হাদিস

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কি গরুর গোশত খেতে নিরুৎসাহিত করেছেন?

বরং উল্টোটি প্রমাণিত

একটি হাদিসে এসেছে যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ গরুর দুধ ও ঘি পানের বিষয়ে উৎসাহিত করেছেন:

«عَلَيْكُمْ بِأَلْبَانِ الْبَقَرِ فَإِنَّهَا تَرُمُّ مِنْ كُلِّ الشَّجَرِ وَهُوَ شِفَاءٌ مِنْ كُلِّ دَاءٍ»
“তোমরা গরুর দুধ পান করো; কারণ গাভী প্রতিটি গাছপালা থেকে চরে বেড়ায়, আর এতে রয়েছে সব রোগের শিফা”[1]مسند ابن الجعد (ص ৩০৭), الفتح الكبير في ضم الزيادة إلى الجامع الصغير (২/ ২২৪).

মুসনাদে আহমাদ, মুসতাদরাকে হাকিম এবং সুনানে তা বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত।

কিছু বর্ণনায় অতিরিক্ত হিসেবে এসেছে:

“তোমরা গরুর দুধ পান করো, তা শেফা; ঘি ব্যবহার করো, তা ওষুধ; আর এর গোশত থেকে বেঁচে থাকো, কেননা এর গোশত রোগ (داء)”[2] كنز العمال (১০/ ৩০), الطب النبوي لأبي نعيم (১/ ৩৮৩)।

এই বর্ণনার «لحمها داء» (গরুর গোশত রোগ) অংশটি নিয়ে কিছু লোক মুসলিমদেরকে সংশয়ে ফেলার চেষ্টা করছে যে নবী সঃ নাকি গরুর গোশত খাওয়াকে নিরুৎসাহিত করেছেন। আজকে আমরা বিষয়টি যাচাই করে দেখবো ইনশাআল্লাহ।

সনদ যাচাই

সূত্র ১: সুহাইব (রা.)-এর রেওয়ায়েত

  • সনদ: তাবারানি, ইবনুস সুন্নি এবং আবু নুআইম এটি সংকলন করেছেন: আহমাদ ইবনুল হাসান আত-তিরমিজি ← মুহাম্মদ ইবনু মুসা আন-নাসায়ি ← দিফা‘ ইবনু দাগফাল আস-সাদুসি ← আব্দুল হামিদ ইবনু সাইফি ← তাঁর পিতা ← সুহাইব (রা.)[3] الطب النبوي لأبي نعيم (১/ ৩৮৩)।

  • রাবিদের দোষত্রুটি (জারহ ও তাদিল):

    • দিফা‘ ইবনু দাগফাল (دفاع بن دغفل): ইমাম আবু হাতিম আর-রাযি তাঁকে ‘যঈফ’ (ضعيف الحديث) বলেছেন[4] ديوان الضعفاء (ص ১২৯), الحواشى على سنن ابن ماجه (৪/ ৩৩৭).।

    • আব্দুল হামিদ ইবনু সাইফি: হাফিজ ইবন হাজার ও মুহাদ্দিসগণ তাঁকে দুর্বল এবং অপরিচিতির (মাজহুল) স্তরে গণ্য করেছেন[5] تحفة الأحوذي (৫/ ৩৫৭).।

    • ইমাম ইবনুল কায়্যিমের ফায়সালা: ইবনুল কায়্যিম এই সনদ পর্যালোচনা করে সুস্পষ্ট ভাষায় রায় দেন:

      «وَلَا يَثْبُتُ مَا فِي هَذَا الْإِسْنَادِ»

      (এই সনদের কোনো কিছুই নবিজি থেকে প্রমাণিত বা সাব্যস্ত নয়)[6] الطب النبوي لابن القيم (ص ২৪৫).।

সূত্র ২: আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.)-এর রেওয়ায়েত

  • হাকিম তাঁর মুসতাদরাক-এ এই সূত্র এনে সহিহ দাবি করলেও মুহাদ্দিসগণ তাঁর তীব্র সমালোচনা করেছেন:

    • ইমাম নাসাঈ স্পষ্ট মন্তব্য করেন: হাকিম এই হাদিস সহিহ বলে শিথিলতা (تساهل) দেখিয়েছেন [7]التنوير شرح الجامع الصغير (৭/ ৩১২).।

    • আল্লামা বদরুদ্দিন জারকাশি সনদকে মুনকাতি‘ (বিচ্ছিন্ন) উল্লেখ করে বলেন: এর সহিহ হওয়ার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ; কারণ সহিহ সনদে নবিজি ﷺ গরু কুরবানি করেছেন এবং কুরবানি দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা হয়, কোনো ‘রোগ’ দ্বারা নয় [8]فيض القدير (৪/ ৩৪৮).।

