আরাকান নিয়ে আমাদের অ্যাক্টিভিজম যেমন হবে

উম্মাহর বেহাল দশা, আরাকানে রোহিঙ্গা বোনকে বিবস্ত্র করে লাঞ্ছিত করা, সাধারণ জনগণকে গলা কেটে হত্যা করা-এরকম বেশ কিছু বিষয় মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। যখন আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই শুরু করার কথা, তখন আমরা ‘ফিলিস্তিন নাকি আরাকান?’ – এই প্রশ্নে বিভাজিত হয়ে গিয়েছি। এমতাবস্থায় কিছু বিষয় স্পষ্ট করা এবং আমাদের করণীয় তুলে ধরাকে জরুরি মনে করছি।
প্রথমে সংক্ষেপে প্রেক্ষাপটটা বলতে চাই। ২০১৬-১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন (আরাকান) রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর স্টীমরোলার চালায় দেশটির সামরিক বাহিনী এবং পুলিশ। হত্যাকান্ড, গণধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটে, বাদ যায়নি শিশুরাও। আর এটা একদিনের কাহিনী না, এটাই প্রথম না। এর আগেও রোহিঙ্গাদেরকে উচ্চ শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, দুইয়ের বেশি সন্তান না নেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে স্বাক্ষর করানো এবং জমি দখলসহ নানাভাবে তাদের উপর নিপীড়ন চলতো, যার ধারাবাহিকতায় আজও তারা শহিদ হচ্ছেন।
এতদিন ধরে পরিস্থিতি খারাপ, তবুও ভূ-রাজনীতিতে তা যথেষ্ট আলোচিত নয়। নির্বিচারে নিপীড়ন যেমন চলেছিল, তেমনি এ দেশে যারা এসেছিল তাদেরকে নিয়ে বিভিন্ন এনজিও ও খ্রিস্টান মিশনারীরা নোংরা খেলায়ও মেতেছিল। এককথায়, রোহিঙ্গা মুসলিমরা বিভিন্ন দিক দিয়ে আজ আহত-বিপর্যস্ত। কিন্তু তাদের ব্যাপারে আমাদের কার্যক্রম নেই বললেই চলে, যেমনটা আলাপ হয়েছে ফিলিস্তিনিদের ব্যাপারে।
তবে এখানে একটা ব্যাপার পরিষ্কার করতে চাই। পুরো মুসলিম উম্মাহ হলো এক দেহ। আর এই উম্মাহর প্রতিটা অংশই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এদেশের একজন সত্যিকার মুসলিমের ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী জনগণ ও সকল গোষ্ঠীর প্রতি যেমন পূর্ণ সমর্থন থাকবে, তেমনি আবেগ থাকবে প্রতিবেশী রাখাইনে নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতিও।
কিন্তু দুটো দৃশ্যপট ভিন্ন। ভূ-রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং ভবিষ্যতের ঘটনাপ্রবাহের কারণে মাসজিদুল হারাম, মাসজিদে নববী এবং বায়তুম মাকদিস সংলগ্ন অঞ্চলগুলোর তাৎপর্য একটু বেশিই। সেকারণেই ফিলিস্তিনের ব্যাপারটা তুলনামূলক ভিন্ন। এছাড়াও ঐ ভূখন্ডের জনগণের ব্যাপারে যেমন যথেষ্ট তথ্য পাওয়া যায়, তেমনি তাদের ভাষা আরবি হওয়ায় দ্রুতই বিশ্বের বড় একটা জনগোষ্ঠীর কাছে তাদের (হামাসসহ) বার্তা পৌঁছে যায়। এছাড়াও কয়েক দশক ধরেই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে তাদের নিয়ে যথেষ্ট আলাপ হয়েছে।
কিন্তু রাখাইনের (আরাকানের) জনগণের ভাষা না কোনো আন্তর্জাতিক ভাষা, আর না কোনো বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ভাষা। ভৌগলিকভাবেও মিয়ানমার কোনো কেন্দ্রভূমি বা তৎসংশ্লিষ্ট অঞ্চলে অবস্থিত নয়। এসব কারণেও তাদের ব্যাপারে পর্যাপ্ত তথ্যের বিস্তার ঘটেনি, তৈরি হয়নি কার্যকর ন্যারেটিভ। লড়াইয়ের শুরুটা এখান থেকেই।
হ্যাঁ, আমাদেরকেই এই ন্যারেটিভ তৈরির দায়িত্ব নিতে হবে। তবে এখানে একটা কথা না বললেই নয়। আমাদের কথা, দাওয়াহ, অ্যাক্টিভিজম-সবকিছুই হবে ইসলামকে কেন্দ্র করে। আমরা গাযার কথা শুধুমাত্র মানবিকতার খাতিরে বলি না। আর বাম-সেক্যুলার গোষ্ঠীও ফিলিস্তিন নিয়ে অ্যাক্টিভিজম করে, তবে তাদের কাজ দিন শেষে সেই বস্তাপচা পশ্চিমা ফ্রেমিং এর মধ্যেই থাকে।
