আম্মার (রা)-এর শাহাদাত: নবুওয়াতের প্রমাণ বনাম শিয়া প্রোপাগান্ডা

আমাদের নবী (ﷺ) এর বহু ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে, আজকে সেগুলো হতে সাহাবি আম্মার বিন ইয়াসির (রা) শাহাদাতের বিষয় নিয়ে কথা বলবো এবং সাথে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিয়াদের চালানো কিছু প্রোপাগান্ডারও উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।
আম্মার (রা) এর শাহাদাত এর ভবিষ্যদ্বাণী
আমাদের নবী (ﷺ) আম্মার (রা.) জীবিত থাকা অবস্থাতেই উনার শাহাদতের বর্ণনা দিয়েছিলেন এবং উনার জন্য আফসোস করেছিলেন। আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) একটি ঘটনা বর্ণনা করেন: যেখানে নবী (ﷺ) আম্মারের মাথায় হাত দিয়ে বললেন,
وَيْحَ عَمَّارٍ تَقْتُلُهُ الْفِئَةُ الْبَاغِيَةُ
‘আম্মারের জন্য আফসোস, তাকে বিদ্রোহী দল হত্যা করবে।’’[1]সহিহ বুখারী, হাদিস ৪৪৭, সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯১৫
কেউ কেউ হাদিসটিকে অস্বীকার করার চেষ্টা করেন যয়িফ বলে, কিন্তু এটি সহিহ মুতাওয়াতির সূত্রে প্রমাণিত, ২৭/২৮ জন সাহাবা এটি বর্ণনা করেছেন কিছু কম বেশি শব্দে, ইবনে হাজার, যাহাবি, সুয়ুতী, আব্দুল বার নিশ্চিত করেছেন, এ সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো নবী (ﷺ) থেকে ‘তাওয়াতুর’ পর্যায়ে পৌঁছেছে।[2]আল-ইস্তী‘আব ৩/১১৪০; সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ১/৪২১; আল-আযহারুল মানসূরাহ পৃষ্ঠা ২৮৩; ফাতহুল বারী ১/৫৪৩
ইমাম আহমাদ (রহ) বর্ণনা করেন,
حدثنا عفان، قال: حدثنا حماد بن سلمة، قال: أخبرنا أبو حفص وكلثوم بن جبر، عن أبي غادية، قال: قتل عمار بن ياسر فأخبر عمرو بن العاص، قال: سمعت رسول الله ﷺ يقول: إن قاتله وسالبه في النار. فقيل لعمرو: فإنك هو ذا تقاتله! قال: إنما قال: قاتله وسالبه
আবু গাদিয়া (রা) বলেছেন: আম্মার ইবন ইয়াসির নিহত হলেন। আমর ইবনুল আস (রা)-কে এ সংবাদ দেওয়া হলো। তিনি বললেন: আমি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি: ‘তার হত্যাকারী ও তার থেকে লুটকারী উভয়েই জাহান্নামে।’ তাকে বলা হলো: তুমি নিজেও তো তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলে! তিনি বললেন: তিনি (রাসুল) বলেছিলেন ‘তার হত্যাকারী ও তার থেকে লুটকারী’ — (আমি তাকে হত্যা করিনি।)[3]মুসনাদে আহমাদ, ২৯/৩১১, রিসালা সংস্করণ; হাদিসটি সহিহ, কিতাবু সিফাতি রাব্বিল ‘আলামীন, রাসাইলু জামি‘ইয়্যাহ, নাকিস, ১/৪৮৮
‘বিদ্রোহী দল হত্যা করবে’ হাদিসটি উল্লেখ করে হাফিয ইবনে কাসীর (রহ) বলেছেন:
” وَهَذَا الْحَدِيثُ مِنْ دَلَائِلِ النُّبُوَّةِ حَيْثُ أَخْبَرَ صَلَوَاتُ اللَّهِ وَسَلَامُهُ عَلَيْهِ عَنْ عَمَّارٍ أَنَّهُ تَقْتُلُهُ الْفِئَةُ الْبَاغِيَةُ ، وَقَدْ قَتَلَهُ أَهْلُ الشَّامِ فِي وَقْعَةِ صِفِّينَ ، وَعَمَّارٌ مَعَ عَلِيٍّ وَأَهْلِ الْعِرَاقِ كَمَا سَيَأْتِي بَيَانُهُ وَتَفْصِيلُهُ فِي مَوْضِعِهِ ، وَقَدْ كَانَ عَلِيٌّ أَحَقَّ بِالْأَمْرِ مِنْ مُعَاوِيَةَ .
আর এই হাদিসটি নবুওয়াতের অন্যতম প্রমাণ, কেননা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আম্মার (রা)-এর ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, তাঁকে বিদ্রোহী দল হত্যা করবে। আর সিফফিনের যুদ্ধে সিরিয়াবাসীরাই তাঁকে হত্যা করেছিল, অথচ আম্মার ছিলেন আলী ও ইরাকবাসীদের পক্ষে — যার বিস্তারিত বিবরণ যথাস্থানে পরে আসবে। আর নিশ্চয়ই আলী (রা) মুআবিয়া (রা)-এর চেয়ে খিলাফতের অধিক হকদার ছিলেন।[4]আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৪/৫৩৮
ইমাম নববী (রহ) বলেন,
١ – (منها): أن فيه معجزةً ظاهرةً لرسول اللَّه -صلى اللَّه عليه وسلم- من أوجه: منها أن عمارًا يموت قتيلًا، وأنه يقتله مسلمون، وأنهم بُغاة، وأن الصحابة يتقاتلون، وأنهم يكونون فرقتين: باغية، وغيرها، وكل هذا قد وقع مثل فلق الصبح، صلّى اللَّه وسلّم على رسوله الذي لا ينطق عن الهوى: {إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى (٤)} [النجم: ٤]. انتهى (٢).
এতে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর একটি সুস্পষ্ট মুজিযা রয়েছে, বিভিন্ন দিক থেকে। তার মধ্যে একটি হলো — আম্মার (রা) শহিদ হবেন, তাকে মুসলিমরা হত্যা করবে, তারা বিদ্রোহী হবে, সাহাবিরা পরস্পর যুদ্ধ করবে এবং তারা দুটি দলে বিভক্ত হবে — একটি বিদ্রোহী দল ও অপরটি নয়। এই সবকিছুই ভোরের আলোর মতো স্পষ্টভাবে ঘটেছে। আল্লাহ তার রাসুলের উপর দরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন, যিনি প্রবৃত্তির বশে কথা বলেন না: “এটা তো কেবল ওহী যা নাযিল করা হয়।” [সূরা আন-নাজম: ৪][5]শারহুন নববী, ১৮/৪০
ইমাম ইবনে আবদুল বার্র (রহ) বলেন:
“وتواترت الآثار عَنِ النَّبِيِّ -صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- أَنَّهُ قال: تقتل عمارًا الفئة الباغية”. وهذا من إخباره بالغيب، وإعلام نبوّته -صلى الله عليه وسلم- وهو من أصح الأحاديث”.
নবী (ﷺ) থেকে এ মর্মে অসংখ্য বর্ণনা মুতওয়াতিরভাবে এসেছে যে, তিনি বলেছেন: ‘আম্মারকে বিদ্রোহী দল হত্যা করবে।’ এটি তাঁর অদৃশ্যের সংবাদ এবং নবুওয়াতের প্রমাণ, এবং এটি সর্বাধিক সহিহ হাদীসগুলোর অন্তর্ভুক্ত।[6]‘আল-ইস্তি‘আব’ ২/৪৭৪
আম্মার (রা) সিফফীনের যুদ্ধে আলি (রা) এর বিরোধিতাকারীদের হাতে শহিদ হয়েছিলেন। আলিমগণ সর্বসম্মত যে, ‘আম্মার (রা) ৩৭ হিজরীতে সিফফিনের যুদ্ধে শামবাসীদের দ্বারা নিহত হন, যখন তিনি ‘আলী ইবনে আবি তালিব ও ইরাকবাসীদের সাথে যুদ্ধ করছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ৯৩ বছর।[7]আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (৪/৫৩৮), আল-ইসাবাহ (৪/৪৭৪)
কিন্তু সমস্যা হলো, আলী (রা)-এর প্রতি মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসা প্রদর্শন করা কাফির শিয়ারা বিভিন্ন ধরনের প্রোপাগান্ডা চালিয়েছিল মুয়াবিয়া (রা)-এর বিরুদ্ধে, সেগুলোর উত্তরও দেওয়া উচিত, যেন কোনো কনফিউশন না থাকে।
শিয়াদের প্রোপাগান্ডা
এই হাদিস নিয়ে শিয়ারা মুয়াবিয়া (রা) এর বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে থাকে। বুখারির উক্ত হাদিসের শেষের দিকে এসেছে,
يَدْعُوهُمْ إِلَى الْجَنَّةِ وَيَدْعُونَهُ إِلَى النَّارِ
সে তাদেরকে আহবান করবে জান্নাতের দিকে আর তারা তাকে আহবান করবে জাহান্নামের দিকে।[8]সহিহ বুখারী, হাদিস ৪৪৭
এই হাদিস দিয়ে শিয়ারা প্রমাণ করতে চায় মুয়াবিয়া ছিলেন বাগি, উনার পক্ষের লোকেরা জাহান্নামি, তারা জাহান্নামের দিকে আহ্বান করছিল। তারা ছিল পথভ্রষ্ট, এমনকি মুয়াবিয়া ও উনার অনুসারী সাহাবাগণকেও তাকফির করে অনেকে।
বিদ্রোহী বা সীমালঙ্ঘনকারী দল
প্রথমে আলোচনা করি হাদিসের প্রথম অংশে নিয়ে, সেখানে ’বিদ্রোহী বা সীমালঙ্ঘনকারী’ শব্দ দ্বারা যে জাহান্নামিই হবে এমন বুঝাটা বিভ্রান্তিকর। আমাদের অবশ্যই অনিচ্ছাকৃত ইজতিহাদি ভুল ও ইচ্ছাকৃত ফাসাদ ও ফিতনাবাজির মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। ইবনে কাসির (রহ) বলেন,
وَلَا يَلْزَمُ مِنْ تَسْمِيَةِ أَصْحَابِ مُعَاوِيَةَ بُغَاةً : تَكْفِيرُهُمْ ، كَمَا يُحَاوِلُهُ جَهَلَةُ الْفِرْقَةِ الضَّالَّةِ مِنَ الشِّيعَةِ وَغَيْرِهِمْ ; لِأَنَّهُمْ ، وَإِنْ كَانُوا بُغَاةً فِي نَفْسِ الْأَمْرِ، فَإِنَّهُمْ كَانُوا مُجْتَهِدِينَ فِيمَا تَعَاطَوْهُ مِنَ الْقِتَالِ، وَلَيْسَ كُلُّ مُجْتَهِدٍ مُصِيبًا، بَلِ الْمُصِيبُ لَهُ أَجْرَانِ، وَالْمُخْطِئُ لَهُ أَجْرٌ .
আর মুআবিয়া (রা)-এর সঙ্গীদেরকে ‘বাগী’ (বিদ্রোহী) বলাটার অর্থ এই নয় যে তাঁদেরকে কাফের বলতে হবে, যেমনটা শিয়া ও অন্যান্যদের মধ্যকার পথভ্রষ্ট ফিরকারা করে। কারণ, তাঁরা যদিও আক্ষরীক অর্থে বাগী (বিদ্রোহী/সীমালঙ্ঘনকারী) ছিলেন, কিন্তু যুদ্ধ ক্ষেত্রে তাঁরা ছিলেন মুজতাহিদ — আর প্রত্যেক মুজতাহিদই যে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন, এমন কোনো কথা নেই। বরং যে মুজতাহিদ সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছান, তিনি দুটি সওয়াব পান, আর যিনি ভুল করেন, তিনিও একটি সওয়াব পান।[9]আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৪/৫৩৮
কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
আর যদি মুমিনদের দু’দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাহলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের উপর বাড়াবাড়ি করে, তাহলে যে দলটি বাড়াবাড়ি করবে, তার বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না সে দলটি আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। তারপর যদি দলটি ফিরে আসে তাহলে তাদের মধ্যে ইনসাফের সাথে মীমাংসা কর এবং ন্যায়বিচার কর। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালবাসেন। নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোষ- মীমাংসা করে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আশা করা যায় তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে। [সূরা হুজরাত আয়াত ৯-১০]
এই আয়াতের তাফসিরে ইমাম শাফিঈ (রহ) বলেন:
فَذَكَرَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ اقْتِتَالَ الطَّائِفَتَيْنِ وَالطَّائِفَتَانِ الْمُمْتَنِعَتَانِ الْجَمَاعَتَانِ كُلُّ وَاحِدَةٍ تَمْتَنِعُ أَشَدَّ الِامْتِنَاعِ أَوْ أَضْعَفَ إذَا لَزِمَهَا اسْمُ الِامْتِنَاعِ وَسَمَّاهُمْ اللَّهُ تَعَالَى الْمُؤْمِنِينَ وَأَمَرَ بِالْإِصْلَاحِ بَيْنَهُمْ… وَأَمَرَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ بِقِتَالِ الْفِئَةِ الْبَاغِيَةِ وَهِيَ مُسَمَّاةٌ بِاسْمِ الْإِيمَانِ حَتَّى تَفِيءَ إلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ لَمْ يَكُنْ لِأَحَدٍ قِتَالُهَا لِأَنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ إنَّمَا أَذِنَ فِي قِتَالِهَا فِي مُدَّةِ الِامْتِنَاعِ بِالْبَغْيِ إلَى أَنْ تَفِيءَ.
আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা দুটি দলের যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছেন। দুটি দল মানে দুটি প্রতিরোধী জামাআত, যারা একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে—সে প্রতিরোধ প্রবল হোক বা তুলনামূলক দুর্বল, যতক্ষণ তাদের ক্ষেত্রে ‘প্রতিরোধকারী দল’-এর পরিচয় প্রযোজ্য হয়। তবুও আল্লাহ তাআলা তাদের উভয়কে ‘মুমিন’ বলে অভিহিত করেছেন এবং তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। …
আল্লাহ তাআলা বিদ্রোহী দল-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। অথচ সেই দলকেও তিনি ঈমানের পরিচয়ে অভিহিত করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অনুমতি কেবল ততক্ষণ পর্যন্তই, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর আদেশের দিকে ফিরে আসে। অতঃপর তারা যদি আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে, তবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা কারও জন্য বৈধ থাকবে না। কারণ কারণ আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা কেবল বিদ্রোহের মাধ্যমে প্রতিরোধের সময় পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অনুমতি দিয়েছেন — যতক্ষণ না তারা ফিরে আসে।[10]কিতাবুল উম্ম লিশ-শাফিঈ, দারুল-ফিকর, ৪/২২৬
এতে প্রমাণিত হয় যে, মুমিনদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হওয়া সম্ভব, তবে এর ফলে কোনো দল কাফের হয়ে যায় না। এরপর আল্লাহ বলেন: “মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই, সুতরাং তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।” অর্থাৎ যুদ্ধ সত্ত্বেও তাদেরকে পরস্পরের ভাই এবং উভয়কে মুমিন বলা হয়েছে, যা প্রমাণ করে কখনো কখনো সীমালঙ্ঘনকারী হলেও তার কারণে দ্বীন থেকেও বের হয় না এবং জাহান্নাম-ও তাদের উপর বর্তায় না। যুদ্ধরত দু’পক্ষ ভাই, তাই তাদের মধ্যে শান্তি স্থাপন আবশ্যক; এবং অন্যান্য মুমিনরা তাদের ভাই, তাই সংশোধনের চেষ্টা তাদের কর্তব্য। এই আয়াত এটার প্রমাণ বহন করে যে, তারা সীমালংঘনরত অবস্থায়ও মুমিন থাকে।
তাই হয়ত আমিরুল মুমিনিন আলী বিন আবি তালিম (রা) উনার বিরুদ্ধাচরণ করা কারো বিরুদ্ধে দ্বীনহীনতার মতো গুরুতর মন্তব্য দেননি। যেমন এক বর্ণনায় এসেছে,
٤٠٧٥٣ – حدثنا يحيى بن آدم (قال) (١): ثنا (مفضل) (٢) بن مهلهل عن الشيباني عن قيس بن مسلم عن طارق بن شهاب قال: كنت عند علي، فسئل عن أهل النهر (أمشركون هم) (٣) قال: من الشرك فروا، (قيل) (٤): فمنافقون هم؟ قال: إن المنافقين لا يذكرون اللَّه إلا قليلا، قيل له: فما هم؟ قال: قوم بغوا علينا (٥).
তারিক ইবন শিহাব বর্ণনা করেছেন, আমি আলি (রা)-এর কাছে ছিলাম। তাকে নাহরাওয়ানবাসীদের (খারিজিদের) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো: তারা কি মুশরিক? তিনি বললেন: শিরক থেকে পালিয়েছিল। জিজ্ঞেস করা হলো: তারা কি মুনাফিক? তিনি বললেন: মুনাফিকরা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো: তাহলে তারা কী? তিনি বললেন: এমন একটি দল যারা আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে।[11]কিতাবুল মুসান্নাফ ইবনু আবি শাইবাহ, তাহকীক আশ-শাসরী, ২১/৫৭১, হাদিস ৪০৭৫৩, সনদ সহিহ
বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে আম্মার (রা)-এর নিজের বক্তব্যেই বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়ে যায়,
– حدثنا يزيد بن هارون عن الحسن بن الحكم عن (زياد) (١) بن الحارث قال: كنت إلى جانب عمار بن ياسر بصفين، وركبتي تمس ركبته، فقال رجل: كفر أهل الشام، فقال عمار: لا تقولوا ذلك، نبينا ونبيهم واحد، وقبلتنا وقبلتهم واحدة، ولكنهم قوم مفتونون (جاروا) (٢) عن الحق، فحق علينا (أن) (٣) نقاتلهم حتى يرجعوا إليه (٤).
রিয়াহ ইবন হারিস থেকে বর্ণনা করেন, “সিফফীনের যুদ্ধে আমি আম্মার ইবন ইয়াসির (রা)-এর পাশে ছিলাম। এমনকি আমার হাঁটু তাঁর হাঁটুর সঙ্গে লেগে ছিল। তখন এক ব্যক্তি বলল, ‘শামের লোকেরা কাফির হয়ে গেছে।’
তখন আম্মার (রা) বললেন, ‘এ কথা বলো না। আমাদের নবী ও তাদের নবী একই, আমাদের কিবলা ও তাদের কিবলাও একই। তবে তারা এমন এক সম্প্রদায়, যারা ফিতনায় পতিত হয়ে সত্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তাই তারা সত্যের দিকে ফিরে না আসা পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আমাদের কর্তব্য।’[12]কিতাবুল মুসান্নাফ ইবনু আবি শাইবাহ, তাহকীক আশ-শাসরী, ২১/৫১৮, হাদিস ৪০৬৪৭, সহিহ
এই কারণেই বাগী বা বিদ্রোহী সবসময় নেতিবাচক শব্দ হিসেবে গণ্য হয় না, যেমন ইবনে হাজার হাইসামি (রহ) লিখেন,
لَكِنْ لَيْسَ الْبَغْيُ اسْمَ ذَمٍّ عَلَى الْأَصَحِّ عِنْدَنَا لِأَنَّهُمْ إنَّمَا خَالَفُوا بِتَأْوِيلٍ جَائِزٍ فِي اعْتِقَادِهِمْ لَكِنَّهُمْ مُخْطِئُونَ فِيهِ فَلَهُمْ لِمَا فِيهِمْ مِنْ أَهْلِيَّةِ الِاجْتِهَادِ نَوْعُ عُذْرٍ وَمَا وَرَدَ مِنْ ذَمِّهِمْ وَمَا وَقَعَ فِي كَلَامِ الْفُقَهَاءِ فِي بَعْضِ الْمَوَاضِعِ مِنْ عِصْيَانِهِمْ أَوْ فِسْقِهِمْ مَحْمُولَانِ عَلَى مَنْ لَا أَهْلِيَّةَ فِيهِ لِلِاجْتِهَادِ أَوْ لَا تَأْوِيلَ لَهُ أَوْ لَهُ تَأْوِيلٌ قَطْعِيُّ الْبُطْلَانِ
“বাগি” শব্দটি আমাদের কাছে অধিক সঠিক মত অনুযায়ী কোনো নিন্দাসূচক নাম নয় — কারণ তারা কেবল নিজেদের বিশ্বাসে জায়েয একটি তা’বীল (ব্যাখ্যা)-এর ভিত্তিতেই বিরোধিতা করেছিল, যদিও তারা তাতে ভুল করেছিল। তাদের ইজতিহাদের যোগ্যতা থাকার কারণে তাদের জন্য একধরনের ওজর (ক্ষমার কারণ) রয়েছে।
আর তাদের নিন্দাসূচক যেসব বর্ণনা এসেছে, এবং ফকীহদের বক্তব্যে কোথাও কোথাও তাদেরকে “নাফরমান” (আসী) বা “ফাসিক” বলা হয়েছে যা পাওয়া যায় — সেগুলো প্রযোজ্য এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যাদের ইজতিহাদের যোগ্যতা নেই, অথবা যাদের কোনো (গ্রহণযোগ্য) তা’বীল নেই, অথবা যাদের তা’বীল সুস্পষ্টভাবে ভুল/বাতিল।
(مُخَالِفُو الْإِمَامِ) وَلَوْ جَائِرًا لِحُرْمَةِ الْخُرُوجِ عَلَيْهِ أَيْ لَا مُطْلَقًا بَلْ بَعْدَ اسْتِقْرَارِ الْأَمْرِ الْمُتَأَخِّرِ عَنْ زَمَنِ الصَّحَابَةِ وَالسَّلَفِ – رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ – فَلَا يَرِدُ خُرُوجُ الْحُسَيْنِ بْنِ عَلِيٍّ وَابْنِ الزُّبَيْرِ – رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا – وَمَعَهُمَا كَثِيرٌ مِنْ السَّلَفِ عَلَى يَزِيدَ وَعَبْدِ الْمَلِكِ وَدَعْوَى الْمُصَنِّفِ الْإِجْمَاعَ عَلَى حُرْمَةِ الْخُرُوجِ عَلَى الْجَائِرِ إنَّمَا أَرَادَ الْإِجْمَاعَ بَعْدَ انْقِضَاءِ زَمَنِ الصَّحَابَةِ وَاسْتِقْرَارِ الْأُمُورِ أَيْ وَحِينَئِذٍ فَلَا فَرْقَ فِي الْحُرْمَةِ بَيْنَ الْمُجْتَهِدِ الَّذِي لَهُ تَأْوِيلٌ وَغَيْرِهِ (بِخُرُوجٍ عَلَيْهِ وَتَرْكِ) عَطْفُ تَفْسِيرٍ (الِانْقِيَادِ) لَهُ بَعْدَ الِانْقِيَادِ لَهُ كَذَا وَقَعَ فِي عِبَارَةِ بَعْضِهِمْ وَظَاهِرٌ أَنَّهُ غَيْرُ شَرْطٍ (أَوْ مَنْعِ حَقٍّ) طَلَبَهُ مِنْهُمْ
(ইমামের বিরোধিতাকারী) — যদিও তিনি জালিমও হন, তবুও তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা হারাম — অর্থাৎ এটি সর্বাবস্থায় নয়, বরং সাহাবি ও সালাফের যুগের পরবর্তী সময়ে যখন রাষ্ট্রব্যবস্থা স্থিতিশীল হয়ে গেছে তখনকার জন্য প্রযোজ্য। সুতরাং হুসাইন ইবনে আলী (রা) ও ইবনে যুবাইর (রা)-এর বিদ্রোহ, যাঁদের সাথে বহু সালাফও ছিলেন, ইয়াযীদ ও আব্দুল মালিকের বিরুদ্ধে — এই নীতির বিপরীত উদাহরণ হিসেবে গণ্য হবে না। গ্রন্থকারের যে দাবি যে জালিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হারাম হওয়ার ব্যাপারে ইজমা (ঐকমত্য) রয়েছে — তিনি আসলে সেই ইজমার কথা বলতে চেয়েছেন যা সাহাবিদের যুগ অতিক্রান্ত হওয়ার এবং বিষয়াদি স্থিতিশীল হওয়ার পরবর্তী সময়ের জন্য প্রযোজ্য। অর্থাৎ তখন থেকে, যার তা’বীল রয়েছে এমন মুজতাহিদ এবং অন্য কারো মধ্যে হারাম হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই।[13]তুহফাতুল মুহতাজ ফী শারহিল মিনহাজ, শিরওয়ানী ও ইবনে কাসিম আল-আববাদী-এর টীকাসহ, ৯/৬৫-৬৬
আবুশ শাকুর সালেমী বলেন,
وقد قلنا ان الباغى لا يفسق لان شهادته مقبولة بالاتفاق، والثانى ان الباغى ماول فى دعواه، ولان حد الباغى ان يدعى الامارة مع شبهة الدعوى وكان لهم شبهة الدعوى فتاولوا فى ذلك واخطأوا فى تاويلهم وخطاهم ما كان من الكبائر فى الدين حتى يوجب الفسق والكفر……. ولانه يجوز الصلاة والجمعة والحج وتولية القضاء وغير ذلك من الولاية من جهة الباغى دل أنه ما كان فاسقا (كتاب التمهيد فى بيان التوحيد لابى الشكور السالمى-167-168
অর্থাৎ আমরা বলি যে, বাগী ফাসিক নয়। কেননা, তার সাক্ষী সর্বসম্মতভাবে গ্রহণযোগ্য। দ্বিতীয়ত বাগী তার দাবীতে ব্যাখ্যাকারী। কেননা, বাগী ব্যক্তি আমীরত্বের দাবী করে থাকে আমীর হবার যোগ্য মনে করার কারণে। এক্ষেত্রে তারা ইজতিহাদ করে থাকে। আর তাদের ইজতিহাদটি ভুল। আর ভুলকারী ব্যক্তি দ্বীনের ক্ষেত্রে কবীরা গোনাহের হকদার হয় না। তাই ফাসিক বা কাফের হয় না। ….. তাছাড়া নামায, জুমআ, হজ্বের আমীর হওয়া এবং বিচারক হবার যোগ্যতা বাগী হবার কারণে তার থেকে হারিয়ে যায় না। যা প্রমাণ করে বাগী ব্যক্তি ফাসিক নয়।[14]আততামহীদ ফী বয়ানিত তাওহীদ, আবুশ শকুর সালেমীকৃত- ১৬৭-১৬৮
এখানে আরো একটি বিষয় রয়েছে। বিদ্রোহী দল দ্বারা উদ্দেশ্য মুয়াবিয়া (রা) ও উনার সঙ্গিদের সকলে নাও হতে পারে, বরং যুদ্ধরত বিচ্ছিন্ন একটি দল যারা আম্মারকে হত্যা করেছিল তারাও হতে পারে যদিও তারা সাধারণ ভাবে মুয়াবিয়া (রা) এর পক্ষে যুদ্ধরত থাকুক না কেন। যারা উক্ত দলের কাজকে সমর্থন করবে তারা ঐ দলেরই আওতাভুক্ত হবে, কিন্তু মুয়াবিয়া বা আমর ইবনুল আস (রা) কেউ আম্মারের হত্যাকে সমর্থন করেননি। বরং প্রথম দিকে আম্মার (রা) এর হত্যাকারীদের জাহান্নামি হওয়া নিয়ে উল্লেখ করা হাদিসটি এই ব্যাখ্যাকে একটি ভালো ভিত্তি প্রদান করে। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ) বলেন,
ثم ( إن عمارا تقتله الفئة الباغية ) ليس نصا في أن هذا اللفظ لمعاوية وأصحابه ؛ بل يمكن أنه أريد به تلك العصابة التي حملت عليه حتى قتلته ، وهي طائفة من العسكر ، ومن رضي بقتل عمار كان حكمه حكمها . ومن المعلوم أنه كان في المعسكر من لم يرض بقتل عمار : كعبد الله بن عمرو بن العاص وغيره ؛ بل كل الناس كانوا منكرين لقتل عمار ، حتى معاوية ، وعمرو ” انتهى من ” مجموع الفتاوى ” ( 35 / 77 ) .
