সন্তানের সাথে বাবা মায়ের সাদৃশ্য তায় হাদিসের সাথে অসাঞ্জস্যতা

প্রশ্নোত্তর (Q&A) › Category: হাদিস › সন্তানের সাথে বাবা মায়ের সাদৃশ্য তায় হাদিসের সাথে অসাঞ্জস্যতা
Fahad Siam. asked 10 মাস ago
আসসালামুয়ালাইকুম।https://www.facebook.com/100000561910678/posts/pfbid02Y8Aqv3Hd1kKYnZxZt7qvaqyeyYuL4s1TFAFfyu516qPPUC47Ck9ounB5TErcuL7Pl/?app=fbl এইখানে response to anti islam  ওয়েবসাইটে মিনার ভাই একটি আর্টিকেল লিখেছেন সন্তানের সাথে বাবা মায়ের সাদৃশ্যতার হাদিস সম্পর্কে।উনি খুব ভালো ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু শেষের দিকে অনেক কিছুই গোঁড়ামিল ছিল।("পুরুষের পানি যদি নারীর পানির ওপর سَبَقَ হয়, তাহলে সন্তান দেখতে পিতার মত হয়। অন্যদিকে নারীর পানি যদি পুরুষের পানির ওপর سَبَقَ হয়, তাহলে সন্তান দেখতে মায়ের মত হয়।” [16] )এটা ঐ হাদিসের অংশ। এবং মূল হাদিসে আছে মহিলার তরল হলুদ।এমনকি এ সম্পর্কে islamic authors এর একটি আর্টিকেল ও পড়েছি।যাক প্রশ্নে আসি।আমি জানতে পেরেছি যে নারীর ডিম্বাণু হলুদ নয় ।এটি সচ্ছ ও খালি চোখে দেখা যায় না। আমি ঐ islamic authors এ আর্টিকেলে পড়েছি এবং সেখানে বলা হয়েছে নারীর ডিম্বাণু হলুদ যা বৈজ্ঞানিক ভাবে ভুল। এবং ওখানে একটা ছবিও দেওয়া ছিল যাকে ডিম্বাণু বলা হয়েছে। কিন্তু আসলে ওটা ডিম্বাণু ছিল না।ওটা ডিম্বাণুর বাইরের আবরণের দৃশ্য যা হলুদ।   ((‌আপনার দেওয়া ছবিটি দেখে মনে হচ্ছে এটি ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির সময় তোলা ছবি, যেখানে ওভারি (ovary) থেকে ফলিকল (follicle) অ্যাসপিরেট করা হচ্ছে বা ডিম্বাণু (oocyte) সংগ্রহ করা হচ্ছে। এটি প্রধানত IVF-এর পুরনো পদ্ধতি (laparoscopic egg retrieval)-এর ছবি, যা এখন কম ব্যবহৃত হয় (আজকাল transvaginal ultrasound-guided retrieval বেশি সাধারণ)। ছবিতে যে হলুদাভ/সোনালি, স্বচ্ছ, গোলাকার বস্তু দেখা যাচ্ছে (যাকে "Egg" লেবেল করা হয়েছে), সেটি আসলে খাঁচা ডিম্বাণু নয়। এটি হলো: Cumulus-oocyte complex (COC): ম্যাচিউর ডিম্বাণুকে ঘিরে থাকা কিউমুলাস কোষের (cumulus cells) মেঘের মতো স্তর। এই কিউমুলাস কোষগুলো এক্সপ্যান্ডেড (fluffy/cloud-like) হয়ে থাকে, যার ফলে পুরোটা হলুদাভ, স্বচ্ছ এবং তুলনামূলক বড় দেখায়। অথবা, অনেক ক্ষেত্রে এটি corpus luteum (ওভুলেশনের পর ফলিকল থেকে তৈরি হলুদাভ স্ট্রাকচার) বা ফলিকলের অন্য অংশ। প্রকৃত মানব ডিম্বাণু (human ovum/oocyte) কেমন? এটি মানবদেহের সবচেয়ে বড় কোষ — ব্যাস প্রায় ০.