“দুই সমুদ্রের মিলনস্থল” এর ব্যাখ্যা

প্রশ্নঃ সূরা আর-রহমানের আয়াত নম্বর (১৯-২২) এ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা এমন দুটো সমুদ্রের কথা উল্লেখ করেছেন, যারা পরস্পর মিলিত হয়। অথচ এদের প্রত্যেকেরই প্রতিবন্ধক রয়েছে। তাহলে এর অর্থ কী দাঁড়ায়?
উত্তরের সংক্ষিপ্তসার:
অধিকাংশ তাফসীরবিদের মতে, এখানে “দুটি সমুদ্র” বলতে ভূ-পৃষ্ঠে বিদ্যমান সুপরিচিত দুই ধরনের পানির কথা বোঝানো হয়েছে। প্রথম প্রকার: মিঠা পানির নদী। আর, দ্বিতীয় প্রকার: নোনতা পানির সমুদ্র। এই ব্যাখ্যার প্রমাণ হলো আল্লাহ তা‘আলার সেই বাণী, যেখানে তিনি এই দুটি সমুদ্রের বর্ণনায় বলেছেন: {এটি মিঠা ও সুপেয়, আর এটি নোনতা ও তেঁতো}। আর এই আয়াত গুলোতে দুটি সমুদ্রের মাঝে যে “বারযাখ” (প্রতিবন্ধক) এর কথা বলা হয়েছে, সে সম্পর্কে আলেমদের দুটি মত রয়েছে:
- এই বারযাখ বলতে নদী ও সমুদ্রের মাঝে বিস্তৃত ভূমিকে বোঝানো হয়েছে, যা নদী ও সমুদ্রকে পৃথক করে রাখে। ফলে এদের পানি পরস্পরের সাথে মিশে না; বরং প্রত্যেকের নিজস্ব প্রবাহ পথ ও স্থিতি স্থান রয়েছে, যা একে অপর থেকে স্বাধীন।
- মিঠা ও নোনতা পানির এই দুটো সমুদ্রের মাঝে একটি অদৃশ্য সীমারেখা রয়েছে, যা আল্লাহ তাঁর ক্ষমতাবলে সৃজন করেছেন। এই সীমারেখা নদীর মোহনায় মিঠা ও নোনতা পানির মিলনস্থলে থাকা সত্ত্বেও তাদের মিশে যাওয়া থেকে বিরত রাখে।
উত্তর:
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।
কুরআনে মিঠা ও নোনতা দুটি সমুদ্র সম্পর্কে আল্লাহর সৃষ্টির মহান নিদর্শন
কুরআন কারিমে চারটি মহিমান্বিত আয়াতে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার মহান সৃষ্টি হিসেবে মিঠা ও নোনতা দুটি সমুদ্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো বিশ্ব চরাচরে তাঁর অপূর্বভাবে সৃষ্টি করা অপার নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত। আয়াতগুলো নিম্নরূপ:
আর তিনিই দু’টো সাগরকে একসাথে প্রবাহিত করেছেন। একটি সুপেয় সুস্বাদু, অপরটি নোনতা ক্ষারবিশিষ্ট। আর তিনি এতদুভয়ের মাঝে একটি অন্তরায় ও একটি দুর্ভেদ্য অন্তরায় স্থাপন করেছেন। [সূরা আল-ফুরকান: ৫৩]
বরং তিনি, যিনি যমীনকে আবাসযোগ্য করেছেন এবং তার মধ্যে প্রবাহিত করেছেন নদী-নালা। আর তাতে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বতমালা এবং দুই সমুদ্রের মধ্যখানে অন্তরায় সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সাথে কি অন্য কোন ইলাহ আছে? বরং তাদের অধিকাংশই জানে না। [সূরা আন-নামল ৬১]
আর দু’টি সমুদ্র সমান নয়; এটি মিঠা ও সুপেয়, আর এটি নোনতা ও তেঁতো। [সূরা ফাতির: ১২]
