শরিয়াহ আইনইসলামবিরোধীদের প্রতি জবাব

ইসলাম কি সকল অমুসলিমকে হত্যা করতে বলে?

ইসলামবিদ্বেষীরা সবসময় এই কথা খুব জোর দিয়ে প্রচার করে থাকে যে, ইসলাম সকল অমুসলিমকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়। তাদের এই দাবির পক্ষে দলিল স্বরুপ সুরা নিসার ৮৯ থেকে ৯০ নং আয়াত উল্লেখ করে। সাথে সুরা বাকারার ১৯১ নং আয়াত ও সুরা তাওবার ৫ নং আয়াতও তাদের দাবির মূল পুঁজি। কিন্তু তারা আয়াতগুলো দ্বারা যেভাবে বিষয়টিকে উপস্থাপন করে বা মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে, তা কি উক্ত আয়াতগুলির প্রকৃত বুঝ? নাকি তাদের স্বল্প জ্ঞানের কুৎসিত মনোভাবের বুলি? তারা যেভাবে বলে, কোরআন কি সেভাবেই বিষয়টা বুঝাতে চেয়েছে? আমাদের সালাফগন কি সেটাই বুঝেছেন? আমাদের বিধান গুলি কি তাদের মিথ্যাচার গুলিই? আসুন আমরা দেখে নেই আয়াত গুলির প্রকৃত হুকুম কি এবং আমাদের সালাফদের বুঝ কি। আয়াত গুলো নিয়ে আলোচনার পূর্বে আমারা প্রথমে দেখে নেই যে, ইসলামের দৃষ্টিতে সকল কাফেরর সাথে যুদ্ধ বৈধ কিনা এবং তাদের হত্যা করা জায়েয কিনা।

কাফেরদের শ্রেণী বিন্যাস ও তাদের হুকুম 

ইসলামের দৃষ্টিতে একটি মুসলিম রাষ্ট্র কাফেরদেরকে সাধারনত ৪ ভাগে বিভক্ত করে।

১) ذمي ( জিম্মি )
২) معاهد ( মু’আহাদ )
৩) مستأمن ( মুস্তা’মান )
৪) حربي ( হারবি )

১. ذمي ( জিম্মি )

ওই সমস্ত অমুসলিমদেরকে বলা হয়, যারা মুসলিম রাষ্ট্রের অধীন সুরক্ষার মধ্য দিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করে।

২. معاهد ( মু’আহাদ )

ওই সমস্ত অমুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিক, যারা মুসলিম রাষ্ট্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ।

৩. مستأمن ( মুস্তা’মান )

ওই সমস্ত অমুসলিমদেরকে বলা হয়, যারা মুসলিম রাষ্ট্র থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মুসলিম ভূখণ্ডে প্রবেশ করে।

৪. حرب ( হারবি )

ওই সমস্ত অমুসলিমদের বলা হয়, যারা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধরত পক্ষের অন্তর্ভুক্ত এবং তাদের সাথে মুসলিমদের জিম্মি, চুক্তি ও আমানভিক্তিক নিরাপত্তার সম্পর্ক নেই।[1]আল-মুগনি লি ইবনে কুদামা, ১৩/২৫০; আল-বিনায়াহ শরহুল হিদায়াহ, ৭/২০২; আহকামে আহলুজ-জিম্মা ইতাআতুল ইলম লি ইবনে কাইমিয়া,২/৪৪; ফাতহুল কাদীর, ৪/২৯৩; ফতুয়ায়ে হিন্দিয়্যাহ, ১/১৮১; আল-উম, ৪/১১০; বাদায়েউস সানাআ’ই, ৭/২৩৬

উপরোক্ত প্রথম ৩ ধরনের কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করা বা তাদের হত্যা করা বৈধ নয় যা নিয়ে মুসলিম উম্মাহর কোন দ্বীমত নেই, এই ৩ প্রকারের কাফেরদেরকে হত্যা না করার বিষয়ে কোরআন ও সুন্নাহ হতে দলিলাদিও যথেষ্ট পরিমান রয়েছে যার কারনে আর সেগুলো এখানে উল্লেখ করে লিখা বড় করছি না।

যুদ্ধ তো শুধু হারবি বা যুযুৎসুর সাথে। কিন্তু কথা হচ্ছে, যেই সকল হারবি বা যুযুৎসুদের মাঝে এমন অমুসলিম বসবাস করে যারা নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অ-যুযুৎসু তাদের বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিকোণ কি? উত্তর হচ্ছে এদের সাথে যুদ্ধ করা এবং তাদের হত্যা করা নিষিদ্ধ। এদেরকে মূলত غير المقاتلين ( অযোদ্ধা ব্যাক্তি ) বলা হয়। কোরআনে শুধু যোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এবং সীমা লঙ্ঘন করতে নিষেধ করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন—

وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ

অর্থাৎ— যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে তোমরা আল্লাহর পথে তাদের সাথে যুদ্ধ কর, তবে সীমালংঘন করো না। নিশ্চিত জেন, আল্লাহ সীমালংঘনকারীদের ভালোবাসেন না।

[সুরা বাকারা, ২:১৯০ – https://muslimbangla.com/sura/2/tafsir/190]

রাসুল ﷺ ফরমান ছিল অযোদ্ধাদের হত্যা না করা। যেমন ইবনে উমর রাদি: বলেন—

وُجِدَتِ امْرَأَةٌ مَقْتُولَةً فِي بَعْضِ مَغَازِي رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى  عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، «فَنَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْاللهُ قَتْلِ النِّسَاءِ وَالصِّبْيَانِ»

অর্থাৎ—  রাসূলুল্লাহ ﷺ- এর কোন এক যুদ্ধে জনৈকা মহিলাকে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ মহিলা ও শিশুদের হত্যা করতে নিষেধ করেন।

সহীহ বর্ননা[2]সহিহুল বুখারী, হাদিস নং ২৮০৬; সহিহুল মুসলিম, হাদিস নং ৪৩৯৭; – https://muslimbangla.com/hadith/2805

আরেক বর্ননায় এসেছে যে, রিবাহ ইবনে রাবী রাদি: বলেন —

كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي غَزْوَةٍ فَرَأَى النَّاسَ مُجْتَمِعِينَ عَلَى شَىْءٍ فَبَعَثَ رَجُلاً فَقَالَ ” انْظُرْ عَلاَمَ اجْتَمَعَ هَؤُلاَءِ ” فَجَاءَ فَقَالَ عَلَى امْرَأَةٍ قَتِيلٍ . فَقَالَ ” مَا كَانَتْ هَذِهِ لِتُقَاتِلَ ” . قَالَ وَعَلَى الْمُقَدِّمَةِ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ فَبَعَثَ رَجُلاً فَقَالَ ” قُلْ لِخَالِدٍ لاَ يَقْتُلَنَّ امْرَأَةً وَلاَ عَسِيفًا ”