১ মিমি (১০০-১২০ মাইক্রন)। খালি চোখে ঠিকমতো আলোতে খুব কষ্ট করে দেখা যায় (যেমন একটা সূক্ষ্ম সাদা/হালকা বিন্দু, চুলের প্রস্থের সমান), কিন্তু একা একা দেখা প্রায় অসম্ভব — সাধারণত গ্রুপে থাকলে বা পেট্রি ডিশে দেখা যায়। রঙ: স্বচ্ছ বা হালকা হলুদাভ/প্যালে, কিন্তু কিউমুলাস কোষ ছাড়া হলে অনেক ছোট ও সূক্ষ্ম। মাইক্রোস্কোপে দেখলে গোল, স্বচ্ছ, মাঝে গ্র্যানুলার সাইটোপ্লাজম। আপনার বলা "সূক্ষ্ম ও হলুদ" বৈশিষ্ট্য দুটোই মিলে যায় cumulus-oocyte complex-এর সাথে, যা IVF-এ egg retrieval-এর সময় এভাবেই দেখা যায়। প্রকৃত ডিম্বাণুকে ল্যাবে কিউমুলাস কোষ সরিয়ে (denudation) তবেই আলাদা করে দেখা হয়। এখানে কিছু তুলনামূলক ছবি: IVF laparoscopic egg retrieval-এর সময় কেমন দেখায় (আপনার ছবির মতো): মাইক্রোস্কোপে cumulus-oocyte complex (যা retrieval-এ পাওয়া যায়): খালি চোখে প্রকৃত ডিম্বাণু কেমন দেখায় (খুব সূক্ষ্ম বিন্দু): সারাংশ: ছবিতে যা দেখছেন, সেটি ডিম্বাণু নয় — বরং ডিম্বাণু-ঘেরা কিউমুলাস কমপ্লেক্স বা ফলিকলের অংশ, যা হলুদ ও বড় দেখায়। প্রকৃত ডিম্বাণু অনেক সূক্ষ্ম!)) আমি ঐ ছবিটা grokAIকে দেখালে সে এগুলো বলেছে। এবং আমি গুগুলেও সার্চ করেছি এবং সেখানে ও দেখেছি আসল ডিম্বাণু হলুদ নয়।  সন্তানের সাদৃশ্যতা নির্ধারিত হয় পিতা,মাতার জিন,আ্যলিল , ক্রোমোজোম ইত্যাদির মাধ্যমে যা ডিম্বাণুর অংশ। এবং হাদিসে ও বলা হয়েছে নারীর তরল হলুদ ও পাতলা।   ডিম্বাণুর বাইরের কিছু অংশ এবং বাইরের কিছু তরল হলুদ যা ডিম্বাণুকে ঢেকে রাখে। কিন্তু এগুলো ডিম্বাণু নয়। এবং এগুলো সন্তানের সাদৃশ্যতায় কোনো ভূমিকা রাখে না। এবং এখানে এরকম কোনো ক্রোমোজোম ও নেই। কিন্তু হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী হলুদ তরলটি এই বাইরের হলুদ অংশকেই নির্দেশ করছে। কিন্তু ঐ আর্টিকেলে আপনার ব্যাখ্যা পুরোটাই ছিল আ্যলিল , ক্রোমোজোম ইত্যাদি নিয়ে। যেগুলো ডিম্বাণুর অংশ না। তাহলে কি ঐ হাদিসে ডিম্বাণু ব্যতীত অন্য কিছু বুঝিয়েছে ?
2 Answers
Ashraful Nafiz Staff answered 2 সপ্তাহ ago