তিনি দুই সমুদ্রকে প্রবাহিত করেন, যারা পরস্পর মিলিত হয়। (কিন্তু) উভয়ের মধ্যে রয়েছে এক আড়াল যা তারা অতিক্রম করতে পারে না। সুতরাং তোমাদের রবের কোন্ নিআমতকে তোমরা উভয়ে অস্বীকার করবে? [সূরা আর-রহমান: ১৯-২১]
“দুই সমুদ্রের মিলন” (مرج البحرين يلتقيان)-এর তাফসীর
অধিকাংশ তাফসীরবিদের মতে, এখানে “দুটি সমুদ্র” বলতে ভূ-পৃষ্ঠে বিদ্যমান দুই ধরনের পানির কথা বোঝানো হয়েছে:
- প্রথম প্রকার: মিঠা পানির নদী।
- দ্বিতীয় প্রকার: নোনতা পানির সমুদ্র।
এই ব্যাখ্যার প্রমাণ হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণী, যেখানে তিনি এই দুটি সমুদ্রের বর্ণনায় বলেছেন: {এটি মিঠা ও সুপেয়, আর এটি নোনতা ও তেঁতো}
এই দলীল অধিকাংশের মতকেই সমর্থন করে। তবে যাঁরা বলেন, এখানে দুটো সমুদ্রের কথা বলা হয়েছে, এক সমুদ্র আকাশে ও আরেক সমুদ্র পৃথিবীতে। বা, এক সমুদ্র রোমে ও আরেক সমুদ্র পারস্যে। অথবা, এক সমুদ্র পূর্বে ও আরেক সমুদ্র পশ্চিমে, বা অন্য কিছু— তাঁদের এইসকল অদ্ভুত মতামতকে এই দলীল সমর্থন করে না। এসব মতের ক্ষেত্রে {এটি মিঠা ও সুপেয়, আর এটি নোনতা ও তেঁতো} এই বর্ণনা সঠিকভাবে প্রযোজ্য হয় না।
মিলিত দুই সমুদ্রের মাঝে উল্লেখিত সেই ‘বারযাখ’ (প্রতিবন্ধক) কী?
এই আয়াত সমূহে দুই সমুদ্রের মাঝে যে বারযাখের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সে সম্পর্কে আলেমদের দুটো মত রয়েছে:
- প্রথম ব্যাখ্যা
দুই সাগরের (নদী ও সমুদ্র) মাঝে অন্তরাল সেই বারযাখ দ্বারা বোঝানো হয়েছে এমন এক বিস্তীর্ণ ভূমিকে, যে ভূমিটি নদী ও সমুদ্রের পানিকে পরস্পরের সাথে মিশে যাওয়া থেকে পৃথক করে রাখে। বরং প্রত্যেকেরই নিজ নিজ প্রবাহ পথ ও স্থিতি স্থান রয়েছে, যা একে অপর থেকে স্বাধীন।
এটিই হচ্ছে সেই স্পষ্ট ব্যাখ্যা, যা আমরা অধিকাংশ মুফাসসিরের থেকে পেয়েছি। হাফিজ ইবন কাসির (রহ) বলছেন:
“{তিনি একটি বারযাখ এবং হিজর স্থাপন করেছেন তাদের মাঝে} অর্থাৎ, মিষ্ট ও নোনতা পানির মাঝে। {বারযাখ} মানে প্রতিবন্ধক। এটি হচ্ছে শুষ্ক ভূমি। {এবং প্রতিবন্ধক হিজর} অর্থ একে অপরের সাথে মিলে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক।” [1]“তাফসিরুল কুরআনিল আযিম” থেকে আলোচনা সমাপ্ত (৬/১১৭)
তিনি আরও বলছেন:
“{তিনি দুটি সমুদ্রকে প্রবাহিত করেছেন তারা উভয়ে মিলিত হয়} ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন, এর অর্থ ‘তিনি এদেরকে বয়ে দিয়েছেন।’ আর, {উভয়ে মিলিত হয়} সম্পর্কে ইবনু যায়দ (রহ) বলেন, এর অর্থ ‘তিনি এদের মধ্যে বাধাদানকারী এমন প্রতিবন্ধক রেখেছেন যেন তারা পরস্পরের সাথে মিশতে না পারে।’ এখানে {দুটি সমুদ্র} বলতে নোনতা ও মিঠা পানি বোঝানো হয়েছে। মিঠা পানি হলো এই নদীগুলো, যা মানুষের সামনে দিয়ে বয়ে চলে। {তাদের মাঝে এমন এক প্রতিবন্ধক আছে, যেন তারা একে অপরকে অতিক্রম না করে} অর্থাৎ তিনি তাদের মাঝে একটি বাধাদানকারী প্রতিবন্ধক ভূমি রেখেছেন। এটি এজন্য যাতে একটি অপরটির উপর আধিপত্য বিস্তার না করে এবং পরস্পরকে নষ্ট না করে এবং তাদের উদ্দেশ্যের জন্য নির্ধারিত নিজস্ব গুণাবলি বিনষ্ট না করে।”[2]“তাফসিরুল কুরআনিল আযিম” থেকে আলোচনা সমাপ্ত (৭/৪৯২)
আল্লামা সা‘দি (রহ) বলছেন:
“দুটি সমুদ্র” বলতে উদ্দেশ্য হলো মিঠা পানির সমুদ্র ও নোনতা পানির সমুদ্র। এরা উভয়েই পরস্পরের সাথে মিলিত হয়, যেমন মিঠা পানি নোনতা সমুদ্রে গিয়ে পড়ে এবং মিশে যায়। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তাদের মাঝে একটি ভূস্তরী প্রতিবন্ধক রেখেছেন, যাতে একে অপরের উপর আধিপত্য বিস্তার না করে। এভাবে উভয় থেকেই উপকার লাভ হয়। মিঠা পানি থেকে মানুষ পান করে, তাদের গাছপালা ও ফসলের জন্য ব্যবহার করে। আর নোনতা সমুদ্র থেকে বাতাস বিশুদ্ধ হয়, মাছ, মুক্তা ও প্রবাল জন্মে এবং এটি জাহাজ ও নৌযানের চলাচলের উপযোগী স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।[3]“তাইসিরুল কারিমির রহমান” থেকে আলোচনা সমাপ্ত (পৃষ্ঠা ৮৩০)
- দ্বিতীয় ব্যাখ্যা
মিঠা এবং লবণাক্ত সমুদ্র দুটোর মাঝে একটি অদৃশ্য প্রতিবন্ধক বিদ্যমান। এটি আল্লাহ তাঁর কুদরতের দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। নদীর মোহনায় মিঠা ও নোনতা পানি একত্রিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি এর মাধ্যমে পানিদ্বয়কে মিশে যাওয়া থেকে বাধা দেন। এই মতটি ইবন আব্বাস (রা.) থেকে ইমাম কুরতুবি (রহ) উল্লেখ করেছেন এবং কাতাদাহ থেকে বর্ণিত আবদ ইবনু হুমাইদের সনদের ভিত্তিতে সুয়ূতি (রহ) এই মতকে সমর্থন করেছেন।[4]দেখুন, “দুররুল মানসুর” ৬/৩৭১
ইমাম কুরতুবি (রহ) বলেন:
“{তিনি দুই সমুদ্রের মাঝে স্থাপন করেছেন} তাঁর কুদরতে একটি প্রবল বাধা; যেন মিঠা পানির সাথে তেঁতো পানি মিশে না যায়। ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, “এটি আল্লাহর কুদরতের একটি নিদর্শন, যার ফলে মিঠা পানি তেঁতো পানিকে পরিবর্তন করতে পারে না, তেঁতো পানিও মিঠা পানিকে পরিবর্তন করতে পারে না। আর এই প্রতিবন্ধক অর্থ হলো মিশতে বাধা দেওয়া।”[5]“তাফসিরুল কুরতুবি” থেকে আলোচনা সমাপ্ত (১৩/২২২)
আল্লামা আমিন আশ-শানকিতি (রহ) বলছেন:
“এই প্রতিবন্ধকটি প্রথম তাফসির অনুযায়ী শুকনো ভূমি, যা মিঠা পানি ও নোনতা পানির মাঝে বিভাজক হিসেবে কাজ করে।
আর দ্বিতীয় তাফসির অনুযায়ী: এটি আল্লাহর কুদরত থেকে সৃষ্ট একটি অদৃশ্য প্রতিবন্ধক।”[6]“আদওয়াউল বায়ান” থেকে আলোচনা সমাপ্ত (৬/৬৬)
