ইসলামবিরোধীদের প্রতি জবাবসীরাত ও ইতিহাস

আয়িশা (রা.)-এর নিজের বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য সম্পর্ক

আম্মাজান আয়েশা (রা.) ও রাসুলের বিবাহ নিয়ে ইসলামবিদ্বেষী মহলে বহু আলোচনা সমালোচনা লক্ষ্য করা যায়। যার অনেক কিছুর জবাব ইতিমধ্যে অনলাইনে বিদ্যমান। আমি একটু ভিন্ন আঙ্গিকে আপত্তিগুলোর বিরুদ্ধে কিছু ঐতিহাসিক বাস্তবতা উল্লেখ করতে চাই, যা আমাদেরকে সাহায্য করবে তৎকালীন প্রেক্ষাপট, আয়শা (রা.)-এর মনের কথা, আকাঙ্খা, রাসুলের সাথে উনার সম্পর্কের গভীরতা কেমন ছিল তা উপলব্ধি করতে। আমি এই লিখায় যেগুলো উল্লেখ করছি সেগুলো একজন সুস্থ, স্বাভাবিক মনমানুষকিতার অধিকারী নারীর স্বপ্ন থাকে, আকাঙ্খা থাকে তার স্বামীর প্রতি, তারা এমন মানুষকে নিজেদের ড্রিম হাসবেন্ড হিসেবে কল্পনা করে থাকেন। আমার এই লিখাটি পুরুষদের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে ইনশাআল্লাহ, এতে তারা জানতে ও শিখতে পারবেন কিভাবে একজন আইডিয়াল হাসবেন্ড হতে হয়, যার প্রতি স্ত্রী নিজ থেকেই স্বাভাবিক ভাবে অনুগত হতে চাইবে। আমি এখানে সেসকল বিষয়েই ইতিহাসের কিছু সাক্ষ্য উপস্থাপন করার চেষ্টা করছি যা প্রায় সবগুলোই সহিহ সনদে বর্ণিত।

ইসলামবিদ্বেষীদের একটি অভিযোগ রাসূলুল্লাহ ﷺ নাকি আয়িশা (রা.)-এর সঙ্গে এমন একটি সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন, যেখানে ভালোবাসা বা পারস্পরিক সম্মতির কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কখনো এটিকে জোরপূর্বক সম্পর্ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, কখনো বলা হয় আয়িশা (রা.) এই বিবাহ থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন, আবার কখনো এমন কথাও বলা হয় যে, তিনি পরবর্তীতে নবী ﷺ-এর মৃত্যুর সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত ছিলেন।

কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন আছে: এই দাবিগুলোর বিষয়ে আয়িশা (রা.)-এর নিজের বর্ণনাগুলো কী বলে? কারণ কোনো ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের একজন হলেন সেই সম্পর্কের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী নিজেই। আর আয়িশা (রা.) শুধু এই সম্পর্কের একজন অংশগ্রহণকারী ছিলেন না; তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ঘনিষ্ঠতম মানুষদের একজন, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অসংখ্য ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও চরিত্রের অন্যতম প্রধান বর্ণনাকারী। তাই তাঁর নিজের বক্তব্যগুলো একত্রে রাখলে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র সামনে আসে।

প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: যিনি তাঁকে ঘৃণা করতেন, তিনি তাঁর মৃত্যুতে এমনভাবে শোক করেছিলেন কেন? রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মৃত্যুর মুহূর্তের একটি বর্ণনায় আয়িশা (রা.) বলেন যে,

রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার ঘরে আমার বুকে হেলান দেয়া অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। আমি তার ব্যাপারে রাসুলের অন্য স্ত্রীদের প্রতি অন্যায় করিনি। আমার দুর্বলতা এবং কম বয়সের কারণে আল্লাহর রাসূলকে আমার ঘরে নেওয়া হয়েছিলো। অতঃপর আমি তাঁর মাথা একটি বালিশে রেখে মহিলাদের সাথে রক্ত-মাতমে যোগ দিলাম এবং নিজের মুখমন্ডল চাপড়াতে থাকলাম![1]মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং-২৬২২৬, ১৮/১৯৯ – https://islamqa.info/ar/answers/299190/

এখানে অবশ্যই ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে মুখ চাপড়ানো বা মাতম করা বৈধ এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। বরং এই বর্ণনাটি থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয় তা হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মৃত্যু আয়িশা (রা.)-এর জন্য গভীর শোকের ঘটনা ছিল। এই নিয়ে Islam.qa তে বিস্তারিত আলোচনা এসেছে।

এখন প্রশ্ন হলো: যে নারী তাঁর স্বামীকে ঘৃণা করতেন, তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক থেকে মুক্তি পেতে চাইতেন, তাঁর উপস্থিতি সহ্য করতে পারতেন না তার নিজের বর্ণনায় কেন আমরা এত তীব্র শোক দেখতে পাচ্ছি?

একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে অবশ্যই পুরো সম্পর্কের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। তাই চলুন আরও বিস্তারিত দেখি। এর আগে মুশফিকুর রহমান মিনার ভাইয়ের ‘নবী(ﷺ) সুবিধামত আয়াত নাজিল করাতেন বলে কি সন্দেহ করতেন মা আয়িশা(রা.)?’ লিখাটি পড়ে আসার পরামর্শ দিব, অনেক কিছু জানতে পারবেন ইনশাআল্লাহ।

Contents Hide

১. আয়েশা (রা.) কি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে ভালোবাসতেন?

ঈর্ষা কী? ঈর্ষা সাধারণত এমন একজন মানুষের ক্ষেত্রেই অনুভূত হয়, যার প্রতি মানুষের আবেগ, আকর্ষণ, ভালোলাগা কাজ করে। এক বর্ণনায় আয়েশা (রা.) নিজেই বলেন,

কোন এক রাতে রাসুলুল্লাহ ﷺ তার নিকট থেকে বের হলেন। তিনি বলেন, এতে আমার মনে কিছুটা ঈর্ষা জাগল। অতঃপর তিনি এসে আমার অবস্থা দেখে বললেন, হে আয়িশা! তোমার কি হয়েছে? তুমি কি ঈর্ষা পোষণ করছ? উত্তরে আমি বললাম, আমার মত মহিলা আপনার মত স্বামীর প্রতি কে ঈর্ষা করবেনা। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেনঃ তোমার শয়তান কি তোমার নিকট এসে উপস্থিত হয়েছে? তখন তিনি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার সাথেও কি শয়তান রয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ নিশ্চয়ই। অতঃপর আমি বললাম, প্রত্যেক মানুষের সাথেই কি শয়তান রয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার সাথেও কি রয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমার সাথেও। তবে আল্লাহ তা’আলা তার মুকাবিলায় আমাকে সহযোগিতা করেছেন। এখন তার ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ নিরাপদ।[2]সহিহ মুসলিম, (হাদিস ফাউন্ডেশন) ৬৮৫০ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=19173

এখানে আয়েশা (রা.) নিজেই তাঁর ঈর্ষার কথা স্বীকার করছেন। এমন আরো কয়েকটি বর্ণনা আছে, এটির চাইতেও আরো সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে আয়েশা (রা.) কি পরিমাণ ভালোবাসতেন নিজের স্বামীকে সে বিষয়ে। যেমন একটি বর্ণনায় আয়িশা (রা) থেকে বলেন:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বাকী কবরস্থান থেকে ফিরে এসে আমার কাছে প্রবেশ করলেন। তখন তিনি আমাকে দেখতে পেলেন আমার মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছিল এবং আমি বলছিলাম, “হায় আমার মাথা!” তিনিও বলতে লাগলেন, “বরং আমি, আল্লাহর কসম, হায় আমার মাথা!”

