রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কি ধর্ষককে শাস্তি না দিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন?

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম
সমস্ত প্রশংসা সেই রবের যিনি সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, আইন-কানুনের মানদন্ড আমাদেরকে দান করেছেন। আর দূর্ভোগ তাদের জন্য, যারা তা ছূড়ে ফেলে এবং বিমুখ হয়।
ইসলামবিদ্বেষী মহলে বহু আগ থেকেই ইসলামের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালাতে একটি অভিযোগ প্রচলিত আছে, তা হলো আল্লাহর রাসুল (ﷺ) নাকি ধর্ষককে শাস্তি দেন নি। আবু দাউদ ও তিরমিজির একটি হাদিস দেখিয়ে তারা ইনিয়ে বিনিয়ে বিভিন্ন কুযুক্তির ঝুঁড়ি নিয়ে হাজির হয়ে যায়। প্রথমে আপনারা ধর্ষণ নিয়ে আমাদের ওয়েবসাইটের এই লিখাটি পড়ে আসুন, এখানে ধর্ষণের সাথে সম্পর্কিত সকল বিধি বিধান উল্লেখ করার চেষ্টা করা হয়েছে,
এবার আমরা হাদিসটা দেখে নিই,
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يَحْيَى بْنِ فَارِسٍ، حَدَّثَنَا الْفِّرْيَابِيُّ، حَدَّثَنَا إِسْرَائِيلُ، حَدَّثَنَا سِمَاكُ بْنُ حَرْبٍ، عَنْ عَلْقَمَةَ بْنِ وَائِلٍ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ امْرَأَةً خَرَجَتْ عَلَى عَهْدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تُرِيدُ الصَّلَاةَ، فَتَلَقَّاهَا رَجُلٌ، فَتَجَلَّلَهَا، فَقَضَى حَاجَتَهُ مِنْهَا، فَصَاحَتْ، وَانْطَلَقَ، فَمَرَّ عَلَيْهَا رَجُلٌ، فَقَالَتْ: إِنَّ ذَاكَ فَعَلَ بِي كَذَا وَكَذَا، وَمَرَّتْ عِصَابَةٌ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ، فَقَالَتْ: إِنَّ ذَلِكَ الرَّجُلَ فَعَلَ بِي كَذَا وَكَذَا، فَانْطَلَقُوا، فَأَخَذُوا الرَّجُلَ الَّذِي ظَنَّتْ أَنَّهُ وَقَعَ عَلَيْهَا، فَأَتَوْهَا بِهِ، فَقَالَتْ: نَعَمْ هُوَ هَذَا، فَأَتَوْا بِهِ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَلَمَّا أَمَرَ بِهِ قَامَ صَاحِبُهَا الَّذِي وَقَعَ عَلَيْهَا، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَنَا صَاحِبُهَا، فَقَالَ لَهَا اذْهَبِي فَقَدْ غَفَرَ اللَّهُ لَكِ وَقَالَ لِلرَّجُلِ قَوْلًا حَسَنًا، قَالَ أَبُو دَاوُدَ: يَعْنِي الرَّجُلَ الْمَأْخُوذَ، وَقَالَ لِلرَّجُلِ الَّذِي وَقَعَ عَلَيْهَا: ارْجُمُوهُ، فَقَالَ: لَقَدْ تَابَ تَوْبَةً لَوْ تَابَهَا أَهْلُ الْمَدِينَةِ لَقُبِلَ مِنْهُمْ قَالَ أَبُو دَاوُدَ: رَوَاهُ أَسْبَاطُ بْنُ نَصْرٍ، أَيْضًا عَنْ سِمَاكٍ
حسن دون قوله ارجموه والأرجح أنه لم يرجمআলকামাহ ইবনু ওয়াইল (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। নবী ﷺ-এর যুগে জনৈকা মহিলা সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে এক ব্যক্তি তাকে নাগালে পেয়ে তার উপর চেপে বসে তাকে ধর্ষণ করে। সে চিৎকার দিলে লোকটি সরে পড়ে। এ সময় অপর এক ব্যক্তি তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সে (ভুলবশত) বললো, এ লোকটি আমার সঙ্গে এরূপ এরূপ করেছে। এ সময় মুহাজিরদের একটি দল এ পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। স্ত্রীলোকটি বললো, এ লোকটি অমার সঙ্গে এরূপ করেছে। অতএব যার সম্পর্কে মহিলাটি অভিযোগ করেছে তারা দ্রুত এগিয়ে লোকটিকে ধরলো।
অতঃপর তারা তাকে তার নিকট নিয়ে আসলে সে বললো, হ্যাঁ, এ সেই ব্যক্তি। তারা তাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট উপস্থিত হলেন। তিনি তার সম্পর্কে ফায়সালা করতেই আসল অপরাধী দাঁড়িয়ে বললো, হে আল্লাহ রাসূল! আমিই অপরাধী। তিনি ধর্ষিতা মহিলাটিকে বললেনঃ তুমি চলে যাও, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করেছেন আর নির্দোষ ব্যক্তি সম্পর্কে উত্তম কথা বললেন। যে ধর্ষনের অপরাধী তার ব্যাপারে তিনি বললেনঃ তোমরা একে পাথর মারো। তিনি (ﷺ) বললেনঃ সে এমন তওবা করেছে যে, মদীনাবাসী যদি এরূফ তওবা করে, তবে তাদের পক্ষ থেকে তা অবশ্যই কবূল হবে।
হাসান, এ কথাটি বাদেঃ ’’তোমরা একে পাথর মারো।’’ অগ্রাধিকারযোগ্য কথা হলো, তাকে পাথর মারা হয়নি।[1]আবু দাউদের ৪৩৭৯, তিরমিজি ১৪৫৪