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

একটি বিষয় পরিষ্কার করে দেই, মুশফিকুর রহমান মিনার ভাইয়ের ওয়েবসাইটে লিখাটা উনি নিজে লিখেন নি, বরং সোহেল রহমান নামের অন্য একজন লিখেছেন।

তারপর আপনি শেষের দিকে বলেছেন উক্ত ভাইয়ের ব্যাখ্যা পুরোটাই ছিল আ্যলিল , ক্রোমোজোম ইত্যাদি নিয়ে। আপনি এই একটি মন্তব্য হতে মনে হচ্ছে আপনি ভাইয়ের লিখা হয়তো ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারেন নি, কারণ তিনি হাদিসের সনদ নিয়ে বিস্তর পরিসরে উসুলাদির আলোকে কথা বলেছেন। এমনকি আপনি তোলা বহু আপত্তির জবাব উক্ত লিখাতেই রয়েছে৷

যাইহোক আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই প্রাসঙ্গিক। আপনি যাচাই করে প্রশ্ন করেছেন, এটা ভালো লাগল। আপনার উত্থাপিত বিভ্রান্তি দূর করতে বিষয়টি ধাপে ধাপে পরিষ্কার করা যাক:

১. আপনার বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ১০০% সঠিক (ডিম্বাণু বনাম ফলিকুলার ফ্লুইড)

প্রথমেই নিশ্চিত হওয়া দরকার—আপনি এবং GrokAI যে তথ্য পেয়েছেন তা পুরোপুরি সঠিক।

  •  প্রকৃত মানব মানব ডিম্বাণুর (Ovum/Oocyte) ব্যাস প্রায় ০.১ মিমি বা ১০০-১২০ মাইক্রন। এটি কোনো স্পষ্ট হলুদ রঙের বড় বস্তু নয়; বরং স্বচ্ছ/প্যাল (translucent)। এটি মাইক্রোস্কোপিক এবং স্বচ্ছ খালি চোখে সাধারণ পরিস্থিতিতে দেখা যায় না।
  •  ল্যাপারোস্কোপিক রিট্রিভালের সময় যে বড় হলুদাভ পিণ্ডটি দেখা যায়, সেটি খালি ডিম্বাণু নয়; সেটি হলো Cumulus-Oocyte Complex (COC) এবং এর সাথে থাকা ফলিকুলার ফ্লুইড (Follicular Fluid)।

অনলাইনে কিছু কিছু ছবি ও ব্যাখ্যা সত্যিই বৈজ্ঞানিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ। তাই কোনো ইসলামিক আর্টিকেল যদি দাবি করে থাকে যে “নারীর ডিম্বাণু কোষটি নিজেই হলুদ”—তবে সেটি চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী স্পষ্টতই একটি ভুল তথ্য। কিন্তু সোহেল রহমান ভাইয়ের মূল আর্টিকেলে কিন্তু ডিম্বাণুকে হলুদ বলা হয়নি, বরং স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: “ডিম্বাণু অবস্থান করে ফলিকিউলার ফ্লুয়িডের ভেতর (চিত্র ৪), যার রং হলুদ” (আর্টিকেলের ৫ নং অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য)।

২. “হলুদ তরলে ক্রোমোজোম নেই, তবে জিনতত্ত্বের সাদৃশ্যের সাথে হাদিস মিলবে কীভাবে?”

আপনার মূল সংশয়টি এই জায়গায়। আপনি ভেবেছেন: হাদিস যদি ডিম্বাণুর বাইরের হলুদ তরলকে নির্দেশ করে, আর ক্রোমোজোম যদি থাকে ভেতরের ডিম্বাণুতে, তবে হলুদ তরলের সাথে সন্তানের সাদৃশ্যের (Allele Dominance) সম্পর্ক তৈরি করা কি এক ধরণের ‘গোঁজামিল’ নয়?

এই সংশয়টি দূর করা যায় বিভিন্ন ভাবে, হাদিসে "নারীর পানি" বলতে শুধু ডিম্বাণু একাই বোঝানো বাধ্যতামূলক নয়। "বাংলায় যেমন আমরা বলি 'দেশ সমৃদ্ধ হয়েছে'—এখানে 'দেশ' শব্দ অর্থনীতি, মানুষ, সংস্কৃতি সব কিছু নির্দেশ করে, শুধু মাটি নয়।  একইভাবে আরবিতে 'ماء' (পানি) শব্দ নারীর জনন-প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য উপাদানকেও বোঝায়।

আরেকটি হলো যদি আমরা পুরুষের পানির (বীর্য) সাথে বিষয়টিকে তুলনা করি, পুরুষের ক্ষেত্রে কী ঘটে? হাদিসে পুরুষের বীর্যকে বলা হয়েছে: “সাদা ও ঘন পানি”। বিজ্ঞান কী বলে? পুরুষের বীর্য মূলত সেমিনাল প্লাজমা (Seminal Plasma)। এই সাদা তরলটি তৈরি হয় প্রোস্টেট ও সেমিনাল ভেসিকল থেকে। ক্রোমোজোম কোথায় থাকে? ক্রোমোজোম কিন্তু সাদা তরলটির (সেমিনাল প্লাজমা) রাসায়নিক উপাদানের মধ্যে থাকে না। ক্রোমোজোম থাকে এর ভেতরে সাঁতার কাটতে থাকা অতিক্ষুদ্র, খালি চোখে অদৃশ্য শুক্রাণুর (Sperm) ভেতর। শুক্রাণু নিজে দেখতে সাদা তরল নয়, কিন্তু শুক্রাণু যে তরলে ভেসে থাকে, সামগ্রিকভাবে সেই উপাদানকেই সাধারণ মানুষের ভাষায় বলা হয় "পুরুষের পানি"। এই ক্ষেত্রে হাদিস শুক্রাণু ছাড়া অন্য কিছু বুঝিয়েছে এমনটা কেউ বলে না। কারণ এখানে "পানি" মানে বোঝানো হয়েছে প্রজনন-উপাদান বহনকারী তরলটিকে, যার ভেতরের গ্যামেটই সাদৃশ্যের কাজ করে, আর রং হলো সেই তরলের পরিচয়।