অর্থাৎ— আমরা কোন এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি কিছু লোককে এক স্থানে একত্রিত হতে দেখেন। তখন তিনি এক ব্যক্তিকে পাঠান এবং বলেনঃ দেখ তো এরা কি জন্য সেখানে একত্রিত হয়েছে? তখন সে ব্যক্তি এসে বললঃ তারা জনৈক নিহত মহিলার নিকট একত্রিত হয়েছে। তখন নবী ﷺ বলেনঃ এ মহিলা তো কারো সাথে যুদ্ধ করতে আসেনি (একে মারা হলো কেন?) তখন এক ব্যক্তি বললঃ অগ্রবর্তী সেনাদলের নেতা হলেন খালিদ ইবনে ওয়ালীদ। তখন তিনি এক ব্যক্তিকে পাঠিয়ে বলেনঃ খালিদকে বল, মহিলা ও মজদুর (খাদিম) কে যেন হত্যা না করে।

সহীহ বর্ননা[3]সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২৬৬০; ত্বহাবী, হাদিস নং ৫২৭৯; ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২৮৪২; – https://muslimbangla.com/hadith/17007

এক বর্ননায় এসেছে যে, হজরত উমর ইবনে খাত্তাব রাদি. মুজাহিদের একটি চিঠিতে ফরমান স্বরুপ বলেন—

 أَنْ يُقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يُقَاتِلُوا إِلَّا مَنْ قَاتَلَهُمْ، وَلَا يَقْتُلُوا النِّسَاءَ وَلَا الصِّبْيَانَ، وَلَا يَقْتُلُوا إِلَّا مَنْ جَرَتْ عَلَيْهِ الْمُوسَى، وَكَتَبَ إِلَى أُمَرَاءِ الْأَجْنَادِ: أَنْ يَضْرِبُوا الْجِزْيَةَ، وَلَا يَضْرِبُوهَا عَلَى النِّسَاءِ وَالصِّبْيَانِ وَلَا يَضْرِبُوهَا إِلَّا عَلَى مَنْ جَرَتْ عَلَيْهِ الْمُوسَى

অর্থাৎ— তারা যেন (মুজাহিদগন) আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, এবং শুধুমাত্র তাদেরই হত্যা করে যারা তাদের (মুজাহিদদের) সাথে যুদ্ধ করবে, এবং তারা (মুজাহিদরা) যেন নারীদের ও শিশুদের হত্যা না করে। এমন কাউকে হত্যা না করে যার মধ্যে বালেগ হওয়ার আলামত নেই।” তিনি সৈন্যদল গুলোর সেনাপতিদের প্রতি আরো লিখে বলেন: “তারা যেন জিয়িয়া প্রয়োগ করে, এবং নারী, শিশুদের উপর যেন জিযিয়া প্রয়োগ না করা হয়। এমন কারো উপরই যেন প্রয়োগ না করা হয় যাদের বালেগ হয়ার আলামত প্রকাশ পায়নি।

এর সনদ সহীহ[4]কিতাবুল আমওয়াল, হাদিস নং ৯৩ – https://shamela.ws/book/12999/90

এই সনদটি সম্পর্কে নাসিরুদ্দিন আল-আলবানী “ইরওয়াউল গালিল”(৫/৯৬) এ বলেন “এই সনদটি শায়খায়নদের শর্তে সহিহ”। সুহাইব আব্দুল জাব্বার এই হাদিসটিকে “আল-জামিউস সহিহ”(৩৭/২১৬) এ উল্লেখ্য করে সহিহ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

ইমাম আবু হানিফা রহি. এর ফতুয়া সম্পর্কে ইমাম ইউসুফ রহি. বলেন—

سألت أبا حنيفة رحمه الله تعالى عن قتل النساء والصبيان والشيخ الكبير الذي لا يطيق القتال والذين بهم زمانة لا يطيقون القتال فنهى عن ذلك وكرهه

অর্থ্যাৎ— আমি আবু হানিফাকে নারী, শিশু, এমন বৃদ্ধ যে যুদ্ধ করতে অক্ষম এবং এমন বিকলাঙ্গ যারা যুদ্ধ করতে অক্ষম —তাদের হত্যা করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি তা নিষেধ করেছেন এবং অপছন্দ করেছেন।[5]আল মাবসুত, ১০/১৩৭ – https://ready.shamela.ws/pdf/pdfjs.html?file=https%3A%2F%2Fready.shamela.ws%2Fpdf%2Fmbsootsrkhsy%2Fmbsoot10.pdf#page=137

এই বিষয়ে ইমাম মালেক রহি. —এর মতামত উদ্ধৃতি করতে গিয়ে ইমাম সাহ্’নুন বলেন—

قُلْت لِابْنِ الْقَاسِمِ: هَلْ كَانَ مَالِكٌ يَكْرَهُ قَتْلَ النِّسَاءِ وَالصِّبْيَانِ وَالشَّيْخِ الْكَبِيرِ فِي أَرْضِ الْحَرْبِ؟ قَالَ: نَعَمْ. قُلْت: فَهَلْ كَانَ مَالِكٌ يَكْرَهُ قَتْلَ الرُّهْبَانِ الْمُحْبَسِينَ فِي الصَّوَامِعِ وَالدِّيَارَاتِ؟ قُلْت: أَرَأَيْت الرَّاهِبَ هَلْ يُقْتَلُ؟ قَالَ: سَمِعْت مَالِكًا يَقُولُ لَا يُقْتَلُ الرَّاهِبُ،

অর্থ্যাৎ— আমি ইবনে কাসিম কে জিজ্ঞেস করলাম, মালেক কি যুদ্ধের ময়দানে নারী, শিশু, ও বৃদ্ধদের হত্যা করা অপছন্দ করতেন? তিনি বললেন “হ্যাঁ”। আমি জিজ্ঞেস করলাম, মালেক কি উপাসনালয়ে থাকা সন্ন্যাসীদের হত্যা করা অপছন্দ করতেন? আপনি কি মনে করেন, সন্ন্যাসীকে হত্যা করা হবে? ইবনে কাশেম বললেন, “আমি মালেককে বলতে শুনেছি: সন্ন্যাসীকে হত্যা করা হবে না।”[6]আল-মুদাওনাতুল কুবর, ১/৪৯৯ – https://shamela.ws/book/587/387

ইমাম কাছানি রহি. বলেন—

أَمَّا حَالَ الْقِتَالِ فَلَا يَحِلُّ فِيهَا قَتْلُ امْرَأَةٍ وَلَا صَبِيٍّ، وَلَا شَيْخٍ فَانٍ، وَلَا مُقْعَدٍ وَلَا يَابِسِ الشِّقِّ، وَلَا أَعْمَى، وَلَا مَقْطُوعِ الْيَدِ وَالرِّجْلِ مِنْ خِلَافٍ، وَلَا مَقْطُوعِ الْيَدِ الْيُمْنَى، وَلَا مَعْتُوهٍ، وَلَا رَاهِبٍ فِي صَوْمَعَةٍ، وَلَا سَائِحٍ فِي الْجِبَالِ لَا يُخَالِطُ النَّاسَ،