উক্ত হাদিস নিয়ে মুহাদ্দিসিনদের মতানৈক্য লক্ষ্য করা যায়। মতানৈক্য থাকলেও উভয় ক্ষেত্রেই এটি প্রমাণ করা সম্ভব হয়: উক্ত হাদিস দ্বারা এটি প্রমাণ হয় না যে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ধর্ষককে শাস্তি দেন নি।
হাদিস সহিহ নয় (এক দলের মতামত)
একদল হাদিসটিকে যয়িফ সাব্যস্ত করেছেন, তাদের মতে যয়িফ হওয়ার কারণ হলো সিমাক বিন হারবের একা বর্ণনা করেছে, আর এই রাবী আগেও এমন এমন হাদিস সনদ সহ বর্ণনা করেছে যা আর কারো কাছ থেকে খুঁজে পাওয়া যায় না। আরেকটি কারণ হলো উক্ত সনদের মতনে ইজতিরাব রয়েছে, একই রাবীর সনদে আসা সত্ত্বেও ভিন্ন ভিন্ন সনদে মতনের অনেক বেশি অমিল বা গড়মিল পাওয়া যায়। সিমাকের অন্যন্যা হাদিস বর্ণনায়ও ইজতিরাব বা মতনে গড়মিল থাকার অভিযোগ রয়েছে। আবার আলকামার তাঁর পিতার কাছ থেকে শ্রবণ (সামা’) নিয়েও কিছু আলোচনা সমালোচনার কথা উল্লেখ করেছেন কেউ কেউ, যেমন ইবনে হিব্বান (রহ), ইবনে হাজার (রহ), ইয়াহইয়া ইবনু মা’ঈন (রহ)-সহ আরো কিছু মুহাদ্দিসিন বলেছেন তার পিতা থেকে তার হাদিস মুরসাল কারণ সে জন্ম হওয়ার পূর্বেই তার পিতা মৃত্যুবরণ করেছিলেন।[2]আলকামা ইবনু ওয়ায়িল সম্পর্কে বিস্তারিত দেখুন:- https://hadith-web-production.up.railway.app/narrator/4493 [3]সিমাক বিন হারব সম্পর্কে আরো বিস্তারিত দেখুন:- https://hadith.dev/narrator/2644
যার কারণে হাদিসটিকে শুয়াইব আল-আরনাউত (রহ) যয়িফ বলেছেন[4]তাহকিক সুনান আবি-দাউদ ৬/৪৩২, টিকা-১), মুহাম্মাদ নুয়াইম আল-ইরকাসুসি, ইব্রাহিম আয-যাইবাক, মুহাম্মাদ বারাকাত যয়িফ বলেছেন[5]তাহকিক মুসনাদ আহমাদ ৪৫/২১৪, টিকা-৩, ইবনুল কাত্তান আল-ফাসি (রহ) হাদিসটিকে পরিত্যাজ্য বলেছেন।[6]আল-ওয়াহম ওয়াল-ঈহাম, খণ্ড/পৃষ্ঠা: ৪/৫২, সাঈদ আল-কাযী, ইমাম যাহাবী (রহ) হাদিসটি সমালোচনা করে অগ্রহণযোগ্য বিবেচনা করেছেন।[7]আবু উয়াইস আল-কুরদী, সিলসিলাতুল ফাওয়ায়িদিল হাদীসিয়্যাহ ওয়াল ফিকহিয়্যাহ ৫/১২৩
আমরা যদি এই মতটির অনুসরণ করি তাহলে সিমাক বিন হারবের সূত্রে সমস্ত সনদ যয়িফ সাব্যস্ত হয়, এবং আল্লাহর রাসুল (ﷺ) কোন ধর্ষকের হদ রহিত করেছেন বলে আর প্রমাণ থাকে না।
হাদিস হাসান (অপর দলের মতামত)
আরেকদল মুহাদ্দিসিন একে হাসান সাব্যস্ত করেছেন। আলবানী (রহ) হলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি বলেছেন সিমাক বিন হারবের ইকরিমা থেকে বর্ণনাগুলোতে আপত্তি আছে, একই কথা আরো অনেকেই উল্লেখ করেছেন, তবে অন্য কারো থেকে বর্ণনা করলে তাতে সমস্যা নেই। এই সনদে সিমাক ইকরিমা হতে বর্ণনা করেন নি। এছাড়া অধিকাংশ বা জমহুর মুহাদ্দিসের মতে সিমাক একজন নির্ভরযোগ্য, সিকাহ বা সাদুক পর্যায়ের রাবী।[8]মুসনাদ ইবনিল জা’আদ হা/৫৬৬; সিলসিলাতুল আহাদীসিস সাহীহাহ ওয়া শাইউন মিন ফিকহিহা ওয়া ফাওয়ায়িদিহা ২/৫৬৭[9]আরো বিস্তারিত দেখুন:- https://hadith.dev/narrator/2644
আর আলকামার তাঁর পিতার কাছ থেকে শ্রবণ (সামা’) নিয়ে যে আপত্তি সেটি নিয়েও মতভেদ রয়েছে মুহাদ্দিসদের মধ্যে, কারণ কিছু মুহাদ্দিসিনদের মত হলো তাদের মাঝে সামা প্রমাণিত।[10]তুহফাতুল আহওয়াযী, ৪/৩৮২; ইকমালু তাহযীবিল কামাল ৯/২৭৫, আস-সিকাত, ইবনু হিব্বান ৫/২০৯ এই বিষয়ে ইমাম তিরমিজি (রহ)-এর মূল্যায়নকে অনুসরণ করা হয়, তিনি বলেছেন,
আলকামা ইবনু ওয়ায়িল ইবনি হুজর তাঁর পিতার কাছ থেকে শুনেছেন; তিনি আব্দুল জাব্বার ইবনু ওয়ায়িলের চেয়ে বয়সে বড়, আর আব্দুল জাব্বার তাঁর পিতার কাছ থেকে শোনেননি।[11]সুনানুত তিরমিযী ৪/৫৬ হাদিস ১৪৫৪
উক্ত হাদিস থেকে ধর্ষকের শাস্তি দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়
এখন যদি আমরা উক্ত সনদ হাসান হিসেবে গণ্য করি তাহলে হাদিসটি ধর্ষককে শাস্তি দেওয়ার পক্ষে দলিল হিসেবে কাজ করে, বিপক্ষে নয়। এর কারণ হলো উক্ত হাদিসে রজম করার কথা সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এখন অনেকে বলতে পারে তিরমিজি ও আবু দাউদে লিখা হয়েছে,
“হাদিসটি হাসান—‘ارجموه’‘তাকে রজম করো’ অংশটি বাদে। আর অধিক গ্রহণযোগ্য/রাজিহ মত হলো, ওই ব্যক্তিকে রজম করা হয়নি”
এখানে আমাদের বঙ্গীয় সাইট নির্মাতাদের একটু ভুল আছে, তা হলো তারা এটি পরিষ্কার করে নি যে উক্ত মন্তব্যটি হাদিসের সনদগত দিক থেকে অংশ নয়। বরং এই বক্তব্যটি শাইখ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.)-এর মূল্যায়ন (তাহকীক/তখরীজ), এটি সনদেরও অংশ নয় এবং আবু দাউদ কিংবা তিরমিজির বক্তব্যও নয়।
