ইসলামবিরোধীদের প্রতি জবাবশরিয়াহ আইনহিউম্যানিজম

শিশুকে প্রহার বা শাসনের সীমারেখা

ইসলাম শিশুকে ইসলাম বিরোধীরা যেভাবে উপস্থাপন করে সেভাবে নির্যাতনের অনুমতি দেয় না। সন্তানের শিষ্টাচার ও দ্বীনি শিক্ষার দায়িত্ব পিতা-মাতার ওপর, আর সেই দায়িত্ব পালনের জন্য শিক্ষামূলক শাসনের অনুমতি আছে। শাসন আর নির্যাতন এক জিনিস নয়। শাসনের উদ্দেশ্য সংশোধন ও কল্যাণ; নির্যাতনের পেছনে থাকে ক্ষোভ, প্রতিশোধ বা ক্ষতি করার মনোভাব। ইসলাম এই অনুমতির সঙ্গে বয়স, উদ্দেশ্য, সংখ্যা, তীব্রতা, আঘাতের স্থান ও উপকরণের কঠোর সীমা বেঁধে দিয়েছে এবং সীমা লঙ্ঘনের জন্য ক্ষতিপূরণ, কাফফারা ও কিসাস পর্যন্ত জবাবদিহি রেখেছে। নবী ﷺ-এর জীবনে শিশুদের প্রতি আচরণের মূল সুর ছিল দয়া ও কোমলতা। নিচের লেখায় হাদিস, চার মাযহাবের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ও সমকালীন আলেমদের বক্তব্যের আলোকে বিষয়টি ক্রমানুসারে তুলে ধরা হলো।

Contents Hide

শিশুকে শাসন করা বৈধ

প্রথমত, শিশুকে শাসন বা প্রহার করা বৈধ। এর দলিল নিচের হাদিস।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:

مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرِ سِنِينَ وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ

অনুবাদ: “তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও, আর দশ বছর বয়সে নামাজের জন্য তাদের প্রহার করো এবং তাদের শয্যা পৃথক করে দাও।”[1]সূত্র: সুনান আবি দাউদ, হাদিস ৪৯৫। (সংকলক ইমাম আবু দাউদ, মৃ. ২৭৫ হি./৮৮৯ খ্রি.).

এই হাদিসে ধাপে ধাপে শেখানোর পদ্ধতি আছে। সাত বছর বয়সে শুধু নির্দেশ দেওয়া ও অভ্যাস গড়ে তোলা। প্রহারের প্রশ্ন আসে দশ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর, তাও নামাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত শেখানোর উদ্দেশ্যে। তৃতীয় নির্দেশ ‘শয্যা পৃথক করে দাও’। অর্থাৎ হাদিসটি কেবল প্রহারের অনুমতি নয়; এটি ইবাদতের অভ্যাস, শালীনতা ও সীমারেখা শেখানোর পূর্ণ কাঠামো। প্রহার সেই কাঠামোর সবচেয়ে শেষ ধাপ।

১০ বছর বয়সে সালাতের জন্য প্রহারের হাদিসের ব্যাখ্যা

প্রশ্ন ওঠে, দশ বছর বয়সে সালাত তো শিশুর ওপর ফরযই হয়নি, তবু প্রহারের নির্দেশ কেন? আলেমদের উত্তরে তিনটি বিষয় স্পষ্ট উঠে এসেছে: প্রহারের উদ্দেশ্য হবে প্রশিক্ষণ ও অভ্যাস গড়া, প্রহার হবে হালকা ও উপকারী, আর তার লক্ষ্য হবে শিশুর নিজের কল্যাণ।

ইবনু কুদামা (রহ) (মৃ. ৬২০ হি./১২২৩ খ্রি.) এর মতে, প্রশিক্ষণই উদ্দেশ্য। তিনি বলেন:

هَذَا الْأَمْرُ وَالتَّأْدِيبُ الْمَشْرُوعُ فِي حَقِّ الصَّبِيِّ لِتَمْرِينِهِ عَلَى الصَّلَاةِ، كَيْ يَأْلَفَهَا وَيَعْتَادَهَا، وَلَا يَتْرُكَهَا عِنْدَ الْبُلُوغِ.

অনুবাদ: শিশুর ক্ষেত্রে এই নির্দেশ ও শাসন শরিয়তসম্মত করা হয়েছে তাকে সালাতের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য, যাতে সে সালাতের সঙ্গে পরিচিত হয়, তাতে অভ্যস্ত হয় এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তা ছেড়ে না দেয়।[2]রেফারেন্স: المغني (১/৩৫৭)। – https://shamela.ws/book/6910/856

তাকিউদ্দিন আস-সুবকি (রহ) (মৃ. ৭৫৬ হি./১৩৫৫ খ্রি.) উল্লেখ করেছেন কল্যাণের জন্য অভ্যাস গড়া নিয়ে। তিনি বলেন,

يَجِبُ عَلَى الْوَلِيِّ أَنْ يَأْمُرَ الصَّبِيَّ بِالصَّلَاةِ لِسَبْعٍ وَيَضْرِبَهُ عَلَيْهَا لِعَشْرٍ.

وَلَا نُنْكِرُ وُجُوبَ الْأَمْرِ بِمَا لَيْسَ بِوَاجِبٍ، وَالضَّرْبَ عَلَى مَا لَيْسَ بِوَاجِبٍ، وَنَحْنُ نَضْرِبُ الْبَهِيمَةَ لِلتَّأْدِيبِ فَكَيْفَ الصَّبِيُّ؟ وَذَلِكَ لِمَصْلَحَتِهِ وَأَنْ يَعْتَادَ بِهَا قَبْلَ بُلُوغِهِ.

অনুবাদ: অভিভাবকের জন্য সাত বছর বয়সে শিশুকে সালাতের নির্দেশ দেওয়া এবং দশ বছর বয়সে সালাতের জন্য তাকে প্রহার করা আবশ্যক।

যে কাজ নিজে আবশ্যক নয়, সে কাজের নির্দেশ দেওয়াকে এবং তা না করার জন্য প্রহার করাকে আমরা অস্বীকার করি না। আমরা তো পশুকেও প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য প্রহার করি; তাহলে শিশুর ক্ষেত্রে কীভাবে তা অস্বীকার করা যায়? এটি করা হয় শিশুর কল্যাণের জন্য এবং সে যেন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই সালাতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, সেই উদ্দেশ্যে।[3]রেফারেন্স: كتاب فتاوى السبكي (১/১৯০)। – https://shamela.ws/book/11498/188

সুবকির যুক্তি হলো: নিজে ফরয নয় এমন কাজেও প্রশিক্ষণমূলক শাসন চলে, কারণ উদ্দেশ্য অভ্যাস ও কল্যাণ। পশুর উপমা এখানে প্রশিক্ষণের বৈধতা বোঝাতে এসেছে; শিশুকে পশুর সমান করতে নয়। আর ‘শিশুর কল্যাণের জন্য’ কথাটিই মানদণ্ড: যে প্রহার শিশুর কল্যাণ করে না, তা এই যুক্তির আওতায় পড়ে না।

শায়েখ বিন বায (রহ) (মৃ. ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.) হালকা প্রহারের বিষয়ে বলেছেন,

والعناية بأهل البيت، لا تغفل عنهم يا عبد الله، عليك أن تجتهد في صلاحهم، وأن تأمر بنيك وبناتك بالصلاة لسبع، وتضربهم عليها لعشر، ضربا خفيفا يعينهم على طاعة الله، ويعودهم أداء الصلاة في وقتها، حتى يستقيموا على دين الله ويعرفوا الحق، كما صحت بذلك السنة عن رسول الله صلى الله عليه وسلم

অনুবাদ: পরিবারের প্রতি যত্নবান হওয়া জরুরি। হে আল্লাহর বান্দা, তাদের ব্যাপারে উদাসীন হয়ো না। তাদের সংশোধনের জন্য চেষ্টা করতে হবে। ছেলে ও মেয়েদের সাত বছর বয়সে সালাতের নির্দেশ দেবে এবং দশ বছর বয়সে সালাতের জন্য তাদের প্রহার করবে—এমন হালকা প্রহার, যা আল্লাহর আনুগত্যে তাদের সহায়তা করবে এবং যথাসময়ে সালাত আদায়ে অভ্যস্ত করবে। যাতে তারা আল্লাহর দ্বীনের ওপর অবিচল হয় এবং সত্য জানতে পারে। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে সহিহ সুন্নাহ প্রমাণিত।

أمر النبي صلى الله عليه وسلم أن نأمر أولادنا بالصلاة لسبع سنين، وأن نضربهم عليها لعشر سنين، مع أنهم لم يُكلفوا بعد، من أجل أن يتمرنوا على فعل الطاعة ويألفوها، حتى تسهل عليهم بعد الكبر، وتكون محبوبة لديهم، كذلك الأمور التي ليست بالمحمودة، لا ينبغي أن يعود الصغار عليها وإن كانوا غير مكلفين؛ وذلك لأنهم يألفونها عند الكبر ويستسيغونها.

অনুবাদ: নবী ﷺ আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা যেন সাত বছর বয়সে সন্তানদের সালাতের নির্দেশ দিই এবং দশ বছর বয়সে সালাতের জন্য তাদের প্রহার করি, যদিও তখনও তাদের ওপর শরিয়তের বাধ্যবাধকতা আসেনি। উদ্দেশ্য হলো, তারা যেন আনুগত্যের কাজ অনুশীলন করে ও তাতে অভ্যস্ত হয়। ফলে বড় হওয়ার পর কাজটি তাদের জন্য সহজ হয় এবং তারা তা ভালোবাসে। একইভাবে যেসব কাজ প্রশংসনীয় নয়, সেগুলোতেও ছোটদের অভ্যস্ত করা উচিত নয়, যদিও তারা তখনও দায়বদ্ধ নয়। কারণ বড় হয়ে তারা সেসব কাজে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে এবং সেগুলোকে স্বাভাবিক মনে করবে।[4]রেফারেন্স: فتاوى نور على الدرب (১১/৩৮৬) – https://shamela.ws/book/2300/6188

শাইখ ইবনে উসাইমিন (রহ) (মৃ. ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.) এর নির্দেশ ও তার শর্ত,

الأمر للوجوب، لكن يقيد بما إذا كان الضرب نافعاً؛ لأنه أحياناً تضرب الصبي ولكن ما ينتفع بالضرب، ما يزداد إلا صياحاً وعويلاً ولا يستفيد، ثم إن المراد بالضرب الضرب غير المبرح، الضرب السهل الذي يحصل به الإصلاح ولا يحصل به الضرر.

অনুবাদ: এ নির্দেশ বাধ্যবাধকতা বোঝায়। তবে শর্ত হলো, প্রহারটি উপকারী হতে হবে। কারণ কখনো শিশুকে প্রহার করা হয়, কিন্তু তাতে তার কোনো উপকার হয় না; বরং কান্না ও চিৎকারই বাড়ে। আর এখানে প্রহার বলতে বোঝানো হয়েছে গুরুতর বা ক্ষতিকর নয়, বরং মৃদু প্রহার, যার মাধ্যমে সংশোধন হয় এবং কোনো ক্ষতি হয় না।[5]রেফারেন্স: لقاء الباب المفتوح (৯৫/১৮)। – https://shamela.ws/book/7687/2767

ইবনু মুফলিহ (মৃ. ৭৬৩ হি./১৩৬২ খ্রি.) তাঁর আল-আদাব আশ-শারঈয়্যাহ গ্রন্থে ইমাম আহমদ (রহ) (মৃ. ২৪১ হি./৮৫৫ খ্রি.)-এর বক্তব্য সংকলন করেছেন:

قال إسماعيل بن سعيد: سألت أحمد عما يجوز فيه ضرب الولد، قال: الولد يضرب على الأدب. قال: وسألت أحمد هل يضرب الصبي على الصلاة؟ قال: إذا بلغ عشرا.

وقال حنبل: إن أبا عبد الله قال: اليتيم يؤدب ويضرب ضربا خفيفا.

وقال الأثرم: سئل أبو عبد الله عن ضرب المعلم الصبيان، فقال: على قدر ذنوبهم، ويتوقى بجهده الضرب، وإن كان صغيرا لا يعقل فلا يضربه.