আরাকান ইস্যুতেও হয়ত আপনি এদেশের সুশীল সমাজকে এক সময় কথা বলতে দেখবেন হালকা-পাতলা। এমনকি প্রফেসর ইউনূস এবং জাতিসংঘও মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে ফেলেছে। কিন্তু আমাদের কথা ও কাজের ধরণ হবে ভিন্ন, লক্ষ্য হবে প্রশস্ত। আমরা যদি ভাবি, তাদের সাথে গলা মিলালেই সমাধান হয়ে যাবে, তবে তা অসম্ভব। কোনো সেক্যুলার বা তাগুত গোষ্ঠীর সাথে সমন্বয় করে আমরা শুদ্ধ ন্যারেটিভ তৈরি করতে পারব না।
তাই এক কথায়, আরাকান ইস্যুতে আমাদেরকে নিয়ত শুদ্ধ করে বেশ কিছু মৌলিক কাজ করা লাগবে। কার মতামতকে কোন কাজে লাগাচ্ছি-এটা বুঝতে শিখতে হবে। হরে-দরে কিছু একটা নিয়েই তার উপর কাজ শুরু করে দিলে সাময়িক হাইপ তৈরি হলেও সামষ্টিক কল্যাণ নিশ্চিত হবে না। পাশাপাশি কাজগুলো ধারাবিকভাবে করে যেতে হবে; দুদিনের আলোচনায় যেন শেষ না হয়।
আরেকটা কথা বলে নিই। এসব কাজ করতে গেলে গোয়েন্দা সংস্থা ফিতনা তৈরির চেষ্টা করবেই। তারা প্রথমে ফাঁদ তৈরি করবে এবং সেখানে আপনাকে ফেলে আরাকানে নিয়ে যাওয়ার নাম করে কাশিমপুরে পাঠাবে। শুধু এখানেই শেষ না, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পালিত কিছু প্রতিনিধি আছে, যারা প্রকৃত ইসলামপন্থীদের বেশ ধরে ন্যারেটিভ দাঁড় করাতে চায়। কিন্তু তাদের ন্যারেটিভ একদিকে জাতীয়তাবাদমুখী, অন্যদিকে ওয়ার অর টেররকে সমর্থনকারী। তাই বিশুদ্ধ কাজের আউটপুট পেতে হলে অতি উৎসাহী কার্যক্রম এড়িয়ে চলে এসব চক্রান্ত থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
যাহোক, এবার প্রশ্ন হলো, কীভাবে কী করব? যখন আমরা কথা বলব, লিখব, তখন সেগুলো যেন অথেনটিক ও ভেরিফাইড সোর্স থেকে ক্রস-চেক করার মাধ্যমে সংগৃহীত হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে যাতে করে পরবর্তীতে আমাদের কথা-লেখাই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এর মানে হলো, আগে পড়তে হবে। রোহিঙ্গা এবং রাখাইন (আরাকান) নিয়ে যেসকল নির্ভরযোগ্য রিপোর্ট, বই ও গবেষণাপত্র রয়েছে, সেগুলোই হবে আমাদের প্রাথমিক রিসোর্স।
এবার এই রিসোর্সগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য জনগণের বুঝার উপযোগী করে অনুবাদ করতে হবে। এগুলো নিয়ে একাডেমিক আলোচনা যেমন দরকার, তেমনি প্রয়োজন সহজ-সরল তথ্যগুলোকে ফ্যাক্ট আকারে তুলে ধরা। যারা ভূ-রাজনীতি বা মুসলিম উম্মাহর দুর্ভোগ নিয়ে লিখছেন, তাদেরকে আর্টিকেল বা ব্লগপোস্ট তৈরি করতে হবে। যারা ভিডিও বানিয়ে থাকেন, তাদেরকে ‘ভিডিও ডকুমেন্টারি’ বানাতে হবে।
এছাড়াও ছোট ছোট রিল ও ইনফো-গ্রাফিকের মাধ্যমে অল্পের মধ্যে অনেক কিছু তুলে ধরা যেতে পারে, যেগুলোর সাথে তরুণপ্রজন্ম নিজেদেরকে ভালোমতো কানেক্ট করতে পারবে। পাশাপাশি এক্স (টুইটার)-এ সক্রিয় হওয়া জরুরি। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, গাযা ইস্যু, ইরান-ইজরায়েল সংঘাত-এসব কিছুর আলোচনা তুঙ্গে ওঠার পেছনে এক্সের বিশেষ ভূমিকা ছিল।
তবে উল্লিখিত কাজগুলো দলগত হলে উত্তম হবে। একজনই সব ধরণের কন্টেন্ট বানানোর চাইতে একটা টীম তৈরি করে কাজ ভাগ করে নিয়ে এগোলে আউটপুটটা সর্বোচ্চ হবে। ইতোমধ্যে যেসকল প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠেছে, তারা এই দায়িত্বগুলো নিতে পারে। ফেসবুক পেইজগুলো সিরিজ আকারে পোস্ট করবে এবং ইউটিউব চ্যানেলগুলো ধারাবাহিক পডকাস্টের আয়োজন করতে পারে।
একইভাবে এসব বিষয়ে খুবই ভালো জানেন বা পড়াশোনা করেছেন এমন ব্যক্তি বা লেখকদেরকে এগিয়ে আসতে হবে বই লেখার কাজে। প্রকাশনীগুলো সেই বইগুলোর উপর অলিম্পিয়াড বা কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারে। এতে করে একদিকে বইগুলোর পাঠক বাড়বে, অন্যদিকে রোহিঙ্গা ও রাখাইন নিয়ে আলোচনার পরিধিও বিস্তৃত হবে।
