ফেরাউনের শূলে চড়ানো কি ঐতিহাসিক ভুল? কুরআন ও প্রাচীন মিশরের ইতিহাস
ফেরাউনের আমলে মিশরে শূলে চড়ানোর শাস্তি ছিল কি? সূরা ত্বহা ২০:৭১, আরবি 'সালব' ধাতু, জেনেসিস ৪০:১৯ ও সূরা মায়িদা ৫:৩৩ নিয়ে নাস্তিকদের আপত্তির দলিলভিত্তিক জবাব।

ফেরাউন জাদুকরদের হুমকি দিয়েছিল খেজুর গাছের কাণ্ডে শূলে চড়ানোর (সূরা ত্বহা ২০:৭১)। এই একটি আয়াতকে ঘিরেই নাস্তিক ও খ্রিষ্টান মিশনারিদের একটি পুরোনো আপত্তি ঘুরে বেড়ায়: ক্রুশে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড নাকি মূসা (আ.)-এর বহু শতাব্দী পরে শুরু হয়েছে, আর প্রাচীন মিশরের কোনো নথিতেও এর প্রমাণ নেই। অতএব, তাদের দাবি, কুরআনের বর্ণনা ঐতিহাসিকভাবে ভুল।
এই লেখায় আমরা আপত্তির প্রতিটি অংশ ধাপে ধাপে যাচাই করেছি। প্রাচীন মিশরের শিলালিপি, প্যাপিরাস ও গবেষণাপত্র থেকে দেখেছি, ফেরাউনদের যুগে শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ডের প্রচলন ছিল। আরবি “সালব” (ص-ل-ب) ধাতুর অর্থ আভিধানিক দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেছি এবং দেখেছি, শব্দটি শুধু † আকৃতির ক্রুশ বোঝায় না। জেনেসিস ৪০:১৯ ও তারগুম অনকেলোস নিয়ে করা দাবির জবাব দিয়েছি। সূরা মায়িদা ৫:৩৩-এর শাস্তির বিধান ও ফেরাউনের হুমকির মধ্যে নৈতিক পার্থক্যও আলোচনা করেছি। সবশেষে জিন নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নেরও জবাব দিয়েছি।
প্রশ্নটি এসেছিল একজন পাঠকের মাধ্যমে, যিনি এটি এক নাস্তিকের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। আমরা চেষ্টা করেছি দলিল ও সূত্রসহ উত্তর দিতে। আল্লাহ আমাদের এই প্রচেষ্টা কবুল করুন।
আমাদের কাছে আসা প্রশ্ন
নিচের প্রশ্নট এক ভাই করেছেন ফ্রমমুসলিমস ওয়েবসাইটের প্রশ্ন উত্তর সেকশনে
(নাস্তিকের কাছ থেকে পাওয়া)
ফেরাউন তার কওমকে যেভাবে শাস্তি দেওয়ার কারণে কুরআনে তাকে খলনায়ক হিসেবে প্রেজেন্ট করেছে, একইরকম শাস্তির কথা আল্লাহর নবীও বলে গেছেন, কিন্তু সেটাকে ইনসাফ বলা হচ্ছে? যেমন ফেরাউন তার কওমকে খেজুর গাছের কাণ্ডে শূলে চড়িয়ে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করত (সুরা ত্বহা-৭১)।
সেইম কথাগুলো তো সুরা মায়িদার ৩৩ নং আয়াতে আল্লাহ/নবীজিও বলেছেন। এটার ব্যাখ্যা কী?
প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশ
ক্রুশবদ্ধ করে কাউকে মারাটা ইতিহাসে প্রথম শুরুই হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ৬শ বছর আগে, অথচ ফেরাউনের যুগ তার চেয়েও হাজার বছর আগে ছিল। ইতিহাসে ফেরাউনের যুগে বা প্রাচীন মিশরে ক্রুশবদ্ধ করে মারার বিষয়টা পাওয়া যায় না, কিন্তু কুরআনে সেটাকে ন্যারেশন করা হয়েছে (হিস্টোরিক্যাল মিস্টেক)।
এভাবে মারাটা যদি কোনো সিগনিফিক্যান্ট ঘটনা হতো, তাহলে তো হায়ারোগ্লিফিক্সে/প্যাপিরাসে বা যে যে পাণ্ডুলিপি বা ম্যানুস্ক্রিপ্ট পাওয়া গেছে, সেগুলোতে এটার কথা থাকত। কুরআনে বারবার মেনশন করা হয়েছে, মানে এটা একটা পপুলার ঘটনা, কিন্তু আমরা কোনো মিশরীয় স্ক্রিপ্টে এগুলো পাই না। নাস্তিকরা বলে যে সপ্তম শতাব্দীর আরবে এভাবে শাস্তি দেওয়াটা পেইনফুল একটা প্রসেস ছিল, তাই এভাবে তাদের ভয় দেখানো হয়েছে, যেন কেউ উনার বিরুদ্ধে কিছু দাবি না করে (নাউজুবিল্লাহ)।
প্রশ্নের তৃতীয় অংশ
তাদের আরেকটা দাবি হচ্ছে, ইতিহাসের এই ক্ষেত্রে কুরআনে ভুল থাকলেও জেনেসিসের ৪০:১৯-এ সঠিকটা বলা আছে। সেই সময় মিশরে ইম্পেল করে লোকদের মারা হতো, সেই ইম্পেলমেন্ট শব্দটা আছে জেনেসিসে। এটার হিস্টোরিক্যাল ডকুমেন্টেশন আছে। কিন্তু ক্রুসিফাই করার কথা আছে কুরআনে, যা ঐতিহাসিকভাবে ভুল।
ইহুদিদের একটা স্ক্রিপচার আছে ‘তারগুম অংকেলস’ নামে। সেখানে তারা যখন জেনেসিসের এই কথাটা আরামাইক ভাষায় অনুবাদ করে, তখন তারা এখানে ভুল অনুবাদ করে। তারা এটাকে ক্রুসিফিকেশন অনুবাদ করে। আর তাদের এই তারগুম অংকেলস নবীজি আসারও ৪/৫শ বছর আগে অনেক প্রসিদ্ধ ছিল, প্রচলিত ছিল। তো, তারা বলছে যে নবীজি ক্রুসিফিকেশনের কথাটা সেখান থেকেই নিয়েছেন, কিন্তু এটা যে ভুল অনুবাদ, তা তো তিনি জানতেন না, তাই কুরআনেও ভুলটাই তুলে দিয়েছেন (সুরা ইউসুফ, ১২:৪১ “ক্রুশবদ্ধ করে যাকে মারা হবে, তার মাংস পাখিরা খুবলে খাবে”), যার কোনো হিস্টোরিক্যাল এভিডেন্স নেই।
প্রশ্নের চতুর্থ অংশ
আরেকটা প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন: জিনের কথা নাকি খ্রিস্টানিটি বা জুডাইজমের কোথাও নেই। তখনকার আরবে যে ফোকলোর (লোককাহিনি) প্রচলিত ছিল, সেখানে জিনের কথা ছিল, তাই নাকি নবীজি কুরআনে জিনের কথা এনেছেন।
আমাদের দেওয়া উত্তর
জবাব: بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله والصلاه والسلام على رسول الله وعلى اله وبعد
এই প্রশ্নের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, তাই প্রশ্নটা আমি কয়েকটি ভাগে ভাগ করে উত্তর দিচ্ছি।
দ্বিতীয় অংশের আপত্তিটির বক্তব্য হলো:
১. কুরআনে ফেরাউনের সময়কার শাস্তি হিসেবে শূলবিদ্ধ বা ক্রুশবিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
২. ঘটনাটি যদি সত্যিই প্রাচীন মিশরে প্রচলিত থাকত, তাহলে মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিক্স, প্যাপিরাস বা অন্যান্য প্রাচীন নথিতে তার প্রমাণ পাওয়া যেত।
৩. কিন্তু প্রাচীন মিশরের নথিতে কুরআনে বর্ণিত পদ্ধতির প্রমাণ নেই।
৪. অতএব, কুরআনের বর্ণনা ঐতিহাসিকভাবে ভুল।
জবাব: মুসলিমদের দাবি হলো, কুরআন যেহেতু মহান রবের পক্ষ থেকে এসেছে, সেটার ওপর ভিত্তি করেই মুসলিমরা বলে কুরআনে কোনো ভুল থাকা সম্ভব না। ভুল মানে সীমাবদ্ধতা এবং কোনো কিছু না জেনে ইচ্ছামতো কিছু একটা বলে দেওয়া। কিন্তু মহান রব জ্ঞান সৃষ্টি করেছেন, সুতরাং তিনিই জানেন সবকিছুর রহস্য, সুবহানাল্লাহ!
কুরআন হলো মহান রবের কালাম। তাঁর ইলম, যা মানুষ জানে না, সেটাও কুরআনেই আছে।
আমার খুব অদ্ভুত লাগে, যখন আমি চিন্তা করি, মানুষ কীভাবে ইন্টারনেটের এই যুগে এসে এসব উদ্ভট দাবি করে!
যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে তারা হয়তো ইসলামের সত্যতা উপলব্ধি করতে পারত, কিন্তু তারা শুধু প্রশ্নগুলো মনের মধ্যে পুষে রাখতে পছন্দ করে। সংশয়কে তারা নিজেদের সঙ্গী বানিয়ে নিয়েছে। এতে তারা হয়তো তৃপ্ত হয়, তবে আফসোস তাদের জন্য! নিজেদের মনকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে তারা নিজেকেই ধোঁকা দিচ্ছে।
আমরা প্রশ্নগুলোকে কেন্দ্র করে জবাবগুলো দিচ্ছি। তার আগে উক্ত প্রশ্নে কিছু ভুল বিষয় উপস্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো আমি মার্ক করে তারপর আপত্তিগুলোর উত্তর দিচ্ছি।
১. “খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ সালের আগে ক্রুশবিদ্ধ † আকৃতির ক্রুশে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো না” এটি প্রমাণিত ঐতিহাসিক সত্য নয়। আবার “খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ সালের অনেক আগে † আকৃতির ক্রুশে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো” এ দাবির পক্ষেও এখানে নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
২. ইতিহাসে ফারাওদের যুগে স্পষ্টভাবেই শূলে চড়িয়ে শাস্তির উল্লেখ পাওয়া যায়, তবে প্রচলিত † ক্রুশবিদ্ধ ধরনের নয়।
৩. কুরআনের শব্দ স-ল-ব এবং † ক্রুশবিদ্ধকে একই বিষয় মনে করা হয়েছে, অথচ দুটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়।
৪. ‘তারগুম অংকেলস’ নবীজির নবুয়তের ৩০০, ৪০০ বছর আগে আসলেই সেই অনুবাদ ছিল, এর প্রমাণ অনুপস্থিত।
৫. প্রশ্নে আরও ধরে নেওয়া হয়েছে, নবীজি ﷺ ভাষাবিদ ছিলেন এবং সেই চিরচেনা আপত্তি উল্লেখ করা হয়েছে যে তিনি বাইবেল থেকে নিয়েছেন (নাউজুবিল্লাহ)। আমি এই প্রশ্নের উত্তরে শেষে কিছু বই দিয়ে দেবো, নাহলে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আর্টিকেল আরও অনেক লম্বা হয়ে যাবে।
আর আল্লাহ যাকে হেদায়েত দান করেন, তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না, আর তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তাকে কেউ হেদায়েত দিতে পারে না।
ফেরাউনদের যুগে শূলে চড়িয়ে শাস্তি দেওয়ার ইতিহাস
আপত্তি: কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে যে মূসা (আ)-এর প্রতি ঈমান আনয়নকারী জাদুকরদের উদ্দেশে ফেরাউন বলেছিল:
قَالَ ءَامَنتُمْ لَهُۥ قَبْلَ أَنْ ءَاذَنَ لَكُمْ ۖ إِنَّهُۥ لَكَبِيرُكُمُ ٱلَّذِى عَلَّمَكُمُ ٱلسِّحْرَ ۖ فَلَأُقَطِّعَنَّ أَيْدِيَكُمْ وَأَرْجُلَكُم مِّنْ خِلَٰفٍ وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ ٱلنَّخْلِ وَلَتَعْلَمُنَّ أَيُّنَا أَشَدُّ عَذَابًا وَأَبْقَىٰ
“সে বলল, ‘আমি তোমাদেরকে অনুমতি দেয়ার আগেই তোমরা কি তার প্রতি ঈমান আনলে? নিশ্চয় সে তোমাদের প্রধান, যে তোমাদেরকে জাদু শিখিয়েছে। সুতরাং আমি অবশ্যই তোমাদের হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলব এবং তোমাদেরকে খেজুর গাছের কাণ্ডে শুলিবিদ্ধ করবই। আর তোমরা অবশ্যই জানতে পারবে যে, আমাদের মধ্যে কার শাস্তি কঠোরতর ও অধিক স্থায়ী।’” [সূরা ত্ব-হা, ২০:৭১]
অন্য আয়াতে এসেছে,
قَالَ فِرۡعَوۡنُ اٰمَنۡتُمۡ بِہٖ قَبۡلَ اَنۡ اٰذَنَ لَکُمۡ ۚ اِنَّ ہٰذَا لَمَکۡرٌ مَّکَرۡتُمُوۡہُ فِی الۡمَدِیۡنَۃِ لِتُخۡرِجُوۡا مِنۡہَاۤ اَہۡلَہَا ۚ فَسَوۡفَ تَعۡلَمُوۡنَ لَاُقَطِّعَنَّ اَیۡدِیَکُمۡ وَاَرۡجُلَکُمۡ مِّنۡ خِلَافٍ ثُمَّ لَاُصَلِّبَنَّکُمۡ اَجۡمَعِیۡنَ
ফির‘আউন বলল, আমি তোমাদেরকে অনুমতি দেওয়ার আগেই তোমরা তার প্রতি ঈমান আনলে? নিশ্চয়ই এটা কোন চক্রান্ত। তোমরা শহরে এই চক্রান্ত করেছ, যাতে তোমরা এর বাসিন্দাদেরকে এখান থেকে বহিষ্কার করতে পার। আচ্ছা, তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে। আমি অবশ্যই তোমাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলব, তারপর তোমাদের সকলকে শূলে চড়িয়ে ছাড়ব। [সূরা আরাফ আয়াত ১২৩-১২৪]
একই কথা সূরা আশ শুআরা আয়াত ৪৯-তেও বর্ণিত হয়েছে। এবং সূরা ইউসুফ আয়াত ৪১ এ ইউসুফ (আ) এর সময়কার দুইজনের স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলা হয়েছে,
یٰصَاحِبَیِ السِّجۡنِ اَمَّاۤ اَحَدُکُمَا فَیَسۡقِیۡ رَبَّہٗ خَمۡرًا ۚ وَاَمَّا الۡاٰخَرُ فَیُصۡلَبُ فَتَاۡکُلُ الطَّیۡرُ مِنۡ رَّاۡسِہٖ ؕ قُضِیَ الۡاَمۡرُ الَّذِیۡ فِیۡہِ تَسۡتَفۡتِیٰنِ ؕ
হে আমার কারা সঙ্গীদ্বয়! (এখন তোমাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুনে নাও) তোমাদের একজনের ব্যাপার এই যে, (বন্দী দশা থেকে মুক্তি পেয়ে) সে নিজ মনিবকে মদ পান করাবে। আর থাকল অপরজন। তা তাকে শূলে চড়ানো হবে। ফলে পাখিরা তার মাথা (ঠুকরে ঠুকরে) খাবে। তোমরা যে বিষয়ে জিজ্ঞেস করছিলে তার ফায়সালা (এভাবে) হয়ে গেছে।
এই আয়াত গুলা উল্লেখ করে আপত্তি করা হয়েছে যে এখানে ফেরাউনের বা ইউসুফ (আ) এর প্রতি যে বক্তব্যটি আরোপ করা হয়েছে, তা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। কারণ, অপরাধীদের শাস্তি হিসেবে শূলে চড়িয়ে হত্যা করার প্রচলন মূসা (আ)-এর যুগের কয়েক শতাব্দী পরেই শুরু হয়েছিল।
জবাব: ইন্টারনেটের এই যুগে এই ধরনের আপত্তি মানুষ কীভাবে করে, সেটা চিন্তার বিষয়!
ঐতিহাসিক প্রমাণ সাক্ষ্য দেয় যে প্রাচীন মিসরীয়দের মধ্যে শূলে চড়িয়ে শাস্তি দেওয়ার প্রথা পরিচিত ছিল। Encyclopaedia Judaica-তেও এই বিষয়টি স্বীকৃত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে:
There are reports of crucifixions from Assyrian, Egyptian, Persian, Greek, Punic, and Roman sources
“আসিরীয়, মিসরীয়, পারসিক, গ্রিক, পুনিক ও রোমান উৎসগুলোতে শূলে চড়িয়ে শাস্তি দেওয়ার বিভিন্ন বিবরণ পাওয়া যায়।”
কুরআনের এই বাক্যাংশটিও মুফাসসিরদের সামনে একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। কারণ, আয়াতটিতে বলা হয়নি, ‘আমি তোমাদের খেজুরগাছের কাণ্ডের ওপর শূলে চড়াব।’ বরং বলা হয়েছে:
وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ النَّخْلِ
অর্থাৎ, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের খেজুরগাছের কাণ্ডের মধ্যে শূলে চড়াব।’
এই শব্দচয়ন থেকে মনে হয়, এখানে ক্রুশ বা শূল এবং শূলে চড়ানো ব্যক্তির মধ্যে একধরনের সংযোগ বা মিশ্রণ রয়েছে; যেন ক্রুশটি শূলে চড়ানো ব্যক্তির শরীর ভেদ করে প্রবেশ করেছে।
ফেরাউনদের যুগে শূলে চড়িয়ে শাস্তি দেওয়ার পদ্ধতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শূলে চড়ানো ব্যক্তিকে একটি কাঠের খণ্ডের ওপর স্থাপন করা হতো। ফলে কাঠটি তার শরীরের অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত থাকত।
প্রাচীন মিসরের অপরাধ ও শাস্তিব্যবস্থা নিয়ে রচিত The Pharaoh’s Judgment: Crime and Punishment in Ancient Egypt নামক গ্রন্থে গাছের কাণ্ডের ওপর শূলে চড়িয়ে শাস্তি দেওয়ার একটি চিত্র নিচে দিয়ে দিচ্ছি।
প্রাচীন মিসরে শূলে বিদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পদ্ধতির ঐতিহাসিক উল্লেখ পাওয়া যায়। Joyce A. Tyldesley তাঁর Judgement of the Pharaoh: Crime and Punishment in Ancient Egypt গ্রন্থে প্রাচীন মিসরের বিভিন্ন মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি আলোচনা করতে গিয়ে কাঠের শূলে বিদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।
লেখিকার বর্ণনা অনুযায়ী, বেসামরিক ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের একটি পছন্দনীয় পদ্ধতি ছিল কাঠের শূলে বিদ্ধ করা। এ প্রসঙ্গে তিনি নাউরি ফরমানের একটি বাক্য উদ্ধৃত করেছেন:
“caused to fall, he being placed on the top of the wood”
সম্পূর্ণ টেক্সট দেখুন,
The most severe penalty that the state could inflict was death followed by the loss of burial rites. Death provided a cheap and efficient means of disposing of unwanted and dangerous elements in a society that had no interest in either rehabilitating its prisoners or preserving them for years in a costly prison cell. Although we are invited to appreciate a variety of deaths on the battlefield by smiting, piercing with arrow, lance or sword, decapitation, trampling with chariot and horses, or drowning the preferred method of civilian execution was by impaling on a wooden stake, the convicted party being, in the graphic words of the Nauri decree, ’caused to fall, he being placed on the top of the wood’.
