বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনঃ ভারতকে ইতিহাসের দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা

এক
বাংলাদেশের সরকারি পাঠ্যপুস্তকের ৯ম-১০ম শ্রেণির বাংলা বইটা খুলি। দেখতে পাই বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের কাহিনি।

বলা হচ্ছে তিনি ভারত থেকে উপহার পাওয়া গানবোট পরিচালনা করে যুদ্ধ করছিলেন।
- আকাশে উড়ে এলো জঙ্গীবিমান (জেটপ্লেন)।
- রুহুল আমিন চাইলেই জীবন বাঁচাতে নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে পারতেন। করলেন না।
- জেটপ্লেন থেকে গোলাবর্ষনে গানবোট ধ্বংস হয়ে যায়।
- রুহুল আমিন আহত হয়ে নদীতে ঝাপ দিলে তীরে থাকা রাজাকাররা তাকে খুন করে।[1]মাধ্যমিক বাংলা সংকলন গদ্য, নবম-দশম শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা, প্রবন্ধ: ‘দুজন বীরশ্রেষ্ঠ’, পৃ ১৩৫, ছাপা: ২০০৯
খুব ট্র্যাজেডিকাল কাহিনি।
ঘটনা শুনে মনে হচ্ছে পাকিস্তান আর্মির জেটপ্লেন থেকে বোমাবর্ষণের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন রুহুল আমিন। গর্বে বুক ফুলে উঠে।
কিন্তু…
দুই
সেই বোমাবর্ষণকারী বিমানগুলো ছিলো ভারতীয় বিমান, ভারতের আর্মির। এই অংশটাকে গোপন করেই পাঠ্যপুস্তকে লেখা হচ্ছে ইতিহাস!
“পরিকল্পনা ছিল ভারতীয় বিমানের ছত্রছায়ায় রনতরীগুলি এগিয়ে যাবে এবং ১০ ডিসেম্বর দুপুর দুইটার পূর্বে তা কোনক্রমেই খুলনা শীপ ইয়ার্ড অতিক্রম করে অভ্যন্তরে প্রবেশ করবেনা। এছাড়া রনতরীগুলি মিত্রবাহিনীর তা বোঝানোর জন্য জাহাজের ছাদে হলুদ কাপড় বিছিয়ে রাখার নির্দেশ থাকলেও রনতরীগুলি সে নির্দেশ না মেনে দুপুর বারটার পূর্বেই খুলনার জলসীমায় প্রবেশ করে। যে কারণে ঘটে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বৃহৎ বিপর্যয়।
ভারতীয় বোমারু বিমান রনতরীগুলিকে পাকিস্তানী পক্ষের ভেবে এর উপর উপর্যপুরি বোমা নিক্ষেপ করতে থাকে। চিত্রাঙ্গদা ও পানভেল ছিল অনেক এগিয়ে। পদ্মা ও পলাশ ছিল সকলের পিছনে। বিমানের বোমার আঘাতে জাহাজ দুটিতে আগুন ধরে যায়। সাথে সাথে মারা যান ভারতীয় কমাণ্ডার ও নাবিক সহ বেশ কয়েকজন বাঙালি নাবিক ও নৌ-কমান্ডো। বিপদ আন্দাজ করতে পেরে আত্মরক্ষার জন্য যারা পানিতে লাফিয়ে পড়েন কেবল তারাই ছিলেন অক্ষত। কিন্তু শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত যারা জাহাজ আকড়িয়ে ছিলেন, তাঁরা হয় শহীদ না হয় মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। কমান্ডো রফিকুল ইসলামের দেহ বোমার আঘাতে সম্পূর্ণ ভাবে দ্বি-খন্ডিত হয়ে যায়। বীরশ্রেষ্ঠ রুহল আমিন (ই,আর, এ) প্রথমেই গোলার আঘাতে আহত হন। বিমান থেকে নিক্ষেপিত গুলিতে তার বামহাত ভেঙ্গে যায়। তিনি ১১ই নভেম্বর তারিখ যুদ্ধে যোগদিয়েছিলেন। প্রচুর রক্তক্ষরণে যখন তিনি যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছেন তাঁরই সহযোদ্ধা এবং অপর নাবিক রুহুল