নারীর ক্ষেত্রে কী ঘটে? ঠিক একইভাবে, নারীর জননকোষ বা ডিম্বাণু তৈরি ও পরিপক্ব হয় ডিম্বাশয়ের ফলিকলের ভেতরে, যা ফলিকুলার ফ্লুইড (Follicular fluid) নামক হলুদ ও পাতলা তরলে নিমজ্জিত থাকে। নারীর ডিম্বাণু শুক্রাণুর মতোই মাইক্রোস্কোপিক। এই ডিম্বাণুটি যে তরল মাধ্যম থেকে পুষ্টি পেয়ে পরিপক্ব হয় এবং ওভুলেশনের সময় ডিম্বাশয় থেকে নির্গত হয়, সেই তরল মাধ্যমটিই হলো "নারীর হলুদ ও পাতলা পানি"। নারীর ক্ষেত্রেও আর্টিকেলের ব্যাখ্যা তাই: ডিম্বাণু যে তরলে থাকে সেটি হলুদ। সাদৃশ্যের কাজটা করে ভেতরের ডিম্বাণুর অ্যালিল। হলুদ তরলই আসল কাজ করে, হাদিস এমন দাবিও করে নি।

সুতরাং সারসংক্ষেপ হলো:

পুরুষের সাদা তরল যেমন সরাসরি জিন বহন করে না (জিন বহন করে এর ভেতরের শুক্রাণু), ঠিক তেমনি নারীর হলুদ তরলও সরাসরি জিন বহন করে না (জিন বহন করে এর ভেতরের ডিম্বাণু)। কিন্তু সপ্তম শতাব্দীর মানুষের কাছে মাইক্রোস্কোপ ছিল না যে রাসুলুল্লাহ ﷺ তাদের কোষ বা নিউক্লিয়াসের কথা বলবেন। তিনি পুরুষ ও নারীর জনন উপাদানের বাহক তরল (Reproductive Carrier Fluids)-কে তাদের স্বাভাবিক রঙের মাধ্যমে চিহ্নিত করেছেন।

৩. হাদিসে ‘পানি’ এবং ‘সাবাক্বা’ (سَبَقَ) শব্দের প্রকৃত উদ্দেশ্য

এই শব্দটি "আগে পৌঁছানো বা উপরে উঠা"র বাইরে আরও অর্থ বহন করে। হাদিসে যখন বলা হচ্ছে: “কারো পানি অপর কারো পানির ওপর سَبَقَ (প্রাধান্য/ক্ষমতা বিস্তার) করে”—এখানে ‘পানি’ বলতে শুধু তরলটির কেমিক্যালকে বোঝানো হয়নি, বরং এটি একটি Metonymy (আরবি অলংকার শাস্ত্রে যাকে ‘মাজায’ বা সামগ্রিক রূপক বলে)। এর অর্থ হলো পিতামাতার নিজ নিজ জনন উপাদানের সামগ্রিক অবদান (Genetic Contribution)।

রিসপন্স টু এন্টি ইসলাম ওয়েব সাইটে সোহেল রহমান ভাইও তাঁর আর্টিকেলে খুব সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন: হাদিসের মূল শব্দ سَبَقَ (সাবাক্বা) বা عَلا (আ’লা)—এর অর্থ কেবল 'আগে দৌড়ে যাওয়া' নয়, বরং আরবি ভাষায় এর অন্যতম প্রধান অর্থ হলো "প্রাধান্য বিস্তার করা বা ডমিনেট করা"। আধুনিক জিনতত্ত্বে মা ও বাবার বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কোনটি প্রকাশ পাবে, তা নির্ধারিত হয় Dominant Allele দিয়ে। যদি বাবার অ্যালিল ডমিনেন্ট হয়, তবে পিতার পানি প্রাধান্য পেল (সন্তান পিতার মতো হলো)। আর যদি মায়ের ডিম্বাণুর অ্যালিল ডমিনেন্ট হয়, তবে মায়ের পানি প্রাধান্য পেল (সন্তান মায়ের মতো হলো)।

