন:

وإن تساوت الروايات وامتنع الترجيح؛ كان الحديث مضطرباً”

“আর যদি বর্ণনাগুলো সমান হয় এবং প্রাধান্য নির্ধারণ করা সম্ভব না হয়, তাহলে হাদিসটি বিপর্যয়গ্রস্ত (মুযতারিব) বলে গণ্য হবে।”[12]আল-বায়িসুল হাসিস: ১/২২১

কাসিমী বলেছেন:

ثم إن رجحت إحدى الروايتين أو الروايات … فالحكم للراجحة ولا يكون الحديث مضطرباً

“যদি একটি বর্ণনা বা বর্ণনাগুলোর মধ্যে কোনো একটি প্রাধান্য পায়… তবে সিদ্ধান্ত প্রাধান্যযুক্তটির পক্ষে হয় এবং হাদীসটি মুযতারিব গ্রস্ত হয় না।”[13]কাওয়াইদুত তাহদিস: (১৩২

وبهذا يتبين أن الاضطراب الموجب للاطراح هو اختلاف متكافئ، مع تعذر الجمع، أي أنه متقارب ومتقاوم لا نستطيع ترجيح إحدى الروايات على الأخرى

“এ থেকে স্পষ্ট যে, যে বিপর্যয় (ইদতিরাব) বর্জনের কারণ হয় তা হলো সমতুল্য পার্থক্য, যার সাথে সমন্বয় সাধনও অসম্ভব। অর্থাৎ, এটি এমন কাছাকাছি ও সমতুল্য যাতে আমরা একটি বর্ণনাকে অন্যটির উপর প্রাধান্য দিতে পারি না।”[14]দেখুন: ইতহাফুন নাবিল: ৫৯

এবং এই হাদীসটি এই বর্ণনায় ইযতিরাবগ্রস্ত বলে গণ্য হয় না। কারণ, যখন সংখ্যায় এই পার্থক্য দেখা দেয়, তখন আলেমগণ হাদীসটির ক্ষেত্রে প্রাধান্য নির্ধারণ বা সমন্বয় সাধনের পথ অবলম্বন করেছেন।

তারা এই হাদীসের উপর আমল করা এবং এ থেকে বহু ফিকহী বিধান আহরণ করা বন্ধ করেননি, কারণ বিভিন্ন বর্ণনার মধ্যে সমন্বয় বা প্রাধান্য নির্ধারণ সম্ভব।

সমন্বয় ও প্রাধান্য নির্ধারণের ব্যাখ্যা

ক) সমন্বয়:

হাফেয ইবনে হাজার (রহ.) বিভিন্ন বর্ণনার মধ্যে সমন্বয়ের কথা উল্লেখ করে বলেছেন:

والجمع بينها أن الستين كنّ حرائر، وما زاد عليهن كنّ سراري، أو بالعكس. وأما السبعون فللمبالغة، وأما التسعون، والمائة؛ فكنّ دون المائة وفوق التسعين، فمن قال (تسعون) ألغى الكسر، ومن قال (مائة) جبره. ومن ثم وقع التردد في رواية جعفر

“এর মধ্যে সমন্বয় হলো: ষাটজন ছিলেন স্বাধীন (হারাইর) নারী এবং এর অতিরিক্তরা ছিলেন দাসী (সারারি), অথবা তার বিপরীত। আর সত্তর সংখ্যাটি অতিরঞ্জন (মুবালাগা) বোঝাতে। আর নব্বই ও একশ-এর ক্ষেত্রে: তারা একশ-এর কম ও নব্বই-এর বেশি ছিলেন। সুতরাং যিনি ‘নব্বই’ বলেছেন, তিনি ভগ্নাংশ বাদ দিয়েছেন। আর যিনি ‘একশ’ বলেছেন, তিনি ভগ্নাংশকে পূর্ণ করেছেন। এ কারণেই জা’ফার-এর বর্ণনায় দ্বিধা দেখা দিয়েছে।”[15]সহীহ বুখারী: কিতাবুল জিহাদ ওয়াস সিয়ার, বাব: মান তালাবাল ওয়ালাদ লিল জিহাদ, (৬/৪১), নং: (২৮১৯), ফাতহুল বারী: ১০/২২২

আর তিনি বলেছেন: “আমি বলছি:

والذي يظهر مع كون مخرج الحديث عن أبي هريرة، واختلاف الرواة عنه أن الحكم للزائد، لأن الجميع ثقات

যেহেতু হাদীসটির সূত্র আবু হুরাইরা (রা.) এবং তার থেকে বিভিন্ন রাবীদের বর্ণনায় পার্থক্য রয়েছে, তাই অতিরিক্ত বর্ণনার (যিয়াদাহ) মূল্য থাকবে, কারণ সব রাবীই বিশ্বস্ত।”[16]ফাতহুল বারী: ৬/৬১৫

খ) প্রাধান্য নির্ধারণ (তার্জীহ):

ইমাম বুখারী (রহ.) প্রাধান্য নির্ধারণের পথ অবলম্বন করেছেন, যেখানে তিনি শু’আইব ও আবুয যিনাদের বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, (সুলাইমান আঃ এর স্ত্রীর সঠিক সংখ্যা) তা হলো ‘নব্বই’। অতঃপর তিনি বলেছেন: “এটাই সবচেয়ে সহীহ।”

এটি এমন ব্যক্তির জন্য গোপন নয় যার মুহাদ্দিসদের পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান আছে যে, তারা পার্থক্যপূর্ণ সহীহ বর্ণনাগুলোর ফয়সালা করার ক্ষেত্রে এই সতর্কতাপূর্ণ সমন্বয় বা প্রাধান্য নির্ধারণের পন্থাটি বেছে নিয়েছেন, যাতে যা সহীহ তা বর্জন না করা হয়।