আমিন (সম্প্রতি বাংলাদেশ নেভী থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন) আহত বন্ধুকে নিয়ে নদীতে ঝাপিয়ে পড়েন। রুহুল আমিনের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, তিনি আহত বন্ধুকে নিয়ে সাঁতরিয়ে কূলে পৌঁছানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। প্রবল স্রোতের তোঁড়ে উভয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন আহত অবস্থায় আপ্রাণ চেষ্টা করে সাঁতরিয়ে রূপসার তীরে পৌছতে সক্ষম হলেও পিশাচ রাজাকাররা তাঁকে বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে মেরে ফেলে।”[2]মুক্তিযুদ্ধ ও নৌ-কমান্ডো অভিযান, (মুক্তিযুদ্ধে একটি অপ্রকাশিত দলিল), কমান্ডো মোঃ খলিলুর রহমান, ফেব্রু ‘৯৭, পৃ ১৯৪ ও ১৯৫
তিন
“পদ্মা ও পলাশ জাহাজের দ্বিতীয় অভিযান শুরু হয় ৭ ডিসেম্বর ‘৭১। জনাব মোতালেব এই অপারেশনে একজন সৈনিক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল পিএনএস তিতুমীর দখল করা। অভিযানে ভারতের নৌবাহিনীর যুদ্ধ জাহাজ ‘আইএনএস পানভেল’ এবং ‘চিত্রাংগদা’ও অংশ নেয়। তাঁরা ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান রুট ধরে ৯ ডিসেম্বর হিরন পয়েন্ট পৌছেন। ১০ ডিসেম্বর সকাল ৭টায় মংলা বন্দর এবং দুপুর বারটায় কোন বাধা ছাড়া খুলনা শিপ ইয়ার্ডের নিকট পৌঁছেন।
ভূলবশত: ভারতের তিনটি জঙ্গী বিমান অকস্মাৎ গানবোটগুলির উপর বোমাবর্ষণ শুরু করলে পদ্মা এবং পলাশে আগুন ধরে যায়। ফলে অনেকে শহীদ হন। অনেকে আহত অবস্থায় আত্মরক্ষা করেন। বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন এখানে রাজাকারদের হাতে শহীদ হন। জনাব মোতালেব আহত অবস্থায় আত্মরক্ষায় সমর্থ হন।”[3]মুক্তিযুদ্ধঃ নাবিক ও নৌ কমান্ডোদের জীবন গাঁথা – কমান্ডো মোঃ খলিলুর রহমান, ফেব্রু ‘০১, পৃ ৯১
চার
“পরদিন ১০ ডিসেম্বর অভিযান শুরু হয়। বেলা ১২টার সময় খুলনা শিপইয়ার্ডের সন্নিকটে আকাশে তিনটি জংগী বিমান দেখা দেয়। ভারতীয় নাবিক বলেন যে, বিমানগুলো ভারতীয়। আকস্মিকভাবে জংগী বিমানগুলো বোমাবর্ষণ শুরু করে। ভারতীয় নাবিক সবাইকে জাহাজ ত্যাগ করতে বলেন। ইঞ্জিন আর্টিফিসার মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমিন উপরে এসে চীৎকার করে জানতে চান ‘জাহাজ থামতে কেন বলা হয়েছে। আমরা মৃত্যুর ভয়ে ভীত নই এগিয়ে যাবোই।” বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন ‘পলাশ’-এর উপরে পাকিস্তানী বোমাবর্ষণের ফলে শহীদ হন।”[4]মুক্তিযুদ্ধে যশোর, আসাদুজ্জামান আসাদ, ফেব্রু ‘৯৪, পৃ ৮৫[5]বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র (দশম খণ্ড), পৃ 536
পাঁচ
ভারতীয় আর্মির তৎকালীন লে. জেনারেল জে এফ আর জেকব লিখেছেন,
