স্ত্রীকে প্রহার সম্পর্কিত প্রশ্ন

প্রশ্নোত্তর (Q&A)Category: ইসলামস্ত্রীকে প্রহার সম্পর্কিত প্রশ্ন
ফাহিম খান asked 3 বছর ago

আমাদের নবী স্ত্রীদের মারতে নিষেধ করেছিল, তারপর কিছু সাহাবা যাতে তাদের মারতে পারে সেজন্য আবেদন করেছিল। এরপর আবার আমাদের নবি স্ত্রীকে প্রহার করার অনুমতি দিলেন! এটাকি অন্যায় নয়?

2 Answers
Ashraful Nafiz Staff answered 3 বছর ago

কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেছেন,

“আর স্ত্রীদের মধ্যে যাদের অবাধ্যতার আশংকা কর তাদেরকে সদুপদেশ দাও, তারপর তাদের শয্যা বর্জন কর এবং তাদেরকে প্রহার কর” [সূরা নিসা আয়াত ৩৪]

এই আয়াতের তাফসিরে একটি হাদিস বর্ণিত আছে অনেক তাফসির গ্রন্থে সেটা হল,

“আত্বা [রহ] বলেন, ইবন আব্বাসকে প্রশ্ন করা হল, উক্ত প্রহার কিরূপ হবে? তিনি বললেন, মেসওয়াক বা অনুরূপ কাঠি দ্বারা প্রহার হতে হবে।” [তাফসিরে তাবারী ৭/২৪০]

এছাড়াও কোরআন থেকেও স্ত্রীকে হালকা কিভাবে প্রহার করবে সেটারও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কোরআনে আল্লাহ বলেছেন,

“আর (আল্লাহ আদেশ করলেন আইয়ুব আঃ কে) একমুঠ ঘাস নিন এবং তা দ্বারা আঘাত করুন এবং শপথ ভঙ্গ করবেন না।” [সূরা সোয়াদ আয়াত ৪৪]

স্ত্রীদেরকে মৃদু প্রহার করার অনুমতি দেওয়ার পর মহানবী ﷺ এটাও বলে দিয়েছিলেন যে কি রকম হালকা ভাবে স্ত্রীদেরকে শাসন করবে। যেমন রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

তোমাদের কেউ যেন তার স্ত্রীকে চাকর-বাকরদের বা দাসের মত না মারে, কোন কোন বর্ণনায় ষাড়ের মত বলা হয়েছে। কেননা, দিনের শেষে তার সঙ্গে তো মিলিত হবে। [সহিহ বুখারী ৫২০৪; ৬০৫২]

আরেক বর্ণনায় দেখা যায় মহানবী (সা) বলেছেন,

“কিন্তু তারা যদি নির্দেশ লঙ্ঘন করে এরূপ করে ফেলে (স্বামীর অবাধ্যতা করে পরপুরুষকে গৃহে স্থান দেয়) তবে, তাদেরকে প্রহার কর। কিন্তু প্রহার যেন কঠিন ও কষ্টদায়ক না হয়। [মুসলিম, হাদীস ১২১৮]

আরেক বর্ণনায় রাসূল ﷺ বলেছেন,

স্ত্রীর মুখমন্ডলে মারবে না, তাকে গালমন্দ করবে না এবং পৃথক রাখতে হলে ঘরের মধ্যেই রাখবে। [আবু দাউদ ২১৪২]

রাসূল ﷺ এর উপদেশ ছিল স্ত্রীকে প্রহার না করার,

একদা আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট এসে বললাম, আমাদের স্ত্রীদের (হক) সম্পর্কে আপনি কি বলেন? তিনি বললেনঃ তোমরা যা খাবে তাদেকেও তা খাওয়াবে এবং তোমরা যা পরবে, তাদেরকেও তা পরিধান করাবে। তাদেরকে প্রহার করবে না এবং গালিগালাজ করবে না। [আবু দাউদ ২১৪৪]

এছাড়া আরো বহু হাদিসে দেখা যায় রাসূল ﷺ যেটা কষ্ট দায়ক, আহত হবে, ক্ষতিকর হবে, জুলুমের পর্যায়ের হবে সেরকম ভাবে স্ত্রীকে মারতে কঠোর ভাবে নিষেধ করেছে। [আবু দাউদ ১৯০৫; তিরমিযী ১১৬৩, ৩০৮৭; ইরওয়াহ ১৯৯৭-২০২০; আদাবুয যিফাফ ১৫৬; ইবনে মাজাহ ১৮৫১]

