
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা’আলার জন্য। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁরই সাহায্য চাই এবং তাঁরই নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক সর্বশেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মদ ﷺ, তাঁর পরিবারবর্গ, সাহাবায়ে কিরাম এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর অনুসারীদের উপর।
বর্তমান যুগে মুসলিম সমাজে একটি নতুন ভ্রান্ত মতবাদ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যারা নিজেদেরকে “আহলে কুরআন” বলে পরিচয় দেয়। তাদের মূল দাবি হলো কুরআনই একমাত্র শরঈ দলীল; হাদীস মানুষের রচিত, তাই তা মানা যাবে না। তারা আরও বলে, রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহসমুহ আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নয়; অতএব দ্বীনের বিধান নির্ধারণে কেবল কুরআনই গ্রহণযোগ্য।
এই দাবি কুরআনের অসংখ্য সুস্পষ্ট আয়াতের পরিপন্থী। কারণ কুরআন নিজেই রাসূল ﷺ-এর অনুসরণকে ফরজ করেছে, তাঁর ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করতে নির্দেশ দিয়েছে এবং তাঁর বক্তব্যকে ওহী হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাই যে ব্যক্তি কুরআনকে সত্যিকার অর্থে গ্রহণ করবে, সে কখনোই রাসূল ﷺ-এর সহীহ সুন্নাহকে অস্বীকার করতে পারে না।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মহান আল্লাহ তাআলা মানবজাতির হিদায়াতের জন্য কুরআন নাজিল করেছেন এবং সেই কুরআনের ব্যাখ্যা, বাস্তব প্রয়োগ ও বিস্তারিত নির্দেশনা প্রদানের জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে প্রেরণ করেছেন। তাই ইসলামের বিধানকে কেবল কুরআনের লিখিত পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ ও হাদিসকে অগ্রাহ্য করা ইসলামের মূল কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর যুগের বহু শতাব্দী পর উদ্ভূত একটি চিন্তাধারার ব্যাপারে যেন আগেই সতর্ক করে গেছেন। তিনি এমন এক শ্রেণির মানুষের কথা বলেছেন, যারা তাঁর হাদিস তাদের সামনে উপস্থাপিত হলে বলবে, আমাদের জন্য আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট; কুরআনে যা পাব, শুধু সেটিই গ্রহণ করব।
অর্থাৎ হাদিস অস্বীকারের যে প্রবণতা পরবর্তী যুগে বিভিন্ন রূপে প্রকাশিত হয়েছে, তার মূল বৈশিষ্ট্য রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ভবিষ্যদ্বাণীতেই সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
হাদিস অস্বীকারের ভবিষ্যদ্বাণী
হাদিস অস্বীকারকারীদের ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনাগুলোর একটি হলো আবূ রাফি‘ (রা) থেকে বর্ণিত হাদিস।
عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي رَافِعٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ:
«لَا أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ مُتَّكِئًا عَلَى أَرِيكَتِهِ يَأْتِيهِ الْأَمْرُ مِنْ أَمْرِي مِمَّا أَمَرْتُ بِهِ أَوْ نَهَيْتُ عَنْهُ فَيَقُولُ: لَا نَدْرِي، مَا وَجَدْنَا فِي كِتَابِ اللَّهِ اتَّبَعْنَاهُ».উবাইদুল্লাহ ইবনু আবূ রাফি‘ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, নবী ﷺ বলেছেন: “আমি যেন তোমাদের কাউকে এমন অবস্থায় না পাই যে, সে তার গদিতে হেলান দিয়ে বসে আছে, আর তার কাছে আমার পক্ষ থেকে এমন কোনো নির্দেশ বা নিষেধাজ্ঞা পৌঁছল, যা আমি নির্দেশ দিয়েছি অথবা নিষেধ করেছি; তখন সে বলল, ‘আমরা জানি না। আল্লাহর কিতাবে আমরা যা পেয়েছি, আমরা শুধু তারই অনুসরণ করব।’”[1]সুনান আবূ দাঊদ, হাদিস ৪৬০৫।
এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন একজন ব্যক্তির চিত্র তুলে ধরেছেন, যে বাহ্যিকভাবে মুসলিম সমাজেরই একজন। সে হয়তো কুরআনের প্রতি বিশ্বাসের দাবি করবে, কিন্তু রাসূল ﷺ-এর নির্দেশ তার কাছে পৌঁছার পর সেটিকে গ্রহণ না করে বলবে, “আল্লাহর কিতাবে যা আছে, আমরা শুধু সেটিই অনুসরণ করব।” এখানেই হাদিস অস্বীকারের মৌলিক দর্শনটি প্রকাশ পেয়েছে।
আবূ রাফি‘ (রা) থেকে বর্ণিত আরেকটি বর্ণনায় বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে এসেছে,
عَنْ أَبِي رَافِعٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:
«لَا أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ مُتَّكِئًا عَلَى أَرِيكَتِهِ، يَأْتِيهِ أَمْرٌ مِمَّا أَمَرْتُ بِهِ أَوْ نَهَيْتُ عَنْهُ، فَيَقُولُ: لَا أَدْرِي، مَا وَجَدْنَا فِي كِتَابِ اللَّهِ اتَّبَعْنَاهُ».রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: আমি যেন তোমাদের মধ্যে কাউকে এমন অবস্থায় না পাই যে, সে তার সুসজ্জিত আসনে হেলান দিয়ে বসে থাকবে এবং তার নিকট যখন আমার আদিষ্ট কোন বিষয় অথবা আমার নিষেধ সম্বলিত কোন হাদীস উত্থাপিত হবে তখন সে (তাচ্ছিল্যভরে) বলবে, আমি তা জানি না, আল্লাহ তা’আলার কিতাবে আমরা যা পাই, তারই অনুসরণ করবো।[2]সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত): ২৬৬৩