এরপর তিনি বললেন, “আমার আগে তুমি মারা গেলে তোমার কী ক্ষতি হতো? আমি তোমার লাশের দায়িত্ব নিতাম, তোমাকে কাফন দিতাম, তোমার জানাজা পড়াতাম এবং তোমাকে দাফন করতাম!”

আয়িশা (রা) বললেন, “আল্লাহর শপথ! আমার মনে হচ্ছে, আপনি যদি তা করতেন, তাহলে মনে হয়ত আপনি আমার ঘরে ফিরে এসে আপনার অন্য কোনো স্ত্রীর সঙ্গে থাকতেন।“ এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ মুচকি হেসে দিলেন।

এরপর তাঁর (রাসুলের) অসুস্থতা ক্রমশ বেড়ে গেল এবং তিনি তা তীব্রভাবে অনুভব করতে লাগলেন। তখন তিনি মাইমূনা (রা)-এর ঘরে অবস্থান করছিলেন। তিনি তাঁর স্ত্রীদের ডাকলেন এবং তাঁদের কাছে অনুমতি চাইলেন যে, তিনি যেন আমার ঘরে অসুস্থ অবস্থায় থাকতে পারেন। তাঁরা তাঁকে অনুমতি দিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তার পরিবারের দু’জন লোকের মধ্যে ভর করে বেরিয়ে এলেন, তাদের একজন ছিলেন ফাযল ইবনে আব্বাস এবং অন্যজন ছিলেন আরেক ব্যক্তি তিনি পা দু’টি মাটিতে ফেলে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন এবং মাথায় পাগড়ি বাঁধা ছিল, যতক্ষণ না তিনি আমার ঘরে এলেন। এভাবে তিনি আমার ঘরে এসে পৌঁছালেন।

উবাইদুল্লাহ বলেন: আমি এই হাদিসটি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাসকে বর্ণনা করলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি জানো, দ্বিতীয় ব্যক্তিটি কে ছিলেন?” আমি বললাম, “না।” তিনি বললেন, “তিনি ছিলেন আলী।”

এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন এবং তাঁর অসুস্থতা আরও তীব্র হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ পর তিনি জ্ঞান ফিরে পেলেন এবং বললেন: “বিভিন্ন কূপের পানি থেকে সাতটি মশক পানি আমার ওপর ঢেলে দাও, যাতে আমি মানুষের কাছে বের হয়ে তাদেরকে কিছু নির্দেশনা দিয়ে যেতে পারি।”

আয়িশা (রা) বলেন: তখন আমরা তাঁকে হাফসা বিনতে উমরের একটি তামার পাত্রে বসালাম এবং তাঁর ওপর পানি ঢালতে লাগলাম। একপর্যায়ে তিনি হাত দিয়ে ইশারা করে বলতে লাগলেন: “যথেষ্ট হয়েছে! যথেষ্ট হয়েছে!”

এরপর তিনি বের হলেন, মাথায় পাগড়ি বাঁধা অবস্থায়। তিনি মিম্বরে বসে প্রথমে উহুদের যুদ্ধে শাহাদাতবরণকারী সাহাবিদের জন্য দোয়া করলেন এবং তাঁদের জন্য অনেক বেশি দোয়া করলেন।

এরপর তিনি বললেন: “আল্লাহর বান্দাদের মধ্য থেকে একজন বান্দাকে আল্লাহ দুনিয়া ও আল্লাহর কাছে যা রয়েছে এই দুটির মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। সে আল্লাহর কাছে যা রয়েছে, সেটিই বেছে নিয়েছে।”

আবু বকর (রা) কথাটির মর্ম বুঝতে পারলেন। তিনি কাঁদতে লাগলেন এবং বুঝলেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেকেই বোঝাচ্ছেন।

তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: “হে আবু বকর! একটু ধৈর্য ধরো। মসজিদের সঙ্গে সংযুক্ত এই দরজাগুলোর দিকে তাকাও এবং এগুলো বন্ধ করে দাও। তবে আবু বকরের ঘরের দরজাটি বন্ধ করবে না। কারণ, তাঁর চেয়ে উত্তম সহচর্যকারী আর কাউকে আমি জানি না।”[3]মুসনাদ আবূ ইয়া’লা, ৬/৪৯২, হাদীস নম্বর ৪৫৭৯ – https://shamela.ws/book/181/3789

মুল্লা আলী ক্বারী (রহ) বলেন,

“(فَتَبَسَّمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ)” — “এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ মুচকি হাসলেন।”

অর্থাৎ, আয়িশা (রা)-এর কথার মধ্যে তাঁর অত্যন্ত প্রবল ঈর্ষা ও ভালোবাসার প্রকাশ ছিল, এমনকি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালের পরও যেন সেই ঈর্ষা থাকবে – এ বিষয়টি তাঁর কথায় প্রকাশ পেয়েছিল। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ ﷺ মুচকি হাসলেন।

এরপর বলা হয়েছে: “(ثُمَّ بُدِئَ فِي وَجَعِهِ الَّذِي مَاتَ فِيهِ)” — এখানে “بُدِئَ” ক্রিয়াটি কর্মবাচ্য (مجهول)-এ ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ, “এরপর তাঁর সেই অসুস্থতা শুরু হলো, যে অসুস্থতার মধ্যেই পরবর্তীতে তিনি ইন্তেকাল করেন।”[4]মিরকাতুল মাফাতীহ শরহু মিশকাতিল মাসাবীহ ৯/৩৮৫৬, হাদিস ৫৯৭১

২. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে ছিলেন?

একবার আমর ইবনুল আস (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলেন:

আপনার কাছে কোন লোকটি অধিকতর প্রিয়? তিনি উত্তর দিলেন, আয়িশা (রা)। আমি বললাম, পুরুষদের মধ্যে কে? তিনি বললেন, তাঁর (আয়িশার) পিতা। আমি বললাম, তারপর কে? তিনি বললেন, উমর (রা), এভাবে তিনি (আমার প্রশ্নের জবাবে) একের পর এক আরো কয়েকজনের নাম বললেন। আমি চুপ হয়ে গেলাম এই আশংকায় যে, আমাকে না তিনি সকলের শেষে স্থাপন করে বসেন।[5]সহিহ বুখারী, (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) নাম্বারঃ ৪০১৯ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=4289

এখানে রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই প্রকাশ্যে তাঁর ভালোবাসার কথা জানিয়েছেন।

৩. আয়িশা (রা.) কি তাঁর স্বামীর সান্নিধ্য এড়িয়ে চলতেন?

এক সফরের ঘটনায়, রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন সফরে বের হতেন, তখন নিজ বিবিদের ব্যপারে লটারি করতেন। একবার লটারিতে আয়িশা ও হাফসার নাম উঠলো। উভয়েই তার সাথে বের হলেন। তারপর,

রসূলুল্লাহ ﷺ যখন রাতে সফর করতেন তখন তিনি আয়িশাহর সঙ্গে কথোপকথন করে চলতেন। হাফসাহ (রা) আয়িশাহকে বললেন, আজ রাতে তুমি আমার উটে চড় আর আমি তোমার উটে চড়ি। তারপর তুমি অপেক্ষা করবে আমিও অপেক্ষা করব। এরপর আয়িশাহ (রা) হাফসাহর উটে আর হাফসাহ্ (রা) আয়িশাহর উটে সওয়ারী হলেন। যখন রসূলুল্লাহ ﷺ আয়িশাহর উটের নিকট আসলেন এবং এতে সওয়ার ছিলেন হাফসাহ (রা) তখন তিনি সালাম দিলেন এবং তার সঙ্গে চললেন। পরিশেষে মনযিলে গিয়ে অবতরণ করলেন।

’আয়িশাহ্ (রা) তাকে (ﷺ-কে) না পেয়ে চটে গেলেন। যখন সকলে মনযিলে যেয়ে নামলেন, ’আয়িশাহ্ তার পা “ইযখির” ঘাসের উপর রেখে বলতে লাগলেন, হে রব! একটা সাপ বা বিচ্ছু আমার দিকে পাঠিয়ে দিন যেন আমাকে দংশন করে। তিনি তো আপনার রসূল। আমি তাঁকে কিছু বলতেও পারি না।[6]সহিহ মুসলিম, (হাদিস একাডেমি) নাম্বারঃ ৬১৯২ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=53291

এই ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ psychological detail বহন করে: ‘তিনি তাঁর স্বামীর মনোযোগ নিজের দিকে চান।’ যে সম্পর্কের মধ্যে কোনো আবেগ নেই, সেখানে এমন দাম্পত্য সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা কঠিন।

৪. আয়িশা (রা.) কি সুযোগ পেয়ে বিবাহ থেকে বেরিয়ে যেতে পারতেন?

রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর স্ত্রীদের তালাকের বিকল্প গ্রহণের সুযোগ দিয়েছিলেন। আয়িশা (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, স্ত্রীদের এই স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন,

রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এক সময় আমাদের তালাকের ইখতিয়ার প্রদান করেন। তখন আমরা তাঁর নির্দেশ পালন করি এবং তালাকের ইখতিয়ার সম্পর্কে কিছু ঘটেনি। (অর্থাৎ কেউই তালাক গ্রহণ করেননি, বরং নবীজীর স্ত্রী হিসাবে থাকাই পছন্দ করেছেন।)[7]আবু দাউদ হাদিস ২২০০ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=34308

অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসুল কোরআনের আয়াত অনুযায়ী উনার স্ত্রীগণকে তালাকের ইখতিয়ার দিয়ে ও তারাহুরো না করে নিজেরা চিন্তা ভাবনা এবং পিতা মাতার সঙ্গে ধীরে সুস্থে এই নিয়ে পরামর্শ করতে বললে,

আয়িশা (রা) বলেন, আমি বললামঃ এ ব্যাপারে আবার আমার মা- বাপের সঙ্গে পরামর্শ করব? আমি তো আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল ও আখিরাতকেই ইখতিয়ার করছি। তিনি বলেন, পরে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর অন্যান্য স্ত্রীগণ তেমনই করেন যেমন আমি করেছিলাম।[8]সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) হাদিস ৩৫৪৮ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=13159

অর্থাৎ আয়িশা (রা.)-এর সামনে এই বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার একটি সুযোগ এসেছিল কিন্তু তিনি নবী ﷺ-এর স্ত্রী হিসেবেই থেকে যাওয়াকে বেছে নিয়েছিলেন।

এখানে একটি সহজ প্রশ্ন: যদি এই বিবাহ তাঁর কাছে নিছক নিপীড়ন, ঘৃণা বা বন্দিত্ব হতো তাহলে যখন বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ এল, তিনি কেন তা গ্রহণ করলেন না? অন্য এক মেয়ে রাসুলের সাথে থাকতে চায় নি, এবং রাসুল ন্যূনতম প্রেসারও সেই মেয়ের উপর দেয় নি, বরং তাকে তার গন্তব্যে যেতে দিয়েছিলেন। তাহলে আয়শা (রা)-কেও নিশ্চয়ই তিনি বাঁধা দিতেন না, নিজের কষ্ট হলেও।

৫. খাদিজা (রা.)-কে নিয়ে আয়িশা (রা.)-এর ঈর্ষা কী প্রমাণ করে?

আরেকটি বর্ণনায় আয়িশা (রা.) বলেন যে, তিনি খাদিজা (রা.)-কে সবচেয়ে বেশি ঈর্ষা করতেন, যদিও তিনি তাঁকে কখনো দেখেননি। আয়িশা (রা.) বলেন,

আমি খাদীজা ছাড়া নবী ﷺ স্ত্রীদের আর কাউকে ঈর্ষা করি নি, যদিও আমি তাঁকে পাই নি। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন বকরী যবেহ করতেন তখন বলতেন, এর মাংস খাদীজার বান্ধবীদের পাঠিয়ে দাও। একদিন আমি তাঁকে রাগান্বিত করার জন্য বললাম, শুধু খাদিজা খাদিজা! রাসুলুল্লাহ ﷺ তখন বললেনঃ তার ভালোবাসা আমার অন্তরে গেঁথে দেয়া হয়েছে।[9] সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), হাদিস ৬০৬০ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=15930

কেন এত ঈর্ষা? কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ বারবার খাদিজা (রা.)-এর কথা স্মরণ করতেন এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসার কথা প্রকাশ করতেন। এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

“তার ভালোবাসা আমার অন্তরে গেঁথে দেওয়া হয়েছে।”

এটি নিছক ধর্মীয় উপদেশের ঘটনা নয়। এটি একটি বাস্তব দাম্পত্য সম্পর্কের ভাষা, যেখানে ভালোবাসা আছে, স্মৃতি আছে, ঈর্ষা আছে, অভিমান আছে।

৬. রাসূলুল্লাহ ﷺ কি আয়িশা (রা.)-এর ফিলিংস এর পরোয়া করতেন না?

অবশ্যই তিনি পরোয়া করতেন। বরং তাঁর আচরণে কোমলতা ও পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতার অসংখ্য নিদর্শন পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ উনার স্ত্রী হযরত আয়িশা (রা.)-এর অনুভূতি, আবেগ ও ভালোবাসার অত্যন্ত গভীর পরোয়া করতেন। আয়িশা (রা.) বলেন,

রাসূলুল্লাহ্ ﷺ আমাকে বললেন, ’’আমি জানি কখন তুমি আমার প্রতি খুশী থাক এবং কখন রাগান্বিত হও।’’ আমি বললাম, কী করে আপনি তা বুঝতে সক্ষম হন? তিনি বললেন, তুমি প্রসন্ন থাকলে বল, না! মুহাম্মাদ ﷺ-এর রব-এর কসম! কিন্তু তুমি আমার প্রতি নারাজ থাকলে বল, না! ইব্রাহীম (’আ.)-এর রব-এর কসম! শুনে আমি বললাম, আপনি ঠিকই বলেছেন। আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল! সে ক্ষেত্রে শুধু আপনার নাম উচ্চারণ করা থেকেই বিরত থাকি।[10]সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) হাদিস ৫২২৮ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=29791

এখানে আমরা এমন একজন স্বামীকে দেখতে পাই যিনি তাঁর স্ত্রীর আবেগের সূক্ষ্ম পরিবর্তনও লক্ষ্য করতেন। এটি দেখায় যে তাঁদের সম্পর্ক এমন ছিল যে, একটি বাক্যে ব্যবহৃত শপথের শব্দের পরিবর্তন থেকেও রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর স্ত্রীর মনের অবস্থা বুঝতে পারতেন। একজন স্ত্রী তাঁর স্বামীকে ভালোবাসতে পারেন, আবার তাঁর ওপর রাগও করতে পারেন, ঈর্ষান্বিত হতে পারেন, তাঁর জন্য কাঁদতে পারেন। এগুলো দেখায় যে, সম্পর্কটা কতটা প্রাকৃতিক ছিল।

৭. রাসূলুল্লাহ ﷺ কি নিজের স্ত্রীর ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিতেন?