“ডিসেম্বরের ৯/১০ তারিখের রাতে এটা মংলার প্রবেশপথে এবং ১০ তারিখে বন্দরে পৌঁছে। অতি-উৎসাহী সামন্ত খুলনা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। পরিষ্কার হলুদ রং করা থাকা সত্ত্বেও দুর্ভাগ্যবশত আমাদের এয়ার ফোর্স সেগুলোকে চিহ্নিত করতে পারেনি। ফলে ন্যাটো (NATO)-র পরিভাষা অনুযায়ী ‘বন্ধুত্বপূর্ণ গুলিবর্ষণ (friendly fire)’-এর পরিণতিতে জাহাজগুলো ডুবে যায়। সামন্তসহ অন্যান্য ক্রু সাঁতরে পারে উঠতে সমর্থ হয়। সেই এলাকার নিয়ন্ত্রণ মুক্তিবাহিনীর হাতে ছিল বলে সৌভাগ্যবশত কেউ হতাহত হয়নি। তারপরেও ইস্টার্ন কম্যান্ডের আমরা সকলে সামন্তকে মহাবীর চক্র পুরস্কারে ভূষিত করার জন্য সুপারিশ করি।”[6]সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা, লে. জেনারেল জে এফ আর জেকব, আনিসুর রহমান মাহমুদ অনূদীত, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, পৃ ৭৫
পয়েন্ট টু বি নোটেড, তিনি দাবি করছেন যে ভারতীয় বিমানের এই হামলায় কেউ হতাহত হয় নি, তবে বাংলাদেশী সূত্র বলছে হতাহত হয়েছে। আবার সে বলছে হলুদ রং করা ছিলো নৌকাতে! পরস্পরবিরোধী কথাবার্তা সব। তবে বিমানগুলা ভারতের ছিলো সে ব্যাপারে সবাই একমত।
রুহুল আমিন হত্যায় ভারতীয় আর্মির দায় রয়েছে, সেটা আমাদের স্বীকার করে নিয়েই ইতিহাসের বয়ান নির্মাণ করতে হবে। কোন উদ্দেশ্যে ভারতকে ইতিহাস থেকে দায়মুক্তি দেবো আমরা।
পাঠ্যপুস্তকে কি এ সবকিছু সঠিকভাবে সম্পাদনা করা হবে না আর? নাকি আওয়ামী বয়ানই গিলতে থাকবো?
- যেখানে মুক্তিবাহিনীর গানবোট চলে, অর্থাৎ সে এলাকা মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে, সেখানে রাজাকার কীভাবে থাকে? রাজাকাররা বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনকে মেরেছে এটা সাব্যস্ত হলো কীভাবে? আমার তো মনে হয় বোমায় আহত বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন নদীতে বন্ধু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই মারা গেছে।
- ভারতীয় আর্মির জ্যাকবের সূত্র বলছে হলুদ কাপড় বিছানো ছিলো, তারপরেও ভারতীয় বিমান কেন বোমাবাজি করলো? মিত্রপক্ষের যে, তা না বোঝার কোনো যৌক্তিকতা নেই তো!
Footnotes
| ⇧1 | মাধ্যমিক বাংলা সংকলন গদ্য, নবম-দশম শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা, প্রবন্ধ: ‘দুজন বীরশ্রেষ্ঠ’, পৃ ১৩৫, ছাপা: ২০০৯ |
|---|---|
| ⇧2 | মুক্তিযুদ্ধ ও নৌ-কমান্ডো অভিযান, (মুক্তিযুদ্ধে একটি অপ্রকাশিত দলিল), কমান্ডো মোঃ খলিলুর রহমান, ফেব্রু ‘৯৭, পৃ ১৯৪ ও ১৯৫ |
| ⇧3 | মুক্তিযুদ্ধঃ নাবিক ও নৌ কমান্ডোদের জীবন গাঁথা – কমান্ডো মোঃ খলিলুর রহমান, ফেব্রু ‘০১, পৃ ৯১ |
| ⇧4 | মুক্তিযুদ্ধে যশোর, আসাদুজ্জামান আসাদ, ফেব্রু ‘৯৪, পৃ ৮৫ |
| ⇧5 | বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র (দশম খণ্ড), পৃ 536 |
| ⇧6 | সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা, লে. জেনারেল জে এফ আর জেকব, আনিসুর রহমান মাহমুদ অনূদীত, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, পৃ ৭৫ |




