তালিবান ও নারীদের লেখা বই নিয়ে মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা

সম্প্রতি BBC থেকে Taliban ban books written by women from Afghan universities শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয় যে আফগানিস্তানে মহিলাদের লেখা সমস্ত বই পড়ানো নিষিদ্ধ। তারা কিছুটা বিদ্রুপ করে আরও তুলে ধরে, “গত চার বছরে তালিবানরা যা করেছে তা বিবেচনা করে তাদের কাছ থেকে পাঠ্যক্রমের এমন পরিবর্তন আরোপ করার আশা করা অমূলক ছিল না।” এরপর বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের মিডিয়া তালিবানের বিরুদ্ধে একই ধরণের শিরোনাম দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে। কিন্ত এটা কতটুকু সত্য তা কি জানেন?
আমি কোনো রকম ফিল্ড এনালাইসিস করার কথা বলবো না, আফগানিস্তানে যেতে বলবো না। ঐসকল মিডিয়ার তথ্য দিয়েই প্রমাণ করে দিবো কীভাবে তারা চেরি পিকিং করেছে, বুঝে-শুনে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছে এবং সেই সাথে তাল দিয়েছে অন্য অন্ধ অনুসারীরা।
প্রথমে BBC এর ঐ প্রতিবেদনটা নিয়েই কথা বলতে চাই। সেখানে বলা হয়েছে যে ৬৮০টি (কোনো কোনো সূত্রানুসারে ৬৭৯টি) বইয়ের মধ্যে মহিলাদের লেখা প্রায় ১৪০টি বই ছিল। গাণিতিকভাবে হিসাব করলে দাঁড়ায়, নিষিদ্ধ হওয়া বইগুলোর মধ্যে প্রায় ২০.৫% বই ছিল নারীদের লেখা। তাহলে বাকি ৭৯.৫% ছিল পুরুষদের। নারীদের লেখা যতগুলো বই নিষিদ্ধ হয়েছে, তার চাইতেও ৪ গুণ বেশি পুরুষদের লেখা বই নিষিদ্ধ হয়েছে। হা হা হা। সহজ হিসেব!
আরও ইন্টারেস্টিং বিষয় আছে। বিভিন্ন মিডিয়াতে ‘নারীদের লেখা বই’ এর উপর ফোকাস করা হয়েছে। কিন্তু খুব অল্প জায়গায়ই ‘নারীদের নিয়ে লেখা বই’ এর উপর ফোকাস করা হয়েছে। আসলে পশ্চিমা ধ্যান-ধারণা তথা ফেমিনিজম অনুসারে নারীর অধিকার বলতে যা বুঝায় সে বিষয়ে বহু বই (অর্থাৎ নারীদের নিয়ে লেখা বই) নিষিদ্ধ হয়েছে, যেগুলো স্পষ্ট করে সেভাবে মিডিয়া তুলে ধরেনি।[1]Wafayee, M. (2025, September 19). Taliban bans key university textbooks on women’s rights, human rights and Western philosophy. The Independent. https://www.independent.co.uk/asia/south-asia/taliban-university-textbooks-ban-afghanistan-b2828744.html
আগস্টের শেষে আফগান বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে তালিবানের উপ-উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জিয়াউর রহমান আরিউবি স্বাক্ষরিত একটি নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছিল। সেই নথিতে বলা হয়েছে যে নিষিদ্ধ বইগুলোর আদর্শিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং বৈজ্ঞানিক বিষয়বস্তুগুলো মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং কর্মকর্তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে এর বিষয়বস্তু শারিয়াহর নীতি লঙ্ঘন করে।
এই নির্দেশনার পরে কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদে জান আর্ট শোল্টের ‘গ্লোবালাইজেশন: আ ক্রিটিকাল ইন্ট্রোডাকশন’, শামসালসাদাত জাহেদীর ‘ইন্টারন্যাশনাল সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’, আব্দুল রহমান সেলিমের ‘কম্পারেটিভ হিউম্যান রাইটস’, জাকিয়া আদেলির ‘পলিটিক্যাল টার্মিনোলজি অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস’, নাসরুল্লাহ স্তানেকজাইয়ের ‘প্রিন্সিপলস অফ ল’-এর মতো পশ্চিমা ও লিবারেল মুসলিম স্কলারদের লেখা কয়েক ডজন বই পড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
একইভাবে শিক্ষা ও সাংবাদিকতার অনুষদেও কার্ল এইচ. বোটান, জর্জ রিটজার এবং লুইস এ কোসারের মতো লেখকদের বই নিষিদ্ধ হয়েছে। আর এগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশই হলো পুরুষ লেখকদের লেখা।