অর্থাৎ আবু দাউদ এবং তিরমিজির সনদে রজম করার অংশটি পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ এই হাদিস থেকে ধর্ষককে রজম করার শাস্তির প্রমাণ পাওয়া যায় যা রাসুলুল্লাহর নিজে আমল করে দেখিয়ে গিয়েছেন।
রজম না করার কথা কোন গ্রহণযোগ্য বর্ণনায় প্রমানিত নয়
কিন্তু আলবানী কেন রজম করার এটিকে সহিহ নয় বলেছেন? এখানেই আসছে মুল আলোচনা। মুসনাদে আহমদে যে সনদ বর্ণিত হয়েছে সেটিকে দলিল হিসেবে মতনে ইজতিরাব দেখিয়েছেন আলবানী (রহ), সেই সনদে এসেছে, ইমাম আহমাদ বলেছেন:
: 27240 – حدثنا محمد بن عبد الله بن الزبير، قال: حدثنا إسرائيل، عن سماك، عن علقمة بن وائل عن أبيه، قال: خرجت امرأة إلى الصلاة، فلقيها رجل، فتجللها بثيابه، فقضى حاجته منها، وذهب، وانتهى إليها رجل، فقالت له: إن الرجل فعل بي كذا وكذا، فذهب الرجل في طلبه، فانتهى إليها قوم من الأنصار، فوقفوا عليها، فقالت لهم: إن رجلا فعل بي كذا وكذا، فذهبوا في طلبه، فجاؤوا بالرجل الذي ذهب في طلب الرجل الذي وقع عليها، فذهبوا به إلى النبي صلى الله عليه وسلم، فقالت: هو هذا، فلما أمر النبي صلى الله عليه وسلم برجمه، قال الذي وقع عليها: يا رسول الله، أنا والله هو، فقال للمرأة: ” اذهبي فقد غفر الله لك ” وقال للرجل قولا حسنا، فقيل: يا نبي الله، ألا ترجمه؟ فقال: ” لقد تاب توبة لو تابها أهل المدينة، لقبل منهم “.
মুহাম্মাদ ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনিয যুবাইর আমাদের বলেছেন, তিনি বলেন, ইসরাঈল আমাদের বলেছেন, সিমাক থেকে, তিনি আলকামা ইবনু ওয়ায়িল থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তাতে রয়েছে:
এক নারী সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল। পথে এক ব্যক্তি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজের কাপড় দিয়ে তাকে আচ্ছাদিত করল, তার সঙ্গে নিজের যৌন চাহিদা পূরণ করল এবং চলে গেল। এরপর আরেক ব্যক্তি সেখানে এসে পৌঁছাল। নারীটি তাকে বলল, “ওই ব্যক্তি আমার সঙ্গে এমন এমন কাজ করেছে।” লোকটি তখন তাকে খুঁজতে বের হলো। এরপরপর আনসারদের একটি দল ওই নারীর কাছে এসে দাঁড়াল। নারীটি তাদের বলল, “এক ব্যক্তি আমার সঙ্গে এমন এমন কাজ করেছে।” তারা তখন সেই ব্যক্তিকে খুঁজতে বের হলো। এরপর তারা সেই লোকটিকে ধরে আনল, যে প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজতে বের হয়েছিল! তারা তাকে নবী ﷺ-এর কাছে নিয়ে গেল। নারীটি বলল, “এই সেই ব্যক্তি।” নবী ﷺ যখন তাকে রজম করার নির্দেশ দিলেন, তখন প্রকৃত অপরাধী বলল, “হে আল্লাহর রাসুল! আমিই সেই ব্যক্তি।” তখন তিনি নারীটিকে বললেন, “তুমি চলে যাও। আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।” তিনি ওই ব্যক্তির সঙ্গে উত্তম কথা বললেন।
তখন তাঁকে বলা হলো, “হে আল্লাহর নবী! আপনি কি তাকে রজম করবেন না?” আল্লাহর রাসুল উত্তর দিলেন, ‘সে এমন তওবা করেছে যে, মদিনাবাসী সবাই যদি এমন তওবা করত, তবে তাদের তওবাও কবুল করা হতো।'[12]মুসনাদে আহমদ ৬/৩৭৯, হাদিস ২৭২৪০
এটিও আলকামা ইবনু ওয়ায়িল থেকে সিমাক বিন হারব বর্ণনা করেছে, এই সনদে পথ হলো:
- সিমাক থেকে ইসরাঈল, ইসরাঈল থেকে যুবাইর [এই সনদে রজম করার কথা নেই, রজম না করার কথাও সুস্পষ্ট ভাবে নেই]
অপর দিকে আবু দাউদ ও তিরমিজির সনদের পথ হচ্ছে:
- সিমাক থেকে ইসরাঈল, ইসরাঈল থেকে ফারইয়াবী [এই সনদে সুস্পষ্ট ভাবে রজম করার কথা উল্লেখ আছে]
এই দুই সনদের বর্ণনাগুলো পরষ্পর বিরোধী বলা সম্ভব নয়, যেহেতু একটিতে রজম করা বা না করা সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই, কিন্তু অপটিতে রজম করার কথা এসেছে। একটিকে অপরটির পূর্ণ সংস্করণ বলা যায়। কারণ যুবাইর[13] محمد بن عبد الله بن الزبير بن عمر بن درهم ও ফারইয়াবী[14] محمد بن يوسف بن واقد بن عثمان দুজনই সিকাহ রাবী। ইমাম শাওকানী পরিষ্কার করে জানিয়েছেন, এতে এমন কথা নেই যে, তিনি তাকে রজম করতে অস্বীকার করেছেন; আর এটি রজমের নির্দেশের পরিপন্থী।[15]কিতাবুল ফাতহির রব্বানী মিন ফাতাওয়াল ইমামিশ শাওকানী, ৪/২০৩৭
যুবাইরের সনদে কিন্তু সুস্পষ্ট করে কোথাও বলা নেই সেই ধর্ষককে শাস্তি দেওয়া হয় নি। কিন্তু তারপরও আলবানী (রহ) ধরে নিয়েছিলেন তাকে রজম করা হয় নি, তিনি এর পক্ষে আরো দলিল পেশ করেছেন অবশ্যই, সেগুলোর বিষয়ে একটু পড়ে আসছি। এর আগে অন্য একটি ঘটনা উল্লেখ করা প্রয়োজন।