আল্লামা তাহির ইবনে আশুর (রহ.) বলছেন:
“দুই সমুদ্রের মাঝে প্রতিবন্ধক স্থাপন করা আল্লাহর অপূর্ব জ্ঞানের নিদর্শন। এটি একটি গুনগত প্রতিবন্ধক, যা দুটি পানির পরস্পরকে ঠেলে দেওয়ার ফলে সৃষ্টি হয়। এটি পানির মিশ্রণ থেকে বিরত রাখে, যা নোনতা পানি ও মিঠা পানির গঠনগত উপাদানের ভিন্নতার কারণে তাদের আপেক্ষিক গুরুত্বের পার্থক্য থেকে উৎপন্ন হয়।
সুতরাং, এই প্রতিবন্ধকটি তাদের স্বাভাবিক গুণ থেকে সৃষ্ট, এটি তাদের মাঝে আলাদা কোনো বস্তুগত বিভাজক নয়।”[7]“আত তাহরির ওয়াত তানভির” থেকে আলোচনা সমাপ্ত (২০/১৩)
শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলছেন:
“কিছু আলেম বলেছেন: বারযাখ (প্রতিবন্ধক) আসলে একটি গুণগত বাধা, যা নোনতা ও মিঠা পানিকে পরস্পরের সাথে মিশে যাওয়া থেকে বাধা দেয়।
তারা আরও বলেছেন: বর্তমানে সমুদ্রের গভীরে মাটি থেকে উৎসারিত মিঠা পানির প্রস্রবণ রয়েছে। এমনকি ডুবুরিরা সেখানে গিয়ে তা সুমিষ্ট পানির ন্যায় পান করে থাকে। এতদসত্ত্বেও সমুদ্রের পানি এগুলোকে দূষিত করে না। যদি এটি প্রমাণিত হয়, তাহলে ভূগোলবিদ ও তাফসীরবিদদের মত গ্রহণে আমাদের কোনো বাধা নেই। আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।” [8]“লিক্বাউল বাবিল মাফতুহ” থেকে আলোচনা সমাপ্ত (লিক্বা/৭)
শাইখ সালিহ আল-ফাওজান (হাফি:) বলছেন:
“বারযাখ হতে পারে: তাদের মাঝে একটি পৃথককারী, অথবা ভূমি থেকে সৃষ্ট একটি প্রতিবন্ধক। এটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার ক্ষমতার নিদর্শন, যেখানে এই সমুদ্রগুলো পাশাপাশি থাকা সত্ত্বেও একে অপরকে প্রভাবিত করে না—না নোনতা পানি মিঠা হয়, না মিঠা পানি নোনতা হয়। বরং প্রত্যেকটি তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রাখে।”[9]মাজমাউল ফতোয়া শাইখ সালিহ আল-ফাওজান, ১/১৭৯
দুটি মতই গ্রহণ করা সম্ভব
আয়াতের (পূর্বে উল্লেখিত) তাফসিরে এই দুটি মত গ্রহণে কোনো সমস্যা নেই, কারণ উভয়ই সত্য এবং এদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। প্রতিবন্ধক বলতে শুকনো ভূমিকে বোঝানো যায়, যা নদী ও সমুদ্রকে পৃথক করে। আবার এটি গুনগত প্রতিবন্ধককেও (যেমন ঘনত্বের পার্থক্য) বোঝাতে পারে, যা আজকের সমুদ্রবিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেন। এটি বৈচিত্র্যের পার্থক্য, পরস্পরবিরোধের পার্থক্য নয়।
ডক্টর হুসাইন আল-হারবি বলছেন:
“প্রথম ধরনের মতপার্থক্য হলো যখন আয়াতের সব মতই সম্ভাব্য হয় এবং কুরআন ও সুন্নাহর নুসুস (প্রমাণ) প্রতিটির পক্ষে সাক্ষ্য দেয়… (তিনি উদাহরণ দিয়েছেন)। এ ধরনের মতপার্থক্য গ্রহণযোগ্য। এখানে সব মতই সঠিক এবং কোনোটির উপর প্রাধান্য দেওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ সবগুলোই সঠিক এবং আয়াতের উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত। কুরআন প্রতিটি মতের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়।” [10]কাওয়াইদুত তারজিহ ‘ইন্দাল মুফাসসিরিন, ১/৪২-৪৫