একটি অসাধারণ বর্ণনা এ বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে। মসজিদে হাবশিরা তাদের ক্রীড়া প্রদর্শন করছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ আয়িশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন:

“হুমাইরার, তুমি কি তাদের খেলা দেখতে চাও?” আমি বললাম, “হ্যাঁ।” এরপর তিনি মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে আমাকে তাদের দিকে যেতে বললেন। আমি তাঁর কাছে গিয়ে আমার চিবুক তাঁর কাঁধের ওপর রাখলাম এবং আমার মুখ তাঁর গালের সঙ্গে ঠেকিয়ে রাখলাম।”

তিনি আরও বললেন: “সেদিন হাবশিরা তাদের খেলার সময় বলছিল, ‘হে আবুল কাসিম! উত্তম ব্যক্তি!’’ তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে বললেন, ‘তোমার দেখা কি যথেষ্ট হয়েছে?’ আমি বললাম, ‘হে রাসূলুল্লাহ, দয়া করে তাড়াহুড়া করবেন না।’ তিনি আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকলেন। এরপর আবার বললেন, ‘এবার কি তোমার দেখা যথেষ্ট হয়েছে?’ আমি বললাম, ‘হে রাসূলুল্লাহ, দয়া করে তাড়াহুড়া করবেন না।”

আয়িশা (রা) আরও বললেন: “আসলে তাদের খেলা দেখার প্রতি আমার বিশেষ কোনো আগ্রহ ছিল না; বরং আমি চেয়েছিলাম, নারীরা যেন জানতে পারে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে আমার সম্পর্ক এবং আমার অবস্থান কতটা বিশেষ ছিল।”[11]সুনানুল কুবরা নাসাই ৮৯০২ সনদ (হাসান) – https://shamela.ws/book/8361/12395

সনদের তাহকিক: সীলসিলা সহীহাহ – https://shamela.ws/book/9442/5627

এই একটি ঘটনা দাম্পত্য সম্পর্কের কতগুলো দিক একসঙ্গে প্রকাশ করে? ভালোবাসা, ঘনিষ্ঠতা, রসিকতা, স্ত্রীর ইচ্ছা বা চাওয়া পাওয়ার প্রতি মনোযোগ, এই বর্ণনা আরো দেখায় একজন স্ত্রীর ছবি, যিনি তাঁর স্বামীর কাছে নিজের বিশেষ স্থান নিয়ে সচেতন এবং গর্বিত। এছাড়া আমাদের নবী ﷺ আয়িশা (রা.)-এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন এই ঘটনাতো বহুল প্রশিদ্ধ একটি ঘটনা।[12]আবূ দাউদ (আলবানী একাডেমী) হাদিস ২৫৭৮ এমন আরো বহু বর্ণনাই রয়েছে।

৮. রাসূলুল্লাহ ﷺ কঠোর স্বামী ছিলেন?

এই বিষয়ে আয়িশা (রা.) বলেন:

রসূলুল্লাহ ﷺ তার স্বহস্তে কোন দিন কাউকে আঘাত করেননি, কোন নারীকেও না, খাদিমকেও না, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ব্যতীত। আর যে তার অনিষ্ট করেছে তার থেকে প্রতিশোধও নেননি। তবে আল্লাহর মর্যাদা ক্ষুন্ন হয় এমন বিষয়ে তিনি তার প্রতিশোধ নিয়েছেন।[13]সহিহ মুসলিম, (হাদিস একাডেমি) নাম্বার ৫৯৪৪ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=53041

যদি কেউ দাবি করেন যে আয়িশা (রা.) তাঁর স্বামীর দ্বারা নিপীড়িত ছিলেন, তাহলে প্রথমে তাঁকে ব্যাখ্যা করতে হবে কেন সেই স্ত্রী নিজেই তাঁর চরিত্র সম্পর্কে এমন সাক্ষ্য রেখে গেলেন?

৯. আয়িশার (রা.) দৃষ্টিতে রাসুলের চরিত্র

আয়িশা (রা.) রাসুলুল্লাহর চরিত্র সম্পর্কে কী বলেছিলেন? এই প্রশ্নটির উত্তর সম্ভবত পুরো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। আয়িশা (রা.)-কে যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি বলেন:

তিনি অশ্লীল বা কটুভাষী ছিলেন না। ভান করেও তিনি অশ্লীল কথা তিনি বলেন নি। তিনি বাজারে চিৎকার করতেন না। অন্যায়াচরণের মাধ্যমে তিনি অন্যায়ের বদলা নিতেন না; বরং তিনি তা ক্ষমা করে দিতেন এবং তা উপেক্ষা করতেন।[14]সুনান আত তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), হাদিস ২০২২ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=37377

ভিন্ন এক বর্ণনায় সা‘দ ইবনু হিশাম ইবনু ‘আমির (রহ.) বলেন:

আমি আয়িশা (রা.)-এর কাছে এসে বললাম, “হে উম্মুল মুমওনিন! আমাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চরিত্র সম্পর্কে বলুন।”

তিনি বললেন: “তাঁর চরিত্রই ছিল কুরআন।

তিনি বললেন, “তুমি কি কুরআনে পড়ো নি আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ — সূরা আল-কলম, ৬৮:৪

আমি বললাম, “আমি তো একান্তভাবে ইবাদতে আত্মনিয়োগ করতে চাই।”

তিনি বললেন: “এমনটি করো না। তুমি কি পড়োনি, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ — সূরা আল-আহযাব, ৩৩:২১

আর রাসূলুল্লাহ ﷺ বিবাহ করেছেন এবং তাঁর সন্তানও হয়েছে।”[15]মুসনাদে আহমদ, হাদিস ২৫৬০১ – https://al-hadees.com/musnad-ahmed/24601

এগুলো কোনো সাধারণ প্রশংসা নয়। এগুলো একজন নারীর নিজের স্বামীর চরিত্র সম্পর্কে সাক্ষ্য যিনি তাঁর সবচেয়ে কাছের ও অতি ব্যক্তিগত জীবনও প্রত্যক্ষ করেছেন।

আয়িশা (রা) হতে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর আখলাক, চরিত্র নিয়ে আরো বহু বর্ণনা পাওয়া যায়, যেমন এক বর্ণনায় তিনি বলেন, রাসুলের হাত নিজস্ব মালিকানাধীন স্ত্রীলোক ব্যতীত অপর কারো হাত (ইচ্ছাকৃত) স্পর্শ করেনি।[16]সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) হাদিস ৩৩০৩ এত বর্ণনা উপস্থাপন করার প্রয়োজন হয় না, দুই একটাতেই সামগ্রিক বিষয়বস্তু ফুটে উঠে, উনার কাছে উনার স্বামী কেমন ছিলেন তা জানতে শত শত বর্ণনা দেখানোর প্রয়োজন নেই।

১০. আয়িশা (রা.) নিজের ভাগের রাতটুকুও সপত্নীদের সাথে ভাগ করতে চাননি!