The rare hieroglyphic determinative for this type of execution, as seen in the Amada stela of Merenptah, shows a person suspended by the centre of the torso on the point of a pole slightly shorter than the victim (see above). The man is face downwards so that his arms and legs dangle towards the ground
রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির ওপর যে সর্বোচ্চ কঠোর শাস্তি আরোপ করতে পারত, তা ছিল মৃত্যুদণ্ডের পর তাকে দাফন-সংক্রান্ত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান থেকে বঞ্চিত করা। এমন একটি সমাজে মৃত্যুদণ্ড ছিল অবাঞ্ছিত ও বিপজ্জনক ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়ার একটি সাশ্রয়ী ও কার্যকর উপায়, যে সমাজে বন্দিদের সংশোধন করার কিংবা ব্যয়বহুল কারাকক্ষে বছরের পর বছর আটকে রেখে তাদের বাঁচিয়ে রাখার কোনো আগ্রহ ছিল না।
যদিও যুদ্ধক্ষেত্রে হত্যা করার বিভিন্ন পদ্ধতির কথা আমরা জানতে পারি—যেমন আঘাত করে হত্যা করা, তির, বর্শা বা তরবারি দিয়ে বিদ্ধ করা, শিরশ্ছেদ করা, রথ ও ঘোড়ার পায়ের নিচে পিষে ফেলা কিংবা পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করা—তবুও বেসামরিক ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পছন্দনীয় পদ্ধতি ছিল কাঠের একটি শূলে বিদ্ধ করা। নাউরি ফরমানের চিত্রময় ভাষায়, দণ্ডিত ব্যক্তিকে এভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো: ‘তাকে ফেলে দেওয়া হতো, আর তাকে কাঠের ওপরের অংশে স্থাপন করা হতো।’
এই ধরনের মৃত্যুদণ্ড বোঝাতে ব্যবহৃত বিরল হায়ারোগ্লিফিক নির্ধারক-চিহ্নে, যেমন মেরনেপতাহর আমাদা শিলালিপিতে দেখা যায়, একজন ব্যক্তিকে এমনভাবে দেখানো হয়েছে, যেন তাঁর ধড়ের মাঝখান দিয়ে তাঁকে একটি দণ্ডের অগ্রভাগে বিদ্ধ করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। দণ্ডটি ভুক্তভোগীর উচ্চতার চেয়ে সামান্য ছোট (উপরের চিত্রটি দেখুন)। লোকটির মুখ নিচের দিকে ফেরানো, ফলে তাঁর হাত ও পা মাটির দিকে ঝুলে রয়েছে।
অর্থাৎ, দণ্ডিত ব্যক্তিকে ফেলে দিয়ে কাঠের ওপরের অংশে স্থাপন করা হতো।
এ ছাড়া লেখিকা মেরনেপতাহর আমাদা শিলালিপিতে পাওয়া একটি বিরল হায়ারোগ্লিফিক চিহ্নের উল্লেখ করেছেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ওই চিহ্নে একজন ব্যক্তিকে ধড়ের মাঝামাঝি অংশ দিয়ে একটি খুঁটির অগ্রভাগে বিদ্ধ অবস্থায় দেখানো হয়েছে।
এই বিষয়ে Ahmad Abo El Magd মিসরের Minia University-এর একজন অধ্যাপক ও Egyptology গবেষক। তাঁর গবেষণার মধ্যে প্রাচীন মিসরের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব রয়েছে। তিনি এই বিষয়ে একটি পেপার লিখেছেন। যুক্তি, তথ্য এবং প্রমাণের মাধ্যমে তিনি বলেন,
Impalement – as a type of capital punishment in ancient Egypt- has been a much debated subject. Supported by a number of documents dating to the Middle and New Kingdoms, this paper argues that impalement, namely putting on stick or tree as a penalty, was a method of execution for some crimes in ancient Egypt
প্রাচীন মিশরে মৃত্যুদণ্ডের একটি ধরন হিসেবে ‘শূলে চড়ানো’ একটি বহু আলোচিত বিষয়। মধ্য ও নতুন রাজবংশের সমসাময়িক বেশ কিছু দলিলের ওপর ভিত্তি করে এই নিবন্ধে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, শূলে চড়ানো, অর্থাৎ শাস্তি হিসেবে খুঁটি বা গাছের ওপর চড়ানো, প্রাচীন মিশরে কিছু নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য প্রচলিত একটি মৃত্যুদণ্ড প্রদানের পদ্ধতি ছিল।
এরপর তিনি দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করা শুরু করেন, যা আমি হুবহু বাংলায় উপস্থাপন করছি।
তোদ (Tod) থেকে প্রাপ্ত প্রথম সেনুসেরতের ক্ষতিগ্রস্ত শিলালিপি
মধ্য রাজত্বকালের (Middle Kingdom) একক ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক শিলালিপি হলো তোদ থেকে প্রাপ্ত রাজা প্রথম সেনুসেরতের ক্ষতিগ্রস্ত শিলালিপি।
এই শিলালিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাজা প্রথম সেনুসেরত তোদের মন্দিরটিকে অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় দেখতে পান। মন্দিরটি আগাছায় আচ্ছাদিত হয়ে পড়েছিল, এর সিলমোহরগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছিল এবং মন্দিরের দেয়ালের কিছু অংশ ভেঙে পড়েছিল। এ ছাড়া, মন্দিরের কাঠামোর কিছু অংশে আগুন লাগানো হয়েছিল বলেও প্রতীয়মান হয়।
শিলালিপির টেক্সটটি
[(as for) those who had cast] fire and flame on the temple, and those who had trespassed in this house. [My Majesty made a great (?) slaughter among them (?) men and women, the valleys filled with the flayed (srhw) and the hills with the impaled (pthw) [যারা] মন্দিরের ওপর আগুন ও অগ্নিশিখা নিক্ষেপ করেছিল এবং যারা এই পবিত্র স্থানে অনধিকার প্রবেশ করেছিল, [তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে:] আমার মহিমাময় রাজকীয় সত্তা তাদের মধ্যে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল (?)। উপত্যকাগুলো চামড়া ছাড়ানো (srhw) ব্যক্তিদের দ্বারা এবং পাহাড়গুলো শূলে বিদ্ধ (pthw) ব্যক্তিদের দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।
‘pthw’ শব্দটির প্রসঙ্গে: রেডফোর্ড (Redford) উল্লেখ করেছেন যে, এই লেখায় ব্যবহৃত নির্ধারক চিহ্নটি (determinative) হলো একত্রে বাঁধা চারটি খাড়া শূলের চিত্র। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, লেখাটির সামগ্রিক প্রেক্ষাপট, নির্ধারক চিহ্ন এবং শূলে বিদ্ধ করার অর্থবোধক সেমিটিক সমগোত্রীয় শব্দ pht বিবেচনায় নিলে, এখানে pthw শব্দটির অর্থ সম্ভবত শূলে বিদ্ধ করা এবং শূলের মধ্যে গেঁথে দেওয়া।
সমাধি কিংবা মন্দির, যে ধরনের পবিত্র ভূমিই হোক না কেন, সেটিকে অপবিত্র করাকে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করা হতো। রাজা প্রথম সেনুসেরতের তোদ-সংক্রান্ত এই শিলালিপিকে এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যদিও এর কিছু দিক নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। লেখাটির কিছু অংশে অতিরঞ্জন থাকলেও, এটি আমাদের এমন এক ঐতিহাসিক ধারণা দেয় যে, রাজা তাঁর শাসনামলে কী ধরনের শাস্তি প্রয়োগের ক্ষমতা রাখতেন এবং সেগুলোকে কীভাবে ব্যবহার করা হতো।
তোদের মন্দির অপবিত্রকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানোর বিবরণ দিতে গিয়ে সেনুসেরত প্রথম বারবার brwy (শত্রু) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এই শব্দটি বিশেষভাবে রাজার শত্রুকে বোঝাত, যার মধ্যে বিদ্রোহীরাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই বিশেষ্যটির বিমূর্ত অর্থ হিসেবে ‘শত্রুতা’, ‘বিদ্রোহ’ কিংবা ‘বিদ্রোহমূলক কর্মকাণ্ড’ উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং, সেনুসেরত প্রথম নিহত ব্যক্তিদের রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করছিলেন, যাতে তাদের হত্যা করার পক্ষে একটি যুক্তি প্রতিষ্ঠা করা যায়।
আমরা আরও কিছু প্রমাণ উল্টো পেপার থেকে উপস্থাপন করছি হুবহু।
Theban Account Papyrus (Papyrus Boulaq 18) (Pl.I)
প্যাপিরাস বুলাক ১৮ (Papyrus Boulaq 18) প্রাচীন মিশরের দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী যুগের (Second Intermediate Period) শুরুর দিকের নিদর্শন। বিশেষত, এটি ত্রয়োদশ রাজবংশের (13th Dynasty) দুই রাজা খেন্ডজের (Chendjer) ও দ্বিতীয় সোবেখোতেপ (Sobekhotep II)-এর শাসনামলের সঙ্গে সম্পর্কিত।

a blood bath (?) had occurred with (by?) wood (?) … the comrade was put on the stake (tp-bt), land near the island …; waking alive at the places, may he live, be prosperous and be in health
কাঠের সাহায্যে (?) একটি রক্তস্নাত হত্যাকাণ্ড (?) সংঘটিত হয়েছিল… সেই সঙ্গীকে একটি খুঁটির ওপর গেঁথে দেওয়া হয়েছিল (tp-bt)। দ্বীপের নিকটবর্তী ভূমি…; স্থানগুলোতে জীবিত অবস্থায় জেগে ওঠা… সে যেন বেঁচে থাকে, সমৃদ্ধি লাভ করে এবং সুস্বাস্থ্যে থাকে।
আমেনহোটেপ চতুর্থ (আখেনাতেন) এর বুহেন শিলালিপি (প্লেট II)
কুশের ভাইসরয় জেহুতিমোসে (Djehutymose) বুহেনে একটি শিলালিপি স্থাপন করেছিলেন। একই ধরনের প্রায় অভিন্ন একটি লিপি আমাদাতেও পাওয়া যায়। উভয় শিলালিপিই বেশ ক্ষতিগ্রস্ত। এগুলোতে আকুয়াতি (Akuyati) গোত্রের বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে সংঘটিত একটি যুদ্ধের বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে।
এই সংঘাতের তারিখটিও ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। তবে সেখানে অবশিষ্ট থাকা সাল-সংক্রান্ত চিহ্নগুলো থেকে ধারণা করা হয়, ঘটনাগুলো আখেনাতেনের রাজত্বের দ্বাদশ বছরে সংঘটিত হয়েছিল।
ক্ষতিগ্রস্ত শিলালিপিগুলোর বিবরণ অনুযায়ী, একজন বার্তাবাহক সরাসরি আখেনাতেনের কাছে (সম্ভবত আখেতাতেনে অবস্থানকালে) খবর পৌঁছে দেন যে, নুবিয়ায় অস্থিরতা ও বিদ্রোহের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আখেনাতেন একটি শাস্তিমূলক সামরিক অভিযান (punitive expedition) পরিচালনার দায়িত্ব তাঁর কুশের ভাইসরয় জেহুতিমোসের ওপর অর্পণ করেন।
লেখাটিতে নুবীয়রা কেন মরুভূমির দিকে তাদের পশ্চাদপসরণ অব্যাহত রাখেনি, কিংবা কূপগুলোর কাছে এসে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্তটি তারা নিজেরাই নিয়েছিল কি না, সে সম্পর্কে কোনো ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি। একইভাবে, প্রতিপক্ষের সেনাবাহিনী ঠিক কী ধরনের সামরিক কৌশল ব্যবহার করেছিল, তা কেবল অনুমান করা সম্ভব। তবে যুদ্ধের ফলাফল সম্পর্কে মিশরীয় নথিগুলোতে কোনো অস্পষ্টতা নেই। জেহুতিমোসে ১৪৫ জন জীবিত বন্দিকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ১২ জন ছিল শিশু। এ ছাড়া শত্রুপক্ষের মোট ২২৫ জন হতাহতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অতিরিক্ত যুদ্ধলব্ধ সম্পদের মধ্যে সম্ভবত ৩৬১টি গবাদিপশুর কথাও লিপিবদ্ধ রয়েছে।
শিলালিপির পাঠটি নিম্নরূপ:
List (of the enemy belonging to) Ikayta: living Nehesi 80+?; …… their (chiefs?) 12; total number of living captives 145; those who were impaled (nty.w hr bt)……. total 225; beasts 361
ইকায়তা (Ikayta)-এর শত্রুদের তালিকা: জীবিত নেহেসি (Nehesi) ৮০ জনের বেশি (?) ; …… তাদের (প্রধানদের?) সংখ্যা ১২; জীবিত বন্দিদের মোট সংখ্যা ১৪৫; যাদের খুঁলে বিদ্ধ করা হয়েছে (nty.w ḥr bt) ……; মোট সংখ্যা ২২৫; গবাদিপশু ৩৬১টি।
আখেনাতেনের হাতে বন্দিদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছিল, তা ছিল একেবারেই অস্বাভাবিক। উভয় শিলালিপিতেই উল্লেখ রয়েছে যে, বন্দি আকুয়াতি গোত্রের কয়েকজন সদস্যকে ‘একটি খুঁটির ওপর স্থাপন করা হয়েছিল’ (placed atop a stake)। মিশরীয় ভাষায় এটি ছিল শূলে বিদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রচলিত অভিব্যক্তি, অর্থাৎ impalement, শূলে চড়ানো।
মজার বিষয় হলো, নব্য রাজবংশীয় যুগের (New Kingdom) পরবর্তী সময়ের প্রাচীন মিশরীয় কিছু লিপি আকুয়াতি যাযাবরদের বিরুদ্ধে আখেনাতেন কেন এত চরম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন, তার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিতে পারে।
দ্বিতীয় রামেসিসের রাজত্বকালের কুবান শিলালিপি (Kuban Stela) অনুসারে, আকুতা (Akuta) নামক দক্ষিণাঞ্চলীয় ভূখণ্ডে ‘প্রচুর সোনা’ (much gold) ছিল।
কুবান যেহেতু নীল নদের এমন একটি প্রান্তস্থ স্থান, যেখান থেকে প্রধান মরুভূমির সড়কটি ওয়াদি আল্লাকির (Wadi Allaqi) স্বর্ণখনি অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়েছে, তাই কুবান শিলালিপির অন্যান্য বক্তব্য বিবেচনায় আকুতা বলতে সম্ভবত ওয়াদি আল্লাকি অঞ্চলকেই বোঝানো হয়েছে। একসময় এটি ছিল উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার অন্যতম সমৃদ্ধ স্বর্ণখনি অঞ্চল।
সুতরাং, এই গোত্রটির বিরুদ্ধে এমন ভয়াবহ শাস্তি আরোপের প্রধান কারণ হতে পারে, তারা মূল্যবান স্বর্ণখনিগুলোর কাছাকাছি বসবাস করত। এসব স্বর্ণখনি আখেনাতেনের জন্য অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং এ কারণে বিদ্রোহী গোত্রটির বিরুদ্ধে বিশেষভাবে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রেরণা জুগিয়ে থাকতে পারে।
এবং মিশরের স্বর্ণ সরবরাহে যেকোনোভাবে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করতে পারে, এমন যে কারও জন্য এটি ছিল এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা।
খুঁটিতে গেঁথে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার (Impalement) ঘটনা তাদের ওপরও গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছিল, যারা আকুয়াতি বিদ্রোহে অংশ নেয়নি। খণ্ডিত শিলালিপিগুলো থেকে বোঝা যায়, এই ভয়াবহ দৃশ্য প্রদর্শনের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জিত হয়েছিল।
শিলালিপিগুলোতে আনুগত্য প্রকাশকারী একটি ভাষণের আংশিক বিবরণ সংরক্ষিত রয়েছে। এতে নুবীয় শাসকেরা ফেরাউনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে নিজেদের ভূখণ্ডের সমস্ত সম্পদ তাঁর জন্য উজাড় করে দেওয়ার অঙ্গীকার করে। সম্ভবত এর উদ্দেশ্য ছিল, ফেরাউন যেন তাদের ভূখণ্ডে এসে নিজের হাতে তা লুটপাট না করেন। আর এই প্রক্রিয়ার অনুষঙ্গ হিসেবে খুঁটিতে গেঁথে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনাও ঘটে থাকতে পারে।
নাউরিতে প্রথম সেতি (Seti I) এর নাউরি ডিক্রি (Nauri Decree)
আবিদোসে (Abydos) ওসিরিসের একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পর, যা ওসিরেইন (Osireion) নামে পরিচিত, প্রথম সেতি (Seti I) একটি রাজকীয় ফরমান জারি করেন। এই ফরমানের মাধ্যমে একটি বৃহৎ ভূসম্পত্তিকে কর ও অন্যান্য বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
প্রথম সেতি নুবিয়ায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় জলপ্রপাতের (Cataract) মধ্যবর্তী অঞ্চলে নাউরি (Nauri)-তে একটি পাহাড়ের খাড়া পাথুরে গায়ে এই ফরমানটি খোদাই করান।
এই ভূসম্পত্তিগুলোর ব্যবস্থাপনা সুসংগঠিত করার উদ্দেশ্যে প্রথম সেতি রাজকীয় আইনের আকারে একটি আইনি বিধান যুক্ত করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল, ওসিরেইনের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত সম্পদ ও কর্মীদের প্রতি দুর্ব্যবহার এবং সেগুলোর আত্মসাৎ বা অপব্যবহার প্রতিরোধ করা। সম্ভাব্য বিভিন্ন অপরাধের জন্য প্রথম সেতি একাধিক শাস্তির বিধান নির্ধারণ করেন।
লিপির ৭৫–৭৯ নম্বর পঙ্ক্তিতে বলা হয়েছে:
Now as for any superintendent of cattle, any superintendent of donkeys, any herdsman belonging to the Temple of Menmare Happy in Abydos, who shall sell of any beast belonging to the Temple of Menmare Happy in Abydos to someone else; likewise whoever may cause it to be offered on some other document, and it not be offered to Osiris his master in the Temple of Menmare Happy in Abydos; the law shall be executed against him, by condemning him, impaled on the stake, along with forfeiting(?) his wife, his children and all his property to the Temple of Menmare Happy in Abydos
আবিদোসে অবস্থিত মেনমারে হ্যাপি (Menmare Happy)-এর মন্দিরের যেকোনো গবাদিপশুর তত্ত্বাবধায়ক, গাধার তত্ত্বাবধায়ক কিংবা পশুপালক যদি ওই মন্দিরের কোনো পশু অন্য কারও কাছে বিক্রি করে; অথবা কেউ যদি অন্য কোনো নথিতে সেই পশু উৎসর্গ করার ব্যবস্থা করে, অথচ আবিদোসে অবস্থিত মেনমারে হ্যাপি-এর মন্দিরে তার প্রভু ওসিরিসের উদ্দেশ্যে তা উৎসর্গ না করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইন কার্যকর করা হবে। তাকে শূলে বিদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। পাশাপাশি, তার স্ত্রী, সন্তান এবং তার সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে আবিদোসে অবস্থিত মেনমারে হ্যাপি-এর মন্দিরের অধীনে ন্যস্ত করা হবে।
এটি স্পষ্ট যে, কেবল গবাদিপশুর তত্ত্বাবধায়ক, শিকারি কুকুরের তত্ত্বাবধায়ক অথবা পশুপালক কর্তৃক গবাদিপশুর অর্থ আত্মসাৎ এবং সেগুলো যথাযথভাবে উৎসর্গ না করার অপরাধেই শাস্তি হিসেবে শূলে চড়ানোর (impalement) বিধান ছিল। তবে ওসিরিসের ধর্মীয় উপাসনাকেন্দ্র অ্যাবিডোসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে, যেখানে আঘাত ও প্রহারের শাস্তি দেওয়া হতো, সেখানে এই অপরাধের জন্য কেন এমন শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা লিপিতে স্পষ্ট নয়।
অন্যান্য অপরাধগুলোর মধ্যে ছিল ওসিরিসের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া, এস্টেটের নৌযান চলাচলে বাধা দেওয়া, এস্টেটের শিকারিদের ওপর আক্রমণ করা, পণ্যসামগ্রী চুরি করা অথবা এস্টেটের পশুপালকদের ওপর হামলা করা। এসব অপরাধের শাস্তি হিসেবে অপরাধীর কান কেটে দেওয়া এবং তাকে কঠোর শ্রমে নিয়োজিত করার বিধান ছিল। এ ছাড়া, জমির সীমানা পরিবর্তন করাও একটি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতো।
লর্টন (Lorton) যুক্তি দিয়েছিলেন যে, শূলে চড়ানোর মতো কঠোর শাস্তি দেওয়ার কারণ ছিল সম্পত্তি চুরি করার পাশাপাশি সেটিকে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা। অন্যদিকে, এডগারটন (Edgerton) মনে করেছিলেন, সম্ভবত ওসিরেইন (Osireion)-এর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে গবাদিপশুর বিশেষ গুরুত্ব ছিল; আর এ কারণেই এই অপরাধের জন্য এত কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছিল।
যুক্তি দেওয়া যেতে পারে যে, এই কঠোর শাস্তির পেছনে বিশ্বাসভঙ্গ এবং ধর্মীয় পবিত্রতার অবমাননা, এই দুটি অপরাধের সম্মিলিত প্রভাব কাজ করেছিল।
নাউরি ডিক্রির আরেকটি প্রাসঙ্গিক অংশ হলো ১০৭–১০৮ নম্বর পঙ্ক্তি। এখানে এমন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থার উল্লেখ রয়েছে, যাঁরা সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত আয়ে হস্তক্ষেপ করেছিলেন অথবা সেই অর্থ আত্মসাৎ করেছিলেন। তাঁদের শাস্তি হিসেবে আত্মসাৎ করা সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
লিপিতে বলা হয়েছে:
But his Majesty has avoided causing [he who molested them to be thrown to the ground and] impaled (hr-tp-ht), desiring to let him be convicted in any council (knbt) of any city to which they go”.