এই বর্ণনার বিশেষ তাৎপর্য হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ কেবল হাদিস অস্বীকারের কথা বলেননি; বরং হাদিসের বিপরীতে কুরআনকে দাঁড় করানোর মানসিকতাকেও চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ সমস্যা কুরআনের প্রতি ভালোবাসায় নয় বরং সমস্যা হলো কুরআনকে রাসূল ﷺ-এর ব্যাখ্যা ও নির্দেশনা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া।
“আমাদের ও তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট” এই দাবির ভবিষ্যদ্বাণী
আল-মিকদাম ইবনু মা‘দীকারিব (রা) থেকে বর্ণিত হাদিসটি এ বিষয়ে এসেছে,
عَنِ الْمِقْدَامِ بْنِ مَعْدِيكَرِبَ الْكِنْدِيِّ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ:
«يُوشِكُ الرَّجُلُ مُتَّكِئًا عَلَى أَرِيكَتِهِ يُحَدَّثُ بِحَدِيثٍ مِنْ حَدِيثِي، فَيَقُولُ: بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ كِتَابُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، فَمَا وَجَدْنَا فِيهِ مِنْ حَلَالٍ اسْتَحْلَلْنَاهُ، وَمَا وَجَدْنَا فِيهِ مِنْ حَرَامٍ حَرَّمْنَاهُ. أَلَا وَإِنَّ مَا حَرَّمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِثْلُ مَا حَرَّمَ اللَّهُ».মিকদাম ইবনু মাদীকারিব (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ সাবধান! খুব শীঘ্রই এমন ব্যক্তির আগমন ঘটবে যে, সে তার সুসজ্জিত গদিতে হেলান দিয়ে বসে থাকবে, তখন তার নিকট আমার কোন হাদীস পৌছলে সে বলবে, আমাদের ও তোমাদের সামনে তো আল্লাহ তা’আলার কিতাবই আছে। আমরা তাতে যা হালাল পাব সেগুলো হালাল বলে মেনে নিব এবং যেগুলো হারাম পাব সেগুলো হারাম বলে মনে নিব। সাবধান রাসূলুল্লাহ ﷺ যা হারাম ঘোষণা করেছেন তা আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক হারামকৃত বস্তুর মতোই হারাম।[3]জামে‘ আত-তিরমিজি, ২৬৬৪; সুনান আদ-দারিমী, ৫৮৬
এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেননি যে, তারা আল্লাহর কিতাবকে অস্বীকার করবে। বরং তারা কুরআনকে গ্রহণ করার দাবি করেই রাসূল ﷺ-এর হাদিসকে প্রত্যাখ্যান করবে। অর্থাৎ হাদিস অস্বীকারের বাহ্যিক স্লোগান হবে – “আমরা কুরআন মানি।”
কিন্তু বাস্তবে সেই দাবির মাধ্যমে রাসূল ﷺ-এর ব্যাখ্যা, নির্দেশ ও বিধানকে অগ্রাহ্য করা হবে।
আমাকে কুরআন এবং তার অনুরূপ আরেকটি জিনিস দেওয়া হয়েছে
আল-মিকদাম (রা) থেকে বর্ণিত আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাদিস হলো—
وَعَنِ الْمِقْدَامِ بْنِ مَعْدِي كَرِبَ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ:
«أَلَا إِنِّي أُوتِيتُ الْكِتَابَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ، أَلَا يُوشِكُ رَجُلٌ شَبْعَانُ عَلَى أَرِيكَتِهِ يَقُولُ: عَلَيْكُمْ بِهَذَا الْقُرْآنِ، فَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَلَالٍ فَأَحِلُّوهُ، وَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَرَامٍ فَحَرِّمُوهُ، وَإِنَّ مَا حَرَّمَ رَسُولُ اللَّهِ كَمَا حَرَّمَ اللَّهُ، أَلَا لَا يَحِلُّ لَكُمْ لَحْمُ الْحِمَارِ الْأَهْلِيِّ، وَلَا كُلُّ ذِي نَابٍ مِنَ السَّبُعِ، وَلَا لُقَطَةُ مُعَاهَدٍ إِلَّا أَنْ يَسْتَغْنِيَ عَنْهَا صَاحِبُهَا، وَمَنْ نَزَلَ بِقَوْمٍ فَعَلَيْهِمْ أَنْ يُقْرُوهُ، فَإِنْ لَمْ يُقْرُوهُ فَلَهُ أَنْ يُعْقِبَهُمْ بِمِثْلِ قِرَاهُ».আল-মিকদাম ইবনু মা’দীকারিব (রা) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ জেনে রাখো! আমাকে কিতাব এবং তার সঙ্গে অনুরূপ কিছু দেয়া হয়েছে। জেনে রাখো! এমন এক সময় আসবে যখন কোনো প্রাচুর্যবান লোক তার আসনে বসে বলবে, তোমরা শুধু এ কুরআনকেই গ্রহণ করো, তাতে যা হালাল পাবে তা হালাল এবং যা হারাম পাবে তা হারাম মেনে নিবে। নবী ﷺ বলেন, জেনে রাখো! গৃহপালিত গাধা তোমাদের জন্য হালাল নয় এবং ছেদন দাঁতবিশিষ্ট হিংস্র পশুও নয়।
অনুরূপ সন্ধিবদ্ধ অমুসলিম গোত্রের হারানো বস্তু তোমাদের জন্য হালাল নয়, অবশ্য যদি সে এর মুখাপেক্ষী না হয়। আর যখন কোনো লোক কোনো সম্প্রদায়ের নিকট আগন্তুক হিসেবে পৌঁছে তখন তাদের উচিত তার মেহমানদারী করা। যদি তারা তা না করে, তাহলে তাদেরকে কষ্ট দিয়ে হলেও তার মেহমানদারীর পরিমাণ জিনিস আদায় করার অধিকার তার আছে।[4]সুনান আবূ দাঊদ, ৪৬০৪; সহীহুল জামি‘, ২৬৪৩; সুনান ইবনু মাজাহ, ১২
এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রথমে একটি মৌলিক সত্য ঘোষণা করেছেন,
«أُوتِيتُ الْكِتَابَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ»
অর্থাৎ তাঁকে কিতাব দেওয়া হয়েছে এবং তার সঙ্গে তার অনুরূপ আরেকটি জিনিসও দেওয়া হয়েছে।
এরপর রাসূল ﷺ এমন এক ব্যক্তির কথা বলেছেন, যে বলবে,
“তোমরা শুধু কুরআন অনুসরণ করো।”
এখানে ভবিষ্যৎবাণী এবং বাস্তবতার মধ্যে আশ্চর্য মিল দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন এক চিন্তাধারার পূর্বাভাস দিয়েছেন, যার মূল বক্তব্য হবে,
“কুরআনই যথেষ্ট; হাদিসের প্রয়োজন নেই।”
এই বক্তব্যের বিপরীতে রাসূল ﷺ নিজেই ঘোষণা করেছেন যে, তাঁর নির্দেশ ও নিষেধও শরিয়তের দলিল।
