ইসলাম সত্য ধর্ম হওয়ার প্রমাণ | কোরআন ও মুহাম্মদ (সা.)-এর সত্যতার প্রমাণ
ইসলাম সত্য ধর্ম হওয়ার প্রমাণ | কোরআন ও মুহাম্মদ (সা.)-এর সত্যতার প্রমাণ

আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক নবীকে তাঁর সমসাময়িক যুগের সবচেয়ে উন্নত বিদ্যার আদলে মুজিযা প্রদান করেছিলেন, যাতে মানুষ সহজেই শনাক্ত করতে পারে যে তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সত্য নবী ও রাসূল। যেমন রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَا مِنَ الْأَنْبِيَاءِ نَبِيٌّ إِلَّا أُعْطِيَ مَا مِثْلُهُ آمَنَ عَلَيْهِ الْبَشَرُ، وَإِنَّمَا كَانَ الَّذِي أُوتِيتُ وَحْيًا أَوْحَاهُ اللَّهُ إِلَيَّ»
“প্রত্যেক নবীকে এমন কিছু মুজিযা দেওয়া হয়েছিল, যার কারণে মানুষ তাঁর প্রতি ঈমান এনেছিল; আর আমাকে যে বিষয়টি দেওয়া হয়েছে তা হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার প্রতি অবতীর্ণ ওহি (কোরআন)।”[1]সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৪৯৮১
১. হযরত মূসা (আ.) যে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সত্য নবী ও রাসূল, তার অকাট্য প্রমাণ
হযরত মূসা (আ.)-এর যুগে মিসরে জাদুবিদ্যার ব্যাপক প্রচলন ও চর্চা ছিল। জাদুকররা বিভিন্ন দৃষ্টির ভেলকি দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করত এবং সমাজে তাদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল।
এর জবাবে আল্লাহ তাআলা হযরত মূসা (আ.)-কে তাঁর লাঠির মাধ্যমে মোজেজা প্রদর্শনের ক্ষমতা দান করেন—যা মাটিতে ফেললে এক প্রকাণ্ড সাপে পরিণত হয়ে জাদুকরদের বানানো সমস্ত কৃত্রিম সাপকে গিলে ফেলত।[2]সূরা ত্ব-হা ২০:৬৯
এছাড়া তাঁর হাত উজ্জ্বল হয়ে ওঠা (যা তিনি বগলের নিচ থেকে বের করলে সূর্যের মতো দীপ্তি ছড়াত)[3]সূরা আল-আ‘রাফ ৭: ১০৮; সূরা ত্ব-হা ২০:২২; সূরা আশ-শু‘আরা ২৬: ৩৩ এবং লোহিত সাগরকে দ্বিখণ্ডিত করা ছিল জাদুকরদের কল্পনারও অতীত।[4]সূরা আশ-শু‘আরা ২৬:৬৩; আরও দেখুন: সূরা আল-বাকারা ২:৫০
তৎকালীন শ্রেষ্ঠ জাদুকররা তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পেরেছিল যে এটি কোনো জাদু নয়, বরং রব্বুল আলামীনের ঐশ্বরিক মোজেজা।[5]সূরা ত্ব-হা ২০:৭০; আরও দেখুন: সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১২০–১২২; সূরা আশ-শু‘আরা ২৬:৪৬–৫১
আর এটিই ছিল হযরত মূসা (আ.) যে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সত্য নবী ও রাসূল, তার অকাট্য প্রমাণ।
আমরা এসব ইতিহাস জানতে পেরেছি পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে। হযরত মুসা (আ.)-এর এই অলৌকিক ঘটনাগুলো কেবল পবিত্র কুরআনেই নয়, বরং বাইবেলেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে।[6]বাইবেল পুরাতন নিয়ম: যাত্রাপুস্তক ৪:১–৯; ৭:৮–১২ এবং ১৪:২১–২২
কিন্তু প্রশ্ন আসতেই পারে যে, কুরআন যে সত্য—তার প্রমাণ কী? একটু ধৈর্য ধরুন, আস্তে আস্তে পয়েন্ট আকারে এ সম্পর্কিত সবকিছুর জবাব সামনে আসবে।