আরো তথ্যের জন্য এই উত্তরগুলো দেখা যেতে পারে: ৩০০৬৮৩, ২৭৬৯৩১, ৪৫৪৮।
আল্লাহু আলাম
অনুবাদকদের কিছু কথা
বিশেষ বিশেষ ইসলাম বিদ্বেষী সাইট এই বিষয়টিকে অবৈজ্ঞানীক প্রমাণের চেষ্টা করে, তাই এইটি অনুবাদ করা ও নিজেদের কিছু বাড়তি মন্তব্য সংযুক্ত করা হচ্ছে। আমাদের আরো একজন লেখক সামিউল হাসান ভাইও এই বিষয়ে লিখেছেন। চাইলে সেটাও দেখতে পারেন – দুই দরিয়ার মিলন সংক্রান্ত আয়াতসমূহের তাফসির।
আয়াত গুলায় আরবি مرج শব্দ ব্যাবহার হয়, যার অর্থ মিশানো বা mix করা। পানি যে মিশে ইহা সুনানের নুসুস স্বীকার করে। কোরআনে এই বিষয়ে ৪টি আয়াত এসেছে। একটি আয়াতেও বলা হয় নি পানি একে বারেই মিশে না, দুই সমুদ্রের বা দুই রকমের পানি কখনোই দ্রবিভুত হবে না।[11]আরো দেখুন তাফসিরে তাবারি https://shamela.ws/book/7798/11890
আয়াতে আসলে অন্তরায় কি তা বুঝা যায়, মুফাসসির গণ মতভেদ করেন, অন্তরায় সম্পর্কে মতভেদ হল যে তা শুকনা কোন ভূমি না অন্য কিছু যা দেখেছেনই আপনারা। সালাফদের যামানার তাফসীর, ইবনে আব্বাসের মুক্তকৃত গোলাম ও ছাত্র হতে পাওয়া যায়, বারযাখ বা অন্তরায়, বাহ্যিক কোন ফিজিকাল জিনিস না, তা হলো আল্লাহর হুকুম ও আদেশ।
অন্তরায়-কে ফিজিকাল কোন বস্তু হতে হবে এমন কোন শর্ত আরোপ করাই হই নি। আয়াতে সাধারণ ভাবেই দুটো সমুদ্রের ভিন্নতার বিষয়টা ফুটে উঠেছে। নদীর পানি সমুদ্রে গিয়ে মিলিত হলেও নদীর যে ধারা সেটা কি বাহ্যিক কোন কারণ ছাড়া সমুদ্রের পানির মত পরিপুর্ণ হয়ে লবনাক্ত হয়ে যায়? বা নদীর যে পানি সমুদ্রে গিয়ে মিলিত হচ্ছে তাতে কি সম্পুর্ন সমুদ্র তার বৈশিষ্ট হারাচ্ছে? অবশ্যই না। দুটো দু যায়গায় নিজের বৈশিষ্ট্য ঠিকই ধরে রেখেছে। অন্তরায় রেখেছে তাই বলে যে এক পানি আরেক পানির সাথে একটুও মিশবে না এমনতো কোথাও বলা হয় নি। সমুদ্র, নদী, খাল, বিলে জাল বা অন্যান্য জিনিস দিয়ে কখনো কখনে বেরিকেট দেওয়া হয়, এতে কি এক স্থানের পানি এক স্থানেই আটকা পড়ে যায়? অবশ্যই না। তেমনই আল্লাহর সৃষ্টিতে অন্তরায় বা আড়াল থাকার মানেতো এই না যে এক পানি একে বারের জন্য এক সাইডেই আটকা পড়ে গিয়েছে। তেমনই সমুদ্রের বিভিন্ন যায়গার পানির ভিন্নতার বিষয়েও একই কথা প্রযোজ্য৷ পাশাপাশি দুই সমুদ্রের পার্থক্য সুস্পষ্ট বিধ্যমান, যতসামান্য পানির মিশ্রণের পরও এই পার্থক্য বিলিন হয়ে যাচ্ছে না। সেহেতু কোরআনে ভুল কি করে বলা যেতে পারে?