কুরআন ও সুন্নাহকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী বানানো যাবে না
হাদিস অস্বীকারকারীদের একটি মৌলিক ভ্রান্তি হলো তারা কুরআন ও সুন্নাহকে যেন দুটি পৃথক ও পরস্পরবিরোধী উৎস হিসেবে উপস্থাপন করে। অথচ ইসলামের প্রকৃত কাঠামো হলো:-
কুরআন → রাসূল ﷺ-এর ব্যাখ্যা ও শিক্ষা → সাহাবিদের মাধ্যমে সংরক্ষিত সুন্নাহ → শরিয়তের পূর্ণাঙ্গ বিধান।
কুরআন নামাজের নির্দেশ দিয়েছে; কিন্তু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিস্তারিত পদ্ধতি কুরআনে নেই। কুরআন যাকাতের নির্দেশ দিয়েছে; কিন্তু অধিকাংশ সম্পদের নিসাব, পরিমাণ ও বিস্তারিত প্রয়োগ হাদিস ও সুন্নাহর মাধ্যমে জানা যায়। কুরআন হজের নির্দেশ দিয়েছে; কিন্তু হজের বহু বিস্তারিত বিধান রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহর মাধ্যমে জানা যায়। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي»
“তোমরা আমাকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখেছ, সেভাবেই নামাজ পড়ো।”[5]আল-বুখারী (৬০০৮)
অর্থাৎ কুরআনের বিধান বাস্তব জীবনে কীভাবে পালন করতে হবে, রাসূল ﷺ তা নিজের জীবন দিয়ে শিক্ষা দিয়েছেন।
হাদিস অস্বীকারের সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি
হাদিস অস্বীকারকারীর কাছে যদি প্রশ্ন করা হয়, “আপনি কুরআন কীভাবে বুঝলেন?” তখন একটি মৌলিক সমস্যা সামনে আসে। কারণ কুরআন নিজেই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছে।মহান আল্লাহ বলেন:
﴿مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ﴾
“যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে অবশ্যই আল্লাহর আনুগত্য করল।” [সূরা আন-নিসা: ৮০]
অতএব রাসূলের আনুগত্য যদি আল্লাহর আনুগত্য হয়, তাহলে রাসূল ﷺ-এর নির্দেশকে অস্বীকার করে কীভাবে আল্লাহর কিতাবের প্রকৃত অনুসারী হওয়ার দাবি করা যায়? আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাসূল ﷺ-এর জীবদ্দশায় সাহাবিগণ কেবল কুরআনের আয়াত সংগ্রহ করেননি; বরং তাঁর কথা, কাজ, অনুমোদন ও ব্যাখ্যাও সংরক্ষণ করেছেন। কারণ তাঁরা জানতেন রাসূল ﷺ কেবল কুরআনের বাহক নন; তিনি সেই কিতাবের শিক্ষকও।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এই হাদিসগুলো কোনো কাল্পনিক আশঙ্কা ছিল না। তিনি ভবিষ্যতে এমন লোকের আবির্ভাবের কথা বলেছেন, যারা তাঁর হাদিস শুনেও কেবল কুরআনকে গ্রহণ করার দাবি করবে। পরবর্তী ইসলামী ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে হাদিসের প্রামাণ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। কোথাও হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সীমিত পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে, আবার কোথাও সুন্নাহকে শরিয়তের দলিল হিসেবেই অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। আধুনিক যুগে এ প্রবণতা নতুন ভাষা ও নতুন স্লোগান নিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষত “আহলে কুরআন” নামে পরিচিত আন্দোলন হাদিসের শরয়ি কর্তৃত্ব অস্বীকার করে কুরআনকেই ইসলামের একমাত্র গ্রহণযোগ্য উৎস হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে।
এখানেই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সেই ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে তাদের বক্তব্যের আশ্চর্য সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। উপরের হাদিসগুলো একত্রে পর্যালোচনা করলে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
- প্রথমত: রাসূলুল্লাহ ﷺ ভবিষ্যতে এমন ব্যক্তির আগমনের সংবাদ দিয়েছেন, যে তাঁর হাদিস শুনেও তা গ্রহণ করবে না।
- দ্বিতীয়ত: সে ব্যক্তি কুরআনের প্রতি অবিশ্বাসী হবে এমনটি বলা হয়নি। বরং সে কুরআনের অনুসরণের দাবিই করবে।
- তৃতীয়ত: তার মূল বক্তব্য হবে, “আমরা কেবল কুরআনে যা পাই, সেটিই গ্রহণ করব।”
- চতুর্থত: রাসূল ﷺ এই চিন্তাধারাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
- পঞ্চমত: তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, তাঁর হারাম করা বিষয়ও শরিয়তের বাধ্যতামূলক বিধানের অন্তর্ভুক্ত।
- ষষ্ঠত: তিনি ঘোষণা করেছেন যে তাঁকে কিতাবের সঙ্গে তার অনুরূপ আরেকটি বিষয়ও প্রদান করা হয়েছে।
অতএব এই হাদিসগুলো কেবল হাদিসের মর্যাদা বর্ণনা করে না; বরং হাদিস অস্বীকারের ভবিষ্যৎ প্রবণতা সম্পর্কে সরাসরি সতর্কবার্তা প্রদান করে। হাদিস অস্বীকারের প্রবণতা আধুনিক যুগের কোনো সম্পূর্ণ নতুন আবিষ্কার নয়। বরং এর মূল বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ বহু আগেই সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এমন লোক আসবে যারা তাঁর হাদিস শুনে বলবে,
“আমরা আল্লাহর কিতাবে যা পাব, শুধু সেটিই অনুসরণ করব।”
তিনি আরও বলেছেন,
“আমাদের ও তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট।”
আর তার জবাবে তিনি ঘোষণা করেছেন,
“রাসূলুল্লাহ যা হারাম করেছেন, তা আল্লাহ যা হারাম করেছেন তারই অনুরূপ।”
