ইসলামবিরোধীদের প্রতি জবাব

ইসলাম ও দাসপ্রথা

দাসপ্রথা ও ইসলাম: নাস্তিকদের অভিযোগের খণ্ডন, বিধান, প্রজ্ঞা ও বাস্তবতার বিশ্লেষণ” পর্ব : ৫

এর পূর্বের পর্ব গুলো পড়ে আসুন: পর্ব :১পর্ব: ২, পর্ব : ৩, পর্ব :৪ 

অভিযোগ ও খন্ডন- ৩: ইসলামে কি যুদ্ধবন্দী কিংবা দাসীর পর্দা শুধু নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত?

ইসলামে দাসী তথা নারীর পর্দা নিয়ে নাস্তিক ও ইসলামবিদ্বেষীদের প্রচারণা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। তারা প্রায়শই ইসলামকে দাসপ্রথা ও নারীর অধিকার হরণকারী ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। তবে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলামী বিধান অনুযায়ী দাসী বা নারীর পর্দা ও আচার-আচরণ নির্ধারিত হয়েছে যথাযথ নিয়ম ও মর্যাদার সঙ্গে, যা কোনোভাবেই স্বাধীন নারীর অধিকার হরণের সমতুল্য নয়। তাদের উদ্দেশ্য মূলত ইসলামের নিয়মকানুনকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকরা। নাস্তিকদের এই ধরনের অভিযোগের পেছনে থাকে ইসলামের স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতা ও নৈতিকতার প্রতি তাদের দ্বিমুখী মনোভাব। এই প্রবন্ধে আমরা দাসী ও নারীর পর্দা সম্পর্কিত ইসলামের প্রকৃত বিধানগুলো তুলে ধরব এবং মিথ্যা অভিযোগ ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণার যথাযথ জবাব প্রদান করব।

নাস্তিকদের অভিযোগ

“ইসলামের পর্দা বিধান নারীর সম্মান বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য নয়; বরং এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্তর চিহ্নিত করার এবং ক্রীতদাসী নারীদের মালিকের ‘পণ্য’ হিসেবে শনাক্ত করার একটি ব্যবস্থা ছিল। অর্থাৎ মূল লক্ষ্য ছিল দাসদের মূল্যায়ন ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা, নারী স্বাধীনতা বা মর্যাদার রক্ষা নয়। তাইতো ইসলামের নারী দাসীদের পেট, বুক ইত্যাদি খোলা দেখাতে বৈধ বলা হয়েছে ”

অভিযোগ খন্ডন

ইসলামবিদ্বেষীরা নারী দাসীদের ব্যাপারে এক জঘন্য মিথ্যাচার করে থাকে, তারা বলে থেকে ইসলামের নারীর পেট বুক ইত্যাদি খোলা রাখা বৈধ। তাদের এই দাবির পেছনে কোন বিশুদ্ধ হাদিস কিংবা কোরআনের কোন আয়াত নেই। বরঞ্চ তারা কিছু ফতোয়ার কিতাব থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু মত উল্লেখ করে এ বিষয়টিকে মানুষের সামনে প্রকাশ করে থাকে। প্রথমতো দাসী ও স্বাধীন নারীর যে পর্দায় ভিন্নতা রয়েছে তা কোরআনের বহু আয়াত ও হাদিস থেকে থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু দাসীর আওরা কতটুকু এই সংক্রান্ত কোন তথ্য কোরআনে বা গ্রহণযোগ্য হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয় [এটা ইজতিহাদি মাসআলা]। আসুন আমরা এবার দেখবো কুরআন সুন্নাহ এবং যুগ শ্রেষ্ঠ আলেমদের মদের ভিত্তিতে নারী দাসীদের পর্দার বিধান কি?

পবিত্র কুরআন মাজীদের আলোকে নারী দাসীদের পর্দার বিধান

পবিত্র কোরআন মাজিদে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নারীদের পর্দার বিধান নাজিল করেছেন। সে ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত ও তাফসীর দেখে নেওয়া যাক

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ قُل لِّأَزْوَٲجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَآءِ ٱلْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَـٰبِيبِهِنَّۚ ذَٲلِكَ أَدْنَىٰٓ أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا

“হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীগণ, তোমার কন্যাগণ এবং মুমিন নারীদেরকে বল— তারা যেন তাদের উপর নিজেদের জিলবাব (বাহ্যিক চাদর) টেনে নেয়। এতে তাদেরকে সহজে চেনা যাবে (যে তারা সম্মানিত ও সম্ভ্রান্ত), ফলে তাদেরকে কষ্ট দেওয়া হবে না। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”

— (সূরা আহযাব: ৫৯)

♦ এ আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জগৎ বিখ্যাত ইমাম, ইমাম আল-হাফিয ইবনুল কাত্তান আল-ফাসী (রহিমাহুল্লাহ)- বলেন

وقال الإمام الحافظ ابن القطان الفاسي ، رحمه الله :

” قوله تعالى : ( وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ) : نهي مطلق ، للنساء كلهن ، حرة كانت أو أمة ، عن إبداء كل زينة ، لكل أحد ، رجل أو امرأة ، أجنبي ، أو قريب ، أو صهر ؛ هي مطلقة بالنسبة إلى كل زينة ، و مطلقة بالنسبة إلى كل مُبْدِيَة ، مطلقة بالنسبة إلى كل ناظر .

ورد على إطلاقين منها : استثناءان : أحدهما على مطلق الزينة ؛ ومخصص به منها : ما ظهر منها ، فيجوز إبداؤه لكل واحد . والآخر على مطلق الناظرين الذين يبدى لهم شيء من ذلك ؛ فخصص منهم : البعولة ومن بعدهم …” انتهى من “النظر في أحكام النظر” (135-136) .