অনুবাদ: ইসমাঈল ইবনু সাঈদ বলেন, আমি আহমদকে জিজ্ঞেস করলাম, কোন বিষয়ে সন্তানকে প্রহার করা যায়? তিনি বললেন, “সন্তানকে শিষ্টাচার শেখানোর জন্য প্রহার করা হয়।” আমি আরও জিজ্ঞেস করলাম, শিশুকে নামাজের জন্য প্রহার করা হবে কি? তিনি বললেন, “যখন সে দশ বছর বয়সে পৌঁছাবে।”

হাম্বল (ইবনু ইসহাক, মৃ. ২৭৩ হি./৮৮৬ খ্রি.) বলেন, আবু আবদুল্লাহ (ইমাম আহমদ) বলেছেন, “এতিমকে শিষ্টাচার শেখানো হবে এবং হালকা প্রহার করা হবে।”

আল-আছরাম (আনু. মৃ. ২৬১ হি./৮৭৫ খ্রি.) বলেন, শিশুদের প্রহারের বিষয়ে শিক্ষকের বিধান জিজ্ঞেস করা হলে ইমাম আহমদ বলেন, “তাদের অপরাধের অনুপাতে [শাসন করবে], আর যথাসাধ্য প্রহার এড়িয়ে চলবে। শিশু যদি এত ছোট হয় যে শাসনের অর্থ বোঝে না, তবে তাকে প্রহার করবে না।”[6]সূত্র: ইবনু মুফলিহ, আল-আদাব আশ-শারঈয়্যাহ, ১/৪৫১। – https://shamela.ws/book/21582/450

উপরোক্ত বক্তব্যগুলো থেকে বোঝা যায়:

  • শাসনের মূল উদ্দেশ্য শিষ্টাচার শেখানো ও প্রশিক্ষণ।
  • সালাতে অভ্যস্ত করা, যাতে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে সে তা না ছাড়ে। কারণ শৈশবের অভ্যাস বড় বয়সে স্থায়ী হয়।
  • ব্যবস্থাটি শিশুর স্বার্থে বা কল্যানে।
  • নামাজের জন্য প্রহারের শুরু দশ বছর বয়সে; তার আগে নয়।
  • শাসন হালকা প্রহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ হতে হবে, যা আনুগত্যে সহায়তা করে, ক্ষতি করে না।
  • শিক্ষকের শাসন হবে অপরাধের অনুপাতে, আর যথাসাধ্য প্রহার এড়িয়ে চলতে হবে।
  • যে শিশু এত ছোট যে শাসনের অর্থ বোঝে না, তাকে প্রহার করা যাবে না।
  • প্রহারে উপকার না হলে নির্দেশ যান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ করা যাবে না; কারণ প্রহারের লক্ষ্য ছিল সংশোধন।

ইমাম আহমদের কাছে প্রহার শাসনের প্রথম উপায় নয়, বরং শেষ ও সীমিত উপায়। ‘শিষ্টাচারের জন্য’ কথাটি প্রহারের উদ্দেশ্য ঠিক করে দেয়; ক্ষোভ, প্রতিশোধ বা বিরক্তি প্রকাশের সুযোগ এতে নেই। ‘অপরাধের অনুপাতে’ মানে শাস্তি অপরাধের চেয়ে বেশি হবে না, আর ‘যথাসাধ্য এড়িয়ে চলা’ মানে বিকল্প থাকলে প্রহারে যাওয়া যাবে না। যে শিশু কারণ ও পরিণতির সম্পর্ক বোঝে না, তাকে প্রহার করলে শিক্ষা হয় না, কেবল কষ্ট হয়।

শাসনের অধিকারী কারা: পিতা-মাতা ও শিক্ষক

পিতার পাশাপাশি মাও সন্তানের শাসনের অধিকার রাখে। আর শিক্ষক এই দায়িত্ব পালন করেন অভিভাবকের প্রতিনিধি হিসেবে।

ইমাম নববী (রহ) (মৃ. ৬৭৬ হি./১২৭৭ খ্রি.)-এর বক্তব্য,

ذكرنا في تعليم أحكام الطهارة والصلاة والأمر بها والضرب عليها أن الأمهات كالآباء، والمعلم يؤدب الصبي بإذن الولي ونيابة عنه.

অনুবাদ: “পবিত্রতা ও নামাজের বিধান শেখানো, সেগুলোর নির্দেশ দেওয়া এবং সেগুলোর জন্য প্রহারের আলোচনা করতে গিয়ে আমরা উল্লেখ করেছি যে, মায়েরা পিতাদের মতো। আর শিক্ষক অভিভাবকের অনুমতিতে এবং তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে শিশুকে শাসন করবেন।”[7]সূত্র: ইমাম নববী, রওদাতুত তালিবীন ওয়া উমদাতুল মুফতীন, ১০/১৭৫—প্রচলিত সংস্করণের পৃষ্ঠা-নির্দেশ। অনলাইন সংস্করণে এটি ৭ম খণ্ডের ৩৮৩ নম্বর পৃষ্ঠায় রয়েছে। – https://shamela.ws/book/499/4104

‘তাআযীর’ ও তার অধিকারী

ফিকহের পরিভাষায় শাসনমূলক শাস্তিকে ‘তাআযীর’ বলা হয়। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:

অনুবাদ: “কিছু আলেম তাআযীর শব্দটি উভয় ধরনের শাসনের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করেছেন; এটিই অধিক প্রসিদ্ধ মত। এই মত অনুযায়ী, তাআযীর কার্যকর করার অধিকারী হলেন শাসক, স্বামী, পিতা, শিক্ষক ও মনিব।”

এরপর শিক্ষক সম্পর্কে বলা হয়েছে:

وَالْمُعَلِّمُ يُؤَدِّبُ الصَّبِيَّ بِإِذْنِ الْوَلِيِّ وَنِيَابَةً عَنْهُ.

অনুবাদ: “শিক্ষক অভিভাবকের অনুমতিতে এবং তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে শিশুকে শাসন করবেন।”

অর্থাৎ শাসনের মূল অধিকার অভিভাবকের। শিক্ষকের অধিকার প্রতিনিধিত্বমূলক এবং সেই প্রতিনিধিত্বের সীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

শাইখ সালেহ আল ফাওজান (হাফি) বলেন,

الضّرب وسيلة من وسائل التربية، فللمعلِّم أن يضرب، وللمؤدِّب أن يضرب، ولولّي الأمر أن يضرب تأديباً وتعزيراً، وللزوج أن يضرب زوجته على النشور.

لكن يكون بحدود، لا يكون ضرباً مبرحاً يشقّ الجلْد أو يكسرُ العظم، وإنّما يكون بقدر الحاجة.

অনুবাদ: প্রহার শিক্ষাদানের বিভিন্ন উপায়ের একটি। তাই শিক্ষক প্রহার করতে পারেন, শাসনকারী ব্যক্তি প্রহার করতে পারেন, শাসনকর্তা শৃঙ্খলামূলক ও দণ্ডমূলক ব্যবস্থা হিসেবে প্রহার করতে পারেন এবং স্বামীর জন্যও স্ত্রীর অবাধ্যতার ক্ষেত্রে প্রহারের বিধান রয়েছে। তবে এর সীমা থাকতে হবে। এমন গুরুতর প্রহার করা যাবে না, যা চামড়া বিদীর্ণ করে অথবা হাড় ভেঙে দেয়। বরং প্রয়োজনের পরিমাণ অনুযায়ী প্রহার করতে হবে।[8]রেফারেন্স: إغاثة المستفيد بشرح كتاب التوحيد (২/২৮২) – https://shamela.ws/book/8565/655

এখানেও শর্ত স্পষ্ট: প্রহারের অধিকার থাকলেও তা কেবল প্রয়োজন অনুযায়ী। যে প্রহার চামড়া ফাটায় বা হাড় ভাঙে, তা কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয়।

অভিভাবকের অনুমতি কি দরকার?

শিক্ষক শিশুকে শাসন করতে অভিভাবকের অনুমতি লাগবে কি না, এ নিয়ে ফকিহদের দুটি মত আছে। প্রথম মত: অভিভাবকের অনুমতি শর্ত। দ্বিতীয় মত: প্রচলিত রীতি (উরফ) অনুযায়ী, সীমার ভেতরে থেকে, অনুমতি ছাড়াই শিক্ষক শাসন করতে পারেন। বিভিন্ন মাযহাবের বক্তব্য নিচে দেওয়া হলো।

শাফিঈ মাযহাব

খতীব আশ-শিরবীনী (রহ) (মৃ. ৯৭৭ হি./১৫৭০ খ্রি.) বলেন:

الثانية: للمعلم أن يؤدب من يتعلم منه، لكن بإذن الولي كما في الروضة، وإن قال الأذرعي: الإجماع الفعلي مطرد بذلك من غير إذن.

অনুবাদ: “দ্বিতীয় বিষয়: শিক্ষক তাঁর কাছ থেকে যে শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করে, তাকে শাসন করতে পারেন; তবে রওদা গ্রন্থে যেমন আছে, তা অভিভাবকের অনুমতিতে হতে হবে। যদিও আল-আযরা‘ঈ বলেছেন, অনুমতি ছাড়াই এ বিষয়ে কার্যকর ঐকমত্য ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে।”[9]সূত্র: মুগনিল মুহতাজ, ৪/১৯৩–১৯৯ – https://shamela.ws/book/11444/2708

এখানে ‘রওদা’ মানে ইমাম নববীর রওদাতুত তালিবীন। আর আল-আযরা‘ঈ (মৃ. ৭৮৩ হি./১৩৮১ খ্রি.) দ্বিতীয় মতের প্রতিনিধি; অর্থাৎ প্রচলিত রীতিতে অভিভাবকের অনুমতি ধরেই নেওয়া হয়।

ইমাম নববীর বক্তব্য (পূর্ণ আরবি ও অনুবাদ ২ নম্বর অংশে দেওয়া হয়েছে): মায়েরা পিতাদের মতো, আর শিক্ষক অভিভাবকের অনুমতিতে ও তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে শিশুকে শাসন করবেন।[10]সূত্র: রওদাতুত তালিবীন, ১০/১৭৫; https://shamela.ws/book/499/4104

হানাফী মাযহাব

হানাফী মাযহাবে অভিভাবক শিশুকে শিক্ষকের হাতে সোপর্দ করলেই শাসনের অনুমতি ধরা হয়, যতক্ষণ শিক্ষক প্রচলিত সীমার ভেতরে থাকেন।

আল-বাহরুর রায়িক (ইবনু নুজাইম, মৃ. ৯৭০ হি./১৫৬৩ খ্রি.)-এর পরিপূরক অংশে (তাকমিলা; লেখক মুহাম্মদ ইবনু হুসাইন আত-তূরী, মৃ. আনু. ১১৩৮ হি./১৭২৬ খ্রি.-এর পর) আছে:

والأب والوصي إذا سلما الصغير إلى معلم يعلمه القرآن أو علما آخر فضربه المعلم للتعليم فلا ضمان على المعلم ولا على الأب والوصي … وإن ضربه حيث لا يضرب أو فوق ضرب التعليم فالمعلم ضامن.

অনুবাদ: “পিতা বা ওসিয়তপ্রাপ্ত অভিভাবক যখন শিশুকে কুরআন কিংবা অন্য কোনো বিদ্যা শেখানোর জন্য শিক্ষকের হাতে সোপর্দ করেন, তখন শিক্ষক শিক্ষাদানের জন্য তাকে প্রহার করলে শিক্ষক, পিতা ও অভিভাবকের ওপর [ক্ষতিপূরণের] দায় নেই … কিন্তু শিক্ষক যদি এমন স্থানে প্রহার করেন যেখানে প্রহার করা হয় না, অথবা শিক্ষাদানের জন্য প্রচলিত মাত্রার চেয়ে বেশি প্রহার করেন, তাহলে শিক্ষক দায়ী হবেন।”[11]সূত্র: আল-বাহরুর রায়িক, কিতাবুদ দিয়াত, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯২-এর অনলাইন পাঠ। মূল আরবি পাঠ: https://shamela.ws/book/12227/2923

ইবনু আবিদীন (মৃ. ১২৫২ হি./১৮৩৬ খ্রি.) বলেন,

وكذا المعلم إذا ضرب بإذن الأب أو الوصي لتعليم القرآن أو عمل آخر مثل ما يضرب فيه لا يضمن هو ولا الأب ولا الوصي.

অনুবাদ: “একইভাবে, শিক্ষক যদি পিতা বা ওসিয়তপ্রাপ্ত অভিভাবকের অনুমতিতে কুরআন বা অন্য কোনো বিদ্যা শেখানোর জন্য প্রচলিত ধরনের প্রহার করেন, তাহলে শিক্ষক, পিতা ও অভিভাবক—কারও ওপর ক্ষতিপূরণ বর্তাবে না।”[12]সূত্র: হাশিয়াতু ইবনু আবিদীন, গবেষণাপত্রে উদ্ধৃত পৃষ্ঠা ৫/৩৬৩; অনুমতির প্রসঙ্গে ৩/১৮৯-ও উল্লেখ করা হয়েছে। – https://shamela.ws/book/918/135

এই দুটি উদ্ধৃত থেকে তিনটি বিষয় বোঝা যায়:

  • অভিভাবক শিশুকে শিক্ষকের হাতে সোপর্দ করলেই শিক্ষকের কর্তৃত্ব তৈরি হয়।
  • সেই কর্তৃত্বের মাপকাঠি ‘প্রচলিত ধরন’। শিক্ষকের ব্যক্তিগত মেজাজ এখানে মাপকাঠি নয়।
  • ভুল স্থানে আঘাত করলে বা মাত্রা ছাড়ালে দায় অভিভাবকের ওপর নয়, শিক্ষকের ওপর বর্তায়।

শাফিঈ ও মালিকী বিশ্লেষণ: ড. ইবরাহিম আত-তান্নামের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মত

ড. ইবরাহিম আত-তান্নাম তাঁর গবেষণায় প্রথম মতটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন:

الذي يظهر من القولين – والله أعلم بالصواب – القول الأول، القائل باشتراط إذن الولي في جواز ضرب المعلم لتلميذه على التعليم، وذلك لأن ولاية المعلم ولاية نيابية تنحصر تصرفاته فيما أنيب فيه فقط، ولا يحق له أن يتعدى حدود ما أنيط به من عمل، وتسليم الولي صبيه إلى المعلم لتعليمه لا يثبت الإذن في الضرب.

অনুবাদ: “দুটি মতের মধ্যে সঠিক বলে যা প্রতীয়মান হয়—আল্লাহই অধিক জ্ঞাত—তা হলো প্রথম মত: শিক্ষকের শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদানের জন্য প্রহার করার বৈধতা অভিভাবকের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল। কারণ শিক্ষকের কর্তৃত্ব প্রতিনিধিত্বমূলক; তাঁকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাঁর কার্যক্রম সেই দায়িত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাঁকে অর্পিত দায়িত্বের সীমা অতিক্রম করার অধিকার তাঁর নেই। আর অভিভাবক শিশুকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য শিক্ষকের হাতে সোপর্দ করলেই প্রহারের অনুমতি প্রমাণিত হয় না।”

…

অনুবাদ: “মূলত এই মতটিকে অগ্রাধিকার দিলেও বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষক শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষার্থীকে এক, দুই অথবা তিনবার প্রহার করতে পারেন—যদিও অভিভাবক স্পষ্টভাবে অনুমতি না দেন। কারণ শিক্ষার্থীর ওপর শিক্ষকের বিশেষ কর্তৃত্ব বিবেচনায়, এ ধরনের প্রহারকে প্রচলিত রীতিতে অনুমতিপ্রাপ্ত বলে গণ্য করা হয়েছে; ফলে তা মৌখিক অনুমতির মতো।”

তিনি আরও বলেন:

أما ما زاد على الثلاث فإنه يشترط فيه إذن الولي.