সুতরাং কুরআন ও সুন্নাহকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী বানানো ইসলামের শিক্ষা নয়। কুরআন আল্লাহর কালাম, আর রাসূল ﷺ হলেন সেই কুরআনের ব্যাখ্যাকার ও বাস্তব শিক্ষক। কুরআন আমাদেরকে রাসূলের আনুগত্য করতে বলেছে; রাসূল ﷺ তাঁর সুন্নাহ আঁকড়ে ধরতে শিক্ষা দিয়েছেন; সাহাবায়ে কেরাম তাঁর কথা, কাজ ও অনুমোদন সংরক্ষণ করেছেন; আর উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই সুন্নাহ যাচাই ও সংরক্ষণ করেছেন।
অতএব, “কুরআন মানব, কিন্তু হাদিস মানব না” এই স্লোগান যতই আকর্ষণীয় শোনাক, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণীর আলোকে এটি কোনো নতুন কথা নয়। বরং তিনি নিজেই তাঁর উম্মতকে এ ধরনের বক্তব্য থেকে সতর্ক করে গেছেন। আর তাই হাদিসের প্রতি ঈমান, তার প্রামাণ্যতা স্বীকার এবং সহিহ সুন্নাহকে শরিয়তের দলিল হিসেবে গ্রহণ করা ইসলামী জ্ঞানের একটি মৌলিক বিষয় ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ভবিষ্যদ্বাণী আমাদের সামনে আজও এক গভীর সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে ব্যক্তি কুরআনের নামে রাসূল ﷺ-এর সহিহ সুন্নাহকে প্রত্যাখ্যান করে, সে যেন মনে রাখে: কুরআনই তাকে রাসূলের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছে। ‘কুরআন ও সুন্নাহ’ এ দুটিকে বিচ্ছিন্ন করে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গভাবে বোঝা সম্ভব নয় ।
ওহীর পরিচয়, প্রকারভেদ এবং সুন্নাহর প্রামাণ্যতা
ইসলামী আকীদা ও শরীআতের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত ওহী। মহান আল্লাহ মানবজাতিকে সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং তাঁদের প্রতি ওহী অবতীর্ণ করেছেন। এই ওহীর মাধ্যমেই মানুষ আল্লাহর পরিচয়, ইবাদতের বিধান, হালাল-হারাম, নৈতিকতা এবং পরকালীন মুক্তির পথ সম্পর্কে অবগত হয়েছে। তাই ওহীর প্রকৃতি, তাৎপর্য ও প্রকারভেদ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন ইসলামী জ্ঞানচর্চার একটি মৌলিক বিষয়।
পবিত্র কুরআন সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ দ্বীনের বিষয়ে নিজের প্রবৃত্তি বা ব্যক্তিগত ইচ্ছানুযায়ী কোনো কথা বলেননি; বরং তিনি যা প্রচার করেছেন, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ওহীরই প্রতিফলন। এ কারণেই তাঁর বাণী ও সুন্নাহ ইসলামী শরীআতের দ্বিতীয় প্রধান উৎস হিসেবে স্বীকৃত। আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে ওহীর মাধ্যমে সত্যের পথনির্দেশ দিয়েছেন এবং সেই ওহীকে বিকৃতি ও সংযোজন-বিয়োজন থেকে সংরক্ষণ করেছেন।
অতএব, ওহীর প্রকৃতি ও প্রকারভেদ সম্পর্কে আলোচনা কেবল একটি তাত্ত্বিক বিষয় নয়; বরং এটি কুরআন ও সুন্নাহর পারস্পরিক সম্পর্ক, শরীআতের উৎস এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রিসালাতের মর্যাদা যথাযথভাবে অনুধাবনের জন্য অপরিহার্য। নিম্নে কুরআন, হাদীস এবং তাফসীরের আলোকে ওহীর প্রকৃতি ও এর বিভিন্ন প্রকারভেদ আলোচনা করা হলো।
ওহীর প্রকৃতি ও প্রকারভেদ
আল্লাহ বলেন
, وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى، إِنْ هُوَ إِلاَّ وَحْيٌ يُوحَى
‘(রাসূল) ইচ্ছামত কিছু বলেন না। কেবলমাত্র ততটুকু বলেন, যতটুকু তাঁর নিকটে ‘অহী’ করা হয়’। [সূরা নাজম, আয়াত নং ৩-৪]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু কাছীর (মৃ. ৭৭৪ হি.) বলেন,
ما يقول قولا عن هوى وغرض إنما يقول ما أمر به، يبلغه إلى الناس كاملا موفَّرًا من غير زيادة ولا نقصان، ‘
রাসূল ﷺ স্বগত এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে যা কিছুই বলেন না কেন, তা কেবল আল্লাহর নির্দেশেই বলেন এবং মানুষের কাছে তা কোন প্রকার হ্রাস-বৃদ্ধি ছাড়াই পূর্ণাঙ্গভাবে পৌঁছে।[6] تفسير ابن كثير – ط أولاد الشيخ ١٣/٢٤٧
অর্থাৎ দ্বীনের ব্যাপারে রাসূল ﷺ যা বলেন তা কেবলমাত্র অহী মারফতই বলেন, নিজের পক্ষ থেকে নয়। আল্লাহ অন্যত্র কঠোর ভাষায় তা উল্লেখ করেছেন
, وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْأَقَاوِيلِ، لَأَخَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِينِ، ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِينَ، فَمَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ عَنْهُ حَاجِزِينَ- ‘
সে (মুহাম্মাদ) যদি আমার নামে কোন কথা রচনা করত, তবে আমি তার দক্ষিণ হস্ত ধরে ফেলতাম, অতঃপর কেটে দিতাম তার গ্রীবা। তোমাদের কেউ তাকে রক্ষা করতে পারতে না।’ [সুরা হাক্কাহ ৬৯/৪৪-৪৭]
ওহী নাযিলের উপায়
আল্লাহ তাআলা বলেন,
«وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُكَلِّمَهُ اللَّهُ إِلَّا وَحْيًا أَوْ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوحِيَ بِإِذْنِهِ مَا يَشَاءُ ۚ إِنَّهُ عَلِيٌّ حَكِيمٌ»
কোন মানুষের এ মর্যাদা নেই যে, আল্লাহ তার সাথে সরাসরি কথা বলবেন, ওহীর মাধ্যম, পর্দার আড়াল অথবা কোন দূত পাঠানো ছাড়া। তারপর আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে তিনি যা চান তাই ওহী প্রেরণ করেন। তিনি তো মহীয়ান, প্রজ্ঞাময়। [সূরা আশ-শূরা: ৫১]