প্রাচিন শারাহকারকগণও বলেছেন নারী-পুরুষের পানি একে অপরের উপরে যাওয়া বা প্রাদান্য পাওয়া দ্বারা বুঝানো হয়েছে, এক জনের উপর আরেকজনের বৈশিষ্ট্য বিস্তার করা, প্রভাব ফেলা বা শক্তিশালী হয়ে প্রকাশ পাওয়া। মায়ের পানি বেশি (শক্তিশালী বা প্রকট) হলে সন্তান মাতৃবংশের বৈশিষ্ট্য পায়, পিতার পানি বেশি (শক্তিশালী বা প্রকট) হলে সন্তান পিতৃবংশের বৈশিষ্ট্য পায়। এছাড়া অনেক ওলামা আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন চাইলে দেখতে পারেন সেগুলো [সহিহ মুসলিম (ই.ফা.) ৬০৮, মিশকাত ৫৮৭০ এর ব্যাখ্যা; كتاب منة المنعم في شرح صحيح مسلم ১/২২৪ ; كتاب توفيق الرب المنعم بشرح صحيح الإمام مسلم ১/৫৪৮ ; كتاب فتح المنعم شرح صحيح مسلم ২/৩০৩ ; فتح الباری ৭/৩৯৩৮]

ততকালীন সময়ে মানুষের জন্য যেমনটা বোধগম্য ছিল আল্লাহর রাসুল সেরকম ভাষা প্রয়োগ করে বিষয়টা বুঝিয়েছেন। এখানে নিশ্চয়ই জীন, ক্রোমেজোম, এলিল ইত্যাদি শব্দগুলো উপস্থিত না থাকাটাই অধিক স্বাভাবিক বিষয়। এখানে কোনো গোঁজামিল নেই; বরং প্রাচীন আরবের ভাষা ও আধুনিক বিজ্ঞানের জেনেটিক পরিভাষার মধ্যে চমৎকার একটি ধারণাগত সামঞ্জস্য রয়েছে।

৪. তাহলে হাদিসে কি ডিম্বাণু ব্যতীত অন্য কিছু বুঝিয়েছে?

মূল প্রশ্নটি হলো "হাদিস হলুদ তরলের কথা বলছে; ক্রোমোজোম তো সেখানে নেই, যা সাদৃশ্য নির্ধারণ করে?"

হাদিসে ডিম্বানুও বুঝানো হয় নি আবার এর ব্যতিত অন্য কিছুকেও বুঝানো হয় নি। হাদিসের ماء - পানি কথাটি হচ্ছে একটি সামগ্রিক বা ম্যাক্রোস্কোপিক টার্ম।

  • পুরুষের জনন উপাদান = সেমিনাল ফ্লুইড + শুক্রাণু (বর্ণনায়: সাদা ও ঘন)।
  • নারীর জনন উপাদান = ফলিকুলার ফ্লুইড + ডিম্বাণু (বর্ণনায়: হলুদ ও পাতলা)।

হাদিসটি কোনো মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবের রিসার্চ পেপার নয় যে সেখানে তরল আর কোষকে আলাদা আলাদা কেমিক্যাল কম্পোজিশনে ভাগ করে বলতে হবে। হাদিসের উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন মানুষকে তাদের বোধগম্য ভাষায় বোঝানো যে—সন্তান কেবল পুরুষের বীর্য থেকেই এককভাবে সবকিছু পায় না (যা তৎকালীন গ্রিক ও বহু প্রাচীন সমাজে বিশ্বাস করা হতো), বরং নারীরও নিজস্ব জনন উপাদান রয়েছে এবং সন্তানের সাদৃশ্যে নারীর উপাদানেরও সমান প্রাধান্য বিস্তারের ক্ষমতা রয়েছে।

একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে খামে এবং তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। কেউ যদি বলে 'আমি খামটি পাঠিয়েছি', তা খামের সাথে চিঠি এবং বার্তাকেও নির্দেশ করে।