এরপর, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এই বাণী—“নিশ্চয়ই আম্মারকে বিদ্রোহী দল (الفئة الباغية) হত্যা করবে”—এটি এমন কোনো স্পষ্ট (নস) প্রমাণ নয় যে, এখানে মুয়াবিয়া (রা) ও তাঁর সমস্ত সঙ্গীকেই উদ্দেশ্য করা হয়েছে। বরং এর দ্বারা সেই বিশেষ দলটিকে বোঝানো হতে পারে, যারা আম্মারের ওপর আক্রমণ চালিয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁকে হত্যা করেছিল। অর্থাৎ, পুরো বাহিনী নয়; বরং বাহিনীর একটি অংশ। আর যারা আম্মারের হত্যাকে সমর্থন করেছে, তাদের বিধানও সেই দলেরই অনুরূপ।
এটি সর্বজনবিদিত যে, সে বাহিনীতে এমন অনেক লোক ছিলেন, যারা আম্মারের হত্যাকে সমর্থন করেননি। যেমন, আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস (রা) এবং অন্যান্যরা। বরং আম্মারের হত্যাকাণ্ডে সকলেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন—এমনকি মুয়াবিয়া (রা) ও আমর ইবনুল আস (রা)-ও।[15]মাজমূ‘ আল-ফাতাওয়া ৩৫/৭৭
ছাহেবে তোহফা বলেন, বিদ্রোহী দল বলতে মু‘আবিয়া (রা)-এর দলভুক্ত একদল লোককে বুঝানো হয়েছে।[16]তোহফাতুল আহওয়াযী ১০/২০৪ এজন্য আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (রহ) অনেকের মন্তব্য উল্লেখ করে বলেন, সঠিক কথা উভয় দলই তাদের ইজতিহাদে সঠিক ছিলেন।[17]উমদাতুল ক্বারী ৪/২০৮ তবে মু‘আবিয়া (রা) বিদ্রোহী ছিলেন এবং আলী (রা) অধিক সঠিক ছিলেন এর উপর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত একমত।[18]আমীর কাহলানী, আত-তানভীর ১১/৪৩
যদি আমরা ধরে নেই, বিদ্রোহী দল দ্বারা মুয়াবিয়া (রা) এর সম্পূর্ণ দলই উদ্দেশ্য, তাহলেও এতে মুয়াবিয়া (রা) ও উনার অনুসারীদেরকে কাফির ও জাহান্নামি বলার মতো দুঃসাহস করার সুযোগ নেই। যেমনটা আমরা আলী (রা) ও আম্মার (রা) এর আমল দ্বারাই প্রমাণ পেয়েছি। একই সাথে আমর ইবনুল আস (রা) এর হাদিসে সুস্পষ্ট বর্ণিত হয়েছে, আম্মারকে হত্যাকারী ও তার জিনিসপত্র লুটকারীরা জাহান্নামি৷ আর নিশ্চয়ই মুয়াবিয়া (রা) এর সঙ্গীদের সকলে মিলে উনাকে হত্যাও করেনি, উনার জিনিসপত্র লুটও করেনি, এসব করতে আদেশও করেনি, উপদেশও দেয়নি, এসব যারা করেছে তাদের প্রতি সন্তুষ্টিও প্রকাশ করেনি। সেহেতু এই হাদিসে বর্ণিত ভয়াবহ পরিণাম তাদের উপর বর্তায় না।
ইমাম আব্দুল কাহির তাঁর ‘আল-ইমামাহ’ গ্রন্থে ফুকাহাদের ঐকমত্য উল্লেখ করেছেন, হিজাজ ও ইরাকের ফুকাহা, হাদীস ও রায়ের অনুসারী, যেমন মালিক, শাফিঈ, আওযাঈ এবং অধিকাংশ মুতাকাল্লিমিন একমত পোষণ করেছেন যে, আলী (রা) সিফফিনের যুদ্ধে সঠিক ছিলেন, যেমন জামালের যুদ্ধেও সঠিক ছিলেন। যাঁরা তাঁর সাথে যুদ্ধ করেছিলেন, তারা সীমালংঘনকারী ছিল; কিন্তু তাদের সীমালংঘনের কারণে তাকফীর করা জায়েজ নয়।[19]আল-আওয়াসিম ওয়াল কাওয়াসিম ৮/২০
সাদুদ্দীন তাফতাজানী (রহ) লিখেন,
وليسوا كفارا ولا فسقة ولا ظلمة لما لهم من التاويل وان كان باطلا فغاية الامر انهم اخطأوا فى الاجتهاد وذلك لا يوجب التفسيق فضلا عن التكفير، ولهذا منع على رضى الله عنه اصحابه من لعن اهل الشام وقال اخواننا بغوا علينا
তারা কাফির নয়, ফাসিকও নয়, জালিমও নয় — কারণ তাদের একটি তা’বীল (ব্যাখ্যা) রয়েছে, যদিও তা বাতিল/ভুল। সুতরাং সর্বোচ্চ যা বলা যায় তা হলো, তারা ইজতিহাদে ভুল করেছে — আর এটি ফাসিক হওয়াকে অনিবার্য করে না, তাকফীরতো দূরের কথা। আর এ কারণেই আলী (রা) তাঁর সঙ্গীদেরকে সিরিয়াবাসীদের প্রতি অভিশাপ দেওয়া থেকে নিষেধ করেছিলেন এবং বলেছিলেন: “তারা আমাদের ভাই, তারা আমাদের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি (বাগী) করেছে মাত্র।”[20]শারহুল মাকাসিদ, সা’দুদ্দীন তাফতাযানী ৫/৩০৮
জান্নাত জাহান্নামের দিকে আহ্বান
এই অংশে আমরা আলোচনা করবো বুখারীর হাদিসের দ্বিতীয় অংশ নিয়ে, যেখানে বলা হয়েছে, আম্মার তাদেরকে জান্নাতের দিকে এবং তারা আম্মারকে জাহান্নামের দিকে আহ্বান করে।
ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) এর ব্যাখ্যা – জান্নাত জাহান্নামের কারণের দিকে আহ্বান
এই জান্নাত জাহান্নামের দিকে আহবান নিয়ে ইবনে হাজার (রহ) বলেন,
” فَإِنْ قِيلَ : كَانَ قَتْلُهُ بِصِفِّينَ ، وَهُوَ مَعَ عَلِيٍّ ، وَالَّذِينَ قَتَلُوهُ مَعَ مُعَاوِيَةَ ، وَكَانَ مَعَهُ جَمَاعَةٌ مِنَ الصَّحَابَةِ : فَكَيْفَ يَجُوزُ عَلَيْهِمُ الدُّعَاءُ إِلَى النَّارِ ؟
فَالْجَوَابُ : أَنَّهُمْ كَانُوا ظَانِّينَ أَنَّهُمْ يَدْعُونَ إِلَى الْجَنَّةِ ، وَهُمْ مُجْتَهِدُونَ لَا لَوْمَ عَلَيْهِمْ فِي اتِّبَاعِ ظُنُونِهِمْ ، فَالْمُرَادُ بِالدُّعَاءِ إِلَى الْجَنَّةِ : الدُّعَاءُ إِلَى سَبَبِهَا وَهُوَ طَاعَةُ الْإِمَامِ ، وَكَذَلِكَ كَانَ عَمَّارٌ يَدْعُوهُمْ إِلَى طَاعَةِ عَلِيٍّ ، وَهُوَ الْإِمَامُ الْوَاجِبُ الطَّاعَةُ إِذْ ذَاكَ ، وَكَانُوا هُمْ يَدْعُونَ إِلَى خِلَافِ ذَلِكَ ، لَكِنَّهُمْ معذورون للتأويل الَّذِي ظهر لَهُم ”যদি বলা হয়: আম্মারকে সিফফিনের যুদ্ধে হত্যা করা হয়েছিল, তখন তিনি ছিলেন আলী (রা)-এর পক্ষে, আর যারা তাঁকে হত্যা করেছিল তারা ছিল মুআবিয়া (রা)-এর পক্ষে, এবং তাঁর (মুআবিয়ার) সাথে একদল সাহাবিও ছিলেন — তাহলে কীভাবে এই সাহাবিদের ব্যাপারে ‘জাহান্নামের দিকে আহ্বানকারী’ কথাটি প্রযোজ্য হতে পারে?
জবাব: তাঁরা মনে করতেন যে তাঁরা জান্নাতের দিকেই আহ্বান করছেন, এবং তাঁরা ছিলেন মুজতাহিদ — নিজেদের ইজতিহাদি ধারণা অনুসরণ করার কারণে তাঁদের কোনো দোষ নেই। বস্তুত ‘জান্নাতের দিকে আহ্বান’ বলতে বোঝানো হয়েছে জান্নাতের কারণের (উপায়ের) দিকে আহ্বান, আর তা হলো ইমামের আনুগত্য। ঠিক একইভাবে আম্মারও তাদেরকে আলী (রা)-এর আনুগত্যের দিকে আহ্বান করছিলেন, কেননা সে সময় তিনিই ছিলেন এমন ইমাম যাঁর আনুগত্য অবশ্যকর্তব্য ছিল। আর তাঁরা (মুআবিয়ার পক্ষের সাহাবিরা) এর বিপরীত দিকে আহ্বান করছিলেন — তবে তাঁদের কাছে যে ব্যাখ্যা (তা’বীল) প্রতীয়মান হয়েছিল, তার কারণে তাঁরা ওজরযোগ্য।[21]ফাতহুল বারী ১/৫৪২
আব্দুর রাউফ আল-মুনাবী (রহ) বলেন,
يدعوهم أي عمار يدعو الفئة وهم أصحاب معاوية الذين قتلوه بوقعة صفين في الزمان المستقبل إلى الجنة أي إلى سببها وهو طاعة الإمام الحق ويدعونه إلى سبب النار وهو عصيانه ومقاتلته قالوا وقد وقع ذلك في يوم صفين دعاهم فيه إلى الإمام الحق ودعوه إلى النار وقتلوه فهو معجزة للمصطفى وعلم من أعلام نبوته
‘সে তাদেরকে জান্নাতের দিকে আহ্বান করে’ — অর্থাৎ ‘আম্মার (রা) মু‘আবিয়াহর দলকে জান্নাতের কারণের দিকে আহ্বান করতেন — যা ইমামের আনুগত্য। আর ‘তারা তাকে জাহান্নামের দিকে আহ্বান করে’ — অর্থাৎ ইমামের অবাধ্যতা ও তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার দিকে। সিফফিনের দিন তাই ঘটেছিল: তিনি তাদেরকে হকের (প্রকৃত খলিয়ার) দিকে আহ্বান করেছিলেন, আর তারা তাকে বাতিলের (খলিফার বিরোধীতার) দিকে আহ্বান করেছিল এবং তাকে হত্যা করেছিল। এটি ছিল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মু‘জিজা ও নবুওয়াতের নিদর্শন।”[22]‘ফায়দুল কাদীর’ — আব্দুর রাউফ আল-মুনাবী ৬/৩৬৬
ইবনে বাত্তাল (রহ) ও মুহাল্লাব (রহ) ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন,
إنما يصح هذا في الخوارج الذين بعث إليهم على عمارا يدعوهم إلى الجماعة ولا يصح في أحد من الصحابة
এই কথা শুধু খারিজীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য (তারা তাকে আহবান করবে জাহান্নামের দিকে), যাদের কাছে ‘আলী (রা) ‘আম্মারকে পাঠিয়েছিলেন; কিন্তু কোনো সাহাবীর ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়।
ইবনে বাত্তাল (রহ) বলেন,
” قوله: (يدعوهم إلى الجنة ويدعونه إلى النار) ، إنما يصح ذلك في الخوارج الذين بعث إليهم علىّ عمارًا ليدعوهم إلى الجماعة ، وليس يصح في أحد من الصحابة؛ لأنه لا يجوز لأحد من المسلمين أن يتأول عليهم إلا أفضل التأويل ؛ لأنهم أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم الذين أثنى الله عليهم وشهد لهم بالفضل ، فقال تعالى: (كنتم خير أمةٍ أخرجت للناس) آل عمران/ 110 .
قال المفسرون : هم أصحاب رسول الله، وقد صح أن عمارًا بعثه علىّ إلى الخوارج يدعوهم إلى الجماعة التي فيها العصمة ” انتهى من “شرح صحيح البخاري”“তাঁর বাণী (সে তাদেরকে জান্নাতের দিকে আহ্বান করবে, আর তারা তাকে জাহান্নামের দিকে আহ্বান করবে) কেবল ঐ খারিজিদের ক্ষেত্রেই সঠিক প্রযোজ্য, যাদের কাছে আলী আম্মারকে পাঠিয়েছিলেন তাদেরকে জামাআতের দিকে আহ্বান করতে। কোনো সাহাবির ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়, কেননা কোনো মুসলিমের জন্যই জায়েয নয় যে তাদের ব্যাপারে সর্বোত্তম তা’বীল ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করবে — কেননা তাঁরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবি, যাঁদের আল্লাহ প্রশংসা করেছেন এবং যাঁদের মর্যাদার সাক্ষ্য দিয়েছেন, আল্লাহ বলেন: ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির জন্য আবির্ভূত হয়েছ’ — আলে ইমরান আয়াত ১১০
মুফাসসিরগণ বলেন: এখানে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবিদের বোঝানো হয়েছে। আর এটাও প্রমাণিত যে, আলী আম্মারকে খারিজিদের কাছে পাঠিয়েছিলেন তাদেরকে সেই জামাআতের দিকে আহ্বান করতে যাতে নিরাপত্তা (ইসমাত) রয়েছে।”[23]শারহু সহীহিল বুখারী ২/৯৮-৯৯
তবে ইবনে হাজার এই মতের সমালোচনা করে তিনটি যুক্তি দেন:
- খারিজীদের আবির্ভাব ঘটে ‘আম্মার হত্যার পর, সিফফিনের যুদ্ধ শেষে ‘তাহকীম’-এর সময়। তাহলে কীভাবে ‘আলী (রা) মৃত্যুর পর ‘আম্মারকে তাদের কাছে পাঠালেন?