অর্থ্যাৎ— যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় কোন নারী, কোন শিশু, কোন অতি বৃদ্ধ, কোন পঙ্গু, শরীরের এক এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া ব্যক্তি, কোন অন্ধ, বিপরীত দিকের হাত পা কেটে যাওয়া ব্যক্তি, ডান হাত কাটা ব্যক্তি, মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি, উপাসনালয় অবস্থানরত কোন সন্ন্যাসী এবং পাহাড়ের নির্জনে বসবাসরত এমন লোক যে লোকালয়ের কোন মানুষের সাথে মেলামেশা করে না। তাদের হত্যা করা বৈধ নয়।[7]বাদাউস সানাই ফি তারতীবিশ শারাই, ৭/১০১ – https://ready.shamela.ws/pdf/pdfjs.html?file=https%3A%2F%2Fready.shamela.ws%2Fpdf%2Fbdsnatrtbsh%2F07_bsts.pdf#page=101

এই বিষয়ে ইমাম সারাখসি রহি. বলেন—

وَلَا يُقْتَلُ الْأَعْمَى وَلَا الْمُقْعَدُ وَالْمَعْتُوهُ مِنْ الْأَسَارَى لِأَنَّهُ إنَّمَا يُقْتَلُ مَنْ يُقَاتِلُ

অর্থ্যাৎ— অন্ধ, পঙ্গু, মানসিকভাবে অক্ষম বন্দীদেরকে হত্যা করা যাবে না। হত্যা শুধু তাদের কেই করা হয় যারা যুদ্ধ করে।[8]আল-মাবসুত, ১০/৬৪ –  https://ready.shamela.ws/pdf/pdfjs.html?file=https%3A%2F%2Fready.shamela.ws%2Fpdf%2Fmbsootsrkhsy%2Fmbsoot10.pdf#page=64

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহি. বিষয়টি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে অধ্যায়ের শিরোনাম তুলেছেন এভাবে—

الدَّلِيلُ الأَوَّلُ عَلَى تَحْرِيمِ قَتْلِ الكَافِرِ لمُجَرَّدِ كُفْرِ

অর্থাৎ— শুধুমাত্র তার কুফুরের কারণে কাফেরকে হত্যা করা নিষিদ্ধ হওয়ার প্রথম দলিল।

অতঃপর তিনি বলেন—

فَهَذَا الأَصْلُ الَّذِي ذَكَرْنَاهُ – وَهُوَ أَنَّ القِتَالَ لِأَجْلِ الحِرَابِ لَا لِأَجْلِ الكُفْرِ هُوَ الَّذِي يَدُلُّ عَلَيهِ الكِتَابُ وَالسُّنَّةُ، وَهُوَ مُقْتَضَى الاعتبار. وَذَلِكَ: أَنَّهُ لَو كَانَ الكُفْرُ هُوَ المُوجِبُ لِلْقَتْلِ بَلْ هُوَ المُبْيحُ لَهُ لَمْ يحرِّمْ قَتْلَ النِّسَاءَ

অর্থাৎ— আমরা যে মূলনীতি উল্লেখ করছি, অর্থাৎ “যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার কারণে যুদ্ধ করা, কুফরের কারণে নয়” কোরআন ও সুন্নাহ তারই প্রমান দেয়। আর এটি বিবেচনারও দাবি। এটির কারণ হলো, যদি কুফরির দোষে হত্যার কারণ হতো বা হত্যা করা বৈধ হতো, তাহলে নারীদের হত্যা করা নিষিদ্ধ হতো না।[9]কায়িদাতুন মুখতাসারাতুন ফি কিতালিল কুফফারি ওয়া মুহাদানাতিহিম ওয়া তাহরিমি কাতলিহিম লিমুজাররাদি কুফরিহিম, পৃ: ১৮৮ – https://shamela.ws/book/147669/181

উপরোক্ত বর্ণনাগুলো থেকে এই বিষয়টি বুঝতে পারলাম যে, সকল অমুসলিমদের সাথে যুদ্ধ নয়। যুদ্ধ শুধু যোদ্ধাদের সাথে, কিন্তু তাদের মাঝে থাকা অযোদ্ধাদের হত্যা বৈধ নয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সকল যোদ্ধাদের গড়ে হত্যার অনুমতিও ইসলাম দেয় না। বরং পরিস্থিতি সাপেক্ষে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে। হয় তাদের মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্তি দিবে, নয়তো দাস বানাবে, স্বাধীন করবে না হয় ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলে হত্যা করবে। যেমন আল্লাহ বলেন—

فَاِذَا لَقِیۡتُمُ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا فَضَرۡبَ الرِّقَابِ ؕ حَتّٰۤی اِذَاۤ اَثۡخَنۡتُمُوۡہُمۡ فَشُدُّوا الۡوَثَاقَ ٭ۙ فَاِمَّا مَنًّۢا بَعۡدُ وَاِمَّا فِدَآءً حَتّٰی تَضَعَ الۡحَرۡبُ اَوۡزَارَہَا

অর্থাৎ— যারা কুফর অবলম্বন করেছে, তাদের সাথে যখন তোমরা মুকাবেলা কর, তখন তাদের গর্দানে আঘাত করবে। অবশেষে তোমরা যখন তাদের শক্তি চূর্ণ করবে, তখন তাদেরকে শক্তভাবে গ্রেফতার করবে। তারপর চাইলে (তাদেরকে) মুক্তি দেবে অনুকম্পা দেখিয়ে অথবা মুক্তিপণ নিয়ে। (তোমাদের প্রতি এটাই নির্দেশ,) যাবৎ না যুদ্ধ তার অস্ত্র রেখে দেয় (অর্থাৎ যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়)।

[সুরা মুহাম্মদ, ৪৭:৪ – https://muslimbangla.com/sura/47/tafsir/4]

রাসুল ﷺ বলেন—

فُكُّوا العَانِيَ، يَعْنِي: الأَسِيرَ، وَأَطْعِمُوا الجَائِعَ، وَعُودُوا المَرِيضَ

অর্থাৎ— তোমরা বন্দীকে মুক্ত কর, ক্ষুধার্তকে আহার দান কর এবং রোগীর সেবা-শুশ্রুষা কর।[10]সহীহ বুখারী, হাদিস নং ২৮৩২ – https://muslimbangla.com/hadith/2832

মুক্তিপণ বিষয়ে হাদিস গুলো অত্যাধিক দীর্ঘ হওয়ার কারণে বর্ননা গুলি উল্লেখ করা সম্ভব হয় নাই। কিন্তু এটা একটি পরিচিত বিষয়। তা ছাড়া রাসুল ﷺ থেকে এমন বর্ননা অনেক আছে, যাতে দেখা যায় যে, রাসুল ﷺ মুক্তিপণ ছাড়াও কাফেরদের মুক্তি দিয়েছেন। যেমন মক্কা বিজয়। তাই ইমামদের কয়েকটি বক্তব্য উল্লেখ করছি। যেমন ইমাম কুদুরী আল-হানাফি রহি: বলেন—

إن شاء قتلهم وإن شاء استرقهم وإن شاء تركهم أحرارا ذمة للمسلمين

অর্থাৎ— তিনি ( নেতা ) চাইলে তাদের ( বন্দীদের ) হত্যা করবেন, চাইলে তাদের দাস বানাতে পারেন, আর চাইলে তাদের স্বাধীন করে মুসলমানদের জিম্মায় রেখে দিতে পারেন।[11]মুখতাছারে কুদুরী, পৃ: ২৩২ –  https://ready.shamela.ws/pdf/pdfjs.html?file=https%3A%2F%2Fready.shamela.ws%2Fpdf%2Fmkhtsrkdreweda%2F75029.pdf#page=23