২. হযরত ঈসা (আ.) যে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সত্য নবী ও রাসূল, তার অকাট্য প্রমাণ
হযরত ঈসা (আ.)-এর যুগে গ্রিক ও রোমান প্রভাবের মধ্যে তৎকালীন চিকিৎসাশাস্ত্রের যথেষ্ট উন্নতি ঘটেছিল। চিকিৎসকরা বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা করতে পারলেও জন্মগত অন্ধত্ব, কুষ্ঠরোগসহ কিছু গুরুতর ও জটিল রোগের ক্ষেত্রে তাদের চিকিৎসা-সক্ষমতা সীমিত ছিল।
এর জবাবে আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আ.)-কে এমন কিছু বিস্ময়কর মোজেজা দান করেন, যা বিজ্ঞানের সমস্ত সীমাবদ্ধতাকে ছাড়িয়ে যায়। তিনি আল্লাহর হুকুম ও ক্ষমতায় জন্মঅন্ধকে দৃষ্টিশক্তি দান করতেন, ধবল ও কুষ্ঠরোগীদের পুরোপুরি সুস্থ করে তুলতেন এবং এমনকি মৃত মানুষকেও জীবিত করতেন।[7]সূরা আলে ইমরান ৩:৪৯; সূরা আল-মায়িদাহ ৫:১১০
আর এটিই ছিল হযরত ঈসা (আ.) যে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সত্য নবী ও রাসূল, তার অকাট্য প্রমাণ।
এই তথ্যগুলোও আমরা জানতে পেরেছি পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে। হযরত ঈসা (আ.)-এর এই অলৌকিক কাজগুলোর বর্ণনা বাইবেলে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।[8]বাইবেল নতুন নিয়ম: মথি ৯:২৭–৩০; মার্ক ৮:২২–২৫; যোহন ৯:১–৭ এবং যোহন ১১:৩৮–৪৪।
তবে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, কুরআন যে স্বয়ং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আসা সত্য কিতাব—তার প্রমাণ কী? এখন এই প্রশ্নটিরই যৌক্তিক জবাব দেওয়া হবে ৩ থেকে ৬ নম্বর পয়েন্ট পর্যন্ত— ইনশাআল্লাহ।
৩. হযরত মুহাম্মদ (সা.) যে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত শেষ নবী ও রাসূল, তার অকাট্য প্রমাণঃ
হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগে আরব জাতি ভাষা, সাহিত্য, অলংকারশাস্ত্র ও বাকপটুক্ষায় চরম উৎকর্ষ লাভ করেছিল। সে যুগে আরবের কবি ও সাহিত্যিকদের মুন্সিয়ানা এত উঁচুমাত্রার ছিল যে, তারা নিজেদের ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে অত্যন্ত অহংকার করত।
এর জবাবে আল্লাহ তাআলা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে এমন এক অতুলনীয় অলৌকিক গ্রন্থ—পবিত্র কুরআন—মোজেজা হিসেবে দান করলেন, যার সাহিত্যিক ও ভাষাগত মুজেজা তৎকালীন শ্রেষ্ঠ আরব কবি ও সাহিত্যিকদের বাকশক্তি হটিয়ে দিয়েছিল। কুরআন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল যে, পুরো আরব মিলে এর একটি সূরার মতো একটি সুরাও তৈরি করে দেখাক; কিন্তু তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল।[9]সূরা আল-বাকারা ২:২৩; সূরা ইউনুস ১০: ৩৮; সূরা আল-ইসরা ১৭:৮৮