- ‘আলী (রা) ‘আম্মারকে পাঠিয়েছিলেন কুফাবাসীদের কাছে তাদেরকে দাওয়াত দেওয়ার জন্য। তাদের মধ্যে অনেক সাহাবীও ছিলেন (যারা পরে মু’আবিয়াহর সাথে যুক্ত হয়েছিলেন)। মুহাল্লাব এখানে ভুল করেছেন।
- ইবনে বাত্তাল অসম্পূর্ণ বর্ণনার ওপর নির্ভর করে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু অন্য বর্ণনায় স্পষ্ট যে, “জাহান্নামের দিকে আহ্বানকারী” বলতে কুরাইশ কাফেরদের বোঝানো হয়েছে—যেমন কিছু ব্যাখ্যাকার বলেছেন।[24]আরশিফু মুলতাকা আহলিল হাদীস – ২, অনুচ্ছেদ ৩৭, পৃষ্ঠা ৩৪৫
ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) এর ব্যাখ্যার পক্ষে ইজতিহাদের বিখ্যাত হাদিসটিতো সকলেরই পরিচিত, এবং জান্নাত জাহান্নামের কারণের দিকে আহ্বানের ব্যাখ্যার পক্ষেও হাদিস থেকে দলিল পাওয়া যায়, যেমন: বুখারীর একটি হাদিসে এসেছে,
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ ـ رضى الله عنه ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ “ إِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ، وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَصْدُقُ حَتَّى يَكُونَ صِدِّيقًا، وَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ، وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَكْذِبُ، حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ كَذَّابًا ”
’আবদুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ সত্য নেকীর দিকে পরিচালিত করে আর নেকী জান্নাতে পৌঁছায়। আর মানুষ সত্যের উপর কায়িম থেকে অবশেষে সিদ্দীক-এর দরজা লাভ করে। আর মিথ্যা মানুষকে পাপের দিকে নিয়ে যায়, পাপ তাকে জাহান্নামে নিয়ে যায়। আর মানুষ মিথ্যা কথা বলতে বলতে অবশেষে আল্লাহর কাছে মহামিথ্যাচারী প্রতিপন্ন হয়ে যায়।[25]সহিহ বুখারী, হাদিস ৬০৯৪
এই হাদীসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, জান্নাতের কারণসমূহের মধ্যে সত্যতা অন্যতম, আর জাহান্নামের কারণসমূহের মধ্যে মিথ্যা অন্যতম। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেক সত্যবাদী জান্নাতে যাবে, কারণ কাফিরও তার কথায় ও অঙ্গীকারে সত্যবাদী হতে পারে, কিন্তু আমল গ্রহণের শর্ত (ইসলাম) না থাকায় সে জান্নাতে যাবে না। অনুরূপভাবে মিথ্যার ক্ষেত্রেও— মুসলিম ব্যক্তি মিথ্যা বলতে পারে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, সে অবশ্যই জাহান্নামে যাবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করে না (মুওয়াহহিদ), যদি সে এমন পাপ করে যা তাকে ইসলামের বাইরে নিয়ে যায় না, তবে সে আল্লাহর ইচ্ছাধীন— তিনি ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমা করবেন, ইচ্ছা করলে শাস্তি দেবেন অথবা জাহান্নামে শাস্তি পূর্ণ করে জান্নাতে দিবেন।
আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী (রহ) এর ব্যাখ্যা – দুটো ভিন্ন ঘটনার
অধিকাংশ আধুনিক ব্যাখ্যাকার ‘ফাতহুল বারী’-তে ইবনে হাজার আসকালানির (রহ)- হাদীস বোঝার পদ্ধতিকে অনুসরণ করেন। ইবনে হাজার বলেছেন: তারা (সীমালংঘনকারী দল) ধারণা করেছিল যে তারা জান্নাতের দিকে আহ্বান করছে, বাস্তবে তা না হলেও। তবে তাদের জন্য ‘ইজতিহাদ’ ও ‘তাবীল’-এর ভিত্তিতে ওজর রয়েছে, কারণ তারা ছিল মুজতাহিদ। তাই আলী (রা)-এর বিরোধিতার দাওয়াত দেওয়া যদিও জাহান্নামের দিকে আহ্বানের কারণ, কিন্তু যেহেতু তারা মুজতাহিদ ছিল, তাদের নিকট গ্রহণযোগ্য তাওয়ীল ছিল, সেহেতু এর ভিত্তিতে তাদের উপর জাহান্নাম চূড়ান্ত হয়নি।
ইমাম কাশমীরী (রহ) ‘ফয়জুল বারী আলা সহীহিল বুখারী’ গ্রন্থে এই ব্যাখ্যার সমালোচনা করেন বিভিন্ন দলিল প্রমাণের আলোকে। আমরা সমালোচনাগুলো আর উল্লেখ করছি না, বরং উনার দেওয়া সমাধান দেখে নেওয়া যাক। কাশমীরী (রহ) বলেন:
فالوجه عندي أنَّ الكلامَ في حق الأمير معاوية رضي الله عنه، ثم إلى قوله: «تقتله الفئة الباغية»، وصرَّح صاحب «الهداية» في كتاب القضاء: أنَّ الأميرَ معاويةَ رضي الله عنه كان بَغَى على عليَ رضي الله عنه. أما قوله: «يدعوهم إلى الجنة» فاستئْنَاف لحالِهِ مَعَ المشرِكين وقريش العرب، وإشارةٌ إلى المصائبِ التي أتت عليه مِنْ جهةِ قريش، وتعذيبهم، وإلجائهم إياه على أَنْ يَكْفُر بربه فأبَى إلا أنْ يَقُول: الله أحد.
সুতরাং আমার মতে সঠিক দিকটি হলো — এই কথাটি আমীরে মুআবিয়া (রা)-এর ব্যাপারে, তারপর “তাকে হত্যা করবে বিদ্রোহী দল” পর্যন্ত। আর “হিদায়া” গ্রন্থের লেখক কিতাবুল কাযা-তে স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, আমীর মুআবিয়া (রা) আলী (রা.)-এর বিরুদ্ধে বাগী (বিদ্রোহী) ছিলেন। আর তাঁর বাণী “সে তাদেরকে জান্নাতের দিকে আহ্বান করবে” — এটি আম্মারের মুশরিক ও কুরাইশ আরবদের সাথে তাঁর পূর্বেকার অবস্থার প্রসঙ্গ, এবং কুরাইশের পক্ষ থেকে তাঁর উপর যে বিপদাপদ এসেছিল, তারা তাঁকে যে নির্যাতন করেছিল এবং তাঁকে তাঁর রবের সাথে কুফরী করতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছিল অথচ তিনি অস্বীকার করে শুধু বলেছিলেন “আল্লাহ এক” — সেদিকে ইঙ্গিত করে।[26]ফয়জুল বারী আলা সহীহিল বুখারী ২/৭২
এই ব্যাখ্যার পক্ষে ইবনে হাজার ও ইবনে বাত্তাল (রহ) এর বক্তব্য হতেই প্রমান পাওয়া যায়। যেমন, ইবনু বাত্তাল (রহ) লিখেন,
وقوله: (يدعوهم إلى الله) فيريد والله أعلم أهل مكة الذين أخرجوه من دياره وعذبوه فى ذات الله لدعائه لهم إلى الله. ولا يمكن أن يتأول هذا الحديث فى المسلمين البتة؛ لأنهم قد دخلوا دعوة الله، وإنما يدعى إلى الله من كان خارجًا من الإسلام. وقوله: (ويدعونه إلى النار) دليل أيضًا على ذلك؛ لأن المشركين أهل مكة إنما فتنوه وطالبوه أن يرجع إلى دينهم، فهو النار. فإن قيل: إن فتنة عمار قد كانت بمكة فى أول الإسلام، وإنما قال: يدعوهم بلفظ المستقبل، وهذا لفظ الماضي. قيل: العرب قد تخبر بالفعل المستقبل عن الماضى إذا عرف المعنى، كما تخبر بالماضى عن المستقبل، فقوله: (يدعوهم إلى الله) بمعنى دعاهم إلى الله؛ لأن محنة عمار كانت بمكة مشهورة، فأشار (صلى الله عليه وسلم) إلى ذكرها لما طابقت شدته فى نقله لبنتين شدته فى صبره بمكة على عذاب الله، فضيلة لعمار، وتنبيهًا على ثباته، وقوته فى أمر الله تعالى.
(মুহাল্লাব (রহ) বলেন:) আর তাঁর বাণী “সে তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে” — এখানে আল্লাহই ভালো জানেন, উদ্দেশ্য হলো মক্কাবাসী, যারা তাঁকে তাঁর ঘরবাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল এবং আল্লাহর পথে তাঁকে নির্যাতন করেছিল, কারণ তিনি তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছিলেন। এই হাদিসকে কোনোভাবেই মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়, কারণ তারা তো ইতিমধ্যেই আল্লাহর দাওয়াতে প্রবেশ করে গেছে — আল্লাহর দিকে তো তাকেই আহ্বান করা হয় যে ইসলামের বাইরে রয়েছে। আর তাঁর বাণী “আর তারা তাকে জাহান্নামের দিকে আহ্বান করে” — এটিও এই একই বিষয়ের প্রমাণ, কারণ মক্কার মুশরিকরা তাঁকে ফিতনায় ফেলেছিল এবং তাদের ধর্মে ফিরে আসার দাবি জানিয়েছিল — আর এটাই হলো জাহান্নাম।
যদি বলা হয়: আম্মারের এই পরীক্ষা তো মক্কায়, ইসলামের প্রাথমিক যুগে ঘটেছিল, অথচ তিনি “সে আহ্বান করে” বলেছেন ভবিষ্যৎকালীন শব্দে, অথচ এটি তো অতীতের ঘটনা — তাহলে জবাবে বলা হবে: আরবরা কখনো কখনো অতীতের ঘটনা সম্পর্কে ভবিষ্যৎকালীন ক্রিয়াপদ ব্যবহার করে সংবাদ দেয়, যখন অর্থ বোঝা যায় — যেমন তারা ভবিষ্যতের ঘটনা সম্পর্কেও অতীতকালীন ক্রিয়াপদ ব্যবহার করে সংবাদ দিয়ে থাকে। সুতরাং তাঁর বাণী “সে তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে” এর অর্থ হলো “সে তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছিল” — কারণ আম্মারের মক্কায় সহ্য করা পরীক্ষা-নির্যাতনের ঘটনা তখন সুপরিচিত ছিল। তাই নবী (ﷺ) তাঁর এই ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করলেন, যখন দুটি ইট বহনে তাঁর দৃঢ়তা মক্কায় আল্লাহর নির্যাতন সহ্য করার দৃঢ়তার সাথে মিলে গেল — এটি আম্মারের জন্য একটি মর্যাদা এবং আল্লাহর পথে তাঁর অবিচলতা ও শক্তির প্রতি ইঙ্গিত।[27]ইবনু বাত্তাল, শরহু সহীহিল বুখারী ৫/২৭
হাফিজ ইবনে হাজার (রহ) বলেন,
وَيُمْكِنُ حَمْلُهُ عَلَى أَنَّ الْمُرَادَ بِالَّذِينَ يَدْعُونَهُ إِلَى النَّارِ كُفَّارُ قُرَيْشٍ كَمَا صَرَّحَ بِهِ بَعْضُ الشُّرَّاحِ،
এটি এভাবেও ব্যাখ্যা করা সম্ভব যে “যারা তাকে জাহান্নামের দিকে ডাকছিল” বলতে কুরাইশের কাফিরদের বোঝানো হয়েছে — যেমনটি কিছু ব্যাখ্যাকার স্পষ্টভাবে বলেছেন।[28]ফাতহুল বারী ১/৫৪২ (তবে তিনি এই ব্যাখ্যাটি গ্রহণ করেন নি যার কারণ পরবর্তীতে আসছে)
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, দুটো কথাইতো একটি হাদিসেই এসেছে, তাহলে দুইটাকে কেন দুই ঘটনার বা প্রেক্ষাপটের হিসেবে ধরে নেবো? কেন প্রথম অংশকে ভবিষ্যতের ও দ্বিতীয় অংশকে অতীতের হিসেবে মানবো?