আল্লাহু আলাম

M. M. Apurba answered 1 সপ্তাহ ago

১. আরবি ভাষার নিয়ম: সিনেকডোকি / মাজাজ মুরসাল (অংশ উল্লেখ করে পুরোকে উদ্দেশ্য করা)

আরবি ভাষায় (এবং অন্যান্য ভাষায়ও) একটি প্রচলিত বালাগাতী নিয়ম আছে—synecdoche বা মাজাজ মুরসাল। এর অর্থ: অংশ উল্লেখ করে পুরোকে বোঝানো, বা স্থান/ধারণা উল্লেখ করে তার অধিবাসী/বিষয়বস্তুকে বোঝানো (by mentioning a part you intend the whole)।

কুরআনের উদাহরণ:

- সূরা বাকারায় (২:১৯-এর আশেপাশে)

"তারা কানে আঙুল দেয়”

এখানে আঙুলের মাথা/অগ্রভাগ উদ্দেশ্য।

- সূরা ইউসুফ ১২:৮২:

> وَاسْأَلِ الْقَرْيَةَ الَّتِي كُنَّا فِيهَا
“আমরা যে জনপদে ছিলাম, তাকে জিজ্ঞেস করো।”

জনপদ/শহর কোনো ব্যক্তি নয় যাকে জিজ্ঞাসা করা যায়। তাফসীরে ইমাম আল-বাগাবী (মৃ. ৫১৬ হি.) বলেন:

> (وَاسْأَلِ الْقَرْيَةَ الَّتِي كُنَّا فِيهَا) أَيْ أَهْلَ الْقَرْيَةِ وَهِيَ مِصْرُ
“অর্থাৎ জনপদের অধিবাসীদের; আর সেটি হলো মিসর।” সূত্র: معالم التنزيل, তাফসির সূরা ইউসুফ, আয়াত ৮২।

বালাগাতের বিস্তারিত ব্যাখ্যা (হালিয়্যাহ/স্থানীয় সম্পর্ক):

الحالیة: وذلك كقوله تعالى: (فَلْيَدْعُ نَادِيَهُ) لاستحالة دعاء المكان، ولكن المراد هنا: أهل النادي... ومنه قوله تعالى: (وَاسْأَلِ الْقَرْيَةَ) [يوسف: ٨٢] أي: أهلها، فلفظ القرية مجاز مرسل علاقته الحالیة...

“যেমন আল্লাহর বাণী, ‘সে তার সমাবেশকে ডাকুক’ (সূরা আল-আলাক ৯৬:১৭)।

স্থানকে ডাকা অসম্ভব; এখানে উদ্দেশ্য সমাবেশের লোকেরা... একইভাবে ‘জনপদকে জিজ্ঞেস করো’—অর্থাৎ তার অধিবাসীদের। ‘القرية’ শব্দটি মাজাজ মুরসাল, সম্পর্ক হালিয়্যাহ (কারণ জনপদ তার অধিবাসীদের অবস্থানের স্থান)। কারিনা: জনপদকে স্বয়ং জিজ্ঞেস করা অসম্ভব।”
সূত্র: *البلاغة الصافية في المعاني والبيان والبديع*, باب علم البيان, المجاز المرسل, العلاقة الحالیة
(লিংক: https://shamela.org/gen/69d39a808cde5_24ab01266dd86f6e732b3a075236dead_gen.pdf )।

আরবি ভাষায় এ ধরনের বালাগাতের উদাহরণ অসংখ্য। কাজেই “পানি/তরল” উল্লেখ করে সেই পানিতে উপস্থিত কোষকে (oocyte) উদ্দেশ্য করা অসম্ভব কিছু নয়। আল্লাহ পাক আলিম ও হাকিম।

২. বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা: Oocyte ফলিকুলার ফ্লুইডে থাকে

ওভারিয়ান ফলিকলে Oocyte (এগ সেল/ডিম্বাণু) হলুদ ফলিকুলার ফ্লুইডে অবস্থান করে। এজন্য ফলিকুলার ফ্লুইডের সাথেই oocyte aspirate (সংগ্রহ) করা যায়।

- জার্নাল: https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/6456756/
(Human luteal phase function following oocyte aspiration from the immediately preovular graafian follicle... — follicular fluid-এর সাথে cumulus-enclosed oocyte aspirate করার কথা স্পষ্ট)।