এবং অনুরূপভাবে তারা হাদীসের জ্ঞান নেই এমন ব্যক্তিকেও একটি স্পষ্ট নিয়ম দিয়েছেন, যাতে শুধুমাত্র এর বর্ণনায় কোনো প্রকার পার্থক্য থাকার কারণে সে সহীহ হাদীসগুলো প্রত্যাখ্যানের ফাঁদে না পড়ে।

এবং এই পরিভাষাগত সূক্ষ্মতার মাধ্যমে তারা একদিকে হাদীস সম্পর্কে অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করেছেন, অন্যদিকে হাদীসের দাবিদারদের ইচ্ছামতো এটির সাথে খেলা করার পথ রুদ্ধ করেছেন।

বর্ণনায় সন্দেহ থাকলে সহীহ হাদীসের আমল বাতিল হয় না

কারণ, হাদীসের সহীহ হওয়া তা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া আবশ্যক করে, যেমন ইবনুস সালাহ (রহ.) সহীহাইন সম্পর্কে বলেছেন এবং দৃঢ়তার সাথে মত দিয়েছেন যে এটাই হল সঠিক মত। সাখাবী (রহ.) বলেছেন:

وسبقه إلى القول بذلك في الخبر المتلقي بالقبول الجمهورُ من المحدثين والأصوليين، وعامة السلف، بل وكذا غير واحد في الصحيحين”

“এবং সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত (ক্বাবুল) বর্ণনা সম্পর্কে এই মত পোষণ করার ক্ষেত্রে মুহাদ্দিস ও উসূলবিদদের বৃহত্তর অংশ, সাধারণ সালাফ এবং এমনকি সহীহাইন সম্পর্কেও একাধিক ব্যক্তি তার আগে থেকেই এ মত পোষণ করেছেন।”[17]ফাতহুল মুগীস শারহু আলফিয়াতিল হাদীস খণ্ড/পৃষ্ঠা: ১/৭২

লেখক ইমাম শামসুদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুর রহমান আস-সাখাবী (মৃত্যু ৯০২ হিজরি) আবু ইসহাক আল-ইসফারায়ীনী (রহ.) বলেছেন:

أهل الصنعة مجمعون على أن الأخبار التي اشتمل عليها الصحيحان مقطوعٌ بصحة أصولها ومتونها، ولا يحصل الخلاف فيها بحال، وإن حصل فذاك اختلاف في طرقها ورواتها، فمن خالف حكمه خبراً منها وليس له تأويل سائغ للخبر؛ نقضنا حكمه، لأن هذه الأخبار تلقتها الأمة بالقبول

“এই শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞরা একমত যে, সহীহাইন-এ অন্তর্ভুক্ত সংবাদগুলোর মূল ও পাঠের সহীহ হওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়, এবং কোনো অবস্থাতেই এতে মতবিরোধ সৃষ্টি হয় না। যদি মতবিরোধ সৃষ্টি হয়, তবে তা এর সনদ ও বর্ণনাকারীদের পথে মতবিরোধ। সুতরাং, যে ব্যক্তি এর মধ্য থেকে কোনো সংবাদের (হুকুম) বিরোধিতা করে এবং তার কাছে সংবাবের জন্য কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা (তাউয়ীল) নেই, আমরা তার সিদ্ধান্ত বাতিল করি; কারণ উম্মত এই সংবাদগুলোকে সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করেছে।”।[18]দেখুন: মারকাতুল মাফাতীহ: (১/১১৭), এবং ফাতহুল মুগীস: (১/৫১), এবং কাওয়াইদুত তাহদীস: (৪৪), এবং তাওজীহুন নাজার ইলা উসূলিল আছার: ১/৩০৭

ইবনে হাজার (রহ.) বলেছেন:

وقد يقع فيها ـ أي في أخبار الآحاد ـ … ما يفيد العلم النظري بالقرائن على المختار خلافاً لمن أبى … والخبر المحتف بالقرائن أنواع : منها ما أخرجه الشيخان في صحيحيهما مما لم يبلغ التواتر، فإنه احتفت به قرائن منها : جلالتهما في هذا الشأن، وتقدمهما في تمييز الصحيح على غيرهما، وتلقي العلماء لكتابيهما بالقبول، وهذا التلقي وحده أقوى في إفادة العلم من مجرد كثرة الطرق القاصرة عن التواتر”

“এবং আহাদ বর্ণনাগুলোর মধ্যে… এমন কিছু ঘটতে পারে যা নির্বাচিত মতানুসারে প্রমাণাদি (ক্বরায়িন) দ্বারা তাত্ত্বিক নিশ্চয়তা (ইলম নাযারী) দান করে, এর বিরোধিতা করে ঐ ব্যক্তির যে তা অস্বীকার করে… এবং প্রমাণাদি দ্বারা পরিবেষ্টিত বর্ণনা (খাবর মুহতাফ বিল ক্বরায়িন) বিভিন্ন প্রকারের: তার মধ্যে রয়েছে যা শাইখাইন (বুখারী ও মুসলিম) তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে বর্ণনা করেছেন, যা তাওয়াতুর পর্যন্ত পৌঁছায়নি। কারণ, এতে বহু প্রমাণাদি রয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে: এই ক্ষেত্রে তাঁদের মহান মর্যাদা, অন্যদের তুলনায় সহীহকে পৃথকীকরণে তাঁদের অগ্রগতি এবং আলেমগণ তাঁদের উভয় গ্রন্থকে সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করেছেন। এবং শুধুমাত্র এই সর্বসম্মত গ্রহণই তাওয়াতুর পর্যন্ত না পৌঁছানো বহু সনদের তুলনায় নিশ্চয়তা দানে অধিক শক্তিশালী।”[19]নুযহাতুন নাযার: ৪৮-৪৯