এটার সমাধান দিতে গেলেই আসে আরো মজার কিছু বিষয়। বুখারিতে দুটো কথা একই সনদে আসলেও বাস্তবে বুখারীর বর্ণনায় ‘বিদ্রোহী দল তাকে হত্যা করবে’ এই অংশটি হলো ‘মুদরাজ’ বা সংযোজিত। আমাদের নবী (ﷺ) থেকে বুখারীর হাদিসের প্রথম ও দ্বিতীয় অংশটি একই সময়ে এক সাথে বর্ণনা করা প্রমাণিত না, যা মুহাদ্দিসগণই নিশ্চিত করেছে।
হাদিসে ইদরাজ বা সংযোজন করা
‘তোমাকে হত্যা করবে সীমালংঘনকারী দল’ — এই হাদীসটি সহীহ ও মুতাওয়াতির সূত্রে প্রমাণিত হলেও দ্বিতীয় অংশ ‘জাহান্নামের দিকে আহ্বান,’ মুতাওয়াতির সূত্রে প্রমাণিত না। অন্য সাহাবিদের থেকে এই অংশটি বর্ণিত হয়নি। মুদরাজ কি তা আগে আমরা বুঝার চেষ্টা করি, মুদরাজ হলো হাদিসের সনদ বা মতনে বিনা কোনো পার্থক্য করেই রাবির পক্ষ থেকে কোনো কিছু বৃদ্ধি করা যা প্রকৃত পক্ষে সেই বিশেষ হাদিসের অংশ ছিল না।[29] মুদরাজ হাদিস আরো বিস্তারিত বললে মুদরাজ হাদিস হলো,
এমন হাদিস, যার সনদ বা মূল বক্তব্য (মতন)-এর মধ্যে এমন কোনো অতিরিক্ত বক্তব্য রয়েছে, যা মূল হাদিসের অংশ নয়; বরং তা কোনো একজন বর্ণনাকারীর নিজস্ব সংযোজন। অথচ তিনি এটিকে আলাদাভাবে স্পষ্ট না করে এমনভাবে উল্লেখ করেছেন যে, তা মূল হাদিসের অংশ বলেই মনে হয়।[30]মা‘রিফাতু ‘উলূমিল হাদীস পৃষ্ঠা ১৯৯–২০১; নুযহাতুন নাযার পৃষ্ঠা ৬৬–৬৭; আত-তাবসিরাহ ওয়াত-তাযকিরাহ ১/২৪৬–২৬০; ফাতহুল বাকী পৃষ্ঠা ২০৭–২১৪; আল-বাঈসুল হাসীস পৃষ্ঠা ৬১–৬৪
এখন বুখারীর বর্ণনায় এই হাদিসের প্রথম অংশটি কীভাবে মুদরাজ হাদিস বা এর প্রমাণ কী তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আকারে আলোচনা করা যাক।
বুখারীর পান্ডুলিপিতে মতনে বাদ দেওয়া
মুহাল্লাব ইবনে আবি সুফরাহ (রহ) এর কিতাব ‘আল-মুখতাসারুন নাসীহু ফী তাহযীবিল কিতাবিল জামি‘ইস সহীহ’ এর মুহাক্কিক আহমাদ ইবনে ফারিস আস-সালূম লিখেন,
(١) في الصحيح من الطريقين هنا زيادة: (تَقْتُلُهُ الْفِئَةُ الْبَاغِيَةُ) وليست هذه الزيادة في نسختنا، وفي إثباتها في صحيح البخاري بحث، ملخصه: أن عامة النسخ خلت منها، إلا أنها وردت في رواية ابن السكن وكريمة، وكذا ثبتت في نسخة الصغاني التي ذكر أنه قابلها على نسخة الفربري التي بخطه.
দুটি সনদের সহিহ গ্রন্থে এখানে একটি অতিরিক্ত বাক্য রয়েছে: (تَقْتُلُهُ الْفِئَةُ الْبَاغِيَةُ) — “তাকে বিদ্রোহী দল হত্যা করবে”, কিন্তু আমাদের পাণ্ডুলিপিতে এই অতিরিক্তাংশটি নেই। সহিহ বুখারিতে এটি প্রমাণিত কিনা তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে, যার সারসংক্ষেপ হলো: সাধারণত অধিকাংশ পাণ্ডুলিপিতে এটি বর্জিত, তবে ইবনুস সাকান ও করিমার বর্ণনায় এটি এসেছে এবং সগানির পাণ্ডুলিপিতেও প্রমাণিত — যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে তিনি এটি ফারাবরির নিজ হস্তলিপির পাণ্ডুলিপির সাথে মিলিয়ে দেখেছেন।[31]আল-মুখতাসারুন নাসীহু ফী তাহযীবিল কিতাবিল জামি‘ইস সহীহ, ১/৩২৪
ইবনে হাজার বাড়তি অংশের সম্ভাব্য অন্য ব্যাখ্যাটি দেওয়ার পরও সেগুলোকে সাহাবাদের প্রতি নিজবত করার মতটাকেই প্রাদান্য দিয়েছেন। তিনি বলেন,
لَكِنْ وَقَعَ فِي رِوَايَةِ ابْنِ السَّكَنِ وَكَرِيمَةَ وَغَيْرِهِمَا، وَكَذَا ثَبَتَ فِي نُسْخَةِ الصَّغَانِيِّ الَّتِي ذَكَرَ أَنَّهُ قَابَلَهَا عَلَى نُسْخَةِ الْفَرَبْرِيِّ الَّتِي بِخَطِّهِ زِيَادَةٌ تُوَضِّحُ الْمُرَادَ وَتُفْصِحُ بِأَنَّ الضَّمِيرَ يَعُودُ عَلَى قَتَلَتِهِ وَهُمْ أَهْلُ الشَّامِ، وَلَفْظُهُ: وَيْحَ عَمَّارٍ تَقْتُلُهُ الْفِئَةُ الْبَاغِيَةُ يَدْعُوهُمْ الْحَدِيثَ،
কিন্তু ইবনুস সাকান, করিমা ও অন্যদের বর্ণনায়, এবং সগানির পাণ্ডুলিপিতেও — যেটি তিনি ফারাবরির নিজ হস্তলিপির পাণ্ডুলিপির সাথে মিলিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন — একটি অতিরিক্তাংশ রয়েছে যা উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে এবং সুস্পষ্টভাবে বলে যে বার্তাটি তার হত্যাকারীদের দিকে ফিরে যাবে, আর তারা শামবাসী। এর শব্দচয়ন হলো: “ওয়াইহা আম্মার, বিদ্রোহী দল তাকে হত্যা করবে, সে তাদের আহবান করবে…”।
কিন্তু এটি উল্লেখ করার পর তিনি এই জিনিসও সুস্পষ্ট করেছেন যে উক্ত বাড়তি অংশটি মুদরাজ হওয়ার দোষে আরোপিত। তিনি লিখেন,
وَاعْلَمْ أَنَّ هَذِهِ الزِّيَادَةَ لَمْ يَذْكُرْهَا الْحُمَيْدِيُّ فِي الْجَمْعِ، وَقَالَ: إِنَّ الْبُخَارِيَّ لَمْ يَذْكُرْهَا أَصْلًا، وَكَذَا قَالَ أَبُو مَسْعُودٍ. قَالَ الْحُمَيْدِيُّ: وَلَعَلَّهَا لَمْ تَقَعْ لِلْبُخَارِيِّ، أَوْ وَقَعَتْ فَحَذَفَهَا عَمْدًا. قَالَ: وَقَدْ أَخْرَجَهَا الْإِسْمَاعِيلِيُّ، وَالْبَرْقَانِيُّ فِي هَذَا الْحَدِيثِ. قُلْتُ: وَيَظْهَرُ لِي أَنَّ الْبُخَارِيَّ حَذَفَهَا عَمْدًا وَذَلِكَ لِنُكْتَةٍ خَفِيَّةٍ، وَهِيَ أَنَّ أَبَا سَعِيدٍ الْخُدْرِيَّ اعْتَرَفَ أَنَّهُ لَمْ يَسْمَعْ هَذِهِ الزِّيَادَةَ مِنَ النَّبِيِّ ﷺ فَدَلَّ عَلَى أَنَّهَا فِي هَذِهِ الرِّوَايَةِ مُدْرَجَةٌ، وَالرِّوَايَةُ الَّتِي بَيَّنَتْ ذَلِكَ لَيْسَتْ عَلَى شَرْطِ الْبُخَارِيِّ، وَقَدْ أَخْرَجَهَا الْبَزَّارُ مِنْ طَرِيقِ دَاوُدَ بْنِ أَبِي هِنْدَ، عَنْ أَبِي نَضْرَةَ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ، فَذَكَرَ الْحَدِيثَ فِي بِنَاءِ الْمَسْجِدِ وَحَمْلِهُمْ لَبِنَةً لَبِنَةً، وَفِيهِ: فَقَالَ أَبُو سَعِيدٍ: فَحَدَّثَنِي أَصْحَابِي وَلَمْ أَسْمَعْهُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ أَنَّهُ قَالَ: يَا ابْنَ سُمَيَّةَ تَقْتُلُكَ الْفِئَةُ الْبَاغِيَةُ اهـ.
وَهَذَا الْإِسْنَادُ عَلَى شَرْطِ مُسْلِمٍ، وَقَدْ عَيَّنَ أَبُو سَعِيدٍ مَنْ حَدَّثَهُ بِذَلِكَ، فَفِي مُسْلِمٍ، وَالنَّسَائِيِّ مِنْ طَرِيقِ أَبِي سَلَمَةَ، عَنْ أَبِي نَضْرَةَ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ: حَدَّثَنِي مَنْ هُوَ خَيْرٌ مِنِّي أَبُو قَتَادَةَ، فَذَكَرَهُ فَاقْتَصَرَ الْبُخَارِيُّ عَلَى الْقَدْرِ الَّذِي سَمِعَهُ أَبُو سَعِيدٍ مِنَ النَّبِيِّ ﷺ دُونَ غَيْرِهِ، وَهَذَا دَالٌّ عَلَى دِقَّةِ فَهْمِهِ وَتَبَحُّرِهِ فِي الِاطِّلَاعِ عَلَى عِلَلِ الْأَحَادِيثِ.
وَفِي هَذَا الْحَدِيثِ زِيَادَةٌ أَيْضًا لَمْ تَقَعْ فِي رِوَايَةِ الْبُخَارِيِّ، وَهِيَ عِنْدَ الْإِسْمَاعِيلِيِّ، وَأَبِي نُعَيْمٍ فِي الْمُسْتَخْرَجِ مِنْ طَرِيقِ خَالِدٍ الْوَاسِطِيِّ، عَنْ خَالِدٍ الْحَذَّاءِ وَهِيَ: فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: يَا عَمَّارُ أَلَا تَحْمِلُ كَمَا يَحْمِلُ أَصْحَابُكَ؟ قَالَ: إِنِّي أُرِيدُ مِنَ اللَّهِ الْأَجْرَ، وَقَدْ تَقَدَّمَتْ زِيَادَةُ مَعْمَرٍ فِيهِ أَيْضًا.
জেনে রাখো যে এই অতিরিক্তাংশ হুমাইদি তার আল-জামে-তে উল্লেখ করেননি এবং বলেছেন যে বুখারি মোটেই এটি উল্লেখ করেননি। আবু মাসউদও একই কথা বলেছেন। হুমাইদি বলেছেন: সম্ভবত এটি বুখারির কাছে পৌঁছায়নি, অথবা পৌঁছেছিল কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন: ইসমাঈলি ও বারকানি এই হাদিসে এটি বর্ণনা করেছেন।
আমি (ইবন হাজার) বলছি: আমার কাছে স্পষ্ট হচ্ছে যে বুখারি ইচ্ছাকৃতভাবে এটি বাদ দিয়েছেন এবং এর পেছনে একটি সূক্ষ্ম কারণ রয়েছে — তা হলো আবু সাঈদ খুদরি (রা) স্বীকার করেছেন যে তিনি এই অতিরিক্তাংশটি নবী (ﷺ)-এর কাছ থেকে সরাসরি শোনেননি। এতে প্রমাণিত হয় যে এই বর্ণনায় এটি মুদরাজ। যে বর্ণনাটি এটি স্পষ্ট করে তা বুখারির শর্ত পূরণ করে না। বাযযার এটি দাউদ ইবন আবি হিন্দ → আবু নাদরা → আবু সাঈদের সূত্রে বর্ণনা করেছেন, যেখানে মসজিদ নির্মাণ ও একটি একটি করে ইট বহনের ঘটনা রয়েছে। এতে আবু সাঈদ বলেছেন: “আমার সাথীরা আমাকে বলেছেন — তবে আমি নিজে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছ থেকে শুনিনি — যে তিনি বলেছিলেন: ‘হে সুমাইয়ার পুত্র! তোমাকে বিদ্রোহী দল হত্যা করবে।'”
এই সনদটি মুসলিমের শর্তে রয়েছে। আবু সাঈদ যার কাছ থেকে শুনেছেন তাকেও নির্দিষ্ট করেছেন — মুসলিম ও নাসাঈতে আবু সালামা → আবু নাদরা → আবু সাঈদের সূত্রে বর্ণিত যে তিনি বলেছেন: “আমাকে এমন একজন বর্ণনা করেছেন যিনি আমার চেয়ে উত্তম — আবু কাতাদা।” অতঃপর হাদিসটি উল্লেখ করেছেন। সুতরাং বুখারি কেবল সেটুকুই গ্রহণ করেছেন যা আবু সাঈদ নিজে নবী (ﷺ)-এর কাছ থেকে সরাসরি শুনেছেন, বাকিটা বাদ দিয়েছেন। এটি তার সূক্ষ্ম বোধশক্তি ও হাদিসের ইলাল (সুক্ষ ত্রুটি) সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের প্রমাণ।
এই হাদিসে আরও একটি অতিরিক্তাংশ রয়েছে যা বুখারির বর্ণনায় আসেনি। এটি ইসমাঈলি ও আবু নুআইমের মুস্তাখরাজে খালিদ আল-ওয়াসিতি → খালিদ আল-হাযযা-এর সূত্রে রয়েছে: “রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: ‘হে আম্মার! তুমি কি তোমার সাথীদের মতো বহন করতে পারছ না?’ তিনি বললেন: ‘আমি আল্লাহর কাছে (বেশি) সওয়াব চাই।'” মামারের অতিরিক্তাংশও আগেই উল্লেখ হয়েছে।[32]ফাতহুল বারী ১/৫৪২-৫৪৩
ড. জুম‘আ ফাতহী ‘আবদুল হালীম (হাফি) লিখেন,
كذا جاء سياق المتن عند اليُونِينِيّ كما في «السلطانية» ورمز لسقوط جملة: (تَقْتُلُهُ الْفِئَةُ الْباغِيَةُ) من عند أبي ذر الهَرَويّ والأصيلي.
ইউনিনি সুলতানিয়া পাণ্ডুলিপিতে (বুখারীর হাদিস ৪৪৭) মতনের এই ধারাবাহিকতা উল্লেখ করেছেন এবং চিহ্নিত করেছেন যে আবু যর আল-হারাওয়ি ও আসিলির বর্ণনায় “তাকে বিদ্রোহী দল হত্যা করবে” বাক্যটি বাদ পড়েছে।
ورمز اليُونِينِيّ لسقوط جمِلة: «تَقْتُلُهُ الْفِئَةُ الْباغِيَةُ، عَمّارٌ» من عند أبي ذر الهَرَويّ فقط.