ইমাম ইবনে রুশদ আল-মালেকী রহি: বলেন—

مذهب مالك أن الإمام مخير في الأسارى على وجه الاجتهاد بين خمسة أشياء: إما أن يقتل، وإما أن يأسر ويستعبد، وإما أن يعتق، وإما أن يأخذ فيه الفداء، وإما أن يعقد عليه الذمة ويضرب عليه الجزية؛

অর্থাৎ— মালেকের মাজহাব হচ্ছে —নেতা বন্দিদের ব্যাপারে ইজতিহাদের ভিত্তিতে পাঁচটি বিষয়ে ইখতিয়ার রাখেন। হয়তো তিনি তাদের হত্যা করবেন, অথবা তাদের বন্দী করে দাস বানাবেন, অথবা তাদের মুক্ত করে দিবেন, অথবা তাদের বিনিময়ে মুক্তিপণ নিবেন, অথবা তাদের সাথে জিম্মি চুক্তি করবেন এবং তাদেরকে উপর জিযিয়া আরপ করবেন।[12]আল-বয়ান ওয়া আত-তাহসীন, ২/৫৬০ – https://shamela.ws/book/21751/1053#p1

ইবনে কুদামা আল-হাম্বলী রহি: বলেন—

وَإذا سَبَى الْإِمامُ فَهُوَ مُخَيَّرٌ، إنْ رَأَى قَتَلَهُم، وإنْ رأَى مَنَّ عَلَيْهِمْ وأَطْلَقَهُمْ بِلَا عِوَضٍ، وإنْ رأَى أطْلَقَهُمْ عَلَى مَالٍ يَأْخُذُهُ مِنْهُمْ، وإنْ رَأَىَ فَادَى بِهِمْ، وإنْ رَأَىَ اسْتَرَقَّهُم، أىَّ ذلِكَ رَأَى فِيهِ نِكايَةً للْعَدُوِّ، وحَظًّا لِلْمُسْلِمِينَ، فَعَلَ

অর্থাৎ— আর নেতা যদি কাউকে বন্দী করে, তবে তিনি সিদ্ধান্তের বিষয়ে স্বাধীন। তিনি চাইলে তাদের হত্যা করতে পারে, চাইলে বিনিময় ছাড়া অনুগ্রহের মাধ্যমে মুক্তি দিতে পারেন। চাইলে অর্থের বিনিময়ে তাদেরকে মুক্তি দিতে পারেন। চাইলে মুসলিম বন্দীদের বিনিময়ের মুক্ত করতে পারেন। আর চাইলে তাদের দাস বানিয়ে রাখতে পারেন। তিনি যে পদ্ধতি অবলম্বন করে শত্রুর ক্ষতি ও মুসলমানদের উপকার পাবেন, সেটিই তিনি প্রয়োগ করবেন।[13]আল মুগনী, ১৩/৪৪ –  https://ready.shamela.ws/pdf/pdfjs.html?file=https%3A%2F%2Fready.shamela.ws%2Fpdf%2FWAQmogni%2Fmogni13.pdf#page=44

আলোচনা দেখতে পারলাম যে, সকল যোদ্ধাই হত্যা যোগ্য না, বরং পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে তাদেও মুক্তি দেওয়া যায়।

দাবিকৃত আয়াত গুলো কি সকল অমুসলিমদের হত্যার কথা বলে?

এখন আমরা সুরা নিসার ৮৯-৯০, সুরা বাকারার ১৯১, সুরা তওবার ৫ নং আয়াত নিয়ে সমালোচনা করার চেষ্টা করবো। এবং দেখবো যে তারা আসলে কতটুকু মিথ্যাচার করছে।

প্রথমে সুরা নিসায় আল্লাহ বলেন—

 فَمَا لَکُمۡ فِی الۡمُنٰفِقِیۡنَ فِئَتَیۡنِ وَاللّٰہُ اَرۡکَسَہُمۡ بِمَا کَسَبُوۡا ؕ اَتُرِیۡدُوۡنَ اَنۡ تَہۡدُوۡا مَنۡ اَضَلَّ اللّٰہُ ؕ وَمَنۡ یُّضۡلِلِ اللّٰہُ فَلَنۡ تَجِدَ لَہٗ سَبِیۡلًا

অর্থাৎ— অতঃপর তোমাদের কি হল যে, মুনাফিকদের ব্যাপারে তোমরা দু’দল হয়ে গেলে? অথচ তারা যে কাজ করেছে তার দরুণ আল্লাহ তাদেরকে উল্টিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ যাকে (তার ইচ্ছা অনুযায়ী) গোমরাহীতে লিপ্ত করেছেন, তোমরা কি তাকে হিদায়াতের উপর আনতে চাও? আল্লাহ যাকে গোমরাহীতে লিপ্ত করেন, তার জন্য তুমি কখনই কোন (কল্যাণের) পথ পাবে না।

وَدُّوۡا لَوۡ تَکۡفُرُوۡنَ کَمَا کَفَرُوۡا فَتَکُوۡنُوۡنَ سَوَآءً فَلَا تَتَّخِذُوۡا مِنۡہُمۡ اَوۡلِیَآءَ حَتّٰی یُہَاجِرُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ؕ  فَاِنۡ تَوَلَّوۡا فَخُذُوۡہُمۡ وَاقۡتُلُوۡہُمۡ حَیۡثُ وَجَدۡتُّمُوۡہُمۡ ۪  وَلَا تَتَّخِذُوۡا مِنۡہُمۡ وَلِیًّا وَّلَا نَصِیۡرًا ۙ

অর্থাৎ— তারা কামনা করে, তারা নিজেরা যেমন কুফর অবলম্বন করেছে, তেমনি তোমরাও কাফির হয়ে যাও, যাতে তোমরা পরস্পর সমান হয়ে যাও। সুতরাং (হে মুসলিমগণ!) তোমরা তাদের মধ্য হতে কাউকে ততক্ষণ পর্যন্ত বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা আল্লাহর পথে হিজরত না করে। যদি তারা (হিজরত করাকে) উপেক্ষা করে, তবে তাদেরকে পাকড়াও কর এবং তাদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর, আর তাদের কাউকেই নিজের বন্ধুরূপেও গ্রহণ করবে না এবং সাহায্যকারীরূপেও না।

اِلَّا الَّذِیۡنَ یَصِلُوۡنَ اِلٰی قَوۡمٍۭ بَیۡنَکُمۡ وَبَیۡنَہُمۡ مِّیۡثَاقٌ اَوۡ جَآءُوۡکُمۡ حَصِرَتۡ صُدُوۡرُہُمۡ اَنۡ یُّقَاتِلُوۡکُمۡ اَوۡ یُقَاتِلُوۡا قَوۡمَہُمۡ ؕ وَلَوۡ شَآءَ اللّٰہُ لَسَلَّطَہُمۡ عَلَیۡکُمۡ فَلَقٰتَلُوۡکُمۡ ۚ فَاِنِ اعۡتَزَلُوۡکُمۡ فَلَمۡ یُقَاتِلُوۡکُمۡ وَاَلۡقَوۡا اِلَیۡکُمُ السَّلَمَ ۙ فَمَا جَعَلَ اللّٰہُ لَکُمۡ عَلَیۡہِمۡ سَبِیۡلًا