“আল্লাহ তাআলার বাণী:

وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا

— ‘তারা যেন তাদের সৌন্দর্য (অলংকার) প্রকাশ না করে, তবে যা স্বাভাবিকভাবে প্রকাশিত হয় তা ছাড়া’—

এটি একটি সর্বজনীন নিষেধাজ্ঞা, যা সমস্ত নারীর জন্য প্রযোজ্য— সে স্বাধীন হোক বা দাসী— যে তারা কোনো প্রকার সৌন্দর্য কারো সামনে প্রকাশ করবে না; তা সে পুরুষ হোক বা নারী, অপরিচিত হোক বা আত্মীয়, এমনকি শ্বশুরালীয় সম্পর্কের লোকই হোক।

অতএব, এই বিধানটি তিন দিক থেকে সাধারণ (مطلق):

সকল প্রকার সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে,

সকল নারীর ক্ষেত্রে,

এবং সকল দর্শকের ক্ষেত্রে।

তবে এই সাধারণতার মধ্যে দুটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম এসেছে—

প্রথমত: ‘সকল সৌন্দর্য’-এর সাধারণতার মধ্যে ব্যতিক্রম হলো—

﴿ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ﴾ — ‘যা স্বাভাবিকভাবে প্রকাশিত হয়’;

অতএব, এই অংশটুকু সবার সামনে প্রকাশ করা বৈধ।

দ্বিতীয়ত: ‘সকল দর্শক’-এর সাধারণতার মধ্যে ব্যতিক্রম হলো—

যাদের সামনে কিছু সৌন্দর্য প্রকাশ করা বৈধ; যেমন— স্বামী এবং তার পরবর্তীতে উল্লেখিত (মাহরাম) ব্যক্তিবর্গ।…”[1]আন-নযর ফী আহকামিন-নযর, পৃ. ১৩৫–১৩৬

♦ এই আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইমাম ইবনুল কাত্তান রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন

والظاهر أن قوله : وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ : يشمل الحرائر والإماء ، والفتنة بالإماء أكثر ؛ لكثرة تصرفهن ، بخلاف الحرائر؛ فيحتاج إخراجهن من عموم النساء إلى دليل واضح”.

وسبقه إلى ذلك الحافظ ابن القطان في “أحكام النظر” “ق 24/ 2” وغيره.

“প্রকাশ্যত (ظاهر) মনে হয় যে, আল্লাহ তাআলার বাণী—

وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ (‘এবং মুমিন নারীগণ’)— এর মধ্যে স্বাধীন নারী ও দাসী— উভয়ই অন্তর্ভুক্ত।

আর দাসীদের মাধ্যমে ফিতনার সম্ভাবনা অধিক; কারণ তারা অধিক চলাফেরা ও মেলামেশা করে থাকে, যা স্বাধীন নারীদের ক্ষেত্রে ততটা নয়।

অতএব, তাদেরকে (দাসীদেরকে) ‘নারীগণ’-এর সাধারণ বিধান থেকে আলাদা করতে হলে একটি স্পষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন।”‘[2]আহকামুন-নযর’  ২৪/২

সহিহ হাদিসের আলোকে নারী দাসীদের পর্দার বিধান

এবার আসুন দেখি আমরা সহিহ হাদিসের আলোকে নারী দাসীদের পর্দার বিধান কি?

عَنْ أَبِي ذَرٍّ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ لَاءَمَكُمْ مِنْ مَمْلُوكِيكُمْ، فَأَطْعِمُوهُ مِمَّا تَأْكُلُونَ، وَاَكْسُوهُ مِمَّا تَلْبَسُونَ، وَمَنْ لَمْ يُلَائِمْكُمْ مِنْهُمْ، فَبِيعُوهُ، وَلَا تُعَذِّبُوا خَلْقَ اللَّهِ

আবূ যার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের দাস-দাসীর মধ্যে যারা তোমাদের খুশি করে তাদেরকে তোমরা যা খাও তা-ই খেতে দাও এবং তোমরা যা পরিধান করো তা-ই পরতে দাও। আর যেসব দাস তোমাদের খুশি করে না তাদেরকে বিক্রি করো। তোমরা আল্লাহর সৃষ্টিজীবকে শাস্তি দিও না।[3]সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)| হাদিস:৫১৬১

এ হাদিস স্পষ্ট যে ইসলামী বিধান অনুসারে মনিব যেসকল খাদ্য খাবে এবং যে পোশাকগুলো পরিধান করবে তার দাসীকে ঠিক সেই পোশাক এবং খাদ্য খাওয়াতে হবে। এই হাদিসে স্পষ্ট বলা হচ্ছে স্বাধীন ব্যক্তি যা খাবে, যা পরবে তাই দাস-দাসীদের খাওয়াতে হবে এবং পরাতে হবে।

জগৎ বিখ্যাত ইমামদের বক্তব্য আলোকে নারী দাসীদের পর্দার বিধান

পবিত্র কুরআন মাজিদ এবং সহীহ হাদিসকে সামনে রেখে জগৎ বিখ্যাত ইমাম ও ইসলামিক স্কলার গণ এই বক্তব্য দিয়েছেন যে, একজন দাসী এবং একজন স্বাধীন নারীর পর্দার বিধান প্রায় এক। আসুন এ ব্যাপারে আমরা জগত বিখ্যাত ইমামদের বক্তব্য দেখে আসি

১/ ইমাম ইবনে হাজাম রহমাতুল্লাহি আলাইহির বক্তব্য

“وأما الفرق بين الحرة والأمة : فدين الله واحد ، والخلقة والطبيعة واحدة ؛ كل ذلك في الحرائر والإماء سواء ، حتى يأتي نص في الفرق بينهم في شيء ، فيوقف عنده”

