‘দিরহাম’ নিয়ে কি কোরআনে ঐতিহাসিক ভুল তথ্য আছে?

প্রশ্নোত্তর (Q&A) › Category: ইতিহাস › ‘দিরহাম’ নিয়ে কি কোরআনে ঐতিহাসিক ভুল তথ্য আছে?
remianfahad.note asked 4 ঘন্টা ago
আসসালামু আলাইকুম। কোরআনে সুরা ইউসুফের ২০ নং আয়াতে বলা হয়েছে ইউসুফ (আঃ) এর ভাইয়েরা তাকে কয়েকটি দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছিল। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে জানা যায় যে, ঐ সময় দিরহাম বলে কোনো মুদ্রার অস্তিত্ব ছিল না বরং দিরহাম আরো অনেক পরে অস্তিত্বে আসে। আবার ঐ সময় কোনো মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন ছিল না। বরং ওই সময় মানুষ ওজন আকারে জিনিসপত্র কেনা বেচা করত। তাই অনেক মিশনারীরা এটাকে কোরআনের ঐতিহাসিক ভুল বলে। কোরআনে যে এই বিষয়ে কোনো ভুল তথ্য নেই, এই বিষয়ে জানালে অনেক উপকৃত হব।
1 Answers
anil af answered 4 ঘন্টা ago

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

আপনার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ এবং মিশনারী/সমালোচকদের একটি সাধারণ আপত্তি। সূরা ইউসুফ ১২:২০-এ বলা হয়েছে:

> وَشَرَوْهُ بِثَمَنٍ بَخْسٍ دَرَاهِمَ مَعْدُودَةٍ وَكَانُوا فِيهِ مِنَ الزَّاهِدِينَ > “আর তারা তাকে সস্তা মূল্যে বিক্রি করে দিল—গণনাযোগ্য কয়েকটি দিরহামের বিনিময়ে—এবং তারা তার ব্যাপারে উদাসীন ছিল।”

সমালোচকরা বলেন: ইউসুফ (আ.)-এর যুগে (আনুমানিক ১৮০০–১৬০০ খ্রিস্টপূর্ব) “দিরহাম” নামের মুদ্রা ছিল না; মুদ্রা ব্যবস্থা অনেক পরে (প্রায় ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে লিডিয়ায়) শুরু হয়; তখন ওজনভিত্তিক রূপা/সোনা বা বিনিময় চলত। তাই এটি ঐতিহাসিক ভুল।

আমরা বলতে চাই এটি কোনো ভুল নয়। নিচে বিস্তারিত, নির্ভরযোগ্য উৎসভিত্তিক ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।

১. “দিরহাম” শব্দের অর্থ: শুধু মুদ্রা নয়

আরবিতে দিরহাম (একবচন) / দারাহিম (বহুবচন), এটি দ্বারা মূলত রূপার একক/ওজন বা রূপার টুকরা/মূল্য বোঝায়। এটি মুদ্রিত কয়েন হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।

- এটি গ্রিক drachma (δραχμή, আক্ষরিক “মুঠো/হাতভর্তি”) থেকে পারস্যীয় drahm হয়ে আরবিতে এসেছে। প্রাক-ইসলামী আরবেও শব্দটি পরিচিত ছিল (যেমন আনতারাহর কবিতায়)।

- ইসলামের আবির্ভাবকালে যেকোনো রূপার মুদ্রা বা রূপার মূল্য একককে দিরহাম বলা হতো। এটি ওজনের এককও ছিল।

- হাদিসেও এর ব্যবহার ওজন হিসেবে আছে (যেমন চুলের ওজন পরিমাণ রূপা দিরহাম হিসেবে সদকা)। অভিধানে এটি অর্থ, রূপা, মূল্য, ওজনকৃত রূপা ইত্যাদি বোঝায়।

কুরআন এখানে “মুদ্রিত কয়েন” দাবি করেনি; বরং অল্প কিছু রূপার টুকরা/বা ততকালীন প্রচলিত রুপার বস্তু বোঝিয়েছে, যা তৎকালীন আরবদের কাছে সহজবোধ্য।

২. “মা‘দূদাহ” (গণনাযোগ্য/গণনা করা)-এর অর্থ

তাফসীরকারকগণ (তাবারী, কুরতুবী, ইবনে কাসীর প্রমুখ) ব্যাখ্যা করেন:

- আরব ব্যবসায়ীরা বড় পরিমাণ ওজন করতেন, ছোট পরিমাণ (সাধারণত ৪০-এর নিচে) গণনা করতেন।

- তাই “দারাহিমা মা‘দূদাহ” মানে অল্প সংখ্যক (গণনা করা যায় এমন) রূপার একক—যেমন ২০ দিরহাম। এটি মুলত সস্তা মূল্য বোঝায়।

