আলি(রা.) কি রাসুল(স.) এর স্থলাভিষিক্ত?
"নিশ্চয়ই আল্লাহ আদম, নূহ ও ইবরাহীমের পরিবারকে এবং ইমরানের পরিবারকে সৃষ্টিজগতের উপর মনোনীত করেছেন।" (সূরা আল-ইমরানঃ৩৩)আবার, ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এ বিষয়ে বলেন,
এখানে ইবরাহীম, ইমরান, ইয়াসীন ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবারের মধ্যে যারা ঈমানদার কেবল তাদেরকে বুঝানো হয়েছে। তাদেরকেই আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বাণী ও রহমত বহনের জন্য মনোনীত করেছেন। এদের বংশধরদের মধ্যে যারা কাফের বা মুশরিক তাদের বোঝানো হয়নি। [তাবারী]এই আয়াত আর তাফসির দিয়ে শিয়ারা বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, আলি(রা.) যেহেতু রাসুল(স.) এর পরিবারের একজন ইমানদার ব্যক্তি ছিলেন, তাই উনি সৃষ্টিজগতের উপর মনোনীত বা রাসুল(স.) এর মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্ত (নাউযুবিল্লাহ)। এখন তাদের এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে একটা কঠিন জবাব দিলে ভালো হয়।
---
১. সূরা আল-ইমরান: ৩৩ আয়াতের সঠিক তাফসীর ও প্রাসঙ্গিকতা
আয়াত:
"إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَىٰ آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعَالَمِينَ"
অনুবাদ: "নিশ্চয়ই আল্লাহ আদম, নূহ, ইবরাহীমের পরিবার-পরিজন এবং ইমরানের পরিবার-পরিজনকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের উপর মনোনীত করেছেন।"
এই আয়াতের "اصْطَفَىٰ" (ইসতাফা) শব্দের অর্থ হলো "মনোনীত করা" বা "বেছে নেওয়া"। এখানে এই মনোনয়ন কী জন্য?
ক) তাফসীরে তাবারীর উদ্ধৃতি (যা আপনি উল্লেখ করেছেন):
ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেছেন:
"আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীমের পরিবার থেকে ইসমাঈল ও বনী ইসরাঈলকে মনোনীত করেছেন। ইমরানের পরিবার থেকে হারুন, মূসা ও মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরিবারের মধ্যে যারা মুমিন, শুধু তাদেরকেই বোঝানো হয়েছে। যারা কাফের, তারা এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত নয়।"
[তাফসীর আত-তাবারী, ৬/৩০৬]
মূল要点: এই আয়াত নবুয়ত ও রিসালাতের জন্য মনোনয়ন সম্পর্কিত, রাজনৈতিক খিলাফত বা ইমামতের জন্য নয়।
---
২. নবুয়ত বনাম ইমামত/খিলাফত: স্পষ্ট পার্থক্য
ক) নবুয়ত হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি নির্বাচন:
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"আল্লাহই ভালো জানেন, তিনি তাঁর রিসালাত কোথায় স্থাপন করবেন।" [সূরা আল-আন'আম: ১২৪]
নবুয়তের জন্য বংশীয় যোগ্যতা একটি উপাদান হতে পারে, যেমন ইবরাহীম (আ.)-এর বংশে নবুয়ত চলেছে। কিন্তু খিলাফত বা ইমামতের জন্য তা নয়।
খ) খিলাফতের ভিত্তি হলো তাকওয়া ও যোগ্যতা:
"নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক মর্যাদাবান যে সর্বাধিক মুত্তাকী।" [সূরা আল-হুজুরাত: ১৩]
রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"কোনো আরবের উপর কোনো অনারবের, কোনো কালোর উপর কোনো সাদারের, কোনো সাদারের উপর কোনো কালোর তাকওয়া ছাড়া কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই।"
[মুসনাদে আহমাদ, ২২৯৭৮; আলবানী সহীহ বলেছেন]
---
৩. "আল" (পরিবার) শব্দের অর্থ কী? শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়
ক) "আল" অর্থ অনুসারী ও ঈমানদার:
· "আল-ইবরাহীম" বলতে শুধু ইবরাহীম (আ.)-এর সন্তানদের নয়, বরং তার অনুসারী মুমিনদের বোঝায়।
· যেমন, সূরা হুদ (৪৬) এ নূহ (আ.)-কে বলা হয়েছিল: "নিশ্চয়ই সে (নূহের পুত্র) তোমার আল (পরিবার) এর অন্তর্ভুক্ত নয়।" কারণ সে কাফের ছিল।
খ) মুহাম্মাদ (সা.)-এর "আল" কারা?
রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"প্রত্যেক নবীর আল (পরিবার) রয়েছে, আর আমার আল হলো তারা, যারা আল্লাহকে ভয় করে (মুত্তাকী)।"
[তাফসীর ইবনে কাসীর, ৩/৪৩২]
এছাড়াও তিনি বলেছেন:
"নিশ্চয়ই আমার আল হলো মুত্তাকী (আল্লাহভীরু) লোকেরা।"
[তাফসীর আল-কুরতুবী, ৪/১০৪]
---
৪. ঐতিহাসিক প্রমাণ: আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নিজেই প্রথম তিন খলিফাকে মেনেছেন
ক) আলী (রা.)-এর আনুগত্য:
· আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আবু বকর, উমর ও উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর শাসনামলে উপদেষ্টা, বিচারক ও সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
· তিনি তাঁর কন্যা উম্মে কুলসুমকে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে বিয়ে দিয়েছেন। [তারীখ আত-তাবারী, ৪/১৯০]
· উমর (রা.) বলেছেন: "আলী আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম বিচারক।" [সুনান আত-তিরমিযী, ৩/৩০২]
খ) আলী (রা.)-এর বক্তব্য:
তিনি বলতেন:
"আবু বকর ও উমর (আল্লাহ তাদের উপর রহমত বর্ষণ করুন) হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। তাদের অনুসরণ করো, কারণ আমি তাদের অনুসরণ করি।"
[কানযুল উম্মাল, ১২/৬৭০]
---
৫. আহলে বাইতের মর্যাদা ও তাদের অবস্থান
ক) আহলে বাইতের সংজ্ঞা:
সহীহ হাদীসে "আহলে বাইত" বলতে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রীগণ-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে:
"হে আহলে বাইত! আল্লাহ তো চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।" [সূরা আল-আহযাব: ৩৩]
হাদীস: উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেছেন: "রাসুল (সা.) বের হয়ে আসলেন, তাঁর উপর একটি চেকার চাদর... তখন তিনি বললেন: 'হে আহলে বাইত!'" [সহীহ মুসলিম, ২৪২৪]
এই হাদীসে আয়িশা (রা.)-কেও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
খ) হাসান (রা.)-এর খিলাফত ত্যাগ:
ইমাম হাসান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মুআবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে খিলাফত হস্তান্তর করেছেন। [তারীখ আত-তাবারী, ৫/১৫৮]
এটিপ্রমাণ করে যে, আহলে বাইতের জন্য খিলাফত কোনো divine right নয়।
---
৬. শিয়াদের দাবির যুক্তিগত খণ্ডন
প্রশ্ন ১: যদি আলী (রা.) divine right-এ খলিফা হতেন, তাহলে:
· কেন তিনি ২৫ বছর অপেক্ষা করলেন?
· কেন সাহাবায়ে কিরাম (রা.)-এর ইজমা (consensus) তাঁর বিরুদ্ধে গেল?
· কেন তিনি নিজে অন্য খলিফাদের আনুগত্য করলেন?
প্রশ্ন ২: যদি "আল" বলেই খিলাফত পাওয়া যায়, তাহলে:
· কেন আব্বাস (রা.) (রাসুলের চাচা) খলিফা হলেন না?
· কেন জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.) খলিফা হলেন না?
উত্তর: কারণ খিলাফত হলো উম্মাহর আমানত ও পরামর্শভিত্তিক পদ। আল্লাহ বলেন:
"তাদের কাজ হলো পরস্পর পরামর্শ করা।" [সূরা আশ-শুরা: ৩৮]
---
৭. প্রসিদ্ধ মুফাসসিরগণের মতামত
ক) ইবনে কাসীর (রহ.):
"এই আয়াত (সূরা আল-ইমরান: ৩৩) নবুয়তের জন্য মনোনয়ন সম্পর্কিত। এটি প্রমাণ করে না যে, তাদের বংশধররা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইমাম বা খলিফা হবে।" [তাফসীর ইবনে কাসীর, ২/৩০]
খ) আল-কুরতুবী (রহ.):
"আল-ইবরাহীম বলতে ইবরাহীম (আ.)-এর অনুসারী মুমিনরা অন্তর্ভুক্ত। এটি শুধু বংশগত সম্পর্ক নয়।" [তাফসীর আল-কুরতুবী, ৪/১০৪]
গ) আত-তাবারী (রহ.):
"এই আয়াতের উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ এই পরিবারগুলোকে নবুয়তের জন্য মনোনীত করেছেন, দুনিয়ার রাজত্বের জন্য নয়।" [তাফসীর আত-তাবারী, ৬/৩০৭]
---
৮. চূড়ান্ত উপসংহার
১. সূরা আল-ইমরান: ৩৩ আয়াতটি নবুয়তের জন্য মনোনয়ন সম্পর্কিত, খিলাফত বা ইমামতের জন্য নয়।
২."আল" (পরিবার) বলতে শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়, বরং ঈমান ও তাকওয়ার সম্পর্ক বোঝায়।
৩.খিলাফতের ভিত্তি হলো তাকওয়া, যোগ্যতা ও উম্মাহর পরামর্শ (শুরা)।
৪.আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নিজেই প্রথম তিন খলিফাকে মেনেছেন এবং তাদের অধীনে কাজ করেছেন।
৫.আহলে বাইতের মর্যাদা অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু এই মর্যাদা স্বয়ংক্রিয় খিলাফতের দাবিদার হওয়া নয়।
শিয়াদের এই দাবি কুরআন, হাদীস, ঐতিহাসিক সত্য ও সাহাবায়ে কিরামের ইজমার সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি একটি পরবর্তীকালে উদ্ভাবিত রাজনৈতিক মতবাদ।
আল্লাহ আমাদেরকে সত্য বুঝার এবং মেনে নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।