ইউনিনি চিহ্নিত করেছেন যে আবু যর আল-হারাওয়ির বর্ণনায় (বুখারীর হাদিস ২৮১২) “বিদ্রোহী দল তাকে হত্যা করবে, আম্মার” বাক্যটি বাদ পড়েছে।
وقال الحميدي محمد بن فتوح بعد أن ذكر الحديث من رواية خالد الحذاء بدون هذه الزيادة في كلا الموضعين عند البخاري: في هذا الحديث زيادة مشهورة لم يذكرها البخاري أصلًا في طريقي هذا الحديث، ولعلها لم تقع إليه فيهما، أو وقعت فحذفها لغرض قصده في ذلك.
হুমাইদি মুহাম্মদ ইবন ফুতুহ বুখারির উভয় স্থানে খালিদ আল-হাযযার বর্ণনায় এই অতিরিক্তাংশ ছাড়া হাদিসটি উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এই হাদিসে একটি বিখ্যাত অতিরিক্তাংশ রয়েছে যা বুখারি এই হাদিসের উভয় সনদে মোটেই উল্লেখ করেননি। সম্ভবত এটি উভয় সনদে তার কাছে পৌঁছায়নি, অথবা পৌঁছেছিল কিন্তু কোনো উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিয়েছেন।”[33]কিতাবু রিওয়ায়াতিল জামি‘ইস সহীহি ওয়া নুসুখিহি — দিরাসাতুন নাযারিয়্যাতুন তাত্ববীকিয়্যাহ, ২/৪৯০
অনেক প্রাচিন ওলামা এটি নিশ্চিত করেছেন যে বুখারিতে “বিদ্রোহী দল তাকে হত্যা করবে” এই অংশটি ছিল না। যেমন, কাযি ইয়ায তার মাশারিক-এ হাদিসটি উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন যে সহিহতে অতিরিক্তাংশ ছাড়া রয়েছে এবং ইবনুস সাকান হতে অতিরিক্তাংশসহ রয়েছে।[34]মাশারিক ২/৩৮২, মাকতাবা আতিকা সংস্করণ। মিযযি তুহফাতুল আশরাফ-এ হাদিসটি উল্লেখ করে বুখারির উভয় স্থানেই এই অতিরিক্তাংশ ছাড়া উল্লেখ করেছেন এবং শেষে বলেছেন: এতে নেই — “বিদ্রোহী দল আম্মারকে হত্যা করবে।”[35]তুহফাতুল আশরাফ ৩/৪২৭ (৪২৪৮)। একই কথা ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে সালিম আল-সাফারিনি-ও উল্লেখ করেছেন।[36]লাওয়াইহুল আনওয়ারিস সুনিয়্যাহ ওয়া লাওয়াকিহুল আফকারিস সুনিয়্যাহ, ২/৩৮ আব্দুল হক আল-ইশবীলী, মাজদুদ্দীন ইবনুল আছীর, আবুল ‘আব্বাস আল-কুরতুবী উল্লেখ করেছেন যে, তাদের সহীহ বুখারীর পান্ডুলিপিতে এই অতিরিক্ত অংশ নেই।[37]আল-জাম‘ বাইনাস সহীহাইন লি ‘আব্দিল হাক্ক আল-ইশবীলী: ৪/১৯৯; জামিউল উসূল লি ইবনিল আছীর: ৬৫৮৩; ইখতিসারু সহীহিল বুখারী লি আবিল ‘আব্বাস আল-কুরতুবী: ১৩৪২ এভাবেই অনেকেই এটি নিশ্চিত করেছেন।
এখন প্রশ্ন হলো যদি বুখারীর নুসখায় এ দুটো বর্ণনা একসাথে না থাকে তাহলে এগুলোর অস্তিত্ব এসেছে কোথা থেকে? এই বিষয়ে,
قال أبو مسعود الدمشقي من كتابه: لم يذكر البخاري هذه الزيادة، وهي في حديث عبد العزيز بن المختار، وخالد بن عبد الله الواسطي، ويزيد بن زريع، ومحبوب ابن الحسن، وشعبة، كلهم عن خالد الحذاء. ورواه إسحاق بن عبد الوهاب هكذا. وأما حديث عبد الوهاب الذي أخرجه البخاري دون هذه الزيادة فلم يقع إلينا من غير حديث البخاري. هذا آخر معنى ما قاله أبو مسعود. (١)
আবু মাসউদ আদ-দিমাশকি (রহ) তার গ্রন্থে বলেছেন: বুখারি এই অতিরিক্তাংশ উল্লেখ করেননি। অথচ এটি আবদুল আযিয ইবন মুখতার, খালিদ ইবন আবদুল্লাহ আল-ওয়াসিতি, ইয়াযিদ ইবন যুরাই, মাহবুব ইবনুল হাসান ও শুবা — এই সকলের হাদিসে রয়েছে, সবাই খালিদ আল-হাযযা থেকে বর্ণনা করেছেন। ইসহাক ইবন আবদিল ওয়াহহাবও এভাবেই বর্ণনা করেছেন। আর আবদুল ওয়াহহাবের হাদিস — যা বুখারি এই অতিরিক্তাংশ ছাড়া বর্ণনা করেছেন — তা বুখারির বর্ণনা ছাড়া অন্য কোনো সূত্র থেকে আমাদের কাছে পৌঁছায়নি। আবু মাসউদের বক্তব্যের মূল অর্থ এটুকুই।[38]কিতাবু রিওয়ায়াতিল জামি‘ইস সহীহি ওয়া নুসুখিহি — দিরাসাতুন নাযারিয়্যাতুন তাত্ববীকিয়্যাহ, ২/৪৯০-৪৯১
এই বর্ণনা হতে দেখা যাচ্ছে, খালিদ আল-হাযযা ও আবদুল ওয়াহহাবের সূত্রে এই হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যা অন্যন্যা কিতাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে। কিন্তু বুখারীর পাণ্ডুলিপিতে যদি এর অস্তিত্ব না থাকতো বা বুখারি যদি আসলেই অতিরিক্ত অংশ বাদ দিয়ে বর্ণনা করে থাকেন, তাহলে এখন বুখারিতে এটি কেন আছে এই প্রশ্নও আসতে পারে। এর সমাধানও আমরা ৪৮৮ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করা জাহেরি মাযহাবের স্কলার হুমাইদি মুহাম্মদ ইবন ফুতুহ (রহ) এর বক্তব্যেই পাই, তিনি বলেন,
قلت أنا: والذي قرأته في «كتاب البخاري» – من طريق أبي الوقت عبد الأول السِّجْزي – رحمه الله – من النسخة التي قرئت عليه، عليها خَطُّه: أمَّا في متن الكتاب، فبحذف الزيادة، وقد كتب في الهامش هذه الزيادة، وصحح عليها وجعلها في جملة الحديث، وأنها من رواية أبي الوقت هكذا، بإضافتها إلى الحديث، وذلك في موضعين من الكتاب: أولهما: في باب: التعاون في بناء المسجد، من كتاب الصلاة.
والثاني: فى باب: مسح الغبار عن الناس في السبيل، في كتاب: الجهاد.
وما عدا هذه النسخة، فلم أجد الزيادة فيها، كما قاله الحميدي ومن قبله، والله أعلم .
“আমি বলছি: আমি বুখারির কিতাবে যা পড়েছি — আবুল ওয়াক্ত আব্দুল আওয়াল আস-সিজযী (রহ)-এর মাধ্যমে, সেই পাণ্ডুলিপি থেকে যা তার সামনে পড়া হয়েছিল এবং যাতে তার নিজের হস্তলিখিত স্বাক্ষর ছিল — তাতে মতনে এই অতিরিক্তাংশ বাদ দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি হাশিয়ায় (টীকায়) এই অতিরিক্তাংশটি লিখেছেন, তার উপর সহিহ চিহ্ন দেওয়া হয়েছে এবং এটিকে হাদিসের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আর এটি আবুল ওয়াক্তের বর্ণনায় হাদিসের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। এটি গ্রন্থের দুটি স্থানে রয়েছে: প্রথমটি কিতাবুস সালাতের বাবুত তাআউন ফি বিনাইল মাসজিদে, দ্বিতীয়টি কিতাবুল জিহাদের বাব মাসহিল গুবার আনিন নাস ফিস সাবিলে।
(ড. জুম‘আ ফাতহী ‘আবদুল হালীম (হাফি) বলেন) এই পাণ্ডুলিপি ছাড়া অন্য কোনোটিতে আমি অতিরিক্তাংশটি পাইনি — যেমনটি হুমাইদি ও তার আগের পণ্ডিতরা বলেছেন। আর আল্লাহই সর্বজ্ঞ।”[39]কিতাবু রিওয়ায়াতিল জামি‘ইস সহীহি ওয়া নুসুখিহি — দিরাসাতুন নাযারিয়্যাতুন তাত্ববীকিয়্যাহ, ২/৪৯৭
আল বিদায়া ওয়ান নিহায়ার পদটিকায় ডঃ বাশশার আওয়াদ মারুফ (হাফি) লিখেন,
ويلاحظ أن إشارة قد وضعت في النسخة اليونينية من صحيح البخاري على هذه العبارة فكتب في أولها “لا” وفي آخرها “إلى” أي: احذف هذه العبارة، فالأصح أن هذه العبارة مقحمة من بعض الروايات، وأن الروايات المتقنة الأصيلة قد خلت منها،
লক্ষণীয় যে সহিহ বুখারির ইউনিনি পাণ্ডুলিপিতে এই বাক্যের উপর একটি চিহ্ন দেওয়া হয়েছে — এর শুরুতে “লা” এবং শেষে “ইলা” লেখা হয়েছে, অর্থাৎ এই বাক্যটি বাদ দাও। সুতরাং সঠিক কথা হলো এই বাক্যটি কিছু বর্ণনা থেকে অনুপ্রবেশ করেছে এবং নির্ভুল ও মূল বর্ণনাগুলো এটি থেকে মুক্ত ছিল।[40]আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া — ইবনে কাসির প্রকাশনী, ৩/৪৯৩
এই বর্ণনাগুলো আমাদেরকে বুঝতে সাহায্য করে, কীভাবে পদটিকা মূল বুখারীর পাণ্ডুলিপিতে প্রবেশ করেছিল। আর এসব পদটিকা ব্যবহার করার পিছনের উদ্দেশ্য হতে পারে এটা বুঝানো যে, ভিন্ন বর্ণনায় অথবা ভিন্ন পাণ্ডুলিপিতে এই এই বাড়তি অংশটি আছে যা হাদিস বা ঘটনা বুঝতে আমাদের জ্ঞানকে আরো প্রসারিত ও প্রভাবিত করে।
একটা ভিন্ন ব্যাখ্যা দেখা যায় কারো কারো মাঝে, যেমন : তারা ইবনে হাজারের ব্যাখ্যা ও আনোয়ার শাহ এর ব্যাখ্যা উভয়ের বাহিরে গিয়ে নিজের মতো বলে, ইমাম বুখারি অথবা তার পরবর্তী অনুসারীরা বুখারি থেকে এই অংশ বাদ দিয়েছিল যেন এটির কারণে পরবর্তীতে সাহাবায়ে কেরাম নিয়ে কেউ ফিতনাগ্রস্ত না হয়। ব্যাখ্যাটি রোমাঞ্চকর মনে হলেও এখানে কিছু সমস্যা আছে। যেমন:-
- হাদিসটিতো মুতাওয়াতির সূত্রেই প্রমাণিত, সেহেতু আলীর বিরুদ্ধে থাকা সাহাবাদের শান, মর্যাদা রক্ষা করতে কেন আর এটি বাদ দেওয়ার মতো বৃথা চেষ্টা করবে কেউ?
- তারপর যদি ইমাম বুখারি এটি বাদ না দিয়ে থাকতেন তাহলে নিশ্চয়ই অল্প কয়েকটি পাণ্ডুলিপি নিয়ে বিতর্ক উঠতো, কিন্তু এখন ঘটনাটি বিপরীত হয়ে গেল। প্রাচীন যে পাণ্ডুলিপিগুলোতে এর অস্তিত্ব ছিল সেগুলো সংখ্যায়ও কম এবং বিতর্কের শিকারও।
- আরেকটি বিষয় হলো, যদি এটি আসলেই আমাদের নবীর মুখ দিয়ে একত্রে বের হয়ে থাকতো, তাহলে কি হাদিসের একটি অংশ হাদিস থেকে বাদ দেওয়া আমাদের নবীর কথাকে বিকৃত করার সমতুল্য নয়? আর এমন জঘন্য কাজ কোনো তালিবুল ইলম, মুহাদ্দিসের দ্বারা কি কখনো সম্ভব হতে পারে?
মুদরাজ হওয়ার কারণ
তাহলে দেখা যাচ্ছে, ইসহাক ইবন আবদিল ওয়াহহাব এবং খালিদ আল-হাযযা এই দুই জনের সনদেই শুধু উক্ত অতিরিক্ত অংশটি এসেছে, কিন্তু তা অন্যান্য বর্ণনার সাথে বিরোধপূর্ণ। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণীয় বিষয় হলো : আবদিল ওয়াহহাব এবং খালিদ আল-হাযযা কার সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তার জবাব হলো ইকরিমার সূত্রে। সমস্যা দেখা যায় ইকরিমার সূত্রেই। আশ্চার্যের বিষয় হলো, উক্ত সংযোজিত বর্ণনার একটি সনদ মুহাম্মদ ইবন জাফর → শুবা → খালিদ আল-হাযযার সূত্রে ইকরিমা হতে বর্ণিত হয়েছে, তবে সেখানে ইবন আব্বাসের কথাই উল্লেখ নেই।[41]আহমাদ, মুসনাদ ৩/২২ (১১১৬৬); ও নাসাঈ তার কুবরা-তে কিতাবুল খাসাইস, বাব যিকর কাওলিন নাবি (ﷺ): “আম্মারকে বিদ্রোহী দল হত্যা করবে” — এই শিরোনামে এটি বর্ণনা করেছেন।
সহিহ মুসলিমেই ভিন্ন সনদে আহ্বানের অংশটি নেই, এবং সেখানেই সাঈদ আল খুদরী (রা) বলছেন উনাকে জানিয়েছেন উনার থেকে সেরা লোক যিনি হলেন আবূ কাতাদাহ (রা)।[42]সহিহ মুসলিম, হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৭২১২-৭২১৬ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৯১৫-২৯১৬ আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা)-এর অপর একটি বর্ণনায় এসেছে:
داود بن أبي هند عن أبي نضرة عن أبي سعيد قال: فحدثني أصحابي، وعند أحمد والبزار زيادةُ: ولم أسمعه من رسول الله – صلى الله عليه وسلم -.