المحلى” “3/ 218 – 219

ইমাম (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর কিতাব المحلى (৩/২১৮–২১৯)-এ অত্যন্ত সুন্দরভাবে বলেছেন—

“স্বাধীন নারী (হুররা) ও দাসী (আমাহ)-এর মধ্যে পার্থক্যের ব্যাপারে—আল্লাহর দ্বীন এক, তাদের সৃষ্টিগত গঠন ও স্বভাবও এক; এ সমস্ত বিষয়ে স্বাধীন নারী ও দাসী সমান। তবে কোনো বিষয়ে তাদের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করে এমন শরঈ দলিল (নস) আসলে, তখন সে (দলিল)-এর উপরই সীমাবদ্ধ থাকা হবে।”[4]আল মুহাল্লাহ ৩/২১৮–২১৯

২/ ইমাম নববী রহমাতুল্লাহি আলাইহির বক্তব্য

“إِذَا كَانَ الْمَنْظُورُ إِلَيْهَا أَمَةً ، فَثَلَاثَةُ أَوْجُهٍ :

أَصَحُّهَا فِيمَا ذَكَرَهُ الْبَغَوِيُّ وَالرُّويَانِيُّ : يَحْرُمُ النَّظَرُ إِلَى مَا بَيْنَ السُّرَّةِ وَالرُّكْبَةِ ، وَلَا يَحْرُمُ مَا سِوَاهُ ، لَكِنْ يُكْرَهُ .

وَالثَّانِي : يَحْرُمُ مَا لَا يَبْدُو حَالَ الْمِهْنَةِ دُونَ غَيْرِهِ .

وَالثَّالِثُ : أَنَّهَا كَالْحُرَّةِ ، وَهَذَا غَرِيبٌ لَا يَكَادُ يُوجَدُ لِغَيْرِ الْغَزَالِيِّ .

قُلْتُ : قَدْ صَرَّحَ صَاحِبُ ( الْبَيَانِ ) وَغَيْرُهُ، بِأَنَّ الْأَمَةَ كَالْحُرَّةِ وَهُوَ مُقْتَضَى إِطْلَاقِ كَثِيرِينَ ، وَهُوَ أَرْجَحُ دَلِيلًا . وَاللَّهُ أَعْلَمُ”

ইমাম নববী (রহ.) বলেন— যদি দর্শনীয় ব্যক্তি একজন দাসী হয়, তবে এ বিষয়ে তিনটি মত রয়েছে:

প্রথম মত :

ইমাম বাগভী ও রুয়াইয়ানী যা উল্লেখ করেছেন— নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ দেখা হারাম। এর বাইরে অংশ দেখা হারাম নয়, তবে তা অপছন্দনীয় (মাকরূহ)।

দ্বিতীয় মত:

যে অঙ্গ সাধারণত কাজের সময় প্রকাশ পায় না (অর্থাৎ শ্রম বা খেদমতের সময়ও ঢাকা থাকে), তা দেখা হারাম; তবে যা সাধারণত প্রকাশ পায়, তা নয়।

তৃতীয় মত:

দাসী স্বাধীন নারীর মতোই (অর্থাৎ তার হুকুমও একই)।

ইমাম নববী বলেন—এই মতটি বিরল, এবং প্রায় একমাত্র ইমাম গাজালী থেকেই এটি বর্ণিত।

এরপর ইমাম নববী নিজেই বলেন—

“‘আল-বায়ান’ গ্রন্থকার ও অন্যান্য আলেম স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, দাসী স্বাধীন নারীর মতোই। বহু আলেমের সাধারণ বক্তব্য থেকেও এটি প্রতীয়মান হয়, এবং দলিলের দিক থেকেও এটাই অধিক শক্তিশালী মত। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।”[5]রাওদাতুত ত্বালেবীন : ৭/২৩

ইমাম নববী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি আরো বলেন

“وَالأَصَحُّ عِنْدَ الْمُحَقِّقِينَ : أَنَّ الْأَمَةَ كَالْحُرَّةِ ، وَاللَّهُ أَعْلَمُ”

গবেষক আলেমদের নিকট অধিক গ্রহণযোগ্য মত হলো— দাসী স্বাধীন নারীর মতোই (পর্দা ও দৃষ্টির বিধানে)। আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।[6]মিনহাজুত ত্বালিবীন: ২০৪

৩/ আল্লামা ইবনে হাজার হাইতামি রাহমাতুল্লাহি আলাইহির বক্তব্য

“لِاشْتِرَاكِهِمَا فِي الْأُنُوثَةِ ، وَخَوْفِ الْفِتْنَةِ ؛ بَلْ كَثِيرٌ مِنْ الْإِمَاءِ يَفُوقُ أَكْثَرَ الْحَرَائِرِ جَمَالًا ؛ فَخَوْفُهَا فِيهِنَّ أَعْظَمُ

দাসীকে স্বাধীন নারীর মতো গণ্য করার কারণ হলো—

উভয়ের মধ্যেই নারীত্বের অভিন্নতা রয়েছে এবং উভয় ক্ষেত্রেই ফিতনার আশঙ্কা বিদ্যমান। বরং অনেক সময় এমনও দেখা যায় যে, বহু দাসী সৌন্দর্যের দিক থেকে অধিকাংশ স্বাধীন নারীকেও ছাড়িয়ে যায়; ফলে তাদের ক্ষেত্রে ফিতনার আশঙ্কা আরও বেশি।[7]তুহফাতুল মুহতাজ : ৭/১৯৯