কোন মানুষের মর্যাদা এমন নয় যে, আল্লাহ তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন, তবে তিনটি পদ্ধতিতে তা হতে পারে,
১. ওহীর মাধ্যমে,
২. পর্দার আড়াল থেকে,
৩. অথবা একজন দূত (ফেরেশতা) প্রেরণ করে;
অতঃপর তিনি আল্লাহর অনুমতিক্রমে যা ইচ্ছা ওহী পৌঁছে দেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী, পরম প্রজ্ঞাময়।
আয়াতের বিশ্লেষণ আল্লাহ তা’আলা অবহিত করেছেন যে, মানবের উদ্দেশ্যে তাঁর বাক্যালাপ ও ওহী তিনটি স্তরে সংঘটিত হয়। এই আয়াত ওহীর মৌলিক ভিত্তি। আল্লাহ তাআলা এখানে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, নবীদের নিকট ওহী পৌঁছানোর একাধিক মাধ্যম রয়েছে। তিনি কোথাও বলেননি যে, ওহী বলতে কেবল কুরআনের শব্দগুলোই বোঝায়। বরং ওহী বিভিন্ন পদ্ধতিতে নাযিল হয়।
ইমাম ইবন কাসীর, ইমাম তাবারী, ইমাম কুরতুবীসহ প্রখ্যাত মুফাসসিরগণ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন—
– কখনো আল্লাহ নবীর অন্তরে কোনো বিষয় ইলহাম করেন।
– কখনো পর্দার আড়াল থেকে কথা বলেন, যেমন মূসা (আ)-এর ক্ষেত্রে।
– আবার কখনো জিবরীল (আ)-এর মাধ্যমে ওহী পাঠান।
ওহীর প্রথম স্তর: শুধুমাত্র ওহী- আর তা হল ওহীপ্রাপ্ত ব্যক্তির হৃদয়ে আল্লাহ যা চান তা এমনভাবে প্রক্ষেপ করেন যে, তিনি (ওহী প্রাপ্ত ব্যক্তি) তা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসার ব্যাপারে কোন সন্দেহ পোষণ করেন না। যেমন ইব্রাহীম (আ)-এর স্বপ্ন সম্পর্কে আল্লাহ সংবাদ দিচ্ছেন :
﴿ قَالَ يُبْنَى إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ ﴾
“তিনি বললেন, হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি যবেহ করছি”। [সূরা আস-সাফফাতঃ১০২]
দ্বিতীয় স্তর: কোন মাধ্যম ছাড়াই পর্দার অন্তরাল থেকে কথা বলা: যেমনটি সাব্যস্ত হয়েছে কোন কোন রাসূল ও নবীদের ক্ষেত্রে। যেমন মূসার সাথে আল্লাহ তা’আলার কথোপকথন, যে সম্পর্কে তিনি কুরআনের একাধিক স্থানে সংবাদ দিয়েছেন:
وَكَلَّمَ اللهُ مُوسَى تَكْلِيمًا
“আর মূসার সাথে আল্লাহ সরাসরি কথা বলেছিলেন” । [সূরা আন-নিসা :১৬৪]
তিনি আরো বলেন:
وَلَمَّا جَاءَ مُوسَى لِمِيقَاتِنَا وَكَلَمَة رَبُّهُ
“মূসা যখন আমাদের নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলেন এবং তার প্রতিপালক তার সাথে কথা বললেন”। [সূরা আল-আ’রাফ: ১৪৩]
অনুরূপভাবে আদমের সাথে আল্লাহর কথোপকথন। আল্লাহ তা’আলা বলেন:
فَتَلَقَّى آدَمُ مِنْ رَبِّهِ كَلِمَتِ
“তারপর আদম তার প্রতিপালকের নিকট হতে কিছু বাণী প্রাপ্ত হল” । [সূরা আল-বাকারাহঃ ৩৭]
আরো যেমন আমাদের নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর সাথে ইসরার রাতে আল্লাহ তা’আলার কথোপকথন, যা সুন্নায় সাব্যস্ত রয়েছে।
তৃতীয় স্তর: ফেরেস্তার মাধ্যমে ওহী প্রদান- এই প্রকার ওহে আল্লাহ তাআলা তার নিকটতম ফেরেশতা জিব্রাইল (আ)-এর মাধ্যমে দুনিয়াতে রাসুলদের কাছে প্রেরণ করে থাকে। এর দলীল আল্লাহ তা’আলার বাণী:
أَوْ يُرْسِلَ رَسُولاً فَيُوحِيَ بِإِذْنِهِ مَا
“অথবা এমন দূত প্রেরণ করবেন, যে দূত তাঁর অনুমতিক্রমে তিনি যা চান তা ব্যক্ত করেন”। [সূরা আশ-শুরা: ৫১]
এ ধরনের ওহী যেমন জিবরীল (আ) আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নিয়ে নবী ও রাসূলগণের নিকট অবতীর্ণ হয়েছিলেন। কুরআনের পুরোটাই এ পদ্ধতিতে অবতীর্ণ হয়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর কথা পেশ করেছেন। জিবরীল (আ) আল্লাহ তা’আলার কাছ থেকে তা শুনেছেন এবং মুহাম্মাদ ﷺ-এর কাছে তা পৌঁছিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন:
وَإِنَّهُ لَتَنزِيلُ رَبِّ الْعَلَمِينَ * نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ * عَلَىٰ قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنذِرِينَ
“নিশ্চয়ই এটা (আল-কুরআন) জগতসমূহের প্রতিপালক হতে অবতীর্ণ। বিশ্বস্ত আত্মা (জিবরীল) তা নিয়ে অবতরণ করেছে আপনার হৃদয়ে, যাতে আপনি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হন”। [সূরা আশ-শু’আরা: ১৯২-১৯৪]
আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন:
قُلْ نَزَّلَهُ رُوحُ الْقُدُسِ مِنْ رَبِّكَ بِالْحَق
“বলুন, আপনার প্রতিপালকের নিকট হতে রূহুল কুদ্দুস (জিবরীল) সত্যসহ কুরআন অবতীর্ণ করেছেন”। [সূরা আন-নাহল: ১০২]
রাসূল ﷺ-এর নিকট কুরআন যেমন জিবরীল (আ)-এর মাধ্যমে নাযিল হয়েছে,
وَ اِنَّهٗ لَتَنۡزِیۡلُ رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ.. نَزَلَ بِهِ الرُّوۡحُ الۡاَمِیۡنُ
অবশ্যই এ কুরআন জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। বিশ্বস্ত আত্মা (জিবরাঈল) একে নিয়ে অবতরণ করেছে। [শুয়ারা:২৬: ১৯৩-১৯৩]
এই আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যায় কোরআন শুধু মাত্র একটি পদ্ধতিতে রাসূল ﷺ এর কাছে ওহী করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হল উপরোক্ত আয়াতে উল্লেখযোগ্য বাকি দুইটি পদ্ধতি ১. ওহীর মাধ্যমে, ২. পর্দার আড়াল থেকে, এর মাধ্যমে রাসুলের কাছে কোন ওহীগুলো অবতরণ করা হয়েছে?
