সহিহ হাদিসে satanic verse এর প্রমাণ রয়েছে?
ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরাহ ওয়ান-নাজম তিলাওয়াতের পর সিজদা করেন এবং তাঁর সাথে সমস্ত মুসলিম, মুশরিক, জ্বিন ও ইনসান সবাই সিজদা করেছিল।1আরেকটা:
‘আবদুল্লাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত যে, একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরাহ্ আন্ নাজ্ম তিলাওয়াত করেন, অতঃপর সিজদা্ করেন। তখন উপস্থিত লোকদের এমন কেউ বাকী ছিল না, যে তাঁর সঙ্গে সিজদা্ করেনি। কিন্তু এক ব্যক্তি এক মুঠো কঙ্কর বা মাটি হাতে নিয়ে মুখমণ্ডল পর্যন্ত তুলে বলল, এটাই আমার জন্য যথেষ্ট। [‘আবদুল্লাহ্ (রাযি.) বলেন] পরে আমি এ ব্যক্তিকে দেখেছি যে, সে কাফির অবস্থায় নিহত হয়েছে।2এখানে মুশরিকরাও সিজদাহ করল কেন? নাস্তিকদের দাবি, তখন নাকি নবি(স.) তাঁর মুখ দিয়ে Satanic verse উচ্চারণ করেছিলেন, যার জন্য মুশরিকরা খুশি হয় এবং মুসলিমদের সাথে তারাও আনন্দে সিজদাহ দেয় (নাউযুবিল্লাহ) । আমার কথা হচ্ছে, তারা সিজদা দিল কেন? তারা তো রাসুল এবং কুরআনের ঘোর বিরোধী ছিল।
References:
1. সহীহ বুখারী ১০৭১
2. সহীহ বুখারী ১০৭০
তাফসীরকারগণ এর বেশ কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছেনঃ
১) এটিই প্রথম সূরা যা মুশরিকদের উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে পাঠ করা হয়েছিল, যাতে সিজদার একটি আয়াত ছিল। মুশরিকরা হয় এই সূরায় তাদের মূর্তিগুলোর নাম [লাত ও উজ্জা] উল্লেখ করার সাথে সাথে তাদের মূর্তিগুলোকে সিজদা করেছিল, অথবা তারা অনিচ্ছাকৃতভাবে সিজদা করেছিল অথবা তারা ভয় করেছিল যে তারা তৎকালীন উপস্থিত সকল মুসলমানের বিপরীত কাজ করবে। (সূত্রঃ ফাতহুল বারী, হাদিস : ১০৬৭ ও ৪৮৬৩)
২) শাহ ওয়ালীউল্লাহ আদ দেহলভী (রহঃ) ব্যাখ্যা করেছেন যে, সে সময় [ইসলাম ও নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম] এর সত্য প্রকাশ হয়ে যায়, ফলে সকলেই না চাইতেও আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু যখন সেই মুহূর্ত অতিবাহিত হলো, তখন যারা কুফরীকে বেছে নিল, তারা কুফরী করল এবং যারা ইসলাম গ্রহণকে বেচে নিল, তারা মেনে নিল।
আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী (রহঃ) এ ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করার পর বলেছেন যে, এটিই সবচেয়ে সন্তোষজনক উত্তর (وهذا التأويل لا بد من المصير إليه) (ফাতহুল মুলহিম, হাদিস : ১২৬৪)
Answered by: Moulana Suhail Motala - https://hadithanswers.com/the-reason-for-the-disbelievers-prostrating-when-nabi-sallallahu-alayhi-wa-sallam-recited-surah-najm/
যারা হাদিসটা দেখিয়ে যুক্তিটা দেয় তাদের এই যুক্তিটি বেশ লেইম, কারন বহু মুশরিক লুকিয়ে কোরআন তেলাওয়াত শুনতো, [ https://www.alkawsar.com/bn/article/3549/ ] কেন? সেখানে কি তাদের দেবদেবীর প্রশংসা করা হত? অবশ্যই না।
আপনার প্রশ্নের দ্বারা বুঝা গেল, আপনি প্রি ইসলামিক আরবদের ঐশ্বরিক বিশ্বাস সম্পর্কে completely অজ্ঞ।