দাউদ ইবন আবি হিন্দ → আবু নাদরা → আবু সাঈদের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: “আমার সাথীরা আমাকে বলেছেন।” আহমাদ ও বাযযারের বর্ণনায় অতিরিক্ত রয়েছে: “আর আমি নিজে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছ থেকে শুনিনি।”[43]তাইয়ালিসি তার মুসনাদ-এ, মুসনাদ ১/৫১৭–৫১৮ (৬৩৭); ইবন সাদ তার তাবাকাত-এ, তাবাকাত ৩/২৫২; আহমাদ, মুসনাদ ৩/৫ (১১০১১); বাযযার তার মুসনাদ-এ — যা কাশফুল আস্তার-এ রয়েছে, কিতাব আলামাতিন নুবুওয়াহ, বাব মানাকিব আম্মার ইবন ইয়াসিরে, কাশফুল আস্তার ৩/২৫২ (২৬৮৭); এবং বাইহাকি দালাইল-এ দালাইল ২/৫৪৮–৫৪৯। সকলেই এটি বর্ণনা করেছেন
খেয়াল করুন, ইকরিমা যখন আবু সাঈদ আল খুদরী (রা) হতে বর্ণনা করে, তখন বিদ্রোহীদের দ্বারা শহিদ হওয়া এবং জাহান্নামের দিকে আহ্বান দুটো অংশই বর্ণনা করে। কিন্তু আবু নাদরা যখন সাঈদ আল খুদরী (রা) হতে বর্ণনা করেন তখন শুধুমাত্র বিদ্রোহীদের দ্বারা শহিদ হওয়ার বিষয়টা বর্ণনা করেন। এর কারণ কী?
এর কারণ হলো, সহিহ মুসলিমে রসুলুল্লাহ (ﷺ) হতে মূল বর্ণনাকারী হলেন আবু কাতাদা (রা)। কাতাদা থেকে আবু সাইদ (রা) বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ ”তোমাকে বিদ্রোহী দল হত্যা করবে” এটি আবু কাতাদা (রা) নিজের কানে শুনেছেন, আর উনার থেকে আবু সাঈদ (রা) শুনেছেন। আবু সাইদ (রা) নিজে সরাসরি এটি রাসুলের কাছে শোনেননি, যা আবু সাঈদ (রা) নিজেও স্বীকার করেছেন, যেমনটা একটু আগেই দেখেছি যে, ইবনে হাজার উল্লেখ করেছেন,
দাউদ ইবন আবি হিন্দ → আবু নাদরা → আবু সাঈদের সূত্রে বর্ণনা করেছেন, যেখানে মসজিদ নির্মাণ ও একটি একটি করে ইট বহনের ঘটনা রয়েছে। এতে আবু সাঈদ বলেছেন: “আমার সাথীরা আমাকে বলেছেন — তবে আমি নিজে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছ থেকে শুনিনি — যে তিনি বলেছিলেন: ‘হে সুমাইয়ার পুত্র! তোমাকে বিদ্রোহী দল হত্যা করবে।'”[44]মুসনাদে আহমদ, হাদিস ১০৫৮৮; ফাতহুল বারী ১/৫৪২
ইমাম বাইহাকি (রহ)-ও খালিদ আল হাযযা থেকে বাড়তি অংশটিসহ বর্ণনা করে বলেছেন, ‘বুখারি এটি সহিহতে মুসাদ্দাদ → আবদুল আযিয থেকে বর্ণনা করেছেন, তবে “বিদ্রোহী দল তাকে হত্যা করবে” বাক্যটি উল্লেখ করেননি।’[45]বাইহাকি, দালাইল ২/৫৪৬ তারপর বাইহাকি এটি ইবন আবি সামিনার সূত্রে → আবদুল ওয়াহহাব আস-সাকাফি থেকে পূর্বোক্ত অতিরিক্তাংশসহ বর্ণনা করেছেন। তারপর বলেছেন:
أخرجه البخاري عن إبراهيم بن موسى عن عبد الوهاب دون هذه اللفظة، وكأنه إنما تركها لمخالفة أبي نضرة عن أبي سعيد عكرمةَ في ذلك.
বুখারি এটি ইবরাহিম ইবন মুসা → আবদুল ওয়াহহাব থেকে এই বাক্যটি ছাড়া বর্ণনা করেছেন। মনে হচ্ছে তিনি এটি বাদ দিয়েছেন কারণ এই বিষয়ে আবু নাদরা → আবু সাঈদের বর্ণনা ইকরিমার বর্ণনার বিরোধী।[46]দালাইল ২/৫৪৭–৫৪৮।
এখানে আরো বিবেচ্য বিষয়টি হলো, ইকরিমার বর্ণনার সময়ে পরিবেশগত প্রেক্ষাপট এবং আবু নাদরার বর্ণনায় পরিবেশগত প্রেক্ষাপট এক রকম না। আমরা বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনার পরিবেশগত পার্থক্য করার চেষ্টা করলেই বুঝতে পারি, দুই হাদিস দুই ঘটনার। সহিহ মুসলিমের প্রেক্ষাপট ও সহিহ বুখারির প্রেক্ষাপট আলাদা দেখাচ্ছে। বুখারিতে আম্মার (রা)-সহ রাসুলের মসজিদে নববীর নির্মাণের সময় ইট-বালুর আলোচনা এসেছে।[47]সহিহ বুখারী ৪৪৭, ২৮১২ অথচ সহিহ মুসলিমে আম্মারের পরিখা খননের প্রেক্ষাপট দেখা যাচ্ছে।[48]সহিহ মুসলিম আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৯১৫-২৯১৬ আর সহিহ মুসলিমে বিদ্রোহীরা আম্মারকে হত্যা করবে সুস্পষ্ট এসেছে, কিন্তু আহ্বানের অংশটি নেই। কিন্তু অন্যদিকে বুখারীর প্রাচীন পাণ্ডুলিপিতে, উক্ত সনদ দুটিতে বিদ্রোহীরা আম্মারকে হত্যা করবে এই অংশটি নেই, বরং তারা তাকে আহ্বান করে এই অংশটি আছে। কিন্তু ইবনে হাজার যে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন, যেখানে দেখা যায় ‘আবু নাদরার সূত্রে আবু সাঈদ বলছেন, তিনি নিজের কানে রাসুলকে এটি বলতে শোনেননি’ সেই হাদিসের প্রেক্ষাপটের মিল পাওয়া যায়।
এই থেকে অনুমান করা যায়, যখন আবু সাঈদ (রা) বুখারিতে বর্ণিত হাদিসটি বর্ণনা করছিলেন তখনই তিনি এই বিষয়টাও পরিষ্কার করে বলেছেন, তিনি কোন অংশটি নিজের কানে শোনেননি। যা দর্শায় পরের অংশ তিনি নিজের কানে শুনেছেন, যেটি প্রমাণ করে দুই ঘটনা একই সঙ্গে ঘটেনি বরং দুটো কথাই ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার। কিন্তু ইকরিমার সূত্রে এই স্পষ্টীকরণ করা আবু সাঈদ (রা) এর পরিষ্কার ব্যাখ্যাটি অন্তর্ভুক্ত হয়নি, যার কারণে এত কনফিউশন।
এই কারণেই ইবনে হাজার (রহ) সুস্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি নিশ্চিত যে, ইমাম বুখারি ইচ্ছাকৃত উক্ত অংশ নিজের কিতাবে বাদ দিয়েছিলেন, যা উনার হাদিস শাস্ত্রের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়েও গভীর পাণ্ডিত্যের প্রমাণ বহন করে। বুখারি কেবল সেটুকুই গ্রহণ করেছেন যা আবু সাঈদ নিজে নবী (ﷺ)-এর কাছ থেকে সরাসরি শুনেছেন, বাকিটা বাদ দিয়েছেন।[49]ফাতহুল বারী ১/৫৪২-৫৪৩
বিদ্রোহীর হাতে শাহাদাত ও জান্নাত জাহান্নামের দিকে আহ্বান সংক্রান্ত এই হাদিসের দুই অংশ যে দুই ঘটনার, তার আরো প্রমাণ পাওয়া যায় অন্যন্যা সাহাবাদের বর্ণনাগুলো একটু ভালো ভাবে পর্যালোচনা করলেই। যেমন ”তোমাকে বিদ্রোহী দল হত্যা করবে” এই হাদিসটি মুতাওয়াতির সূত্রে প্রমাণিত, যা আমরা একদম প্রথম দিকেই দেখিয়েছিলাম। ১৩/১৪ জনের নাম-তো ফাতহুল বারীতেই উল্লেখ রয়েছে, এবং এই সনদগুলোর অধিকাংশই সহিহ ও হাসান পর্যায়ের, যেমনটা ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) উল্লেখ করেছেন।[50]ফাতহুল বারী ১/৫৪১-৫৪২ মুহাম্মদ ইবনে জাফর আল-কাত্তানি (রহ) নিজের কিতাবে ৩২ জন সাহাবির নাম উল্লেখ করেছেন যাদের কাছ থেকে (সহিহ, হাসান, যয়িফ সনদে) উক্ত হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে।[51]কিতাবু নাজমিল মুতানাসির, পৃ. ১৯৭-১৯৮ কিন্তু সেগুলোর সবগুলোতে ‘জাহান্নামের দিকে আহ্বান…’ এই অতিরিক্ত অংশটি নেই, এবং এই অংশটি মুতাওয়াতির সূত্রেই প্রমাণিত নয়। এই দুটো অংশ একত্রে শুধু মাত্র ইকরিমার সূত্রেই সহিহ সনদে পাওয়া যায়।
যদি দুটো কথাই একই ঘটনার সময় বলতেন আমাদের নবী (ﷺ) তাহলে হাদিসে একটি অংশ মুতাওয়াতির হবে ও আরেকটি অংশ নয়, এমনটা কি ঘটা কখনো সম্ভব? শুধু একজন বর্ণনাকারীর সূত্রেই দুটো ঘটনা একত্রে থাকবে আর বাকি কারো সূত্রেই থাকবে না এমনটা কি সম্ভব? যদি দুটো কথাই একই সময়ে বর্ণিত হতো, তাহলে এত সাহাবী নিজে শুনার পরও কেন প্রথম অংশ বর্ণনা করবেন ও দ্বিতীয় অংশটি বর্ণনা করবেন না? আবার আবু সাঈদ খুদরি (রা) বলেন, তিনি নিজের কানে শোনেননি, বরং কাতাদা (রা) থেকে শুনেছেন, অথচ তিনি জান্নাত জাহান্নামের দিকে আহ্বান করা সংক্রান্ত হাদিস নিজের অথরিটিতে বর্ণনা করেছেন। যদি দুটোই একই সময়ে আমাদের রাসুলের মুখ দিয়ে বের হয়ে থাকতো, তাহলে এটা কি করে সম্ভব যে, আবু সাঈদ (রা) প্রথম অংশ শোনেননি কিন্তু দ্বিতীয় অংশ শুনেছেন! অথচ তিনি সেখানের শুরুর দিকে কি কি হয়েছে সেগুলারও বর্ণনা দিচ্ছেন!
এই বিষয়ে ইবনে কাসির (রহ) বলেন,
قال البيهقي: فقد فرَّق بين ما سمعه بنفسه وما سمعه من أصحابه. قال ويُشبه أن يكون قولُه الخندق وَهْمًا، أو أنه قال له ذلك في بناء المسجد وفي حفر الخندق. واللَّه أعلم.
قلت: حَمْلُ اللبن في حفر الخندق لا معنى له، والظاهر أنه اشتبه على الناقل واللَّه أعلم. وهذا الحديث من دلائل النبوة حيث أخبر صلواتُ اللَّه وسلامه عليه عن عمَّار أنه تقتُله الفئةُ الباغية، وقد قتله أهلُ
বাইহাকি বলেছেন:[52]দালাইল ২/৫৪৯ “তিনি যা নিজে শুনেছেন এবং যা সাথীদের কাছ থেকে শুনেছেন তার মধ্যে পার্থক্য করেছেন।” তিনি (বাইহাকি) আরও বলেছেন: ”মনে হচ্ছে ‘খন্দক’ শব্দটি ভুলক্রমে বলা হয়েছে, অথবা তিনি মসজিদ নির্মাণ ও খন্দক খনন উভয় সময়েই এই কথা বলেছিলেন। আর আল্লাহই সর্বজ্ঞ।”
আমি (ইবনে কাসির) বলছি: খন্দক খননের সময় ইট বহনের কথা বলা অর্থহীন। স্পষ্টতই বর্ণনাকারীর ভুলে এটি হয়েছে। আর আল্লাহই সর্বজ্ঞ।[53]আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া — ইবনে কাসির প্রকাশনী, ৩/৪৯৫
সবশেষে ড. জুম‘আ ফাতহী ‘আবদুল হালীম (হাফি) লিখেন,
ونخلص مما سبق في جملة «تقتله الفئة الباغية» إلى: أن الصواب – فيما أرى – عدم ثبوتها في رِواية أبي سعيد الخدري عند البخاري، كما جاء في نسخة أبي ذر عن شيوخه الثلاثة، ورِواية الأصيلي، ولذلك جُلُّ الشراح على عدم ثبوتها، وكما جاء أيضًا في كتب الأطراف والمستخرجات كما سبق بيانه، وكما وجهه ابن حجر وانتهى إلى إدراجها ممن ثبتت عندهم من رواة «الصحيح»، وأن البُخارِيّ حذفها عمدًا، لعدم ثبوتها عنده من رِواية أبي سعيد.