“কিন্তু মহামান্য [তাদের ওপর অত্যাচারকারী ব্যক্তিকে মাটিতে ফেলে] শূলে চড়ানোর (hr-tp-ht) ব্যবস্থা গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকেছেন; বরং তিনি চেয়েছেন, সেই ব্যক্তিকে তারা যে নগরেই যাক না কেন, সেখানকার যেকোনো পরিষদে (knbt) দোষী সাব্যস্ত করা হোক।”
লিপির এই অংশ থেকে বোঝা যায় যে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্থানীয় আদালতের সামনে বিচার করা হলেও তাঁদের শূলে চড়ানোর শাস্তি কার্যকর করার বিষয়টি রাজার অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কারণ, এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড প্রদানের ক্ষমতা কেবল রাজারই ছিল।
মেরেনপতাহর আমাদা প্রাচীর-শিলালিপি (Amada Wall-Stela of Merenptah)
রাজা মেরেনপতাহও আমাদা (Amada)-তে অবস্থিত আমুন-রে (Amun-Re) ও রে-হোরাখতি (Re-Herakhty)-এর মন্দিরের প্রবেশপথের বাম পাশের পুরু দেয়ালে উৎকীর্ণ একটি শিলালিপিতে শাস্তি হিসেবে শূলে বিদ্ধ করার (impalement) কথা উল্লেখ করেছেন। মন্দিরটি নীল নদের প্রথম ও দ্বিতীয় জলপ্রপাতের (cataracts) মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত।
আমাদা প্রাচীর-শিলালিপিতে পরাজিত লিবীয় শত্রুদের প্রতি ফারাওয়ের আচরণের একটি জীবন্ত বিবরণ পাওয়া যায়। এতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাজা বিপুলসংখ্যক শত্রুকে হত্যা করেছিলেন। এরপর শিলালিপির পাঠে লিপিবদ্ধ হয়েছে:
The remainder were impaled (lit. put on top of stakes) to south of Memphis
অবশিষ্টদের মেমফিসের দক্ষিণে শূলে বিদ্ধ করা হয়েছিল (আক্ষরিক অর্থে: শূলের ওপর স্থাপন করা হয়েছিল)।

আমাদার শিলালিপিতে যেমন দেখা যায়, ‘ir-tp-ht’ (শূলে বিদ্ধ করা হয়েছে) শব্দটির নির্ধারক চিত্রলিপিতে একজন ব্যক্তিকে একটি সূচালো শূলের ওপর বিদ্ধ অবস্থায় দেখানো হয়েছে। তাঁর পা দুটি একদিকে ঝুলছে এবং বাহু দুটি অন্যদিকে প্রসারিত। চিত্রটি দেখে মনে হয়, ব্যক্তিটিকে উপুড় করে শূলে বিদ্ধ করা হয়েছে।
মেরেনপতাহর আমাদা প্রাচীর-শিলালিপিটি ‘tp-ht’ (শূলের ওপর স্থাপন করা) অভিব্যক্তিটির অর্থ নিয়ে চলমান বিতর্কের অবসান ঘটায়।
যদিও শূলে বিদ্ধ করা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের একটি অত্যন্ত ভয়াবহ ও চরম পদ্ধতি, তবুও মেমফিসের দক্ষিণে লিবীয়দের শূলে বিদ্ধ করার পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট সামরিক উদ্দেশ্য ছিল। এটি শত্রুপক্ষকে ভয় দেখানোর জন্য সামরিক কৌশল বা ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ (Psychological Warfare) হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল, প্রকৃত সামরিক শক্তি যা-ই হোক না কেন, শত্রুর মনে নিজেদের সামরিক শক্তি সম্পর্কে ভীতি ও ধারণাগত আধিপত্য সৃষ্টি করা। একই সঙ্গে, ভবিষ্যতে রাজার বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষের অনুপ্রবেশ বা বিদ্রোহ প্রতিরোধ করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।
মহা সমাধি-লুণ্ঠন (The Great Tomb Robberies)
বিংশ রাজবংশের শেষ পর্যায়ে সংঘটিত মহা সমাধি-লুণ্ঠন (Great Tomb Robberies) সম্পর্কে বহু দলিল রয়েছে। এসব দলিলের মাধ্যমে আমরা মিথ্যা শপথ (perjury) এবং সমাধি-লুণ্ঠনের (tomb robberies) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শাস্তিগুলো সম্পর্কে একটি ভালো ধারণা লাভ করতে পারি।
১. শপথের ক্ষেত্রে শূলে চড়ানো (Impalement in the Oaths)
জিজ্ঞাসাবাদের সময় সত্য বলার জন্য নেওয়া অধিকাংশ শপথের মধ্যেই মিথ্যা শপথের (perjury) শাস্তির উল্লেখ ছিল।
এই শপথগুলো নিয়ে গবেষণা করেছেন লর্টন (Lorton)। তিনি উল্লেখ করেন যে, অপরাধীদের ওপর আরোপিত শাস্তি হিসেবে নয়বার শূলে চড়ানোর (impalement) কথা বর্ণনা করা হয়েছে। তবে এর মধ্যে চারটি ঘটনা এমন অনানুষ্ঠানিক শপথের (informal oaths) অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো সাক্ষ্য দেওয়ার (testimony) প্রক্রিয়ায় উচ্চারণ করা হয়েছিল।
নিচে মহা সমাধি-লুণ্ঠনসংক্রান্ত দুটি প্যাপিরাসের উদাহরণ দেওয়া হলো, যেখানে সম্ভাব্য শাস্তি (potential punishment) হিসেবে শূলে চড়ানোর (impalement) উল্লেখ রয়েছে।
এটি স্পষ্ট যে, শপথের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে শূলে চড়ানোর আগে অঙ্গহানির (mutilation) শাস্তিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অ্যাবট প্যাপিরাস (The Abbott Papyrus, BM 10221):
অ্যাবট প্যাপিরাসে (Abbott Papyrus) প্রাচীন মিশরীয় কর্মকর্তাদের পরিচালিত এমন কিছু তদন্তের বিবরণ রয়েছে, যেগুলো রাজা রামেসিস নবমের (King Ramesses IX) রাজত্বের প্রায় ষোড়শ বছরে সংঘটিত সমাধি-লুণ্ঠনের (tomb robberies) ঘটনাগুলো নিয়ে পরিচালিত হয়েছিল।
প্যাপিরাসটি ১৮৫৭ সালে কায়রোতে ড. অ্যাবটের (Dr Abbott) কাছ থেকে কেনা হয়েছিল। বর্তমানে এটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে (British Museum) সংরক্ষিত রয়েছে।
এই তাম্রকারকে (তামার কারিগরকে) গ্রেট ভ্যালিতে (Great Valley) অত্যন্ত কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা নির্দেশ দেন। কিন্তু তিনি যে দুটি স্থানের কথা দেখিয়ে দিয়েছিলেন, সেগুলো ছাড়া ওই উপত্যকায় অন্য কোনো স্থানের বিষয়ে তিনি জানতেন, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি শপথ করেন যে, মিথ্যা বললে তাঁকে বেত্রাঘাত করা হবে, তাঁর নাক ও কান কেটে ফেলা হবে এবং তাঁকে শূলে চড়ানো হবে। তিনি বলেন, “এই সমাধিগুলোর মধ্যে এখানে খোলা অবস্থায় থাকা এই সমাধি এবং আমি আপনাদের যে গৃহটি দেখিয়েছি, তা ছাড়া অন্য কোনো স্থান সম্পর্কে আমি জানি না…”

প্যাপিরাস BM10052:
এটিও নব্য রাজত্বকালের (New Kingdom Period) বিংশ রাজবংশের (20th Dynasty) Great Tomb Robberies বা রাজকীয় সমাধিগুলোতে সংঘটিত ব্যাপক লুণ্ঠনের একটি বিবরণ।
লক্ষ করুন, এই শপথে প্রকৃতপক্ষে শূলে চড়ানোর শাস্তি কার্যকর করার আগেই অঙ্গহানির শাস্তির উল্লেখ রয়েছে।

The scribe Paoemtaumt was brought. he was given the oath not to speak falsehood. He said, As Amun lives and as the Ruler lives, if I be found to have had anything to do with any one of the thieves may I be mutilated in nose and ears and placed on the stake. He was examined with the stick. He was found to have been arrested on account of the measurer Paoemtaumt son of Kaka.
লেখক পাওএমতাউমতকে হাজির করা হলো। তাকে মিথ্যা না বলার শপথ করানো হলো। সে বলল, “আমুনের জীবনের শপথ এবং শাসকের জীবনের শপথ করে বলছি, যদি প্রমাণিত হয় যে আমি কোনো চোরের সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত ছিলাম, তবে আমার নাক ও কান কেটে ফেলা হোক এবং আমাকে শূলে চড়ানো হোক।”
তাকে লাঠি দিয়ে প্রহার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। অনুসন্ধানে জানা গেল, পরিমাপক পাওএমতাউমত ইবনে কাকার কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
সমাধি-লুণ্ঠনের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের উল্লেখ
প্রাচীন মিশরের রাজকীয় সমাধি লুণ্ঠনের ঘটনাবলি-সংক্রান্ত প্যাপিরাসগুলোতে বহুবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই সময়কালে রাজকীয় সমাধি লুণ্ঠনের শাস্তি ছিল শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা (Impalement)।
এ থেকেও স্পষ্ট বোঝা যায় যে, সে সময় এই শাস্তির বিধানটি সর্বজনবিদিত ছিল।
সমাধি লুণ্ঠনের অভিযোগে অভিযুক্ত এক ব্যক্তি নিজের আত্মপক্ষসমর্থনে এই যুক্তি তুলে ধরে:
saw the punishments, oh, that were done to the thieves (sb3w.i ir.wnn3 Ipw) in the time of the Vizier Khaemwese. Is it that I go to seek death when I know it?” (šm r wh3 p3 mwt iw.i rh sw)
“আমি তো দেখেছি, উজির খায়েমওয়াসের সময় চোরদের সঙ্গে কী ধরনের শাস্তি কার্যকর করা হয়েছিল। আমি যখন জানি যে এর পরিণতি মৃত্যু, তখন কি আমি নিজেই মৃত্যুর সন্ধানে যাব?”
আরেক ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি তাঁর এক বন্ধুকে সমাধি লুণ্ঠনের কাজে জড়িত না হওয়ার জন্য সতর্ক করেছিলেন। তিনি সাক্ষ্য দেন:
I quarreled with him and I said to him, you will be put to death (iw.i dd n.fiw hdb.k) for the thefts which you committed [in] the Necropolis” (hr p3 isw iri.k [m] p3 hr
“আমি তার সঙ্গে ঝগড়া করেছিলাম এবং তাকে বলেছিলাম, ‘তুমি যে চুরিগুলো করেছ, তার জন্য তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে’ (iw.i dd n.f iw hdb.k), নেক্রোপলিসে [সমাধিক্ষেত্রে] সংঘটিত তোমার চুরির অপরাধের কারণে।” (hr p3 isw iri.k [m] p3 hr
প্রাচীন মিশরে শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড (Impalement)
মধ্য রাজত্বকাল (Middle Kingdom) ও নব্য রাজত্বকালে (New Kingdom) শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিষয়ে প্রাপ্ত নথিপত্র উপস্থাপনের পর, এবার শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতি সম্পর্কে আরও সুনির্দিষ্ট তথ্য উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
মিশরীয় ভাষায় শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড
মিশরীয় ভাষায় ব্যবহৃত নির্ধারক চিহ্নগুলোর (Determinatives) মধ্যে এই চিহ্নটি ছিল অত্যন্ত বিরল। এই নির্ধারক চিহ্ন থেকে ধারণা করা যায় যে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রচলিত পদ্ধতিটি ছিল একটি খুঁটি বা শূলে বিদ্ধ করা।
এই নির্ধারক চিহ্নটি কীভাবে দেখানো হয়েছে:
এতে একজন মানুষকে একটি খুঁটির অগ্রভাগে তাঁর ধড়ের মাঝামাঝি অংশ দিয়ে বিদ্ধ অবস্থায় ঝুলতে দেখা যায়। লোকটির মুখ নিচের দিকে থাকে, ফলে তাঁর হাত ও পা মাটির দিকে ঝুলে থাকে।


খুঁটির অগ্রভাগ যদি হৃদপিণ্ড বা শরীরের কোনো বড় রক্তনালিকে বিদ্ধ করত, তাহলে দ্রুত মৃত্যু ঘটতে পারত। অন্যথায়, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে দীর্ঘ সময় ধরে অসহনীয় যন্ত্রণা ভোগ করে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হতো।
শাস্তি হিসেবে শূলে বিদ্ধ করার জন্য প্রাচীন মিশরীয় অভিব্যক্তিসমূহ
প্রাচীন মিশরীয়রা শাস্তি হিসেবে শূলে বিদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন অভিব্যক্তি ব্যবহার করত। এসব অভিব্যক্তির মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো:
(rdi) tp-ht: শাস্তি হিসেবে শূলে স্থাপন করা বা শূলে বিদ্ধ করা।
এই প্রসিদ্ধ শব্দটি ছাড়াও, জার্মান Pfahl (খুঁটি বা শূল) এবং pfählen (শূলে বিদ্ধ করা) শব্দের অধীনে হ্যানিং আরও কিছু উল্লেখযোগ্য অভিব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন:
mait — শাস্তি হিসেবে শূলে বিদ্ধ করা।
ht — শাস্তি হিসেবে শূলের ওপর স্থাপন করা।
tpt — শূল বা শূলের অগ্রভাগ।
dph — মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য কাউকে শূলে বিদ্ধ করার দণ্ডে দণ্ডিত করা। rdi ḥr dpů অভিব্যক্তিটি সম্ভবত tp-ht-এর অনুরূপ। এর অর্থ বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা স্থান, আবদ্ধ স্থান অথবা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মঞ্চও হতে পারে।
শূলে বিদ্ধ করার নির্দেশক চিত্রলিপি (determinative) এবং এ-সংক্রান্ত অসংখ্য পরিভাষা বিবেচনা করলে এটা স্পষ্ট হয় যে, প্রাচীন মিশরে অপরাধীদের শূলে বিদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো।
ব্রুনার মনে করতেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে দণ্ডিত ব্যক্তিকে একটি শূলের সঙ্গে বেঁধে রাখা হতো। এরপর (hr-tp-bt) অভিব্যক্তিটির আক্ষরিক অর্থ অনুসারে, তার মাথা একটি খুঁটির ওপর স্থাপন করা হতো।

শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কারণসমূহ
যেহেতু হত্যাকাণ্ডকে একটি অপরাধ এবং একধরনের অবৈধ সহিংসতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তাই এ ধরনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য রাজার কাছে কোনো কারণ বা ‘ন্যায্যতা’ থাকা প্রয়োজন ছিল।
রাজা হোরেমহেবের শাসনামল এ ধরনের ন্যায্যতার একটি উদাহরণ প্রদান করে। অপরাধী, বিদ্রোহী ও শত্রুদের বিরুদ্ধে সহিংস ব্যবস্থা গ্রহণের ন্যায্যতা হিসেবে তিনি ‘ইসফেত’ (Isfet) দূর করা এবং মিথ্যাকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল:
“ইসফেতকে দূর করা এবং মিথ্যাকে ধ্বংস করা (dr isft shtm grg)। তাঁর মহামান্যের পরিকল্পনাসমূহ ছিল একটি শক্তিশালী আশ্রয়স্থল, যা সহিংসতাকে প্রতিহত করত (bd 3bw)।”
নেতিবাচক স্বীকারোক্তি (Negative Confession)-তেও এমন কিছু বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেগুলোর মাধ্যমে মানুষ ঘোষণা করত যে সে নির্দিষ্ট কাজগুলো করেনি। এর মধ্যে ছিল নিম্নলিখিত বক্তব্যগুলো:
“আমি হত্যা করিনি” (n sm3.f)।
“আমি কাউকে হত্যা করার নির্দেশ দিইনি” (n wd.i sm3)।
“আমি মানুষ হত্যা করিনি” (n sm3.i rmft)।
এখানে উল্লেখ করা আকর্ষণীয় যে, Book of the Dead-এর ১২৫ নম্বর মন্ত্র (Spell 125), যেখানে পূর্বোক্ত নেতিবাচক স্বীকারোক্তিগুলো রয়েছে, রাজা মেরেনপ্তাহের শাসনামল থেকে রাজকীয় সমাধিগুলোতে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। মেরেনপ্তাহ ছিলেন সেই রাজাদের একজন, যিনি তাঁর শত্রুদের বিরুদ্ধে শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ডসহ অন্যান্য ধরনের মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগ করেছিলেন।
নতুন রাজ্য যুগের (New Kingdom) রাজাদের মধ্যে এই নেতিবাচক স্বীকারোক্তির ধারাবাহিক ব্যবহার থেকে মনে হতে পারে যে, তাঁরা হত্যা করা কিংবা কাউকে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়াকে অনুচিত বলে মনে করতেন।
যদিও Book of the Dead-এর ১২৫ নম্বর মন্ত্রটি এমন রাজকীয় সমাধিগুলোতে ব্যবহৃত হতো, যেখানে রাজা নিজেই কাউকে হত্যা করা বা হত্যার নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করতেন, তবুও বাস্তবে তিনি অবশ্যই মানুষ হত্যা করতেন এবং অন্যদেরও হত্যার নির্দেশ দিতেন। অতএব, এ ধরনের কাজ করার অনুমতি বা জীবন-মৃত্যুর ওপর কর্তৃত্ব প্রয়োগের পক্ষে অবশ্যই কোনো যুক্তিসংগত ন্যায্যতা থাকা প্রয়োজন ছিল।
মৃত্যুদণ্ডের কারণ ও ধরন সম্পর্কিত কিছু গবেষণামূলক সাহিত্য বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। এর ফলে যে একাডেমিক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে, তা বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করতে এবং গবেষণাকে সমৃদ্ধ করতে সহায়ক হয়েছে।
যেহেতু এই গবেষণার উদ্দেশ্য হলো প্রমাণ করা যে, প্রাচীন মিশরে শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো, তাই গবেষক নিম্নলিখিত প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন:
শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কারণগুলো কী ছিল? অন্যভাবে বললে, কোন কোন অপরাধের শাস্তি হিসেবে অপরাধীদের শূলে চড়ানো হতো?