৪/ শাইখ নাসির উদ্দিন আলবানী রহমাতুল্লাহ আলাইহির বক্তব্য

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিকোণে দাসী নারীর পর্দার বিধান সম্পর্কে দুটি মত পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি মত হল এমন যে, “দাসী তার নাভি থেকে হাটু পর্যন্ত ঢেকে রাখবে” এমতটি বিশুদ্ধ নয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত আল্লামা নাসির উদ্দিন আলবানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি আলোচনা করেছেন,। কেন এই মতামতটি গ্রহণযোগ্য নয় এ ব্যাপারে নাসির উদ্দিন আলবানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন আমরা সেই আলোচনাটি নিম্নে আপনাদের বোঝার সুবিধার্থে উল্লেখ করলাম।

وقال الشيخ الألباني رحمه الله :

” وقد أبان الله تعالى عن حكمة الأمر بإدناء الجلباب بقوله: ( ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلا يُؤْذَيْنَ ) [الأحزاب: 59] ؛ يعني : أن المرأة إذا التحفت بالجلباب ، عرفت بأنها من العفائف المحصنات الطيبات ، فلا يؤذيهن الفساق بما لا يليق من الكلام ، بخلاف ما لو خرجت متبذلة غير مستترة ؛ فإن هذا مما يُطمع الفساق فيها والتحرش بها ، كما هو مشاهد في كل عصر ومصر ؛ فأمر الله تعالى نساء المؤمنين جميعًا بالحجاب سدًّا للذريعة .

وأما ما أخرجه ابن سعد “8/ 176″: أخبرنا محمد بن عمر عن ابن أبي سبرة عن أبي صخر عن ابن كعب القرظي قال: ” كان رجل من المنافقين يتعرض لنساء المؤمنين يؤذيهن فإذا قيل له ؟ قال : كنت أحسبها أمة ، فأمرهن الله أن يخالفن زي الإماء ويدنين عليهن من جلابيبهن “.

فلا يصح بل هو ضعيف جدًّا لأمور:

الأول: أن ابن كعب القرظي – واسمه محمد – تابعي لم يدرك عصر النبوة ، فهو مرسل .

الثاني: أن ابن أبي سبرة وهو أبو بكر بن عبد الله بن محمد بن أبي سبرة ضعيف جدًّا قال الحافظ في “التقريب”: ” رموه بالوضع “.

والثالث: ضعف محمد بن عمر وهو الواقدي ، وهو مشهور بذلك عند المحدثين ، بل هو متهم.

وفي معنى هذه الرواية روايات أخرى أوردها السيوطي في “الدر المنثور” وبعضها عند ابن جرير وغيره وكلها مرسلة لا تصح ؛ لأن منتهاها إلى أبي مالك وأبي صالح والكلبي ومعاوية بن قرة والحسن البصري ، ولم يأت شيء منها مسندًا ، فلا يحتج بها ، ولا سيما أن ظاهرها مما لا تقبله الشريعة المطهرة ولا العقول النيرة ؛ لأنها توهم أن الله تعالى أقر إماء المسلمين – وفيهن مسلمات قطعًا- على حالهن من ترك التستر ، ولم يأمرهن بالجلباب ليدفعن به إيذاء المنافقين لهن.

ومن العجائب أن يغتر بعض المفسرين بهذه الروايات الضعيفة فيذهبوا بسببها إلى تقييد قوله تعالى: ( وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ ) [الأحزاب: 59] بالحرائر دون الإماء ، وبنوا على ذلك أنه لا يجب على الأمة ما يجب على الحرة ، من ستر الرأس والشعر ، بل بالغ بعض المذاهب فذكر أن عورتها مثل عورة الرجل: من السرة إلى الركبة ، وقالوا:

“فيجوز للأجنبي النظر إلى شعر الأمة وذراعها وساقها وصدرها وثديها”.

وهذا -مع أنه لا دليل عليه من كتاب أو سنة- : مخالف لعموم قوله تعالى: ( وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِين ) [الأحزاب: 59] ؛ فإنه من حيث العموم كقوله تعالى: ( يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنْتُمْ سُكَارَى حَتَّى تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ وَلَا جُنُبًا إِلَّا عَابِرِي سَبِيلٍ حَتَّى تَغْتَسِلُوا وَإِنْ كُنْتُمْ مَرْضَى أَوْ عَلَى سَفَرٍ أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِنْكُمْ مِنَ الْغَائِطِ أَوْ لَامَسْتُمُ النِّسَاءَ فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا ) الآية [النساء: 43] ولهذا قال أبو حيان الأندلسي في تفسيره : “البحر المحيط” “7/ 250”:

“والظاهر أن قوله : وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ : يشمل الحرائر والإماء ، والفتنة بالإماء أكثر ؛ لكثرة تصرفهن ، بخلاف الحرائر؛ فيحتاج إخراجهن من عموم النساء إلى دليل واضح”.

وسبقه إلى ذلك الحافظ ابن القطان في “أحكام النظر” “ق 24/ 2” وغيره.

وما أحسن ما قال ابن حزم في “المحلى” “3/ 218 – 219”:

“وأما الفرق بين الحرة والأمة : فدين الله واحد ، والخلقة والطبيعة واحدة ؛ كل ذلك في الحرائر والإماء سواء ، حتى يأتي نص في الفرق بينهم في شيء ، فيوقف عنده”.

قال:

“وقد ذهب بعض من وهل في قول الله تعالى: ( يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلا يُؤْذَيْنَ ) ؛ إلى أنه إنما أمر الله تعالى بذلك ؛ لأن الفساق كانوا يتعرضون للنساء للفسق، فأمر الحرائر بأن يلبسن الجلابيب ليعرف الفساق أنهن حرائر فلا يتعرضوهن ” .