অর্থাৎ— তবে ওই সকল লোক (এ নির্দেশ থেকে) ব্যতিক্রম, যারা এমন কোনও সম্প্রদায়ের সাথে গিয়ে মিলিত হয়েছে, যাদের ও তোমাদের মধ্যে কোনও (শান্তি) চুক্তি আছে। অথবা যারা তোমাদের কাছে এমন অবস্থায় আসে, যখন তাদের মন কুণ্ঠিত থাকে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এবং নিজ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করতে। আল্লাহ চাইলে তাদেরকে তোমাদের উপর ক্ষমতা দান করতেন, ফলে তারা তোমাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই যুদ্ধ করত। সুতরাং তারা যদি তোমাদের থেকে পাশ কাটিয়ে চলে ও তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ না করে এবং তোমাদের কাছে শান্তির প্রস্তাব দেয়, তবে আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে তোমাদেরকে কোনওরূপ (ব্যবস্থা গ্রহণের) অধিকার দেননি।

سَتَجِدُوۡنَ اٰخَرِیۡنَ یُرِیۡدُوۡنَ اَنۡ یَّاۡمَنُوۡکُمۡ وَیَاۡمَنُوۡا قَوۡمَہُمۡ ؕ  کُلَّ مَا رُدُّوۡۤا اِلَی الۡفِتۡنَۃِ اُرۡکِسُوۡا فِیۡہَا ۚ  فَاِنۡ لَّمۡ یَعۡتَزِلُوۡکُمۡ وَیُلۡقُوۡۤا اِلَیۡکُمُ السَّلَمَ وَیَکُفُّوۡۤا اَیۡدِیَہُمۡ فَخُذُوۡہُمۡ وَاقۡتُلُوۡہُمۡ حَیۡثُ ثَقِفۡتُمُوۡہُمۡ ؕ  وَاُولٰٓئِکُمۡ جَعَلۡنَا لَکُمۡ عَلَیۡہِمۡ سُلۡطٰنًا مُّبِیۡنًا

অর্থাৎ— (মুনাফিকদের মধ্যে) অপর কিছু লোককে পাবে, যারা তোমাদের থেকেও নিরাপদ থাকতে চায় এবং তাদের সম্প্রদায় হতেও নিরাপদ থাকতে চায়। (কিন্তু) যখনই তাদেরকে ফিতনার দিকে ফিরে যাওয়ার জন্য ডাকা হয়, অমনি তারা উল্টে গিয়ে তাতে পতিত হয়। সুতরাং এসব লোক যদি তোমাদের (সঙ্গে যুদ্ধ করা) থেকে সরে না যায়, শান্তি প্রস্তাব না দেয় এবং নিজেদের হাত সংযত না করে, তবে তাদেরকেও পাকড়াও কর এবং যেখানেই তাদেরকে পাও হত্যা কর। আল্লাহ এরূপ লোকদের বিরুদ্ধে তোমাদেরকে সুস্পষ্ট এখতিয়ার দান করেছেন।

[সুরা নিসা, আয়াত নং ৮৮-৯১ – https://muslimbangla.com/sura/4/tafsir/88]

প্রথমত সুরা নিসার ৮৯-৯০ নং আয়াত গুলির মূল প্রেক্ষাপট মুনাফিকদের বিষয়ে। ঘটনাটি এরকম যে, রাসুল ﷺ যখন উহুদের ময়দানে যান তখন মুনাফিকদের জামায়াত যুদ্ধ ছেড়ে পালিয়ে যায়। তখন তাদের বিষয়ে সুরা নিসার ৮৮-৯১ নং পর্যন্ত আয়াত নাজিল হয়। এখানে মুনাফিকদের ৪টি অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে। এই ঘটনা সম্পর্কে যায়েদ ইবনে সাবিত রাদি: বলেন—

لَمَّا خَرَجَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى أُحُدٍ رَجَعَ نَاسٌ مِنْ أَصْحَابِهِ فَقَالَتْ فِرْقَةٌ: نَقْتُلُهُمْ، وَقَالَتْ فِرْقَةٌ: لاَ نَقْتُلُهُمْ، فَنَزَلَتْ {فَمَا لَكُمْ فِي المُنَافِقِينَ فِئَتَيْنِ} وَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ  «إِنَّهَا تَنْفِي الرِّجَالَ كَمَا تَنْفِي النَّارُ خَبَثَ الحَدِيدِ»

অর্থাৎ— নবী ﷺ এর সঙ্গে উহুদ যুদ্ধে যাত্রা করে তাঁর কতিপয় সাথী ফিরে আসলে একদল লোক বলতে লাগল, আমরা তাদেরকে হত্যা করব, আর অন্য দলটি বলতে লাগল, না, আমরা তাদেরকে হত্যা করব না। এ সময়ই فَمَا لَكُمْ فِي الْمُنَافِقِينِ فِئَتَيْنِ الخ (তোমাদের কি হল, তোমরা মুনাফিকদের সম্পর্কে দু’দল হয়ে পড়েছ?) আয়াতটি নাযিল হয়। এরপর নবী ﷺ বললেনঃ মদীনা লোকদেরকে বহিষ্কার করে দেয়, যেমনভাবে আগুন লোহার মরিচাকে দূর করে দেয়।[14]সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১৭৬৩ – https://muslimbangla.com/hadith/1763

প্রিয় পাঠক, আপনারা আয়াতের শানে নুযুল থেকে অবশ্যই বুঝতে পেরেছেন যে, এই আয়াতটি কাফেরদের বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হয়নি; বরং এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে মুসলিমদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুনাফিকদের বিষয়ে। আর মুনাফিকরা ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের চরম শত্রু। যাদের কে বাংলা ভাষায়  রাষ্ট্রদ্রোহীও বলা যায়। কেননা, তারা মুসলিম রাষ্ট্রের ভেতর থেকে মুসলিম সেজে কাফেরদের ইসলামের বিরুদ্ধে সাহায্য করছিল এবং মুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল। এমনকি তারা কাফেরদের সঙ্গে সংঘবদ্ধ হয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেছিল। আর এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, একজন রাষ্ট্রদ্রোহীর জন্য রাষ্ট্রীয় আইনে কঠোর শাস্তির বিধান থাকতে পারে। সুতরাং, এই আয়াতে কখনোই সকল অমুসলিমকে হত্যা করার কথা বলা হয়নি; বরং এই আয়াত রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও শত্রুভাবাপন্নতার মতো গুরুতর অপরাধের প্রসঙ্গে এসেছে।

Read More...  ইসলামে গণতন্ত্র: গণতন্ত্র কেন হারাম ও এর বিকল্প কী?