পাশাপাশি, তৎকালীন কাফেরদের দাবির প্রেক্ষিতে নবীজি (সা.) আল্লাহর হুকুমে নিজ হাতে চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত করার ঐতিহাসিক মোজেজাও প্রদর্শন করেছিলেন—এমন বর্ণনা পবিত্র কুরআনে এসেছে এবং সহিহ হাদিসেও একাধিক সাহাবির সূত্রে ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে।[10]সূরা আল-কামার ৫৪:১; সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৪৮৬৪–৪৮৬৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৮০০
তৎকালীন শ্রেষ্ঠ আরব সাহিত্যিক ও পন্ডিতরা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, কুরআনের অসাধারণ ভাষা, ভাবসম্পদ এবং এসব অলৌকিক নিদর্শন কোনো মানুষের রচনা বা সাধনা হতে পারে না; বরং এটি স্বয়ং রব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ বাণী। আর এটিই ছিল হযরত মুহাম্মদ (সা.) যে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত শেষ নবী ও রাসূল, তার অকাট্য প্রমাণ।
যেমন কুরাইশের অন্যতম নেতা ও আরবি কবিতা সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তি ওলিদ ইবনুল মুগীরাহ কুরআন শুনে স্বীকার করেছিলেন যে,
«فَوَاللَّهِ مَا هُوَ بِشِعْرٍ، وَلَا بِسِحْرٍ، وَلَا بِهَذَيَانٍ مِنَ الْجُنُونِ، وَإِنَّ قَوْلَهُ لَمِنْ كَلَامِ اللَّهِ، … وَاللَّهِ لَقَدْ نَظَرْتُ فِيمَا قَالَ هَذَا الرَّجُلُ، فَإِذَا هُوَ لَيْسَ بِشِعْرٍ، وَإِنَّ لَهُ لَحَلَاوَةً، وَإِنَّ عَلَيْهِ لَطَلَاوَةً، وَإِنَّهُ لَيَعْلُو وَمَا يُعْلَى»
আল্লাহর কসম! এটি কোনো কবিতা নয়, কোনো জাদুও নয় এবং এটি কোনো পাগলের প্রলাপও নয়। নিশ্চয়ই তার কথা আল্লাহর কালাম। … আল্লাহর কসম! এই ব্যক্তি যা বলেছেন, আমি তা পরীক্ষা করে দেখেছি। দেখলাম, এটি কোনো কবিতা নয়। নিশ্চয়ই এর মধ্যে এক বিশেষ মাধুর্য রয়েছে, এর ওপর এক অনন্য সৌন্দর্য ও আকর্ষণ রয়েছে। নিশ্চয়ই এটি ঊর্ধ্বে উঠে যায়, কিন্তু এর ওপর কেউ উঠতে পারে না।”
[11]রেফারেন্স: তাফসীরুত তাবারী = জামি‘উল বায়ান ‘আন তা’বীলি আয়িল কুরআন, ২৩/৪৩০, দারু হাজার লিত্তিবা‘আতি ওয়ান-নাশরি ওয়াত্তাওযী‘ই ওয়াল-ই‘লান, কায়রো, মিসর।
(تَفْسِيرُ الطَّبَرِيِّ = جَامِعُ الْبَيَانِ عَنْ تَأْوِيلِ آيِ الْقُرْآنِ، ٢٣ / ٤٣٠، دَارُ هَجَر لِلطِّبَاعَةِ وَالنَّشْرِ وَالتَّوْزِيعِ وَالإِعْلَانِ، الْقَاهِرَةُ، مِصْرُ)
অনলাইনে চেক করুন:
https://shamela.ws/book/7798/15764
কেউ আপত্তি করতে পারেন যে, ওলিদের বক্তব্যের তাবারীতে উদ্ধৃত কিছু বর্ণনার সনদ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। কিন্তু এই আপত্তির জবাব হল, এই ঘটনার মূল কাঠামো অন্য শক্তিশালী সনদে এসেছে। যা নীচে উল্লেখ করা হল:
فَوَاللَّهِ مَا فِيكُمْ رَجُلٌ أَعْلَمُ بِالأَشْعَارِ مِنِّي، وَلَا أَعْلَمُ بِرَجَزِهِ وَلَا بِقَصِيدَتِهِ مِنِّي، وَلَا بِأَشْعَارِ الْجِنِّ، وَاللَّهِ مَا يُشْبِهُ الَّذِي يَقُولُ شَيْئًا مِنْ هَذَا، وَوَاللَّهِ إِنَّ لِقَوْلِهِ الَّذِي يَقُولُ حَلَاوَةً، وَإِنَّ عَلَيْهِ لَطَلَاوَةً، وَإِنَّهُ لَمُثْمِرٌ أَعْلَاهُ، مُغْدِقٌ أَسْفَلُهُ، وَإِنَّهُ لَيَعْلُو وَمَا يُعْلَى، وَإِنَّهُ لَيَحْطِمُ مَا تَحْتَهُ.