সহিহ মুসলিমের হাদিস, মা’ইয ইবনে মালিক আসলামী (রা) এসে নিজের ব্যবিচারের স্বীকারোক্তি দিলেন, উনাকে ৩ বার ফেরত পাঠানোর পর তিনি পুনরায় আসলে সকল কিছু শুনে প্রমান নিশ্চিত হলে আল্লাহর রাসুল উনাকে রজমের শাস্তি দেন। উনার পর পর আরেন নারী আসে যিনি গর্ভবতী ছিলেন, তিনাকেও ফেরত পাঠানো হয়, ৩য় বারে বলা হয় সন্তান জন্ম হওয়ার পর যেতে, তারপর বলা হয় সন্তানকে দুধ পান করানো শেষ হলে তারপর যেতে৷ এর পর তিনি রাসুলের নিকট পুনরায় গেলে আল্লাহর রাসুল শাস্তির ব্যবস্থা করেন এবং খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা)-কে বললেন (তিনি সেই নারীকে কটু কথা বলছিলেন),
“সাবধান! হে খালিদ! সেই মহান আল্লাহর শপথ, যার হাতে আমার জীবন, জেনে রেখো! নিশ্চয়ই সে এমন তাওবা করেছে, যদি কোন জুলুমবাজ (চাঁদাবাজ) ব্যক্তিও এমন তাওবা করতো তবে তারও ক্ষমা হয়ে যেতো।”
ভিন্ন সনদে এসেছে উমর (রা) এর প্রশ্নের জবাবে বললেন,“নিশ্চয়ই সে এমনভাবে তাওবা করেছে, যদি তা মদীনার সত্তরজন লোকের মধ্যে বণ্টিত হতো, তবে তাদের জন্য তাই যথেষ্ট হতো।”[16]সহিহ মুসলিম, আন্তর্জাতিক, হাদিস ১৬৯৫-২, ১৬৯৬-১
এই ঘটনায় সেই নারী ব্যবিচার করেছিল, আল্লাহর রাসুল প্রথমে শাস্তি দিতে না চাইলেও তার স্বীকারোক্তি ও তার সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া নিশ্চিত হওয়ার কারণে শাস্তির ব্যবস্থা করেন। অথচ এটা ব্যবিচার, তার ব্যক্তিগত অপরাধ, অন্যের ক্ষতি করা হয় নি এখানে, এমনকি সে নারী এতটাই অনুতপ্ত ছিল যে নিজ থেকে বার বার ফিরে এসেছে রাসুলের কাছে, আল্লাহর রাসুল তার তওবার এমন প্রশংসা করার পরও এটা বলেন নি যে, ‘তুমি চলে যাও আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, তোমার উপর হদ মাফ করা হয়েছে!’ অথচ যেই লোক দিনে দুপুরে ধর্ষণের মত কাজ করেছে তাকে শুধু তওবার কারণে এমনিতেই আল্লাহর রাসুল ছেড়ে দিবেন!
আরেকটি বিষয় হলো মুসনাদে আহমদে যেমন সেই লোকের তওবার প্রসংসা এসেছে, সহিহ মুসলিমের এই হাদিসেও তার চাইতে বেশি গুরুত্বের সহিত নারীটির তওবার প্রসংশা এসেছে, এমনকি আমরা এই হাদিসে নারীটির ডেস্পারেটভাবে অনুতপ্ত হওয়ার দৃশ্য লক্ষ করতে পারি। কিন্তু এখানে আল্লাহর রাসুল তার হদ কায়েম করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন নি, বরং হদ আরোপ করে তার জানাজা পড়েছেন এবং তার তওবার মহত্ত্বের, সম্মানের, মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছেন। এতে বুঝা যায় তওবার কথা থাকলেই হদ আরোপ করেন নি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বাস্তবসম্মত কোন কাজ নয়। তাই বলা যায় খুব আশ্চার্যজনক এক মতবাদের দিকে ঝুঁকেছিলেন শায়েখ।
এই একই বিষয়টি শুয়াইব আরনাউত (রহ)-ও উল্লেখ করেছেন,
وقد أورده البيهقي من هذا الوجه الثاني الذي فيه أنه -صلَّى الله عليه وسلم- لم يرجمه ثم قال: وقد وُجد مثل اعترافه من ماعز والجهنية والغامدية، ولم يسقط حدودهم، وأحاديثهم أكثر وأشهر، والله أعلم.
বাইহাকী এই দ্বিতীয় সূত্রটি উল্লেখ করেছেন, যাতে আছে যে তিনি ﷺ তাকে রজম করেননি। এরপর বলেছেন: মাইয, জুহানিয়্যা ও গামিদিয়্যার স্বীকারোক্তির মতো স্বীকারোক্তিও পাওয়া গেছে, অথচ তাদের হদ রহিত হয়নি; আর তাদের হাদীসগুলো সংখ্যায় বেশি ও অধিক প্রসিদ্ধ। আল্লাহই ভালো জানেন।[17]সুনানু আবী দাঊদ – তাহকীক: আল-আরনাঊত ৬/৪৩২
ইমাম শাওকানী (রহ) ইবনুল কায়্যিম (রহ) এর দলিলের খন্ডণ করতে গিয়ে ঠিক এই একই রকম কথা বলেছেন,
فنقول: إذا كانت رواية النسائي كما ساقها في كلامه من أنه – صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ – أبى أن يقيم على الرجل الحد، فلا شك أنه مشكل وإن لم يقع منه – صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ – بعد قول عمر إلا قوله: “لقد تاب توبة” .. إلخ، فليس فيه دلالة على أنه أسقط الحد، ولا يلزم من هذه العبارة عدم إقامة الحد، فإنه – صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ – قد قال مثلها لماعز (٢)، وفي رواية (١) أنه قالها للمرأة الجهنية، وفي رواية (٢) أنه قال لماعز: “والذي نفسي بيده إنه الآن لفي أنهار الجنة ينغمس فيها”