Ahmad Abo el Magd, Impalement in Ancient Egypt (2010)-এর গবেষণা থেকে উদ্ধৃতি সমাপ্ত হলো। এই লেখার সমস্ত তথ্যসূত্র নিচের লিংকে ক্লিক করে ডাউনলোড করে পিডিএফ থেকে দেখে নিতে পারেন।[1] https://scholar.google.com/citations?view_op=view_citation&hl=en&user=BQXlnXoAAAAJ&citation_for_view=BQXlnXoAAAAJ:9yKSN-GCB0IC
আপনাদের জন্য আমি আরও কিছু বই সাজেস্ট করছি:
- Kerry M. Muhlestein, Royal Executions: Evidence Bearing on the Subject of Sanctioned Killing in the Middle Kingdom (2008)
- Roselyn A. Campbell, Smiting Pharaohs: The Poetics of Violence and Power in Ancient Egypt (2020)
- Alexandre Loktionov, Regulating Labour through Foreign Punishment? Codification and Sanction at Work in New Kingdom Egypt
- Ahmad Abo el Magd-এর “Impalement in Ancient Egypt” (২০১০)-এ ৬০টিরও বেশি গ্রন্থ রয়েছে, যেখান থেকে এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে পারবেন।
আরবি মূলধাতু ص-ل-ب (Ṣ-L-B)-এর অর্থ কী?
এবার আমরা আলোচনা করব আরবীতে কুরআনে ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনিতে বর্ণিত ক্রুশবিদ্ধকরণ (crucifixion) সম্পর্কে
প্রাচীন মিসরের কোনো আলোচনা করতে হলে, প্রথমেই এ বিষয়টি বর্ণনা করার জন্য ব্যবহৃত আরবি শব্দটির বিশ্লেষণ দিয়ে শুরু করতে হবে। ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনিতে ১২:৪১ আয়াতে ব্যবহৃত শব্দটি হলো يُصْلَبُ (yuṣlabu)। আর মূসা (আ.)-এর কাহিনিতে صَلِّبَنَّكُمْ (ṣallibannakum) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ৭:১২৪, ২৬:৪৯ এবং ২০:৭১ আয়াতে। এই দুটি শব্দই ص-ل-ب (Ṣ-L-B) মূলধাতু থেকে উদ্ভূত।
নিচে ইবন মানযুরের লিসানুল আরব (Lisān al-ʿArab) গ্রন্থে সাদ-লাম-বা (ص-ل-ب) মূলধাতু সম্পর্কে আলোচিত প্রাসঙ্গিক অংশগুলোর একটি নির্বাচন তুলে ধরা হলো। এই মূলধাতুটিকে প্রায়ই ভুলভাবে শুধু ‘ক্রুশবিদ্ধ করা’ অর্থে বোঝা হয়। আমরা দেখতে পাব যে, এই মূলধাতুর এমন একটি সরল অর্থ নির্ধারণ করা তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর শামিল; প্রকৃতপক্ষে এর অর্থগত পরিসর একজন সাধারণ আরবিভাষী ব্যক্তির ধারণার চেয়েও জটিল।
১. লিসানুল আরবে মূলধাতু ص-ل-ب-এর আলোচনা
صلب: الصُّلْبُ والصُّلَّبُ: عَظْمٌ من لَدُنِ الكاهِل إِلى العَجْب، والجمع أَصْلُب وأَصْلاب وصِلَبَةٌ؛ أَنشد ثعلب
أَما تَرَيْني، اليَوْمَ، شَيْخاً أَشْيَبَا،* إِذا نَهَضْتُ أَتَشَكَّى الأَصْلُبا
ص-ل-ب (Ṣ-L-B): সুলব (الصُّلْبُ) এবং সুল্লাব (الصُّلَّبُ) বলতে এমন একটি হাড়কে বোঝায়, যা শরীরের ওপরের অংশ থেকে কোমরের শেষভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত, অর্থাৎ মেরুদণ্ড। এর বহুবচন হলো আসুলুব (أَصْلُب), আসলাব (أَصْلاب) এবং সিলাবাহ (صِلَبَةٌ)। ছা’লাব তাঁর কবিতায় আবৃত্তি করেছেন:
أَما تَرَيْني، اليَوْمَ، شَيْخاً أَشْيَبَا،* إِذا نَهَضْتُ أَتَشَكَّى الأَصْلُبا
‘তুমি কি আজ আমাকে ধূসরকেশী বৃদ্ধ হিসেবে দেখছ না?
আমি যখন উঠে দাঁড়াই, তখন আমার পিঠের হাড়গুলোর ব্যথার অভিযোগ করি।’
এখানে আরবি আসুলুব (الأَصْلُب) শব্দটি পিঠের হাড় বা মেরুদণ্ডের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
والصُّلْب من الظَّهْر، وكُلُّ شيء من الظَّهْر فيه فَقَارٌ فذلك الصُّلْب؛ والصَّلَبُ، بالتحريك، لغة فيه؛
সুলব (الصُّلْب) বলতে পিঠকে বোঝায়। পিঠের যে অংশে কশেরুকা রয়েছে, সেটিকেই সুলব বলা হয়। আর সালাব (الصَّلَب), যার মধ্যে স্বরচিহ্নের পার্থক্য রয়েছে, এ শব্দটিও একই অর্থে ব্যবহৃত হয়।
والصَّلابَةُ: ضدُّ اللِّين صَلُبَ الشيءُ صَلابَـةً فهو صَلِـيبٌ وصُلْب وصُلَّب وصلب أَي شديد. ورجل صُلَّبٌ: مثل القُلَّبِ والـحُوَّل، ورجل صُلْبٌ وصَلِـيبٌ : ذو صلابة؛ وقد صَلُب، وأَرض صُلْبَة، والجمع صِلَبَة. ويقال: تَصَلَّبَ فلان أَي تَشَدَّدَ. وقولهم في الراعي: صُلْبُ العَصا وصَلِـيبُ العَصا، إِنما يَرَوْنَ أَنه يَعْنُفُ بالإِبل؛
সালাবাহ (الصَّلَابَة) হলো কোমলতার (اللِّين) বিপরীত। কোনো বস্তু শক্ত বা কঠিন হয়ে গেলে বলা হয়, সালুবা (صَلُبَ), আর তার শক্ত হওয়ার অবস্থাকে বলা হয় সালাবাহ (صَلَابَة)। তখন বস্তুটিকে সালিব (صَلِيب), সুলব (صُلْب), সুল্লাব (صُلَّب) কিংবা সালব (صلب) বলা যায়; এসব শব্দের অর্থ শক্ত বা কঠিন।
কোনো ব্যক্তিকে সুল্লাব (صُلَّب) বলা হয়। এটি কুল্লাব (القُلَّب) ও হুওয়াল (الحُوَّل)-এর মতো একটি শব্দরূপ। কোনো ব্যক্তিকে সুলব (صُلْب) বা সালিব (صَلِيب) বলার অর্থ হলো, তিনি শক্ত বা দৃঢ় প্রকৃতির অধিকারী।
কোনো কিছু শক্ত হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও সালুবা (صَلُبَ) শব্দটি ব্যবহৃত হয়। আর শক্ত জমিকে বলা হয় সুলবাহ (صُلْبَة); এর বহুবচন সিলাবাহ (صِلَبَة)।
বলা হয়, তাসাল্লাবা ফুলান (تَصَلَّبَ فلان), অর্থাৎ অমুক ব্যক্তি কঠোর বা অনমনীয় হয়ে উঠেছে।
উটের রাখাল সম্পর্কে যখন বলা হয়, সুলবুল-আসা (صُلْبُ العَصا) অথবা সালিবুল-আসা (صَلِيبُ العَصا), তখন এর দ্বারা বোঝানো হয় যে, তার লাঠি শক্ত। এখানে উদ্দেশ্য হলো, সে উটগুলোর সঙ্গে কঠোর আচরণ করে এবং তাদের শক্তভাবে আঘাত করে।
والنِّيقُ: أَرْفَعُ مَوْضِـعٍ في الجَبَل وصَلَبَ العِظامَ يَصْلُبُها صَلْباً واصْطَلَبَها: جَمَعَها وطَبَخَها واسْتَخْرَجَ وَدَكَها لِـيُؤْتَدَم به، وهو الاصْطِلابُ، وكذلك إِذا شَوَى اللَّحْمَ : فأَسالَه؛ قال الكُمَيْتُ الأَسَدِيّ
واحْتَلّ بَرْكُ الشِّـتاءِ مَنْزِلَه، وباتَ شَيْخُ العِـيالِ يَصْطَلِبُ
নাইয়াক (النِّيق) বলতে পাহাড়ের সর্বোচ্চ স্থানকে বোঝায়।
আর কেউ যখন হাড় সালাবা (صَلَبَ العِظامَ يَصْلُبُها صَلْباً) করে, তখন এর অর্থ হলো, সে হাড়গুলো রান্না করে। একইভাবে, ইস্তালাবাহা (اصْطَلَبَها) অর্থ হলো, সে হাড়গুলো সংগ্রহ করে, সেগুলো রান্না করে এবং তা থেকে চর্বি বা তৈলাক্ত পদার্থ বের করে, যাতে তা খাবারের সঙ্গে খাওয়া যায়।
এই কাজকে বলা হয় ইস্তিলাব (الاصْطِلاب)। মাংস আগুনে ঝলসানোর ফলে যখন তার চর্বি গলে বেরিয়ে আসে, তখনও এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
কুমাইত আল-আসাদী বলেছেন:
واحْتَلّ بَرْكُ الشِّـتاءِ مَنْزِلَه، وباتَ شَيْخُ العِـيالِ يَصْطَلِبُ
শীত তার আসন দখল করেছে,
আর পরিবারের বৃদ্ধ কর্তা রাত কাটাচ্ছেন মাংসের চর্বি গলিয়ে খাবার প্রস্তুত করে।
এখানে ইয়াস্তালিব (يَصْطَلِبُ) শব্দটি চর্বি গলিয়ে বের করার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
وفي الحديث: أَنه لـمَّا قَدِمَ مَكَّةَ أَتاه أَصحابُ الصُّلُب؛ قيل: هم الذين يَجْمَعُون العِظام إِذا أُخِذَت عنها لُحومُها فيَطْبُخونها بالماءِ، فإِذا خرج الدَّسَمُ منها جمعوه وائْتَدَمُوا به. يقال اصْطَلَبَ فلانٌ العِظام إِذا فَعَل بها ذلك. والصُّلُبُ جمع صَليب، والصَّلِـيبُ: الـوَدَكُز والصَّلِـيبُ والصَّلَبُ: الصديد الذي يَسيلُ من الميت. والصَّلْبُ: مصدر صَلَبَه يَصْلُبه صَلْباً، وأَصله من الصَّلِـيب وهو: الوَدَك. وفي حديث عليّ: أَنه اسْتُفْتِـيَ في استعمال صَلِـيبِ الـمَوْتَى في الدِّلاءِ والسُّفُن، فَـأَبـى عليهم، وبه سُمِّي الـمَصْلُوب لما يَسِـيلُ من وَدَكه. والصَّلْبُ، هذه القِتْلة المعروفة، مشتق من ذلك، لأَن وَدَكه وصديده يَسِـيل. وقد صَلَبه يَصْلِـبُه صَلْباً، وصَلَّبه، شُدِّدَ للتكثيف وفي التنزيل العزيز: وما قَتَلُوه وما صَلَبُوه. وفيه: ولأُصَلِّـبَنَّكم في جُذُوعِ النَّخْلِ؛ أَي على جُذُوعِ النخل. والصَّلِـيبُ: الـمَصْلُوبُ. والصَّليب الذي يتخذه النصارى على ذلك الشَّكْل.
হাদিসে এসেছে:
‘তিনি যখন মক্কায় আগমন করলেন, তখন তাঁর কাছে আসহাবুস-সুলুব (أَصْحابُ الصُّلُب) উপস্থিত হলো।’
বলা হয়েছে, এরা হলো সেই লোকেরা, যারা হাড় থেকে মাংস সরিয়ে ফেলার পর হাড়গুলো সংগ্রহ করত এবং পানিতে সেদ্ধ করত। এরপর হাড় থেকে যখন চর্বি বেরিয়ে আসত, তখন তারা তা সংগ্রহ করত এবং খাবারের সঙ্গে খেত।
কেউ হাড়ের সঙ্গে এ ধরনের কাজ করলে বলা হয়, ইস্তালাবা ফুলানুল-ইযাম (اصْطَلَبَ فلانٌ العِظامَ), অর্থাৎ অমুক ব্যক্তি হাড়গুলো সেদ্ধ করে তা থেকে চর্বি বের করেছে।
সুলুব (الصُّلُب) হলো সালিব (صَليب)-এর বহুবচন। আর সালিব শব্দটি ওয়াদাক (الوَدَك), অর্থাৎ চর্বি বা তৈলাক্ত পদার্থ অর্থেও ব্যবহৃত হয়।
সালিব (الصَّلِيب) ও সালাব (الصَّلَب) বলতে মৃতদেহ থেকে নিঃসৃত পুঁজ বা তরল পদার্থকেও বোঝায়।
সালব (الصَّلْب) হলো সালাবাহু (صَلَبَهُ يَصْلُبُهُ صَلْباً) ক্রিয়ার মাসদার বা ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য। এর মূল সম্পর্ক সালিব (الصَّلِيب)-এর সঙ্গে, যার অর্থ চর্বি বা তৈলাক্ত পদার্থ।
আলী (রা.)-এর একটি হাদিসে এসেছে, তাঁকে মৃত ব্যক্তির সালিব (صَلِيب), অর্থাৎ মৃতদেহ থেকে নিঃসৃত তৈলাক্ত পদার্থ, বালতি ও নৌকা তৈরিতে ব্যবহারের বিষয়ে ফতোয়া জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তিনি তা করতে নিষেধ করেছিলেন।
এ থেকেই মাসলুব (الْمَصْلُوب), অর্থাৎ যাকে ক্রুশবিদ্ধ বা শূলে চড়ানো হয়েছে, নামটির উৎপত্তি ব্যাখ্যা করা হয়েছে; কারণ তার দেহ থেকে চর্বি বা তৈলাক্ত পদার্থ নিঃসৃত হয়।
সালব (الصَّلْب), অর্থাৎ পরিচিত সেই মৃত্যুদণ্ড, এই অর্থ থেকেই উদ্ভূত। কারণ এ ধরনের মৃত্যুর পর মৃতদেহ থেকে চর্বি ও পুঁজজাতীয় তরল পদার্থ নিঃসৃত হয়।
ক্রিয়াটির রূপ হলো:
صَلَبَهُ (ṣalabahu): সে তাকে সালবের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।
يَصْلُبُهُ (yaṣlubuhu): সে তাকে সালবের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
صَلْباً (ṣalban): সালবের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া; ক্রিয়াটির মাসদার।
صَلَّبَهُ (ṣallabahu): একই ক্রিয়ার তীব্রতা বা ব্যাপকতা বোঝাতে ব্যবহৃত রূপ।
মহান আল্লাহর কিতাবে এসেছে:
وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ
অর্থাৎ, ‘তারা তাকে হত্যা করেনি এবং তাকে ক্রুশবিদ্ধও করেনি।’ (কুরআন ৪:১৫৭)
আরও এসেছে:
وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ النَّخْلِ
অর্থাৎ, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের খেজুরগাছের কাণ্ডে ক্রুশবিদ্ধ করব।’ (কুরআন ২০:৭১)
এখানে ফি জুযূইন-নাখল (فِي جُذُوعِ النَّخْلِ) দ্বারা বোঝানো হয়েছে, খেজুরগাছের কাণ্ডের ওপর বা মধ্যে তোমাদের ক্রুশবিদ্ধ করব।
সালিব (الصَّلِيب) শব্দটি মাসলুব (الْمَصْلُوب), অর্থাৎ ক্রুশবিদ্ধ ব্যক্তিকেও বোঝায়। আর খ্রিষ্টানরা যে নির্দিষ্ট আকৃতির প্রতীক গ্রহণ করে, তাকেও আরবিতে সালিব (الصَّلِيب) বলা হয়।
প্রাচীন ভাষাবিদ ইমাম রাঘিব আল ইসফাহানী (রহ) [মৃত্যু ৫০২ হি.] বলেন:
في صَلَبٍ مثل العنان المؤدم
«٣» والصَّلَبُ والاصْطِلَابُ: استخراج الودك من العظم، والصَّلْبُ الذي هو تعليق الإنسان للقتل، قيل: هو شدّ صُلْبِهِ على خشب، وقيل: إنما هو من صَلْبِ الوَدَكِ. قال تعالى: وَما قَتَلُوهُ وَما صَلَبُوهُ
[النساء/ ١٥٧] ، وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ أَجْمَعِينَ [الشعراء/ ٤٩] ، وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ النَّخْلِ [طه/ ٧١] ، أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا [المائدة/ ٣٣] ، والصَّلِيبُ: أصله الخشب الذي يُصْلَبُ عليه، والصَّلِيبُ: الذي يتقرّب به النّصارى، هو لكونه على هيئة الخشب الّذي زعموا أنه صُلِبَ عليه عيسى عليه السلام، وثوب مُصَلَّبٌ، أي:عليه آثار الصَّلِيبِ، والصَّالِبُ من الحمّى: ما يكسر الصُّلْبَ، أو ما يُخْرِجُ الودَكَ بالعرق،
‘صَلَب’ (সলব) ও ‘اصْطِلَاب’ (ইস্তিলাব) শব্দের অর্থ হলো হাড় থেকে চর্বি বের করা।
আর ‘صَلْب’ (সলব) শব্দের আরেকটি অর্থ হলো কাউকে হত্যার উদ্দেশ্যে শূলে চড়ানো বা কাঠের সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা। কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ হলো মানুষের মেরুদণ্ডকে কাঠের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে দেওয়া। আবার কেউ বলেছেন, শব্দটি মূলত হাড় থেকে চর্বি বের করার অর্থ থেকেই এসেছে।
আল্লাহ বলেন:
– “অথচ তারা তাঁকে হত্যা করেনি এবং তাঁকে শূলেও চড়ায়নি।” [সূরা আন-নিসা, ৪:১৫৭]
– “আমি অবশ্যই তোমাদের সবাইকে শূলে চড়াব।” [সূরা আশ-শু‘আরা, ২৬:৪৯]
– “আমি অবশ্যই তোমাদের খেজুরগাছের কাণ্ডে শূলে চড়াব।” [সূরা ত্ব-হা, ২০:৭১]
– “তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে।” [সূরা আল-মায়িদা, ৫:৩৩]
‘صَلِيب’ (সলিব) শব্দের মূল অর্থ হলো সেই কাঠ, যার ওপর কাউকে শূলে চড়ানো হয়। খ্রিষ্টানদের ব্যবহৃত ক্রুশকেও ‘সলিব’ বলা হয়। কারণ, সেটি সেই কাঠের আকৃতির, যার ওপর তাদের ধারণা অনুযায়ী ঈসা (আ.)-কে শূলে চড়ানো হয়েছিল।
‘ثوب مُصَلَّب’ (মুসাল্লাব পোশাক) অর্থ হলো এমন পোশাক, যার ওপর ক্রুশের চিহ্ন রয়েছে।
‘الصَّالِب’ (সালিব) জ্বরের একটি প্রকার। বলা হয়, এটি এমন জ্বর যা মেরুদণ্ডকে দুর্বল করে দেয়, অথবা এমন জ্বর যার কারণে ঘামের সঙ্গে চর্বি বেরিয়ে আসে। [2]كتاب المفردات في غريب القرآن – 489 https://shamela.ws/book/23636/471
আব্দুল রাউফ আল-মানাওয়ি (রহ) [মৃত্যু ১০৩১ হি.] বলেন,
الصلب: بالضم الشديد وباعتباره سمي الظهر صلبا، ومنه الصلب بالفتح الذي هو تعليق الإنسان للقتل لشدة تصلبه على الخشب. وقيل الصلب الجرم الذي لا يقبل دفع سطحه إلى داخله إلا بعسر. والصلب الذي يتقرب به النصارى لكونه على هيئة الصليب الذي صلب عليه عيسى ﵇ في زعمهم.