অর্থ:
আল্লাহর কসম! তোমাদের মধ্যে আমার চেয়ে কবিতা সম্পর্কে অধিক জ্ঞানী কেউ নেই; তার রজয, কাসিদা এবং জিনদের কবিতা সম্পর্কেও আমি অধিক জ্ঞানী। আল্লাহর কসম! সে যা বলে, তার সঙ্গে এগুলোর কোনো কিছুরই সাদৃশ্য নেই। আল্লাহর কসম! তার কথায় অবশ্যই মাধুর্য আছে, তার ওপর সৌন্দর্য/আকর্ষণ আছে; তার ওপরের অংশ ফলপ্রসূ, নিচের অংশ সমৃদ্ধ; নিশ্চয়ই তা ঊর্ধ্বে উঠে যায় এবং তার ওপর কেউ উঠতে পারে না; এবং তা তার নিচের সবকিছুকে চূর্ণ করে দেয়।
ইমাম আল-হাকিম এই বর্ণনাটির সনদকে “বুখারির শর্ত অনুযায়ী সহীহ” বলেছেন। যেমন তিনি বলেছন—
«هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحٌ عَلَى شَرْطِ الْبُخَارِيِّ، وَلَمْ يُخَرِّجَاهُ.»
এর অর্থ:
এটি বুখারির শর্ত অনুযায়ী একটি সহীহ হাদিস; তবে ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম এটি তাঁদের গ্রন্থে সংকলন করেননি।
রেফারেন্স:
আল-মুস্তাদরাকু ‘আলাছ-সাহীহাইন, ৫/৮০-৮১, হাদিস: ৩৯১২, দারুল মিনহাজিল ক্বাওয়িম লিন-নাশরি ওয়াত্তাওযী‘ই, সিরিয়া।
(الْمُسْتَدْرَكُ عَلَى الصَّحِيحَيْنِ، ٥ / ٨٠-٨١، رقم الحديث: ٣٩١٢، دَارُ الْمِنْهَاجِ الْقَوِيمِ لِلنَّشْرِ وَالتَّوْزِيعِ، سُورِيَا)
অনলাইনে চেক করুন:
https://shamela.ws/book/1200/2437
ইমাম বায়হাকি একই ঘটনার একাধিক মুরসাল বর্ণনা উল্লেখ করার পর বলেছেন:
«وَكُلُّ ذَلِكَ يُؤَكِّدُ بَعْضُهُ بَعْضًا»
অর্থ: “এসব বর্ণনা পরস্পরকে সমর্থন করে।”
রেফারেন্স: আল-বায়হাকি, দালায়িলুন নুবুওয়াহ ওয়া মা‘রিফাতু আহওয়ালি সাহিবিশ শরী‘আহ, ২/১৯৯–২০০, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, লেবানন।
(دَلَائِلُ النُّبُوَّةِ وَمَعْرِفَةُ أَحْوَالِ صَاحِبِ الشَّرِيعَةِ، ٢ / ١٩٩، دَارُ الْكُتُبِ الْعِلْمِيَّةِ، بَيْرُوتُ، لُبْنَانُ)
অনলাইনে চেক করুন:
https://shamela.ws/book/7478/720
কিন্তু পরে কুরাইশের চাপের মুখে তিনি কুরআনকে “মানুষের কথা” এবং “প্রাচীনদের কাছ থেকে শেখা জাদু” বলে অভিহিত করেন।
৪. নাস্তিকদের কথিত ‘সূরা’গুলো কোরআনের সমকক্ষ হওয়া তো দূরের কথা, শ্রেষ্ঠ মানব-রচিত সাহিত্যকর্মের সমপর্যায়েও পৌঁছাতে পারেনি।
বর্তমানে ইন্টারনেটে কিছু নাস্তিক বা সমালোচক দাবি করেন যে, তারা কুরআনের সূরার মতো “নতুন সূরা” তৈরি করে কুরআনের চ্যালেঞ্জের জবাব দিয়ে দিয়েছেন। এবার আসি তাদের তৈরি সূরাগুলোর জবাবে—