“তবে তিনটির বেশি প্রহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকের অনুমতি শর্ত।”[13]দেখুন বিস্তারিত:- https://www.alukah.net/social/0/47509/شروط-ولاية-تأديب-المعلم-لتلميذه/

তিনি একদিকে অভিভাবকের অনুমতির শর্তকে গুরুত্ব দিয়েছেন, কারণ শিক্ষকের কর্তৃত্ব প্রতিনিধিত্বমূলক। অন্যদিকে শিক্ষাদানের প্রয়োজনে এক থেকে তিনবার পর্যন্ত লঘু শাসনকে প্রচলিত রীতির কারণে ‘মৌখিক অনুমতির’ সমান ধরেছেন। তিনের বেশি হলে স্পষ্ট অনুমতি আবশ্যক।

অভিভাবকের অনুমতি: সারকথা

  • শাফিঈ মাযহাব: মূল নীতি অভিভাবকের অনুমতি; তবে প্রচলিত রীতির কারণে অনুমতি ছাড়াও সীমিত শাসনের কথা বলা হয়েছে।
  • হানাফী মাযহাব: অভিভাবক শিশুকে শিক্ষকের কাছে সোপর্দ করলে প্রচলিত মাত্রার শাসনের অনুমতি ধরা হয়; মাত্রা ছাড়ালে শিক্ষকই দায়ী।
  • মালিকী মাযহাব: শিক্ষক নির্দিষ্ট সংখ্যার ভেতরে থাকবেন; তার বেশি করতে পিতার অনুমতি লাগে (ইবন সাহনুনের বক্তব্য ৪.২ অংশে দ্রষ্টব্য)।
  • সব মাযহাবের অভিন্ন বার্তা: অনুমতি থাকলেও সীমা অতিক্রম করার সুযোগ নেই।

প্রহারের পরিমাণ ও তীব্রতা

শাসন বৈধ হলেও তা অনিয়ন্ত্রিত নয়। ফকিহগণ সংখ্যা, তীব্রতা, আঘাতের স্থান এবং ব্যবহৃত উপকরণ—এই কয়েক ধাপে সীমা ঠিক করেছেন।

সর্বোচ্চ সংখ্যার সীমা: দশ বেত্রাঘাত

عَنْ أَبِي بُرْدَةَ الْأَنْصَارِيِّ أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ

لَا يُجْلَدُ أَحَدٌ فَوْقَ عَشَرَةِ أَسْوَاطٍ إِلَّا فِي حَدٍّ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ

অনুবাদ: “আল্লাহর নির্ধারিত কোনো হদ্দের শাস্তি ছাড়া কাউকে দশ বেত্রাঘাতের বেশি মারা যাবে না।”[14]সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৬৮৫০ (ইমাম বুখারী, মৃ. ২৫৬ হি./৮৭০ খ্রি.); সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৭০৮ (ইমাম মুসলিম, মৃ. ২৬১ হি./৮৭৫ খ্রি.)। হাদিসটি সহিহ এবং উভয় গ্রন্থে বর্ণিত।

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় আলেমদের বক্তব্য:

বদরুদ্দীন আল-আইনী (রহ) (মৃ. ৮৫৫ হি./১৪৫১ খ্রি.) উমদাতুল কারীতে পিতা ও সন্তানের শাসনের উদাহরণ দিয়েই হাদিসটির ব্যাখ্যা করেছেন।

ومعنى الحديث: لا يزاد على العشر في التأديبات التي لا تتعلق بمعصية كتأديب الأب ولده الصغير

অনুবাদ: “হাদিসটির অর্থ হলো, যেসব শাসনমূলক প্রহার পাপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, সেগুলোতে দশের বেশি প্রহার করা হবে না; যেমন পিতার নিজের ছোট সন্তানকে শাসন করা।”[15]সূত্র: বদরুদ্দীন আল-আইনী, عمدة القاري شرح صحيح البخاري, কিতাবুল হুদূদ, باب كم التعزير والأدب। – https://shamela.ws/book/5756/7142

এখানে লক্ষণীয় হলো, হদ্দ আল্লাহর নির্ধারিত দণ্ড, যা শরিয়তসম্মত বিচারব্যবস্থায় প্রয়োগ হয়; আর পাপের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয় এমন শিষ্টাচারমূলক শাসন অভিভাবক ও শিক্ষকের বিবেচনাধীন, তাই তার ওপর দশের ঊর্ধ্বসীমা বৈধ নয়।

ইবনু হাজার আল-আসকালানী (রহ) (মৃ. ৮৫২ হি./১৪৪৯ খ্রি.) — ফাতহুল বারীতে বলেন,

فلا يزاد على العشر في التأديبات التي لا تتعلق بمعصية كتأديب الأب ولده الصغير

অনুবাদ: যেসব শাসনমূলক প্রহার কোনো পাপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, সেগুলোতে দশের বেশি প্রহার করা হবে না; যেমন পিতার নিজের ছোট সন্তানকে শাসন করা।[16]সূত্র: ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী, ১২/১৮৫-এ – https://shamela.ws/book/1673/7165

ইবনুল কায়্যিম (রহ) (মৃ. ৭৫১ হি./১৩৫০ খ্রি.) বলেন:

فقوله صلى الله عليه وسلم: «لا يضرب فوق عشرة أسواط إلا في حد من حدود الله» يريد به الجناية التي هي حق لله.

فإن قيل: فأين تكون العشرة فما دونها إذ كان المراد بالحد الجناية؟

قيل: في ضرب الرجل امرأته وعبده وولده وأجيره، للتأديب ونحوه، فإنه لا يجوز أن يزيد على عشرة أسواط؛ فهذا أحسن ما خُرِّج عليه الحديث.

নবী ﷺ-এর বাণী, “আল্লাহর নির্ধারিত কোনো হদ্দের ক্ষেত্র ছাড়া দশ বেত্রাঘাতের বেশি প্রহার করা যাবে না”—এর অর্থ হলো, আল্লাহর হকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধ।

যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘হদ্দ’ বলতে অপরাধ বোঝানো হলে দশ বা তার কম বেত্রাঘাত কোথায় প্রয়োগ করা হবে?

উত্তরে বলা হবে: কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রী, দাস, সন্তান ও ভাড়াটে কর্মচারীকে শাসন বা অনুরূপ উদ্দেশ্যে প্রহার করার ক্ষেত্রে। কারণ এসব ক্ষেত্রে দশ বেত্রাঘাতের বেশি করা বৈধ নয়। হাদিসটির সবচেয়ে উত্তম ব্যাখ্যা হলো এটি।[17]রেফারেন্স: إعلام الموقعين (২/২৩)। https://shamela.ws/book/17798/1037

এ থেকে বোঝা যায়, পিতার শাসন ও অন্যান্য শাসনমূলক প্রহারের ঊর্ধ্বসীমা হিসেবে দশের সংখ্যাটি আলেমদের কাছে স্বীকৃত ছিল।

আবুল আব্বাস আহমদ ইবন উমর আল-কুরতুবি (রহ) (মৃ. ৬৫৬ হি./১২৫৮ খ্রি.) তাঁর المفهم لما أشكل من تلخيص كتاب مسلم গ্রন্থে আবু বুরদার এই হাদিসের ব্যাখ্যায় তা‘যীরের সংখ্যা নিয়ে ফকিহদের মতভেদ সংকলন করেছেন। (ইনি তাফসীরকার ইমাম কুরতুবি নন; দুজন ভিন্ন ব্যক্তি।) তাঁর বক্তব্য:

وَ(قَوْلُهُ ـ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ـ: لَا يُجْلَدُ أَحَدٌ فَوْقَ عَشَرَةِ أَسْوَاطٍ إِلَّا فِي حَدٍّ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ) أَخَذَ بِظَاهِرِ هَذَا الْحَدِيثِ أَحْمَدُ بْنُ حَنْبَلٍ، وَأَشْهَبُ مِنْ أَصْحَابِ مَالِكٍ فِي بَعْضِ أَقْوَالِهِ. وَقَالَ ابْنُ أَبِي ذِئْبٍ وَابْنُ أَبِي لَيْلَى: لَا يُضْرَبُ فِي الْأَدَبِ أَكْثَرَ مِنْ ثَلَاثَةٍ. وَقَالَ أَشْهَبُ فِي مُؤَدِّبِ الصِّبْيَانِ: قَالَ: وَإِنْ زَادَ اقْتُصَّ مِنْهُ. وَالْجُمْهُورُ: عَلَى أَنَّهُ يُزَادُ فِي التَّعْزِيرِ عَلَى الْعَشَرَةِ.

فَمِنْهُمْ مَنْ قَصَرَهُ عَلَى عَدَدٍ بِحَيْثُ لَا يُزَادُ عَلَيْهِ، فَقَالَ أَبُو حَنِيفَةَ: أَرْبَعِينَ. وَقَالَهُ الشَّافِعِيُّ، وَقَالَ أَيْضًا: عِشْرِينَ.

وَرُوِيَ عَنْ مَالِكٍ: خَمْسَةً وَسَبْعِينَ سَوْطًا؛ وَإِلَيْهِ مَالَ أَصْبَغُ بْنُ الْفَرَجِ، وَقَالَهُ ابْنُ أَبِي لَيْلَى، وَأَبُو يُوسُفَ.

وَقَالَ مُحَمَّدُ بْنُ مَسْلَمَةَ: لَا أَرَى أَنْ يَبْلُغَ بِهِ الْحَدَّ، وَقَدْ رُوِيَ عَنْ عُمَرَ: مَا يُبْلَغُ بِهِ ثَمَانُونَ. وَعَنِ ابْنِ أَبِي لَيْلَى وَابْنِ شُبْرُمَةَ: لَا يُبْلَغُ بِهِ مِائَةٌ.

وَمِنْهُمْ مَنْ رَأَى ذَلِكَ مَوْكُولًا إِلَى رَأْيِ الْإِمَامِ بِحَسَبِ مَا يَرَاهُ أَرْدَعَ وَأَلْيَقَ بِالْجَانِي، وَإِنْ زَادَ عَلَى أَقْصَى الْحُدُودِ، وَهُوَ مَشْهُورُ مَذْهَبِ مَالِكٍ، وَأَبِي يُوسُفَ، وَأَبِي ثَوْرٍ، وَالطَّحَاوِيِّ، وَمُحَمَّدِ بْنِ الْحَسَنِ. وَقَالَ: وَإِنْ بَلَغَ أَلْفًا. وَقَدْ رُوِيَ عَنْهُ مِثْلُ قَوْلِ أَبِي حَنِيفَةَ.

وَالصَّحِيحُ عَنْ عُمَرَ: أَنَّهُ ضَرَبَ مَنْ نَقَشَ عَلَى خَاتَمِهِ مِائَةً، وَضَرَبَ ضُبَيْعًا أَكْثَرَ مِنَ الْحَدِّ. وَقَدْ رُوِيَ عَنِ الشَّافِعِيِّ: أَنَّهُ يُضْرَبُ فِي الْأَدَبِ أَبَدًا، وَإِنْ أَتَى عَلَى نَفْسِهِ حَتَّى يُقِرَّ بِالْإِنَابَةِ. وَقَالَ الْمُزَنِيُّ مِنْ أَصْحَابِ الشَّافِعِيِّ: تَعْزِيرُ كُلِّ ذَنْبٍ مُسْتَنْبَطٌ مِنْ حَدِّهِ لَا يُجَاوَزُ.

قُلْتُ: وَالصَّحِيحُ: الْقَوْلُ الْعُمَرِيُّ، وَالْمَذْهَبُ الْمَالِكِيُّ؛ لِأَنَّ الْمَقْصُودَ بِالتَّعْزِيرِ الرَّدْعُ وَالزَّجْرُ، وَلَا يَحْصُلُ ذَلِكَ إِلَّا بِاعْتِبَارِ أَحْوَالِ الْجِنَايَاتِ وَالْجُنَاةِ. فَأَمَّا الْحَدِيثُ فَخَرَجَ عَلَى أَغْلَبِ مَا يُحْتَاجُ إِلَيْهِ فِي ذَلِكَ الزَّمَانِ. وَاللَّهُ تَعَالَى أَعْلَمُ.