‘الصُّلْب’ (পেশ/দাম্মা দিয়ে) অর্থ কঠিন, দৃঢ় ও শক্তিশালী। পিঠকে ‘صُلْب’ বলা হয়, কারণ এটি শক্ত ও দৃঢ়। এ থেকেই ‘الصَّلْب’ (ফাতহা দিয়ে) শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ কাউকে হত্যার উদ্দেশ্যে শূলে চড়ানো। কাঠের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে রাখার কারণে একে এ নামে অভিহিত করা হয়েছে।
কেউ কেউ বলেছেন, ‘الصُّلْب’ হলো এমন কঠিন বস্তু, যার পৃষ্ঠকে ভেতরের দিকে চাপ দিয়ে প্রবেশ করানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
আর খ্রিষ্টানরা যে ‘الصَّلِيب’ (ক্রুশ) ব্যবহার করে, সেটিকে এ নামে অভিহিত করার কারণ হলো—তাদের ধারণা অনুযায়ী, ঈসা (আ.)-কে যে ক্রুশে শূলে চড়ানো হয়েছিল, এটি তারই আকৃতির।[3]كتاب التوقيف على مهمات التعاريف – 217 https://shamela.ws/book/10640/211
আবু হায়ান আল-আন্দালুসি সূরাহ আরাফের ১২৪ নম্বর আয়াতের তাফসীরে লিখেন,
وَمَعْنَى أَيْ يَدٌ يَمِينَى وَرِجْلٌ يَسْرَى وَالْعَكْسُ، قِيلَ هُوَ أَوَّلُ مَنْ فَعَلَ هَذَا، وَقِيلَ الْمَعْنَى مِنْ أَجْلِ الْخِلَافِ الَّذِي ظَهَرَ مِنْكُمْ، وَالصَّلْبُ التَّعْلِيقُ عَلَى الْخَشَبِ.
এর অর্থ হলো, ডান হাত ও বাম পা, অথবা এর বিপরীত—অর্থাৎ বাম হাত ও ডান পা (কেটে ফেলা)।
কেউ বলেছেন, তিনিই সর্বপ্রথম এভাবে শাস্তি দিয়েছিলেন। আবার কেউ বলেছেন, এর অর্থ হলো, তোমাদের পক্ষ থেকে যে বিরোধিতা ও অবাধ্যতা প্রকাশ পেয়েছে, তার কারণে এ শাস্তি দেওয়া হবে।
‘الصَّلْب’ (সলব) অর্থ হলো কাঠের সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা বা শূলে চড়ানো।[4]كتاب البحر المحيط في التفسير – ط الفكر – 5/141 https://shamela.ws/book/23591/2984
২. উপরোক্ত আলোচনা থেকে সিদ্ধান্ত ও অভিযোগের অসারতা
উপরের আলোচনা থেকে নিম্নলিখিত সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করা যায়।
প্রথমত: ص-ل-ب (Ṣ-L-B) মূলধাতুটির অর্থগত সম্পর্ক হাড়ের সঙ্গে; আরও নির্দিষ্টভাবে বললে, মেরুদণ্ডের সঙ্গে।
দ্বিতীয়ত: ص-ل-ب মূলধাতুটি প্রকৃত ও রূপক উভয় অর্থেই শক্ত হওয়া বা দৃঢ়তা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
তৃতীয়ত: হাড় রান্না করে তা থেকে তৈলাক্ত বা চর্বিজাতীয় পদার্থ ওয়াদাক (وَدَك) বের করার কাজকে ইস্তালাবা (اصْطَلَبَ) বলা হয়। এই শব্দটিও ص-ل-ب মূলধাতু থেকে উদ্ভূত।
চতুর্থত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: সালব (صَلْب), যা সাধারণত ‘ক্রুশবিদ্ধকরণ’ অর্থে অনূদিত হয়, এই ص-ل-ب মূলধাতু থেকে উদ্ভূত।
ইবন মানযুরের ব্যাখ্যা অনুসারে, এর কারণ হলো, এভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ব্যক্তির দেহ থেকে ওয়াদাক এবং সাদীদ (صديد), অর্থাৎ পুঁজ বা রক্তমিশ্রিত তরল পদার্থ, নিঃসৃত হয়।
ইবন মানযুর তাঁর লিসানুল আরব গ্রন্থে কুরআন থেকে এর ব্যবহারের দুটি উদাহরণ দিয়েছেন। একটি ঈসা (আ.)-এর সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত, আর অন্যটি মূসা (আ.)-এর সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। যথাক্রমে:
وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ
অর্থাৎ, ‘তারা তাকে হত্যা করেনি এবং তাকে ক্রুশবিদ্ধও করেনি।’ [কুরআন ৪:১৫৭]
এবং
وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ النَّخْلِ
অর্থাৎ, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের খেজুরগাছের কাণ্ডে ক্রুশবিদ্ধ করব।’ [কুরআন ২০:৭১]
খ্রিষ্টান মিশনারিরা দাবি করেছেন যে, ‘কুরআনে ক্রুশবিদ্ধকরণ বোঝাতে ব্যবহৃত আরবি শব্দটি ক্রুশ-আকৃতির একটি মৃত্যুদণ্ডের যন্ত্রকে নির্দেশ করে।’ অথচ এ দাবির পক্ষে যুক্তি দেওয়ার সময় তাঁরা আরবি ভাষার ব্যুৎপত্তিগত অভিধানগুলো পরীক্ষা করার কোনো চেষ্টা করেননি।
এডওয়ার্ড লেনের (Edward Lane) সুবিস্তৃত An Arabic-English Lexicon গ্রন্থে ص-ل-ب মূলধাতু সম্পর্কে প্রায় তিন পৃষ্ঠাব্যাপী আলোচনা রয়েছে। এর অধিকাংশই ‘শক্ত’, ‘দৃঢ়’ ইত্যাদি অর্থে শব্দটির ব্যবহারের ওপর কেন্দ্রীভূত।
ক্রুশবিদ্ধকরণের প্রসঙ্গে লেন বলেন:
“[He crucified him;] he put him to death in a certain well-known manner… because the oily matter, and the ichor mixed with blood, of the person so put to death flows.”
‘[সে তাকে ক্রুশবিদ্ধ করল;] সে তাকে একটি বিশেষ ও সুপরিচিত পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড দিল… কারণ এভাবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির দেহ থেকে তৈলাক্ত পদার্থ এবং রক্তমিশ্রিত ইকোর (ichor) প্রবাহিত হয়।’
এখানে ইকোর বলতে পাতলা, জলীয় বা রক্তমিশ্রিত নিঃসৃত তরল পদার্থ বোঝানো হয়েছে।
লেনের অভিধানের তুলনায় অনেক কম বিস্তারিত হলেও Hans Wehr Dictionary of Modern Written Arabic এবং কুরআনে ص-ل-ب মূলধাতুর ব্যবহার নিয়ে রচিত অভিধানগুলোতেও একই ধরনের আলোচনা পাওয়া যায়।
এখন আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, ص-ل-ب মূলধাতুটির মধ্যে ক্রুশ বা ক্রুশের আকৃতির কোনো অন্তর্নিহিত অর্থ নেই। বরং ক্রুশ ও ক্রুশ-আকৃতির অর্থগুলো এর থেকে উদ্ভূত বিশেষ অর্থ। আরবী অভিধানগুলোতে যেখানেই ক্রুশের আলাপ এসেছে সেখানেই আরবীতে ص-ل-ب এর মূল অর্থ বর্ণনা করার পর ক্রুশের বিষয়টিকে খ্রিষ্টানদের বিশ্বাসের দিকে নিসবত করা হয়েছে, আরবদের সাধারণ বুঝ হিসেবে এটি উল্লেখ করা হয় নি কোথাও।
আমরা যেমন দেখেছি, ص-ل-ب মূলধাতুটি শক্ত হওয়া বা দৃঢ়তা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি, ক্রুশবিদ্ধ বা শূলে বিদ্ধ ব্যক্তির দেহ থেকে তৈলাক্ত পদার্থ নিঃসৃত হওয়ার ধারণার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। সুলব শব্দটি ব্যবহারের জন্য বা শুলবিদ্ধ বা শুলে চড়ানোর জন্য কোন ক্রুশ আকৃতির কিছুর অপরিহার্যতা নেই। যেমনটা আমরা দেখিয়েছি আরবি আভিধানিক রূপ এবং প্রাচিন ইতিহাসে শূলবিদ্ধ করার পদ্ধতির দ্বারা। বরং মৃত্যুদন্ড দেওয়ার জন্য কাঠের উপর ঝোলানোই এখানে মুখ্য।
মূলধাতুটিকে ‘বিদেশি’ বলার দাবি
ص-ل-ب মূলধাতুর আলোচনা থেকে পাঠকদের মনোযোগ সরিয়ে দেওয়ার জন্য মিশনারিরা আর্থার জেফারির (Arthur Jeffery) উদ্ধৃতি দেন। জেফারির অভিযোগ ছিল যে, ص-ل-ب মূলধাতুটিকে আরবি ভাষার নিজস্ব শব্দমূল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না এবং এর চূড়ান্ত উৎস ফারসি অথবা ইথিওপীয় ভাষায় নিহিত।
মিশনারিরা জেফারির বক্তব্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যেন তিনি দাবি করেছেন যে ‘এই শব্দটি আরবি নয়’।
অথচ জেফারি নিজেই আল-নাবিগা এবং আদি ইবন যায়দের প্রাক-ইসলামি আরবি কবিতায় এই শব্দের ব্যবহারের উদাহরণ উল্লেখ করেছেন!
ص-ل-ب মূলধাতুর ‘ক্রুশবিদ্ধ করা’ অথবা ‘ক্রুশ’, এই কয়েকটি উদ্ভূত অর্থের ওপর সংকীর্ণভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে মিশনারিরা দাবি করেন যে, কুরআনে ব্যবহৃত আরবি শব্দটি ‘স্পষ্টতই একটি জ্যামিতিক ক্রুশকে নির্দেশ করে; কোনো খুঁটি, শূল বা গাছকে নয়।’
কিন্তু ص-ل-ب মূলধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন অর্থের স্তর ও পরিসর নির্ধারণ করার যদি সত্যিকারের আগ্রহ থাকত, তাহলে প্রাচীন আরবি ভাষার প্রামাণ্য অভিধানগুলোর সাহায্য নেওয়া হতো। এসব অভিধানে এই মূলধাতুর ব্যুৎপত্তি ও অর্থগত ব্যবহার বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
মূলধাতুটিকে ‘বিদেশি’ বলে অভিহিত করা নিছকই মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার একটি কৌশল। আর আমরা যেমন আলোচনা করেছি, ص-ل-ب মূলধাতুটির অন্তর্নিহিত অর্থের মধ্যে ক্রুশ, জ্যামিতিক ক্রুশ, খুঁটি, শূল বা গাছের কোনো নির্দিষ্ট আকৃতি অন্তর্ভুক্ত নয়।
অতএব বলা যায়, কুরআনে ক্রুশবিদ্ধকরণ বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দটি ص-ل-ب মূলধাতু থেকে উদ্ভূত। এই মূলধাতুর মধ্যে ক্রুশ বা তার আকৃতির কোনো অন্তর্নিহিত অর্থ নেই। বরং ওপরের দেওয়া প্রমাণ অনুযায়ী, এটি এমন যেকোনো মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতিকে নির্দেশ করতে পারে, যার ফলে দেহ শক্ত বা অনমনীয় হয়ে যায়, কারণ শরীরের যেকোনো নড়াচড়া অসহনীয় যন্ত্রণার কারণ হতে পারে এবং দেহ থেকে বিভিন্ন তরল পদার্থ নিঃসৃত হয়।
সুতরাং, এই ব্যাখ্যার আওতায় শূলে বিদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া এবং ক্রুশবিদ্ধকরণের অন্যান্য পদ্ধতিও অন্তর্ভুক্ত। এসব পদ্ধতির মধ্যে কোনো পার্থক্য নির্ধারণ না করেই লেখক সেগুলোকে একই বিস্তৃত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
কুরআনে ص-ل-ب মূলধাতুর ব্যবহার প্রাচীন যুগে ক্রুশবিদ্ধকরণ সম্পর্কে আধুনিক গবেষণার কিছু পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয়।
‘ক্রুশবিদ্ধকরণ’ (crucifixion) শব্দটি শুনলে প্রায় সবসময়ই মানুষের মনে একটি ক্রুশের ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু প্রাচীন যুগে মানুষকে বিভিন্নভাবে ঝুলিয়ে রাখা হতো, শূলে বিদ্ধ করা হতো এবং ক্রুশবিদ্ধ করা হতো। এসব পদ্ধতিকে বর্ণনা করার জন্য ব্যবহৃত পরিভাষাগুলোর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য সবসময় বজায় রাখা হতো না।
প্রাচীন যুগে ক্রুশবিদ্ধকরণ নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় ডেভিড চ্যাপম্যান (David Chapman) এ বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন:
… in studying the ancient world the scholar is wise not to differentiate too rigidly the categories of “crucifixion,” “impalement,” and “suspension” (as if these were clearly to be distinguished in every instance). Hence any study of crucifixion conceptions in antiquity must grapple with the broader context of the wide variety of penal suspension of human beings.
‘…প্রাচীন বিশ্ব নিয়ে গবেষণা করার সময় একজন গবেষকের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে “ক্রুশবিদ্ধকরণ” (crucifixion), “শূলে বিদ্ধকরণ” (impalement) এবং “ঝুলিয়ে রাখা” (suspension), এই শ্রেণিগুলোর মধ্যে অতিরিক্ত কঠোরভাবে পার্থক্য নির্ধারণ না করা; যেন প্রতিটি ক্ষেত্রেই এগুলোকে সুস্পষ্টভাবে আলাদা করা সম্ভব।
অতএব, প্রাচীন যুগে ক্রুশবিদ্ধকরণ সম্পর্কে ধারণা নিয়ে যেকোনো গবেষণা করতে হলে, শাস্তি হিসেবে মানুষকে ঝুলিয়ে বা বিদ্ধ করে রাখার বিভিন্ন পদ্ধতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিতে হবে।’
এরপর তিনি বলেন, অতীতে ‘ক্রুশবিদ্ধকরণ’ এবং ‘ঝুলিয়ে রাখা’কে শাস্তির সম্পূর্ণ পৃথক দুটি ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো না। চ্যাপম্যান আরও যোগ করেন:
… “on a cross was simply one specific form within the broader category of human bodily suspension”.
‘…ক্রুশের ওপর [কাউকে শাস্তি হিসেবে ঝুলিয়ে রাখা] ছিল মানুষের দেহ ঝুলিয়ে রাখার বৃহত্তর শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি মাত্র।’
এই বিষয়টি মাথায় রেখে, আধুনিক যুগে ক্রুশবিদ্ধকরণ (crucifixion) এবং ক্রুশ (cross) সম্পর্কে যে সংজ্ঞাগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর কয়েকটি এবার দেখা যাক।
খ্রিষ্টান মিশনারিদের মতে, শূল বা খুঁটি ক্রুশ নয়
১. গ্রিক শব্দ Stauros এবং ‘ক্রুশ’-এর অর্থ
খ্রিষ্টান মিশনারিরা দাবি করেন যে, একটি শূল বা খুঁটি (stake) ক্রুশ (cross) নয়।
‘ক্রুশ’ বলতে কী বোঝায়, সে বিষয়ে মিশনারিদের ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে যতই আগ্রহী হওয়া যাক না কেন, যথাযথ শব্দকোষ ও ভাষাতাত্ত্বিক উৎসের কাছে ফিরে যাওয়াই তুলনামূলকভাবে নিরাপদ পন্থা।
ইংরেজি cross শব্দটি গ্রিক σταυρός (stauros) শব্দের অনুবাদ। ক্রুশ, গ্রিক stauros, লাতিন crux, মূলত একটি একক খাড়াভাবে দাঁড় করানো শূল বা খুঁটি ছিল, যার সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বেঁধে রাখা হতো, পেরেক দিয়ে আটকানো হতো অথবা শূলে বিদ্ধ করা হতো।
প্রাচীন গ্রিক ভাষার প্রামাণ্য অভিধান Liddell-Scott-Jones-McKenzie’s A Greek-English Lexicon-এ ‘cross’-এর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবে:
upright pale or শূল।’
একই ধরনের বা কাছাকাছি সংজ্ঞা পাওয়া যায় নিম্নলিখিত গ্রন্থগুলোতেও:
- Bauer-Danker-Arndt-Gingrich’s A Greek-English Lexicon of the New Testament and Other Early Christian Literature
- Mounce’s The Analytical Lexicon to the Greek New Testament
- Louw and Nida’s Greek-English Lexicon of the New Testament: Based on Semantic Domains
- Friberg, Friberg and Miller’s Analytical Lexicon of the Greek New Testament
নিউ টেস্টামেন্টে এই বিশেষ্যটি সাতাশবার এসেছে এবং সেখানে এটি সাধারণভাবে একটি খাড়াভাবে দাঁড় করানো শূল বা খুঁটিকে নির্দেশ করে।
লক্ষ করলে দেখা যাবে, শব্দকোষগত দৃষ্টিকোণ থেকে এই শব্দের অর্থগত পরিসরকে (semantic domain) শুধু গ্রিক নিউ টেস্টামেন্টে এর নির্দিষ্ট ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যথাযথ নয়। এমনটি করলে শব্দটির সামগ্রিক ঐতিহাসিক অর্থকে বিকৃত করা হবে।
ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের যথাযথ পদ্ধতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকায় মিশনারিরা প্রয়োজনীয় তথ্যসূত্র যাচাই না করেই নিজেদের উদ্দেশ্যের উপযোগী করে ‘ক্রুশ’ শব্দটির সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
২. নেলসনের ইলাস্ট্রেটেড বাইবেল ডিকশনারিতে ‘ক্রুশ’-এর সংজ্ঞা
এই শব্দের অর্থ সম্পর্কে Nelson’s Illustrated Bible Dictionary-তে ‘Cross’-এর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবে:
an upright wooden stake or post on which Jesus was executed… the Greek word for cross referred primarily to a pointed stake used in rows to form the walls of a defensive stockade.