আরবি সাহিত্যের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সাহিত্যমানের ক্লাসিক্যাল সংকলনগুলোর মধ্যে প্রাক-ইসলামি বা জাহেলি যুগের আরবদের কাছে ভাষার এক চূড়ান্ত উৎকর্ষের প্রতীক ছিল ‘আল-মুআল্লাকাত আস-সাবআ’ (الْمُعَلَّقَاتُ السَّبْعُ)। এছাড়া পরবর্তী বিভিন্ন যুগে মাকামাতুল হারিরি (مَقَامَاتُ الْحَرِيرِيِّ) বা দীওয়ানুল মুতানাব্বি (دِيوَانُ الْمُتَنَبِّي)-এর মতো অসাধারণ সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে, যা আরবি ভাষার মুন্সিয়ানার পরিচয় বহন করে।
কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ! সুম্মা আলহামদুলিল্লাহ! পবিত্র কুরআন মানব রচিত এই কিতাবগুলোর চেয়েও বহু বহু গুণ উঁচু স্তরের সাহিত্য। আর নাস্তিক বা ইসলামবিরোধীদের বানানো অপচেষ্টামূলক ‘সূরা’গুলো এই মানব রচিত গ্রন্থগুলোর মানের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি। যেখানে সাধারণ মানব রচিত আরবি সাহিত্যের মানদণ্ডেই সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব টেকে না, সেখানে সেগুলো কুরআনের সমকক্ষ কীভাবে হতে পারে?
অর্থাৎ আরবি সাহিত্যের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে শক্তিশালী সাহিত্যমানের গ্রন্থ হলো ‘পবিত্র কুরআন’। মুসলিম পণ্ডিতদের পাশাপাশি বহু ধর্মনিরপেক্ষ ও অমুসলিম ভাষাবিদ এবং প্রাচ্যবিদের মতে, আরবি ভাষাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এবং এর অলংকারশাস্ত্রের চূড়ান্ত মানদণ্ড নির্মাণে কুরআনের প্রভাব একক ও অনন্য।
কুরআন ছাড়া পৃথিবীতে মানব রচিত যত আরবি গ্রন্থ রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ সাহিত্যমানের গ্রন্থ হলো প্রাক-ইসলামিক যুগের— الْمُعَلَّقَاتُ السَّبْع উচ্চারণ: আল-মু‘আল্লাকাতুস সাব‘আ
এটি ইসলাম-পূর্ব (জাহেলি যুগের) আরবের সাতজন শ্রেষ্ঠ কবির সাতটি দীর্ঘ কবিতার সংকলন। এই সাতজনের মধ্যে কবি ইমরুল কায়েসের কবিতাকে ক্লাসিক্যাল আরবির সর্বোচ্চ চূড়া মনে করা হয়।
প্রাচীন আরবের খাঁটি ও অলঙ্কৃত ভাষার সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক দলিল এটি।
৫. নাস্তিকদের তৈরি কথিত ‘সূরা’গুলো কেন কোরআনের মতো নয়?