এখানে আয়িশা (রা) থেকে খুব মজার বর্ণনা পাওয়া যায়, যা সুস্পষ্ট ভাবে দেখায় তিনি রাসুলের সঙ্গ কত বেশি পছন্দ করতেন।

আয়িশাহ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আপনি তাদের (স্ত্রীদের) মধ্যে যাকে ইচ্ছা দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন এবং যাকে ইচ্ছা আপনার নিকট স্থান দিতে পারেন”- (সূরা আহযাব ৩৩ঃ ৫১) আয়াত নাযিল হবার পরে রসূলুল্লাহ ﷺ তার কোন এক স্ত্রীর পালার দিনে (অন্যদের জন্য) আমাদের কাছে অনুমতি চাইতেন। তখন মুআযাহ্ (রহঃ) তাকে বললেন, রসূলুল্লাহ ﷺ আপনার নিকট অনুমতি চাইলে আপনি তাকে কী বলতেন? তিনি বললেন, আমি বলতামঃ এ বিষয়টি আমার অধিকারে থাকলে তো কাউকে আমি আমার উপর অগ্রাধিকার দিতাম না। (অর্থাৎ অনুমতি প্রার্থনার বিষয়টি অধিকারমূলক ছিল না। বরং তা ছিল নৈতিক ও রসূলুল্লাহ ﷺ এর সৌজন্যমূলক আচরণ মাত্র। সুতরাং সেখানে অনুমতি না দেয়ার অবকাশ ছিল না। অন্যথায় আমি অনুমতি প্রদানে রায়ী হতাম না।)[17]সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) হাদিস ৩৫৭৪ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=50657

আয়িশা (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অন্য স্ত্রীদের নিয়ে ঈর্ষা করতেন। খাদিজা (রা.)-কে নিয়েও ঈর্ষা করতেন। তাঁর স্বামী অন্য কারো প্রতি মনোযোগ দিলে তাঁর অভিমান হতো।

Read More...  হেদায়েত দেওয়া ও অন্তরে মোহর মারার কারণ

এসব একজন স্ত্রী যে তার স্বামীকে সত্যিই ভালোবাসে তার প্রাকৃতিক আচরণ। বরং এই ঘটনাগুলো সম্পর্কটির বাস্তবতাকে আরও শক্তিশালী করে। কারণ একটি সম্পূর্ণ সাজানো, কৃত্রিম, রাজনৈতিক সম্পর্কের বর্ণনায় আমরা সাধারণত এই ধরনের সূক্ষ্ম ব্যক্তিগত আবেগের ধারাবাহিকতা আশা করি না।

১১. রাসুল ﷺ কি বৃদ্ধ ছিলেন?

রাসুলের দাড়ি-চুল পাকে নি, কুজো ছিলেন না তিনি, তিনি প্রমান উচ্চতার ছিলেন, উনার চামরা বুড়োদের মত কুচকানো বা ঝুলে পড়ার মত ছিল না, মোটা ছিলেন না, বরং দৈহিক গঠন একজন যোদ্ধার যেমন হওয়ার প্রয়োজন অনেকটা তেমন অথবা তার চেয়েও অনেক সুঠাম দেহের অধিকারি ছিলেন তিনি, তিনি ছিলেন সুদর্শন, শুভ্রকায় ও লাবণ্যময় সুসামঞ্জস্যপূর্ণ। রং ছিল উজ্জ্বল ফর্সা, তাঁর ফর্সা রঙের মধ্যে লালিমার আভা (গোলাপি বা লালাভ-সাদা) মিশে ছিল। অর্থাৎ তিনি অতিরিক্ত সাদা বা ফ্যাকাশে ছিলেন না, আবার অতিরিক্ত শ্যামলা বা কালোও ছিলেন না।[18]‘নবিজি দেখতে যেমন ছিলেন’, আল্লামা ইব্‌নে কাছীর (রহ) ; শামায়েলে তিরমিযী ; নবীজির সা. সৌন্দর্য কোন বর্ণনায় এসেছে উনার মৃত্যুর সময় ১৫-২০টি সাদা চুল দেখা গিয়েছিল শুধু, কোন বর্ণনায় পুর্ণিমার চাঁদের সাথে তুলনা দেওয়া হয়েছে উনাকে।

চিন্তা করুন বর্তমানে বহু অভিনেতা, ইনফ্লুয়েন্সার, মডেল, খেলোয়াড় ইত্যাদি ৫০-৫৫ বছর বয়সেও অনেক ফিট, স্মার্ট, হেন্ডসাম, যাদের জন্য অসংখ্যা নারী পাগল। তাদেরকে বিবাহের কথা বললে যত বেশি বয়সের পার্থক্যই থাকুক না কেন, যেকোন মেয়ে রাজি হয়ে যাবে। রাসূলুলল্লাহ ﷺ-তো এদের চাইতেও আরো অনেক বেশি ফিট, সুন্দর, স্মার্ট ছিলেন। সেহেতু তার স্ত্রীরা তাকে ভালোবাসবেই না কেন!

১২. খাদিজা (রা) এর মৃত্যুর কতদিন পর আয়েশা (রা) কে বিবাহ করেন?

রাসুলুল্লাহ ﷺ উনার প্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রা) এর মৃত্যুর বের লম্বা সময় পরে আয়িশাকে বিবাহ করেন, যা প্রায় ৩ বছর। আয়িশাহ (রা) বলেন,

আমি অন্য কোন মহিলার উপর ততটা ঈর্ষা পোষণ করতাম না, যতটা ঈর্ষা করতাম খাদীজার উপর। অথচ আমার বিয়ের তিন বছর আগেই তিনি মারা যান। কারণ, আমি শুনতাম, নবী ﷺ তাঁর নাম উল্লেখ করতেন। আর জান্নাতের মাঝে মণি-মুক্তার একটি ঘরের খোশ-খবর খাদীজাকে শোনানোর জন্যে তাঁর প্রতিপালক তাঁকে নির্দেশ দেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনও ছাগল যবহ করলে তার একটি টুকরো খাদীজার বান্ধবীদের কাছে অবশ্যই পাঠাতেন।[19]সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) হাদিস ৬০০৪ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=30601

১৩. আয়িশা (রা) এর বয়স ও সম্মতি

সম্মতি নিয়ে বর্তমান সময়ে বিভিন্ন সম্প্রদায় জঘন্য কর্মকান্ডে লিপ্ত হওয়াকেও বৈধতা দিয়ে থাকে। সেখানে আয়িশা (রা)-তো নিজে এই বিবাহে সম্মতি দিয়েছিল। আয়িশা (রা.) বর্ণনা করেন যে,

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ দু’বার আমাকে স্বপ্নযোগে তোমাকে দেখানো হয়েছে। এক ব্যক্তি রেশমী কাপড়ে জড়িয়ে তোমাকে নিয়ে যাচ্ছিল, আমাকে দেখে বলল, এ হচ্ছে তোমার স্ত্রী। তখন আমি তার পর্দা খুললাম, আর সেটা হলে তুমি। তখন আমি বললাম, এ স্বপ্ন যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়, তবে তিনি বাস্তবে তা-ই করবেন।[20]সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) হাদিস ৬০৬৫ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=15935

অর্থাৎ এই বিবাহ কেবল ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাই নয়; বরং নবুয়তের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ঐশী নির্দেশনার পালনও বটে, কিন্তু এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ বিষয় হলো আয়িশা (রা) নিজের সম্মতি জ্ঞাপন করেছে এই বিবাহ সম্পর্কে।

এখন আসতে পারে উনার বয়স নিয়ে আলোচনা, গ্রহণযোগ্য সূত্রে প্রমাণ পাওয়া যায় আয়িশা (রা) বলেছেন,

যখন একজন মেয়ে নয় বছর বয়সে পৌছায় তখন সে একজন মহিলা হয়ে যায়।

(আবুবকর ইবনুল আরাবী আলমালিকী বলেছেন এর মানে হল সহবাসের উপযুক্ত হওয়া)[21]انظر : تنقيح التحقيق لابن عبد الهادي (بتحقيق سامي و الخباني، 4/324) و الشرح الكبير علی المقنع لابن أبي عمر (المنار،7/388) و المغني لابن قدامة (بتحقيق التركي و الحلو، 9/404) و الفروع لابن مفلح (بتحقيق عبد الله التركي،3/283) و المبدع شرح المقنع لابن مفلح (دار الكتب العلمية، 6/98) و الروض المربع بشرح زاد المستقنع لمنصور البهوتي (دار ركائز، 3/86) و كشاف القناع عن متن الإقناع لمنصور البهوتي (وزارة العدل،11/253) و شرح دليل الطالب لعبد الله المقدسي (بتحقيق أحمد الجماز ،3/223) و معونة أولي النهی شرح منتهی الإرادات لابن النجار (بتحقيق عبد الملك دهيش ،9/45) و العدة شرح العمدة لبهاء الدين المقدسي (دار الحديث، صفحة 393-394) و شرح الزركشي الحنبلي علی مختصر الخرقي (دار عبيكان، 5/83 ) و مطالب أولي النهی في شرح غاية المنتهی للرحيباني (المكتب الإسلامي ،5/53) و الفوائد المنتخبات في أخصر المختصرات لعثمان ابن جامع (مؤسسة الرسالة،3/281) و هداية الراغب لشرح عمدة الطالب لابن قائد (دار ركائز ، 2/414) …..إلخ , عارضة الأحوذي لأبي بكر ابن العربي (دار الكتب العلمية،5/24)