প্রথমে মহানবী ﷺ স্ত্রীদের গায়ে হাত তূলতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন কিন্তু পরে স্বামীর অবাধ্যতা ও নাফরমানি করার কারনে স্ত্রীকে হালকা প্রহার করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। স্ত্রীদের পক্ষ থেকে যদি নাফরমানী সংঘটিত হয় কিংবা এমন আশংকা দেখা দেয়, তবে প্রথম পর্যায়ে তাদের সংশোধন হল যে, নরমভাবে, সুন্দরভাবে তাদের বোঝাবে। যদি তাতেও বিরত না হয়, তবে দ্বিতীয় পর্যায়ে তাদের বিছানা নিজের থেকে পৃথক করে দেবে। যাতে এই পৃথকতার দরুন সে স্বামীর অসন্তুষ্টি উপলব্ধি করে নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে পারে। তারপর যদি তাতেও সংশোধন না হয়, তবে মৃদুভাবে প্রহার করবে। আর তার সীমা হল এই যে, শরীরে যেন সে মারধরের প্রতিক্রিয়া কিংবা যখম না হয়। কিন্তু যখন মহানবী দেখলেন স্বামীদের অবাধ্য হওয়ার কারনে যখন স্ত্রীকে মৃদু প্রহার করার অনুমতি দেওয়া হল তখন অনেক নারী মহানবীর স্ত্রীদের কাছে এসে স্বামীদের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ করলো। তখন এই ধরনের শাস্তি দানকে রাসূল ﷺ পছন্দ করেননি, বরং তিনি বলেছেনঃ যারা স্ত্রীদেরকে প্রহার করে তারা তোমাদের মধ্যে উত্তম নয়। (কারন মৃদু প্রহার করলেত আর কেউ অভিযোগ করতে আসত না, এতেই বুঝা যাচ্ছে কঠোর আচরন করেছিল তারা) [ইবন হিব্বানঃ ৯/৪৯৯, নং ৪১৮৯; আবু দাউদ ২১৪৪-২১৪৬; ইবন মাজাহ ১৯৮৫]

এছাড়া রাসূল ﷺ এমন ব্যাক্তির সাথে বিবাহ করতে অনুৎসাহিত করেছেন যে স্ত্রীকে মারে বা স্ত্রীর প্রতি কঠোর বেশি। যেমন সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে পাওয়া যায় এক নারীর তালাকের পর পুনরায় বিবাহ দেওয়ার ক্ষেত্রে তার সামনে ৩টি প্রস্তাব ছিল। মু’আবিয়াহ, আবূ জাহম ও উসামাহ ইবনু যায়দ।  তখন নবী ﷺ বললেনঃ মু’আবিয়াহ তো একজন গরীব মানুষ, নগণ্য সম্পদের অধিকারী আর আবূ জাহম তো নারীদের প্রতি কঠোর (অথবা বললেন) সে স্ত্রীদের লাঠিপেটা করে অথবা এরূপ কিছু বললেন। তবে উসামাহ ইবনু যায়দকেই গ্রহণ করা তোমার জন্য উচিত হবে। [সহিহ মুসলিম ১৪৮০, হাদিস একাডেমি ৩৬০৪-০৫]

অবশ্যই এই সংক্রান্ত একটা হাদিস অনেক প্রচার করা হয় সেটা হল -

উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) হতে বর্নিত যে রাসুল ﷺ বলেছেন :  "কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে প্রহার করলে এজন্য সে দোষী হবে না/ একজন পুরুষকে জিজ্ঞেস করা হয় না কেন সে তার স্ত্রীকে মারধর করেছে" [আল-মুসনাদুল জামে ১৩/৫১২; মুসনাদ আহমদ ১২২; মুসনাদ আব্দ বিন হুমাইদ ৩৭; সুনান আবি দাউদ ২১৪৭; সুনান ইবন মাজাহ ১৯৮৯; সুনানুন নাসাঈ আল কুবরা ৯১২৩; মুস্তাদরাকুল হাকেম ৪/১৯৪]

