
বৃদ্ধ আলেম শায়খ আবদুর রহমান তাঁর মাটির ঘরের বারান্দায় বসে ছিলেন। সন্ধ্যার আলো মিলিয়ে যাচ্ছে, দূরে নীলনদের জল রঙ বদলাচ্ছে — সোনালী থেকে রুপালী, রুপালী থেকে কালো।
তাঁর ছাত্র ইউসুফ হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
– “উস্তাদজি, একটা কথা মাথায় ঘুরছে। হাদিসে পড়লাম নীলনদের উৎপত্তি জান্নাতে।[1]মুসলিম ১৬৪, মিশকাতুল মাসাবিহ ৫৮৬২ কিন্তু আমি তো কখনো আকাশ থেকে পানি এসে নীলনদে পড়তে দেখিনি। ব্যাপারটা বুঝলাম না।”
শায়খ হাসলেন। বললেন,
– “বসো। একটা গল্প বলি। কল্পনা করো, এক মহাসমুদ্র আছে আকাশের ওপারে। সে সমুদ্র থেকে হাজার হাজার বছর আগে একটি ধারা বেরিয়ে এলো। সে ধারা পাথর ভেদ করলো, মাটির নিচ দিয়ে গেলো, পাহাড়ের বুক চিরে বেরিয়ে এলো — আর একদিন আফ্রিকার মাটিতে মাথা তুলল। সেই ধারাকে মানুষ চেনে ‘নীলনদ’ নামে।”
ইউসুফ বলল,
– “কিন্তু উস্তাদ, পানি তো আকাশ থেকে সরাসরি পড়েনি।”
শায়খ বললেন,
– “ঠিকই বলেছ। ইমাম নববী (রহ) বলেছেন — নদী সেই জান্নাতি উৎস থেকে বেরিয়ে আসে, তারপর আল্লাহ যেভাবে চান সেভাবে মাটির ভেতর দিয়ে পথ করে নেয়। পদ্ধতিটা আমাদের অজানা।”[2]শরহে মুসলিম ইমাম নববী ২/২২৫
শায়খ এবার সামনের চায়ের কাপটা তুলে ধরলেন।
– “ইউসুফ, এই চায়ের পানি কোথা থেকে এলো?”
– “নদী থেকে। তারপর পাইপে। তারপর কেটলিতে।”
– “ঠিক। কিন্তু মূল উৎস?”
ইউসুফ ভাবলো,
– “মেঘ, বৃষ্টি, পাহাড়ের বরফ।”
– “এখন এই পানিকে কি তুমি ‘মেঘের পানি’ বলবে?”
-“না, এটা তো এখন চা।”
শায়খ মাথা নাড়লেন।
– “শেখ ইবনে উসাইমিন (রহ) ঠিক এই কথাই বলেছেন। যখন জান্নাতের সেই নদী পৃথিবীতে নামলো, সে এই পৃথিবীর নিয়ম মেনে নিলো। হয়ে গেলো পৃথিবীর নদী। তার উৎস জান্নাতি, কিন্তু তার রূপ এখন দুনিয়াবি।”[3]শারহে রিয়াদ আস সলীহিন ৬/৬৭৪
“আচ্ছা, তুমি কি আজওয়া খেজুর খেয়েছ কখনো?” শায়খ জিজ্ঞেস করলেন।
– “হ্যাঁ, মদিনা থেকে আনা। অসাধারণ স্বাদ।”
– “হাদিসে আছে — আজওয়া জান্নাতের ফল। কিন্তু সেটা কি জান্নাত থেকে তুলে এনে বিক্রি হচ্ছে মদিনার বাজারে?”
ইউসুফ হেসে বললো,
– “না, সেটা তো মদিনার বাগানে জন্মায়।”
– “তাহলে?”
ইউসুফ ধীরে ধীরে বুঝতে লাগলো। শায়খ বললেন,
– “ইবনে কাসির (রহ) বলেছেন — এর অর্থ হলো সাদৃশ্য। আজওয়া জান্নাতের ফলের মতো বিশেষ। নীলনদ জান্নাতের নহরের মতো পবিত্র, পরিচ্ছন্ন, প্রবাহমান। একটা মর্যাদার ঘোষণা।”
শায়খ একটু থামলেন। তারপর বললেন,
– “কোন কোন আলেম বলেছেন এমনও হতে পারে জান্নাতেও ফুরাত ও নীল নামে দু’টি নহর আছে।”[4]মিশকাতুল মাসাবিহ ৫৮৬২ নাম্বার হাদিসের ব্যাখ্যা
আরেকটা হাদিসের কথা ভাবো। রাসূল (সা.) বলেছেন — ‘জ্বর হলো জাহান্নামের তাপ। তাকে পানি দিয়ে ঠাণ্ডা করো।’ এর মানে কি জাহান্নামের আগুন আমার শরীরে ঢুকেছে?”
ইউসুফ মাথা নাড়লো,
– “না, সেটা একটা উপমা। তীব্রতার বর্ণনা।”
– “হ্যাঁ। ভাষার এই শক্তি বোঝার নামই তাফসির।”[5]আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১/৮৩
ইউসুফ নীলনদের ধারে গেলো একা। অন্ধকারে নদীর শব্দ শুনলো।
সে ভাবলো —
এই নদী হয়তো কোনো এক রহস্যময় পথে জান্নাতের সাথে যুক্ত। সে পথ চোখে দেখা যায় না। আকাশ থেকে পানি পড়তে হবে, এমন কোনো শর্ত নেই। আল্লাহর কুদরত মাটির ভেতর দিয়েও পথ বানাতে পারে। আর হয়তো — এই নদীর পানির স্বাদে, প্রবাহে, উর্বরতায় এমন কিছু আছে যা জান্নাতের ছোঁয়া বহন করে।
তিনজন বড় আলেমের তিনটি ব্যাখ্যা মাথায় ঘুরলো —
– নববী (রহ): উৎস জান্নাতি, পথ অজানা
– ইবনে উসাইমিন (রহ): রূপ বদলে দুনিয়াবি হয়েছে
– ইবনে কাসির (রহ): মর্যাদার উপমা
তিনটিই সম্ভব। তিনটিই সুন্দর।
নীলনদ বয়ে চলে। হাজার বছর ধরে। উৎস নিয়ে তর্ক করে না। শুধু বয়ে যায় — মাটি সিক্ত করে, ফসল ফোটায়, মানুষ বাঁচায়।
হয়তো সেটাই তার আসল পরিচয়।