    • মুনকাতে ও মাওকুফ হওয়া: ইমাম দারা কুতনি আল-ইলাল-এ দেখিয়েছেন যে, কায়েস ইবনু মুসলিম থেকে তারিক ইবনু শিহাবের সূত্রে কেবল দুধের আলোচনাটি মারফু (নবিজির বাণী) হিসেবে সহিহ; কিন্তু অতিরিক্ত অংশগুলো মুদরাজ বা বিচ্ছিন্ন [9]علل الدارقطني (৬/ ২৮).।

সূত্র ৩: মুলাইকা বিনতে আমর (রা.)-এর রেওয়ায়েত

তাবারানি ও বায়হাকির বর্ণনায় রয়েছে: জুহাইর ইবনু মুয়াবিয়া ← তাঁর পরিবারের এক অজ্ঞাত নারী (امرأة من أهله) ← মুলাইকা বিনতে আমর [10]السنن الكبرى للبيهقي (৯/ ৫৮০).।

এখানে বর্ণনাকারী নারী মাজহুল (অজ্ঞাতনামা), যার পরিচয় ও গ্রহণযোগ্যতা হাদিসশাস্ত্রে অজ্ঞাত হওয়ায় সনদটি অগ্রহণযোগ্য বা জয়িফ [11]جمع الفوائد (৩/ ২৬৪).।

সূত্র ৪: ইবন আব্বাস (রা.)-এর সূত্র

  • ইবন আদী আল-কামিল-এ এটি আনয়ন করেছেন মুহাম্মদ ইবনু জিয়াদ আত-তাহ্হান-এর মাধ্যমে। মুহাদ্দিসগণের ঐক্যমতে:

    «والطحان متهم بالكذب»

    (তাহ্হান নামক এই রাবি মিথ্যা হাদিস রচনার দায়ে অভিযুক্ত বা কাজ্জাব) [12]الأجوبة المرضية للسخاوي (১/ ২৪).।

মতন যাচাই

মুহাদ্দিস এবং ফকিহগণ কেবল সনদের দুর্বলতাই নয়, বরং এই বাক্যটির বক্তব্যের অসঙ্গতিও স্পষ্ট করেছেন:

কুরআনের অকাট্য আয়াতের সাথে বৈপরীত্য

আল্লাহ তাআলা সূরা আল-আন‘আমের ১৪৪ নম্বর আয়াতে গরু-মহিষ জোড়াকে হালাল রিজিক হিসেবে দান করার ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ মুমিনদের জন্য এমন কোনো খাদ্য সাধারণ অবস্থায় হালাল করেননি যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি “রোগ” (داء)

শাইখ ইবন উসাইমিন স্পষ্ট করেছেন যে,

আল্লাহ তাআলা কুরআনে গরুর গোশতকে বান্দার জন্য হালাল ও নিয়ামত হিসেবে উল্লেখ করেছেন (সূরা আল-আন‘আম: ১৪৪)। আল্লাহ যেটিকে হালাল ও খাদ্য বানিয়েছেন, তা সার্বিকভাবে ‘রোগ’ হতে পারে না; ফলে এই বাক্যটি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বিশুদ্ধ কথার অংশ নয় [13]لقاء الباب المفتوح (১৮২/ ১৯).।

Read More...  বৃটিশোত্তর নাটোরে প্রথম গরু কুরবানি - ১৯৫৬!

আমলি সুন্নাহর সাথে বৈপরীত্য

রাসুলুল্লাহ ﷺ বিদায় হজে নিজ পরিবার এবং সাহাবিদের জন্য গরু জবাই ও কুরবানির বন্দোবস্ত করেন। যদি গরুর গোশত মৌলিকভাবেই ‘রোগ’ হতো, তবে উম্মতের পথপ্রদর্শক হিসেবে তিনি তাঁর পরিবার ও সাহাবিদের তা খেতে দিতেন না।

আল্লামা জারকাশি বলেন: সহিহ সনদে সাব্যস্ত যে রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ থেকে গরু কুরবানি করেছেন এবং কুরবানি দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা হয়, কোনো ‘রোগ’ বা ক্ষতিকর বস্তু দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় না[14]جامع الأحاديث (১৪/ ২৭০).।

বুখারি, মুসলিম ও সুনান হাদিসের কিতাবে আয়েশা (রা.) থেকে সাব্যস্ত যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ ঘরে প্রবেশ করে চুলার হাঁড়িতে গোশত ফুটতে দেখে তা পরিবেশন করতে বললেন। জানানো হলো এটি বারিরাকে দেওয়া সদকার গোশত। তখন নবিজি ﷺ বলেন:

«هُوَ لَهَا صَدَقَةٌ وَلَنَا هَدِيَّةٌ» (এটি তার জন্য সদকা, আর আমাদের জন্য হাদিয়া) [15]مستخرج أبي عوانة (১২/ ৩৯), بذل المجهود في حل سنن أبي داود (৬/ ৫১০).।

একাধিক বর্ণনায় স্পষ্ট এসেছে যে, বারিরা (রা.)-কে হাদিয়া দেওয়া সেই গোশতটি ছিল গরুর গোশত (لحم بقر) [16]السنن الكبرى – النسائي (৪/ ২০৬), سبل الهدى والرشاد (৭/ ১৮৬).। নবিজি ﷺ স্বয়ং সেই গোশত চেয়ে নিয়ে খেয়েছেন, যা প্রমাণ করে গরুর গোশত তাঁর কাছে সাধারণ খাদ্য হিসেবে প্রচলিত ও রুচিসম্মত ছিল।

আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন:

«فَلَمَّا كُنَّا بِمِنًى أُتِيتُ بِلَحْمِ بَقَرٍ، فَقُلْتُ: مَا هَذَا؟ قَالُوا: ضَحَّى رَسُولُ اللهِ ﷺ عَنْ أَزْوَاجِهِ بِالْبَقَرِ» (আমরা যখন মিনায় ছিলাম, আমাদের কাছে গরুর গোশত উপস্থিত করা হলো। আমি বললাম: এটা কী? তাঁরা বললেন: রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ থেকে গরু কুরবানি করেছেন) [17]صحيح البخاري (৭/ ৯৯).।

ইমাম কুরতুবি ও হাফিজ ইবন হাজার উল্লেখ করেন, এই হাদিসটি রাসুলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক গরুর গোশত গ্রহণ ও পরিবারের জন্য খাদ্য হিসেবে প্রস্তুত করার সুস্পষ্ট দলিল [18]فتح الباري (১০/ ৫).।

৪. প্রাচীন চিকিৎসা ও ফিকহি দৃষ্টিকোণ

সনদগতভাবে সেই বর্ণনাটি প্রমাণিত নয়, এমনকি মতনও বিরোধিতা করে। কেউ কেউ অর্থ সমন্বয় করার চেষ্টা করেছেন। যেসব আলেম শুধুমাত্র হাদিসটির মতন (অর্থ) চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন (যেমন: আল-হালিমি, ইবনুল কায়্যিম ও মানাভি):

  • আল হালিমি বলেছেন, আরবের হিজাজ অঞ্চলের আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত শুষ্ক ও উষ্ণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় গরুর গোশত হলো ভারী, হজমে ধীরগতির এবং প্রকৃতিগতভাবে শুষ্ক। সেজন্য হয়তো সতর্ক করেছিলেন। [19]فيض القدير (৪/ ৩৪৮).

  • ইবনুল কায়্যিম উল্লেখ করেন, যারা কায়িক পরিশ্রম করে না বা যাদের পেটে গ্যাস্ট্রিক-বদহজমের সমস্যা থাকে, তারা যদি মসলা (আদা, রসুন, দারুচিনি) ছাড়া একনাগাড়ে অতিরিক্ত গরুর গোশত খায়, তবে শরীরে অম্লতা ও শারীরিক ভারাক্রান্ততা তৈরি হতে পারে। এই নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত সতর্কতাকেই তৎকালীন চিকিৎসকেরা রূপক অর্থে সতর্ক করেছিলেন; এটি কোনো প্রকার শারঈ বা সার্বিক ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা নয় [20]التنوير شرح الجامع الصغير (৭/ ৩১২).।

  • অনেকে বলেছেন যে এটি শুধুমাত্র হেজাজ অঞ্চলের জন্য নির্দিষ্ট, অন্য এলাকার প্রযোজ্য নয়।[21]https://islamweb.org/ar/fatwa/76185

পরিশেষে, গরুর দুধ ও ঘৃতের গুণাগুণ সম্পর্কিত হাদিসগুলো গ্রহণযোগ্য হলেও, “গরুর গোশত রোগ” সম্পর্কিত বাক্যটির সনদ মুহাদ্দিসগণের কাছে মারফু হিসেবে সাব্যস্ত নয়। আর রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে গরুর গোশত খেয়েছেন এবং তাঁর পরিবারকে তা খাইয়েছেন।

Citation is loading...
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Back to top button