রাসূল ﷺ এর কাছে ওহি এ তিন পদ্ধতিতেই নাজিল করা হয়েছে। এ বিষয় মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন
«وَكَذَٰلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِنْ أَمْرِنَا ۚ مَا كُنْتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ وَلَٰكِنْ جَعَلْنَاهُ نُورًا نَهْدِي بِهِ مَنْ نَشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا ۚ وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ»
এভাবেই (অর্থাৎ উপরোক্ত তিন পদ্ধতিতে) আমি তোমার প্রতি আমার নির্দেশ থেকে একটি রূহ (ওহী) প্রেরণ করেছি। তুমি জানতে না কিতাব কী এবং ঈমান কী। কিন্তু আমি এটিকে এমন এক আলো বানিয়েছি, যার মাধ্যমে আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করি। আর নিশ্চয়ই তুমি সরল পথের দিকে দিকনির্দেশনা প্রদান কর। [সূরা আশ-শূরা: ৫২]
এ আয়াত থেকে সুস্পষ্ট ভাবে প্রমানিত হয় যে আল্লাহ তায়ালা তার রাসূল ﷺ এর কাছে ওহি এ তিন পদ্ধতিতে নাজিল করেছে। এ ছাড়াও আরো আয়াত সমূহ থেকে এ কথা প্রমাণিত হয়। যেমন ,আল্লাহ বলেন
, إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّينَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَوْحَيْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَعِيسَى وَأَيُّوبَ وَيُونُسَ وَهَارُونَ وَسُلَيْمَانَ وَآتَيْنَا دَاوُودَ زَبُورًا ‘
নিশ্চয়ই আমি তোমার নিকট অহী পাঠিয়েছি, যেমন অহী পাঠিয়েছি নূহ ও তার পরে নবীগণের নিকট এবং আমি অহী পাঠিয়েছি ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব, তার বংশধরগণ, ঈসা, আইয়ূব, ইউনুস, হারূণ ও সুলায়মানের নিকটে এবং দাঊদকে প্রদান করেছি যাবূর’ [নিসা ৪/১৬৩]
অত্র আয়াত বিশ্লেষণে দেখা যায়, অহী নাযিলের ধারাবাহিকতায় নূহ (আ)-এর পর মুহাম্মাদ ﷺ-কে উল্লেখ করে তাঁকে অন্যান্য সকল নবীদের সাথে সাদৃশ্য প্রদান করা হয়েছে। কুরআনের ভাষায় উল্লিখিত নবীগণের সকলেই অহীপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, কিন্তু ইবরাহীম (আ), ঈসা (আ) এবং দাঊদ (আ) ব্যতীত তাঁদের কারোর কিতাবের কথা কুরআনে উল্লেখ করা হয়নি। এতে প্রতীয়মান হয় যে, তাঁদের কাছে যে প্রকার অহী প্রেরিত হয়েছিল তা ছিল সুন্নাহ। অত্র আয়াতে রাসূল ﷺ-কে উভয় প্রকার অহীপ্রাপ্তদের সাথে সমভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, রাসূল ﷺ-এর প্রতি দুই প্রকার অহীই নাযিল করা হয়েছিল। একটি হ’ল কুরআন, যা শব্দগতভাবে নাযিল হয়েছিল এবং অপরটি হাদীছ, যা অর্থগতভাবে নাযিল হয়েছিল।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম এর কাছে এই তিন ভাবেই ওহী নাযিল হয়েছে সে বিষয়ে আমরা হাদিস থেকেও দলিল পেয়ে থাকি। যেমন :
(১) সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। যা রাসূল ﷺ ৪০ বছর বয়সে রবীউল আউয়াল মাস থেকে রামাযান মাস পর্যন্ত প্রথম ছয়মাস প্রাপ্ত হয়েছিলেন। যা প্রভাত সূর্যের ন্যায় সত্য হয়ে দেখা দিত
عَنْ عَائِشَةَ أُمِّ الْمُؤْمِنِينَ، أَنَّهَا قَالَتْ أَوَّلُ مَا بُدِئَ بِهِ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مِنَ الْوَحْىِ الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ فِي النَّوْمِ،
উম্মুল মু’মিনীন ’আয়িশাহ (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ -এর নিকট সর্বপ্রথম যে ওয়াহী আসে, তা ছিল নিদ্রাবস্থায় বাস্তব স্বপ্নরূপে।[7]বুখারী হা/৩
(২) অদৃশ্য থেকে হৃদয়ে অহি-র প্রক্ষেপণ, যা জিব্রীল মাঝে-মধ্যে রাসূল ﷺ-এর উপরে করতেন।
وإِن رُوحَ الْقُدُسِ – نَفَثَ فِي رُوعِي أَنَّ نَفْسًا لَنْ تَمُوتَ حَتَّى تَسْتَكْمِلَ رِزْقَهَا
রূহুল কুদুস (জিবরীল আ) আমার অন্তরে এ কথাটি ঢেলে দিয়েছেন যে, কোন দেহ তার (নির্ধারিত) রিযক পরিপূর্ণভাবে ভোগ না করা পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না।[8]ছহীহাহ হা/২৮৬৬; মিশকাত হা/৫৩০০
(৩) মানুষের রূপ ধারণ করে জিব্রীলের আগমন। যেমন একবার দেহিয়াতুল কালবীর রূপ ধারণ করে ছাহাবীগণের মজলিসে এসে তিনি রাসূল ﷺ-কে ইসলাম, ঈমান, ইহসান ও ক্বিয়ামতের আলামত সম্পর্কে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে শিক্ষা দেন।
عَنْ أَبِي سُهَيْلٍ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّهُ سَمِعَ طَلْحَةَ بْنَ عُبَيْدِ اللَّهِ، يَقُولُ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مِنْ أَهْلِ نَجْدٍ ثَائِرُ الرَّأْسِ نَسْمَعُ دَوِيَّ صَوْتِهِ وَلاَ نَفْقَهُ مَا يَقُولُ حَتَّى دَنَا مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَإِذَا هُوَ يَسْأَلُ عَنِ الإِسْلاَمِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” خَمْسُ صَلَوَاتٍ فِي الْيَوْمِ وَاللَّيْلَةِ ” . فَقَالَ هَلْ عَلَىَّ غَيْرُهُنَّ قَالَ ” لاَ . إِلاَّ أَنْ تَطَّوَّعَ وَصِيَامُ شَهْرِ رَمَضَانَ ” . فَقَالَ هَلْ عَلَىَّ غَيْرُهُ فَقَالَ ” لاَ . إِلاَّ أَنْ تَطَّوَّعَ ” . وَذَكَرَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الزَّكَاةَ فَقَالَ هَلْ عَلَىَّ غَيْرُهَا قَالَ ” لاَ . إِلاَّ أَنْ تَطَّوَّعَ ” قَالَ فَأَدْبَرَ الرَّجُلُ وَهُوَ يَقُولُ وَاللَّهِ لاَ أَزِيدُ عَلَى هَذَا وَلاَ أَنْقُصُ مِنْهُ . فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” أَفْلَحَ إِنْ صَدَقَ ” .
