আজারবাইজানের হিজাব ও সেক্যুলার দ্বিচারিতা

সম্প্রতি আজারবাইজানের সরকারি স্কুলগুলোতে একটি নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে। স্কুলে ঢুকতে গেলে মেয়েদেরকে হিজাব খুলে ঢুকতে হবে। স্কুলগেট থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে হিজাব পরিহিতা অনেক ছাত্রীকে। এমনকি শিক্ষিকাদের পোশাকের ওপরেও চাপানো হয়েছে খানিকটা একই নিয়ম। নারীর হিজাব আর শিক্ষার অধিকারের মাঝে দরজা এলো কীভাবে? শিক্ষার অধিকার পেতে হলে কি তবে কোনো শিক্ষার্থীকে তার ধর্মীয় পরিচয় সম্পূর্ণ অদৃশ্য করে আসতে হবে?
সেক্যুলারিজম কিংবা জনশৃঙ্খলার নামে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর কারণে আজ কিশোরীরা স্কুলের গেটে থমকে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন হলো, কেন বারবার মুসলিম নারীদের পোশাকই আধুনিকতা, স্বাধীনতা এবং সামাজিক অগ্রগতির কষ্টিপাথর হয়ে দাঁড়ায়? হিজাব পরলেই সব জায়গায় সেটাকে অনগ্রসরতা হিসেবে দেখা হয়। আর কোনো দেশে নারীবাদী আন্দোলনের সময় যখন কোনো নারী হিজাব খুলে ফেলে অথবা ছিঁড়ে ফেলে সেটাকে দেখা হয় প্রগতিশীলতার প্রতীক হিসেবে।
দেখুন, হিজাব বা স্কার্ফ হলো আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, নিজস্ব সাংস্কৃতিক শেকড়ের টান কিংবা নারীর একান্তই ব্যক্তিগত পরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ। এই অধিকারকে হরহামেশাই ‘তাঁদেরকে ধর্মীয় চাপ থেকে মুক্ত করা হচ্ছে’ বলে কেড়ে নেওয়া হয়। এখানেই আসে মূল সংঘাত। হিজাব যে ঐ কিশোরীদের কাছে ধর্মীয় চাপ, সেটা কে নির্ধারণ করলো? আর এই কথিত চাপ থেকে মুক্তি দেওয়ার দায়িত্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোন অধিকার বলে পেলো?
যে নিয়ম একজন শিশুকে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তা মূল শিক্ষার শর্তাবলী নিয়েই প্রশ্ন তোলে। কিন্তু এই প্রশ্ন ক’জন করতে পারেন? নীতি নির্ধারক থেকে শুরু করে, সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী—বিতর্কের টেবিলে কথা বলার মানুষের অভাব নেই। কিন্তু যে মেয়েগুলোর শিক্ষা নিয়ে, হিজাব নিয়ে এই টানাটানি, কখনো কি তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে—তারা কী চায়?
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী, শিশুদের প্রভাবিত করে এমন সব বিষয়ে তাদের নিজস্ব মতামত প্রকাশের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। একই সাথে মুক্ত চিন্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং শিক্ষা লাভের অধিকারও এর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু দ্বিচারিতার ব্যাপার হলো, এই বিষয়টা ট্রান্সজেন্ডার শিশুর ক্ষেত্রে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, একজন প্রাক্টিসিং মুসলিম ছাত্রীর ক্ষেত্রে একই ভার বহন করে না।
আফগানিস্তান ইস্যুতে প্রায়ই পশ্চিমা মহল থেকে একটি দাবি আসে যে শিক্ষার আলো কেড়ে নিয়ে কখনো কোনো মেয়েদের স্বাধীনতা রক্ষা করা যায় না। কিন্তু শুধু হিজাব পরার কারণেই যখন কোনো ছাত্রীকে প্রবেশপথে আটকে দেওয়া হয়, তখন উঠে আসে আরেক দ্বিচারিতা। স্কুলের গেটে যদি কিছু ফেলে আসতেই হয়, তবে তা হিজাব নয়; বরং এই বৈষম্যমূলক ও বিদ্বেষী নীতিগুলোকেই শিক্ষকদের বাইরে ফেলে আসা উচিত।
আমরা হামেশাই ভুলে যাই, হিজাবের কারণে একটি মেয়েকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া মানে কেবল একদিনের পড়া মিস করা নয়। এই কাঠামোগত ইসলামবিদ্বেষ তার আত্মবিশ্বাস, নিজেকে মেলে ধরা এবং কোনো সামাজিক পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বোধকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। শুধু এখানেই শেষ নয়, একবার যখন নারীকে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার হতে হয়, তখন ধীরে ধীরে সেটি সমাজে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। আজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো কাল কর্মক্ষেত্র। এভাবে এক সময় ধর্মীয় মূল্যবোধ পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে যায়। ফলে যেই কথিত অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজে সমকামীদের স্থান থাকে, সেই সমাজ প্রকৃত ইসলাম পালনকারীদেরকে ‘মৌলবাদী’ আখ্যা দেয়।
তাই যেকোনো সমাজে ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করতে চাইলে এক দিকে যেমন সেক্যুলারিজমের দিকে প্রশ্ন তুলতে হবে, তেমনি কাঠামোগত ইসলামবিদ্বেষ থেকে আসা যেকোনো নীতিকে শুরুতেই প্রতিহত করতে হবে। কারণ একটি নীতি বা নিয়মই ভবিষ্যতের পথ তৈরি করে। আর এই পথ মসৃণ হয় প্রশ্নহীন নীরব সম্মতি থেকেই।