অনুবাদ: “নবী ﷺ-এর বাণী—‘আল্লাহর নির্ধারিত কোনো হদ্দ ছাড়া কাউকে দশ বেত্রাঘাতের বেশি মারা যাবে না’—এই হাদিসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করেছেন আহমদ ইবন হাম্বল এবং মালিকের শিষ্যদের মধ্যে আশহাব (তাঁর কিছু বক্তব্যে)। ইবনু আবী যি‘ব ও ইবনু আবী লায়লা বলেছেন: শাসনের ক্ষেত্রে তিনের বেশি প্রহার করা হবে না। শিশুদের শিক্ষক সম্পর্কে আশহাব বলেছেন: সে যদি তার চেয়ে বেশি করে, তবে তার কাছ থেকে কিসাস নেওয়া হবে। আর জমহুরের মত হলো, তা‘যীরে দশের বেশি করা যায়।”

“তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ তা‘যীরকে এমন এক নির্দিষ্ট সংখ্যায় সীমিত করেছেন, যার বেশি করা যাবে না। আবু হানিফা বলেছেন: চল্লিশ। শাফিঈও তা-ই বলেছেন, আবার তিনি বিশের কথাও বলেছেন।”

“মালিক থেকে বর্ণিত হয়েছে: পঁচাত্তর বেত্রাঘাত। আসবাগ ইবনুল ফারাজ সে দিকেই ঝুঁকেছেন; ইবনু আবী লায়লা ও আবু ইউসুফও তা বলেছেন।”

“মুহাম্মদ ইবন মাসলামা বলেছেন: আমি মনে করি না যে তা হদ্দের সংখ্যায় পৌঁছাবে। উমর থেকে বর্ণিত হয়েছে: আশিতে পৌঁছানো যাবে না। আর ইবনু আবী লায়লা ও ইবনু শুবরুমা থেকে বর্ণিত: একশতে পৌঁছানো যাবে না।”

“আবার তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেছেন, বিষয়টি ইমামের (শাসকের) বিবেচনার ওপর ন্যস্ত—অপরাধীর জন্য যা অধিক প্রতিরোধক ও উপযুক্ত বলে তিনি দেখেন, তা সর্বোচ্চ হদ্দের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেলেও। এটি মালিক, আবু ইউসুফ, আবু সাওর, তাহাবি ও মুহাম্মদ ইবনুল হাসানের প্রসিদ্ধ মত। তিনি [মালিক] বলেছেন: এমনকি তা এক হাজারে পৌঁছালেও। আবার তাঁর থেকে আবু হানিফার অনুরূপ মতও বর্ণিত হয়েছে।”

“উমর থেকে সহিহভাবে প্রমাণিত: যে ব্যক্তি নিজের আংটিতে (সিলমোহর) খোদাই করেছিল, তাকে তিনি একশ বেত্রাঘাত করেছেন; আর দুবাই‘ (ضُبَيْع)-কে হদ্দের চেয়ে বেশি প্রহার করেছেন। শাফিঈ থেকে বর্ণিত হয়েছে: শাসনের ক্ষেত্রে সর্বদা প্রহার করা হবে—এমনকি তা তার প্রাণের ওপর এসে পড়লেও—যতক্ষণ না সে তাওবার স্বীকারোক্তি দেয়। শাফিঈর অনুসারী মুযানি বলেছেন: প্রতিটি পাপের তা‘যীর তার হদ্দ থেকে নির্ণীত হবে; তা অতিক্রম করা যাবে না।”

“আমি বলি: সঠিক হলো উমরের মত এবং মালিকী মাযহাব। কারণ তা‘যীরের উদ্দেশ্য প্রতিরোধ ও সতর্কীকরণ, আর অপরাধ ও অপরাধীদের অবস্থা বিবেচনা ছাড়া তা অর্জিত হয় না। আর হাদিসটি—তা সেই যুগে এ বিষয়ে সাধারণত যে প্রয়োজন দেখা দিত, তার ভিত্তিতে এসেছে। আল্লাহ তাআলাই অধিক জ্ঞাত।”[18]সূত্র: আবুল আব্বাস আল-কুরতুবি, المفهم لما أشكل من تلخيص كتاب مسلم, كتاب الحدود, باب الحد في الخمر وما جاء في جلد التعزير, ৫ম খণ্ড, পৃ. ১৩৯। https://shamela.ws/book/132524/2793

আলোচনার প্রথম অংশ আগের পৃষ্ঠায়: https://shamela.ws/book/132524/2792

এই উদ্ধৃতি থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়:

  • বাহ্যিক অর্থের অনুসারী: হাদিসের ভাষা (দশের বেশি নয়) আহমদ ইবন হাম্বল ও আশহাব গ্রহণ করেছেন; ইবনু আবী যি‘ব ও ইবনু আবী লায়লার মতে সংখ্যাটি আরও কম, তিন।
  • জমহুরের মত: শাসক-নির্ধারিত তা‘যীরে দশের বেশি করা যায়। তবে তাঁদের মধ্যেও কেউ সংখ্যা বেঁধে দিয়েছেন (চল্লিশ, পঁচাত্তর, আশি, একশ), কেউ বিষয়টি ইমামের বিবেচনায় ছেড়েছেন।
  • কুরতুবির নিজের অগ্রাধিকার: তিনি উমরের মত ও মালিকী মাযহাবকে সঠিক বলেছেন এবং হাদিসের দশের সীমাকে সেই যুগের সাধারণ প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেছেন।

তবে এ আলোচনার প্রসঙ্গ লক্ষ্য করা জরুরি। কুরতুবির এই মতভেদ মূলত ইমাম বা শাসকের তা‘যীর, অর্থাৎ অপরাধীর জন্য “অধিক প্রতিরোধক” দণ্ড নিয়ে। পিতা-মাতার শিশু-শাসন নিয়ে নয়। আর ওপরে আল-আইনী, ইবনু হাজার ও ইবনুল কায়্যিমের ব্যাখ্যা থেকে দেখা গেছে, সহিহ বুখারির এই হাদিসের অধীনে পিতার ছোট সন্তানকে শাসন করা সরাসরি দশের সীমার ভেতরে আসে। তাই শিশুর শাসনের ক্ষেত্রে আমাদের গৃহীত অবস্থান দশের সীমা; কুরতুবির উদ্ধৃতি এ বিষয়ে আলেমদের মতভেদের পূর্ণ চিত্র তুলে ধরার জন্য এখানে আনা হয়েছে। এমনকি যে মালিকী ধারাকে কুরতুবি সঠিক বলেছেন, সেই ধারাতেও শিক্ষকের শাসনে তিনের সীমার কথা আছে।

শিক্ষকের ক্ষেত্রে তিনের সীমা

শিক্ষকের শাসনে মালিকী ও অন্যান্য ধারার আলেমদের বহুল উদ্ধৃত সীমা হলো তিন। এ বিষয়ে কয়েকটি বক্তব্য:

মুহাম্মদ ইবন সাহনুন (রহ) (মৃ. ২৫৬ হি./৮৭০ খ্রি.) তার প্রাচীন মালিকি শিক্ষাবিষয়ক গ্রন্থ آداب المعلمين-এ বলেন:

وَلَا بَأْسَ أَنْ يَضْرِبَهُمْ عَلَى مَنَافِعِهِمْ، وَلَا يُجَاوِزُ بِالْأَدَبِ ثَلَاثًا إِلَّا أَنْ يَأْذَنَ الْأَبُ فِي أَكْثَرَ مِنْ ذَلِكَ إِذَا آذَى أَحَدًا. وَيُؤَدِّبُهُمْ عَلَى اللَّعِبِ وَالْبَطَالَةِ، وَلَا يُجَاوِزُ بِالْأَدَبِ عَشَرًا. وَأَمَّا عَلَى قِرَاءَةِ الْقُرْآنِ فَلَا يُجَاوِزُ أَدَبُهُ ثَلَاثًا.

অনুবাদ: “শিশুদের উপকারের জন্য তাদের প্রহার করতে অসুবিধা নেই। তবে শাসনে তিনটির বেশি অতিক্রম করবে না—যদি না কোনো ব্যক্তিকে কষ্ট দেওয়ার কারণে পিতা তার চেয়ে বেশি প্রহারের অনুমতি দেন। খেলাধুলা ও অলসতার জন্য তাদের শাসন করতে পারবে, তবে দশটির বেশি নয়। আর কুরআন পড়ার ক্ষেত্রে তার শাসন তিনটির বেশি হবে না।”[19]সূত্র: মুহাম্মদ ইবন সাহনুন, آداب المعلمين, পৃষ্ঠা ৮৯; উদ্ধৃতিটি এখানে পাওয়া যায়: শিক্ষকদের শাসনবিধি নিয়ে আলোচনা। https://www.safahat.org/books/40635716/0.3/

অর্থাৎ অপরাধের ধরনভেদে সীমা আলাদা: কুরআন শেখার ক্ষেত্রে তিন, খেলাধুলা ও অলসতার ক্ষেত্রে দশ; আর পিতার অনুমতি থাকলে নির্দিষ্ট কারণে তার বেশি।

মালিকি ফকিহ ইবন আবী যায়দ আল-কায়রাওয়ানী (রহ) (মৃ. ৩৮৬ হি./৯৯৬ খ্রি.) حكم المعلمين والمتعلمين গ্রন্থে বলেন:

لَا يَنْبَغِي لِمُؤَدِّبِ الصِّبْيَانِ أَنْ يَزِيدَ فِي ضَرْبِهِمْ إِذَا احْتَاجُوا إِلَيْهِ عَلَى ثَلَاثَةِ أَسْوَاطٍ شَيْئًا.

অর্থ: “শিশুদের শিক্ষক যখন প্রয়োজনবশত তাদের প্রহার করবেন, তখন তিন বেত্রাঘাতের বেশি করা তাঁর উচিত নয়।”[20]সূত্রঃ كتاب بدائع السلك في طبائع الملك (২/৩৬৯) https://shamela.ws/book/7236/879

‘প্রয়োজনবশত’ শর্তটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন না থাকলে প্রহারের প্রশ্নই ওঠে না, আর প্রয়োজন থাকলেও তিনের ওপরে যাওয়া সংগত নয়।

সুহাইলী (রহ) (মৃ. ৫৮১ হি./১১৮৫ খ্রি.) তাঁর الروض الأنف গ্রন্থে লিখেছেন:

وَقَدِ انْتَزَعَ بَعْضُ التَّابِعِينَ، وَهُوَ شُرَيْحٌ الْقَاضِي، مِنْ هَذَا: أَلَّا يُضْرَبَ الصَّبِيُّ عَلَى الْقُرْآنِ إِلَّا ثَلَاثًا، كَمَا غَطَّ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ مُحَمَّدًا ﷺ ثَلَاثًا.

অর্থ: “কিছু তাবিঈ—তাঁদের মধ্যে কাজি শুরাইহ (মৃ. আনু. ৭৮ হি./৬৯৭ খ্রি.)—এই ঘটনা থেকে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, কুরআনের ব্যাপারে শিশুকে তিনবারের বেশি প্রহার করা হবে না; যেমন জিবরীল আলাইহিস সালাম মুহাম্মদ ﷺ-কে তিনবার চেপে ধরেছিলেন।”[21]সূত্র: সুহাইলী, الروض الأنف, ১/২৭২। https://shamela.ws/book/1514/564

শুরাইহের এই সিদ্ধান্ত সরাসরি কোনো হাদিসের নির্দেশ নয়; এটি তাঁর ইজতিহাদি উপলব্ধি। এর মূল্য সংখ্যার বাধ্যবাধকতায় নয়, প্রবণতায়: প্রথম যুগের আলেমরাও শিক্ষাদানে প্রহার যথাসম্ভব কমিয়ে রাখার পক্ষে ছিলেন।

আত-তাজ ওয়াল-ইকলীল ও হাশিয়াতুর রাহূনী এ এসেছে,

مؤدب الصبيان لا يضرب أكثر من ثلاثة أسواط، فإن زاد اقتص منه.

অনুবাদ: “শিশুদের শাসনকারী তিনটি বেত্রাঘাতের বেশি করবে না; এর বেশি করলে তার কাছ থেকে কিসাস নেওয়া হবে।”[22]সূত্র: আত-তাজ ওয়াল-ইকলীল (আল-মাওয়াক, মৃ. ৮৯৭ হি./১৪৯২ খ্রি.), ৬/৩১৯ এবং হাশিয়াতুর রাহূনী (মৃ. ১২৩০ হি./১৮১৫ খ্রি.), ৮/১৬২; https://shamela.ws/book/16968/4831

এখানে সীমা লঙ্ঘনের পরিণতিও বলা হয়েছে: তিনের বেশি করলে কিসাস। মালিকী ধারার তিন, হানাফী ও শাফিঈদের ‘প্রচলিত মাত্রা’ এবং সাধারণ শাসনে দশ—মাপ ভিন্ন হলেও মূল উদ্দেশ্য একই, প্রহারে শিথীলতা।

তিনের সীমার একটি দলিল ও তার মান

শিক্ষক বা অভিভাবকের প্রহারে তিনের সীমার কথা যাঁরা বলেছেন, তাঁদের অনেকে এই সীমার ভিত্তি হিসেবে নিচের বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন। (আগে দেখা গেছে, কাজি শুরাইহ তিনের সীমা নিয়েছিলেন ভিন্ন এক ইজতিহাদি উপলব্ধি থেকে—জিবরীল (আ.)-এর তিনবার চেপে ধরার ঘটনা থেকে।) বর্ণনাটিতে নবী ﷺ মিরদাস নামের এক শিক্ষককে বলেছেন বলে উদ্ধৃত হয়েছে:

إِيَّاكَ أَنْ تَضْرِبَ فَوْقَ الثَّلَاثِ، فَإِنَّكَ إِذَا ضَرَبْتَ فَوْقَ الثَّلَاثِ اقْتَصَّ اللَّهُ مِنْكَ

অনুবাদ: “তিন প্রহারের বেশি প্রহার করা থেকে সাবধান! কেননা, তুমি যদি তিন প্রহারের বেশি প্রহার করো, তবে আল্লাহ তোমার কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন।”[23]সূত্র: হাশিয়াতু ইবনি আবিদীন (রদ্দুল মুহতার, আল-হালাবী সংস্করণ), কিতাবুস সালাত, ১/৩৫২—সেখানে ইসমাঈলের মাধ্যমে আল-উস্তুরুশানীর أحكام الصغار থেকে উদ্ধৃত। https://shamela.ws/book/21613/347

কিন্তু এই বর্ণনা হাদিসশাস্ত্রের মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য নয়; এটি একটি ভিত্তিহীন বর্ণনা (لا أصل له)। এর তাখরীজে দেখা যায়:

  • উৎস: হাদিসের নির্ভরযোগ্য সংকলনে এর কোনো সনদ পাওয়া যায় না। কেবল আল-উস্তুরুশানী তাঁর أحكام الصغار গ্রন্থে এটি উল্লেখ করেছেন; তাঁর কাছ থেকে আল-বুজাইরিমী তাঁর হাশিয়ায় (১/৪১০) তা নকল করেছেন।
  • বর্ণনাসূত্রের অবস্থা: যাঁকে উদ্দেশ্য করে কথাটি বলা হয়েছে, সেই “মিরদাস আল-মু‘আল্লিম” অজ্ঞাত; তাঁর পরিচয় পাওয়া যায় না (ইবনু হাজার, আল-ইসাবা, ৬/৬০)।
  • বিপরীত সহিহ বর্ণনা: এই বিষয়ে প্রমাণিত হাদিস হলো আবু বুরদা (রা.) বর্ণিত সহিহ আল-বুখারির (৬৮৫০) হাদিস: হদ্দ ছাড়া দশ বেত্রাঘাতের বেশি নয়।[24]https://diwan-ahadiths.com/hadith/1347
Read More...  আয়িশা (রা.)-এর নিজের বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য সম্পর্ক

(উল্লেখ্য, উপরের তাখরীজ দিওয়ানুল হাদিস প্ল্যাটফর্মের। সেখানে বলা হয়েছে, এই বর্ণনার ওপর কোনো পূর্ববর্তী মুহাদ্দিসের সুস্পষ্ট হুকুম তারা পাননি; “ভিত্তিহীন” সিদ্ধান্তটি তাখরীজের ওপর ভিত্তি করে।)

ফলে আমাদের নিকট অধিক সহীহ ও নির্ভরযোগ্য হলো ইমাম বুখারি সংকলিত হাদিস এবং তার ব্যাখ্যায় ইবনুল কায়্যিমের মত: পিতার সন্তান-শাসনসহ হদ্দ-বহির্ভূত শাসনে দশের বেশি প্রহার নয়। তিনের সীমাকে তাই সহিহ হাদিস-প্রমাণিত বাধ্যতামূলক সীমা না বলে মালিকী ও অন্যান্য ধারার একটি ইজতিহাদি সতর্কতা হিসেবে বোঝা সংগত। হাদিসসম্মত ঊর্ধ্বসীমা হলো দশ।

প্রহারের ধরন ও তীব্রতা

সংখ্যার পাশাপাশি আলেমগণ প্রহারের ধরন ও তীব্রতা নিয়েও স্পষ্ট শর্ত দিয়েছেন। মূল কথা: ব্যথা হতে পারে, কিন্তু ক্ষতি নয়। ক্ষতি না করা নিয়ে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে, কোন হাদিসে এসেছে যে লোক অন্য কারো ক্ষতি করে আল্লাহ তা দিয়েই তার ক্ষতি করেন বা কোন সনদে এসেছে যে অন্যের ক্ষতি করবে আল্লাহ তার ক্ষতি করবেন[25]তিরমিজি ১৯৪০, আবু দাউদ ৩৬৩৫; ইবনে মাজাহ ২৩৪২ আলবানী, আহমেদ শাকের, বাশার আওয়াদ, শুয়াইব আরনাউত হাসান বলেছেন, কোন হাদিসে এসেছে ক্ষতি করাও যাবে না, ক্ষতি সহাও যাবে না।[26]ইবনে মাজাহ ২৩৪০-২৩৪১; আলবানী ও শুয়াইব আরনাউত সহিহ বলেছেন এক হাদিসে এসেছে আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন, “সে (অপরের) ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকবে। কারণ, সেটাও হল সাদকাহ স্বরূপ।”[27]হাদীস সম্ভার, হাদিস ৪৭৮, বুখারী ১৪৪৫, ৬০২২, মুসলিম ২৩৮০, আরেক হাদিসে এসেছে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমগণ নিরাপদ থাকে সে ব্যক্তিই প্রকৃত মুসলিম।[28]তিরমিজি হাদিস ২৬২৭

আল-কাবিসি (রহ) (মৃ. ৪০৩ হি./১০১২ খ্রি.) বলেন,

وَصِفَةُ الضَّرْبِ هُوَ مَا يُؤْلِمُ وَلَا يَتَعَدَّى الْأَلَمُ إِلَى التَّأْثِيرِ الْمُشْنِعِ أَوِ الْوَهَنِ الْمُضِرِّ.

“প্রহারের ধরন এমন হবে, যাতে ব্যথা হয়; কিন্তু সেই ব্যথা যেন কুৎসিত ক্ষতিকর চিহ্ন বা ক্ষতিকর দুর্বলতা সৃষ্টি করার পর্যায়ে না যায়।”[29]الرسالة المفصلة لأحوال المتعلمين وأحكام المعلمين والمتعلمين – https://www.safahat.org/books/40635716/0.3/

অর্থাৎ মাপকাঠি ব্যথার তীব্রতা নয়, তার ফল। প্রহারের পর দাগ, ফোলা বা শারীরিক ক্ষতি থেকে গেলে বোঝা যায়, সীমা পেরিয়ে গেছে। সমকালীন আলেমগণ ‘হালকা’ শব্দ দিয়ে একই কথা বলেছেন।

ইমাম নববী (রহ) বলেন,

أَنَّ الْمُعَزِّرَ إِذَا عَلِمَ أَنَّ التَّأْدِيبَ لَا يَحْصُلُ إِلَّا بِالضَّرْبِ الْمُبَرِّحِ، لَمْ يَكُنْ لَهُ الضَّرْبُ الْمُبَرِّحُ وَلَا غَيْرُهُ، أَمَّا الْمُبَرِّحُ فَلِأَنَّهُ مُهْلِكٌ، وَلَيْسَ لَهُ الْإِهْلَاكُ، وَأَمَّا غَيْرُهُ فَلَا فَائِدَةَ فِيهِ.

অনুবাদ: “শাসনকারী যদি জানেন যে তীব্র ও যন্ত্রণাদায়ক প্রহার ছাড়া শাসনের উদ্দেশ্য অর্জিত হবে না, তাহলে তাঁর জন্য সেই তীব্র প্রহারও বৈধ নয়, অন্য প্রহারও নয়। তীব্র প্রহার নিষিদ্ধ, কারণ তা ধ্বংসের কারণ হতে পারে এবং তার এমন ধ্বংস সাধনের অধিকার নেই। আর অন্য প্রহারেও যেহেতু কোনো উপকার হবে না, তাই সেটিও করা যাবে না।”[30]সূত্র: নববী, روضة الطالبين, ১০/১৭৫। মূল আরবি পাঠ: রওদাতুত তালিবীন; https://shamela.ws/book/499/4104

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি। শাসনের উদ্দেশ্য সংশোধন, ধ্বংস নয়। যে শাসন তীব্র যন্ত্রণা বা ধ্বংসের পর্যায়ে যায়, তা শুরুতেই নিষিদ্ধ। আর মৃদু শাসনে কাজ না হলেও কঠোর শাসন বৈধ হয়ে যায় না।

একই নীতির আরেকটি বক্তব্য

إِذَا كَانَ الصَّبِيُّ لَا يَصْلُحُ لَهُ إِلَّا الضَّرْبُ الْمُبَرِّحُ، أَيْ الْمُوجِعُ، فَهَلْ يَجُوزُ ضَرْبُهُ تَحْصِيلًا لِمَصْلَحَةِ تَأْدِيبِهِ؟ … لَا يَجُوزُ ذَلِكَ، بَلْ لَا يَجُوزُ أَنْ يُضْرَبَ ضَرْبًا غَيْرَ مُبَرِّحٍ.

অনুবাদ: “যদি শিশুর ক্ষেত্রে এমন হয় যে তাকে শাসন করতে হলে কেবল তীব্র, অর্থাৎ ব্যথাদায়ক প্রহারই কার্যকর হবে, তাহলে শাসনের স্বার্থে তাকে এমন প্রহার করা কি বৈধ? … তা বৈধ নয়; বরং তাকে এমন প্রহারও করা যাবে না, যা তীব্র নয়।”[31]كتاب الفوائد الجسام على قواعد ابن عبد السلام – https://shamela.ws/book/17811/220

ইবনু কুদামা (রহ) (মৃ. ৬২০ হি./১২২৩ খ্রি.) শরীরে কাটা বা জখম করার নিষেধাজ্ঞা উল্লেখ করেছেন,

وَلَا يَجُوزُ قَطْعُ شَيْءٍ مِنْهُ وَلَا جَرْحُهُ؛ لِأَنَّ الْوَاجِبَ أَدَبٌ، وَالتَّأْدِيبُ لَا يَكُونُ بِالْإِتْلَافِ.

“তার শরীরের কোনো অংশ কেটে ফেলা বা তাকে জখম করা বৈধ নয়; কারণ উদ্দেশ্য শাসন করা, আর শাসন শরীরের ক্ষতিসাধনের মাধ্যমে হয় না।”[32]সূত্র: كتاب المغني لابن قدامة – ت التركي (12/526) – https://shamela.ws/book/6910/6663

আঘাতের স্থান: মুখমণ্ডল ও মাথা এড়িয়ে চলা

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه، قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ:

إِذَا ضَرَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَجْتَنِبِ الْوَجْهَ

অনুবাদ: “তোমাদের কেউ যখন কাউকে আঘাত করবে, সে যেন মুখমণ্ডল এড়িয়ে চলে।”[33]সূত্র: সহিহ মুসলিম, ২৬১২; كتاب البر والصلة والآداب، باب النهي عن ضرب الوجه।

এই হাদিস ব্যাপক: শাসন, শাস্তি ও বিবাদ, সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাই শিশুর শাসনে মুখ এড়ানো আলাদা ফিকহি সংযোজন নয়, সরাসরি নববী নির্দেশের প্রয়োগ।

আল-কাবিসি একই প্রসঙ্গে বলেন:

وَلْيَجْتَنِبْ أَنْ يَضْرِبَ رَأْسَ الصَّبِيِّ أَوْ وَجْهَهُ.

“শিশুর মাথা বা মুখে প্রহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।”[34]https://www.safahat.org/books/40635716/0.3/

শাইখ ইবনে উসাইমিন (রহ) কোথায় আঘাত করা যাবে এই বিষয়ে বলেন,

لا يضرب ضرباً مبرحاً، ولا يضرب على الوجه مثلاً، ولا على المحل القاتل، وإنما يضرب على الظهر أو الكتف أو ما أشبه ذلك مما لا يكون سبباً في هلاكه. والضرب على الوجه له خطره؛ لأن الوجه أعلى ما يكون للإنسان وأكرم ما يكون على الإنسان، وإذا ضرب عليه أصابه من الذل والهوان أكثر مما لو ضرب على ظهره، ولهذا نهي عن الضرب على الوجه.

তাকে গুরুতর প্রহার করা যাবে না। উদাহরণস্বরূপ, মুখে প্রহার করা যাবে না; প্রাণঘাতী স্থানে প্রহার করাও যাবে না। বরং পিঠে, কাঁধে অথবা এ ধরনের স্থানে প্রহার করা হবে, যা তার মৃত্যুর কারণ হবে না।

মুখে প্রহারের বিপদ রয়েছে। কারণ মানুষের অঙ্গগুলোর মধ্যে মুখ তার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানিত অঙ্গ। মুখে প্রহার করা হলে পিঠে প্রহার করার তুলনায় সে অধিক অপমান ও লাঞ্ছনার শিকার হয়। এ কারণেই মুখে প্রহার করতে নিষেধ করা হয়েছে।[35]রেফারেন্স: فتاوى نور على الدرب (১৩/২)। https://shamela.ws/book/2300/7043

মুখ এড়ানোর কারণ শুধু শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা নয়; মুখ মানুষের মর্যাদার প্রতীক, তাই সেখানে আঘাত করলে অপমানের মাত্রাও বাড়ে। ফলে সংশোধনের উদ্দেশ্য নষ্ট হয়।

প্রহারে শিশুর ক্ষতি হলে করণীয়

বৈধ সীমার ভেতরের শাসন আর সীমা ছাড়ানো প্রহারের বিধান এক নয়। ফকিহগণ এটি আলোচনা করেছেন ‘যমান’ (ক্ষতিপূরণের দায়) পরিভাষায়। সংক্ষেপে: শিক্ষক বা শাসনকারী বৈধ সীমার ভেতরে থাকলে হানাফী ও মালিকী আলেমদের উদ্ধৃতিতে তিনি দায়মুক্ত থাকতে পারেন (যদিও মালিকী ফতোয়ায় দিয়াতের দায় আকিলার ওপর বর্তানোর কথাও আছে); কিন্তু সীমা ছাড়ালে তিনি দায়ী হবেন।

মালিকী মাযহাব

মুহাম্মদ উলাইশের (মৃ. ১২৯৯ হি./১৮৮২ খ্রি.) মানহুল জালীল শারহু মুখতাসারি খলীল গ্রন্থে (মূল মুখতাসারের লেখক খলীল ইবন ইসহাক, মৃ. ৭৭৬ হি./১৩৭৪ খ্রি.) এবং আল-হাত্তাবের (মৃ. ৯৫৪ হি./১৫৪৭ খ্রি.) মাওয়াহিবুল জলীল গ্রন্থে এ আলোচনা উদ্ধৃত হয়েছে:

معلم الكتاب والصنعة إن ضرب صبيًا ما يعلم الأمن فيه لأدبه فمات فلا يضمن، وإن جاوز به الأدب ضمن ما أصابه.

অনুবাদ: “কুরআন বা কোনো শিল্পের শিক্ষক যদি শিশুকে এমন শাসনমূলক প্রহার করেন, যাতে নিরাপদ থাকার বিষয়ে তিনি নিশ্চিত থাকেন, তারপরও শিশু মারা যায়, তাহলে তিনি দায়ী হবেন না। কিন্তু তিনি যদি শাসনের সীমা অতিক্রম করেন, তাহলে যে ক্ষতি করেছেন তার জন্য দায়ী হবেন।”[36]সূত্র: منح الجليل شرح مختصر خليل, ৯/৩৬১; মাওয়াহিবুল জলীল, ৬/৩২১-এও এ আলোচনা উদ্ধৃত হয়েছে। https://shamela.ws/book/21614/4559

হাম্বলী মাযহাব

আল-খাল্লাল (মৃ. ৩১১ হি./৯২৩ খ্রি.)-এর বক্তব্য, ইবনু কুদামার আল-মুগনি-তে বলেন,

وليس على المعلم إذا أدب صبيه الأدب المشروع … قال الخلال: إذا ضرب المعلم ثلاثًا، كما قال التابعون وفقهاء الأمصار، وكان ذلك ثلاثًا، فليس بضامن، وإن ضربه ضربًا شديدًا، مثله لا يكون أدبًا للصبي، ضمن؛ لأنه قد تعدى في الضرب.