‘একটি খাড়াভাবে দাঁড় করানো কাঠের শূল বা খুঁটি, যার ওপর যিশুকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল… ক্রুশের জন্য ব্যবহৃত গ্রিক শব্দটি মূলত এমন একটি সূচালো শূলকে নির্দেশ করত, যেগুলো সারিবদ্ধভাবে ব্যবহার করে প্রতিরক্ষামূলক কাঠের বেষ্টনীর দেয়াল তৈরি করা হতো।’
৩. ভাইনসের অভিধানে Stauros-এর অর্থ
Vine’s Expository Dictionary of New Testament Words গ্রন্থে গ্রিক stauros শব্দটির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবে:
Stauros denotes, primarily, “an upright pale or stake.” On such malefactors were nailed for execution…
‘Stauros শব্দটি মূলত “খাড়াভাবে দাঁড় করানো দণ্ড বা শূল” বোঝায়। এ ধরনের দণ্ডে অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য পেরেক দিয়ে আটকানো হতো…’
এরপর গ্রন্থটিতে বলা হয়েছে:
The method of execution was borrowed by the Greeks and Romans from the Phoenicians. The stauros denotes (a) “the cross, or stake itself,” e.g., Matt. 27:32; (b) “the crucifixion suffered,” e.g., 1 Cor. 1:17,18, where “the word of the cross,” RV, stands for the Gospel; Gal. 5:11, where crucifixion is metaphorically used of the renunciation of the world, that characterizes the true Christian life; Gal. 6:12,14; Eph. 2:16; Phil. 3:18.
‘মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার এই পদ্ধতি গ্রিক ও রোমানরা ফিনিশীয়দের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিল।
Stauros শব্দটি নিম্নলিখিত অর্থগুলো বোঝায়:
(ক) “ক্রুশ অথবা শূলটি নিজেই”; উদাহরণস্বরূপ, মথি ২৭:৩২।
(খ) “ক্রুশবিদ্ধকরণের মাধ্যমে ভোগ করা শাস্তি”; উদাহরণস্বরূপ, ১ করিন্থীয় ১:১৭–১৮। সেখানে RV (Revised Version)-এ ব্যবহৃত “the word of the cross” বা “ক্রুশের বাণী” কথাটি সুসমাচারকে নির্দেশ করে।
গালাতীয় ৫:১১-এ ক্রুশবিদ্ধকরণকে রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে এর দ্বারা জগৎকে পরিত্যাগ করাকে বোঝানো হয়েছে, যা প্রকৃত খ্রিষ্টীয় জীবনের একটি বৈশিষ্ট্য।
এ ছাড়া দেখুন: গালাতীয় ৬:১২, ৬:১৪; ইফিষীয় ২:১৬; ফিলিপীয় ৩:১৮।’
৪. A Dictionary of the Bible-এ Stauros-এর অর্থ
A Dictionary of the Bible, Dealing With Its Language, Literature and Contents, Including the Biblical Theology গ্রন্থে বলা হয়েছে, নিউ টেস্টামেন্টে stauros শব্দটি ব্যবহৃত হলে তা শুধু প্রচলিত ‘ক্রুশ’-কেই নির্দেশ করে, এমন ধারণা পাওয়া যায়।
গ্রন্থটিতে বলা হয়েছে:
[Stauros] means properly a stake, and is the tr. [i.e., translation] not merely of the Latin crux (cross), but of palus (stake) as well. As used in NT, however, it refers evidently not to the simple stake used for impaling, of which widespread punishment crucifixion was a refinement, but to the more elaborate cross used by the Romans in the time of Christ.‘[Stauros] শব্দটির যথাযথ অর্থ হলো একটি শূল বা খুঁটি। এটি শুধু লাতিন crux (ক্রুশ) শব্দের অনুবাদ নয়, বরং palus (শূল বা খুঁটি) শব্দেরও অনুবাদ।
তবে নিউ টেস্টামেন্টে ব্যবহৃত হলে এটি স্পষ্টতই শূলে বিদ্ধ করার জন্য ব্যবহৃত সাধারণ শূলকে নির্দেশ করে না। বরং সেই শূলে বিদ্ধ করার বহুল প্রচলিত শাস্তিপদ্ধতির একটি উন্নততর রূপ হিসেবে, খ্রিষ্টের সময়ে রোমানরা যে অপেক্ষাকৃত জটিল ক্রুশ ব্যবহার করত, সেটিকেই নির্দেশ করে।’
নিউ টেস্টামেন্টে stauros শব্দটি শুধু প্রকৃত ‘ক্রুশ’ বোঝায়, এই মতামত পুরোপুরি সঠিক নয়।
প্রকৃতপক্ষে, stauros শব্দটির প্রয়োগক্ষেত্র আরও বিস্তৃত। এটি একটি একক শূল বা খুঁটি এবং ক্রুশের আড়াআড়ি দণ্ড, উভয়কেই নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়েছে।
হেস্টিংসের Dictionary of the Bible-এ বলা হয়েছে:
The Greek term rendered ‘cross’ in the English NT is stauros (stauroo = ‘crucify’), which has a wider application than we ordinarily give to ‘cross’ being used of a single stake or upright beam as well as of a cross composed of two beams.
‘ইংরেজি নিউ টেস্টামেন্টে “cross” হিসেবে অনূদিত গ্রিক শব্দটি হলো stauros (stauroo = “ক্রুশবিদ্ধ করা”)। এই শব্দটির প্রয়োগক্ষেত্র আমাদের প্রচলিত “ক্রুশ” শব্দের অর্থের চেয়ে বিস্তৃত। এটি একটি একক শূল বা খাড়াভাবে দাঁড় করানো দণ্ডের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়, আবার দুটি দণ্ড দিয়ে তৈরি ক্রুশের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়।’
৫. নিউ টেস্টামেন্টে Stauros-এর ব্যবহার
নিউ টেস্টামেন্টে stauros শব্দটি মূলত শাস্তি দেওয়ার একটি উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত খাড়াভাবে দাঁড় করানো শূল বা দণ্ডকে নির্দেশ করে।
এ বিষয়ে একটি সংজ্ঞায় বলা হয়েছে:
The Greek word for ‘cross’ (stauros; verb stauroo; Latin crux, crucifigo, ‘I fasten to the cross’) means primarily an upright stake or beam, and secondarily a stake used as an instrument for punishment and execution. It is used in this latter sense in the New Testament.
‘”ক্রুশ”-এর জন্য ব্যবহৃত গ্রিক শব্দ stauros; এর ক্রিয়ারূপ stauroo। লাতিন crux এবং crucifigo, যার অর্থ “আমি ক্রুশের সঙ্গে আটকাই”, এর সঙ্গে শব্দটির সম্পর্ক রয়েছে।
শব্দটির প্রাথমিক অর্থ হলো খাড়াভাবে দাঁড় করানো একটি শূল বা দণ্ড। দ্বিতীয়ত, এটি শাস্তি প্রদান ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত শূলকে বোঝায়। নিউ টেস্টামেন্টে শব্দটি এই দ্বিতীয় অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।’
নিউ টেস্টামেন্টেই stauros শব্দটির অন্তত তিনটি ভিন্ন অর্থগত ব্যবহার ছিল।
প্রথমত: দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির দুই হাতকে সমর্থনকারী আড়াআড়ি কাঠের দণ্ডটিকেও stauros বলা হতো। লাতিন ভাষায় এই দণ্ডের নাম ছিল patibulum। উদাহরণ: লূক ২৩:২৬।
দ্বিতীয়ত: যে শূল বা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে patibulum পেরেক দিয়ে আটকানো হতো, সেটিকেও stauros বলা হতো। উদাহরণ: যোহন ১৯:১৯।
তৃতীয়ত: এই দুটি অংশ, patibulum এবং শূল বা খুঁটি, একত্রে যে সম্পূর্ণ কাঠামো তৈরি করত, সেটিকেও stauros বলা হতো। উদাহরণ: যোহন ১৯:২৫।
৬. ক্যাথলিক এনসাইক্লোপিডিয়ায় গাছের ওপর ক্রুশবিদ্ধকরণ
The Catholic Encyclopaedia-এর “Archaeology of the Cross and Crucifix” শীর্ষক নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গাছের ওপর ক্রুশবিদ্ধকরণের একটি আদিম পদ্ধতি দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত ছিল। এ ধরনের গাছকেও cross বলা হতো।
নিবন্ধটিতে বলা হয়েছে:
The penalty of the cross goes back probably to the arbor infelix, or unhappy tree, spoken of by Cicero (Pro, Rabir., iii sqq.) and by Livy, apropos of the condemnation of Horatius after the murder of his sister. According to Hüschke (Die Multa, 190) the magistrates known as duoviri perduellionis pronounced this penalty (cf. Liv., I, 266), styled also infelix lignem (Senec., Ep. ci; Plin., XVI, xxvi; XXIV, ix; Macrob., II, xvi).
অর্থাৎ, ‘ক্রুশের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার প্রথাটি সম্ভবত arbor infelix বা “অভাগা গাছ” ধারণা থেকে উদ্ভূত হয়েছে। সিসেরো তাঁর Pro Rabirio (অধ্যায় ৩ ও পরবর্তী অংশে) এবং লিভি তাঁর বোনকে হত্যার পর হোরাতিউসের দণ্ডাদেশ প্রসঙ্গে এই গাছের কথা উল্লেখ করেছেন।
হুশকের (Hüschke) Die Multa (পৃষ্ঠা ১৯০) অনুসারে, duoviri perduellionis নামে পরিচিত ম্যাজিস্ট্রেটরা এই দণ্ডাদেশ প্রদান করতেন। তুলনা করুন লিভি, বই ১, অধ্যায় ২৬৬। এই গাছকে infelix lignem নামেও অভিহিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে দেখুন সেনেকা, Epistulae ১০১; প্লিনি, ১৬.২৬ ও ২৪.৯; এবং ম্যাক্রোবিয়াস, ২.১৬।’
এরপর নিবন্ধটিতে বলা হয়েছে:
This primitive form of crucifixion on trees was long in use, as Justus Lipsius notes (“De cruce”, I, ii, 5; Tert., “Apol.”, VIII, xvi; and “Martyrol. Paphnut.” 25 Sept.).
‘গাছের ওপর ক্রুশবিদ্ধকরণের এই আদিম পদ্ধতি দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। জাস্টাস লিপসিয়াসও এ বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। দেখুন তাঁর De cruce, বই ১, অধ্যায় ২, অনুচ্ছেদ ৫; টার্টুলিয়ান, Apologeticus, অধ্যায় ৮, অনুচ্ছেদ ১৬; এবং Martyrologium Paphnutii, ২৫ সেপ্টেম্বরের বিবরণ।’
এরপর নিবন্ধটিতে বলা হয়েছে:
Such a tree was known as a cross (crux). On an ancient vase we see Prometheus bound to a beam which serves the purpose of a cross.
‘এ ধরনের গাছকে ক্রুশ (crux) বলা হতো। একটি প্রাচীন পাত্রে আমরা প্রমিথিউসকে এমন একটি দণ্ডের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পাই, যা ক্রুশের কাজ করছে।’
এরপর আরও বলা হয়েছে:
A somewhat different form is seen on an ancient cist at Præneste (Palestrina), upon which Andromeda is represented nude, and bound by the feet to an instrument of punishment like a military yoke – i.e. two parallel, perpendicular stakes, surmounted by a transverse bar.
‘এর থেকে কিছুটা ভিন্ন একটি রূপ দেখা যায় প্রায়নেস্তে (পালেস্ত্রিনা)-তে পাওয়া একটি প্রাচীন cist-এ। সেখানে অ্যান্ড্রোমিডাকে নগ্ন অবস্থায় চিত্রিত করা হয়েছে এবং তাঁর পা দুটি সামরিক জোয়ালের মতো একটি শাস্তিদণ্ডের সঙ্গে বাঁধা রয়েছে। অর্থাৎ, দুটি সমান্তরাল উল্লম্ব শূল বা দণ্ডের ওপর একটি আড়াআড়ি দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে।’
নিবন্ধটিতে এরপর বলা হয়েছে:
Certain it is, at any rate, that the cross originally consisted of a simple vertical pole, sharpened at its upper end.
‘অন্তত এটুকু নিশ্চিত যে, ক্রুশের আদি রূপটি ছিল একটি সাধারণ উল্লম্ব দণ্ড, যার ওপরের প্রান্তটি সূচালো করা থাকত।’
এরপর বলা হয়েছে:
Mæcenas (Seneca, Epist. xvii, 1, 10) calls it acuta crux; it could also be called crux simplex.
‘মেসেনাস (সেনেকা, Epistulae, ১৭.১.১০) একে acuta crux, অর্থাৎ “সূচালো ক্রুশ” বলে অভিহিত করেছেন। একে crux simplex নামেও ডাকা যেত।’
সবশেষে নিবন্ধটিতে বলা হয়েছে:
To this upright pole a transverse bar was afterwards added to which the sufferer was fastened with nails or cords, and thus remained until he died, whence the expression cruci figere or affigere (Tac., “Ann.”, XV, xliv; Potron., “Satyr.”, iii)…
‘পরবর্তী সময়ে এই উল্লম্ব দণ্ডের সঙ্গে একটি আড়াআড়ি দণ্ড যুক্ত করা হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে পেরেক বা দড়ি দিয়ে সেই দণ্ডের সঙ্গে আটকানো হতো এবং তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেভাবেই থাকতেন।
এ থেকেই cruci figere অথবা cruci affigere, অর্থাৎ “ক্রুশের সঙ্গে আটকানো”, এই অভিব্যক্তিগুলোর উৎপত্তি হয়েছে। দেখুন ট্যাসিটাস, Annales, ১৫.৪৪; এবং পেট্রোনিয়াস, Satyricon, অধ্যায় ৩…’
আরও বিস্তারিত তথ্য, প্রমাণ এবং খ্রিস্টান মিশনারিদের আপত্তির খণ্ডন দেখুন এখানে। আরও বেশ কিছু প্রমাণ দেওয়া হয়েছে বিস্তারিত তথ্যসুত্রসহ, সুন্দর আলোচনা।[5] https://www.islamic-awareness.org/quran/contrad/external/crucify
আমি আপনাদের জানার জন্য আরও কিছু বইয়ের স্ক্রিনশট দিয়ে দিচ্ছি।


Dr Sami Ameri (হাফি)-ও উক্ত প্রমাণগুলো উপস্থাপন করেছেন। তিনি লিখেছেন,
ثالثا: الأدلة التاريخية تشهد أن الصلب كان معروفًا عند المصريين. وهو ما قرَّرَتْهُ الموسوعة اليهودية Encyclopaedia Judaica: «هناك تقارير عن عملياتِ صَلْبِ من المصادر الآشورية والمصرية والفارسية واليونانية والبيونية والرومانية) . (2)
رابعا: العبارة القرآنية عجيبة؛ حَيَّرَت المفسّرين؛ إذ لم تَقُلْ وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ على جذوع النخل»، وإنما قالت ﴿ وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ النَّخْلِ ؛ فكأن هناك تداخلا بين الصليب والمصلوب، فالصليب يخترق المصلوب. والنَّاظِرُ في الصَّلْبِ زمن الفراعنة يُلاحظ أنه كان بوضع المصلوب فوق خشبة؛ فتكون هي فيه. وهذه صورة للصَّلْبِ على جذع الشَّجَرِ كما في كتاب حكم الفرعون، والجريمة والعقاب في مصر القديمة» .
তৃতীয়ত: ঐতিহাসিক প্রমাণ সাক্ষ্য দেয় যে, প্রাচীন মিশরীয়দের মধ্যে শূলবিদ্ধ করে শাস্তি দেওয়ার প্রথা পরিচিত ছিল। Encyclopaedia Judaica বা এনসাইক্লোপিডিয়া জুডাইকা-তেও এ কথাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে:
“আসিরীয়, মিশরীয়, পারসিক, গ্রিক, বাইজেন্টাইন ও রোমান উৎসসমূহে শূলবিদ্ধ করার ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়।”
চতুর্থত: কুরআনের অভিব্যক্তিটি বিস্ময়কর; এটি মুফাসসিরদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। কারণ, কুরআনে এ কথা বলা হয়নি যে, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের খেজুরগাছের কাণ্ডের উপর শূলবিদ্ধ করব’ (ওয়া-লা-উসাল্লিবান্নাকুম ‘আলা জুযূ’ইন-নাখল)। বরং বলা হয়েছে:
“আমি অবশ্যই তোমাদের খেজুরগাছের কাণ্ডের মধ্যে শূলবিদ্ধ করব” (ওয়া-লা-উসাল্লিবান্নাকুম ফী জুযূ’ইন-নাখল)।
বক্তব্যটি এমন একটি চিত্র তুলে ধরে, যেখানে ক্রুশ বা শূল এবং শূলবিদ্ধ ব্যক্তির মধ্যে যেন একধরনের মিশে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে; অর্থাৎ, শূলটি শূলবিদ্ধ ব্যক্তির শরীর ভেদ করে প্রবেশ করছে।
ফেরাউনদের যুগে শূলবিদ্ধ করার প্রথা নিয়ে গবেষণা করলে দেখা যায়, শাস্তিটি এমনভাবে কার্যকর করা হতো যে, শূলবিদ্ধ ব্যক্তিকে একটি কাঠের খুঁটির ওপর স্থাপন করা হতো; ফলে খুঁটিটি তার শরীরের ভেতরে থাকত। প্রাচীন মিশরে গাছের কাণ্ডের ওপর শূলবিদ্ধ করার এমন একটি চিত্র The Rule of the Pharaoh, Crime and Punishment in Ancient Egypt (ফেরআউনের শাসন, প্রাচীন মিশরে অপরাধ ও শাস্তি) শীর্ষক বইয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আরোও দেখুন,




জেনেসিস ৪০:১৯ এবং অনকেলোসের তারগুম
আপনার প্রশ্নের আরেকটি অংশ ছিল,
ইতিহাসের এই ক্ষেত্রে কুরআনে ভুল থাকলেও জেনেসিসের ৪০/৭১ এ সঠিকটা বলা আছে। সেই সময় মিশরে ইম্পেল করে লোকদের মারা হত, সেই ইম্পেলমেন্ট শব্দটা আছে জেনেসিসে। এটার হিস্ট্রিক্যাল ডকুমেশান আছে। কিন্তু ক্রুসিফাই করার কথা আছে কুরআনে যা ঐতিহাসিকভাবে ভুল।
ইহুদিদের একটা স্ক্রিপচার আছে ‘তারগুম অংকেলস’ নামে। সেখানে তারা যখন জেনেসিসের এই কথাটা আরামাইক ভাষায় অনুবাদ করে তখন তারা এখানে ভুল অনুবাদ করে। তারা এটাকে ক্রুসিফিকেশান অনুবাদ করে। আর তাদের এই তারগুম অংকেলস নবীজি আসারও ৪/৫ শ বছর আগে অনেক প্রসিদ্ধ ছিল, প্রচলিত ছিল। তো, তারা বলছে যে- নবীজি ক্রুসিফিকেশনের কথাটা সেখান থেকেই নিসেন কিন্তু এটা যে ভুল অনুবাদ টা তো তিনি জানতেন না তাই কুরআনেও ভুলটাই তুলে দিসেন (সুরা ইউসুফে, ১২/৪১- “ক্রুশবদ্ধ করে যাকে মারা হবে তার মাংস পাখিরা খুবলে খাবে”) যার কোন হিস্ট্রিক্যাল এভিডেন্স নাই।
জবাব:
এই বিষয়ে আমাদের আরেক লেখক M. M. Apurba ভাই ভালো উত্তর দিয়েছেন, তাই আমি সরাসরি সেটিই এখানে উল্লেখ করে দিচ্ছি,
বাইবেলের মূল পাঠে জেনেসিস ৪০:১৯
এখন নেক্সট পার্ট, আপনার প্রশ্নে দাবি করা হয়েছে যে বাইবেলের জেনেসিসে যখন সূরাহ ইউসুফের কাহিনিটা বর্ণিত হয়েছে সেখানে সরাসরি impale শব্দটা ইবরানী মূল পাঠে আছে।
এটা সবচেয়ে মিথ্যা কথা। কিছু ট্রান্সলেশনে আছে, আমরা তা অস্বীকার করিনা। এখন দেখা যাক বাইবেলের মূল পাঠে কি আছে:
এখানে সূরাহ ইউসুফের কাহিনিটাই রিপিট হচ্ছে, এবং ইউসুফ (আ) সরাসরি দুই ব্যক্তির স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন:
עוֹד שְׁלֹשֶׁת יָמִים, יִשָּׂא פַרְעֹה אֶת-רֹאשְׁךָ מֵעָלֶיךָ, וְתָלָה אוֹתְךָ, עַל-עֵץ; וְאָכַל הָעוֹף אֶת-בְּשָׂרְךָ, מֵעָלֶיךָ.