ইসলামবিরোধী নাস্তিকদের তৈরি করা তথাকথিত “সূরা”গুলোকে সাহিত্যের কষ্টিপাথরে এবং নিরপেক্ষ যুক্তির আলোতে বিচার করলে দেখা যায়, তাদের এই তৈরি করা “সূরা” গুলো মূলত কুরআনের বিদ্যমান সুর, ছন্দ এবং বাক্য গঠনকে হুবহু ধার করে লেখা। একে সাহিত্যিক পরিভাষায় বলা হয় “প্লাজিয়ারিজম” (Plagiarism) বা সস্তা অনুকরণ।
কুরআনের চ্যালেঞ্জটি মূলত ভাষাতাত্ত্বিক এবং অলঙ্কারশাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কেবল একটি ভাষার ফ্রেম আর সুরটাই নকলের চ্যালেঞ্জ নয়; বরং এটি একটি গভীর সাহিত্যিক চ্যালেঞ্জ। এটি একটি সূরার সামগ্রিক ভাষাগত, বাগ্মিতাগত ও সাহিত্যিক উৎকর্ষের সমতুল্য একটি সূরা রচনার চ্যালেঞ্জ।”
অর্থাৎ “কুরআনের চ্যালেঞ্জ হলো—কুরআনের একটি সূরার অনুরূপ এমন একটি পূর্ণাঙ্গ রচনা নিয়ে আসা, যা কেবল কিছু শব্দ, ছন্দ বা অলংকারে নয়; বরং ভাষার শুদ্ধতা, ফাসাহাত, বালাগাত, শব্দচয়ন, বাক্যবিন্যাস, নযম, অর্থের গভীরতা, প্রকাশের সৌন্দর্য, ধ্বনিগত সামঞ্জস্য এবং সামগ্রিক সাহিত্যিক প্রভাব ও উৎকর্ষের দিক থেকে সেই সূরার সঙ্গে তুলনীয় হয়।”
উদাহরণস্বরূপ,
ধরা যাক, একজন সাধারণ লেখক বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত গান ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’-এর মূল সুর, তাল এবং গানের পুরো কাঠামোটিকে (Template) হুবহু নকল করলেন। এরপর তিনি কেবল ভেতরের আসল শব্দগুলো সরিয়ে দিয়ে সেখানে নিজের মতো করে সস্তা কিছু শব্দ বসিয়ে লিখলেন—’আমার সোনার ময়না, আমি তোমায় ভালোবাসি…’।
সাহিত্যের দুনিয়ায় এই ধরণের নকল বা শব্দ পরিবর্তনকে বলা হয় প্যারোডি (Parody) বা সস্তা অনুকরণ।
এখন, আপনি যদি এই লাইনগুলো লিখে দাবি করেন—”আমি রবীন্দ্রনাথের সমকক্ষ বা তাঁর চেয়ে বড় কবি হয়ে গেছি, কারণ আমি তাঁর গানের মতোই একটি গান তৈরি করেছি”—তবে বাংলা সাহিত্যের কোনো নিরপেক্ষ অধ্যাপক বা সমালোচক কি আপনার এই অবান্তর দাবি মেনে নেবেন?
কখনোই না! তারা পরিষ্কার বলবেন: “আপনি তো রবীন্দ্রনাথের তৈরি করা ফ্রেম আর সুরটাই চুরি করেছেন। আপনি যদি তাঁর সমকক্ষ হতে চান, তবে তাঁর কাঠামো কপি না করে—আপনার নিজের প্রতিভায় সম্পূর্ণ নতুন একটি সাহিত্যিক রূপ বা সুর সৃষ্টি করে দেখান।”
ঠিক এই উদাহরণটির মতোই, আধুনিক যুগের সমালোচকরা যখন ইন্টারনেটে নতুন কোনো “সূরা” বানানোর দাবি করেন, তখন তারা মূলত কুরআনের বিদ্যমান সুর, আয়াত বিভাজন এবং অলৌকিক ছন্দোবদ্ধ কাঠামোকেই (Template) হুবহু চুরি বা ধার করেন। এরপর কেবল ভেতরের আসল শব্দগুলো বদলে কিছু সস্তা বা ব্যঙ্গাত্মক শব্দ বসিয়ে দেন।
অন্যের তৈরি ছাঁচে কেবল নিজের শব্দ বসিয়ে দেওয়া সাহিত্যিক ভাষায় কোনো নতুন সৃষ্টি হতে পারে না। এটি মূলত একটি ভাষাতাত্ত্বিক ফাঁকি ও সস্তা অনুকরণ মাত্র, যা কুরআনের সাড়ে চৌদ্দশত বছরের অপরাজিত চ্যালেঞ্জের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি।
৬. বর্তমান আধুনিক যুগের জন্য কুরআনের চ্যালেঞ্জের মানে কী?