অনুবাদ: “শিক্ষক তার শিশুশিক্ষার্থীকে বৈধ শাসনমূলক প্রহার করলে … আল-খাল্লাল বলেছেন: শিক্ষক তিনবার প্রহার করলে—যেমন তাবিঈ ও বিভিন্ন অঞ্চলের ফকিহরা বলেছেন—এবং তা তিনবারই হলে তিনি দায়ী হবেন না। কিন্তু এমন কঠোর প্রহার করলে, যা শিশুর জন্য শাসন বলে গণ্য হয় না, তাহলে তিনি দায়ী হবেন; কারণ তিনি প্রহারে সীমালঙ্ঘন করেছেন।”[37]সূত্র: ইবনু কুদামা, আল-মুগনি, ১২/৫২৮; https://shamela.ws/book/6910/6665

তিনি আরো বলেন:

وَإِنْ ضَرَبَهُ ضَرْبًا شَدِيدًا، مِثْلُهُ لَا يَكُونُ أَدَبًا لِلصَّبِيِّ، ضَمِنَ؛ لِأَنَّهُ قَدْ تَعَدَّى فِي الضَّرْبِ.

অনুবাদ: “আর যদি সে শিশুকে এমন কঠোরভাবে প্রহার করে, যা শিশুকে শাসন করার উপযুক্ত প্রহার নয়, তাহলে সে ক্ষতিপূরণের দায় বহন করবে; কারণ সে প্রহারের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করেছে।”[38]সূত্র: ইবন কুদামা, المغني, “فصل ليس على الزوج ضمان الزوجة إذا تلفت من التأديب المشروع في النشوز” https://shamela.ws/book/6910/6665

আল-খাল্লালের বক্তব্যে তিনবারের শর্ত আর কঠোর প্রহারের নিষেধ একসঙ্গে এসেছে। তিনি একে তাবিঈ ও বিভিন্ন অঞ্চলের ফকিহদের কথা বলে উল্লেখ করেছেন; অর্থাৎ এটি বহুজনের গৃহীত নীতি। ইবনু কুদামা সেই নীতিই সূত্রবদ্ধ করেছেন: যে প্রহার শিশুর জন্য শাসন বলে গণ্য হয় না, তা সীমালঙ্ঘন, আর সীমালঙ্ঘনের ফল ক্ষতিপূরণ। মালিকী উদ্ধৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দুই মাযহাবেই একই যুক্তি: অনুমতি থাকলেও দায়মুক্তি কেবল সীমার ভেতরে।

ইবনু কুদামা তা‘যীরের সীমা অতিক্রম তা‘যীরের আলোচনার শেষে বলেন:

وَإِنْ تَجَاوَزَ التَّعْزِيرَ الْمَشْرُوعَ ضَمِنَ، كَمَا لَوْ تَجَاوَزَ الْحَدَّ فِي الْحَدِّ.

অনুবাদ: “কেউ যদি শরিয়তসম্মত তা‘যীরের সীমা অতিক্রম করে, তাহলে সে ক্ষতিপূরণের দায় বহন করবে; যেমন কেউ হদ কার্যকর করার সময় হদের সীমা অতিক্রম করলে দায়ী হয়।”[39]সূত্র: ইবনু কুদামা, الكافي في فقه الإمام أحمد, কিতাবুল হুদূদ, বাবুত তা‘যীর-এর শেষাংশ। https://shamela.ws/book/21731/1282

একই অনুচ্ছেদে এর ঠিক আগে তিনি বলেছেন, শরিয়তসম্মত তা‘যীরের ফলে কেউ মারা গেলে ক্ষতিপূরণ ওয়াজিব হয় না; কারণ তা প্রতিরোধ ও সতর্কীকরণের জন্য বৈধ শাস্তি, হদ্দের মতো। অর্থাৎ দায়মুক্তি শুধু বৈধ সীমার ভেতরে। সীমা ছাড়ালে সেই মুক্তি আর থাকে না, ঠিক যেমন হদ্দ কার্যকর করতে গিয়ে সীমা ছাড়ালে দায় আসে।

শাফিঈ মাযহাব

শাফিঈ মাযহাবেও একই নীতি: তীব্র ও ধ্বংসাত্মক প্রহার শুরু থেকেই নিষিদ্ধ যা আমরা আগেই উল্লেখ করেছিলাম।

প্রহারে শিশুর ক্ষতি হলে শাস্তির পরিমাণ

ক্ষতির ধরন ও সীমালঙ্ঘনের মাত্রা অনুযায়ী বিধান ভিন্ন হয়। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি পরিভাষা জানা দরকার:

  • দিয়াত: রক্তপণ বা আর্থিক ক্ষতিপূরণ।
  • আকিলা: দিয়াত বহনে দায়বদ্ধ পুরুষ আত্মীয়-গোষ্ঠী।
  • কিসামা: হত্যার দায় নির্ধারণে শরিয়তসম্মত বিশেষ শপথ-পদ্ধতি।
  • কাফফারা: ভুলবশত অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত।
  • কিসাস: সমপরিমাণ প্রতিশোধমূলক শাস্তি।

ইমাম মালিকের ফতোয়া

ইমাম মালিক (মৃ. ১৭৯ হি./৭৯৫ খ্রি.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যা আল-ওয়ানশারিসী (মৃ. ৯১৪ হি./১৫০৮ খ্রি.) উদ্ধৃত করেছেন:

سئل الإمام مالك عن مؤدِّب ضرب صبيًا ففقأ عينه أو كسر يده، فقال: إن ضربه بالدِّرَّة على الأدب، أو أصابه بعود فكسر يده أو فقأ عينه، فالدية على العاقلة إذ فعل ما يجوز له، ولو مات الصبي فهي على العاقلة بقسامة، وعليه الكفارة، وإن ضربه باللوح أو بالعصا فقتله فعليه القصاص؛ لأنه لم يؤذن له في الضرب بعصا ولا لوح.

অনুবাদ: “ইমাম মালিককে এমন এক শিশুশিক্ষক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, যে শিশুকে প্রহার করে তার চোখ নষ্ট করেছে অথবা হাত ভেঙেছে। তিনি বলেন: শিক্ষক যদি শাসনের জন্য অনুমোদিত বেত দিয়ে আঘাত করেন, অথবা কাঠের ছোট টুকরো দিয়ে আঘাত করে শিশুর হাত ভেঙে দেন কিংবা চোখ নষ্ট করেন, তাহলে দিয়াত দিতে হবে শিক্ষকের ‘আকিলা’র ওপর—কারণ তিনি অনুমোদিত পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। শিশুটি মারা গেলেও কিসামার মাধ্যমে দিয়াত আকিলার ওপর বর্তাবে এবং শিক্ষকের কাফফারা দিতে হবে। কিন্তু শিক্ষক যদি তক্তা বা লাঠি দিয়ে আঘাত করে তাকে মেরে ফেলেন, তাহলে তার ওপর কিসাস হবে; কারণ তাকে তক্তা বা লাঠি দিয়ে মারার অনুমতি দেওয়া হয়নি।”

সূত্র: আল-ওয়ানশারিসি, المعيار المعرب, ৮/২৫০; উদ্ধৃতিটি এখানে পড়ুন: আল-উলূকাহর গবেষণা।[40]https://api.alukah.net/hosnihamama/11431/55769/الضرر-الناتج-عن-التأديب-غير-المشروع-للتلميذ/

এই ফতোয়ায় তিনটি স্তর আছে:

  • অনুমোদিত উপকরণ ও পদ্ধতিতে দুর্ঘটনা (বেত বা ছোট কাঠি): আঘাতজনিত ক্ষতির দিয়াত আকিলার ওপর বর্তায়।
  • মৃত্যু ঘটলে: কিসামার মাধ্যমে দিয়াত আকিলার ওপর এবং কাফফারা শিক্ষকের ওপর।
  • অননুমোদিত উপকরণ (তক্তা বা লাঠি) দিয়ে হত্যা: কিসাস।

কিসাস আবশ্যক হওয়ার বাস্তব ঘটনা: ইবন হাযম (মৃ. ৪৫৬ হি./১০৬৪ খ্রি.)

ইবন হাযম তাঁর المحلى بالآثار-এ একটি বাস্তব ঘটনা উল্লেখ করেছেন:

وكان في أصحابنا فتى اسمه يبقى بن عبد الملك ضربه معلمه في صباه بقلم في خده فيبست عينه، فهذا عمد يوجب القود، لأن الضربة كانت في العصبة المتصلة بالناظر.

অনুবাদ: “আমাদের সঙ্গীদের মধ্যে ইয়াবকা ইবন আবদুল মালিক নামে এক যুবক ছিল। শৈশবে তার শিক্ষক তার গালে কলম দিয়ে আঘাত করেছিলেন, ফলে তার চোখ শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। এটি এমন ইচ্ছাকৃত আঘাত, যাতে কিসাস আবশ্যক হয়; কারণ আঘাতটি চোখের সঙ্গে সংযুক্ত স্নায়ুতে লেগেছিল।”[41]সূত্র: ইবন হাযম, المحلى بالآثار, كتاب الدماء والقصاص والديات। https://shamela.ws/book/767/4593

এই ঘটনা মুখমণ্ডলে আঘাত নিষিদ্ধ হওয়ার বাস্তব যৌক্তিকতা দেখায়: সামান্য আঘাতও স্থায়ী ক্ষতির কারণ হলে বিচারকের সামনে তা ‘ইচ্ছাকৃত আঘাত’ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

শাসনের ফলে মৃত্যু: শিবহুল আমদ (আধা-ইচ্ছাকৃত হত্যা)

وَإِذَا أَفْضَى تَعْزِيرٌ إِلَى هَلَاكٍ، وَجَبَ الضَّمَانُ عَلَى عَاقِلَةِ الْمُعَزِّرِ، وَيَكُونُ قَتْلُهُ شِبْهَ عَمْدٍ.

অনুবাদ: “তাআযীর দিতে গিয়ে কারও মৃত্যু ঘটলে, শাসনকারী ব্যক্তির ‘আকিলা’র ওপর ক্ষতিপূরণ আবশ্যক হবে; আর হত্যাটি গণ্য হবে شبه عمد—আধা-ইচ্ছাকৃত হত্যা হিসেবে।”[42]https://www.alukah.net/social/0/47509/شروط-ولاية-تأديب-المعلم-لتلميذه/

‘শিবহুল আমদ’ মানে আঘাত ইচ্ছাকৃত ছিল কিন্তু মৃত্যু ঘটানোর ইচ্ছা ছিল না। তাই সাধারণত কিসাস নয়, দিয়াতের দায় আসে। ফকিহদের সাধারণ বক্তব্য অনুযায়ী দিয়াত বহন করে আকিলা, আর শাসনকারীর ওপর থাকে কাফফারা ও আখিরাতের জবাবদিহি।

শিশুদের প্রতি নবী ﷺ-এর কোমল আচরণ

শাসনের অনুমতি আছে, কিন্তু নবী ﷺ-এর জীবনে শিশুদের সঙ্গে আচরণের মূল সুর ছিল দয়া, স্নেহ ও কোমলতা। নিচে কয়েকটি সহিহ হাদিস দেওয়া হলো।

শিশুদের প্রতি সবচেয়ে বেশি দয়ালু

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رضي الله عنه قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَرْحَمَ النَّاسِ بِالصِّبْيَانِ وَالْعِيَالِ.

অনুবাদ: আনাস ইবন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, “রাসুলুল্লাহ ﷺ শিশুদের ও পরিবারের লোকদের প্রতি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দয়ালু ছিলেন।”[43]সূত্র: আল-বুখারির আল-আদাবুল মুফরাদ, ৩৭৬; আত-তায়ালিসি, ২২২৯। আলবানী বর্ণনাটিকে সহিহ আল-জামি‘, ৪৭৯৭-এ সহিহ বলেছেন। আল-আদাবুল মুফরাদ ৩৭৬ — sunnah.com

عَنْ أَنَسٍ رضي الله عنه: أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ كَانَ يَزُورُ الْأَنْصَارَ، وَيُسَلِّمُ عَلَى صِبْيَانِهِمْ، وَيَمْسَحُ رُؤُوسَهُمْ.