পূর্ববর্তী আলোচনার সারসংক্ষেপ — “বিদ্রোহী দল তাকে হত্যা করবে” বাক্য প্রসঙ্গে:
আমার দৃষ্টিতে সঠিক কথা হলো: বুখারিতে আবু সাঈদ খুদরির বর্ণনায় এটি প্রমাণিত নয়। যেমনটি আবু যরের তিন শাইখের সূত্রে এবং আসিলির বর্ণনায় এসেছে, — এবং এ কারণে অধিকাংশ শারিহিন (ব্যাখ্যাকারী) এটি অপ্রমাণিত স্বীকার করেছেন।
যেমনটি আতরাফ ও মুস্তাখরাজাতের গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ রয়েছে এবং যেমনটি ইবনে হাজারও এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, যাদের নিকট এটি প্রমাণিত হয়েছে, তাদের বর্ণনায় এটি ‘মুদরাজ’, এবং বুখারি ইচ্ছাকৃতভাবে এটি বাদ দিয়েছেন কারণ আবু সাঈদের বর্ণনায় তার নিকট এটি প্রমাণিত ছিল না।[54]কিতাবু রিওয়ায়াতিল জামি‘ইস সহীহি ওয়া নুসুখিহি — দিরাসাতুন নাযারিয়্যাতুন তাত্ববীকিয়্যাহ, ২/৪৯৮
উপসংহার
অনেক লম্বা আলোচনা করে ফেলেছি অনিচ্ছা সত্ত্বেও, তাই আলোচনার সারসংক্ষেপ উল্লেখ করার প্রয়োজনীয়তাও বোধ করছি। এই কারণে আমাদের আলোচনার সারসংক্ষেপ পয়েন্ট আকারে আপনাদের নিকট পেশ করছি,
➤ [١] আল্লাহ রাসুল (ﷺ) আম্মার (রা) এর শাহাদাত, বিদ্রোহী বাহিনীর উত্থান, সাহাবায়ে কেরামের মাঝে সংগঠিত হওয়া যুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। আর সেগুলো সত্য হয়েছে।
➤ [٢] বুখারীর হাদিসের প্রথম অংশে বিদ্রোহী বা সীমালঙ্ঘনকারী শব্দটি নেতিবাচক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। এর দ্বারা কোনো মুসলিম দল ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায় না; সীমালঙ্ঘন অবস্থায়ও কোনো দল মুমিন থাকতে পারে।
➤ [٣] বিদ্রোহী দল মুশরিক ছিলেন না, কাফের ছিলেন না, মুনাফিক ছিলেন না। উনারা অনিচ্ছাকৃত ইজতিহাদি ভুল করেছিলেন ভুল তাওয়ীল করার দ্বারা, আর উনাদের ইজতিহাদ ভুল ছিল।
➤ [٤] বুখারীর হাদিসের দ্বিতীয় অংশে জান্নাত জাহান্নামের দিকে আহ্বানের দুটি ব্যাখ্যা রয়েছে। (১) জান্নাত বা জাহান্নামের কারণের দিকে আহ্বান (২) এই আহ্বান সংক্রান্ত কথাটি ভিন্ন প্রসঙ্গের, এটি আম্মার (রা) এর জীবনে অতীতে মুশরিকদের সঙ্গে ঘটা ঘটনার প্রতিচ্ছবি।
➤ [٥] জান্নাত জাহান্নামে দিকে আহ্বান সংক্রান্ত অংশটি মুতাওয়াতির নয়; বুখারীর অধিকাংশ পাণ্ডুলিপিতে প্রথম অংশটি অনুপস্থিত ছিল, পরবর্তীতে ব্যাপকভাবে প্রবেশ করে। বুখারি থেকে প্রথম অংশ বাদ দেওয়ার কারণ ছিল দুটো কথা একই সময়ের নয়, বরং ভিন্ন সময়ের, ভিন্ন প্রেক্ষাপটের এবং সাহাবি নিশ্চিত করেছেন, সেই অংশটি তিনি নিজের কানে শোনেননি। আব্বাস (রা) এর মুক্তদাস ইকরিমার সনদেই শুধুমাত্র দুই হাদিস একসঙ্গে পাওয়া যায়। ইকরিমার সূত্রে এই হাদিসটি মুদরাজ বা সংযোজিত হাদিস। তাই এটিকে সাহাবিদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না।
পরবর্তীতে আরো কিছু ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ যেগুলো থেকে প্রমাণিত হয় সাহাবিদের মাঝে সংগঠিত হওয়া যুদ্ধে উভয় পক্ষ হক ও ন্যায়ের পথে ছিলেন, পার্থক্য ছিলো একটি দল হকের অধিক নিকটবর্তী ছিলেন। আমরা আল্লাহর রাসুল (ﷺ)-এর সকল সাহাবিকে ভালোবাসি, উনাদের মাঝে সংগঠিত হওয়া দ্বন্দ্বগুলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার উপর ন্যস্ত করি ও কারো ব্যপারে নেতিবাচক শব্দচয়নের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বনের চেষ্টা করি। কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে: ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই যারা ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করুন; এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের জন্য আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রাখবেন না; হে আমাদের রব, নিশ্চয় আপনি দয়াবান, পরম দয়ালু। [সূরা আল-হাশর: ১০]
তারা কেউই ইচ্ছাকৃত আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধাচরণ করার নিয়ত রাখতেন না, এমনকি উনারা নিজের পক্ষে জনমত গড়ার জন্য কখনো মুনাফিকদের মত বানোয়াট হাদিস বর্ণনা করার অথবা হাদিসকে প্রত্যাখ্যান করার দুঃসাহসও করেননি; বরং উনাদের কাজের বিরুদ্ধে কোনো নস আসলে হয় সেটার তাওয়ীল করেছেন অথবা নসের দিকে ফিরে এসেছিলেন, কারণ উনারা ছিলেন প্রকৃত মুমিন।
আল্লাহু আলাম
Footnotes
| ⇧1 | সহিহ বুখারী, হাদিস ৪৪৭, সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯১৫ |
|---|---|
| ⇧2 | আল-ইস্তী‘আব ৩/১১৪০; সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ১/৪২১; আল-আযহারুল মানসূরাহ পৃষ্ঠা ২৮৩; ফাতহুল বারী ১/৫৪৩ |
| ⇧3 | মুসনাদে আহমাদ, ২৯/৩১১, রিসালা সংস্করণ; হাদিসটি সহিহ, কিতাবু সিফাতি রাব্বিল ‘আলামীন, রাসাইলু জামি‘ইয়্যাহ, নাকিস, ১/৪৮৮ |
| ⇧4, ⇧9 | আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৪/৫৩৮ |
| ⇧5 | শারহুন নববী, ১৮/৪০ |
| ⇧6 | ‘আল-ইস্তি‘আব’ ২/৪৭৪ |
| ⇧7 | আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (৪/৫৩৮), আল-ইসাবাহ (৪/৪৭৪ |
| ⇧8 | সহিহ বুখারী, হাদিস ৪৪৭ |
| ⇧10 | কিতাবুল উম্ম লিশ-শাফিঈ, দারুল-ফিকর, ৪/২২৬ |
| ⇧11 | কিতাবুল মুসান্নাফ ইবনু আবি শাইবাহ, তাহকীক আশ-শাসরী, ২১/৫৭১, হাদিস ৪০৭৫৩, সনদ সহিহ |
| ⇧12 | কিতাবুল মুসান্নাফ ইবনু আবি শাইবাহ, তাহকীক আশ-শাসরী, ২১/৫১৮, হাদিস ৪০৬৪৭, সহিহ |
| ⇧13 | তুহফাতুল মুহতাজ ফী শারহিল মিনহাজ, শিরওয়ানী ও ইবনে কাসিম আল-আববাদী-এর টীকাসহ, ৯/৬৫-৬৬ |
| ⇧14 | আততামহীদ ফী বয়ানিত তাওহীদ, আবুশ শকুর সালেমীকৃত- ১৬৭-১৬৮ |
| ⇧15 | মাজমূ‘ আল-ফাতাওয়া ৩৫/৭৭ |
| ⇧16 | তোহফাতুল আহওয়াযী ১০/২০৪ |
| ⇧17 | উমদাতুল ক্বারী ৪/২০৮ |
| ⇧18 | আমীর কাহলানী, আত-তানভীর ১১/৪৩ |
| ⇧19 | আল-আওয়াসিম ওয়াল কাওয়াসিম ৮/২০ |
| ⇧20 | শারহুল মাকাসিদ, সা’দুদ্দীন তাফতাযানী ৫/৩০৮ |
| ⇧21, ⇧28 | ফাতহুল বারী ১/৫৪২ |
| ⇧22 | ‘ফায়দুল কাদীর’ — আব্দুর রাউফ আল-মুনাবী ৬/৩৬৬ |
| ⇧23 | শারহু সহীহিল বুখারী ২/৯৮-৯৯ |
| ⇧24 | আরশিফু মুলতাকা আহলিল হাদীস – ২, অনুচ্ছেদ ৩৭, পৃষ্ঠা ৩৪৫ |
| ⇧25 | সহিহ বুখারী, হাদিস ৬০৯৪ |
| ⇧26 | ফয়জুল বারী আলা সহীহিল বুখারী ২/৭২ |
| ⇧27 | ইবনু বাত্তাল, শরহু সহীহিল বুখারী ৫/২৭ |
| ⇧29 | মুদরাজ হাদিস |
| ⇧30 | মা‘রিফাতু ‘উলূমিল হাদীস পৃষ্ঠা ১৯৯–২০১; নুযহাতুন নাযার পৃষ্ঠা ৬৬–৬৭; আত-তাবসিরাহ ওয়াত-তাযকিরাহ ১/২৪৬–২৬০; ফাতহুল বাকী পৃষ্ঠা ২০৭–২১৪; আল-বাঈসুল হাসীস পৃষ্ঠা ৬১–৬৪ |
| ⇧31 | আল-মুখতাসারুন নাসীহু ফী তাহযীবিল কিতাবিল জামি‘ইস সহীহ, ১/৩২৪ |
| ⇧32, ⇧49 | ফাতহুল বারী ১/৫৪২-৫৪৩ |
| ⇧33 | কিতাবু রিওয়ায়াতিল জামি‘ইস সহীহি ওয়া নুসুখিহি — দিরাসাতুন নাযারিয়্যাতুন তাত্ববীকিয়্যাহ, ২/৪৯০ |
| ⇧34 | মাশারিক ২/৩৮২, মাকতাবা আতিকা সংস্করণ। |
| ⇧35 | তুহফাতুল আশরাফ ৩/৪২৭ (৪২৪৮)। |
| ⇧36 | লাওয়াইহুল আনওয়ারিস সুনিয়্যাহ ওয়া লাওয়াকিহুল আফকারিস সুনিয়্যাহ, ২/৩৮ |
| ⇧37 | আল-জাম‘ বাইনাস সহীহাইন লি ‘আব্দিল হাক্ক আল-ইশবীলী: ৪/১৯৯; জামিউল উসূল লি ইবনিল আছীর: ৬৫৮৩; ইখতিসারু সহীহিল বুখারী লি আবিল ‘আব্বাস আল-কুরতুবী: ১৩৪২ |
| ⇧38 | কিতাবু রিওয়ায়াতিল জামি‘ইস সহীহি ওয়া নুসুখিহি — দিরাসাতুন নাযারিয়্যাতুন তাত্ববীকিয়্যাহ, ২/৪৯০-৪৯১ |
| ⇧39 | কিতাবু রিওয়ায়াতিল জামি‘ইস সহীহি ওয়া নুসুখিহি — দিরাসাতুন নাযারিয়্যাতুন তাত্ববীকিয়্যাহ, ২/৪৯৭ |
| ⇧40 | আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া — ইবনে কাসির প্রকাশনী, ৩/৪৯৩ |
| ⇧41 | আহমাদ, মুসনাদ ৩/২২ (১১১৬৬); ও নাসাঈ তার কুবরা-তে কিতাবুল খাসাইস, বাব যিকর কাওলিন নাবি (ﷺ): “আম্মারকে বিদ্রোহী দল হত্যা করবে” — এই শিরোনামে এটি বর্ণনা করেছেন। |
| ⇧42 | সহিহ মুসলিম, হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৭২১২-৭২১৬ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৯১৫-২৯১৬ |
| ⇧43 | তাইয়ালিসি তার মুসনাদ-এ, মুসনাদ ১/৫১৭–৫১৮ (৬৩৭); ইবন সাদ তার তাবাকাত-এ, তাবাকাত ৩/২৫২; আহমাদ, মুসনাদ ৩/৫ (১১০১১); বাযযার তার মুসনাদ-এ — যা কাশফুল আস্তার-এ রয়েছে, কিতাব আলামাতিন নুবুওয়াহ, বাব মানাকিব আম্মার ইবন ইয়াসিরে, কাশফুল আস্তার ৩/২৫২ (২৬৮৭); এবং বাইহাকি দালাইল-এ দালাইল ২/৫৪৮–৫৪৯। সকলেই এটি বর্ণনা করেছেন |
| ⇧44 | মুসনাদে আহমদ, হাদিস ১০৫৮৮; ফাতহুল বারী ১/৫৪২ |
| ⇧45 | বাইহাকি, দালাইল ২/৫৪৬ |
| ⇧46 | দালাইল ২/৫৪৭–৫৪৮। |
| ⇧47 | সহিহ বুখারী ৪৪৭, ২৮১২ |
| ⇧48 | সহিহ মুসলিম আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৯১৫-২৯১৬ |
| ⇧50 | ফাতহুল বারী ১/৫৪১-৫৪২ |
| ⇧51 | কিতাবু নাজমিল মুতানাসির, পৃ. ১৯৭-১৯৮ |
| ⇧52 | দালাইল ২/৫৪৯ |
| ⇧53 | আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া — ইবনে কাসির প্রকাশনী, ৩/৪৯৫ |
| ⇧54 | কিতাবু রিওয়ায়াতিল জামি‘ইস সহীহি ওয়া নুসুখিহি — দিরাসাতুন নাযারিয়্যাতুন তাত্ববীকিয়্যাহ, ২/৪৯৮ |