অথচ এই হাদিসটি যয়িফ [আল-মুসনাদুল মুয়াল্লাল ২২/১৬৩; সুনানু আবিদাউদ বিতাহকিকিল আরনাওওত ৩/৪৮০/১; আন-নাফিলাহ ১/২১; যইফু আবি-দাউদ ২/২২২-২২৩; সিলসিলাতুয যইফাহ ১০/৩১৬-৩১৭; حديث : لا يُسْأل الرجل فيمَ ضرب زوجته ؟]

কিন্তু মুর্খ মানবরা এইটা যয়িফ হাদিস হওয়ার পরও এটাকে আশ্রয় করেও কতই না মিথ্যাচার করে। এই বিষয়ে আরো জানতে চাইলে পড়ুন -

অবশ্যই অনেকে রাসূলের একটি হাদিস প্রমান হিসেবে দেখান যেখানে তিনি আয়শা (রা)-কে আঘাত করেছিলেন। এই দলিলের জবাব - https://www.frommuslims.com/?p=70828

আশা করি উত্তর পেয়েছেন

Md. Nur Habib answered 5 মাস ago
আফগানিস্তানের বিষয়ে দালাল মিডিয়া মিথ্যে নিউজ করেছে। কিন্তু স্ত্রীকে প্রহার সম্পর্কে ইসলামী ফীকহের পজিশন খুবই স্পষ্ট। এই বিষয়ে আহলুস সুন্নাহর আইম্মাদের মধ্যে ইখতিলাফ খুব কম। এই বিষয়ে ইস্তিদলাল করা হয় একটি আয়াত থেকে—
আল্লাহ তাআলা বলেন— আর যাদের পক্ষ থেকে তোমরা অবাধ্যতার আশঙ্কা করো, তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ করো এবং তাদের প্রহার করো। যদি তারা তোমাদের অনুগত হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো পথ খুঁজো না [ সূরা নিসা, আয়াত ৩৪ ]
ইমাম কুরতুবী এই আয়াতের তাফসীরে বলেন—
قوله تعالى (واضربوهن) أمر الله أن يبدأ النساء بالموعظة أولاً، ثم بالهجران، فإن لم ينجعا فالضرب، فإنه هو الذي يصلحها ويحملها على توفية حقه، والضرب في هذه الآية هو ضرب الأدب غير المبرح আল্লাহর কালাম (তাদের প্রহার করো)—এখানে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন যে, নারীদের ক্ষেত্রে প্রথমে উপদেশ দিয়ে শুরু করতে হবে, এরপর শয্যা ত্যাগ করতে হবে; যদি এই দুই পন্থায় কাজ না হয় তবেই প্রহার। কারণ এটিই তাকে সংশোধন করে এবং স্বামীর হক আদায়ে উদ্বুদ্ধ করে। আর এই আয়াতে প্রহার বলতে উদ্দেশ্য হলো শিষ্টাচার শেখানোর জন্য এমন প্রহার যা জখম বা ক্ষত তৈরি করে না। [ তাফসীরে কুরতুবী ৫/১৭২ ]
এখন প্রশ্ন হলো— এই ধরনের প্রহার কিভাবে করা হবে যা ক্ষতি করে না? তাবিঈ ইমাম আতা বিন আবি রাবাহ বলেন—
الضرب غير المبرح بالسواك ونحوه "জখম করে না এমন প্রহার হলো মেসওয়াক (৪-৫ ইঞ্চির ছোট্ট কাঠি যেটা দিয়ে দাঁত ব্রাশ করা হয়) বা এই জাতীয় কিছু দিয়ে আঘাত করা।"
হাফিজ ইবনু হাজার আসক্বালানী বলেন—
إن كان لا بد فليكن التأديب بالضرب اليسير আর যদি প্রহার করতেই হয়, তবে সেই শাসন যেন হয় সামান্য বা হালকা প্রহারের মাধ্যমে। [ ফাতহুল বারী ১১/২১৫ ]
শাইখ আবু ফয়সাল বাদরানী বলেন—