অনুবাদ: আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ আনসারদের কাছে যেতেন, তাদের শিশুদের সালাম দিতেন এবং তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন।[44]সূত্র: সহিহ ইবন হিব্বান, ৪৫৯। এ বর্ণনার সনদকে শু‘আইব আল-আরনাউত সহিহ বলেছেন।

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رضي الله عنه قَالَ: خَدَمْتُ النَّبِيَّ ﷺ عَشْرَ سِنِينَ، فَمَا قَالَ لِي: أُفٍّ، وَلَا قَالَ لِشَيْءٍ صَنَعْتُهُ: لِمَ صَنَعْتَهُ؟ وَلَا لِشَيْءٍ تَرَكْتُهُ: لِمَ تَرَكْتَهُ؟

অনুবাদ: আনাস ইবন মালিক (রা.) বলেন, “আমি দশ বছর নবী ﷺ-এর সেবা করেছি। এ সময়ে তিনি আমাকে কখনো ‘উফ্’ বলেননি। আমি কোনো কাজ করলে কখনো বলেননি, ‘এটা কেন করলে?’ আর কোনো কাজ না করলে বলেননি, ‘এটা কেন করলে না?’”[45]সূত্র: সহিহ মুসলিম, ২৩০৯; সহিহ আল-বুখারি, ৬০৩৮। সহিহ মুসলিম ২৩০৯ — sunnah.com · সহিহ আল-বুখারি ৬০৩৮ — sunnah.com

শিশুদের চুমু দেওয়া ও না দেওয়া সম্পর্কে

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه قَالَ: قَبَّلَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ الْحَسَنَ بْنَ عَلِيٍّ، وَعِنْدَهُ الْأَقْرَعُ بْنُ حَابِسٍ التَّمِيمِيُّ جَالِسًا، فَقَالَ الْأَقْرَعُ: إِنَّ لِي عَشَرَةً مِنَ الْوَلَدِ مَا قَبَّلْتُ مِنْهُمْ أَحَدًا، فَنَظَرَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ ثُمَّ قَالَ: «مَنْ لَا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ»

অনুবাদ: আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ হাসান ইবন আলীকে চুমু দিলেন। তখন তাঁর কাছে আল-আকরা‘ ইবন হাবিস আত-তামীমী বসা ছিলেন। তিনি বললেন, “আমার দশটি সন্তান আছে; আমি তাদের কাউকেই কখনো চুমু দিইনি।” রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, “যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।”[46]সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, ৫৯৯৭; সহিহ মুসলিম, ২৩১৮। সহিহ আল-বুখারি ৫৯৯৭ — sunnah.com · সহিহ মুসলিম ২৩১৮ — sunnah.com

عَنْ عَائِشَةَ رضي الله عنها قَالَتْ: جَاءَ أَعْرَابِيٌّ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ فَقَالَ: تُقَبِّلُونَ الصِّبْيَانَ؟ فَمَا نُقَبِّلُهُمْ، فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ: «أَوَأَمْلِكُ لَكَ أَنْ نَزَعَ اللَّهُ مِنْ قَلْبِكَ الرَّحْمَةَ؟»

অনুবাদ: আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক বেদুঈন নবী ﷺ-এর কাছে এসে বলল, “আপনারা শিশুদের চুমু দেন? আমরা তো তাদের চুমু দিই না।” তখন নবী ﷺ বললেন, “আল্লাহ যদি তোমার অন্তর থেকে দয়া উঠিয়ে নিয়ে থাকেন, তাহলে আমি তোমার জন্য কী করতে পারি?”[47]সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, ৫৯৯৮; সহিহ মুসলিম, ২৩১৭। সহিহ আল-বুখারি ৫৯৯৮ — sunnah.com · সহিহ মুসলিম ২৩১৭ — sunnah.com

নামাজে নাতনিকে কোলে নেওয়া, শিশুর কান্না শুনে নামাজ সংক্ষিপ্ত করা

عَنْ أَبِي قَتَادَةَ الْأَنْصَارِيِّ رضي الله عنه: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ كَانَ يُصَلِّي وَهُوَ حَامِلٌ أُمَامَةَ بِنْتَ زَيْنَبَ بِنْتِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ، وَلِأَبِي الْعَاصِ بْنِ الرَّبِيعِ، فَإِذَا قَامَ حَمَلَهَا، وَإِذَا سَجَدَ وَضَعَهَا.

অনুবাদ: আবু কাতাদা আল-আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ নামাজ পড়তেন এমন অবস্থায় যে, তিনি তাঁর নাতনি উমামা বিনতে যায়নাবকে কোলে নিয়ে থাকতেন। যায়নাব ছিলেন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কন্যা এবং উমামার পিতা ছিলেন আবুল-আস ইবনুর-রাবি‘। তিনি যখন দাঁড়াতেন, উমামাকে কোলে তুলে নিতেন; আর যখন সিজদা করতেন, তাঁকে নামিয়ে রাখতেন।[48]সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, ৫১৬; সহিহ মুসলিম, ৫৪৩। সহিহ আল-বুখারি ৫১৬ — sunnah.com · সহিহ মুসলিম ৫৪৩ — sunnah.com

عَنْ أَبِي قَتَادَةَ رضي الله عنه، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: «إِنِّي لَأَقُومُ فِي الصَّلَاةِ أُرِيدُ أَنْ أُطَوِّلَ فِيهَا، فَأَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ، فَأَتَجَوَّزُ فِي صَلَاتِي، كَرَاهِيَةَ أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمِّهِ».

অনুবাদ: আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন, “আমি নামাজে দাঁড়াই এবং নামাজ দীর্ঘ করার ইচ্ছা রাখি। কিন্তু তখন শিশুর কান্না শুনতে পাই; ফলে আমি আমার নামাজ সংক্ষিপ্ত করি, কারণ আমি চাই না তার মায়ের কষ্ট হোক।”[49]সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, ৭০৭–৭০৯। সহিহ আল-বুখারি ৭০৭ — sunnah.com · ৭০৮ · ৭০৯

ছোট শিশুর প্রস্রাবের ঘটনায় কোমল আচরণ

عَنْ أُمِّ قَيْسٍ بِنْتِ مِحْصَنٍ رضي الله عنها: أَنَّهَا أَتَتْ بِابْنٍ لَهَا صَغِيرٍ لَمْ يَأْكُلِ الطَّعَامَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ، فَأَجْلَسَهُ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فِي حَجْرِهِ، فَبَالَ عَلَى ثَوْبِهِ، فَدَعَا بِمَاءٍ فَنَضَحَهُ وَلَمْ يَغْسِلْهُ.

অনুবাদ: উম্মু কায়স বিনতে মিহসান (রা.) তাঁর ছোট ছেলেকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে নিয়ে এলেন। শিশুটি তখনো খাবার খাওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে নিজের কোলে বসালেন। শিশুটি তাঁর কাপড়ে প্রস্রাব করে দিল। তখন তিনি পানি আনতে বললেন এবং কাপড়ের ওই স্থানে পানি ছিটিয়ে দিলেন; তা ধুয়ে ফেললেন না।[50]সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, ২২৩। সহিহ আল-বুখারি ২২৩ — sunnah.com

শিশুদের সাথে দুষ্টুমি, রসিকতা করা

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رضي الله عنه قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَحْسَنَ النَّاسِ خُلُقًا، وَكَانَ لِي أَخٌ يُقَالُ لَهُ أَبُو عُمَيْرٍ، قَالَ: أَحْسِبُهُ قَالَ: كَانَ فَطِيمًا، وَكَانَ إِذَا جَاءَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَرَآهُ قَالَ: «يَا أَبَا عُمَيْرٍ، مَا فَعَلَ النُّغَيْرُ؟»

অনুবাদ: আনাস ইবন মালিক (রা.) বলেন, “রাসুলুল্লাহ ﷺ মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। আমার এক ছোট ভাই ছিল, যার উপনাম ছিল আবু উমাইর।” আনাস (রা.) বলেন, আমার ধারণা, সে তখন দুধ ছাড়ানো শিশু ছিল। রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন আসতেন এবং তাকে দেখতেন, তখন বলতেন, “হে আবু উমাইর, তোমার ছোট পাখিটির কী হলো?”[51]সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, ৬১২৯; সহিহ মুসলিম, ২১৫০। সহিহ আল-বুখারি ৬১২৯ — sunnah.com · সহিহ মুসলিম ২১৫০ — sunnah.com

عَنْ مَحْمُودِ بْنِ الرَّبِيعِ رضي الله عنه قَالَ: عَقَلْتُ مِنَ النَّبِيِّ ﷺ مَجَّةً مَجَّهَا فِي وَجْهِي وَأَنَا ابْنُ خَمْسِ سِنِينَ مِنْ دَلْوٍ.

অনুবাদ: মাহমুদ ইবনুর-রাবি‘ (রা.) বলেন, “আমি পাঁচ বছর বয়সে নবী ﷺ-এর একটি ঘটনা মনে রাখতে পেরেছি: তিনি একটি বালতি থেকে পানি মুখে নিয়ে আমার মুখের ওপর ছিটিয়ে দিয়েছিলেন।”[52]সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, ৭৭। সহিহ আল-বুখারি ৭৭ — sunnah.com

খেলতে থাকা শিশুদের সালাম দেওয়া

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رضي الله عنه: أَنَّهُ مَرَّ عَلَى صِبْيَانٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ، وَقَالَ: كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَفْعَلُهُ.

অনুবাদ: আনাস ইবন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি কয়েকজন শিশুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সালাম দিলেন এবং বললেন, “নবী ﷺ এমন করতেন।”[53]সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, ৬২৪৭; সহিহ মুসলিম, ২১৬৮। আবু দাউদ, ৫২০২ নম্বরেও এ বিষয়ের বর্ণনা রয়েছে। সহিহ আল-বুখারি ৬২৪৭ — sunnah.com · সহিহ মুসলিম ২১৬৮ — sunnah.com · সুনান আবি দাউদ ৫২০২ — sunnah.com

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رضي الله عنه قَالَ: أَتَى عَلَيَّ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ وَأَنَا أَلْعَبُ مَعَ الْغِلْمَانِ، قَالَ: فَسَلَّمَ عَلَيْنَا، فَبَعَثَنِي إِلَى حَاجَةٍ، فَأَبْطَأْتُ عَلَى أُمِّي، فَلَمَّا جِئْتُ قَالَتْ: مَا حَبَسَكَ؟ قُلْتُ: بَعَثَنِي رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لِحَاجَةٍ، قَالَتْ: مَا حَاجَتُهُ؟ قُلْتُ: إِنَّهَا سِرٌّ، قَالَتْ: لَا تُحَدِّثَنَّ بِسِرِّ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ أَحَدًا.

অনুবাদ: আনাস ইবন মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ আমার কাছে এলেন, তখন আমি কয়েকজন বালকের সঙ্গে খেলছিলাম। তিনি আমাদের সালাম দিলেন। এরপর আমাকে একটি কাজে পাঠালেন। আমি আমার মায়ের কাছে ফিরতে দেরি করলাম। ফিরে এলে মা বললেন, “তোমাকে কী আটকে রেখেছিল?” আমি বললাম, “রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাকে একটি কাজে পাঠিয়েছিলেন।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কী কাজ?” আমি বললাম, “এটি গোপন কথা।” তখন মা বললেন, “রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর গোপন কথা কাউকে বলবে না।”[54]সূত্র: সহিহ মুসলিম, ২৪৮২-এর আনাস (রা.)-এর গোপন কথা সংক্রান্ত বর্ণনা; আবু দাউদ, ৫২০৩-এ শিশুদের সঙ্গে নবী ﷺ-এর আচরণের বর্ণনা রয়েছে। সহিহ মুসলিম ২৪৮২ — sunnah.com · সুনান আবি দাউদ ৫২০৩ — sunnah.com

শিশুদের জন্য বরকতের দোয়া করা ও তাহনিক করা

عَنْ أَبِي مُوسَى رضي الله عنه قَالَ: وُلِدَ لِي غُلَامٌ، فَأَتَيْتُ بِهِ النَّبِيَّ ﷺ، فَسَمَّاهُ إِبْرَاهِيمَ، فَحَنَّكَهُ بِتَمْرَةٍ، وَدَعَا لَهُ بِالْبَرَكَةِ، وَدَفَعَهُ إِلَيَّ.

অনুবাদ: আবু মূসা (রা.) বলেন, “আমার একটি পুত্রসন্তান জন্ম নিলে আমি তাকে নবী ﷺ-এর কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি তার নাম রাখলেন ইবরাহিম, একটি খেজুর দিয়ে তার তাহনিক করলেন, তার জন্য বরকতের দোয়া করলেন এবং তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিলেন।”[55]সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, ৫৪৬৭; সহিহ মুসলিম, ২১৪৫। সহিহ আল-বুখারি ৫৪৬৭ — sunnah.com · সহিহ মুসলিম ২১৪৫ — sunnah.com

عَنْ عَائِشَةَ رضي الله عنها قَالَتْ: كَانَ يُؤْتَى بِالصِّبْيَانِ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ فَيُبَرِّكُ عَلَيْهِمْ وَيُحَنِّكُهُمْ.