এ থেকে জানা যায় যে, বর্ণনায় এরূপ সন্দেহ সহীহ হাদীসের ক্ষেত্রে দোষ সৃষ্টি করে না, বিশেষত যা বুখারী বা মুসলিমে রয়েছে। এরূপ হাদীস রয়েছে যা আলেমগণ গ্রহণ করেছেন ও আমল করেছেন। এর উদাহরণ হল জাবির (রা.)-এর সেই হাদীস, যে গল্পে তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে একটি উট বিক্রি করেছিলেন।[20]বর্ণনা করেছেন বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে: ‘আশ-শুরুত’ অধ্যায়ে, ‘বাব: ইজা ইশতারাতাল বায়ে’ যাহিরাদ দাব্বাহ ইলা মাকান মুসাম্মা জাযা’ (১০/৫২), নং: ২৭১৮ সেখানে মূল্যের পরিমাণ নিয়ে রাবীদের মধ্যে যে পার্থক্য হয়েছে, তা এখানে নারীদের সংখ্যা নিয়ে পার্থক্যের তুলনায় অনেক বেশি।[21]তাফসীর নেট” (mtafsir.net) ওয়েবসাইট থেকে অনুদিত

ইসলামওয়েবের আদলে কিছু আপত্তির জবাব

চতুর্থত আমি এখানে ইসলামওয়েবের ফাতওয়া নং ২০২৮০১-এর প্রশ্নসমূহ বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন না করে সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করলাম এবং সংশ্লিষ্ট দলিল-প্রমাণের তাখরীজও তুলে ধরলাম। যেখানে বিস্তারিতভাবে সুলাইমান আলাইহিস সালামের স্ত্রীর সংখ্যা এবং উক্ত হাদিসের আপত্তিগুলোর জবাব দেওয়া হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ।

প্রশ্নগুলোর সংক্ষিপ্ত রূপ:

১. হাদীসগুলোতে নবী সুলাইমান (আ.)-এর স্ত্রীর সংখ্যা ৬০, ৭০, ৯০, ৯৯ ও ১০০ – বিভিন্নভাবে উল্লেখ হয়েছে। এ পার্থক্য কেন?
২. একজন মানুষ কিভাবে এক রাতে এতগুলো (৬০/১০০) স্ত্রীর সাথে সহবাস করতে পারে? এটি কি শারীরিক ও সময়গতভাবে সম্ভব?
৩. সুলাইমান (আ.) তাঁর কথা বলার সময় “ইনশাআল্লাহ” বলেননি কেন? এটি কি নবীর জন্য দোষণীয় নয়?
৪. “শাক্ক রাজুল” বা “অর্ধেক মানুষ” বলতে কি বোঝানো হয়েছে?

জবাব: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য এবং দরুদ ও সালাম আল্লাহর রাসূলের উপর, তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবীদের উপর।

আপনার (প্রথম) প্রশ্নের উত্তরে: নবী সুলাইমান (আ.) সেই রাতে নিরানব্বইয়ের বেশি এবং একশর কম নারীর সাথে সহবাস করেছিলেন; তাদের মধ্যে ষাট জন ছিলেন স্বাধীন নারী এবং তিনি দাসীদের দ্বারা পূর্ণ সংখ্যা পূরণ করেছিলেন। হাফিজ ইবনে হাজার (রহ.) আলোচিত হাদীসের বিভিন্ন বর্ণনাগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করে “ফাতহুল বারী” গ্রন্থে বলেন:

فمحصل الروايات: ستون، وسبعون، وتسعون، وتسع وتسعون، ومائة. والجمع بينها أن الستين كن حرائر، وما زاد عليهن كن سراري أو بالعكس، وأما السبعون فللمبالغة، وأما التسعون والمائة فكن دون المائة وفوق التسعين، فمن قال تسعون ألغى الكسر، ومن قال مائة جبره- أي أكمل الكسر- .. وقد حكى وهب بن منبه في المبتدأ أنه كان لسليمان ألف امرأة ثلاثمائة مهيرة، وسبعمائة سرية”.

স্ত্রীসংখ্যা বিষয়ক বর্ণনাসমূহ হলো: ষাট, সত্তর, নব্বই, নিরানব্বই ও একশ। এগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা হয় এভাবে – ষাটজন ছিলেন ‘হুররা’ (স্বাধীন/আজাদ স্ত্রী), আর ঐ সংখ্যার অতিরিক্ত যত ছিলেন তারা ‘সরারি’ (দাসীভিত্তিক সহধর্মিণী) অথবা উল্টোটা। তবে ‘সত্তর’ সংখ্যাটি বর্ণনায় অতিরিক্ত কিংবা গোলাকার সংখ্যা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে (মাত্রা বা ব্যাপকতা বোঝাতে)। আর ‘নব্বই’ ও ‘একশ’—এর ক্ষেত্রে সংখ্যাটি আসলে একশ’র নিচে কিন্তু নব্বইয়ের উপরে (অর্থাৎ ৯০–১০০ এর মধ্যে)। সুতরাং যারা ‘নব্বই’ বলেছেন, তারা ভগ্নাংশ বা সামান্য অতিরিক্ত বাদ দিয়েছেন; আর যারা ‘একশ’ বলেছেন, তারা ভগ্নাংশকে পূর্ণ সংখ্যায় সম্পূর্ণ করে নিয়েছেন (অর্থাৎ বাড়িয়ে বলেছেন)। … প্রসঙ্গত, ‘আল-মাবদা’ (সৃষ্টির শুরু) বিষয়ক গ্রন্থে ওয়াহব ইবনে মুনাব্বিহ বর্ণনা করেছেন যে, সুলাইমান (আ.)-এর এক হাজার স্ত্রী ছিলেন: তন্মধ্যে তিনশ ছিলেন ‘মাহিরা’ (মোহরানা প্রাপ্ত স্বাধীন স্ত্রী) এবং সাতশ ছিলেন ‘সুরিয়া’ (দাসী স্ত্রী)।”[22]ফাতহুল বারী শরহে বুখারী – আস-সালাফিয়া সংস্করণ ৬/৪৬০ — ইবনে হাজার আল-আসকালানি (মৃত্যু: ৮৫২ হিজরি) (লেখক কর্তৃক ব্যাখ্যাস্বরূপ অনুবাদ