- ইবনে মাসউদ (রা.)-সহ অনেক সাহাবী/তাবেয়ী থেকে বর্ণিত: ২০ দিরহাম (১০ ভাই ২ করে ভাগ করে নিয়েছিল)। অন্য বর্ণনায় ২২ বা ৪০। সঠিক সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ নয়; মূল কথা হলো এটা সস্তা ও উদাসীনতা জাতীয় বিষয়।

এটি মুদ্রা গুনে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা সাথে সম্পর্কিত নয়— অল্প পরিমান বুঝানোর সাথে সম্পর্কিত।

৩. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ইউসুফ (আ.)-এর যুগে রূপার ব্যবহার

- সত্যি মুদ্রিত কয়েন (সরকারি সিলমোহরসহ) প্রায় ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে লিডিয়ায় শুরু। তার আগে hacksilver (রূপার টুকরা, ইনগট, গহনা কেটে ওজন করে) বা মানসম্মত ওজনের রূপা দিয়ে লেনদেন হতো—নিকটপ্রাচ্য, মিশর, কেনান সব জায়গায়।

- প্রাচীন মিশরে: deben এবং shat (šʿt) নামক রূপা/মূল্যের একক ব্যবহার হতো। এগুলো মানসম্মত ওজনের (প্রায় ৭.৬ গ্রাম shat) ফ্ল্যাট রাউন্ড মেটাল পিস হতে পারত, এবং লেনদেনে সংখ্যা উল্লেখ করে গণনা করা হতো (ওজন/পরীক্ষা না করেও)। মিশরবিদ Cerny বলেন, এগুলো “প্রায় কয়েনের মতো”। পুরনো রাজ্যকাল (Old Kingdom) থেকেই প্রমাণ আছে।

- বিক্রি মিশরের ভিতরে নয়, বরং কেনান/প্যালেস্টাইন থেকে মিশরগামী কাফেলার (মিদিয়ান/ইশমায়েলী) হাতে হয়েছিল—যেখানে রূপার টুকরা সাধারণ ছিল।

- বাইবেলেও (আদিপুস্তক ৩৭:২৮) একই ঘটনায় “২০ শেকেল রূপা” বলা হয়েছে। শেকেলও মূলত ওজনের একক ছিল, পরে মুদ্রা। কেউ এটাকে অ্যানাক্রোনিজম বলে না, কারণ বোঝা যায় রূপার ওজন/মূল্য। কুরআন আরব শ্রোতাদের জন্য সমসাময়িক পরিচিত শব্দ “দিরহাম” ব্যবহার করেছে একই অর্থ বোঝাতে।

কুরআনের ভাষারীতি: অতীত ঘটনা বর্ণনায় সমসাময়িক পরিচিত পরিভাষা ব্যবহার করে (যেমন অন্যান্য আয়াতেও)। এটি ভুল নয়, বরং বোধগম্যতা।

৪. তাফসীর ও আলেমদের অবস্থান

- ইবনে কাসীর, তাবারী, কুরতুবী, সা‘দী প্রমুখ: সস্তা মূল্য, অল্প দিরহাম, বিক্রেতাদের উদাসীনতা হিসেবে বুঝেছেন ও আলোচনা করেছেন। শব্দটিকে আক্ষরিক মুদ্রা হিসেবে জোর দেননি।

- আধুনিক গবেষক: Islamic Awareness-এর বিস্তারিত প্রবন্ধ, SeekersGuidance, IslamQA, ড. সামি আমেরি প্রমুখ—সবাই একমত যে এটি ওজন/রূপার একক, মুদ্রিত কয়েনের আবশ্যকতা নেই। প্রাক-ইসলামী আরবে শব্দ পরিচিত, এবং প্রাচীন রূপার লেনদেনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সারকথাঃ

কুরআনে কোনো ঐতিহাসিক ভুল নেই। “দিরহাম” এখানে অল্প কিছু রূপার টুকরা/মূল্য বোঝায়, যা ইউসুফ (আ.)-এর যুগে প্রচলিত ছিল (ওজন বা মানসম্মত পিস আকারে)। “মা‘দূদাহ” অল্প সংখ্যা বোঝায়। এটি বাইবেলের “শেকেল রূপা”-এর সমতুল্য, এবং আরবি ভাষা ও প্রেক্ষাপট অনুসারে একদম স্বাভাবিক। সমালোচকরা শব্দটিকে শুধু পরবর্তী ইসলামী মুদ্রার সাথে গুলিয়ে ফেলেন এবং প্রাচীন অর্থনীতিকে সরলীকরণ করেন।

আরও বিস্তারিত পড়তে পারেন:

আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জা

Back to top button