বই নিষিদ্ধের পাশাপাশি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ইসলামী শরিয়াহের সাথে সাংঘর্ষিক বলে বিবেচিত ১৮টি কোর্স বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে যে আরও ২০১টি কোর্সকে ‘সমস্যাযুক্ত’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বর্তমানে পর্যালোচনাধীন রয়েছে।[2]Ghazniwal, S., & Ghazniwal, S. (2025, September 16). Banning 700 books and 18 subjects: The Taliban’s latest effort at dismantling higher education. Zan Times. Retrieved September 20, 2025, from https://zantimes.com/2025/09/16/banning-700-books-and-18-subjects-the-talibans-latest-effort-at-dismantling-higher-education/ এগুলো হলো-
-
Constitutional law of Afghanistan
-
Islamic political movements
-
Good governance
-
Electoral systems
-
Political system of Afghanistan
-
Political sociology of Afghanistan
-
Gender and development
-
Human rights and democracy
-
Analysis of Afghanistan’s Constitution
-
Globalization and development
-
History of religions
-
Sociology of women
-
Moral philosophy
-
Sexual harassment
-
Gender-equal employment diversity
-
Leadership of small groups
-
Gender communications
-
Role of women in public communication
এসকল কোর্সের প্রতিটি আলোচনার সাথে যুক্ত আছে পশ্চিমা দর্শন, বস্তুবাদী মনোভাব, সাম্রাজ্যবাদ এবং শরিয়াহবিরোধী পদক্ষেপের কথা। উদাহরণস্বরূপ 4 ও 8 নাম্বার পয়েন্টটি দেখুন। গণতন্ত্র ও প্রচলিত নির্বাচনী পদ্ধতি ইসলামসম্মত নয়। 7, 17 ও 18 নাম্বার পয়েন্টের আলোচনা এলজিবিটিকিউ এবং ফেমিনিজমের সাথে অঙ্গাঅঙ্গতিভাবে জড়িত, যা শারিয়াহর বিরুদ্ধে চলে যায়।
এসকল বই ও কোর্সের মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক দল ও সংগঠন, চারুকলা, সিনেমা, আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন, কূটনীতির ভিত্তি, ইউরোপীয় রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থা, পশ্চিমা রাজনৈতিক ধারণার ইতিহাস ইত্যাদির কথা। আর যেহেতু বর্তমান ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান নতুন করে নিজেদেরকে গড়ে তুলছে বলে এমন বই ও কোর্সগুলোকে স্বাভাবিকভাবেই তাদের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ও সংস্কারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে না।
এখানে এই প্রশ্ন করার সুযোগ নেই যে এগুলো কীভাবে যৌক্তিক? কারণ নতুন কিছু শুরু করতে গেলে পুরাতন আগাছাকে উপড়ে ফেলতে হয়। তবে সুস্থ সমালোচনার জায়গা থেকে এই প্রশ্ন করা যায় যে ভবিষ্যতে আফগানিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হবে? এই বই ও কোর্সগুলোতে যেসকল বিষয়ক আধুনিক বিশ্বের সাথে জড়িত ছিল, সেগুলোর সম্পূরক শিক্ষা কীভাবে প্রদান করা হবে?
তবে অধিকাংশ পশ্চিমা ও পশ্চিমাদের অনুগত মিডিয়া শুধুমাত্র তাদের সুবিধামতো তথ্যের উপর ভিত্তি করে সংবাদ পরিবেশন করেছে। আর সাংবাদিকতায় একটা বড় অভ্যাস হলো, কোনো একটি প্রাথমিক সূত্রের সংবাদ সকলেই প্রচার করা শুরু করে। সব মিলিয়ে প্রোপাগান্ডাকে জোরেসোরেই ছড়ানো হয়েছে। আর এই লেখায় প্রচলিত মিডিয়ার তথ্য দিয়েই সকল প্রোপাগান্ডার যুক্তি খন্ডন করেছি। পশ্চিমা মিডিয়া কীভাবে আফগানিস্তানকে নিয়ে হলুদ সাংবাদিকতা করে সেটা ‘ভূমিকম্পে কি আফগান নারীরা অবহেলিত?’ আর্টিকেলটিতে আলোচনা করেছি।
সবশেষে বলতে চাই, আমাদেরকে বিচক্ষণ হতে হবে। খাতি হাতে তর্ক না করে যুক্তি উপস্থাপন করা, তথ্যগুলো তুলে ধরা কিংবা অন্ধভক্তি থেকে বিরত থাকা-এরকম কয়েক হালি করণীয় আছে। এ লড়াই শুধু তর্কের না, এর বিস্তৃতি ব্যাপক। সেই সাথে আছে সঠিক পথ অনুসরণ করে সঠিক কথা বলতে পারার মতো সাহস।
Footnotes
| ⇧1 | Wafayee, M. (2025, September 19). Taliban bans key university textbooks on women’s rights, human rights and Western philosophy. The Independent. https://www.independent.co.uk/asia/south-asia/taliban-university-textbooks-ban-afghanistan-b2828744.html |
|---|---|
| ⇧2 | Ghazniwal, S., & Ghazniwal, S. (2025, September 16). Banning 700 books and 18 subjects: The Taliban’s latest effort at dismantling higher education. Zan Times. Retrieved September 20, 2025, from https://zantimes.com/2025/09/16/banning-700-books-and-18-subjects-the-talibans-latest-effort-at-dismantling-higher-education/ |