“আর মাত্র তিন দিন পর ফেরাউন তোমার মাথা তোমার দেহের ওপর থেকে তুলে নেবে, তোমাকে কাঠের ওপর ঝুলিয়ে রাখবে এবং পাখিরা তোমার দেহের ওপর থেকে তোমার মাংস খাবে।”[6]https://biblehub.com/lexicon/genesis/40-19.htm?
উক্ত চরণে হিব্রু ভাষায়, וְתָלָ֥ה শব্দটি ইউজ হয়েছে, যার আক্ষরিক অর্থ: and hang (এবং ঝুলিয়ে রাখব)
এমনকি প্রাচীন বাইবেলের ডিকশনারিও এটা স্বীকার করে।[7]https://stronger.encyclopaediabiblica.com/en/lexeme/H8518 এমনকি কিং জেমস ভার্সনেও এটা hanging হিসাবেই ট্রান্সলেট করা আছে, ইম্পেইল না। এই জেনেসিসের ৪০:১৯ এর আক্ষরিক পাঠ কুরআনের সুলব যার অর্থ “হত্যার উদ্দেশ্যে ঝুলানো” এটির সহিত সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। [8]https://www.biblegateway.com/passage/?search=Genesis%2040%3A18-20&version=KJV
বাইবেলের স্কলারদের মধ্যে উক্ত শব্দটার অর্থ ওই আয়াতে কি তা নিয়ে মতভেদ আছে:
Verses 18, 19. – And Joseph answered and said (with what reluctance and pathos may be imagined), This is the interpretation thereof (the exposition was supplied by God, and, however willing or anxious Joseph might be to soften its meaning to his auditor, he could not deviate a hair’s-breadth from what he knew to be the mind of God): The three baskets are three days: yet within three days – literally, in three days more (ut supra, ver. 13) – shall Pharaoh lift up thy head from off thee (i.e. deprive thee of life, the phrase containing a resemblance to that employed in ver. 13, and finding its explanation in the words that follow), and shall hang thee on a tree – i.e. after decapitation (cf. Deuteronomy 21:22, 23
; Joshua 10:26
; 2 Samuel 4:12
), which was probably the mode of execution at that time practiced in Egypt (Michaelis, Clarke, Keil, Murphy, Alford, Inglis, Bush), though some regard the clause as a description of the way in which the baker s life was to be taken from him, viz., either by crucifixion (Onkelos, Rosenmüller, Ainsworth) or by hanging (Willst, Patrick, T. Lewis), and others view it as simply pointing to capital punishment, without indicating the instrument or method (Piscator, Lapide, Mercerus, ‘Speaker’s Commentary’). And the birds shall eat thy flesh from off thee. “The terror of approaching death would be aggravated to the poor man by the prospect of the indignity with which his body was to be treated” (Lawson).[9]https://www.biblehub.com/commentaries/pulpit/genesis/40.htm
কিন্ত যাই হোক না কেন, শব্দটির আক্ষরিক অর্থ Impalement নয়। আমরা বলছিনা যে এটি impalement অর্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারেনা। এরকম দাবি আমরা করছিনা। কিন্তু বাইবেলেই ইম্পেলমেন্ট শব্দটার সরাসরি ব্যবহার আছে।
যেমন এজরা ৬:১১
וּזְקִיף יִתְנְסַח מִן־בַּיְתֵהּ וּמְחָא יִתְמְחֵא עֲלוֹהִי וּבַיְתֵהּ נְוָלִי יִתְעֲבֵד עַל־דְּנָה
“আর যে কেউ এই আদেশ পরিবর্তন করবে, তার ঘর থেকে একটি কাঠের খুঁটি উপড়ে নেওয়া হবে; এবং তাকে সেটির ওপর বিদ্ধ (impale) করা হবে। আর এই অপরাধের কারণে তার ঘর আবর্জনার স্তূপে পরিণত করা হবে।”[10]https://www.sefaria.org/Ezra.6.11?lang=bi
এই আয়াতে ব্যবহৃত יִתְמְחֵא শব্দটি, জেনেসিসের ৪০:১৯ শব্দ হতে আলাদা, এবং এটার অর্থ করা হয়েছে :
literally: (one’s body) is struck (on top of something); hence: = process by which a human body is placed on a vertically position on a sharpened upright pole that will pierce it to be impaled [11]https://afii.org/tanakhinterlinear/he/H4223.html
সুতরাং দেখা গেল বাইবেলেই অন্য জায়গায় ইম্পেলমেন্টের জন্য সরাসরি ভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
অনকেলোসের তারগুম ও “সালাব” ধাতু
এবার আসুন, onkelos এর বিষয়টায়। এর মূল হিব্রু পাঠে পাওয়া যায়:
בְּסוֹף תְּלָתָא יוֹמִין יַעְדִּי פַרְעֹה יָת רֵישָׁךְ מִנָּךְ וְיִצְלוֹב יָתָךְ עַל צְלִיבָא וְיֵכוּל עוֹפָא יָת בִּשְׂרָךְ מִנָּךְ:
In another [At the end of] three days, Pharaoh will lift [remove] your head from off you. He will hang you on a tree, and the bird will eat your flesh from off you.[12]https://www.sefaria.org/Onkelos_Genesis.40?lang=bi
এখানে לוֹב יָתָךְ עַל צְלִיבָא অর্থ:
וְיִצְלוֹב — তোমাকে ঝুলিয়ে রাখবে / শূলে চড়াবে
এই শব্দটা : וְיִצְלוֹב — এর মূল ধাতু צלב।
এই শব্দটার অর্থ কেউ কেউ ক্রুসিফাই করলেও এটার আরেকটা অর্থ ঝুলানো, এখানে এই same কথাটার দ্বারা উদ্দেশ্য কি?
צלב to hang, impale. Esth. R. to I, 8 לזה וצולב. . אתה when thou raisest the one to dignity, thou must decree hanging for the other. Gen. R. s. 30 את צולב . . . אתמול צולביו yesterday he was prepared to be hanged, and now he hangs those who had intended to hang him; a. fr. – Part. pass. צלוב; f צלובה &c. Yeb. XVI, 3 צ׳ . . ראוהו ואפי׳ even if witnesses saw him. . . nailed to the stake (v. צלוב h.) Tosef. Gitt. VIIIV), 1;Y. iib.VII, 48a bot. וכ׳ צ׳ היה if a man was impaled or being bled to death, and motioned (to his friends) and said, write a letter of divorce &c. Ohol. III, 5; Toset. ib. IV, 11 שותת שדמו צ׳ one nailed to the stake whose blood runs freely. Koh. R. to VII, 26 לצלובים, v. בכיר; a. fr. Nif. נצלב to be hanged, mpaled. Esth. R. introd. (ref. to Deut. XXVIII, 66) להצלב יוצא שהוא זה that is he who is taken out to be impaled. Ib. to I, 12 כשנ׳ . . . אימתי המן when was his wrath pacified? When Haman was hanged. Ib. to III, 1 לישלב . .. סופו אם this man, too, will in the end be hanged; a. fr.
צלב, צליבch. same. Targ. Y. I Num. XXV, 4; Y. II צלבין ויהוין (not עלבין). Targ. Gen. XL, 19. Targ. Esth. VII, 9; a. fr. - Part. pass. צליב; pl. צליבין. Targ. II Esth. IX, 24; a. e. - Y. Hag. II, 78a top ועלבונון and they impaled them (the sorceresses); a. e. tthpa. אצטלב, thpe. אצטליב to be hanged. Targ. O. Deut. XXI, 23. Targ. II Esth. IX, 14; a. fr. – Koh. R. to VII, 26. Esth. R. to I, 12 מצטלב, v. חן. Gen. R. s. 65 end למצטלבה שריתא קומי אזל (not למצטבלה) walked before the beam (on which he was) to be hanged; Yalk. ib. 115 למצטלב. Lev. R. s. 28 למצטבלא בעי (corr. acc.) is going to be hanged; Yalk. Esth. 1058 למצלבא.[13]https://daf-yomi.com/Dictionary.aspx?id=8&wordId=75414
এমনকি উপরের অভিধানটিতে জেনেসিস ৪০:১৯ ও অনিকিলোসের উল্লেখও আছে :
צלב, צליב ch. same. Targ. Y. I Num. XXV, 4; Y. II ויהוין צלבין (not צלבין). Targ. Gen. XL, 19. Targ. Esth. VII, 9; a. fr.[14]https://en.wikisource.org/wiki/A_Dictionary_of_the_Targumim%2C_the_Talmud_Babli_and_Yerushalmi%2C_and_the_Midrashic_Literature/%D7%A6%D7%9C%D7%90_-_%D7%A6%D7%9C%D7%95%D7%A0%D7%94%D7%90
এখানেও বলা হইছে:
פ”י — תלה על עץ התליה כדי להמית hängen, krazigen; pendre, crucuefier; to hang, crucify : אין מעידין אלא עד שתצא נפשו, ואפילו ראוהו מגוייד וצלוב וחיה אוכלת בו (יבמ’ טז נ )****(אהל’
צָלַב অর্থ:
פ”י — To hang on a gallows/tree in order to cause death; hängen, krazigen (German: to hang, to execute by hanging); pendre, crucifier (French: to hang, to crucify); to hang, to crucify.[15]https://benyehuda.org/dict/24412/54043
এমনকি কিছু প্রাচ্যবিদ জেনেসিস ও অনকিলোসের শব্দ দুটি সমার্থক গণ্য করেন, যা এখানে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব নয়, পিডিএফ বই হওয়ার কারণে।
কাজেই কুরআনের সুলব শব্দের যদি অনিকিলোস এর হিব্রু শব্দের সাথে মিলও থাকে, তাতেও কোন সমস্যা নাই। কারণ উভয়টাই ঝুলানো অর্থটা প্রকাশ করে। এই অর্থটা আই গেস, বাইবেলের কোন স্কলারও অস্বীকার করবেনা।
সূরা ত্বহা কি মাক্কি? আয়াতটা কি ইহুদিদের থেকে কপি?
এখন আপনি বললেন যে, তারা বলে যে নবী ﷺ onkelos থেকে জিনিস নিয়ে তা কুরআনে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এক্ষেত্রে ট্রাডিশনাল ইসলামিক স্কলারশিপে কিছু আপত্তি ওঠে, ইসলামিক ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাই মক্কায় কোন ইয়াহূদী ছিলনা। ইয়াহূদীদের সাথে ইসলামের সংস্পর্শ হয় মদিনায় হিজরতের পরে।
আর সূরাহ ত্বাহা মদিনায় অবতীর্ণ হবার প্রশ্নেই ওঠে না। কারণ সরাসরি সাহাবি ইবনে মাসাউদের সাক্ষ্য আছে, সহিহ বুখারিতে এসেছে: ইবনে মাসাউদ বলেন:
بَنُو إِسْرَائِيلَ، وَالْكَهْفُ، وَمَرْيَمُ، وَطَهَ، وَالْأَنْبِيَاءُ، هُنَّ مِنَ الْعِتَاقِ الْأُوَلِ، وَهُنَّ مِنْ تِلَادِي.
অর্থ: “বনি ইসরাইল, আল-কাহফ, মারইয়াম, ত্বহা ও আল-আম্বিয়া—এগুলো প্রাচীনকাল থেকে পঠিত সূরাগুলোর অন্তর্ভুক্ত এবং এগুলো আমার পুরোনো অর্জিত সম্পদের অন্তর্ভুক্ত।”[16]সূত্র: সহিহ বুখারি, ৪৯৯৪
الْحَدِيثُ الثَّانِي حَدِيثُ ابْنِ مَسْعُودٍ، تَقَدَّمَ شَرْحُهُ فِي تَفْسِيرِ سُبْحَانَ وَفِي الْأَنْبِيَاءِ، وَالْغَرَضُ مِنْهُ هُنَا أَنَّ هَذِهِ السُّوَرَ نَزَلْنَ بِمَكَّةَ، وَأَنَّهَا مُرَتَّبَةٌ فِي مُصْحَفِ ابْنِ مَسْعُودٍ كَمَا هِيَ فِي مُصْحَفِ عُثْمَانَ، وَمَعَ تَقْدِيمِهِنَّ فِي النُّزُولِ فَهُنَّ مُؤَخَّرَاتٌ فِي تَرْتِيبِ الْمَصَاحِفِ.
“এটি ইবনু মাসউদের দ্বিতীয় হাদিস। এর ব্যাখ্যা ইতিপূর্বে সূরা ‘সুবহান’ (বনি ইসরাইল) ও সূরা আল-আম্বিয়ার তাফসিরে এসেছে। এখানে এর উদ্দেশ্য হলো—এই সূরাগুলো মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছিল এবং ইবনু মাসউদের মুসহাফে এগুলোর বিন্যাস উসমানের মুসহাফের মতোই ছিল। অবতরণের দিক থেকে এগুলো আগে হলেও মুসহাফের বিন্যাসে এগুলো পরে রাখা হয়েছে।”[17]ইবনে হাজার, ফাতহুল বারি ৮/৬৫৮
এরপর তিনি ব্যাখ্যা করেছেন:
وَالْمُرَادُ بِالْعِتَاقِ، وَهُوَ بِكَسْرِ الْمُهْمَلَةِ، أَنَّهُنَّ مِنْ قَدِيمِ مَا نَزَلَ.
“‘العتاق’ দ্বারা উদ্দেশ্য—এগুলো আগে অবতীর্ণ হওয়া সূরাগুলোর অন্তর্ভুক্ত।”
আর «وَهُنَّ مِنْ تِلَادِي» সম্পর্কে তাঁর ব্যাখ্যা:
أَيْ مِنْ مَحْفُوظَاتِي الْقَدِيمَةِ.
“অর্থাৎ, এগুলো আমার পুরোনো মুখস্থ করা সূরাগুলোর অন্তর্ভুক্ত।”
এমনকি সূরাহ ত্বাহার সম্পূর্ণ মাক্কি হবার পক্ষে আলেমদের বক্তব্য পাওয়া যায়:
ইমাম ইবনুল জাওযি (মৃ. ৫৯৭ হি.) তাঁর زاد المسير–এ সূরা ত্বহার শুরুতে স্পষ্ট লিখেছেন:
سورة طه وهي مكية كلها بإجماعهم.
অর্থ: “সূরা ত্বহা—এটি সম্পূর্ণ মক্কি; এ বিষয়ে তাঁদের ইজমা রয়েছে।”
এবং ইমাম কুরতুবি (মৃ. ৬৭১ হি.) বলেছেন:
مَكِّيَّةٌ فِي قَوْلِ الْجَمِيعِ
অর্থ: “সবার মত অনুযায়ী এটি মক্কি।”[18]كتاب مختصر التبيين لهجاء التنزيل – 4/840
ইমাম আবু হাইয়ান (মৃ. ৭৪৫ হি.)-এর البحر المحيط–এ এসেছে:
هَذِهِ السُّورَةُ مَكِّيَّةٌ بِلَا خِلَافٍ
অর্থ: “এই সূরাটি মক্কি—এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই।”
যদিও কেউ কেউ, যেমন যামাক্ষিরি, আল ওয়াহিদি বলেছেন এর শেষ দুইটা আয়াত মাদানী, তাদের এই কথা গ্রহণযোগ্য না, কারণ তারা যে আছারের উপর ভিত্তি করে এটি বলেছেন, তা দুর্বল:
আছারটি নিম্নরূপ:
ইমাম ওয়াহিদীর আসবাবুন নুযূল-এ সনদসহ বর্ণনাটি এসেছে:
أخبرنا أحمد بن محمد بن إبراهيم الثَّعْلَبِي، قال: أخبرنا شُعَيب بن محمد البَيْهَقي، قال: أخبرنا مكي بن عبدان، قال: حدثنا أبو الأزهر، قال: حدثنا روح، عن موسى بن عُبَيدة الرَّبَذِي، قال: أخبرني يزيد عن عبد الله بن قُسَيْط، عن أبي رافع مولى رسول الله صلى الله عليه وسلم:
এরপর ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে: নবী ﷺ-এর কাছে একজন অতিথি এলে তিনি আবু রাফি‘কে এক ইহুদির কাছে খাবার ধার করতে পাঠান। ইহুদি জামানত ছাড়া ধার দিতে অস্বীকার করে। নবী ﷺ নিজের বর্ম জামানত হিসেবে দিতে বলেন। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর ২০:১৩১ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।[19]সূত্র: আসবাবুন নুযূল, ওয়াহিদী, সূরা ত্বা-হা ২০:১৩১। – https://quranpedia.net/tafsir/ta-ha/131
কিন্তু এই আছারটিতে একটি ঘোর সমস্যা আছে। আবু রাফি‘-এর বর্ণনাটির সনদে আছেন মূসা ইবন উবায়দাহ আর-রাবাযী (موسى بن عبيدة الربذي)। তাঁর ব্যাপারে হাদিসবিশারদদের সমালোচনা রয়েছে।
আল-হাইসামী বলেছেন:
رواه الطبراني في الكبير، والبزار، وفيه موسى بن عبيدة الربذي، وهو ضعيف.
অর্থ: “এটি তাবারানী আল-মু‘জামুল কাবীর-এ এবং বাযযার বর্ণনা করেছেন; এতে মূসা ইবন উবায়দাহ আর-রাবাযী আছেন, আর তিনি দুর্বল।”[20]مجمع الزوائد ١/ ١٨٦
আর ইবন হাজারের মূল্যায়ন:
وفيه موسى بن عبيدة، وهو متروك.