দ্বিতীয় সুরা বাকারায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

وَقَاتِلُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ الَّذِیۡنَ یُقَاتِلُوۡنَکُمۡ وَلَا تَعۡتَدُوۡا ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَا یُحِبُّ الۡمُعۡتَدِیۡنَ

যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে তোমরা আল্লাহর পথে তাদের সাথে যুদ্ধ কর, তবে সীমালংঘন করো না। নিশ্চিত জেন, আল্লাহ সীমালংঘনকারীদের ভালোবাসেন না।

وَاقۡتُلُوۡہُمۡ حَیۡثُ ثَقِفۡتُمُوۡہُمۡ وَاَخۡرِجُوۡہُمۡ مِّنۡ حَیۡثُ اَخۡرَجُوۡکُمۡ وَالۡفِتۡنَۃُ اَشَدُّ مِنَ الۡقَتۡلِ ۚ وَلَا تُقٰتِلُوۡہُمۡ عِنۡدَ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ حَتّٰی یُقٰتِلُوۡکُمۡ فِیۡہِ ۚ فَاِنۡ قٰتَلُوۡکُمۡ فَاقۡتُلُوۡہُمۡ ؕ کَذٰلِکَ جَزَآءُ الۡکٰفِرِیۡنَ

তোমরা তাদেরকে যেখানে পাও হত্যা কর এবং তাদেরকে সেই স্থান থেকে বের করে দাও, যেখান থেকে তারা তোমাদের বের করেছিল। বস্তুত ফিতনা হত্যা অপেক্ষা গুরুতর অপরাধ! আর তোমরা মসজিদুল হারামের নিকট তাদের সঙ্গে ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ করো না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা সেখানে তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে, হাঁ তারা যদি (সেখানে) যুদ্ধ শুরু করে তবে তোমরা তাদেরকে হত্যা করতে পার। এরূপ কাফিরদের শাস্তি সেটাই।

فَاِنِ انۡتَہَوۡا فَاِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

অতঃপর তারা যদি নিরস্ত হয়, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

وَقٰتِلُوۡہُمۡ حَتّٰی لَا تَکُوۡنَ فِتۡنَۃٌ وَّیَکُوۡنَ الدِّیۡنُ لِلّٰہِ ؕ فَاِنِ انۡتَہَوۡا فَلَا عُدۡوَانَ اِلَّا عَلَی الظّٰلِمِیۡنَ

তোমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাক, যতক্ষণ না ফিতনা খতম হয়ে যায় এবং দীন আল্লাহর হয়ে যায়। অতঃপর তারা যদি ক্ষান্ত হয়, তবে জালিমরা ছাড়া অন্য কারও প্রতি কোনও কঠোরতা নয়।

[সুরা বাকারা আয়াত ১৯০-১৯৩ – https://muslimbangla.com/sura/2/tafsir/190 ]

এই আয়াতে আল্লাহ শুরু করেছে এই বলে যে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, এবং শেষ করেছেন তারা যদি ক্ষান্ত হয়, তবে জালিমরা ছাড়া অন্য কারও প্রতি কোনও কঠোরতা নয়। এমন সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকার সত্ত্বেও এই আয়াত দিয়ে কি ইসলামে সকল অমুসলিমকে হত্যা করতে বলা হয়েছে এই সিদ্ধান্তে পৌছানো সম্ভব! অবশ্যই না।

আবু বকর জাকারিয়া (হাফি) সুরা বাকারার ১৯১ নম্বর আয়াতের তাফসিরে ইসলাম বিদ্বেষীদের এই আয়াত নিয়ে করা অভিযোগের জবাব দিয়েছেন এভাবে,

কেউ কেউ আল্লাহর বাণীঃ “তাদেরকে যেখানে পাবে হত্যা করবে”-এ বাণীর ভুল ব্যাখ্যা করে ইসলামকে জংগীবাদের প্রেরণাদায়ক বলে অপবাদ দেয়, তারা মূলতঃ এ আয়াতের অর্থই বোঝেনি। কারণ, এই আয়াতে “তাদেরকে” বলে ঐ সমস্ত কাফেরদেরকে বুঝানো হয়েছে, যাদের বর্ণনা পূর্ববতী ও পরবর্তী আয়াতে এসেছে। কেননা, পূর্ববতী আয়াতে কাফেরদের হত্যা করার জন্য শর্ত দেয়া হয়েছে দু’টি – (১) তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধকারী সম্প্রদায় হবে। (২) তোমরা যদি এসব যুদ্ধবাজ কাফেরদের সাথে যুদ্ধ কর, তবুও তোমরা যেহেতু মানবতার জন্য রহমতস্বরূপ সেহেতু হত্যা করতে সীমালংঘন করোনা। যুদ্ধরত কাফেরদের ছাড়া অন্যান্য সাধারণ কাফেরদের হত্যা করার মাধ্যমে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লংঘন করোনা। যেমন, শিশু, অসুস্থ আঘাতপ্রাপ্ত, নারী এজাতীয়দের হত্যা করা থেকে বিরত থাকবে।

পরবর্তী আয়াতসমূহে আরও কিছু শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, (৩) যদি যুদ্ধবাজ কাফেররা যুদ্ধ করা থেকে বিরত হয় তবে তোমরা তৎক্ষণাত যুদ্ধ ত্যাগ কর। (৪) তোমাদের উপর যতটুকু আক্রমণ হবে তোমরা ততটুকুই শুধু আক্রমণ করবে। (৫) তোমাদের যুদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য হলোঃ ক) ফিতনা তথা যাবতীয় বিপর্যয়, শান্তিভংগ, ঘর-বাড়ি থেকে বহিস্কার, যুলুম, নির্যাতন, নিপীড়ন, শির্ক, অসৎপথ ইত্যাদি থেকে মানুষকে উদ্ধার করা। খ) তোমাদের ইবাদাত তথা আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলতে যেন তারা বাধা না হয়। গ) তারা যেন তোমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র না করতে পারে। ঘ) তোমরা যে হক বা সত্যের অনুসারী, তার প্রচার ও প্রসারে সহায়তা করা। এ পথের বাধা দূর করা।

এবার আসুন, আমরা সূরা তাওবার ৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করি।

কুরআনুল কারিমের কোনো আয়াতকে বুঝতে হলে অবশ্যই করণীয় হলো তার পূর্বের ও পরের আয়াতগুলো সম্পর্কে ধারণা রাখা। নাহলে ভুল বুঝার সম্ভবনা রয়েছে। যেমন ধরুন, কোন এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একদিন স্কুলের প্রধান শিক্ষক তার ছাত্বরদের উদ্দেশ্য বলেছেন, “ওমুক শ্রেণীর সকল দুষ্টু ছাত্রদেরকে আমার কাছে নিয়ে আসো এবং সকল ছাত্রকে টিসি দিয়ে দাও।”

এখন কেউ যদি প্রধান শিক্ষকের প্রথম বক্তব্য—অর্থাৎ “দুষ্টু ছেলেদেরকে আমার কাছে নিয়ে আসো”—এই অংশটি গোপন করে শুধু পরবর্তী অংশ—অর্থাৎ “সকল ছাত্রকে টিসি দিয়ে দাও”—এই অংশটি উল্লেখ করে প্রচার করতে থাকে, তাহলে কি আপনারা তাকে সত্যবাদী বা যুক্তিবাদী বলতে পারেন? অবশ্যই না।