الضرب الجائز للرجل هو ما يكون في حالة نشوز المرأة وعصيانها بغير حق وبعد أن ينصحها الزوج فلا تنتصح, ويهجرها في الفراش فلا تنته عن نشوزها عند ذلك له أن يضربها بشروط: أـ أن لا يكون الضرب مبرحاً، أي شديداً بل يكون على وجه التأديب والتأنيب ضرباً غير ذي إذاية شديدة. ب- أن لا يضربها على وجهها. ج- أن لا يشتمها أثناء الضرب. دـ أن يستصحب أثناء هذا، أن القصد حصول المقصود من صلاح الزوجة وطاعتها زوجها، لا أن يكون قصده الثأر والانتقام. هـ- أن يكف عن هذه المعاملة عند حصول المقصود. একজন পুরুষের জন্য স্ত্রীকে প্রহার করা তখনই জায়েজ যখন স্ত্রী কোনো সঙ্গত কারণ ছাড়াই অবাধ্যতা ও নাফরমানি করে এবং স্বামী তাকে নসিহত করার পরও সে উপদেশ গ্রহণ না করে, এবং বিছানায় তাকে ত্যাগ করার পরও সে তার অবাধ্যতা থেকে বিরত না হয়। এমতাবস্থায় স্বামী তাকে প্রহার করতে পারবে তবে তা হতে হবে নিম্নলিখিত শর্ত সাপেক্ষে— ক. প্রহার যেন জখমকারী বা গুরুতর না হয়, অর্থাৎ কঠোর প্রহার হওয়া যাবে না; বরং শাসনের উদ্দেশ্যে এবং তিরস্কার স্বরূপ এমন আঘাত হতে হবে যাতে তীব্র কষ্ট বা কোনো শারীরিক ক্ষতি না হয়। খ. তার মুখে প্রহার করা যাবে না। গ. প্রহার করার সময় তাকে গালিগালাজ করা যাবে না। ঘ. প্রহারের সময় এই বিষয়টি স্মরণে রাখতে হবে যে, এর উদ্দেশ্য হলো স্ত্রীর সংশোধন এবং স্বামীর প্রতি তার আনুগত্য ফিরিয়ে আনা; প্রতিশোধ গ্রহণ বা জিঘাংসা চরিতার্থ করা এর উদ্দেশ্য নয়। ঙ. উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে গেলে (অর্থাৎ স্ত্রী সংশোধন হয়ে গেলে) এই আচরণ থেকে বিরত হতে হবে। [ আল মুসলিম ওয়া হুকূকুল আখারীন (পৃষ্ঠা ৫৪) ] এখানে সামান্য আঘাত বলতে রুমাল বা মিসওয়াক দিয়ে আঘাত করা যেটা দিয়ে ক্ষতি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ই নেই। এবং এই সামান্য আঘাতের উদ্যেশ্য প্রহর করলেও যদি নারির কোনো ক্ষতি হয় তাহলে ইমাম আবু হানীফা ও শাফিঈ বলেন, স্বামীকে এর দায়ভার বা জরিমানা বহন করতে হবে। [ আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু, উস্তায ডক্টর ওয়াহবাহ বিন মুস্তফা আয জুহাইলি ৯/৬৮৫৬ ]
আর এখানে যা বলা হয়েছে এটাও অনুত্তম। কারণ আম্মাজান আয়েশা রা. বলেন—
مَا ضَرَبَ رَسُولُ اللهِ ﷺ شَيْئًا قَطُّ بِيَدِهِ، وَلَا امْرَأَةً وَلَا خَادِمًا، إِلَّا أَنْ يُجَاهِدَ فِي سَبِيلِ اللهِ، وَمَا نِيلَ مِنْهُ شَيْءٌ قَطُّ فَيَنْتَقِمَ مِنْ صَاحِبِهِ إِلَّا أَنْ يُنْتَهَكَ شَيْءٌ مِنْ مَحَارِمِ اللهِ فَيَنْتَقِمَ لِلهِ. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাত দিয়ে কখনো কাউকে আঘাত করেননি—কোনো নারীকে (স্ত্রী) নয়, কোনো সেবককে নয়; তবে আল্লাহর পথে জিহাদ করার সময় ব্যতীত। তাঁর ব্যক্তিগত কোনো ক্ষতি করা হলে তিনি কখনো তার প্রতিশোধ নেননি, তবে যদি আল্লাহর পবিত্র সীমার কোনো কিছু লঙ্ঘিত হতো, তবে তিনি আল্লাহর জন্য তার প্রতিশোধ নিতেন। [ সহীহ মুসলিম ৭/৮০ হা. ২৩২৮ ]
- নুর হাবিব
Back to top button