আরবরা শুধু মূর্তিপূজা করত না। তারা আল্লাহকে সমগ্র সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা মনে করত। এর বহুপ্রমাণাদি কুরআনেই আছে। তাদের মূল ত্রুটি ছিল তারা লাত উযযা মানাত, ও হুবল এদেরকে আল্লাহ ও তার বান্দার মধ্যবর্তী intercession কারী বা শাফায়েতকারী মনে করত। সূরাহ নাজম সহ অন্যান্য সূরায় আরবদের ততকালীন বিশ্বাসের ত্রুটিসমূহ উল্লেখিত আছে। আরবদের মধ্যে রেওয়াজ ছিল তারা যখন কোন উচ্চ বাগ্নীতা পূর্ন কবিতা বা কাব্য শুনত তখন তারা একটি সম্মান সূচক সেজদা করত। আরবদের মধ্যে শিরক ছিল শিরক বা অংশীবাদ সাব্যস্ত করণ ছিল কিন্তু তারা কখনই আপনার তথাকথিত নাস্তিক বন্ধুদের মতন আল্লাহকে অস্বীকার করত না।
যেমন সূরাহ যুমারের নিম্মের আয়াতটিতে আছে যে কুরাইশ মুশরিকদের জিজ্ঞাসা করা হলে তারা জবাব দেবে আসমান ও যমীনের স্রষ্টা আল্লাহ
وَ لَئِنۡ سَاَلۡتَهُمۡ مَّنۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ لَیَقُوۡلُنَّ اللّٰهُ ؕ قُلۡ اَفَرَءَیۡتُمۡ مَّا تَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ اِنۡ اَرَادَنِیَ اللّٰهُ بِضُرٍّ هَلۡ هُنَّ كٰشِفٰتُ ضُرِّهٖۤ اَوۡ اَرَادَنِیۡ بِرَحۡمَۃٍ هَلۡ هُنَّ مُمۡسِكٰتُ رَحۡمَتِهٖ ؕ قُلۡ حَسۡبِیَ اللّٰهُ ؕ عَلَیۡهِ یَتَوَكَّلُ الۡمُتَوَكِّلُوۡنَ ﴿۳۸﴾
আর তুমি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর, কে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে ‘আল্লাহ’। বল, ‘তোমরা কি ভেবে দেখেছ- আল্লাহ আমার কোন ক্ষতি চাইলে তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ডাক তারা কি সেই ক্ষতি দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমাকে রহমত করতে চাইলে তারা সেই রহমত প্রতিরোধ করতে পারবে’? বল, ‘আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট’। তাওয়াক্কুলকারীগণ তাঁর উপরই তাওয়াক্কুল করে (৩৯:৩৮)।
কাজেই কুরাইশদের উক্ত আয়াত শুনে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেজদা করা কোন নব্য কিছু নয়। কারণ তারা আল্লাহকে বিশ্বাস করত যেহেতু তারা ইসমাইল (আ) এর বংশধর ছিল। এবং সূরাহ নাজমের শেষ আয়াতটিতে আল্লাহকে সেজদা করবার কথাই বলা হচ্ছে।
সূরাহ নাজমের শেষ আয়াতটি সেজদার আয়াত। এর পাওয়ার আপনি তিলাওয়াত শুনলেই বুঝতে পারবেন। সূরাহ নাজমের শেষ দিককার আয়াত সমূহ তিলাওয়াত করলে যেকোন ব্যাক্তির গা শিহরিত অবস্থায় থাকে। কুরআন শুনলে আরবরা যে মুগ্ধ হয়ে জ্ঞান শূন্য হয়ে যেত এর অসং্খ্য প্রমাণাদি কুরআনেই আছে। পড়ুন, সূরাহ ফুসসিলাতের প্রথম পাচটি আয়াতের তাফসীর৷ উতবা বিন রাবিয়াহ, সূরাহ ফুসসিলাত শুনে কুরাইশদের নিকট ফেরত আসলে তারা বলা শুরু করে কুরআন হইল "জাদু"। কুরাইশরা বলল, উতবা মুহাম্মাদ (সা) এর জাদুর স্বীকার হইছে। যে জাদু মানুষকে বশ করার ক্ষমতা রাখে।
মুশরিক কুরাইশ কবি ওয়ালিদ বিন মুগীরাহ স্বীকার করতে বাধ্য হইছিল যে কুরআন আসলে অন্যরকম যা চিত্তাকার্ষক। আমরা যারা বাংলা বা অন্য ভাষা ভাশী আছি তাদের পক্ষে এটা অনুধাবন করা সহজজাত না স্বাভাবিক। ঘটনাটি বায়হাকি দালাইলুন নবুয়াত ২/১৯৯২০১ সহ অন্যান্য গ্রন্থে ইতিহাসবিদদের নিকট প্রসিদ্ধ।
কুরআনের আকৃষ্ট বা মোহ করার ক্ষমতার কারণে এক পর্যায়ে মুশরিকরা কুরআনকে জাদু বলা শুরু করে। সূরা মুদাচ্ছির পড়ুন
ثم ادبر و استكبر ﴿۲۳﴾
তারপর সে পিছনে ফিরল এবং অহংকার করল।
فَقَالَ اِنۡ هٰذَاۤ اِلَّا سِحۡرٌ یُّؤۡثَرُ ﴿ۙ۲
তারপর বলল- ‘এ (কুরআন) তো যাদু ছাড়া আর কিছু নয়, এতো পূর্বে থেকেই চলে আসছে।