ঠিক তদ্রূপ ইসলামের সমালোচকদের অবস্থাও এই রকম। তারা কোরআনের কোন এক নির্দিষ্ট সুরার আগে ও পরের বিষয়বস্তু না তুলে মাঝ থেকে আয়াত নিয়ে সমালোচনার ঝড় বসিয়ে দেয়। আর সুরা তওবার ৫ নং আয়াতটি নিয়েও তাদের একই চরিত্র। বিষয়টি বুঝতে আমরা সর্বপ্রথম সুরা তওবার ৪-১৩ আয়াত পড়ে নেই। যেমন আল্লাহ বলেন—

إِلَّا الَّذِينَ عَاهَدتُّم مِّنَ الْمُشْرِكِينَ ثُمَّ لَمْ يَنقُصُوكُمْ شَيْئًا وَلَمْ يُظَاهِرُوا عَلَيْكُمْ أَحَدًا فَأَتِمُّوا إِلَيْهِمْ عَهْدَهُمْ إِلَىٰ مُدَّتِهِمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ ۝٤

অর্থাৎ— তবে (হে মুসলিমগণ!) যে মুশরিকদের সাথে তোমরা চুক্তি সম্পন্ন করেছ ও পরে তারা তোমাদের চুক্তি রক্ষায় কোনও ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সহযোগিতাও করেনি, তাদের সঙ্গে কৃত চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সাবধানতা অবলম্বনকারীদের পছন্দ করেন।

فَإِذَا انسَلَخَ الْأَشْهُرُ الْحُرُمُ فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدتُّمُوهُمْ وَخُذُوهُمْ وَاحْصُرُوهُمْ وَاقْعُدُوا لَهُمْ كُلَّ مَرْصَدٍ ۚ فَإِن تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ۝٥

অর্থাৎ— অতঃপর সম্মানিত মাসসমূহ অতিবাহিত হলে মুশরিকদেরকে (যারা তোমাদের চুক্তি ভঙ্গ করেছিল) যেখানেই পাবে হত্যা করবে। তাদেরকে গ্রেফতার করবে, অবরোধ করবে এবং তাদেরকে ধরার জন্য প্রত্যেক ঘাঁটিতে ওঁৎ পেতে বসে থাকবে।  অবশ্য তারা যদি তাওবা করে, নামায কায়েম করে ও যাকাত দেয়, তবে তাদের পথ ছেড়ে দেবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

وَإِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّىٰ يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ أَبْلِغْهُ مَأْمَنَهُ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَعْلَمُونَ ۝٦

অর্থাৎ— মুশরিকদের মধ্যে কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে তাকে আশ্রয় দেবে, যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পারে। তারপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছিয়ে দেবে। এটা এ কারণে যে, তারা এমন লোক, যাদের জ্ঞান নেই।

كَيْفَ يَكُونُ لِلْمُشْرِكِينَ عَهْدٌ عِندَ اللَّهِ وَعِندَ رَسُولِهِ إِلَّا الَّذِينَ عَاهَدتُّمْ عِندَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ ۖ فَمَا اسْتَقَامُوا لَكُمْ فَاسْتَقِيمُوا لَهُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ ۝٧

অর্থাৎ— মুশরিকদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছে কোন চুক্তি কি করে বলবৎ থাকতে পারে?  তবে মসজিদুল হারামের নিকটে তোমরা যাদের সাথে চুক্তি সম্পন্ন করেছ, তারা যতক্ষণ তোমাদের সাথে সোজা থাকবে, তোমরাও তাদের সাথে সোজা থাকবে।  নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে পছন্দ করেন।

كَيْفَ وَإِن يَظْهَرُوا عَلَيْكُمْ لَا يَرْقُبُوا فِيكُمْ إِلًّا وَلَا ذِمَّةً ۚ يُرْضُونَكُم بِأَفْوَاهِهِمْ وَتَأْبَىٰ قُلُوبُهُمْ وَأَكْثَرُهُمْ فَاسِقُونَ ۝٨

অর্থাৎ— (কিন্তু অন্য মুশরিকদের সাথে) কেমন করে (চুক্তি বলবৎ থাকবে), যখন (তাদের অবস্থা হল), তারা কখনও তোমাদের উপর বিজয়ী হলে তোমাদের ব্যাপারে কোনওরূপ আত্মীয়তার মর্যাদা দেয় না এবং অঙ্গীকারেরও না। তারা মুখে তোমাদেরকে সন্তুষ্ট রাখতে চায়, অথচ তাদের অন্তর তা অস্বীকার করে। তাদের অধিকাংশই অবাধ্য।

اشْتَرَوْا بِآيَاتِ اللَّهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَصَدُّوا عَن سَبِيلِهِ ۚ إِنَّهُمْ سَاءَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ۝٩

অর্থাৎ— তারা আল্লাহর আয়াতসমূহের বিনিময়ে (দুনিয়ার) তুচ্ছ মূল্য গ্রহণকেই পছন্দ করেছে  এবং তার ফলে (মানুষকে) আল্লাহর পথ থেকে নিবৃত্ত করে। বস্তুত তারা যা কিছু করে তা অতি নিকৃষ্ট।

لَا يَرْقُبُونَ فِي مُؤْمِنٍ إِلًّا وَلَا ذِمَّةً ۚ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُعْتَدُونَ ۝١٠

অর্থাৎ— তারা কোনও মুমিনের ক্ষেত্রেই কোনও আত্মীয়তার মর্যাদা দেয় না এবং অঙ্গীকারেরও নয় এবং তারাই সীমালংঘনকারী।

فَإِن تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ ۗ وَنُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ ۝١١

অর্থাৎ— সুতরাং যদি তারা তাওবা করে, নামায কায়েম করে ও যাকাত দেয়, তবে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই হয়ে যাবে। যারা জানতে আগ্রহী, তাদের জন্য বিধানাবলী (এভাবে) বিশদ বর্ণনা করি।

وَإِن نَّكَثُوا أَيْمَانَهُم مِّن بَعْدِ عَهْدِهِمْ وَطَعَنُوا فِي دِينِكُمْ فَقَاتِلُوا أَئِمَّةَ الْكُفْرِ ۙ إِنَّهُمْ لَا أَيْمَانَ لَهُمْ لَعَلَّهُمْ يَنتَهُونَ ۝١٢

অর্থাৎ— তারা যদি চুক্তি সম্পন্ন করার পর নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং তোমাদের দ্বীনের নিন্দা করে, তবে কুফরের এ সকল নেতৃবর্গের সঙ্গে এই আশায় যুদ্ধ কর যে, তারা হয়ত নিরস্ত হবে।  বস্তুত এরা এমন লোক, যাদের প্রতিশ্রুতির কোনও মূল্য নেই।

أَلَا تُقَاتِلُونَ قَوْمًا نَّكَثُوا أَيْمَانَهُمْ وَهَمُّوا بِإِخْرَاجِ الرَّسُولِ وَهُم بَدَءُوكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ ۚ أَتَخْشَوْنَهُمْ ۚ فَاللَّهُ أَحَقُّ أَن تَخْشَوْهُ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ ۝١٣

