ব্রাহ্মণ্যবাদ

ব্রাহ্মণ্যবাদ বনাম বৌদ্ধ ধর্মঃ মুসলিম পূর্ব ভারত

সংঘ পরিবারের তরফ থেকে একটা প্রপাগাণ্ডা ছড়ানো হয় যে ‘মুসলিম শাসন এখানে মারকাট রক্তপাত শিখিয়েছে,তার আগে এখানে এসব কিছু হতো না। সবাই শান্তিপূর্ণ বসবাস করতো।’

ইতিহাস কি বলে দেখা যাক।
মুসলমান যুগ শুরু হওয়ার আগে কি মারকাট এখানে হয়নি? অবশ্যই হয়েছে।

ব্রাহ্মণ্যবাদের সাথে বৌদ্ধদের সংঘাত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। কুমারিল ভট্ট তো সিদ্ধান্তই দিয়ে দিয়েছিলেন,
বৌদ্ধ মাত্রই বধ্য।’
ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাই বৌদ্ধ ও জৈন মঠ, স্তূপ ও বিহারের উপর হিন্দু রাজার আক্রমণ ও লুঠতরাজের দৃষ্টান্ত।
মৌর্য বংশের শাসন ধ্বংসকারী ব্রাহ্মণ রাজা পুষ্যমিত্র শুঙ্গ তাঁর বিশাল সেনাবাহিনীর সাহায্যে বৌদ্ধ স্তূপগুলি ধ্বংস করেন, বৌদ্ধ মঠগুলিকে পুড়িয়ে দেন, বর্তমান শিয়ালকোটে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের হত্যা করেন এবং ঘোষণা করেন, যে তাঁর কাছে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর মাথা এনে দিতে পারবে তাকে একশো স্বর্ণমুদ্রা দান করা হবে।

হিউয়েন সাঙ বলে গেছেন,

‘বাংলার গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক গয়ার বোধিবৃক্ষকে কেটে ফেলেন এবং স্থানীয় বৌদ্ধ মন্দির থেকে বুদ্ধমূর্তি অপসারণ করে তার স্থানে মহেশ্বরের মূর্তি স্থাপন করেন।[1]ডি এন ঝাঁ , এগেইন্সট দ্য গ্রেইনঃ নোটস অন আইডেন্টিটি

তাছাড়া,

❝সপ্তম শতকে রাজা হর্ষবর্ধন ব্রাহ্মণদের কারাগারে বন্দি করেছিলেন কারণ তারা কনৌজে বুদ্ধের সম্মানে নির্মিত স্তস্তম্ভ পুড়িয়ে দেয়।❞[2]কম্যুনালিজম এন্ড ইন্ডিয়াজ পাস্ট, আর এস শর্মা

❝ শৈবধর্মী হুন রাজা মিহিরকূল একাদশ শতকের শেষভাগে বহু বৌদ্ধ মঠ ধ্বংস করেন এবং বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের হত্যা করেন। তাৎপর্যপূর্ণ হল, বৌদ্ধ ও শৈবধর্মীদের মধ্যে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল তার মূলে ছিল মধ্য এশিয়াতে বাণিজ্য বিস্তারে বৌদ্ধ ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ। পরেও বিভিন্ন সময়ে এই বিরোধ প্রকাশিত হয়েছে।❞[3]ইমাজিনড রিলিজিয়াস কমিউনিটিস? এনসিয়েন্ট হিস্ট্রি এন্ড দ্য মডার্ন সার্চ ফর আ হিন্দু আইডেন্টিটি, রোমিলা থাপার ১৯৮৯

❝বৈদিক ব্রাহ্মণ্যবাদ ও বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে বিবাদ-বিসংবাদ এরই তাঁর ছিল যে ব্যাকরণবিদ পাণিনি তাদের মধ্যে শত্রুতাকে বর্ণনা করেছেন অহি-নকুলের দ্বন্দ্বের সাহায্যে।❞[4]কম্যুনাজিম এন্ড দ্য হিস্টোরিক্যাল লিগাসিঃ সাম ফাসেটস, রোমিলা থাপার: ১৯৯০

দক্ষিণ ভারতেও ধর্মীয় বিরোধ তীব্র ছিল। তামিলনাডুতে শৈব শাখা জৈন শ্রমণদের আক্রমণ চালিয়ে তাদের বিতাড়িত করে। কর্নাটকে বীরাশৈব বা লিঙ্গায়েতরা জৈন সন্ন্যাসীদের উপর নির্যাতন চালিয়ে এবং জৈন চিত্র ধ্বসে করে জৈন সন্ন্যাসীদের বিতাড়িত করে এবং বাণিজ্যের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে ও রাজার আনুকূল্য লাভ করে।[5]ইমাজিনড রিলিজিয়াস কমিউনিটিস? এনসিয়েন্ট হিস্ট্রি এন্ড দ্য মডার্ন সার্চ ফর আ হিন্দু আইডেন্টিটি, রোমিলা থাপার ১৯৮৯