অতএব আমরা বলি: নাসায়ীর বর্ণনা যদি তেমনই হয় যেমন তিনি (ইবনুল কাইয়িম) তাঁর বক্তব্যে এনেছেন, অর্থাৎ নবী ﷺ লোকটির ওপর হদ্দ কার্যকর করতে অস্বীকার করেছেন, তাহলে নিঃসন্দেহে তা (হাদিসটি) সমস্যাজনক। তবে উমরের (রা.) কথার পর যদি তাঁর পক্ষ থেকে শুধু এটুকুই এসে থাকে: “সে তো তাওবা করেছে …” ইত্যাদি, তাহলে এতে হদ্দ রহিত করার কোনো দলীল নেই। আর এই বাক্য থেকে হদ্দ কার্যকর না করা আবশ্যকও হয় না, কারণ তিনি ﷺ মা’ইযকেও (২) অনুরূপ কথা বলেছেন, আর এক বর্ণনায় (১) আছে যে, তিনি জুহাইনা গোত্রের নারীকেও এ কথা বলেছিলেন, এবং অন্য এক বর্ণনায় (২) আছে, তিনি মা’ইযকে বলেছিলেন: “সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! সে এখন জান্নাতের নহরসমূহে ডুব দিচ্ছে।”[18]কিতাবুল ফাতহির রব্বানী মিন ফাতাওয়াল ইমামিশ শাওকানী, ৪/২০৩৬-২০৩৭
আল্লাহর রাসুল ﷺ মা’ইয ইবনে মালিক আসলামী ও অন্য সাহাবী যারা গুনাহে লিপ্ত হয়েছিল তাদের বিষয়ে কেন হদ আরোপ না করার জন্য বিভিন্ন প্রশ্ন করছিলেন, বা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, বলছিলেন তুমি হয়তো জিনা করো নি? কারণ যে ব্যক্তি গুনাহে লিপ্ত হয়ে তাওবা করেছে, তার জন্য নিজের ওপর হদ (নির্ধারিত শাস্তি) কার্যকর করানোর চেষ্টা করা জরুরি নয়। বরং তার জন্য অধিক উত্তম হলো নিজের গুনাহ গোপন রাখা, তাওবা করা, বিষয়টি নিজের ও তার রবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা এবং বেশি বেশি সৎকর্ম করা। যে অনুতপ্ত হয় ও নিজের গুনাহ গোপন রাখে তার গুনাহ-ও আল্লাহ গোপন রাখে। যেমন নবী ﷺ বলেছেন:
“তোমরা এসব নোংরা কাজ থেকে বিরত থাকো, যা মহিমান্বিত ও মহান আল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন। যে ব্যক্তি এগুলোর কোনোটিতে লিপ্ত হয়ে পড়ে, সে যেন আল্লাহর (দেওয়া) আবরণে নিজেকে ঢেকে রাখে।”[19]হাদীসটি বাইহাকী বর্ণনা করেছেন এবং আলবানী আস-সিলসিলাতুস সহীহাহ-তে (নং ৬৬৩) সহীহ বলেছেন।
অন্য এক হাদিসে এসেছে, উবাদা ইবনুস সামিত (রা.) বলেন:
আমরা নবী ﷺ-এর সাথে ছিলাম, তিনি বললেন: “তোমরা কি আমার কাছে এই মর্মে বাইআত করবে যে, আল্লাহর সাথে কিছু শরীক করবে না, যিনা করবে না এবং চুরি করবে না?”—আর তিনি সূরা আন-নিসার আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন—“তোমাদের মধ্যে যে এটি পূর্ণ করবে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে। আর যে এগুলোর কোনো একটি করে ফেলবে এবং এর জন্য শাস্তি পাবে, তা তার জন্য কাফফারা হয়ে যাবে। আর যে এগুলোর কোনো একটি করে ফেলবে এবং আল্লাহ তা (তার গুনাহ) গোপন রাখবেন, তবে বিষয়টি আল্লাহর ইচ্ছাধীন—তিনি চাইলে তাকে শাস্তি দেবেন, আর চাইলে ক্ষমা করবেন।”[20]বুখারী হাদিস ৪৮৯৪
কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায় আল্লাহর রাসুল বলেছেন উনার কাছে আগার আগে নিজেদের মাঝে আপোষ করে গোপন রাখতে, কারণ উনার নিকট পৌঁছাতে শাস্তি বাস্তবায়ন হবেই।[21]আবু দাউদ হাদিস ৪৩৭৬, আলবানী সহিহ বলেছেন, আরনাউত বলেছেন সহিহ লিগাইরিহি কিন্তু আল্লাহর রাসুল ﷺ তারপরও বলেন নি তওবা করলে হদের শাস্তি মাফ হয়ে যায়, স্থায়ী ফতোয়া কমিটির আলিমগণ বলেছেন:
হদযোগ্য কোনো গুনাহের সংবাদ যদি বিচারকের কাছে পৌঁছে যায় এবং যথেষ্ট প্রমাণে তা প্রমাণিত হয়, তবে হদ কার্যকর করা ওয়াজিব, আর আলিমদের ইজমা অনুযায়ী তাওবা করলেও সেই শাস্তি রহিত হয় না। গামিদিয়্যা নারী তাওবা করার পর নবী ﷺ-এর কাছে এসে তাঁর ওপর হদ কার্যকর করতে বলেছিলেন, আর তিনি তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন: “সে এমন তাওবা করেছে যে, মদিনাবাসী যদি তেমন তাওবা করত, তবে তা তাদের জন্য যথেষ্ট হতো।” তবুও তিনি তাঁর ওপর নির্ধারিত হদ কার্যকর করেছিলেন, আর এটি শাসক (কর্তৃত্বশীল ব্যক্তি) ছাড়া অন্য কারও কাজ নয়।
কিন্তু শাস্তিযোগ্য গুনাহের সংবাদ যদি শাসকের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে মুসলিম ব্যক্তি আল্লাহর আবরণে নিজেকে ঢেকে রাখবে এবং আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তাওবা করবে, এই আশায় যে আল্লাহ তা তার কাছ থেকে কবুল করবেন।[22]ফাতাওয়া আল-লাজনাতিদ দাইমাহ (২২/১৫) থেকে।