তাছাড়াও কবিতা ও নাশিদ সৃষ্টি নিয়েও ভাবতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাজারটা পোস্ট-প্রবন্ধের চাইতে একটা কবিতা বা নাশিদ হৃদয়ের বেশি গভীরে আলোড়ন তৈরি করতে পারে। গাযা ইস্যু এর সবচেয়ে বড় প্রমাণগুলোর একটি। ‘বন্ধুগো আরাকান’ নাশিদটি আরাকান সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। ইসলামিক ম্যাগাজিন এবং শিল্পীগোষ্ঠী এমন কবিতা বা নাশিদ তৈরির দিকে মনোযোগ দিলে আমরা হয়ত সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে অনেকখানি এগিয়ে যেতে পারবো।
এসবের সমান্তরালে আরও দুটি কাজ দরকার। প্রথমত, আমাদের মিম্বারগুলো থেকে উলামায়ে কেরামের মাধ্যমে রোহিঙ্গা মুসলিমদের মুক্তির কথা উচ্চারিত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, এই ইস্যুতে Intifada Bangladesh সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলো ধারাবাহিকভাবে সেমিনার বা ওয়েবিনারের আয়োজন করতে পারে। পাশাপাশি তারা লিফলেট প্রকাশ করতে পারে, যেগুলো লোকান দ্বীনি সংগঠনগুলো নিজেরা ছাপিয়ে প্রচার করবে।
মনে রাখতে হবে, মূলধারার মিডিয়াগুলো কখনোই রোহিঙ্গাদের প্রকৃত মুক্তির কথা বলবে না। তাই ইসলামপন্থী মিডিয়া বা নিউজ শেয়ারিং পেইজগুলোকে রাখাইন ইস্যুর আপডেট তুলে ধরতে হবে। এর পাশাপাশি যারা বিভিন্ন পত্রিকায় লিখে থাকেন, তাদের উচিত হবে রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক হওয়ার ব্যাপারে লেখা প্রকাশের চেষ্টা করা, যাতে করে অন্তত বিষয়টা কিছু মানুষের চোখে আসে।
আরেকটা কথা না বললেই নয়। যারা নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের কণ্ঠস্বর হয়ে কাজ করবেন, তাদেরকে প্রেশার গ্রুপ হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে যাতে করে রাজনৈতিক দলগুলো রোহিঙ্গা ইস্যুকে তাদের ইশতেহারে রাখতে বাধ্য হয়। যে সরকারই থাকুক না কেন তাদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে যেন তারা এই ইস্যুতে সোচ্চার হয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তকে রোহিঙ্গাদের বঞ্চনা ও লড়াইয়ের কথা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এবার একটু এডভান্সড লেভেলের কাজের কথা বলতে হয়। আলেম, অভিজ্ঞ অ্যাক্টিভিস্ট এবং ইসলামপন্থী সাংবাদিক-এসব মিলিয়ে একটা টীম তৈরি করা যেতে পারে, যারা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাবে। হ্যাঁ, এটা চ্যালেঞ্জিং। রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে ঘিরে অনেক ধরণের রাজনীতি হয়, মিশনারীদের চক্রান্তও হয়। তবুও আমাদের পক্ষ থেকে এই চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে যেন ভুক্তভোগীদের নিজেদের জবান থেকে আমরা তথ্য সংগ্রহ করতে পারি। এক্ষেত্রে অবশ্যই তাদের ভাষা বুঝতে পারবে এমন ব্যক্তিকে টীমে রাখতে হবে।
তো এই আর কী। ন্যারেটিভ তৈরিতে যেগুলো বললাম, সেগুলোর প্রধান ভূমিকা সবাইকে পালন করতে হবে এমন না, সবার করা উচিতও না। তবে একটা নির্দিষ্ট ‘পারদর্শী এবং নিবেদিত’ গোষ্ঠীকে এই দায়িত্ব নিতে হবে। বাকিরা সহায়তাকারী হিসেবে শামিল হবে। এটাকে একটা ‘সামষ্টিক প্রকল্প’ হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করতে হবে।
সবশেষে বলতে চাই, ‘ইস্যু আসে ইস্যু যায়, দ্বীন বেচে দ্বীন যায়’ – এমন যেন না হয়। প্রতিবেশী ভাই-বোনেরা ভালো নেই জেনেও তাদের জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করতে না পারলে কীসের সাফল্য? আসল ফায়সালা তো হবে ময়দানে। কিন্তু তার আগে কি এতোটুকু আমরা করতে পারব না?





