
সম্প্রতি একটি পডকাস্টে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের একটি মন্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ শোরগোল ফেলেছে। আফগানিস্তানের সামাজিক ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি দাবি করেন যে অনেকে আফগান সমাজব্যবস্থার প্রশংসা করলেও সেখানে ‘বাচ্চাবাজি’ নামের একটি প্রথা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে। এমনকি তিনি এটাও বলেন যে আফগানিস্তানের কোনো ট্রাক চালকই নাকি এই বিকৃত যৌনকর্মের বাইরে নন!
বক্তব্যটি শোনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এই দাবির ঐতিহাসিক সত্যতা কতটুকু? আসলেই কি আফগান সমাজ বা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ এই জঘন্য অপরাধের সাথে যুক্ত, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো রাজনৈতিক পটভূমি? চলুন, ফ্যাক্টচেক করা যাক!
বাচ্চাবাজি ও এর নেপথ্যের খলনায়ক
প্রথমেই একটু পরিষ্কার হওয়া দরকার, বাচ্চাবাজি আসলে কী? এটি মূলত একটি অত্যন্ত নিন্দনীয় ও অন্ধকার সামাজিক ব্যাধি, যেখানে এক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী আর যুদ্ধবাজদের ‘বিকৃত যৌন বিনোদনের’ খোরাক জোগাতে জন্মদাতা পরিবারগুলোই বিক্রি করে দেয় তাদের ঘরের অল্পবয়সী সন্তানদের। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই শিশুদের নারীদের পোশাক পরিয়ে নাচতে বাধ্য করা এবং তাদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, বাচ্চাবাজির পেছনে কি সকল ট্রাক চালকেরা দায়ী বা এটাকে কি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাড়তে দেওয়া হচ্ছে?
২০২০ এর প্রতিবেদন [1]Shame and Silence: Bacha Bazi in Afghanistan অনুযায়ী, এটি কোনো সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের কাজ নয়। বরং সমাজের উচ্চবিত্ত, প্রভাবশালী ব্যক্তি, স্থানীয় পুলিশ কমান্ডার, মিলিশিয়া লিডার এবং মাফিয়া প্রধানরাই তাদের ক্ষমতা ও অর্থবিত্তের বিকৃত প্রদর্শনী হিসেবে এই জঘন্য কাজ পরিচালনা করে থাকে। আর এই মন্তব্যগুলো করা হয়েছে তালিবান পূর্ববর্তী সমাজ-ব্যবস্থার আলোকে। কারণ তালিবান ক্ষমতায় এসেছিল ২০২১ সালে।

ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে সাবেক মুজাহিদীন কমান্ডাররা বাচ্চাবাজির সাথে জড়িত। এখানে উল্লেখ্য, সাবেক মুজাহিদীন কমান্ডার আর তালিবানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যদিও উভয়েরই উৎপত্তি আফগানিস্তানের যুদ্ধবিগ্রহের ইতিহাস থেকে এবং উভয়েই ইসলামপন্থী রাজনীতির কথা বলে; কিন্তু তাদের আদর্শ, রাজনৈতিক লক্ষ্য, গঠনের সময়কাল এবং আচরণের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
এক্ষেত্রে “মুজাহিদীন” বলতে বুঝায় সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে লড়াই করা বিভিন্ন স্বাধীন আঞ্চলিক দল ও নেতার জোট; আর তালিবান হলো এই মুজাহিদীনদের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা থেকে ১৯৯৪ সালে জন্ম নেওয়া একটি সুসংগঠিত গোষ্ঠী।
তালিবান বনাম বাচ্চাবাজি
এবারে আসা যাক দ্বিতীয় প্রসঙ্গে। ববি হাজ্জাজ এমন এক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বাচ্চাবাজির অভিযোগ তুলেছেন, যেই শাসনব্যবস্থার উত্থান ঘটেছিলই এই অপকর্মের বিরুদ্ধে। কী? অবাক হলেন?
সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় বাচ্চাবাজির ঘটনা বাড়তে থাকে এবং এটি ঐতিহাসিকভাবে বিনোদনমূলক একটি প্রথা থেকে ক্রমশ নির্যাতন ও যৌন দাসত্বের রূপ নিতে থাকে। বিদ্রোহের শেষ বছরগুলোতে আরও বেশি সংখ্যক যোদ্ধা অল্পবয়সী ছেলেদের অপহরণ করে তাদের সামরিক শিবিরে নিয়ে যেত। আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বাহক বা “চা-বালক” বলা হলেও বাস্তবে তারা প্রায়ই বহু পুরুষের যৌন দাসে পরিণত হতো।
তালিবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমর দুই মিলিশিয়া কমান্ডারের হাতে ধর্ষণের শিকার হতে যাওয়া এক কিশোরকে উদ্ধার করেছিলেন। এরপর তালিবান আরও অনেক ছেলেকে উদ্ধার করতে শুরু করে এবং স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তি করত। এর মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে বাচ্চাবাজি বা কিশোরদের যৌন শোষণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের থেকে আলাদা হিসেবে উপস্থাপন করেছিল [2]What About the Boys: A Gendered Analysis of the U.S. Withdrawal and Bacha Bazi in Afghanistan। এমনকি মোল্লা ওমর বাচ্চাবাজির শাস্তি “মৃত্যুদন্ড” নির্ধারণ করেছিলেন। ফলে প্রকাশ্যে বাচ্চাবাজি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
মার্কিন শাসন ও সেক্যুলার ডেমোক্রেসি
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি শুরু হয় ২০০১ সালে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে তথাকথিত সেক্যুলার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে আক্রমণ চালায়। তালিবান সরকারের পতনের সাথে সাথেই এই অপরাধের বিরুদ্ধে থাকা মৃত্যুদণ্ডের আইনটি বাতিল হয়ে যায়। আর এর সুযোগ নিয়ে মার্কিন বাহিনীর চোখের সামনেই বাচ্চাবাজি আবারও ভয়াবহ রূপ নেয়।
বিশেষ করে পশতু-অধ্যুষিত এলাকায় এবং দেশের অন্যান্য অংশেও বাচ্চাবাজির ঘটনা আবার বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। এক স্থানীয় ব্যক্তি বলেছিলেন: “তালিবানের সময় পাখিরা দুটো ডানাই মেলে উড়ত, কিন্তু এখন আর তা পারে না।” [3]What About the Boys: A Gendered Analysis of the U.S. Withdrawal and Bacha Bazi in Afghanistan
২০১২ সালে ল্যান্স কর্পোরাল গ্রেগরি বাকলি জুনিয়রের মতো মার্কিন সেনারা তাদের পরিবারের কাছে আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, মার্কিন ঘাঁটির ভেতরেই আফগান পুলিশদের ক্যাম্পে শিশুদের আর্তনাদ শুনেও তারা কিছু করতে পারতেন না। উল্টো ড্যান কুইন বা চার্লস মার্টল্যান্ডের মতো যেসব মার্কিন অফিসার এই অপরাধ রুখতে গিয়ে কোনো মিলিশিয়া কমান্ডারকে শাস্তি দিয়েছিলেন, মার্কিন প্রশাসন তাদের পুরস্কৃত করার বদলে চাকরি থেকে সরিয়ে দেয়!

বাকলি জুনিয়র তাঁর বাবাকে বলেছিলেন যে, রাতে তিনি যখন তাঁর বাঙ্কারে শুয়ে থাকতেন, তখন আফগান কর্মকর্তাদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া ওই ছেলেদের চিৎকার শুনতে পেতেন। বাকলি তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে এই বিষয়ে অভিযোগ জানালে তাঁকে নাকি এতে হস্তক্ষেপ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে ২০১২ সালে ঘাঁটির ভেতরেই এক আফগান পুলিশ সদস্যের গুলিতে বাকলি নিহত হন। বাকলির বাবার বিশ্বাস, ছেলেদের ধর্ষণ বন্ধ করার জন্য তাঁর ছেলের এই প্রয়াসই তাঁর হত্যাকাণ্ডের একটি অন্যতম কারণ ছিল। [4]Bacha Bazi: U.S. Soldiers Told Not To Interfere With Afghan Officers Raping Boys At Base Out Of Respect For Cultural Practice.
মূলত তালিবানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিজেদের আফগান সঙ্গীদের খুশি রাখতেই আমেরিকা এই ঘৃণ্য অপরাধকে বছরের পর বছর প্রশ্রয় দিয়ে গেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের এভাবে চোখ বন্ধ করে থাকা বা এড়িয়ে যাওয়া এক চরম নৈতিক আপেক্ষিকতাবাদের (moral relativism) বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক চাপের পর, ২০১৭ সালে এসে কেবল এর বিরুদ্ধে একটি শাস্তিযোগ্য আইন তৈরি করা হয়।
উপসংহার
তাহলে পুরো বিষয়টি বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করলে কী দাঁড়ায়? মার্কিন নেতৃত্বাধীন সেক্যুলার ডেমোক্রেসির আমলেই আফগানিস্তানে বাচ্চাবাজির সবচেয়ে ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছিল। পক্ষান্তরে, যে ইসলামী শরিয়াহ আইনের শাসনকে ববি হাজ্জাজ প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইলেন, সেই আইনই বরাবর এই অপরাধের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
এ থেকে আবারও প্রতীয়মান হয় যে বাচ্চাবাজির মতো সংবেদনশীল ইস্যুগুলোতে পশ্চিমা অনুগত ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো ঢালাওভাবে তালিবান বা সাধারণ আফগান সমাজব্যবস্থাকে কলুষিত করতে চাইলেও, ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলালে দেখা যায়, সেই দায় আসলে পশ্চিমাদের উপরেই পড়ে। আফগানিস্তানকে নিশানা বানিয়ে ইসলামের উপর আঘাত করতে চাওয়ার যে মানসিকতা সেক্যুলারিজমে দেখা যায়, তা আদতে নিজেদের দাগ মুছার ব্যর্থ প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই না।