ব্রাহ্মণ্যবাদ কীভাবে বৌদ্ধ স্তূপ, বিহার ও সন্ন্যাসীদের উপর আক্রমণ চালিয়েছে তার তাৎপর্যপূর্ণ বিবরণ পাওয়া যাবে ‘ডি এন ঝাঁ’র ‘এগেইন্সট দ্য গ্রেইনঃ নোটস অন আইডেন্টিটি’র দুটো পরিচ্ছেদে–

  • ‘ব্রাহ্মনিকাল ইনটলারেন্স ইন আর্লি ইন্ডিয়া’
  • ‘হোয়াটএভার হ্যাপেন্ড টু বুদ্ধিস্ট মনুমেন্টস’এ।

ঐতিহাসিক সুরজিৎ দাশগুপ্ত বাংলায় বৌদ্ধদের উপর ব্রাহ্মণ্যধর্মের অত্যাচারের বিস্তারিত বর্ননা করেছেন, তিনি বলেন,

❝বাংলার বৌদ্ধদের মতো দক্ষিণ ভারতের জৈনরাও রক্ষণশীল শৈব হিন্দুদের হাতে নিপীড়িত হয় এবং একবার একদিনে আট হাজার জৈনকে শূলে হত্যা করার কথা তামিল পুরাণেই উল্লিখিত হয়েছে। স্পষ্টতই এসময়টাতে ব্রাহ্মণ্য হিন্দুধর্ম পরমতসহিষ্ণুতার আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়েছিল। এ-জাতীয় অসহিষ্ণুতার সবচাইতে চমকপ্রদ দৃষ্টান্ত শ্রীরঙ্গমের পরম শৈবরাজা প্রথম কুলোত্তঙ্গ স্বাপন করে গেছেন-তাঁর প্রতাপে স্বয়ং রামানুজও তাঁর শিষ্যবৃন্দসহ ১০৯৬ খ্রস্টাব্দে মহীশূরের হুয়সাল রাজা বিষ্ণুবর্ধনের আশ্রয়ে পলায়ন করেন এবং তার পরে কুড়ি বছরের মধ্যে তিনি আর শ্রীরঙ্গমমুখো হননি।❞[6]ভারতবর্ষ ও ইসলাম, সুরজিৎ দাশগুপ্ত

সেন যুগে বখতিয়ার খিলজি আক্রমণ করলে বৌদ্ধরা তাদেরকে স্বাগত জানিয়েছিলো কারণ সেন তথা ব্রাহ্মণ্য আমলে বৌদ্ধ ও নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ছিলো নিপিড়ীত। বৌদ্ধরা তো মুসলমানদের ঈশ্বরের আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করেছিলো। রামাই পণ্ডিতের শূণ্যপুরাণে এর বিস্তারিত আলোচনা আছে।
স্বামী বিবেকানন্দের মতে জগন্নাথ মন্দির বৌদ্ধস্তূপের উপর বানানো হয়েছে।[7]দ্য সেজেস অফ ইন্ডিয়া, কমপ্লিট ওয়ার্কস অফ স্বামী বিবেকানন্দ, অদ্বৈত আশ্রম প্রকাশনা

এছাড়া ড. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত তার বই ‘বাঙ্গলার ইতিহাসের’ আর্যযুগ অধ্যায়ে এটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

মুসলিম-পূর্ব ভারতে মন্দির ধ্বংস নিয়ে পড়ুনঃ

Read More...  মন্দির ধ্বংসের সাতকাহন - বানোয়াট বনাম প্রকৃত ইতিহাস
Citation is loading...

Footnotes

Footnotes
1 ডি এন ঝাঁ , এগেইন্সট দ্য গ্রেইনঃ নোটস অন আইডেন্টিটি
2 কম্যুনালিজম এন্ড ইন্ডিয়াজ পাস্ট, আর এস শর্মা
3, 5 ইমাজিনড রিলিজিয়াস কমিউনিটিস? এনসিয়েন্ট হিস্ট্রি এন্ড দ্য মডার্ন সার্চ ফর আ হিন্দু আইডেন্টিটি, রোমিলা থাপার ১৯৮৯
4 কম্যুনাজিম এন্ড দ্য হিস্টোরিক্যাল লিগাসিঃ সাম ফাসেটস, রোমিলা থাপার: ১৯৯০
6 ভারতবর্ষ ও ইসলাম, সুরজিৎ দাশগুপ্ত
7 দ্য সেজেস অফ ইন্ডিয়া, কমপ্লিট ওয়ার্কস অফ স্বামী বিবেকানন্দ, অদ্বৈত আশ্রম প্রকাশনা
4 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Back to top button