ফুটনোট: **ইবনে হাজার আল-আসকালানীর ব্যাখ্যা অনুসারে, ‘৭০’ সংখ্যাটি এখানে একটি গোলাকার সংখ্যা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ হলো, এই সংখ্যাটি দিয়ে প্রকৃত ও নির্ভুল গণনার চেয়ে বরং একটি ধারণাগত পরিমাণ বা সাধারণ ব্যাপকতা বোঝানো হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলায় আমরা যখন বলি, “আমি তোমাকে সত্তরবার বলে দিয়েছি,” তখন আমাদের উদ্দেশ্য হুবহু সত্তরবার উল্লেখ করা নয়, বরং “অনেকবার” বা “বারবার” বলা। একইভাবে, নবী সুলাইমান (আ.)-এর স্ত্রীদের সংখ্যা বিষয়ক বর্ণনায় “সত্তর” শব্দটিও এমন একটি ভাষিক রীতি অনুসারে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি প্রকৃতপক্ষে ষাটের কাছাকাছি কোনো সংখ্যাকে নির্দেশ করে, কিন্তু তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ না করে সংখ্যাটির ব্যাপকতা ও গুরুত্ব প্রকাশ করার জন্য ভাষাগতভাবে গোলাকার করে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই পদ্ধতি আরবি বর্ণনাশৈলীতে মাত্রা বা প্রাচুর্য বোঝাতে সাধারণভাবে প্রচলিত; তাই ‘সত্তর’ এখানে একটি সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নয়, বরং একটি প্রতীকী ও ব্যাপক অর্থবহ প্রকাশমাত্র। (যেমনটি আমরা পূর্বেও এটার ব্যাখ্যা করেছি-সংকলক কর্তৃক সংযুক্ত ইকরামুজ্জামন রুকন)

আপনার (দ্বিতীয়) প্রশ্নের উত্তরে: কীভাবে একজন পুরুষ ষাট জন নারীর সাথে সহবাস করতে পারে? এর উত্তর হলো, এটি যুক্তিগতভাবে অসম্ভব নয়। কারণ যিনি এক রাতে একবার বা দুবার সহবাসের শক্তি দেন, তিনি তার চেয়েও বেশি শক্তি দিতে সক্ষম।

Read More...  ছেলেকে হত্যা করলে বাবার শাস্তির বিধান কী?

তারপর, যদিও এটি সাধারণ মানুষের জন্য স্বাভাবিক নয়, কিন্তু নবী-রাসূলগণের জন্য এটি অসম্ভব নয়, যাদের আল্লাহ এমন শক্তি দান করেছেন যা তিনি অন্যদের দেননি। সহীহ বুখারী ও মুসলিমসহ অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে আনাস (রা.) থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, নবী ﷺ একই গোসলের মাধ্যমে রাতের বা দিনের এক ঘণ্টার মধ্যে তাঁর সকল স্ত্রীর নিকট যেতেন এবং সে সময় তাঁদের সংখ্যা ছিল এগারো জন। আনাস (রা.)-এর রাবী (যিনি আনাস থেকে বর্ণনা করেছেন) বলেন: আমি আনাস (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম: তিনি কি তা সামর্থ্য রাখতেন? আনাস বললেন: আমরা আলোচনা করতাম যে, তাঁকে ত্রিশ জনের শক্তি দেয়া হয়েছিল। ইস্মাইলীর বর্ণনায় আছে: চল্লিশ জনের শক্তি। ‘জামিউল উসূল’ গ্রন্থে এসেছে: নবীগণকে তাঁদের নবুওয়াতের কারণে সহবাসের ক্ষেত্রে বাড়তি শক্তি দেয়া হয়েছিল। কারণ যখন বক্ষ নূর দ্বারা পূর্ণ হয় এবং তা শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত হয়, তখন আত্মা ও শিরা-উপশিরা আনন্দ লাভ করে এবং তা কামনা-বাসনাকে জাগ্রত করে ও শক্তিশালী করে। আর যখন কামনা-বাসনা শক্তিশালী হয়, তা হৃদয় ও আত্মা থেকে শক্তি পায়, তখনই (শারীরিক) শক্তি সৃষ্টি হয়।

হাফিজ ইবনে হাজার (র.) ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে বলেন:

وفي الحديث ما خص به الأنبياء من القوة على الجماع الدال ذلك على صحة البنية، وقوة الفحولية، وكمال الرجولية مع ما هم فيه من الاشتغال بالعبادة والعلوم، وقد وقع للنبي صلى الله عليه وسلم من ذلك أبلغ المعجزة؛ لأنه مع اشتغاله بعبادة ربه وعلومه، ومعالجة الخلق كان متقللا من المآكل والمشارب المقتضية لضعف البدن على كثرة الجماع، ومع ذلك فكان يطوف على نسائه في ليلة بغسل واحد وهن إحدى عشرة امرأة. ويقال إن كل من كان أتقى لله فشهوته أشد؛ لأن الذي لا يتقي يتفرج بالنظر ونحوه

“এই হাদীসে নবীগণকে যা বিশেষভাবে দেয়া হয়েছে তা হলো সহবাসের শক্তি, যা দেহের সুস্থতা, পুরুষালী শক্তির সবলতা এবং পূর্ণাঙ্গ পুরুষত্বের দিকে ইঙ্গিত করে, অথচ তারা ইবাদত ও জ্ঞান চর্চায় নিবেদিত ছিলেন। আর নবী (সা.)-এর ক্ষেত্রে এর চেয়েও বড় মু’জিজা সংঘটিত হয়েছে। কারণ তিনি তাঁর রবের ইবাদত ও জ্ঞান চর্চা এবং সৃষ্টির কল্যাণে ব্যস্ত থাকার পাশাপাশি আহার্য ও পানীয় গ্রহণের ক্ষেত্রে মিতাচারী ছিলেন, যা দেহকে দুর্বল করে দেয়, অথচ তিনি অধিক পরিমাণে সহবাস করতেন। তা সত্ত্বেও তিনি একই গোসলের মাধ্যমে তাঁর সকল স্ত্রীর নিকট রাতের বেলায় যেতেন এবং তাঁদের সংখ্যা ছিল এগারো জন। বলা হয়, যে ব্যক্তি যতো বেশি আল্লাহভীরু, তার কামনা-বাসনা ততো প্রবল। কারণ যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করে না, সে দৃষ্টি ইত্যাদির মাধ্যমে (নিষিদ্ধভাবে) তৃপ্তিলাভ করে।”[23]ইবনে হাজার আসকালানী রচিত ‘ফাতহুল বারী’ ৬/৪৬২