সালাফদের তাফসীর না থাকলে তখন আপত্তি করা যেত। কাজেই এখানে এসব আয়াত সায়েন্টিফিক মেথডলজিতে যদি কোন ভাবে অসামঞ্জস্য মনেও হয়, তারপরেও উক্ত আয়াতগুলার তাফসীর করার রাস্তা সালাফগণ খোলা রেখেছেন। হযরত ইকরিমা (রহ.) থেকে বর্ণিত,
٧٤٢١٧ – عن عكرمة مولى ابن عباس، {بَيْنَهُما بَرْزَخٌ لا يَبْغِيانِ}، قال: البرزخ عَزْمَةٌ من الله، لا يبغي أحدهما على الآخر (٤). (١٤/
ইকরিমা, ইবনে আব্বাসের মুক্তদাস, আল্লাহর বাণী {بَيْنَهُما بَرْزَخٌ لا يَبْغِيانِ} – “উভয়ের মধ্যে আছে এক আড়াল, যার একটিও অপরটির উপর সীমালঙ্ঘন করে না” – এর ব্যাখ্যায় বলেছেন: এই আড়াল বা প্রাচীর হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নির্দেশ, যাতে একে অপরের উপর সীমালঙ্ঘন না করে।[12]কিতাব মাওসু’আতুত তাফসীরিল মা’সুর ২১/১০০
আল্লাহ পাক, মাত্র একটি আয়াতে বলেন, দুটি সমুদ্র একে উপরের উপর بغى করেনা। বাগী শব্দের শাব্দিক অর্থ কখনই মিশে যাওয়া না। এর অর্থ বিদ্রোহ করা। কতিপয় মুফাসসির ও সালাফ ইজতিহাদের মাম্যে বলেন এর অর্থ মিশে না যাওয়া। ইজতিহাদ সঠিক ও ভুল উভয়ই হয়।
ইমাম তাবারী (রহ) বলেন,
وأولى الأقوالِ في ذلك عندي بالصوابِ أن يقالَ: إن اللَّهَ وصَف البحرين اللذين ذكَرَهما في هذه الآيةِ أنهما لا يَبغيان، ولم يَخْصُصْ وصفَهما بذلك في شيءٍ دون شيءٍ، بل عمَّ الخبرَ عنهما بذلك، فالصوابُ أن يُعَمَّ كما عمَّ جلَّ ثناؤُه، فيقالَ: إنهما لا يَبْغِيان على شيءٍ، ولا يَبْغِي أحدُهما على صاحبِه، ولا يَتَجاوزان حدَّ اللَّهِ الذي حدَّه لهما.
এ বিষয়ে সঠিক মত হলো এই যে, আল্লাহ্ তাআলা দু’সাগরের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, উভয়েই সীমালঙ্ঘন করে না। তিনি এ গুণটি কোনো একটি বিশেষ বিষয়ের সাথে সীমাবদ্ধ করেননি; বরং সাধারণভাবে উভয়ের সম্পর্কেই এ কথা বলেছেন। অতএব, সঠিক কথা হলো, তিনি যেমন সাধারণভাবে বলেছেন, আমরাও বলব, তারা উভয়েই কোনো কিছুর উপর সীমালঙ্ঘন করে না, একে অপরের উপরেও সীমালঙ্ঘন করে না এবং আল্লাহ্ তাদের জন্য যে সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তারা তা অতিক্রমও করে না।
এখন প্রশ্ন রইল কোরআনে যেটা বলে নি সেটাই অর্থ নিয়ে অবৈজ্ঞানিক দাবি করলে কি হবে?