(নোট: প্রদত্ত অন্য লিংক https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/20576551/ ফলিকুলার ফ্লুইড হলুদ/সেমি-ভিসকাস এবং oocyte-কে ঘিরে থাকে—এটি প্রতিষ্ঠিত।)

শুক্রাণুর কোষ, ডিম্বাণুর কোষ (oocyte) এবং তাতে উপস্থিত জিন ও ক্রোমোজোম—এসব সাদা ও হলুদ তরলেরই অংশ/পার্ট ছিল। কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না।

৩. কুরআন-হাদিস আরবদের ভাষাতত্ত্ব ও উরফ অনুযায়ী নাযিল হয়েছে

কুরআন আরবদের ভাষা ও প্রচলন অনুসারে নাযিল হয়েছে। তৎকালীন আরবরা যা বুঝবে, এমন ভাষা ব্যতীত নাযিল হয়নি। আমাদের বুঝতে হলে আরবদের বুঝ বা উরফ (প্রচলন) অনুসারেই বুঝতে হবে।

ইমাম ইবনে আত্যিয়া আল-আন্দালুসী:

وَأَمَّا إِنْ لَمْ تَكُنِ الْعَرَبُ تَخَاطَبَتْ بِهَا وَلَا عَرَفَتْهَا اسْتَحَالَ أَنْ يُخَاطِبَهُمُ اللَّهُ بِمَا لَا يَعْرِفُونَ، وَحِينَئِذٍ لَا يَكُونُ الْقُرْآنُ عَرَبِيًّا مُبِينًا وَلَا يَكُونُ الرَّسُولُ مُخَاطِبًا لِقَوْمِهِ بِلِسَانِهِمْ.

“যদি আরবরা এসব শব্দে কথা না বলে থাকে এবং সেগুলো না চিনে থাকে, তাহলে আল্লাহ তাদের এমন কিছু দিয়ে সম্বোধন করবেন—যা তারা জানে না—এটা অসম্ভব। সে ক্ষেত্রে কুরআন সুস্পষ্ট আরবি হতো না এবং রাসুলও তাঁর জাতির সঙ্গে তাদের ভাষায় কথা বলতেন না।”

ইমাম শাতিবী (আল-মুওয়াফাকাত):

لا بد في فهم الشريعة من اتباع معهود الأميين، وهم العرب الذين نزل القرآن بلسانهم، فإن كان للعرب في لسانهم عرف مستمر؛ فلا يصح العدول عنه في فهم الشريعة، وإن لم يكن ثم عرف، فلا يصح أن يجرى في فهمها على ما لا تعرفه.

“শরিয়ত বোঝার ক্ষেত্রে উম্মীদের—অর্থাৎ সেই আরবদের, যাদের ভাষায় কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে—প্রচলিত রীতি অনুসরণ করা অপরিহার্য। আরবদের ভাষায় যদি কোনো ধারাবাহিক প্রচলিত রীতি থাকে, তবে শরিয়ত বোঝার ক্ষেত্রে তা থেকে সরে যাওয়া সঠিক নয়। আর যদি কোনো প্রচলিত রীতি না থাকে, তবে এমন কিছুর ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয় যা তারা জানত না।”
সূত্র: https://shamela.ws/book/11435/788 ।

উপসংহার

এই ধারণা করা যে কুরআন-হাদিসে বর্তমান বিজ্ঞান-সমর্থিত টার্মস (যেমন কোষ, ক্রোমোজোম, অ্যালিল ইত্যাদি সরাসরি) থাকবে—তা নেহায়েত বোকামি। আরও বড় বোকামি হলো ধরে নেওয়া যে সেখানে “কোষ”-এর কথা স্পষ্ট লেখা থাকবে। আমাদের ইমাম ও সালাফরা এমন বোঝেননি।

হাদিসে “নারীর পানি/তরল (হলুদ ও পাতলা)” উল্লেখ করে সেই তরলে অবস্থিত oocyte এবং তার জেনেটিক উপাদানকেই (মাজাজ/সিনেকডোকির মাধ্যমে) বোঝানো হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কার (জিন, ক্রোমোজোম) সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে, কিন্তু হাদিসের ভাষা তৎকালীন আরব উরফ ও বালাগাত অনুসারেই ব্যবহৃত হয়েছে।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

Back to top button