একজন মানুষ নিজের বেলায়ও যেটা সত্য সেটার পক্ষেই বেশি কথা বলবে এটাই স্বাভাবিক, আর এই হাদিস দ্বারা আমরা বুঝতেই পারে তিনি ৯ বছর বয়সেই নিজেকে উপযুক্ত মনে করতেন। আর তিনি যে আসলেই উপযুক্ত ছিলেন তা বুঝা যায় বর্তমান সময়ে যে অল্প বয়সে বিবাহের সমস্যা সমূহ বর্ণনা করা হয় সেরকম কোন প্রকারের সমস্যা আয়শা (রা) এর মধ্যে পাওয়া যায় না, যা স্বাভাবিক ভাবেই প্রমান করে তিনি অনুপযুক্ত ছিলেন না।

১৪. আয়িশা (রা.)-এর বিবাহ কি তাঁর পরিবারের অনিচ্ছার বিরুদ্ধে হয়েছিল?

এখানে কিছু বর্ণনা একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র দেয়। খাদিজা (রা.)-এর মৃত্যুর পর খাওলা বিনতে হাকীম রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বিবাহের পরামর্শ দেন।

খাদিজা (রা.) ইন্তেকাল করার পর উসমান ইবনু মাজউন (রা.)-এর স্ত্রী খাওলা বিনতে হাকীম (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি বিবাহ করবেন না?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কার সঙ্গে?”

খাওলা বললেন, “আপনি চাইলে কুমারী, আর চাইলে বিধবা নারীকে বিবাহ করতে পারেন।” রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, “কুমারী কে?”

তিনি বললেন, “আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তির কন্যা – আয়িশা বিনতে আবু বকর।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আর বিধবা কে?”

খাওলা বললেন, “সাওদা বিনতে যামআ। তিনি আপনার প্রতি ঈমান এনেছেন এবং আপনি যা বলেন, তা অনুসরণ করেন।” রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “তাহলে তুমি যাও এবং তাদের উভয়ের ব্যাপারে আমার পক্ষ থেকে কথা বলো।”

এরপর খাওলা (রা.) আবু বকর (রা.)-এর বাড়িতে গেলেন। তিনি উম্মে রুমান (রা.)-কে বললেন, “হে উম্মে রুমান! আল্লাহ আপনাদের জন্য কী কল্যাণ ও বরকত নিয়ে এসেছেন, জানেন?”

উম্মে রুমান জিজ্ঞেস করলেন, “কী সেটা?” খাওলা বললেন, “আল্লাহর রাসূল ﷺ আমাকে আয়িশার জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে পাঠিয়েছেন।” উম্মে রুমান বললেন, “আবু বকর আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো।”

আবু বকর (রা.) এলে খাওলা তাঁকে বললেন, “হে আবু বকর! আল্লাহ আপনাদের জন্য কী কল্যাণ ও বরকত নিয়ে এসেছেন, জানেন?” তিনি বললেন, “কী সেটা?” খাওলা বললেন, “আল্লাহর রাসূল ﷺ আমাকে আয়িশার জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে পাঠিয়েছেন।”

আবু বকর (রা.) বললেন, “সে কি তাঁর জন্য উপযুক্ত হবে? সে তো তাঁর ভাইয়ের মেয়ে!” তখন খাওলা (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে ফিরে গিয়ে আবু বকর (রা.)-এর কথাটি জানালেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “তুমি তাঁর কাছে ফিরে গিয়ে বলো, ‘আমি তোমার ভাই, আর তুমি আমার ইসলামের ভাই; আর তোমার মেয়ে আমার জন্য বিবাহযোগ্য।’”

খাওলা ফিরে গিয়ে তাঁকে এ কথা জানালেন। আবু বকর (রা.) বললেন, “একটু অপেক্ষা করো।” এরপর তিনি বের হয়ে গেলেন। উম্মে রুমান (রা.) বললেন, “মুতইম ইবনু আদী তো আগে তাঁর ছেলের সঙ্গে আয়িশার বিয়ের কথা বলেছিল।”

আবু বকর (রা.) মুতইম ইবনু আদীর কাছে গেলেন। তাঁর কাছে তখন তাঁর স্ত্রী উম্মুল ফাতি উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, “হে আবু কুহাফার পুত্র! তুমি যদি তোমার মেয়েকে আমাদের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দাও, তাহলে হয়তো তুমি আমাদের ছেলেকে তোমার ধর্মে প্রবেশ করিয়ে দেবে এমন আশঙ্কা আমাদের আছে।”

আবু বকর (রা.) মুতইমকে জিজ্ঞেস করলেন, “সে কি এ কথাই বলছে?” মুতইম বললেন, “হ্যাঁ, সে এ কথাই বলছে।” তখন আবু বকর (রা.) সেখান থেকে বের হয়ে এলেন। এভাবে আল্লাহ তাঁর অন্তর থেকে মুতইমের সঙ্গে পূর্বের সেই বিয়ের প্রতিশ্রুতি নিয়ে থাকা বিষয়টি দূর করে দিলেন।

এরপর তিনি ফিরে এসে খাওলা (রা.)-কে বললেন, “আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে আমার কাছে ডেকে আনো।” খাওলা তাঁকে ডাকলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ আয়িশা (রা.)-এর সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন করলেন। তখন আয়িশা (রা.)-এর বয়স ছিল ছয় বছর।

এরপর খাওলা (রা.) সাওদা বিনতে যামআ (রা.)-এর কাছে গেলেন। তিনি বললেন, “আল্লাহ তোমার জন্য কী কল্যাণ ও বরকত নিয়ে এসেছেন, জানো?” সাওদা (রা.) বললেন, “কী সেটা?” খাওলা বললেন, “আল্লাহর রাসূল ﷺ আমাকে তোমার জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে পাঠিয়েছেন।” সাওদা (রা.) বললেন, “আমি তো এতে আনন্দিত। তুমি আমার বাবার কাছে গিয়ে বিষয়টি বলো।”… … … এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর কাছে এলেন এবং তিনি সাওদা (রা.)-এর সঙ্গে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বিবাহ সম্পন্ন করে দিলেন। … …  …

আয়িশা (রা.) বলেন: “এরপর আমরা মদিনায় এলাম এবং খাজরাজ গোত্রের বনু হারিসের এলাকায়, আস-সুনহে অবস্থান করলাম। একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের বাড়িতে এলেন। তাঁর কাছে আনসারদের কয়েকজন পুরুষ ও নারীও উপস্থিত ছিলেন।

আমার মা আমার কাছে এলেন। তখন আমি দুটি খেজুরগাছের মাঝখানে ঝোলানো দোলনায় দোল খাচ্ছিলাম। তিনি আমাকে দোলনা থেকে নামিয়ে দিলেন। তখন আমার মাথায় ছোট ছোট চুল ছিল। তিনি আমার চুল আঁচড়ে গুছিয়ে দিলেন এবং কিছু পানি দিয়ে আমার মুখ মুছে দিলেন। এরপর আমাকে সঙ্গে নিয়ে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তখন আমি হাঁপাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পর আমার শ্বাস স্বাভাবিক হলে তিনি আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন।