পবিত্র কুরআন মূলত অবতীর্ণ হয়েছিল খাঁটি ক্লাসিক্যাল আরবি ভাষায়। যে যুগের আরবরা ভাষার চূড়ান্তে বা সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিল, কুরআনের সাহিত্যিক চ্যালেঞ্জটি প্রাথমিকভাবে ছিল ঠিক তাদের জন্যই।
ইসলামি ইতিহাসের প্রারম্ভিক যুগের কিছু যুক্তিবাদী পণ্ডিত (যেমন ‘সারফাহ’ তত্ত্বের সমর্থকগণ) মনে করেন, মানুষ তাত্ত্বিকভাবে কুরআনের মতো সূরা বানাতে হয়তো সক্ষম ছিল; কিন্তু মহান আল্লাহ অলৌকিকভাবে মানুষের মন ও বুদ্ধি থেকে সেই ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিলেন বা তাদের মনোযোগ সেই দিক থেকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন (আরবিতে একে বলা হয় ‘الصَّرْفَة’ বা Sarfah)। যেহেতু মক্কার কাফিরদের কুরআন তৈরি করা থেকে আল্লাহ স্বয়ং বিরত রেখেছিলেন, তাই এই ভাষাগত চ্যালেঞ্জটির প্রধান ঐতিহাসিক কার্যকারিতা ওই যুগেই সম্পন্ন হয়ে গেছে।
বাস্তবতার আলোতে বিচার করলে, বর্তমান এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এসে একজন অ-আরবি ভাষী (যেমন কোনো বাঙালি বা ইংরেজিভাষী) মানুষকে আরবি ভাষার অলঙ্কারশাস্ত্র (Balaqah) দিয়ে চ্যালেঞ্জ করা কখনোই যৌক্তিক নয়; কারণ সে তো এই ভাষাটিই বোঝে না! তার কাছে এই ভাষার কাঠামোগত অলৌকিকত্ব অনুধাবন করা অসম্ভব।
তাহলে বর্তমান যুগের জন্য কুরআনের চ্যালেঞ্জের মানে কী?
আসলে বর্তমান যুগের মানুষের জন্য এই চ্যালেঞ্জটি কেবল ভাষার সাহিত্য বা ব্যাকরণের অলঙ্কারিক গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং আধুনিক বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কুরআনের চ্যালেঞ্জের স্থায়ী রূপটি প্রকাশ পায় এর শতভাগ সত্য প্রমাণিত হওয়া ভবিষ্যদ্বাণী, নিখুঁত বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিত, ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ ও সর্বাধুনিক আইনব্যবস্থা এবং সাড়ে চৌদ্দশত বছর ধরে এর একটি হরফও পরিবর্তন না হয়ে অক্ষত থাকার অলৌকিকত্বের (Universal Preservation) মাধ্যমে।
অর্থাৎ, কিয়ামত পর্যন্ত আসা পৃথিবীর প্রতিটি নতুন প্রজন্ম তাদের নিজস্ব আধুনিক জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আলোতে কুরআনের কোনো ভুল ধরতে বা এর সমকক্ষ সর্বজনীন কোনো জীবনবিধান তৈরি করতে গিয়ে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হবে—আর এটাই হলো কুরআনের এই চ্যালেঞ্জ কিয়ামত পর্যন্ত চিরন্তন ও স্থায়ী হওয়ার সবচেয়ে আধুনিক ও বাস্তব রূপ!