আনুবাদকঃ Ashraful Nafiz (DeepSeek ও Grok ai দিয়ে)
অনুবাদ নিরীক্ষকঃ Muhammad Al Ibrahim
Footnotes
| ⇧1 | “তাফসিরুল কুরআনিল আযিম” থেকে আলোচনা সমাপ্ত (৬/১১৭) |
|---|---|
| ⇧2 | “তাফসিরুল কুরআনিল আযিম” থেকে আলোচনা সমাপ্ত (৭/৪৯২) |
| ⇧3 | “তাইসিরুল কারিমির রহমান” থেকে আলোচনা সমাপ্ত (পৃষ্ঠা ৮৩০) |
| ⇧4 | দেখুন, “দুররুল মানসুর” ৬/৩৭১ |
| ⇧5 | “তাফসিরুল কুরতুবি” থেকে আলোচনা সমাপ্ত (১৩/২২২) |
| ⇧6 | “আদওয়াউল বায়ান” থেকে আলোচনা সমাপ্ত (৬/৬৬) |
| ⇧7 | “আত তাহরির ওয়াত তানভির” থেকে আলোচনা সমাপ্ত (২০/১৩) |
| ⇧8 | “লিক্বাউল বাবিল মাফতুহ” থেকে আলোচনা সমাপ্ত (লিক্বা/৭) |
| ⇧9 | মাজমাউল ফতোয়া শাইখ সালিহ আল-ফাওজান, ১/১৭৯ |
| ⇧10 | কাওয়াইদুত তারজিহ ‘ইন্দাল মুফাসসিরিন, ১/৪২-৪৫ |
| ⇧11 | আরো দেখুন তাফসিরে তাবারি https://shamela.ws/book/7798/11890 |
| ⇧12 | কিতাব মাওসু’আতুত তাফসীরিল মা’সুর ২১/১০০ |




আসসালামু আলাইকুম। কিন্তু নাস্তিকরা বলতেছে যে এটা নাকি ‘অবৈজ্ঞানিক’। দুই সমুদ্রের পানি নাকি সাময়িক সময়ের জন্য মেশে না কিন্তু একসময় ঠিকই মিশে যায়। ‘য়’ অন্তাক্ষরের একটা ওয়েবসাইটে এমনটা লেখা আছে। তারা নাসার গবেষণার উল্লেখ করে বলেছে পানি নাকি মিশে যায়। এর যথোপযুক্ত জবাব দিলে ভালো হতো।
কোরআনে এই বিষয়ে ৪টি আয়াত এসেছে। একটি আয়াতেও কি বলা হয়েছে পানি একে বারেই মিশে না? দুই সমুদ্রের বা দুই রকমের পানি কখনোই দ্রবিভুত হবে না?
আমার মনে হয় না এমন কিছু বলা হয়েছে আয়াতে৷ বরং আয়াতে সাধারণ ভাবেই দুটো সমুদ্রের ভিন্নতার বিষয়টা ফুটে উঠেছে৷ নদীর পানি সমুদ্রে গিয়ে মিলিত হলেও নদীর যে ধারা সেটা কি বাহ্যিক কোন কারণ ছাড়া সমুদ্রের পানির মত পরিপুর্ণ হয়ে লবনাক্ত হয়ে যায়? বা নদীর যে পানি সমুদ্রে গিয়ে মিলিত হচ্ছে তাতে কি সম্পুর্ন সমুদ্র তার বৈশিষ্ট হারাচ্ছে? অবশ্যই না। দুটো দু যায়গায় নিজের বৈশিষ্ট্য ঠিকই ধরে রেখেছে। অন্তরায় রেখেছে তাই বলে যে এক পানি আরেক পানির সাথে একটুও মিশবে না এমনতো শতভাগ নিশ্চয়তার সাথে বলা যায় না। সমুদ্র, নদী, খাল, বিলে জাল বা অন্যান্য জিনিস দিয়ে কখনো কখনে বেরিকেট দেওয়া হয়, এতে কি এক স্থানের পানি এক স্থানেই আটকা পড়ে যায়? অবশ্যই না। তেমনই আল্লাহর সৃষ্টিতে অন্তরায় বা আড়াল থাকার মানেতো এই না যে এক পানি একে বারের জন্য এক সাইডেই আটকা পড়ে গিয়েছে।
তেমনই সমুদ্রের বিভিন্ন যায়গার পানির ভিন্নতার বিষয়েও একই কথা প্রযোজ্য৷ পাশাপাশি দুই সমুদ্রের পার্থক্য সুস্পষ্ট বিধ্যমান, যতসামান্য পানির মিশ্রণের পরও এই পার্থক্য বিলিন হয়ে যাচ্ছে না। সেহেতু কোরআনে ভুল কি করে বলা যেতে পারে?
আপনি কোরআনে যেটা বলে নি সেটাই অর্থ নিয়ে অবৈজ্ঞানিক দাবি করলে কি হবে?