ইবনুল কাইয়্যিম মুলত এই মতামত উপস্থাপন করেছিলেন যে তওবার কারণে হদ রহিত হয়। কিন্তু এটি মুসলিম উম্মাহর ইজমা বিরোধী একটি মতামত, চুরির হদ নিয়ে ওলামাদের মাঝে মতভেদ হয়েছে, কিন্তু অন্য বিষয়ে সকলেই একমত বিচারকের কাছে মামলা পৌঁছালে এবং অপরাধ সাব্যস্ত হলে শাস্তি রহিত হবে না। ইমাম শাওকানী (রহ) বিস্তারিত দলিলাদি উপস্থাপন পুর্বক ইবনুল কাইয়্যিম (রহ) এর এই মতের খন্ডন করেছেন।
রজম না করার যয়িফ সনদ
এরপর শেখ আলবানী (রহ) নিজের মতের পক্ষে আরো দলিল পেশ করতে গিয়ে সিলসিলাতুল আহাদীসিস সাহীহাহ এর ৯০০ নং হাদিসে বলেছেন,
“ইবনুয যুবাইরি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, নিজের অপরাধ স্বীকারকারী ব্যক্তির ওপর হদ কার্যকর করা হয়নি। আর এটাই সঠিক।”
কিন্তু আমরা একটু আগেই দেখিয়েছি ইবনুয যুবাইরির হাদিসে রজম না করার কথা সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই। কিন্তু তারপরও শেখ আলবানী রজম করে নি এটাকেই সঠিক হিসেবে ধরে নিয়েছেন। এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে শায়েখ আসবাত ইবনু নাসর নামক এক বিতর্কিত রাবীর হাদিস বর্ণনা করেছেন। ইবনু নাসর থেকে, তিনি সিমাক থেকে, তিনি আলকামা ইবনু ওয়ায়িল ইবনি হুজরের সূত্রে (বাকি সনদ পূর্বের ন্যায়) বর্ণনায় রয়েছে:
“ভোরের অন্ধকারে এক নারী মসজিদের দিকে যাচ্ছিলেন, এমন সময় এক পুরুষ তাঁর সাথে সহবাস করল। তিনি পাশ দিয়ে যাওয়া এক লোকের কাছে সাহায্য চাইলেন, আর অপরাধী পালিয়ে গেল। এরপর একদল লোক সেখান দিয়ে যাচ্ছিল, তিনি তাদের কাছেও সাহায্য চাইলেন। যার কাছে তিনি সাহায্য চেয়েছিলেন, তাকে তারা ধরে ফেলল, আর অন্যজন তাদের আগেই সরে পড়ল। তারা তাকে টেনে নিয়ে নারীটির কাছে এল। সে বলল: ‘আমিই তো তোমাকে সাহায্য করেছি, আর অন্যজন চলে গেছে।’ এরপর তারা তাকে আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে নিয়ে এল। নারীটি জানালেন যে সে তাঁর সাথে সহবাস করেছে, আর লোকগুলো জানাল যে তারা তাকে দৌড়ে পালাতে অবস্থায় ধরেছে। সে বলল: ‘আমি তো তাঁকে তাঁর সঙ্গীর হাত থেকে বাঁচাতে সাহায্য করেছিলাম, তখন এরা আমাকে ধরে ফেলল।’ নারীটি বললেন: ‘সে মিথ্যা বলছে, সে-ই আমার সাথে করেছে।’ আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন: ‘একে নিয়ে যাও এবং রজম করো।’ বর্ণনাকারী বলেন: তখন লোকদের মধ্য থেকে একজন দাঁড়িয়ে বলল: ‘একে রজম করবেন না, আমাকে রজম করুন; আমিই কাজটি করেছি।’ সে স্বীকারোক্তি দিল। এভাবে আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে তিনজন একত্র হলো: যে সহবাস করেছিল, যে নারীটির ডাকে সাড়া দিয়েছিল এবং নারীটি। তিনি বললেন: ‘আর তুমি, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।’ আর যে ডাকে সাড়া দিয়েছিল তাকে ভালো কথা বললেন। উমর (রা.) বললেন: ‘যিনার স্বীকারোক্তিদাতাকে রজম করুন।’ আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন: ‘না, কেননা সে আল্লাহর কাছে তাওবা করেছে—আমার ধারণা তিনি বলেছিলেন—এমন তাওবা, মদিনাবাসী অথবা ইয়াসরিববাসী যদি তেমন তাওবা করত, তাহলে তাদের কাছ থেকেও তা কবুল করা হতো।’ অতঃপর তিনি তাদেরকে ছেড়ে দিলেন।”[23]এটি বায়হাকি বর্ণনা করেছেন, সিলসিলাতুল আহাদীসিস সাহীহাহ ২/৫৬৮; ইবনে হাযম বর্ণনা করেছেন, আল-মুহাল্লা বিল-আসার ১২/১৫; ইমাম নাসাঈ বর্ণনা করেছেন, আস-সুনানুল কুবরা, নাসাঈ – তাহকীক: আর-রিসালাহ ৬/৪৭৪
এটা বাইহাকি বর্ণনা করছেন। আলবানী (রহ) এই বর্ণনা উল্লেখ করার পর এটাও বলেছেন যে,
“আসবাত ইবনু নাসরের স্মৃতিশক্তি নিয়ে সমালোচনা আছে, ইমাম বুখারি তাঁকে ‘সাদুক’—সত্যবাদী—বলেছেন। অন্য কিছু মুহাদ্দিস তাঁকে দুর্বল বলেছেন।”
অথচ তারপরও তিনি ফারইয়াবীর মত সিকাহ রাবীর বিপরীতে আসবাত ইবনু নাসরের মত একজন যয়িফ রাবীর দূর্বল বর্ণনাকে তারজিহ দিয়ে শাওয়াহিদ ও মুতাবাআত (সমর্থক বর্ণনা) হিসেবে কোন কারণে গ্রহণ করেছেন তা আমাদের জানা নেই।
আসবাত ইবনু নাসর সম্পর্কে বেশি ভাগ মুহাদ্দিসই নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন,[24] https://shamela.ws/narrator/545 যেমন ইবনে হাজার তার বিষয়ে বলেন,
صدوق كثير الخطأ يغرب
“তিনি সত্যবাদী, তবে বহু ভুল করেন এবং অদ্ভুত হাদীস বর্ণনা করেন।”
আবু হাতিম বলেছেন:
وقال أبو حاتم: سمعت أبا نعيم يضعفه. وقال: أحاديثه عامته سقط مقلوبة الأسانيد
আমি আবু নুআইমকে আসবাত ইবনু নাসরকে দুর্বল বলতে শুনেছি। তিনি বলেছেন: তাঁর অধিকাংশ হাদীস নিম্নমানের (সাকিত), যার সনদগুলো উল্টানো (মাকলূবুল আসানীদ)।