মানুষের তৈরি আইন (যেমন রোমান আইন বা আধুনিক সংবিধান) কেবল মানুষের বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু মানুষের অন্তরের সততা নিশ্চিত করতে পারে না। অপরদিকে, কুরআনের আইনি বুনন (Legislation) এমনভাবে তৈরি যা একই সাথে রাষ্ট্রের আইন হিসেবে অপরাধ দমন করে, আবার মনস্তাত্ত্বিকভাবে মানুষকে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক হতে বাধ্য করে। মানুষের পক্ষে একই টেক্সটে এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা অসম্ভব।
সর্বোপরি, কুরআনের বাণী অবতীর্ণ হওয়ার পর তা কেবল কিতাবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তৎকালীন একটি বর্বর যাযাবর সমাজকে ইতিহাসের সবচেয়ে সুশৃঙ্খল ও ন্যায়পরায়ণ সমাজে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছিল—আর এটি কুরআনের একটি বাস্তব অলৌকিকত্ব।
এই বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানতে চাইলে পড়ুন
Footnotes
| ⇧1 | সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৪৯৮১ |
|---|---|
| ⇧2 | সূরা ত্ব-হা ২০:৬৯ |
| ⇧3 | সূরা আল-আ‘রাফ ৭: ১০৮; সূরা ত্ব-হা ২০:২২; সূরা আশ-শু‘আরা ২৬: ৩৩ |
| ⇧4 | সূরা আশ-শু‘আরা ২৬:৬৩; আরও দেখুন: সূরা আল-বাকারা ২:৫০ |
| ⇧5 | সূরা ত্ব-হা ২০:৭০; আরও দেখুন: সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১২০–১২২; সূরা আশ-শু‘আরা ২৬:৪৬–৫১ |
| ⇧6 | বাইবেল পুরাতন নিয়ম: যাত্রাপুস্তক ৪:১–৯; ৭:৮–১২ এবং ১৪:২১–২২ |
| ⇧7 | সূরা আলে ইমরান ৩:৪৯; সূরা আল-মায়িদাহ ৫:১১০ |
| ⇧8 | বাইবেল নতুন নিয়ম: মথি ৯:২৭–৩০; মার্ক ৮:২২–২৫; যোহন ৯:১–৭ এবং যোহন ১১:৩৮–৪৪। |
| ⇧9 | সূরা আল-বাকারা ২:২৩; সূরা ইউনুস ১০: ৩৮; সূরা আল-ইসরা ১৭:৮৮ |
| ⇧10 | সূরা আল-কামার ৫৪:১; সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৪৮৬৪–৪৮৬৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৮০০ |
| ⇧11 | রেফারেন্স: তাফসীরুত তাবারী = জামি‘উল বায়ান ‘আন তা’বীলি আয়িল কুরআন, ২৩/৪৩০, দারু হাজার লিত্তিবা‘আতি ওয়ান-নাশরি ওয়াত্তাওযী‘ই ওয়াল-ই‘লান, কায়রো, মিসর। (تَفْسِيرُ الطَّبَرِيِّ = جَامِعُ الْبَيَانِ عَنْ تَأْوِيلِ آيِ الْقُرْآنِ، ٢٣ / ٤٣٠، دَارُ هَجَر لِلطِّبَاعَةِ وَالنَّشْرِ وَالتَّوْزِيعِ وَالإِعْلَانِ، الْقَاهِرَةُ، مِصْرُ) অনলাইনে চেক করুন: https://shamela.ws/book/7798/15764 কেউ আপত্তি করতে পারেন যে, ওলিদের বক্তব্যের তাবারীতে উদ্ধৃত কিছু বর্ণনার সনদ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। কিন্তু এই আপত্তির জবাব হল, এই ঘটনার মূল কাঠামো অন্য শক্তিশালী সনদে এসেছে। যা নীচে উল্লেখ করা হল: ইমাম আল-হাকিম এই বর্ণনাটির সনদকে “বুখারির শর্ত অনুযায়ী সহীহ” বলেছেন। যেমন তিনি বলেছন— রেফারেন্স: ইমাম বায়হাকি একই ঘটনার একাধিক মুরসাল বর্ণনা উল্লেখ করার পর বলেছেন: (دَلَائِلُ النُّبُوَّةِ وَمَعْرِفَةُ أَحْوَالِ صَاحِبِ الشَّرِيعَةِ، ٢ / ١٩٩، دَارُ الْكُتُبِ الْعِلْمِيَّةِ، بَيْرُوتُ، لُبْنَانُ) |