আমি দেখলাম, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের ঘরে একটি খাটের ওপর বসে আছেন এবং তাঁর কাছে আনসারদের কয়েকজন পুরুষ ও নারী উপস্থিত রয়েছেন। আমার মা আমাকে তাঁর কোলে বসিয়ে বললেন, ‘এরা তোমার পরিবার। আল্লাহ তাদের মধ্যে তোমার জন্য বরকত দান করুন এবং তোমার মধ্যে তাদের জন্য বরকত দান করুন।’

এরপর পুরুষ ও নারীরা উঠে চলে গেলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের ঘরেই আমার সঙ্গে দাম্পত্য জীবন শুরু করলেন। আমার জন্য কোনো উট জবাই করা হয়নি, কোনো ছাগলও জবাই করা হয়নি। পরে সা‘দ ইবনু উবাদা (রা.) আমাদের জন্য একটি বড় পাত্রে খাবার পাঠালেন। তিনি যখন তাঁর স্ত্রীদের কাছে পালাক্রমে যেতেন, তখন এমন খাবার রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছেও পাঠাতেন। আর সেদিন আমার বয়স ছিল নয় বছর।”[22]মুসনাদে আহমাদ হাদিস ২৫৭৬৯; সনদ হাসান – https://al-hadees.com/musnad-ahmed/25769

https://shamela.ws/book/25794/21672

আয়িশা (রা.)-এর পিতা আবু বকর (রা.) প্রথমে একটি প্রশ্ন তুলেছিলেন—তিনি তো ভাই; তাহলে আয়িশা কী বিবাহের জন্য ঠিক হবে কিনা? এর জবাবও রাসুলুল্লাহ স্পষ্ট করে দেন,

আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে ’আয়িশাহ (রা)-এর বিয়ের পয়গাম দিলেন। আবূ বকর (রা) বললেন, আমি আপনার ভাই। নবী ﷺ বললেন, তুমি আমার আল্লাহর দ্বীনের এবং কিতাবের ভাই। কিন্তু সে আমার জন্য হালাল।[23]সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) হাদিস ৫০৮১ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=29644

এই হাদিসের শরাহ/ ব্যাখ্যায়, ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) বলেন:

وقول أبي بكر إنما أنا أخوك حصر مخصوص بالنسبة إلى تحريم نكاح بنت الأخ، وقوله ﷺ في الجواب أنت أخي في دين الله وكتابه إشارة إلى قوله تعالى ﴿إنما المؤمنون إخوة﴾ ونحو ذلك، وقوله وهي لي حلال معناه وهي مع كونها بنت أخي يحل لي نكاحها لأن الأخوة المانعة من ذلك أخوة النسب والرضاع لا أخوة الدين.

আবু বকর (রা.)-এর “আমি তো আপনার ভাই”—এই কথাটি বিশেষ একটি প্রসঙ্গের মধ্যেই প্রযোজ্য ছিল; অর্থাৎ ভাইয়ের মেয়েকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন। আর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর উত্তরে যখন বললেন, “তুমি আল্লাহর দ্বীন ও তাঁর কিতাবের দৃষ্টিতে আমার ভাই”, তখন এর মাধ্যমে তিনি আল্লাহ তাআলার এই বাণীর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন:

“মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।” — সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১০

অনুরূপ আরও আয়াত ও বর্ণনায় মুমিনদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের কথা এসেছে। আর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর “তিনি আমার জন্য হালাল”— এই কথার অর্থ হলো: আয়িশা (রা.) যদিও তাঁর ভাইয়ের মেয়ে, তবুও তিনি তাঁকে বিয়ে করতে পারেন; কারণ যে ভ্রাতৃত্বের কারণে কোনো নারীকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ হয়, তা হলো বংশগত ভ্রাতৃত্ব অথবা দুধ-সম্পর্কের ভ্রাতৃত্ব—ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ব নয়।

বদর উদ্দিন আইনি (রহ) বলেন:

قوله: (إنما أنا أخوك) كأن أبا بكر، رضي الله تعالى عنه، أعتقد أنه لا يحل له أن يتزوج ابنته للمؤاخاة والخلة التي كانت بينهما، فاعلمه صلى الله عليه وسلم أن أخوة الإسلام ليست كأخوة النسب والولادة فقال: إنها لي حلال بوحي الله تعالى

‘আমি তো আপনার ভাই’—আবু বকর (রা.)-এর এই কথার দ্বারা মনে হয়, তিনি ধারণা করেছিলেন যে, তাঁদের মধ্যে যে ভ্রাতৃত্ব ও ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তার কারণে তাঁর মেয়েকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্য বিবাহ করা বৈধ নয়। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে বুঝিয়ে দিলেন যে, ইসলামের ভ্রাতৃত্ব বংশগত ও জন্মসূত্রের ভ্রাতৃত্বের মতো নয়। তাই তিনি বললেন: ‘তিনি আমার জন্য হালাল—আল্লাহ তাআলার ওহির মাধ্যমে।’

এখানে পরিবারের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতির বিষয়টি আরো ফুটে উঠে ভিন্ন একটি বর্ণনায়, আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

আমার মা আমাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর সংসারে পাঠাতে চাচ্ছিলেন বিধায় আমার দৈহিক পরিপুষ্টির জন্য চিকিৎসা করাতেন। কিন্তু তা কোন উপকারে আসলো না। অবশেষে আমি তাজা খেজুরের সাথে শসা মিশিয়ে খেলাম এবং উত্তমরূপে দৈহিক পরিপুষ্টি লাভ করলাম।[24]ইবনে মাজাহ হাদিস ৩৩২৪ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=44288

অর্থাৎ এখানে ঘটনাটিকে পরিবারের অসম্মতির দিকে দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। বরং আয়িশা (রা)-এর জন্য রাসুলের পুর্বেই প্রস্তাব এসেছিল। আবু বকর (রা) তাদেরকে কথা দেওয়ায় প্রথমে সেই প্রস্তাবকারীদের সাথে সাক্ষাৎ করে। কিন্তু দ্বীন ও মুসলিমদেরকে নিয়ে তাদের নেতিবাচক ধারণার কারণে তিনি সেখান থেকে চলে আসেন যা আমরা প্রথম বর্ণনাটিতেই খুব ভালোভাবে দেখেছি। এরপর তিনি রাসুলের সঙ্গে নিজের কন্যার বিবাহ সম্পন্ন করেন। এই ঘটনা বরং সেই যুগের প্রেক্ষাপটে এমন বিবাহের স্বাভাবিক বিষয় হওয়া, বিয়ের প্রস্তাব, আলোচনা এবং পরিবারের স্বাধীন সিদ্ধান্তের একটি সুস্পষ্ট বিবরণ বহন করে।

১৫. সেই সমাজ কি এই বিবাহকে অস্বাভাবিক মনে করেছিল?