ونحن نبرأ من هذا التفسير الفاسد ، الذي هو إما زلة عالم ، أو وهلة فاضل عاقل ، أو افتراء كاذب فاسق؛ لأن فيه أن الله تعالى أطلق الفساق على أعراض إماء المسلمين ، وهذه مصيبة الأبد، وما اختلف اثنان من أهل الإسلام في أن تحريم الزنا بالحرة كتحريمه بالأمة ، وأن الحد على الزاني بالحرة ، كالحد على الزاني بالأمة ، ولا فرق . وأن تعرض الحرة في التحريم ، كتعرض الأمة ولا فرق ، ولهذا وشبهه : وجب أن لا يقبل قول أحد بعد رسول الله صلى الله عليه وسلم إلا بأن يسنده إليه عليه السلام ..” انتهى من “كتاب المرأة المسلمة” (90-94) .

শাইখ আল-আলবানি রহমাহুল্লাহ বলেছেন:

“আল্লাহ তা‘আলা জেলাবাব নিকট আনার নির্দেশের حکمت পরিষ্কার করেছেন, যেমন তিনি বলেন:

“ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلا يُؤْذَيْنَ” [আহযাব: ৫৯]।

অর্থাৎ, যখন নারী জেলাবাবে আবৃত হন, তখন তাকে পরিচিতি হয় যে তিনি পরিশুদ্ধ, অভিভাবিত ও সৎ নারী, ফলে অসৎ লোকেরা অনুচিত কথায় তার প্রতি উত্যক্ততা বা উত্তেজনা দেখাতে পারবে না। বিপরীতে, যদি তিনি আচ্ছন্ন না হন এবং আবৃত না হন, তবে অসৎ লোকেরা তার প্রতি লোভ বা উত্তেজনা পোষণ করবে—যা সব যুগে এবং সব স্থানে দেখা যায়। অতএব, আল্লাহ মুমিন নারীদের সকলকে আবরণের মাধ্যমে সম্ভাব্য উত্যক্ততা থেকে রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন।”

শায়েখ আলবানী কর্তৃক দাসীর পর্দা নাভি দেখে হাঁটু পর্যন্ত এ মতের দলিল খন্ডন

যদিও ইবনু সা‘দ “আত-তাবাকাত” (৮/১৭৬)-এ একটি বর্ণনা দিয়েছেন, যেখানে তিনি বলেন যে একজন মুনাফিক নারীদের প্রতি উত্যক্তি করত এবং আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দেন যাতে তারা দাসীদের পোশাকের বিপরীত জেলাবাব পরিধান করে। কিন্তু এই বর্ণনা দুর্বল (ضعيف جدًّا), কারণ:

1. ইবনু কা‘ব আল-কুরাযী—যিনি বর্ণনা দিয়েছেন—তিনি তাবেই; নবী যুগ প্রত্যক্ষ করেননি, তাই বর্ণনাটি মুরসাল।

2. ইবনু আবী সাবরা দুর্বল; হাফিয ইবনু হাজার “আত-তাকরীব”-এ বলেছেন: “তাকে জাল হাদীস রচনার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে।”

3. মুহাম্মাদ ইবনু উমর (আল-ওয়াকিদী) দুর্বল এবং পরিচিতভাবে অভিযুক্ত।

সুয়ূতী “আদ-দুররুল মানসুর”-এ এবং ইবনু জারীর কাছেও অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া গেছে, কিন্তু সবই মুরসাল এবং কোনোটি মুসনাদ নয়। এগুলোকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না, বিশেষ করে যখন এগুলোর বাহ্যিক অর্থ এমন যা শরীয়ত ও স্বচ্ছ বিবেক গ্রহণ করে না। কারণ এতে যেন মনে হয় আল্লাহ মুসলিম দাসীদের জন্যও আবরণ না রাখার অনুমোদন দিয়েছেন—যা অমঙ্গলজনক।

কিছু মুফাসসিরা এই দুর্বল বর্ণনার কারণে বিশ্বাস করেছেন যে, আল্লাহর এই বাক্য:

“وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ” [আহযাব: ৫৯]

শুধুমাত্র মুক্ত নারীদের (হুররা) জন্য। তারা এটিও বলেছেন যে, দাসীর ওপর সেই সব বিধান প্রয়োগযোগ্য নয় যা মুক্ত নারীর ওপর আছে, যেমন মাথা ও চুল ঢেকে রাখা। কিছু মাযহাব আরও এগিয়ে গিয়ে বলেছেন যে, দাসীর ‘আওরাহ’ পুরুষের মতো—নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত, এবং পরপুরুষ দাসীর চুল, বাহু, পা, বুক ও স্তনের দিকে তাকাতে পারবে।

কিন্তু এটি—যদিও কোনো কোরআন বা সুন্নাহর প্রমাণ নেই—আল্লাহর বাক্যের সাধারণ অর্থের বিরোধী, যেমন আল্লাহ বলেছেন:

“وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ” [আহযাব: ৫৯]।

এটি সাধারণ অর্থে যেমন নির্দেশ দেয়, তেমনি অন্য আয়াতের মতোই:

“يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنْتُمْ سُكَارَى … فَتَيَمَّمُوا” [নিসা: ৪৩]।

আবু হায়ান আল-আন্দালুসী “আল-বাহরুল মহীৎ” (৭/২৫০)-এ বলেছেন:

“প্রকাশত মনে হয়, আল্লাহর এই বাক্য وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ মুক্ত নারী এবং দাসী উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে। তবে দাসীদের ক্ষেত্রে ফিতনা বেশি হতে পারে, কারণ তাদের চলাচল ও সংস্পর্শের সুযোগ বেশি। তাই তাদের সাধারণ দৃষ্টান্ত থেকে আলাদা করার জন্য স্পষ্ট কোনো নস প্রয়োজন।”

পূর্বেও হাফিয ইবনু কাতান “আহকামুল নজর” (প্রশ্ন ২৪/২) এ একই মত প্রকাশ করেছেন।

ইবনু হাজম “আল-মুহল্লা” (৩/২১৮-২১৯)-এ বলেন:

“মুক্ত নারী ও দাসীর মধ্যে পার্থক্য নেই; ধর্ম আল্লাহর জন্য এক, এবং সৃষ্টি ও প্রকৃতি একই। যতক্ষণ না কোনো নস দ্বারা পার্থক্য স্থাপন করা হয়, উভয় সমান।”

তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, যারা বলেন যে আল্লাহ শুধু মুক্ত নারীদের জন্য জেলাবাবের নির্দেশ দিয়েছেন কারণ অসৎ লোকেরা নারীদের প্রতি উত্যক্ত হতো—এটি পুরোপুরি ভুল ব্যাখ্যা। এটি হয় শিক্ষিত ব্যক্তির ভুল, বা বোঝাপড়ার ব্যর্থতা, বা মিথ্যাকার ব্যাখ্যা; কারণ এতে মনে হয় আল্লাহ অসৎ লোকদেরকে মুসলিম দাসীদের প্রতি উন্মুক্ত করেছেন।

ইসলামের সকল ব্যক্তি একমত যে, মুক্ত নারী বা দাসী—উভয়ের ওপর একইভাবে নিষিদ্ধ জিনিস প্রযোজ্য; এবং জারি করা শাস্তি (হাদ) ও নিষেধ সমান। ফলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে কেউ এই ধরনের ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে পারবে না, যদি না তা সরাসরি নবীর কাছে পৌঁছেছে।”[8]উদ্ধৃত: “কিতাবুল মার‘আতুস সালিমা” (পৃষ্ঠা ৯০–৯৪)।

আলোচনার বিশ্লেষণ :

Read More...  ইসলামে দাসীর পর্দা এবং কাফেরদের মিথ্যাচার

আল্লামা নাসির উদ্দিন আলবানী রহমাতুল্লাহ এর বক্তব্য এই কথাই স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে যে সকল ইমামগণ অথবা ফকিহগণ বলেছেন যে , দাসির সতর হলো নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত, তাদের এই বক্তব্য মূলত একটি দুর্বল বা জাল হাদিস এর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং এই মন্তব্যটি গ্রহণযোগ্য নয়। বরংচ কোরআন এবং সহি হাদিস আলোক বিশ্লেষণ করলে একতা স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে দাসী এবং স্বাধীনা নারীর হাওড়া বা পর্দা সমান। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দাসীর পর্দার বিধান নারীর চেয়েও কঠোর বলা হয়েছে। যা একটু পূর্ব আলোচনা থেকে এই স্পষ্ট।

৫/ ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ এর বক্তব্য

ইমাম ইবন তাইমিয়া (র.) এর মতে,

وَإِنَّمَا ضُرِبَ الْحِجَابُ عَلَى النِّسَاءِ لِئَلَّا تُرَى وُجُوهُهُنَّ وَأَيْدِيهِنَّ . وَالْحِجَابُ مُخْتَصٌّ بِالْحَرَائِرِ دُونَ الْإِمَاءِ ، كَمَا كَانَتْ سُنَّةُ الْمُؤْمِنِينَ فِي زَمَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَخُلَفَائِهِ : أَنَّ الْحُرَّةَ تَحْتَجِبُ وَالْأَمَةُ تَبْرُزُ

অর্থাৎ: “হিজাব (আবরণ) নারীদের ওপর আরোপ করা হয়েছে যাতে তাদের মুখমণ্ডল এবং হাত দেখা না যায়। হিজাব মূলত স্বাধীন নারীদের (হরার) জন্যই প্রযোজ্য, দাসী নারীদের (ইমা) জন্য নয়। এটি নবী ﷺ এবং তাঁর খলিফাগণের যুগে বিশ্বাসীদের অনুসরণ করা সুন্নতের সঙ্গে মিল রয়েছে: স্বাধীন নারী আবৃত থাকতেন, আর দাসী বাইরে বের হতে পারতেন।”

এখানে মূলভাবে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে ইসলামে হিজাবের বিধান মূলত স্বাধীন নারীর জন্য এবং এটি সামাজিক ও নৈতিক নিরাপত্তার জন্য নির্ধারিত, আর দাসীর ক্ষেত্রে এটি বাধ্যতামূলক ছিল না।[9]মাজমু আল ফাতাওয়াহ: ১৫/৩৭২

তিনি আরো বলেন,

প্রতিষ্ঠিত অভিমত হলো দাসীর আওরাহ স্বাধীনা নারীর আওরাহর ন্যায়। ঠিক যেমনি একজন পুরুষ দাসের আওরাহ স্বাধীন পুরুষের আওরাহর ন্যায়। তবে দায়িত্ব ও কাজকর্মের জন্য যতটুকু দরকার ততটুকু প্রদর্শন করতে পারবে। তার বুক ও পিঠের বিধান হলো, সেগুলো থাকবে প্রতিষ্ঠিত অভিমত অনুসারে।[10]শারহুল উমদাহ – ইমাম ইবন তাইমিয়া ২/২৭৫

৬/ ইমাম মালেক রহ এর বক্তব্য

ইমাম মালিক (রা.) কে জিজ্ঞেস করা হলো, কোনো দাসী নারী যদি বুক খোলা রেখে বাহিরে যায়, আপনি কি তাকে ঘৃণা করবেন ? তিনি বললেন “হ্যা। এবং এটা করলে আমি তাকে শাস্তি দেবো।[11]মাওয়াহিব আল জালিল, মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ আল মাগরিবি ১/১০৫

৭/ ইবনে কুদামাহ রহঃ বক্তব্য :