অনুবাদ: আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, শিশুদের নবী ﷺ-এর কাছে আনা হলে তিনি তাদের জন্য বরকতের দোয়া করতেন এবং তাহনিক করতেন।[56]সূত্র: সহিহ মুসলিম, ২১৪৭; সহিহ আল-বুখারি, ৬৩৫৫। সহিহ মুসলিম ২১৪৭ — sunnah.com · সহিহ আল-বুখারি ৬৩৫৫ — sunnah.com

উপসংহার

উপরের উদ্ধৃতিগুলোর আলোকে আলেমদের যুক্তিগুলো এভাবে সাজানো যায়:

১. উদ্দেশ্যনিষ্ঠতা। শাসনের লক্ষ্য সংশোধন ও শিষ্টাচার; প্রতিশোধ বা ক্ষোভ মেটানো নয়। ইমাম আহমদ ‘শিষ্টাচার শেখানোর’ কথাই বলেছেন, আর ইমাম নববী যে প্রহার ধ্বংসের কারণ হতে পারে তা বৈধ বলেননি।

২. বয়সভিত্তিক ধাপ। সাত বছরে নির্দেশ, দশ বছরে প্রহার; খুব ছোট শিশু, যে শাসনের অর্থ বোঝে না, তাকে প্রহার নয়।

৩. পরিমাণ ও তীব্রতার কঠোর নিয়ন্ত্রণ। দশের বেশি নয়; শিক্ষকের ক্ষেত্রে অনেক আলেমের মতে তিনের বেশি নয়; ব্যথা হবে, কিন্তু দাগ বা ক্ষতি নয়; মুখ ও মাথা এড়াতে হবে।

৪. জবাবদিহি ও বিচার। সীমা ছাড়ালে ক্ষতিপূরণ, কাফফারা, এমনকি কিসাস পর্যন্ত বিধান আছে। শিক্ষকের কর্তৃত্ব প্রতিনিধিত্বমূলক, তাই অপব্যবহারে তিনি নিজেই দায়ী।

৫. নববী আদর্শের ভারসাম্য। নবী ﷺ-এর জীবনে কোমলতাই মূল সুর। উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ জিহাদ ছাড়া নিজের হাতে কখনো কাউকে—নারী বা খাদেমকেও—আঘাত করেননি [57]সহিহ মুসলিম, ২৩২৮। তিনি আরও বলেন, কোমলতা যে বিষয়েই থাকে তাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে[58]সহিহ মুসলিম, ২৫৯৪। আর ‘যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’[59]জামে আত-তিরমিযী, ১৯১৯। অর্থাৎ শাসনের বৈধতা কোমলতার বিকল্প নয়; বরং সর্বশেষ ও সীমিত উপায়।

৬. বিকল্প ব্যর্থ হলেও সীমা অটল। মৃদু শাসনে কাজ না হলেও কঠোর প্রহারের অনুমতি নেই। অর্থাৎ ‘ফল না পেলে মাত্রা বাড়াও’—এ যুক্তি ইসলামী সূত্রে গ্রহণযোগ্য নয়।

কুরআন-সুন্নাহ ও চার মাযহাবের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থের উদ্ধৃতি থেকে স্পষ্ট হয়, শিশুকে শাসন করা একটি শর্তসাপেক্ষ ও সীমাবদ্ধ বৈধতা। মূল কথাগুলো:

  • শাসন বৈধ, তবে নামাজের জন্য প্রহার কেবল দশ বছর বয়স থেকে।
  • শাসনের অধিকারী অভিভাবক; শিক্ষক তাঁর প্রতিনিধি, এবং সেই প্রতিনিধিত্বের সীমার ভেতরেই তাঁর কর্তৃত্ব।
  • সংখ্যা, তীব্রতা, স্থান ও উপকরণ—সবকিছুতে সীমা আছে।
  • সীমা ছাড়ালে দায় ও শাস্তি আছে, এমনকি কিসাস পর্যন্ত।
  • সব ক্ষেত্রে লক্ষ্য হবে সংশোধন ও কল্যাণ; ক্ষতি বা প্রতিশোধ নয়।

আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।

Citation is loading...

Footnotes

Footnotes
⇧1 সূত্র: সুনান আবি দাউদ, হাদিস ৪৯৫। (সংকলক ইমাম আবু দাউদ, মৃ. ২৭৫ হি./৮৮৯ খ্রি.).
⇧2 রেফারেন্স: المغني (১/৩৫৭)। – https://shamela.ws/book/6910/856
⇧3 রেফারেন্স: كتاب فتاوى السبكي (১/১৯০)। – https://shamela.ws/book/11498/188
⇧4 রেফারেন্স: فتاوى نور على الدرب (১১/৩৮৬) – https://shamela.ws/book/2300/6188
⇧5 রেফারেন্স: لقاء الباب المفتوح (৯৫/১৮)। – https://shamela.ws/book/7687/2767
⇧6 সূত্র: ইবনু মুফলিহ, আল-আদাব আশ-শারঈয়্যাহ, ১/৪৫১। – https://shamela.ws/book/21582/450
⇧7 সূত্র: ইমাম নববী, রওদাতুত তালিবীন ওয়া উমদাতুল মুফতীন, ১০/১৭৫—প্রচলিত সংস্করণের পৃষ্ঠা-নির্দেশ। অনলাইন সংস্করণে এটি ৭ম খণ্ডের ৩৮৩ নম্বর পৃষ্ঠায় রয়েছে। – https://shamela.ws/book/499/4104
⇧8 রেফারেন্স: إغاثة المستفيد بشرح كتاب التوحيد (২/২৮২) – https://shamela.ws/book/8565/655
⇧9 সূত্র: মুগনিল মুহতাজ, ৪/১৯৩–১৯৯ – https://shamela.ws/book/11444/2708
⇧10 সূত্র: রওদাতুত তালিবীন, ১০/১৭৫; https://shamela.ws/book/499/4104
⇧11 সূত্র: আল-বাহরুর রায়িক, কিতাবুদ দিয়াত, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯২-এর অনলাইন পাঠ। মূল আরবি পাঠ: https://shamela.ws/book/12227/2923
⇧12 সূত্র: হাশিয়াতু ইবনু আবিদীন, গবেষণাপত্রে উদ্ধৃত পৃষ্ঠা ৫/৩৬৩; অনুমতির প্রসঙ্গে ৩/১৮৯-ও উল্লেখ করা হয়েছে। – https://shamela.ws/book/918/135
⇧13 দেখুন বিস্তারিত:- https://www.alukah.net/social/0/47509/شروط-ولاية-تأديب-المعلم-لتلميذه/
⇧14 সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৬৮৫০ (ইমাম বুখারী, মৃ. ২৫৬ হি./৮৭০ খ্রি.); সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৭০৮ (ইমাম মুসলিম, মৃ. ২৬১ হি./৮৭৫ খ্রি.)। হাদিসটি সহিহ এবং উভয় গ্রন্থে বর্ণিত।
⇧15 সূত্র: বদরুদ্দীন আল-আইনী, عمدة القاري شرح صحيح البخاري, কিতাবুল হুদূদ, باب كم التعزير والأدب। – https://shamela.ws/book/5756/7142
⇧16 সূত্র: ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী, ১২/১৮৫-এ – https://shamela.ws/book/1673/7165
⇧17 রেফারেন্স: إعلام الموقعين (২/২৩)। https://shamela.ws/book/17798/1037
⇧18 সূত্র: আবুল আব্বাস আল-কুরতুবি, المفهم لما أشكل من تلخيص كتاب مسلم, كتاب الحدود, باب الحد في الخمر وما جاء في جلد التعزير, ৫ম খণ্ড, পৃ. ১৩৯। https://shamela.ws/book/132524/2793

আলোচনার প্রথম অংশ আগের পৃষ্ঠায়: https://shamela.ws/book/132524/2792

⇧19 সূত্র: মুহাম্মদ ইবন সাহনুন, آداب المعلمين, পৃষ্ঠা ৮৯; উদ্ধৃতিটি এখানে পাওয়া যায়: শিক্ষকদের শাসনবিধি নিয়ে আলোচনা। https://www.safahat.org/books/40635716/0.3/
⇧20 সূত্রঃ كتاب بدائع السلك في طبائع الملك (২/৩৬৯) https://shamela.ws/book/7236/879
⇧21 সূত্র: সুহাইলী, الروض الأنف, ১/২৭২। https://shamela.ws/book/1514/564
⇧22 সূত্র: আত-তাজ ওয়াল-ইকলীল (আল-মাওয়াক, মৃ. ৮৯৭ হি./১৪৯২ খ্রি.), ৬/৩১৯ এবং হাশিয়াতুর রাহূনী (মৃ. ১২৩০ হি./১৮১৫ খ্রি.), ৮/১৬২; https://shamela.ws/book/16968/4831
⇧23 সূত্র: হাশিয়াতু ইবনি আবিদীন (রদ্দুল মুহতার, আল-হালাবী সংস্করণ), কিতাবুস সালাত, ১/৩৫২—সেখানে ইসমাঈলের মাধ্যমে আল-উস্তুরুশানীর أحكام الصغار থেকে উদ্ধৃত। https://shamela.ws/book/21613/347
⇧24 https://diwan-ahadiths.com/hadith/1347
⇧25 তিরমিজি ১৯৪০, আবু দাউদ ৩৬৩৫; ইবনে মাজাহ ২৩৪২ আলবানী, আহমেদ শাকের, বাশার আওয়াদ, শুয়াইব আরনাউত হাসান বলেছেন
⇧26 ইবনে মাজাহ ২৩৪০-২৩৪১; আলবানী ও শুয়াইব আরনাউত সহিহ বলেছেন
⇧27 হাদীস সম্ভার, হাদিস ৪৭৮, বুখারী ১৪৪৫, ৬০২২, মুসলিম ২৩৮০
⇧28 তিরমিজি হাদিস ২৬২৭
⇧29 الرسالة المفصلة لأحوال المتعلمين وأحكام المعلمين والمتعلمين – https://www.safahat.org/books/40635716/0.3/
⇧30 সূত্র: নববী, روضة الطالبين, ১০/১৭৫। মূল আরবি পাঠ: রওদাতুত তালিবীন; https://shamela.ws/book/499/4104
⇧31 كتاب الفوائد الجسام على قواعد ابن عبد السلام – https://shamela.ws/book/17811/220
⇧32 সূত্র: كتاب المغني لابن قدامة – ت التركي (12/526) – https://shamela.ws/book/6910/6663
⇧33 সূত্র: সহিহ মুসলিম, ২৬১২; كتاب البر والصلة والآداب، باب النهي عن ضرب الوجه।
⇧34 https://www.safahat.org/books/40635716/0.3/
⇧35 রেফারেন্স: فتاوى نور على الدرب (১৩/২)। https://shamela.ws/book/2300/7043
⇧36 সূত্র: منح الجليل شرح مختصر خليل, ৯/৩৬১; মাওয়াহিবুল জলীল, ৬/৩২১-এও এ আলোচনা উদ্ধৃত হয়েছে। https://shamela.ws/book/21614/4559
⇧37 সূত্র: ইবনু কুদামা, আল-মুগনি, ১২/৫২৮; https://shamela.ws/book/6910/6665
⇧38 সূত্র: ইবন কুদামা, المغني, “فصل ليس على الزوج ضمان الزوجة إذا تلفت من التأديب المشروع في النشوز” https://shamela.ws/book/6910/6665
⇧39 সূত্র: ইবনু কুদামা, الكافي في فقه الإمام أحمد, কিতাবুল হুদূদ, বাবুত তা‘যীর-এর শেষাংশ। https://shamela.ws/book/21731/1282
⇧40 https://api.alukah.net/hosnihamama/11431/55769/الضرر-الناتج-عن-التأديب-غير-المشروع-للتلميذ/
⇧41 সূত্র: ইবন হাযম, المحلى بالآثار, كتاب الدماء والقصاص والديات। https://shamela.ws/book/767/4593
⇧42 https://www.alukah.net/social/0/47509/شروط-ولاية-تأديب-المعلم-لتلميذه/
⇧43 সূত্র: আল-বুখারির আল-আদাবুল মুফরাদ, ৩৭৬; আত-তায়ালিসি, ২২২৯। আলবানী বর্ণনাটিকে সহিহ আল-জামি‘, ৪৭৯৭-এ সহিহ বলেছেন। আল-আদাবুল মুফরাদ ৩৭৬ — sunnah.com
⇧44 সূত্র: সহিহ ইবন হিব্বান, ৪৫৯। এ বর্ণনার সনদকে শু‘আইব আল-আরনাউত সহিহ বলেছেন।
⇧45 সূত্র: সহিহ মুসলিম, ২৩০৯; সহিহ আল-বুখারি, ৬০৩৮। সহিহ মুসলিম ২৩০৯ — sunnah.com · সহিহ আল-বুখারি ৬০৩৮ — sunnah.com
⇧46 সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, ৫৯৯৭; সহিহ মুসলিম, ২৩১৮। সহিহ আল-বুখারি ৫৯৯৭ — sunnah.com · সহিহ মুসলিম ২৩১৮ — sunnah.com
⇧47 সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, ৫৯৯৮; সহিহ মুসলিম, ২৩১৭। সহিহ আল-বুখারি ৫৯৯৮ — sunnah.com · সহিহ মুসলিম ২৩১৭ — sunnah.com
⇧48 সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, ৫১৬; সহিহ মুসলিম, ৫৪৩। সহিহ আল-বুখারি ৫১৬ — sunnah.com · সহিহ মুসলিম ৫৪৩ — sunnah.com
⇧49 সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, ৭০৭–৭০৯। সহিহ আল-বুখারি ৭০৭ — sunnah.com · ৭০৮ · ৭০৯
⇧50 সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, ২২৩। সহিহ আল-বুখারি ২২৩ — sunnah.com
⇧51 সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, ৬১২৯; সহিহ মুসলিম, ২১৫০। সহিহ আল-বুখারি ৬১২৯ — sunnah.com · সহিহ মুসলিম ২১৫০ — sunnah.com
⇧52 সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, ৭৭। সহিহ আল-বুখারি ৭৭ — sunnah.com
⇧53 সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, ৬২৪৭; সহিহ মুসলিম, ২১৬৮। আবু দাউদ, ৫২০২ নম্বরেও এ বিষয়ের বর্ণনা রয়েছে। সহিহ আল-বুখারি ৬২৪৭ — sunnah.com · সহিহ মুসলিম ২১৬৮ — sunnah.com · সুনান আবি দাউদ ৫২০২ — sunnah.com
⇧54 সূত্র: সহিহ মুসলিম, ২৪৮২-এর আনাস (রা.)-এর গোপন কথা সংক্রান্ত বর্ণনা; আবু দাউদ, ৫২০৩-এ শিশুদের সঙ্গে নবী ﷺ-এর আচরণের বর্ণনা রয়েছে। সহিহ মুসলিম ২৪৮২ — sunnah.com · সুনান আবি দাউদ ৫২০৩ — sunnah.com
⇧55 সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, ৫৪৬৭; সহিহ মুসলিম, ২১৪৫। সহিহ আল-বুখারি ৫৪৬৭ — sunnah.com · সহিহ মুসলিম ২১৪৫ — sunnah.com
⇧56 সূত্র: সহিহ মুসলিম, ২১৪৭; সহিহ আল-বুখারি, ৬৩৫৫। সহিহ মুসলিম ২১৪৭ — sunnah.com · সহিহ আল-বুখারি ৬৩৫৫ — sunnah.com
⇧57 সহিহ মুসলিম, ২৩২৮
⇧58 সহিহ মুসলিম, ২৫৯৪
⇧59 জামে আত-তিরমিযী, ১৯১৯
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Back to top button