আর (তৃতীয়) প্রশ্নটি হলো: সুলাইমান (আ.) কেন ‘ইনশাআল্লাহ’ (আল্লাহর ইচ্ছায়) বললেন না? এর কারণ হলো, এটি তাঁর অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। আর তাঁর সঙ্গী (ফেরেশতা বা জ্বিন) তাঁরকে বলেছিলেন: ‘ইনশাআল্লাহ বলুন’, এ কথা তিনি তাঁর কথার মাঝখানে শুনেছিলেন। কিন্তু তাঁর কথা শেষ হওয়ার পর তিনি এটা ভুলে গিয়েছিলেন, যেমনটি সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীসের কিছু বর্ণনায় এসেছে: ‘অতঃপর তিনি বললেন না এবং ভুলে গিয়েছিলেন।’

ইবনুল জাওযী ‘কাশফুল মুশকিল মিন হাদীসিস সহীহাইন’ (খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৪৫) গ্রন্থে বলেছেন:

وإنما ترك سليمان الاستثناء نسيانا، فلم يسامح بتركه وهو نبي كريم، يقتدى به

“সুলাইমান (আ.) শুধুমাত্র ভুলে যাওয়ার কারণেই (ইনশাআল্লাহ বলতে) বিরত ছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ বর্জন তাঁর জন্য ক্ষমা করা হয়নি, কারণ তিনি একজন সম্মানিত নবী যাঁর অনুসরণ করা হয়।”

হাফিয ইবনে হাজার ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে বলেছেন:

قال بعض السلف: نبه صلى الله عليه وسلم في هذا الحديث على آفة التمني والإعراض عن التفويض. قال: ولذلك نسي الاستثناء ليمضي فيه القدر… ومعنى قوله: فلم يقل أي بلسانه، لا أنه أبى أن يفوض إلى الله، بل كان ذلك ثابتا في قلبه، لكنه اكتفى بذلك أولا، ونسي أن يجريه على لسانه لما قيل له لشيء عرض له

‘কিছু সালাফ (পূর্বসূরী আলেম) বলেছেন: এ হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইচ্ছাপোষণ (তামান্নি) ও আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীলতা (তাফবীযহ) থেকে বিমুখ হওয়ার অপকারিতা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।’ তিনি বলেন: এ কারণেই তিনি (সুলাইমান) ইনশাআল্লাহ বলতে ভুলে গিয়েছিলেন, যাতে এতে ভাগ্য (কদর) কার্যকর হয়। … আর তাঁর (নবীর) বাণী ‘অতঃপর তিনি বললেন না’-এর অর্থ হলো, তিনি মুখে উচ্চারণ করেননি, এর মানে এই নয় যে তিনি আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভর করতে অস্বীকার করেছিলেন। বরং এটি তাঁর অন্তরে প্রতিষ্ঠিত ছিল, কিন্তু প্রথমে তিনি (মনে মনে) এতেই সন্তুষ্ট ছিলেন। পরে যখন তাঁর সঙ্গী তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিলেন, তখন কিছু ব্যস্ততার কারণে তিনি তা জিহ্বায় উচ্চারণ করতে ভুলে গিয়েছিলেন।”[24]ফাতহুল বারি শারহে সহীহ বুখারী খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪৬১

ইবনে হাযম (রহ.) ‘আল-মিলাল ওয়ান-নিহাল’ গ্রন্থে বলেছেন:

ولا يجوز أن يظن به أنه يجهل أن ذلك لا يكون إلا أن يشاء الله -عز وجل- وقد جاء في نص الحديث المذكور أنه إنما ترك إن شاء الله نسيانا، فأخذ بالنسيان في ذلك، وقد قصد الخير.

“তাঁর (সুলাইমান আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে এটা ধারণা করা জায়েজ নয় যে, তিনি এটা জানতেন না যে তা আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া ঘটবে না। উল্লেখিত হাদীসের বর্ণনায় স্পষ্ট এসেছে যে, তিনি কেবল ভুলবশতই ‘ইনশাআল্লাহ’ বলতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। সুতরাং এখানে ভুলের (অজ্ঞাতসারে) পথ গ্রহণ করা হয়েছে, অথচ তিনি কল্যাণই উদ্দেশ্য করেছিলেন।”[25]আল-ফাসল ফিল-মিলাল ওয়াল-আহওয়া ওয়ান-নিহাল), খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৬ ইবনে হাযম আয-যাহিরী (রহ.).

হাফিজ (ইবনে হাজার) ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে বলেছেন:

وفيه جواز السهو على الأنبياء وأن ذلك لا يقدح في علو منصبهم، وفيه جواز الإخبار عن الشيء أنه سيقع ومستند المخبر الظن مع وجود القرينة القوية لذلك.