নাসাঈ বলেছেন:
তিনি শক্তিশালী নন।
ইবনু মা’ঈন বলেছেন:
ليس بشيء. وقال مرة: ثقة
তিনি কিছুই নন (লাইসা বিশাইইন)। আরেকবার বলেছেন: সিকাহ।
আহমাদ তাঁর সম্পর্কে দ্বিধা প্রকাশ করেছেন। আবু যুরআ মুসলিমের উপর দোষারোপ করেছেন তার হাদীস বের করার জন্য। সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হলো সিমাক থেকে তার বর্ণনা করা সম্পর্কে সাজী দু’আফা-তে বলেছেন:
روى أحاديث لا يتابع عليها عن سماك بن حرب
তিনি (আসবাত ইবনু নাসর) সিমাক ইবনু হারব থেকে এমন কিছু হাদীস বর্ণনা করেছেন, যেগুলোতে তাঁর মুতাবাআত (সমর্থক বর্ণনা) নেই।
আব্দুল্লাহ ইবনুল ইমাম আহমাদ উল্লেখ করেছেন ইমাম আহমদ তাঁর হাদীস থেকে কারও কাছ থেকে কিছু লিখেননি। আব্দুল্লাহ ইবনুল ইমাম আহমাদ বলেন তিনার ধারণা উনার পিতা হয়তো এই রাবীকে চিনতেন না। ইমাম আবু হাতিমও তাকে মাজহূল বলেছেন। ইবনু হিব্বান বলেছেন: তিনি সিকাহদের বিরোধিতা করতেন এবং শু’বা থেকে এমন কিছু বর্ণনা করতেন, যেন তিনি আরেক শু’বা।[25]তাহযীবুত তাহযীব – দুবাই সংস্করণ ১/৫৬০–৫৬৪
এটাও সত্য যে এই রাবীকে অনেকে সিকাহ বা সাদুকও বলেছেন যেমনটা ইবনে হাজার তার তাহযীবুত তাহযীব এ দেখিয়েছেন। তবে তার জারাহ বা সমালোচনাগুলো হতে এটি স্পষ্ট হয় যে সে একজন বিতর্কিত রাবী, সিকাহ রাবীদের বিপরীতে হাদিস বর্ণনা করতো এবং সিমাক ইবনু হারব হতে এমন হাদিস বর্ণনা করতো যার কোন সমর্থক বর্ণনা কেউ করে নি। সেহেতু আসবাত ইবনু নাসরের এই সনদটি যয়িফ হিসেবেই সাব্যস্ত হবে।
আরো একটি সমস্যা এখানে লক্ষণীয়, এই রাবীর উক্ত বর্ণনায় এমন নতুন বিষয়ও দেখা যায় যা অন্য বর্ণনাগুলোতে অনুপস্থিত, যেমন আমরা আবু দাউদের হাদিসের সাথে তুলনা করলে মতনে ৮ টি পার্থক্য লক্ষ্য করি, আর মুসনাদে আহমেদের সাথে তুলনা করলে ১০টি পার্থক্য লক্ষ্য করি।
ইমাম শাওকানী নিজের কিতাবে আল্লাহর হদ্দসমূহের একটি হদ্দের ব্যাপারে সুপারিশ করার কারণে সাহাবীর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ, এবং মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করত, তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম বলার দ্বারা সেটার বিরোধিতা করা এবং ‘উত্তম গুণাবলীর অধিকারী লোকদের পদস্খলন (ছোটখাট ত্রুটি) এড়িয়ে চলা, হদ্দের অপরাধ ব্যতীত’ এই নসিহত উল্লেখ করে দেখিয়েছেন আসবাত ইবনু নাসরের উক্ত হাদিসটি সহিহ হাদিস বিরোধী একটি বর্ণনা।[26]কিতাবুল ফাতহির রব্বানী মিন ফাতাওয়াল ইমামিশ শাওকানী, ৪/২০৩৮-২০৩৯
এত কিছুর পরও আলবানী (রহ) তার বর্ণনাকে একটি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে বলেন,
ইমাম মুসলিম তাঁর দ্বারা দলিল গ্রহণ করেছেন।… সমর্থনকারী ও অনুসরণকারী বর্ণনা হিসেবে তাঁর বর্ণনা গ্রহণযোগ্য। সুতরাং তাঁর বর্ণনা সামাক থেকে আল-ফিরইয়াবির বর্ণনার তুলনায় ইবনুয যুবাইরির বর্ণনাকে প্রাধান্য দেয়। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।”
তিনি সহিহ সনদে আবু দাউদের গ্রহণযোগ্য রাবীগণ হতে বর্ণিত বর্ণনার বিষয়ে বলেন,
“ফিরইয়াবী ব্যতীত অন্য যেসব রাবী সিমাকের সূত্রে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন, তাঁরা “ارجموه” শব্দটি উল্লেখ করেননি। এটি ইঙ্গিত করে যে শব্দটি সম্ভবত ফিরইয়াবীর বর্ণনায় অতিরিক্ত প্রবিষ্ট হয়েছে বা তিনি একাকী এই শব্দটি বর্ণনা করেছেন।”
তিনি এখানে বিতর্কিত রাবীর বর্ণনাকে দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন সিকাহ রাবীর বর্ণনার বিপরীতে এবং রজম করার কথা বাদ দিয়ে রজম না করার মতকে তারজিহ দিয়েছেন, যেখানে মুসনাদে আহমদের হাদিসেও রজম করা হয় নি তা সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ নেই।
আলবানী (রহ) নিজেই আবু দাউদ ও তিরমিজির সনদকে সহিহ বলেছেন, আহমদের সনদকে সহিহ বলেছেন। আবু দাউদ এই হাদিসের ব্যাপারে সরাসরি কোনো জারাহ বা হুকুম উচ্চারণ করেননি; বরং তিনি তাঁর পরিচিত নীতি অনুযায়ী চুপ থেকেছেন। তাঁর রিসালায় আহলে মক্কাকে লেখা চিঠিতে তিনি বলেছেন: আমি যে হাদিসে চুপ থাকি তা গ্রহণযোগ্য (صالح)।[27] শর্তসাপেক্ষে বিবেচনাপূর্বক رسالة أبي داود إلى أهل مكة في وصف سننه ص (27) – https://majles.alukah.net/showthread.php?t=85343 তিরমিজি নিজের বর্ণনাকে হাসান গরীব সহীহ বলেছেন। যুবায়ের আলী যাঈ মিশকাতে হাদিসটিকে হাসান বলেছেন। বাশার আওয়াদ মারুফ ও আহমেদ শাকের তিরমিজির হাদিসকে হাসান বলেছেন।