তালহাহ ইবনু উবাইদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তালহাহ ইবনু উবাইদুল্লাহ (রা) বলেন, নাজদের বাসিন্দা এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর খিদমতে আসলো। তার মাথার চুলগুলো ছিল এলোমেলো ও বিক্ষিপ্ত। আমরা তার গুন গুন আওয়াজ শুনছিলাম, কিন্তু সে কী বলছিল তা বুঝা যাচ্ছিলো না। অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর অতি নিকটে এসে ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেনঃ দিন-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত। সে বললো, এ ছাড়া আমার কোন কিছু (সালাত) আছে কি? তিনি বললেন, না তবে নফল আদায় করতে পারো। এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে যাকাত প্রদানের কথাও বললেন। সে জিজ্ঞেস করলো, এ ছাড়া আমার উপর আরো কোন কর্তব্য আছে কি? তিনি বললেন, না। তবে নফল দান-সাদাকা করতে পারো। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর লোকটি এ কথা বলতে বলতে চলে গেল, “আমি এর বেশিও করবো না, আর কমও করবো না। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, লোকটি যদি তার কথার সত্যতা প্রমাণ করতে পারে তাহলে সফলকাম হয়েছে।[9]মুসলিম হা/৮; নাসাঈ হা/৪৯৯১; মিশকাত হা/২।
সুতরাং এখান থেকে প্রমাণিত হয় যে রাসূল ﷺ এর নিকট আল্লাহ তাআলা উপর উক্ত তিন পদ্ধতিতেই এই ওহী নাযিল করেছেন যা কোরআনুল কারীমের মধ্যে আল্লাহ তাআলা বলেছেন।
কুরআনের বাইরে ওহি নাজিল হওয়ার প্রমাণ
আহলে কুরআন বা হাদিস অস্বীকারকারীদের অন্যতম দাবি হলো, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি কেবল কুরআনই নাজিল হয়েছে; কুরআনের বাইরে কোনো ওহি নাজিল হয়নি। অথচ কুরআন মাজীদেই একাধিক স্থানে স্পষ্টভাবে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল ﷺ-কে কুরআনের বাইরে আরও ওহির মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় অবহিত করেছেন এবং নির্দেশনা প্রদান করেছেন। নিম্নে কয়েকটি সুস্পষ্ট প্রমাণ উল্লেখ করা হলো।
প্রমাণ–১ : গোপন কথার সংবাদ আল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো
«وَإِذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ إِلَىٰ بَعْضِ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا… قَالَ نَبَّأَنِيَ الْعَلِيمُ الْخَبِيرُ
“আর যখন নবী তাঁর এক স্ত্রীকে গোপনে একটি কথা বলেছিলেন; অতঃপর সে তা অন্যকে জানিয়ে দিল এবং আল্লাহ তা নবীকে প্রকাশ করে দিলেন… তখন সে বলল, ‘আপনাকে এ সংবাদ কে দিল?’ তিনি বললেন, ‘আমাকে মহাজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ আল্লাহ জানিয়েছেন।’ [সূরা আত-তাহরীম, আয়াত ৩]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন যে, নবী ﷺ-কে একটি গোপন ঘটনার সংবাদ আল্লাহ নিজেই দিয়েছেন। অথচ এই সংবাদ কুরআনের কোনো পূর্ববর্তী আয়াতে ছিল না। এটি ছিল কুরআনের বাইরে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহির মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া একটি বিষয়।
প্রমাণ–২ : পূর্ববর্তী কিবলার নির্দেশ
«وَمَا جَعَلْنَا الْقِبْلَةَ الَّتِي كُنْتَ عَلَيْهَا…
“যে কিবলার উপর তুমি ছিলে, তাকে কেবল এ জন্যই নির্ধারণ করেছিলাম, যাতে আমি জেনে নেই কে রাসূলের অনুসরণ করে এবং কে তার পেছনে ফিরে যায়। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত ১৪৩]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, পূর্ববর্তী কিবলাও তিনিই নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু কুরআনে কোথাও বাইতুল মাকদিসের দিকে মুখ করে সালাত আদায়ের প্রথম নির্দেশ উল্লেখ নেই। অতএব, সেই নির্দেশ কুরআনের বাইরে ওহির মাধ্যমেই রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে প্রদান করা হয়েছিল।
প্রমাণ–৩ : যায়নাব (রা)-এর সাথে বিবাহের নির্দেশ
«…فَلَمَّا قَضَىٰ زَيْدٌ مِّنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنَاكَهَا…
“অতঃপর যায়েদ যখন তার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক শেষ করল, তখন আমি তাকে তোমার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম, যাতে মুমিনদের জন্য কোনো সংকীর্ণতা না থাকে।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৩৭]
রাসূলুল্লাহ ﷺ ও যায়নাব (রা)-এর বিবাহ আল্লাহর বিশেষ নির্দেশে সম্পন্ন হয়েছিল। এই নির্দেশও কুরআনের বাইরে ওহির মাধ্যমে প্রথমে রাসূল ﷺ-কে জানানো হয়েছিল; পরে তা কুরআনে নাজিল করে উম্মতের জন্য চিরস্থায়ী বিধান হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
প্রমাণ–৪ : খেজুর গাছ কাটার অনুমতি
«مَا قَطَعْتُمْ مِنْ لِينَةٍ أَوْ تَرَكْتُمُوهَا قَائِمَةً عَلَىٰ أُصُولِهَا فَبِإِذْنِ اللَّهِ…
“তোমরা যে খেজুর গাছ কেটেছ অথবা যেগুলোকে তাদের মূলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দিয়েছ—তা ছিল আল্লাহর অনুমতিক্রমে, যাতে তিনি ফাসিকদের লাঞ্ছিত করতে পারেন।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত ৫]
বনু নাযীর অভিযানের সময় কিছু খেজুর গাছ কাটার নির্দেশ রাসূলুল্লাহ ﷺ দিয়েছিলেন। পরে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দেন যে, এই নির্দেশ তাঁরই অনুমতিক্রমে ছিল। অর্থাৎ কুরআনে আয়াত নাজিল হওয়ার পূর্বেই আল্লাহ ওহির মাধ্যমে রাসূল ﷺ-কে এ অনুমতি দিয়েছিলেন।
প্রমাণ–5 : রমযানের রাতে স্ত্রীসহবাসের পূর্ববর্তী নিষেধাজ্ঞা ও কুরআনের মাধ্যমে তার রহিতকরণ
ইসলামের প্রাথমিক যুগে রমযানের রোযার বিধান বর্তমান বিধানের তুলনায় কিছুটা কঠোর ছিল। সে সময় কোনো ব্যক্তি ইফতার করার পর ঘুমিয়ে পড়লে, পরবর্তী সময়ে জেগে ওঠার পর তার জন্য পুনরায় পানাহার করা এবং স্ত্রীসহবাস করা নিষিদ্ধ হয়ে যেত। অর্থাৎ সূর্যাস্তের পর সে ঘুমিয়ে পড়লে তার পরবর্তী রাতটি ফজর পর্যন্ত তার জন্য রোযার বিধানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেত।