অর্থাৎ— তোমরা কি সেই সকল লোকের সাথে যুদ্ধ করবে না, যারা নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে এবং রাসূলকে (দেশ থেকে) বহিষ্কারের ইচ্ছা করেছে এবং তারাই তোমাদের বিরুদ্ধে (উস্কানী দান ও উত্যক্তকরণের কাজ) প্রথম করেছে। তোমরা কি তাদেরকে ভয় কর? (যদি তাই হয়) তবে তো আল্লাহই এ বিষয়ের বেশি হকদার যে, তোমরা তাকে ভয় করবে যদি তোমরা মুমিন হও।

[সূরা তাওবা, আয়াত নং ৪–১৩ – https://muslimbangla.com/sura/9/tafsir/4]

প্রিয় পাঠক, উপরের আয়াতগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ুন এবং গভীরভাবে লক্ষ্য করুন। সেখানে সুরা তাওবার ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রথমেই বলে দিয়েছেন, মুশরিকদের মধ্যে থেকে যারা চুক্তি রক্ষা করেছে, অর্থাৎ চুক্তি ভঙ্গ করেনি, তাদের সঙ্গে নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত চুক্তি পূর্ণ কর। অর্থাৎ, তাদেরকে হত্যা না করার কথা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা তাওবার ৪ নম্বর আয়াতেই প্রথমে বলে দিয়েছেন। তারপরও কীভাবে নাস্তিকরা বলতে পারে যে, ৫ নম্বর আয়াতে সকল কাফেরদেরকে নির্বিচারে  হত্যা করার কথা বলা হয়েছে?

আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা যদি একটু পরেই ৬ নম্বর আয়াতটি লক্ষ্য করি, তাহলে আমরা দেখতে পাই যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন চুক্তি ভঙ্গকারী কাফেরদের ব্যাপারে বলেছেন “মুশরিকদের মধ্যে কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে তাকে আশ্রয় দেবে,” অর্থাৎ, চুক্তি ভঙ্গ করেছে এমন মুশরিকদেরকেও আল্লাহ তাআলা আশ্রয় দেওয়ার কথা বলছেন, যাতে করে তারা কুরআনের বাণীগুলো শুনতে পারে এবং এরপর তাদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়।

এছাড়াও আল্লাহ রাব্বুল আলামিন উক্ত সুরার ১৩ নম্বর আয়াতের মধ্যেই স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, মুসলিমরা যেন সেই সকল সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, যারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রথমে লড়াই করেছিল, রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সাহাবিদেরকে বহিষ্কার করার সংকল্প করেছিল এবং প্রথমে আক্রমণ শুরু করেছিল।

সুতরাং, উপরোক্ত আয়াতগুলো  বিশ্লেষণ করলে এই কথাই স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, সুরা নিসার ৮৯ নম্বর আয়াত এবং সুরা তাওবার ৫ নম্বর আয়াতে কখনোই নির্বিচারে কাফেরদের হত্যা করার কথা বলা হয়নি।

বরং সুরা নিসার ৮৯ নম্বর আয়াতে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও শত্রুভাবাপন্নতার শাস্তির প্রসঙ্গ বর্ণিত হয়েছে এবং সুরা তাওবার ৫ নম্বর আয়াতে নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে চুক্তিভঙ্গকারী ও শত্রুভাবাপন্ন মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; সকল অমুসলিমের বিরুদ্ধে নয়।

Citation is loading...

Footnotes

Footnotes
⇧1 আল-মুগনি লি ইবনে কুদামা, ১৩/২৫০; আল-বিনায়াহ শরহুল হিদায়াহ, ৭/২০২; আহকামে আহলুজ-জিম্মা ইতাআতুল ইলম লি ইবনে কাইমিয়া,২/৪৪; ফাতহুল কাদীর, ৪/২৯৩; ফতুয়ায়ে হিন্দিয়্যাহ, ১/১৮১; আল-উম, ৪/১১০; বাদায়েউস সানাআ’ই, ৭/২৩৬
⇧2 সহিহুল বুখারী, হাদিস নং ২৮০৬; সহিহুল মুসলিম, হাদিস নং ৪৩৯৭; – https://muslimbangla.com/hadith/2805
⇧3 সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২৬৬০; ত্বহাবী, হাদিস নং ৫২৭৯; ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২৮৪২; – https://muslimbangla.com/hadith/17007
⇧4 কিতাবুল আমওয়াল, হাদিস নং ৯৩ – https://shamela.ws/book/12999/90

এই সনদটি সম্পর্কে নাসিরুদ্দিন আল-আলবানী “ইরওয়াউল গালিল”(৫/৯৬) এ বলেন “এই সনদটি শায়খায়নদের শর্তে সহিহ”। সুহাইব আব্দুল জাব্বার এই হাদিসটিকে “আল-জামিউস সহিহ”(৩৭/২১৬) এ উল্লেখ্য করে সহিহ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

⇧5 আল মাবসুত, ১০/১৩৭ – https://ready.shamela.ws/pdf/pdfjs.html?file=https%3A%2F%2Fready.shamela.ws%2Fpdf%2Fmbsootsrkhsy%2Fmbsoot10.pdf#page=137
⇧6 আল-মুদাওনাতুল কুবর, ১/৪৯৯ – https://shamela.ws/book/587/387
⇧7 বাদাউস সানাই ফি তারতীবিশ শারাই, ৭/১০১ – https://ready.shamela.ws/pdf/pdfjs.html?file=https%3A%2F%2Fready.shamela.ws%2Fpdf%2Fbdsnatrtbsh%2F07_bsts.pdf#page=101
⇧8 আল-মাবসুত, ১০/৬৪ –  https://ready.shamela.ws/pdf/pdfjs.html?file=https%3A%2F%2Fready.shamela.ws%2Fpdf%2Fmbsootsrkhsy%2Fmbsoot10.pdf#page=64
⇧9 কায়িদাতুন মুখতাসারাতুন ফি কিতালিল কুফফারি ওয়া মুহাদানাতিহিম ওয়া তাহরিমি কাতলিহিম লিমুজাররাদি কুফরিহিম, পৃ: ১৮৮ – https://shamela.ws/book/147669/181
⇧10 সহীহ বুখারী, হাদিস নং ২৮৩২ – https://muslimbangla.com/hadith/2832
⇧11 মুখতাছারে কুদুরী, পৃ: ২৩২ –  https://ready.shamela.ws/pdf/pdfjs.html?file=https%3A%2F%2Fready.shamela.ws%2Fpdf%2Fmkhtsrkdreweda%2F75029.pdf#page=23
⇧12 আল-বয়ান ওয়া আত-তাহসীন, ২/৫৬০ – https://shamela.ws/book/21751/1053#p1
⇧13 আল মুগনী, ১৩/৪৪ –  https://ready.shamela.ws/pdf/pdfjs.html?file=https%3A%2F%2Fready.shamela.ws%2Fpdf%2FWAQmogni%2Fmogni13.pdf#page=44
⇧14 সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১৭৬৩ – https://muslimbangla.com/hadith/1763
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Back to top button