“এতে রয়েছে নবীগণের পক্ষে ভুল হওয়ার বৈধতা, আর এটা তাদের উচ্চ মর্যাদায় কোন দাগ বা ক্ষতি সৃষ্টি করে না। আর তাতে এটাও রয়েছে যে, কোন বিষয় সংঘটিত হবে বলে জানানোর বৈধতা, যদিও সংবাদদাতার ভিত্তি হয় (ঘটনা সম্পর্কে) অধিকতর ধারণা (গলবে যনন) এবং তার জন্য শক্তিশার প্রমাণ থাকে।”[26]ফাতহুল বারি শারহে সহীহ বুখারী খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪৬২

আর চতুর্থ প্রশ্ন: “শাক্কু রাজুলিন (شق رجل)”-এর অর্থ কী? এর অর্থ হলো ‘তার অর্ধেক’, যেমন হাদীসের কোন কোন বর্ণনায় এসেছে: “একটি অর্ধেক বাচ্চা (شق غلام) জন্ম নিল।” এবং অন্য বর্ণনায় এসেছে: “অর্ধেক মানুষ।”

আল্লাহই সর্বজ্ঞ। (প্রশ্ন-উত্তর সমাপ্ত, আরবি থেকে অনুদিত)

সুলাইমান আঃ এর স্ত্রীর সংখ্যা ৯৯৯?

এখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, আমরা তো কিছু কিছু জায়গায় পড়েছি সুলাইমান আঃ এর স্ত্রীর সংখ্যা ৯৯৯ বা তার কাছাকাছি ছিল বা তারও অধিক ছিল তাহলে কোনটা সঠিক?

দলিল: যেমন (বাইবেল বা কিতাবুল মুকাদ্দাসের) বর্ণনায় এসেছে যে সুলাইমান (আ.)-এর সাতশত মুক্ত নারী (সায়্যিদাত) এবং তিনশত দাসী (সারারি) ছিলেন।[27]দেখুন: (সিফর মুলুক আল-আওয়াল: অধ্যায় ১১ অনুরূপভাবে শিয়া বইগুলোতেও সুলাইমান (আ.)-এর অধিক সংখ্যক স্ত্রী থাকার ইঙ্গিত রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তাবরাসী তাঁর তাফসীর ‘মাজমাউল বয়ান’-এ (৮/৪৭৫) আবু হুরাইরা (রা.)-এর সূত্রে এই হাদীসটি উল্লেখ করেছেন!! আর আহলে বাইত (রা.)-এর সূত্রে, যেমন ‘তাফসীরুল বুরহান’-এ (৪/৪৩) বর্ণিত হয়েছে: “হাসান ইবনে জাহম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি আবুল হাসান (আ.)-কে মেহেদী লাগাতে দেখে বললাম: আমি আপনার জন্য কুরবান যাই! আপনি মেহেদী লাগিয়েছেন? তিনি বললেন: হ্যাঁ, নিশ্চয় সাজগোজ নারীর চরিত্র রক্ষায় (ইফফাহ) বৃদ্ধি করে – এ পর্যন্ত বলেন – সুলাইমান ইবনে দাউদের এক হাজার স্ত্রী ছিল একটি প্রাসাদে, তাদের মধ্যে তিনশত মহীরা (মোহরানা প্রাপ্ত স্বাধীন নারী) এবং সাতশত দাসী।” আর নিমাতুল্লাহ আল-জাযায়েরী তাঁর ‘কিসাসুল আম্বিয়া’ (পৃষ্ঠা ৪০৭) গ্রন্থে আবুল হাসান (আ.) থেকে বর্ণনা করেছেন: তিনি বলেন: সুলাইমান ইবনে দাউদের এক হাজার স্ত্রী ছিল একটি প্রাসাদে; তাদের মধ্যে তিনশত মহীরা এবং সাতশত দাসী, আর তিনি প্রতিদিন ও রাতে তাদের কাছে ঘুরে বেড়াতেন। জাযায়েরী এই বর্ণনা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, তার কথ্য হলো: “আমি বলছি: সম্ভবত এটি সাক্ষাৎকারের জন্য ঘুরে বেড়ানো, তবে সবচেয়ে স্পষ্ট হলো যে তা যৌন সংগমের জন্য ঘুরে বেড়ানো।” একই সূত্রে (পৃষ্ঠা ৪০৮): আবু জা’ফার (আ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: সুলাইমানের একটি দুর্গ ছিল যা জিনেরা তার জন্য নির্মাণ করেছিল, তাতে এক হাজার ঘর ছিল, প্রতিটি ঘরে একজন বিবাহিত স্ত্রী; তাদের মধ্যে সাতশত ছিল কুতুবিয়া দাসী এবং তিনশত ছিল মুক্ত মহীরা নারী। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাকে নারীদের সাথে সহবাসের ক্ষেত্রে চল্লিশ পুরুষের শক্তি দান করেছিলেন, এবং তিনি তাদের সকলের কাছে ঘুরে বেড়াতেন এবং তাদের (প্রয়োজন) পূরণ করতেন। আর কাশানী তাঁর ‘আল-মাহজাতুল বাইদা’ (৬/২৮২) গ্রন্থে, “বিভিন্ন ধরণের আশ্চর্যের বিষয় ও তার চিকিৎসার বিস্তারিত বিবরণ” অধ্যায়ে যা বলেছেন তার বক্তব্য হলো: “যেমন সুলাইমান (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি বলেছিলেন: ‘আজ রাতে আমি একশত নারীর কাছে ঘুরব, প্রত্যেক নারী একটি করে পুত্র সন্তান প্রসব করবে…’ হাদীসটি, এবং তিনি ইন শা আল্লাহ বলেননি, ফলে তিনি যা চেয়েছিলেন (সন্তান) তা থেকে বঞ্চিত হলেন…”

জবাব: শাইখ সালেহ আল মুয়াজ্জিন হাফিযাহুল্লাহর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাবে এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হয়েছিল:

প্রশ্ন: সুলাইমান (আ.)-এর স্ত্রীদের সংখ্যা আমি জানতে চাই যে, সুলাইমান (আ.)-এর ৯৯৯ জন স্ত্রী ছিল বা এর কাছাকাছি সংখ্যা—এই বিষয়ে সত্যতা এবং এর কারণগুলি কী?

উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য এবং সালাত ও সালাম রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উপর।

সুলাইমান (আ.)-এর স্ত্রীদের সর্বাধিক সংখ্যা যা সহিহ হাদিসে প্রমাণিত হয়েছে, তা হল একশত জন নারী। যেমনটি বর্ণিত হয়েছে সহিহ বুখারিতে (৫২৪২) আবু হুরাইরা (রা.) থেকে: তিনি বলেন, দাউদ (আ.)-এর পুত্র সুলাইমান (আ.) বলেছিলেন: “আজ রাতে আমি একশত নারীর কাছে যাব, প্রত্যেকে একজন করে ছেলে সন্তান প্রসব করবে, যে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবে।” তখন ফেরেশতা তাকে বললেন: “ইনশাআল্লাহ বলুন।” কিন্তু তিনি তা বলেননি এবং ভুলে গেলেন। তিনি তাদের সকলের কাছে গেলেন, কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র একজন অর্ধেক মানুষ (অর্থাৎ একটি মাত্র সন্তান) প্রসব করল। নবী (সা.) বললেন: “যদি তিনি ইনশাআল্লাহ বলতেন, তাহলে তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতেন না এবং তাঁর প্রয়োজন পূরণের বেশি নিকটবর্তী হতেন।” এটি মুসলিম (১৬৫৪) কর্তৃকও বর্ণিত হয়েছে, যাতে বলা হয়েছে তিনি বলেন নব্বই জন নারী। বুখারি তাঁর সহিহ গ্রন্থের “জিহাদের জন্য সন্তান কামনা করা” অধ্যায়ে একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, যাতে বলা হয়েছে তিনি বলেন নিরানব্বই জন নারী।

হাফেয ইবনে হাজার তাঁর এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন: যারা একশত বলেছেন তারা ভগ্নাংশকে পূর্ণ সংখ্যায় রূপান্তরিত করেছেন, আর যারা নব্বই বলেছেন তারা ভগ্নাংশ বাদ দিয়েছেন।

তবে হাফেয ইবনে কাসির তাঁর “আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া” (২য় খণ্ড) গ্রন্থে সুলাইমান (আ.)-এর ঘটনা বর্ণনায় অনেক সালাফ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, সুলাইমান (আ.)-এর স্ত্রীদের সংখ্যা ছিল এক হাজার। অনুরূপভাবে হাফেয ইবনে হাজারও “ফাতহুল বারি”-তে হাদিস নং ৩৪২৪-এর ব্যাখ্যায় এটি উল্লেখ করেছেন।

এই সংখ্যাটি বনী ইসরাইলের নিকট থেকে বর্ণিত, তাই আমরা না এটি সত্য বলে মানি, আর না মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করি। পূর্বোক্ত হাদিসগুলোতে এমন কিছু নেই যা এটি অস্বীকার করে বা সমর্থন করে।

এর কারণ সম্পর্কে বলতে গেলে, মহান আল্লাহ তাঁর ইচ্ছামতো বান্দাদেরকে দুনিয়ার রাজত্ব ও ভোগ্যবস্তু দান করেন, তাঁর পরিপূর্ণ হিকমত ও প্রসারিত অনুগ্রহে। তিনি যা করেন, সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায় না। বিশেষভাবে সুলাইমান (আ.)-কে তিনি এমন বিশাল রাজত্ব দান করেছিলেন যা তিনি তাঁর পরে আর কাউকে দেননি। তাই আল্লাহ তাকে এই বিশাল শক্তি দান করেছিলেন যা তাকে এত সংখ্যক নারীকে বিবাহ করার সামর্থ্য দিয়েছিল—এটি অসম্ভব কিছু নয়। কোনো মুসলিমের মনে এটা আসতে পারে না যে এই ঘটনায় এই মহান নবীর জন্য কোনো ত্রুটি রয়েছে; বরং এটি তাঁর পরিপূর্ণ রাজত্ব, অনুগ্রহ ও পুরুষত্বের অংশ। দেখুন, তিনি এক রাত্রেই আল্লাহর কাছে কামনা করেছিলেন যে আল্লাহ তাকে একশত সন্তান দান করুন, যারা সবাই আল্লাহর পথে অশ্বারোহী যোদ্ধা হবে। আর আমরা এর আগেও ও পরে বিশ্বাস করি যে, মহান আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং নির্বাচন করেন; তাঁর সিদ্ধান্তের কোনো পরিবর্তনকারী নেই এবং তাঁর ফয়সালা কেউ ফিরিয়ে দিতে পারে না। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।[28]ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব: ২২২৩০ নং প্রশ্ন উত্তর (আরবি থেকে অনুদিত).

সারসংক্ষেপ

নবী সুলাইমান (আ.)-এর স্ত্রীসংখ্যা সম্পর্কিত হাদীসগুলোতে যে পার্থক্য দেখা যায়: ষাট, সত্তর, নব্বই, নিরানব্বই, একশ বা তারও বেশি—তা রাবীদের বর্ণনার ভিন্নতা এবং সংখ্যার ধারণার উদ্দেশ্য থেকে উদ্ভূত। ইমাম বুখারী (রহ.) এই হাদীসগুলোকে তাঁর সহীহ গ্রন্থে বিভিন্ন অধ্যায়ে বিভিন্ন শিরোনামে বর্ণনা করেছেন, যেমন “জিহাদের জন্য সন্তান কামনা করার অধ্যায়”, “শপথের পদ্ধতি কেমন ছিল তার অধ্যায়” ইত্যাদি। এর পেছনে হিকমত হলো, সংখ্যার নির্দিষ্টতা নয়, বরং হাদীস থেকে প্রাপ্ত মাসআলা ও শিক্ষণীয় বিষয় পাঠকের কাছে স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা।