এ বিধানের বিস্তারিত বিবরণ আমরা হাদীছের মাধ্যমে জানতে পারি। সাহাবী বারা ইবনু ‘আযিব (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রমযানের শুরুতে কোনো ব্যক্তি ইফতারের পর ঘুমিয়ে গেলে পরবর্তী রাত পর্যন্ত তার জন্য পানাহার ও স্ত্রীসহবাস বৈধ থাকত না। একবার কায়স ইবনু সিরমাহ আল-আনসারী (রা) দিনের বেলায় কঠোর পরিশ্রম করে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে স্ত্রীকে খাবার প্রস্তুত করতে বললেন। স্ত্রী খাবার আনতে গেলেন। এদিকে তিনি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। স্ত্রী ফিরে এসে তাঁকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে বললেন, ‘আপনি তো ঘুমিয়ে পড়েছেন!’ ফলে তিনি আর খাবার গ্রহণ করলেন না এবং পরদিন অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় কাজ করতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। অন্যদিকে কিছু সাহাবীও পূর্ববর্তী বিধানের কারণে নিজেদের ওপর এমন কষ্ট আরোপ করেছিলেন যে, ইফতারের পর ঘুমিয়ে যাওয়ার পর স্ত্রীদের কাছে গমন করেছিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাযিল করেন
أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلَىٰ نِسَائِكُمْ ۚ هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ ۗ عَلِمَ اللَّهُ أَنَّكُمْ كُنتُمْ تَخْتَانُونَ أَنفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَعَفَا عَنكُمْ ۖ فَالْآنَ بَاشِرُوهُنَّ وَابْتَغُوا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ ۚ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ۖ ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ ۚ وَلَا تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ ۗ تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَقْرَبُوهَا ۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ
“রোযার রাতে তোমাদের স্ত্রীদের সঙ্গে সহবাস করা তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে। তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক। আল্লাহ জানতেন যে, তোমরা নিজেদের সঙ্গে খিয়ানত করছিলে। অতঃপর তিনি তোমাদের তওবা কবুল করলেন এবং তোমাদের ক্ষমা করলেন। সুতরাং এখন তোমরা তাদের সঙ্গে সহবাস কর এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন তা অনুসন্ধান কর। আর তোমরা পানাহার কর, যতক্ষণ না তোমাদের কাছে ভোরের শুভ্র রেখা কালো রেখা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়। অতঃপর রাত পর্যন্ত রোযা পূর্ণ কর। আর তোমরা যখন মসজিদে ই‘তিকাফে অবস্থান কর, তখন তাদের সঙ্গে সহবাস করো না। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা। অতএব তোমরা তার নিকটবর্তী হয়ো না। এভাবেই আল্লাহ মানুষের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে।” [সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৭]
এই আয়াতের মধ্যে কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে।
প্রথমত, “فَالْآنَ بَاشِرُوهُنَّ” – “অতএব এখন তোমরা তাদের সঙ্গে সহবাস কর” – এই ঘোষণা থেকে বোঝা যায় যে, এর পূর্বে এমন একটি সময় ছিল যখন এই অনুমতি বর্তমান অবস্থার মতো ব্যাপক ছিল না। “এখন” বলা হয়েছে পূর্ববর্তী অবস্থার পরিবর্তন ও নতুন বিধান প্রবর্তনের ঘোষণা হিসেবে।
দ্বিতীয়ত, “عَلِمَ اللَّهُ أَنَّكُمْ كُنتُمْ تَخْتَانُونَ أَنفُسَكُمْ”-“আল্লাহ জানতেন যে, তোমরা নিজেদের সঙ্গে খিয়ানত করছিলে”-এখানে পূর্ববর্তী বিধান অমান্য করে যারা নিজেদের ওপর অন্যায় করেছিল, তাদের অবস্থার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে।
তৃতীয়ত, “فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَعَفَا عَنكُمْ-“অতঃপর তিনি তোমাদের তওবা কবুল করলেন এবং তোমাদের ক্ষমা করলেন”-ক্ষমা ও তওবার উল্লেখও পূর্বে সংঘটিত নিষিদ্ধ কাজের প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। অর্থাৎ এমন কিছু ঘটেছিল, যা পূর্ববর্তী বিধানের পরিপন্থী ছিল।
চতুর্থত, আয়াতের ভাষা “فَالْآنَ”-“অতঃপর এখন” বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এটি পূর্ববর্তী অবস্থার সঙ্গে পরবর্তী বিধানের পার্থক্য স্পষ্ট করে। পূর্বে যে বিষয়ে সংকীর্ণতা ছিল, এখন তা প্রশস্ত করে দেওয়া হলো।
এখানে আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এই পূর্ববর্তী বিধানের বিস্তারিত বিবরণ কুরআনের কোনো আয়াতে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি। কুরআন শুধু পরবর্তী বিধানটি ঘোষণা করেছে এবং “এখন” স্ত্রীসহবাসের অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু ইফতারের পর ঘুমিয়ে গেলে কেন পরবর্তী সময় স্ত্রীসহবাস নিষিদ্ধ হয়ে যেত এই বিস্তারিত বিধানটি আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীছের মাধ্যমে জানতে পারি। অতএব, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আসে:
কুরআন শরী‘আতের সব বিধানকে শুধু কুরআনের পূর্ববর্তী আয়াতের পুনরাবৃত্তি হিসেবে উপস্থাপন করেনি; বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মাধ্যমে প্রচলিত কোনো বিধানের পরবর্তী পরিবর্তন বা সংশোধনও কুরআন দ্বারা ঘোষণা করা হয়েছে।
আর যদি কেউ দাবি করে যে, কুরআনের বাইরে রাসূলুল্লাহ ﷺ কোনো শরী‘আতগত নির্দেশ দিতে পারেননি, তাহলে তাকে এই ঘটনার একটি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। কারণ, পূর্ববর্তী রমযানের বিধানের বিস্তারিত বিবরণ কুরআনে নেই; অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে মুসলমানরা সেই বিধান অনুসরণ করছিলেন এবং পরবর্তীতে কুরআন এসে সেই বিধানকে পরিবর্তন করে দেয়।
উপরোক্ত আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি কেবল কুরআনই নয়, কুরআনের বাইরেও আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি নাজিল হতো। কখনো গোপন সংবাদ জানানো হয়েছে, কখনো কোনো বিধান প্রদান করা হয়েছে, কখনো কোনো কাজের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অতএব, কুরআনের বাইরে ওহির অস্তিত্ব অস্বীকার করা কুরআনেরই সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিরোধিতা। আর এই কুরআনের বাইরের ওহিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত রূপ হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সহীহ সুন্নাহ ও হাদিস।
Footnotes
| ⇧1 | সুনান আবূ দাঊদ, হাদিস ৪৬০৫। |
|---|---|
| ⇧2 | সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত): ২৬৬৩ |
| ⇧3 | জামে‘ আত-তিরমিজি, ২৬৬৪; সুনান আদ-দারিমী, ৫৮৬ |
| ⇧4 | সুনান আবূ দাঊদ, ৪৬০৪; সহীহুল জামি‘, ২৬৪৩; সুনান ইবনু মাজাহ, ১২ |
| ⇧5 | আল-বুখারী (৬০০৮ |
| ⇧6 | تفسير ابن كثير – ط أولاد الشيخ ١٣/٢٤٧ |
| ⇧7 | বুখারী হা/৩ |
| ⇧8 | ছহীহাহ হা/২৮৬৬; মিশকাত হা/৫৩০০ |
| ⇧9 | মুসলিম হা/৮; নাসাঈ হা/৪৯৯১; মিশকাত হা/২। |