দ্বিতীয়ত যে সমস্ত হাদিস ব্যাখ্যাকারকেরা স্যাটানিক ভার্সের যইফ ও জাল হাদিস গুলা ব্যাখ্যা করেছেন, তারা একটা কথাই বলেছেন, " শয়তান কুরাইশদের উক্ত লাত উযযার গারাণিক হবার আয়াত সমূহ ছল করে শোনায়, মানে তা রাসূলুল্লাহ (সা) এর মুখ নি:স্বৃত নয় বরঞ্চ তা আলাদাভাবে শয়তানের মুখনি:স্বৃত এবং যা শুধু কুরাইশরাই শুনতে পায় এবং শয়তান এভাবেই কুরাইশদের ধোকায় ফেলে যাতে শুধু তারাই তা শুনতে পায়।" যদিও এগুলা কোন কিছুই সহীহ ও গ্রহণযোগ্যভাবে প্রমাণিত না।
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস শায়েখ আলবানী একটা সম্পূর্ন কিতাবই লিখেছেন, কিচ্ছাতুল গারাণিকের অসাড়তা বর্ননা করে।
কুরাইশদের সহিত রাসূলুল্লাহ (সা) আল্লাহকে বিশ্বাস করানো সংক্রান্ত কোন দ্বন্দ ছিল না। কুরাইশরা অলরেডি আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব মানত। দ্বন্দটা ছিল তারা অর্থাৎ কুরাইশরা আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যে ওছিলা বা মধ্যস্ততাকারী বা সুপারিশকারী সাব্যস্ত করত যেমন (লাত উযযা) । যেমনটি বর্তমানে মাজার ও কবর পূজারীরা বিশ্বাস করে যে পীর তাদের পক্ষ্য হয়ে সুপারিশ করবে।কাজেই কুরাইশদের আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেজদা করা অকল্পনীয় কিছু নয়। কারণ সূরাহ নাজমের শেষ আয়াতে আছে:
فاسجدوا لله و اعبدوا ﴿ٛ۶۲﴾ (سجود)
সুতরাং তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিজদা কর এবং ইবাদাত কর।(৫৩:৬২)
যেহেতু কুরাইশরা আল্লাহকে সবার উপর স্রষ্টা বিশ্বাস করত সেহেতু আল্লাহর প্রশংসা শুনে তার জন্য সেজদা করাটা কোন অকল্পনীয় বা তাদের নিকট নতুন কোন বিষয় নয়।
আর উক্ত হাদিসদুইটায় অন্তত স্যাটানিক ভার্সের কারণেই কুরাইশরা সেজদা করছে এমন কোন ক্লিয়ার এভিডেন্স নাই। কারণ প্রখ্যাত মুহাদ্দিসিনদের অভিমতে এই হাদিসদুইটা এবং সেজদা দেবার ঘটনার জানবার কারণেই আরবের যিন্দিকরা রাসূলুল্লাহ (সা) এর মৃত্যুর পর এই কেচ্ছাতুল গারানিকের মিথ্যা গল্পটা রচনা করে।
কুরাইশদের আল্লাহকে বিশ্বাস করার প্রমাণ হুদাইবিয়াহর সন্ধির সময় মুশরিক সুহাইল কর্তৃক বার বার আল্লাহর নামে কসম খাওয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়:
মুসলিমগন বললেন, আল্লাহর কসম! আমরাبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ছাড়া আর কিছু লিখব না। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, লিখ,بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ তারপর বললেন, এটা যার উপর চুক্তিবদ্ধ হয়েছে আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন সুহায়ল বলল, আল্লাহর কসম! আমরা যদি আপনাকে আল্লাহর রাসূল বলেই বিশ্বাস করতাম, তাহলে আপনাকে কাবা যিয়ারত দেখে বাধা দিতাম না এবং আপনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে উদ্যত হতাম না। বরং আপনি লিখুন, আবদুল্লাহ পুত্র মুহাম্মদ (এর তরফ থেকে)। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ’নিশ্চুই আমি আল্লাহর রাসূল কিন্তু তোমরা যদি আমাকে অস্বীকার কর তবে লিখ, আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ।
সহীহুল বুখারি আন্তর্জাতিক নাম্বার ২৭৩১-২৭৩৩ হাদিস দেখতে পারেন