আলেমগণ ব্যাখ্যা করেছেন যে সুলাইমান (আ.)-এর স্ত্রীসংখ্যার হাদীসে পার্থক্য সমন্বয় ও প্রাধান্য নির্ধারণের মাধ্যমে সহজেই বোঝা যায়। যেমন, ষাটজন স্বাধীন নারী (হুররা) এবং বাকি দাসী (সারারি), সত্তর বা নব্বই বলা হয়েছে অতিরঞ্জন বা সামান্য ভগ্নাংশের কারণে, আর একশ বলা হয়েছে পূর্ণতা বোঝাতে। এছাড়াও, উসূলবিদদের মতে “সংখ্যার ধারণা” নিজেই কোনো দলিল নয়; এখানে উদ্দেশ্য হলো প্রচুরতার ইঙ্গিত, নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়। যেমন কেউ বলে: “আমি একশবার এসেছি” এতে মূল উদ্দেশ্য প্রচুরতা বোঝানো। সুতরাং সংখ্যার পার্থক্যকে বৈপরীত্য বা সহীহ হাদীস অস্বীকারের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা ভুল এবং অসঙ্গত। [শারহু সাহীহ মুসলিম, ১০৬, পৃষ্ঠা ৮] এটা আমাদের দ্বিতীয় ব্যাখ্যা। আর ৯৯৯ জন স্ত্রীর কথা কোন হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয় তাই আমরা এই সম্পর্কে জানি না। আর এই বর্ণনাকে সত্যায়িত করিনা।

আর অধিকাংশ হাদিস অস্বীকারকারী বা নাস্তিকরা বুখারীর এই ধরনের সংখ্যাগত পার্থক্য দেখিয়ে সমস্ত হাদীসের উপর সন্দেহ প্রকাশ করে, এটি ভিত্তিহীন। এই হাদীসগুলো কোন বৈপরীত্য বা মুযতারিব নয়; তাই যাঁরা সহীহ বুখারীর হাদীসের উক্ত হাদিসের সংখ্যা নিয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলেন, তারা একেবারে “অন্ধকে অন্ধের পথ দেখানোর মতো” পরিস্থিতিতে নিজেদের ফেলেছে। তারা ইসলামিক দলিল, উসূল ও বুখারীর বিশদ জ্ঞানের সামনে “সুঁই খুঁজতে মরুভূমিতে ঘুরে বেড়ানো সমান” কাজ করছে। নবী সুলাইমান (আ.)-এর স্ত্রীসংখ্যার পার্থক্যকে তারা বৈপরীত্য মনে করে, অথচ এটি শিক্ষণীয় হিকমত এবং আল্লাহ প্রদত্ত অতিমানবিক ক্ষমতার প্রকাশ।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে বোঝার তৌফিক দান করুন। আল্লাহুম্মা আমীন।

সংকলক ও লেখক: ইকরামুজ্জামান রুকন
(আহলুল হাদীস/সালাফী) (আরাবিক ডিপ্লোমা, আল ইলম একাডেমী)

Citation is loading...

Footnotes

Footnotes
1 হাদীস নং ৩৪২৪
2 হাদীস নং ৭৪৬৯
3 হাদীস নং ৬৬৩৯, ৬৭২০
4 হাদীস নং ২৮১৯
5 হাদীস নং ৫২৪২
6 .https://www.alukah.net/sharia/0/118236.
7 শারহু সাহীহ মুসলিম খন্ড ১০৬, পৃষ্ঠা ৮ লেখক: হাসান আবুল আশবাল আয-যুহাইরি
8 নাহওয়া তাফ’ইল কাওয়াইদ নাকদি মতনিল হাদীস’ (১৮৮)।
9 ফাতহুল বারী: ১১/৬১৪
10 মুকাদ্দিমাতু ইবনিস সালাহ: ১২২
11 ইখতিসার ‘উলুমিল হাদীস ওয়া মা’আহুল বায়িসুল হাসিস: ১/২২১
12 আল-বায়িসুল হাসিস: ১/২২১
13 কাওয়াইদুত তাহদিস: (১৩২
14 দেখুন: ইতহাফুন নাবিল: ৫৯
15 সহীহ বুখারী: কিতাবুল জিহাদ ওয়াস সিয়ার, বাব: মান তালাবাল ওয়ালাদ লিল জিহাদ, (৬/৪১), নং: (২৮১৯), ফাতহুল বারী: ১০/২২২
16 ফাতহুল বারী: ৬/৬১৫
17 ফাতহুল মুগীস শারহু আলফিয়াতিল হাদীস খণ্ড/পৃষ্ঠা: ১/৭২
18 দেখুন: মারকাতুল মাফাতীহ: (১/১১৭), এবং ফাতহুল মুগীস: (১/৫১), এবং কাওয়াইদুত তাহদীস: (৪৪), এবং তাওজীহুন নাজার ইলা উসূলিল আছার: ১/৩০৭
19 নুযহাতুন নাযার: ৪৮-৪৯
20 বর্ণনা করেছেন বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে: ‘আশ-শুরুত’ অধ্যায়ে, ‘বাব: ইজা ইশতারাতাল বায়ে’ যাহিরাদ দাব্বাহ ইলা মাকান মুসাম্মা জাযা’ (১০/৫২), নং: ২৭১৮
21 তাফসীর নেট” (mtafsir.net) ওয়েবসাইট থেকে অনুদিত
22 ফাতহুল বারী শরহে বুখারী – আস-সালাফিয়া সংস্করণ ৬/৪৬০ — ইবনে হাজার আল-আসকালানি (মৃত্যু: ৮৫২ হিজরি) (লেখক কর্তৃক ব্যাখ্যাস্বরূপ অনুবাদ
23 ইবনে হাজার আসকালানী রচিত ‘ফাতহুল বারী’ ৬/৪৬২
24 ফাতহুল বারি শারহে সহীহ বুখারী খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪৬১
25 আল-ফাসল ফিল-মিলাল ওয়াল-আহওয়া ওয়ান-নিহাল), খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৬ ইবনে হাযম আয-যাহিরী (রহ.).
26 ফাতহুল বারি শারহে সহীহ বুখারী খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪৬২
27 দেখুন: (সিফর মুলুক আল-আওয়াল: অধ্যায় ১১
28 ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব: ২২২৩০ নং প্রশ্ন উত্তর (আরবি থেকে অনুদিত).
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Back to top button