এ প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা একটু আগেও দেখেছি পরিবার পরিজন বিবাহের প্রস্তাবটিকে কতটা স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছিল। আমরা চাইলে এই নিয়ে অমুসলিমদের লিখিত ঐতিহাসিক দলিলাদিগুলোও পেশ করতে পারতাম, যেখানে ততকালীন সময়ে এমন বিবাহ সমুহকে খুবই স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তবে আমরা হাদিস নিয়ে আলোচনা করছি বিধায় আর সেগুলো টানছি না। আধুনিক সমাজের কোনো একটি মানদণ্ডকে সরাসরি সপ্তম শতকের আরব সমাজে বসিয়ে দিয়ে ইতিহাস বিচার করা পদ্ধতিগতভাবে দুর্বল। এটিকে ইংরেজিতে Presentism Fallacy বলা হয়৷

যাইহোক আয়িশা (রা.)-এর বিবাহের বর্ণনায় আমরা তাঁর পরিবার, নারী আত্মীয় এবং আনসার নারীদের অংশগ্রহণের কথা দেখি। তাঁকে নবী ﷺ-এর ঘরে নেওয়ার সময় তাঁর মা তাঁকে প্রস্তুত করে নিয়ে যান এবং সেখানে উপস্থিত নারীরা তাঁকে শুভকামনা জানান।

আয়িশা (রাঃ) বলেনঃ সে সময় আমি দোলনার উপর ছিলাম এবং আমার সাথীরাও আমার সাথে ছিলেন। তারা আমাকে এমন একটি ঘরে নিয়ে যায়, যেখানে আনসার মহিলাগণ উপস্থিত ছিলেন। তারা বলেনঃ কল্যাণ ও বরকতময় হোক।[25]সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) হাদিস ৪৮৫২ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=36958

অর্থাৎ প্রাথমিক মুসলিম সমাজের নিজস্ব নথিতে ঘটনাটিকে সেই সমাজে একটি অস্বাভাবিক, গোপন বা অপরাধমূলক ঘটনা হিসেবে চিত্রিত করা হয়নি। এমনকি রাসুলের শত্রুদের পক্ষ হতেও এমন কিছু আসে নি৷ অথচ তারা রাসুলকে অপমান অপদস্ত করতে কোন সুযোগ হাতছাড়া করতে রাজি ছিল না।

১৬. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যৌনতা সম্পর্কে আয়িশা (রা) এর মন্তব্য

একটি বর্ণনায়,

মুহাম্মাদ ইবনুল মুসান্না (রহঃ) ….. আসওয়াদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ও মাসরুক (রহঃ) আয়িশাহ (রাযিঃ) এর নিকট গেলাম এবং তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, সওমের অবস্থায় রসূলুল্লাহ ﷺ কি তার স্ত্রীদেরকে স্পর্শ করতেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, করতেন। তবে তিনি তার কামপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যাপারে তোমাদের সকলের চেয়ে অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন ছিলেন অথবা বললেন, তোমাদের মধ্যে কে এমন আছে, যে তার প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম?[26] সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) হাদিস ২৪৬৯ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=49553

এটি অত্যন্ত ব্যক্তিগত দাম্পত্য জীবনের একটি বিবরণ। এই ধরনের বর্ণনা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখিয়ে দেয় যে, ইসলামী উৎসগুলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বৈবাহিক জীবনকে আড়াল করেনি। বরং তাঁর স্ত্রীদের মাধ্যমেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বহু সূক্ষ্ম বিবরণও সংরক্ষিত হয়েছে।

উপরোক্ত আলোচনাগুলোর ভিত্তিতে যদি আমরা ইসলাম বিরোধীদের অভিযোগকে উল্টে প্রশ্ন দাড় করাই যে,

যদি আয়িশা (রা.) সত্যিই তাঁর স্বামীকে ঘৃণা, অপছন্দ করতেন, তাঁর সঙ্গে থাকতে না চাইতেন এবং তাঁর জীবনকে নিছক নিপীড়ন হিসেবে দেখতেন – তাহলে তাঁর নিজের সংরক্ষিত সাক্ষ্যগুলোতে আমরা এত ভালোবাসা, ঘনিষ্ঠতা, সম্মান, আনন্দ, ঈর্ষা দেখতে পাই কেন? অসন্তুষ্টি প্রকাশ পায় এমন মন্তব্য তেমন পাওয়া যায় না কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব এখন অভিযোগকারীর।

Citation is loading...

Footnotes

Footnotes
1 মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং-২৬২২৬, ১৮/১৯৯ – https://islamqa.info/ar/answers/299190/
2 সহিহ মুসলিম, (হাদিস ফাউন্ডেশন) ৬৮৫০ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=19173
3 মুসনাদ আবূ ইয়া’লা, ৬/৪৯২, হাদীস নম্বর ৪৫৭৯ – https://shamela.ws/book/181/3789
4 মিরকাতুল মাফাতীহ শরহু মিশকাতিল মাসাবীহ ৯/৩৮৫৬, হাদিস ৫৯৭১
5 সহিহ বুখারী, (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) নাম্বারঃ ৪০১৯ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=4289
6 সহিহ মুসলিম, (হাদিস একাডেমি) নাম্বারঃ ৬১৯২ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=53291
7 আবু দাউদ হাদিস ২২০০ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=34308
8 সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) হাদিস ৩৫৪৮ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=13159
9 সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), হাদিস ৬০৬০ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=15930
10 সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) হাদিস ৫২২৮ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=29791
11 সুনানুল কুবরা নাসাই ৮৯০২ সনদ (হাসান) – https://shamela.ws/book/8361/12395

সনদের তাহকিক: সীলসিলা সহীহাহ – https://shamela.ws/book/9442/5627

12 আবূ দাউদ (আলবানী একাডেমী) হাদিস ২৫৭৮
13 সহিহ মুসলিম, (হাদিস একাডেমি) নাম্বার ৫৯৪৪ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=53041
14 সুনান আত তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), হাদিস ২০২২ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=37377
15 মুসনাদে আহমদ, হাদিস ২৫৬০১ – https://al-hadees.com/musnad-ahmed/24601
16 সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) হাদিস ৩৩০৩
17 সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) হাদিস ৩৫৭৪ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=50657
18 ‘নবিজি দেখতে যেমন ছিলেন’, আল্লামা ইব্‌নে কাছীর (রহ) ; শামায়েলে তিরমিযী ; নবীজির সা. সৌন্দর্য
19 সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) হাদিস ৬০০৪ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=30601
20 সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) হাদিস ৬০৬৫ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=15935
21 انظر : تنقيح التحقيق لابن عبد الهادي (بتحقيق سامي و الخباني، 4/324) و الشرح الكبير علی المقنع لابن أبي عمر (المنار،7/388) و المغني لابن قدامة (بتحقيق التركي و الحلو، 9/404) و الفروع لابن مفلح (بتحقيق عبد الله التركي،3/283) و المبدع شرح المقنع لابن مفلح (دار الكتب العلمية، 6/98) و الروض المربع بشرح زاد المستقنع لمنصور البهوتي (دار ركائز، 3/86) و كشاف القناع عن متن الإقناع لمنصور البهوتي (وزارة العدل،11/253) و شرح دليل الطالب لعبد الله المقدسي (بتحقيق أحمد الجماز ،3/223) و معونة أولي النهی شرح منتهی الإرادات لابن النجار (بتحقيق عبد الملك دهيش ،9/45) و العدة شرح العمدة لبهاء الدين المقدسي (دار الحديث، صفحة 393-394) و شرح الزركشي الحنبلي علی مختصر الخرقي (دار عبيكان، 5/83 ) و مطالب أولي النهی في شرح غاية المنتهی للرحيباني (المكتب الإسلامي ،5/53) و الفوائد المنتخبات في أخصر المختصرات لعثمان ابن جامع (مؤسسة الرسالة،3/281) و هداية الراغب لشرح عمدة الطالب لابن قائد (دار ركائز ، 2/414) …..إلخ , عارضة الأحوذي لأبي بكر ابن العربي (دار الكتب العلمية،5/24
22 মুসনাদে আহমাদ হাদিস ২৫৭৬৯; সনদ হাসান – https://al-hadees.com/musnad-ahmed/25769

https://shamela.ws/book/25794/21672

23 সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) হাদিস ৫০৮১ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=29644
24 ইবনে মাজাহ হাদিস ৩৩২৪ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=44288
25 সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) হাদিস ৪৮৫২ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=36958
26 সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) হাদিস ২৪৬৯ – https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=49553
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Back to top button