” …. لَكِنْ إنْ كَانَتْ الْأَمَةُ جَمِيلَةً يُخَافُ الْفِتْنَةُ بِهَا ، حَرُمَ النَّظَرُ إلَيْهَا ، كَمَا يَحْرُمُ النَّظَرُ إلَى الْغُلَامِ الَّذِي تُخْشَى الْفِتْنَةُ بِالنَّظَرِ إلَيْهِ . قَالَ أَحْمَدُ فِي الْأَمَةِ إذَا كَانَتْ جَمِيلَة ً: تَنْتَقِبُ ، وَلَا يُنْظَرُ إلَى الْمَمْلُوكَةِ، كَمْ مِنْ نَظْرَةٍ أَلْقَتْ فِي قَلْبِ صَاحِبِهَا الْبَلَابِلَ ” انتهى من “المغني” (7/ 103

“কিন্তু যদি কোনো দাসী সুন্দর হয় এবং তার দ্বারা ফিতনা (আকর্ষণ বা প্রলুব্ধ হওয়ার সম্ভাবনা) ভয় করা যায়, তবে তার দিকে তাকানো হারাম, যেমনই হারাম কোনো ছেলে যাকে দেখলে ফিতনা হতে পারে। আহমদ বলেন, যদি দাসী সুন্দর হয়, তাহলে সে নিকাব পরবে, এবং তাকে দেখা যাবে না, কারণ কতগুলো তাকানোর নৈমিত্তিক নজরই কারো হৃদয়ে বিভ্রান্তি বা প্রলুব্ধি সৃষ্টি করতে পারে।”

এই উক্তিতে ইবনে কুদামাহ রহঃ এবং ইমাম আহমদ রহঃ উভয়ই উল্লেখ করেছেন যে, সৌন্দর্য দ্বারা ফিতনা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে, দাসীর প্রতি দৃষ্টিপাত সীমাবদ্ধ করা উচিত।[12]আল মুগনী ৭/১০৩

দাসীর আভ্যন্তরীণ আবরাহ (অবরুদ্ধ অংশ) মূলত নিরাপদ পরিবেশে প্রযোজ্য। যদি ফিতনা বা বিপদ থাকে, দাসীরও হিজাব বাধ্যতামূলক এবং লোকেরা তাদের দিকে না চেয়ে নজর রাখতে হবে। ইবনে তাইমিয়াহ ও অন্যান্য আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, ফিতনা এবং লোভের আশঙ্কা থাকলে দাসীরও হিজাব বাধ্যতামূলক।

অতএব, ইসলামী শিক্ষায় দাসীদের হিজাবের বিধান স্বাধীন মহিলাদের মতো হলেও প্রাকটিক্যাল প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু শিথিলতা থাকতে পারে। তবে যে কোনো সম্ভাব্য ফিতনা বা অশুভ দৃষ্টির ক্ষেত্রে তাদেরও হিজাব বাধ্যতামূলক।

সারকথা

আপনার প্রবন্ধের এই অংশের আলোকে বলা যায় যে, ইসলামে দাসী বা নারী দাসীর পর্দা সংক্রান্ত যে “নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত” সীমাবদ্ধতার ধারণা প্রচলিত, তা ভিত্তিহীন ও ভুল। এটি মূলত দুর্বল বা মুরসাল হাদিসের উপর নির্মিত একটি ভুল ব্যাখ্যা। কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকবিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, দাসী নারীর পর্দা স্বাধীন নারীর মতোই বাধ্যতামূলক, এবং উভয়ের ওপর একই রকম বিধান প্রযোজ্য। জেলাবাব পরিধান করার নির্দেশের উদ্দেশ্য হলো নারীকে পরিচিতি ও সুরক্ষা দেওয়া, যাতে তারা সম্ভ্রান্ত নারী হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং অনুপযুক্ত উত্যক্তি থেকে রক্ষা পায়। তদুপরি, যুগের মহান আলেমগণ—ইমাম ইবনুল কাত্তান, ইবনে হাজম, আবু হায়ান আল-আন্দালুসী, ইমাম নববী, এবং শাইখ নাসির উদ্দিন আলবানি—এতে একমত যে দাসী ও স্বাধীন নারীর মধ্যে হুকুমে কোনো পার্থক্য নেই; বরং কিছু ক্ষেত্রে দাসীর পর্দার বিধান আরও কঠোর। সুতরাং, ইসলামবিদ্বেষীদের অভিযোগ যে দাসীর পেট, বুক ইত্যাদি প্রকাশ করা বৈধ বা নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢেকে রাখাই যথেষ্ট, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং ইসলামী শাস্ত্রে অগ্রহণযোগ্য।

অভিযোগ ও খন্ডন- ৪: হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু কি দাসীদের পর্দা করার কারণে প্রহার করতেন?

নাস্তিকদের অভিযোগ :

ইসলামবিদ্বেষী ও নাস্তিকগণ একটি হাদিসকে সামনে অভিযোগ করে থাকেন যে হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা তিনি নাকি পর্দা করার কারণে মারধোর করতেন এবং আঘাত করতেন। তাদের দাবির স্বপক্ষে তারা একটি হাদিস দিয়ে দলিল দিয়ে থাকেন, আসুন আমরা জানার চেষ্টা করব আসলেই কি হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এই কাজ করতেন।

অভিযোগ খন্ডন :

এ অভিযোগটিকে আমরা কয়েকটি ভাবে জবাব দেবো। আসুন এবার আমরা বিস্তারিত আলোচনা করি।

প্রথমত,

নাস্তিকদের উল্লেখিত হাদিসটি নিয়ে পর্যালোচনা করব এবং দেখব হাদিসটির মান কি? তাদের উল্লেখিত হাদিসটি কি বিশুদ্ধ না জাল?