অথচ এর বিপরীতে তিনি একজন বিতর্কিত রাবীর বর্ণনা দলিল হিসেবে পেশ করেন, শেখ আলবানী (রহ) কেন তার মত রাবীর বর্ণনাকে শাহেদ হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছেন এবং ফিরইয়াবীর মতো সিকাহ রাবীর বর্ণনার উপর প্রাদান্য দিয়েছেন তা আমাদের নিকট বোধগম্য নয়।
সারমর্ম
আমাদের আলোচনার সারসংক্ষেপ হলো আলোচ্য হাদীসটি সনদের দিক থেকে দুর্বল হোক বা হাসান, কোনো অবস্থাতেই এর দ্বারা প্রমাণ হয় না যে রাসূল ﷺ ধর্ষককে শাস্তি দেননি। হাদীসটি দুর্বল হলে অভিযোগের ভিত্তিই থাকে না। আর হাসান হলে আবু দাঊদ ও তিরমিযীর সনদে স্পষ্টভাবে “তাকে রজম করো” কথাটি আছে। “রজম হয়নি” মতটি আলবানীর নিজস্ব তারজীহ, যেটিকে তিনি আসবাত ইবনু নাসরের মতো বিতর্কিত বর্ণনাকারীর সূত্র ধরে জোরদার করার চেষ্টা করেছেন। এছাড়া মাইয ও গামিদিয়্যার ঘটনা প্রমাণ করে যে কেবল তাওবার প্রশংসা থাকলেই হদ রহিত হয় না, নাহি বিচারণের নিকট উপস্থিত হওয়ার পর তওবার কারণে হদ রহিত হয়।
মুলত শেখ আলবানী (রহ) ইবনুল কায়্যিম (রহ) এর মতের দিকে ঝুঁকেছিলেন, তাদের মতামত হলো তাওবা করলে হদ্দ মাফ হয়ে যায়। কিন্তু এই মতটি সঠিক নয়, উনাদের মতের পক্ষে যে দলিলাদিগুলো উপস্থাপন করেন তা আমরা সংক্ষিপ্ত আকারে উপরে আলোচনা করেছি। আরো বিস্তারিত কারো জানার ইচ্ছে থাকলে ইমাম শাওকানি (রহ) এর আলোচনা আছে এই মতামতের বিপরীতে সেটি দেখতে পারেন। তিনি এই মতকে খন্ডন করে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন নিজের কিতাবে।[28]كتاب الفتح الرباني من فتاوى الإمام الشوكاني এর ৪র্থ খন্ডে – https://shamela.ws/book/36543/1675#p1
Footnotes
| ⇧1 | আবু দাউদের ৪৩৭৯, তিরমিজি ১৪৫৪ |
|---|---|
| ⇧2 | আলকামা ইবনু ওয়ায়িল সম্পর্কে বিস্তারিত দেখুন:- https://hadith-web-production.up.railway.app/narrator/4493 |
| ⇧3 | সিমাক বিন হারব সম্পর্কে আরো বিস্তারিত দেখুন:- https://hadith.dev/narrator/2644 |
| ⇧4 | তাহকিক সুনান আবি-দাউদ ৬/৪৩২, টিকা-১ |
| ⇧5 | তাহকিক মুসনাদ আহমাদ ৪৫/২১৪, টিকা-৩ |
| ⇧6 | আল-ওয়াহম ওয়াল-ঈহাম, খণ্ড/পৃষ্ঠা: ৪/৫২ |
| ⇧7 | আবু উয়াইস আল-কুরদী, সিলসিলাতুল ফাওয়ায়িদিল হাদীসিয়্যাহ ওয়াল ফিকহিয়্যাহ ৫/১২৩ |
| ⇧8 | মুসনাদ ইবনিল জা’আদ হা/৫৬৬; সিলসিলাতুল আহাদীসিস সাহীহাহ ওয়া শাইউন মিন ফিকহিহা ওয়া ফাওয়ায়িদিহা ২/৫৬৭ |
| ⇧9 | আরো বিস্তারিত দেখুন:- https://hadith.dev/narrator/2644 |
| ⇧10 | তুহফাতুল আহওয়াযী, ৪/৩৮২; ইকমালু তাহযীবিল কামাল ৯/২৭৫, আস-সিকাত, ইবনু হিব্বান ৫/২০৯ |
| ⇧11 | সুনানুত তিরমিযী ৪/৫৬ হাদিস ১৪৫৪ |
| ⇧12 | মুসনাদে আহমদ ৬/৩৭৯, হাদিস ২৭২৪০ |
| ⇧13 | محمد بن عبد الله بن الزبير بن عمر بن درهم |
| ⇧14 | محمد بن يوسف بن واقد بن عثمان |
| ⇧15 | কিতাবুল ফাতহির রব্বানী মিন ফাতাওয়াল ইমামিশ শাওকানী, ৪/২০৩৭ |
| ⇧16 | সহিহ মুসলিম, আন্তর্জাতিক, হাদিস ১৬৯৫-২, ১৬৯৬-১ |
| ⇧17 | সুনানু আবী দাঊদ – তাহকীক: আল-আরনাঊত ৬/৪৩২ |
| ⇧18 | কিতাবুল ফাতহির রব্বানী মিন ফাতাওয়াল ইমামিশ শাওকানী, ৪/২০৩৬-২০৩৭ |
| ⇧19 | হাদীসটি বাইহাকী বর্ণনা করেছেন এবং আলবানী আস-সিলসিলাতুস সহীহাহ-তে (নং ৬৬৩) সহীহ বলেছেন। |
| ⇧20 | বুখারী হাদিস ৪৮৯৪ |
| ⇧21 | আবু দাউদ হাদিস ৪৩৭৬, আলবানী সহিহ বলেছেন, আরনাউত বলেছেন সহিহ লিগাইরিহি |
| ⇧22 | ফাতাওয়া আল-লাজনাতিদ দাইমাহ (২২/১৫) থেকে। |
| ⇧23 | এটি বায়হাকি বর্ণনা করেছেন, সিলসিলাতুল আহাদীসিস সাহীহাহ ২/৫৬৮; ইবনে হাযম বর্ণনা করেছেন, আল-মুহাল্লা বিল-আসার ১২/১৫; ইমাম নাসাঈ বর্ণনা করেছেন, আস-সুনানুল কুবরা, নাসাঈ – তাহকীক: আর-রিসালাহ ৬/৪৭৪ |
| ⇧24 | https://shamela.ws/narrator/545 |
| ⇧25 | তাহযীবুত তাহযীব – দুবাই সংস্করণ ১/৫৬০–৫৬৪ |
| ⇧26 | কিতাবুল ফাতহির রব্বানী মিন ফাতাওয়াল ইমামিশ শাওকানী, ৪/২০৩৮-২০৩৯ |
| ⇧27 | শর্তসাপেক্ষে বিবেচনাপূর্বক رسالة أبي داود إلى أهل مكة في وصف سننه ص (27) – https://majles.alukah.net/showthread.php?t=85343 |
| ⇧28 | كتاب الفتح الرباني من فتاوى الإمام الشوكاني এর ৪র্থ খন্ডে – https://shamela.ws/book/36543/1675#p1 |