নাস্তিকদের দেয়া হাদিসটি নিম্নরুপ

حَدَّثَنَا وَكِيعٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ قَتَادَةَ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ: رَأَى عُمَرُ أَمَةً لَنَا مُتَقَنِّعَةً، فَضَرَبَهَا وَقَالَ: «لَا تَشَبَّهِي بِالْحَرَائِرِ

উমর (রাঃ) ঘোমটা দেওয়া একজন দাসীকে দেখতে পেয়ে তাকে প্রহার করলেন। এবং বললেন, স্বাধীন নারীর সাদৃশ্য অবলম্বন করোনা।[13]মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ: ২/৪১

এ হাদিসের হুকুম নিয়ে খুব অল্প সংখ্যাক ওলামায়ে কেরামদের মতপার্থক্য করেছে। আল্লামা নাসির উদ্দিন আলবানী এর মতে হাদীসটি বিশুদ্ধ। কিন্তু উনার বহু আগের বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনুল কাত্তান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন হাদীসটি বিশুদ্ধ নয়।

هذا نصه، وليس بصحيح، ولا فيه أكثر من إنكاره عليها أن تتريا بري بطن بها من أجله أنها حرة،

অর্থঃ এটি তাঁর [উমার (রা.)] থেকে বর্ণিত নেই। এবং এটি সহীহ বর্ণনা নয়। আর এই বর্ণনাতেও সেই দাসী কর্তৃক স্বাধীন নারীর মতো পোশাক পরার ব্যাপারে নিষেধ করা থেকে বেশি কিছু নেই।[14]আহকামুন নযর: ১/২৩০

দ্বিতীয়তঃ

উপরোক্ত হাদিসটির ব্যাপারে যুগ শ্রেষ্ঠ আলেমগণের মধ্যে মত পার্থক্য রয়েছে যে হাদীসটি বিশুদ্ধ কিনা। কিন্তু ইতিপূর্বে আমরা আপনাদেরকে স্পষ্ট করেছি পবিত্র কুরআন মাজীদ এবং সহিহ হাদিসের আলোকে একজন স্বাধীন নারী এবং দাসীর পর্দার মাঝে তেমন কোন পার্থক্যই নেই। বিস্তারিত জানতে পড়ুন “অভিযোগ ও খন্ডন- ২: ইসলামে কি যুদ্ধবন্দী কিংবা দাসীর পর্দা শুধু নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত?” এ অংশটি।

চতুর্থত:

উপরের হাদিসটিকে ভালোভাবে লক্ষ্য করুন, কি বলা হয়েছে হাদীসটিতে আবারো অনুবাদটি দেখুন উমর (রাঃ) ঘোমটা দেওয়া একজন দাসীকে দেখতে পেয়ে তাকে প্রহার করলেন। এবং বললেন, স্বাধীন নারীর সাদৃশ্য অবলম্বন করোনা। এখানে হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু একজন দাসীকে স্বাধীনা নারীর সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করার কারণে তাকে প্রহার করে। এ হাদিস থেকে কখনো এটা প্রমাণিত হয় না যে দাসীরা পর্দা করার কারণে তাদেরকে প্রহার করা হয়েছে বরঞ্চ তাদেরকে প্রহার করা হয়েছে স্বাধীনা নারীর সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করার জন্য। অতএব, ঘটনাটির মূল কারণ ছিল স্বাধীন নারীদের বিশেষ পোশাক বা সামাজিক চিহ্নের অনুকরণ (تشبه)।

মোটকথা,

উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, হযরত উমর (রাঃ)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উক্ত বর্ণনাকে কেন্দ্র করে যে প্রচারণা চালানো হয়—তা গবেষণার মানদণ্ডে টেকে না। কারণ, প্রথমত বর্ণনাটির সহীহ হওয়া নিয়েই মুহাদ্দিসগণের মাঝে মতভেদ রয়েছে; দ্বিতীয়ত, এর ভাষ্য গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—এতে পর্দা নিষিদ্ধ করার কোনো নির্দেশ নেই, বরং স্বাধীন নারীদের বিশেষ সামাজিক পরিচয়ের অনুকরণ থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে; তৃতীয়ত, এটি সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে একজন সাহাবীর ইজতিহাদী আমল, যা কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর সার্বজনীন বিধানের উপর প্রাধান্য পায় না; এবং চতুর্থত, ইমামগণের উসূলী বক্তব্য অনুযায়ী—স্বাধীন নারী ও দাসীর মধ্যে মৌলিক বিধানে সমতাই মূলনীতি, যতক্ষণ না নির্ভরযোগ্য দলীল দ্বারা পার্থক্য প্রমাণিত হয়।

অতএব, এই একক ও বিতর্কিত বর্ণনাকে ভিত্তি করে ইসলামের পর্দা বিধানকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা সম্পূর্ণ অজ্ঞতাপ্রসূত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার। বরং কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি হলো—সমস্ত মুমিন নারীর জন্য শালীনতা, সতীত্ব ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

Citation is loading...

Footnotes

Footnotes
1 আন-নযর ফী আহকামিন-নযর, পৃ. ১৩৫–১৩৬
2 আহকামুন-নযর’  ২৪/২
3 সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)| হাদিস:৫১৬১
4 আল মুহাল্লাহ ৩/২১৮–২১৯
5 রাওদাতুত ত্বালেবীন : ৭/২৩
6 মিনহাজুত ত্বালিবীন: ২০৪
7 তুহফাতুল মুহতাজ : ৭/১৯৯
8 উদ্ধৃত: “কিতাবুল মার‘আতুস সালিমা” (পৃষ্ঠা ৯০–৯৪)।
9 মাজমু আল ফাতাওয়াহ: ১৫/৩৭২
10 শারহুল উমদাহ – ইমাম ইবন তাইমিয়া ২/২৭৫
11 মাওয়াহিব আল জালিল, মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ আল মাগরিবি ১/১০৫
12 আল মুগনী ৭/১০৩
13 মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ: ২/৪১
14 আহকামুন নযর: ১/২৩০
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Back to top button