অর্থ: “এতে মূসা ইবন উবায়দাহ আছেন, আর তিনি পরিত্যক্ত [বর্ণনাকারী]।”
অর্থাৎ, আছারটা দুর্বল। ইনফ্যাক্ট ইমাম কুরতুবি এই আপত্তির জবাবও দিয়েছেন:
ইমাম কুরতুবী এ আপত্তিটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন:
قال ابن عطية وهذا معترض أن يكون سببا؛ لأن السورة مكية والقصة المذكورة مدنية في آخر عمر النبي صلى الله عليه وسلم؛ لأنه مات ودرعه مرهونة عند يهودي بهذه القصة التي ذكرت.
অর্থ: “ইবন আতিয়্যাহ বলেছেন, এই ঘটনাকে আয়াতটির অবতরণের কারণ বলা আপত্তিকর; কারণ সূরাটি মক্কি, অথচ উল্লিখিত ঘটনাটি নবী ﷺ-এর জীবনের শেষদিকে মদিনায় ঘটেছিল—তিনি সেই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত অবস্থায় এক ইহুদির কাছে বর্ম বন্ধক রাখা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।”[21]كتاب تفسير القرطبي = الجامع لأحكام القرآن 11/ 262 https://shamela.ws/book/20855/4401
ওয়ারাকা ইবনে নওফল ও উপসংহার
মোদ্দাকথা দলিল প্রমাণের আলোকে বোঝা যায় যে সূরাহ ত্বহা মক্কায় নাযিল হয়, যখন নবী ﷺ এর সাথে কোন ইয়াহূদীর যোগাযোগ ছিলনা। তাহলে তৎকালীন সময়ে তিনি onkelos এর সন্ধান আরবি ভাষায় কোথায় পেলেন?
আর যদি বলেন যে তিনি ওরাল ট্রেডিশনের মাধ্যমে পেয়েছেন, তাহলে আমরা বলি, মক্কায় সেসময় এই ধরনের কোন ট্র্যাডিশন প্রচলিত থাকার কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়না। যদি বলেন, হয়ত ওয়ারকা ইবনু নাওফেলের কাছে শুনেছেন কারণ তিনি ইবরানী ভাষায় ইঞ্জিলের অনুবাদ করতেন, তাহলে বলব বর্ণনাগুলা তাদের বিরুদ্ধে যাবে, কারণ ওয়ারকা কিন্তু নবী ﷺ এর কাছে নামূস দূত এসেছে এই কথা শুনে তাকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। তিনি একবারেও এই সন্দেহ উপস্থাপন করলেন না, যে হয়ত মুহাম্মাদ তার পাঠকৃত ইঞ্জিল শুনেই গল্প বানাচ্ছে, যদিও ওয়ারকা এর কিছুদিন পর মারা যান:
عَنْ عَائِشَةَ أُمِّ الْمُؤْمِنِينَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، أَنَّهَا قَالَتْ:
… ثُمَّ انْطَلَقَ بِهِ خَدِيجَةُ حَتَّى أَتَتْ بِهِ وَرَقَةَ بْنَ نَوْفَلِ بْنِ أَسَدِ بْنِ عَبْدِ الْعُزَّى، ابْنَ عَمِّ خَدِيجَةَ، وَكَانَ امْرَأً تَنَصَّرَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ …
وَقَالَ لَهُ وَرَقَةُ: هَذَا النَّامُوسُ الَّذِي نَزَّلَ اللَّهُ عَلَى مُوسَى، يَا لَيْتَنِي فِيهَا جَذَعًا، لَيْتَنِي أَكُونُ حَيًّا إِذْ يُخْرِجُكَ قَوْمُكَ.
فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «أَوَمُخْرِجِيَّ هُمْ؟»
قَالَ: نَعَمْ، لَمْ يَأْتِ رَجُلٌ قَطُّ بِمِثْلِ مَا جِئْتَ بِهِ إِلَّا عُودِيَ، وَإِنْ يُدْرِكْنِي يَوْمُكَ أَنْصُرْكَ نَصْرًا مُؤَزَّرًا.
ওয়ারাকা ইবন নওফল বললেন:
“এ সেই ফেরেশতা, যাঁকে আল্লাহ মূসা (আ.)-এর কাছে পাঠিয়েছিলেন। হায়! যদি আমি সেই সময় পর্যন্ত যুবক থাকতাম! হায়! যদি আমি জীবিত থাকতাম, যখন আপনার সম্প্রদায় আপনাকে বের করে দেবে!”
রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, “তারা কি আমাকে বের করে দেবে?”
ওয়ারাকা বললেন, “হ্যাঁ। আপনি যা নিয়ে এসেছেন, এমন কিছু নিয়ে কোনো ব্যক্তি কখনো আসেননি, যার সঙ্গে শত্রুতা করা হয়নি। যদি আপনার সেই দিনটি আমি পাই, তাহলে আপনাকে শক্তিশালী ও পূর্ণাঙ্গভাবে সাহায্য করব।”
আস যুরকানী ঠিক একই ভাবে উত্তর দেন:
الشبهة الثالثة ودفعها:
يقولون إنه صلى الله عليه وسلم كان يلقى ورقة بن نوفل فيأخذ عنه ويسمع منه ورقة لأنه قريب خديجة زوج محمد، يريدون بهذا أن يوهموا قراءهم وسامعيهم بأن هذا القرآن استمد علومه من هذا النصراني الكبير الذي يجيد اللغة العبرية ويقرأ بها ما شاء الله.
وندفع هذه الشبهة بمثل ما دفعنا به ما قبلها، ونقرر أنه لا دليل عندهم على هذا الذي يتوهمونه ويوهمون الناس به، بل الدليل قائم عليهم؛ فإن الروايات الصحيحة تثبت أن خديجة ذهبت بالنبي حين بدأه الوحي إلى ورقة، ولما قص الرسول قصته قال:
هذا هو الناموس الذي أنزل الله على موسى.
ثم تمنى أن يكون شابًّا في حياة وقوة ينصر بها الرسول صلى الله عليه وسلم ويؤازره حين يخرجه قومه.
ولم تذكر هذه الروايات الصحيحة أنه ألقى إلى الرسول صلى الله عليه وسلم عظة أو درسًا له درسًا في العقائد أو التشريع، ولا أن الرسول صلى الله عليه وسلم كان يتردد عليه كما يتوهمون، فأنى لهم ما يقولون؟
وأي منصف يسمع كلمة ورقة هذه ولا يفهم منها أنه كان يبتغي أن يعيش حتى يكون تلميذًا لمحمد وجنديًّا مخلصًا في صفه، ينصره ويدافع عنه في وقت المحنة؟ ولكن القوم ركبوا رؤوسهم على رغم ذلك، وحاولوا قلب الأوضاع وإيهام أن ورقة هو الأستاذ الخصوصي الذي استقى منه محمد دينه وقرأه، ألا ساء ما يحكمون؟
এই সহিহ বর্ণনাগুলোতে এমন কিছু উল্লেখ করা হয়নি যে, ওয়ারাকা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে কোনো উপদেশমূলক ভাষণ দিয়েছিলেন, কিংবা তাঁকে আকিদা বা শরিয়তের কোনো পাঠ শিখিয়েছিলেন। এমন কথাও বর্ণিত হয়নি যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ তাদের ধারণা অনুযায়ী নিয়মিত তাঁর কাছে যাতায়াত করতেন। তাহলে তারা তাদের দাবির পক্ষে এমন কথা কোথা থেকে পেল?
কোনো ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি ওয়ারাকার এই বক্তব্য শুনলে কীভাবে বুঝতে ব্যর্থ হবেন যে, তিনি বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন, যাতে তিনি মুহাম্মদ ﷺ-এর একজন শিষ্য এবং তাঁর পক্ষে নিবেদিতপ্রাণ সৈনিক হতে পারেন—যিনি বিপদের সময় তাঁকে সাহায্য করবেন ও তাঁর প্রতিরক্ষা করবেন?
কিন্তু তা সত্ত্বেও ওই লোকেরা একগুঁয়েভাবে নিজেদের অবস্থানে অনড় থেকেছে। তারা বাস্তবতাকে উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং এমন ধারণা দিতে চেয়েছে যে, ওয়ারাকাই ছিলেন সেই বিশেষ শিক্ষক, যাঁর কাছ থেকে মুহাম্মদ ﷺ নিজের ধর্ম ও কুরআন গ্রহণ করেছিলেন।
তারা কতই না মন্দ সিদ্ধান্ত দেয়![22]كتاب مناهل العرفان في علوم القرآن – 2/428 https://shamela.ws/book/7249/1036
রাসুলের বিরোধীতা না করার জন্য ভয় দেখানো হয়েছিল?
অতঃপর আপনার এই প্রশ্নের উত্তর
নাস্তিকরা বলে যে, ৭ম শতাব্দীর আরবে এভাবে শাস্তি দেওয়াটা পেইনফুল একটা প্রসেস ছিল, তাই এভাবে তাদের ভয় দেখানো হয়েছে, যেন কেউ উনার বিরুদ্ধে কিছু দাবি না করে (নাউজুবিল্লাহ)।
জবাব: খুবই অদ্ভুত সিদ্ধান্ত, যা দলিল-প্রমাণ বহির্ভূত এবং অনুমান-কল্পনা। এই প্রশ্নগুলোর জন্য একটা সুবিধা আছে, সেটা হলো, এই প্রশ্নগুলো আসলে নবীজির নবুয়তের প্রমাণ আমাদের কাছে আরও দৃঢ় হয়।
নিচের যুক্তি-প্রমাণগুলো লক্ষ করুন।
প্রশ্নটার মধ্যেই উত্তর রয়েছে।
কিসের উদ্দেশ্যে ভয় দেখানো? কিন্তু এতে তাঁর লাভ কী? কেন ভয় দেখাবে? তাঁর কী উদ্দেশ্য ছিল?
উত্তর: ক্ষমতা, নেতৃত্ব, নারী, সম্পদ, নাম?
১. উপরের যুক্তি মতে, নবীজি এই আয়াতগুলো যুক্ত করেছেন মক্কার মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য, যাতে তারা নবীজির কোনো কাজে বা তাঁর বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে না পারে।
কিন্তু এই সিদ্ধান্ত বেশ কিছু দিক থেকে ভুল, কারণ দাওয়াতের শুরুতেই নবীজি ﷺ-কে সুন্দরী নারী, মক্কার হুকুমত বা নেতৃত্ব, সম্পদের পাহাড়, সবকিছুই
কাফেররা নবীজির কাছে এসে বলে:
إِنْ كُنْتَ إِنَّمَا تُرِيدُ بِمَا جِئْتَ بِهِ مِنْ هَذَا الْأَمْرِ مَالًا جَمَعْنَا لَكَ مِنْ أَمْوَالِنَا حَتَّى تَكُونَ أَكْثَرَنَا مَالًا
তুমি যদি এই দাওয়াতের মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করতে চাও, তাহলে আমরা আমাদের সম্পদ একত্র করে তোমাকে দেব, যাতে তুমি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী হয়ে যাও।
وَإِنْ كُنْتَ تُرِيدُ بِهِ شَرَفًا سَوَّدْنَاكَ عَلَيْنَا
তুমি যদি সম্মান ও নেতৃত্ব চাও, তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের নেতা বানিয়ে দেব।
এমনকি বলা হয়েছিল, তোমার সিদ্ধান্তের বাইরে আমরা কোনো সিদ্ধান্ত নেব না।
وَإِنْ كُنْتَ تُرِيدُ بِهِ مُلْكًا مَلَّكْنَاكَ عَلَيْنَا
তুমি যদি রাজত্ব চাও, তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের রাজা বানিয়ে দেব।
طَلَبْنَا لَكَ الطِّبَّ، وَبَذَلْنَا فِيهِ أَمْوَالَنَا حَتَّى نُبْرِئَكَ مِنْهُ
তোমার কাছে যা আসছে, তা যদি এমন কোনো অদৃশ্য সত্তার প্রভাব হয়, যা তুমি প্রতিরোধ করতে পারছ না, তাহলে আমরা তোমার জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করব এবং তোমাকে সুস্থ করার জন্য আমাদের সম্পদ ব্যয় করব।
وَإِنْ كَانَ يُرِيدُ زَوْجَةً زَوَّجْنَاهُ بِأَحْسَنِ فَتَاةٍ فِي مَكَّةَ
আর তিনি যদি স্ত্রী চান, তাহলে আমরা তাঁকে মক্কার সবচেয়ে সুন্দরী তরুণীকে বিয়ে দেব।[23]السيرة النبوية (ابن هشام) – 1/293 – সনদ মুনতাকি
(ভিন্ন ঘটনা, একই উদ্দেশ্য) তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন:
“হে আমার চাচা! আল্লাহর শপথ! তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চাঁদও এনে দেয়, এই শর্তে যে আমি এই দাওয়াতের কাজ ছেড়ে দেব, যতক্ষণ না আল্লাহ একে বিজয়ী করেন অথবা এই পথে আমি ধ্বংস হয়ে যাই, তবুও আমি তা ছাড়ব না।”[24]সিলসিলাতুল আহাদীস আদ-দাঈফাহ, হাদিস নং ৯০৯, সনদ মুনতাকি
তাখরিজ: দুইটি বর্ণনার রাবীগণ বিশ্বস্ত ও সত্যবাদি। ইবন আবি শাইবাহ, আবদ ইবনু হুমাইদ, আবু ইয়ালা, আল-হাকিম (যিনি বর্ণনাটিকে সহিহ বলেছেন), ইবনু মারদাওয়াইহ, আবু নুআইম এবং আল-বায়হাকি (উভয়েই আদ-দালায়িল গ্রন্থে) ও ইবনু আসাকির, জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন।
অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে, রাসুল ﷺ যদি নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিষ্ঠার জন্য এসব ভয়ভীতি বা শাস্তির বিধান প্রচার করে থাকতেন, তবে তাঁর সামনে তো মক্কার নেতৃত্ব ও রাজত্ব বিনা যুদ্ধেই থালা সাজিয়ে দেওয়া হয়েছিল!
কুরাইশরা স্পষ্ট অফার করেছিল, “আমরা তোমাকে আমাদের রাজা বা সর্বোচ্চ নেতা বানিয়ে নেব এবং তোমার নির্দেশ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেব না।”
অন্যদিকে, একজন ক্ষমতা বা নেতৃত্বলোভী ব্যক্তি কখনো সেই ক্ষমতা স্বেচ্ছায় ফিরিয়ে দিয়ে সামাজিক বয়কট এবং নানান মানসিক-শারীরিক যন্ত্রণা বেছে নিতেন না। অথচ তিনি এগুলো আগে থেকেই জানতেন, যেটা তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে তাঁকে নির্যাতন করা হবে, দেশ থেকে বিতাড়িত করা হবে। এরপরও তিনি আল্লাহর দেওয়া কালাম প্রচার করেছেন হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন উক্ত পসিবিলিটি সব গুলিই ভুল।
কুরআনে আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ
সূরা আল-মায়িদা, ৫:৬৭-এর অংশবিশেষ।
হে রাসূল! আপনার রবের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে, তা পৌঁছে দিন। আর যদি আপনি তা না করেন, তবে আপনি তাঁর রিসালাত পৌঁছে দিলেন না।
একইভাবে কুরআন নবীজিকে আরও অনেক ভাবেই উপস্থাপন করেছে
যেমন,
১.সাক্ষী হিসেবে প্রেরণ
সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪৫
২.সুসংবাদ প্রদান
সূরা আল-বাকারা ২:১১৯
৩.সতর্ক করা
সূরা আল-বাকারা ২:১১৯
৪.আল্লাহর দিকে আহ্বান করা
সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪৬
৫.উজ্জ্বল প্রদীপ হওয়া
সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪৬
৬.সমগ্র জগতের জন্য রহমত হওয়া
সূরা আল-আম্বিয়া ২১:১০৭
৭.আল্লাহর আয়াত তিলাওয়াত করা
সূরা আল-জুমুআ ৬২:২
৮.মানুষকে পবিত্র করা
সূরা আল-জুমুআ ৬২:২
৯.কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেওয়া
সূরা আল-জুমুআ ৬২:২
১০.আল্লাহর ওহি পৌঁছে দেওয়া
সূরা আল-মায়িদা ৫:৬৭
১১.সমগ্র মানবজাতির কাছে প্রেরিত হওয়া
সূরা সাবা ৩৪:২৮
একবার চিন্তা করুন, কুরাইশদের এই প্রস্তাব গ্রহণ করলেই তিনি মক্কার নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যেতেন। কিন্তু তিনি তা বিনাবাক্যে প্রত্যাখ্যান করে চরম নির্যাতন ও সামাজিক বয়কটের শিকার হওয়া বেছে নেন।সুতরাং, ভয় দেখিয়ে ক্ষমতা দখল বা নিজের আধিপত্য বিস্তারের যে অভিযোগ নাস্তিকরা করে, তা পুরোপুরি কাল্পনিক ও অবাস্তব।
আরেকটি বিশুদ্ধ হাদিস যাকে আলবানী (রহ) হাসান বলেছেন সেখানে বর্ণিত হয়েছে,
কুরাইশরা আবু তালিবের কাছে এসে বলল,
‘আপনি কি দেখছেন না, আহমদ আমাদের সভাস্থলে ও আমাদের মসজিদে আমাদের কষ্ট দিচ্ছেন? তাঁকে আমাদের কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত রাখুন।’
তখন আবু তালিব বললেন, ‘হে আকীল, মুহাম্মদকে আমার কাছে নিয়ে এসো।’
আমি গিয়ে তাঁকে নিয়ে এলাম। আবু তালিব বললেন, ‘হে আমার ভাতিজা! তোমার চাচাতো ভাইয়েরা দাবি করছে যে, তুমি তাদের সভাস্থলে ও মসজিদে তাদের কষ্ট দিচ্ছ। সুতরাং তুমি তা থেকে বিরত থাকো।’
তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ আকাশের দিকে দৃষ্টি তুললেন। অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকালেন। এরপর বললেন:
«ما أنا بأقدر على أن أدع لكم ذلك، على أن تُشعلوا لي منها شُعلةً يعني الشمسَ»
“তোমরা সূর্য থেকে একটি আগুনের শিখা জ্বালিয়ে এনে দিলেও, তোমাদের জন্য আমি এ কাজ ছেড়ে দিতে পারব না।”
তখন আবু তালিব বললেন, ‘আমার ভাতিজা মিথ্যা বলেনি। তোমরা ফিরে যাও।’”[25]আবু জা‘ফর আল-বুখতারি হাদিসু আবিল ফাদল আহমদ ইবন মুলা‘ইব (৪৭/১–২) এবং ইবন আসাকির (১/১১/৩৬৩; ১৯/৪৪/২০১)-এ আবু ইয়া‘লা প্রমুখের সূত্রে
তাহকিক: শায়খ আলবানী সিলসিলাতুল আহাদীস আস-সহীহাহ (১/১৯৫, হাদিস নং ৯২)-এ বলেছেন: “এই সনদটি হাসান। এর সব বর্ণনাকারী সহিহ মুসলিমের রাবি। ইউনুস ইবন বুকাইর ও তালহা ইবন ইয়াহইয়ার ব্যাপারে কিছু আলোচনা রয়েছে, তবে তা ক্ষতিকর নয়।”
আরেক হাদিসে খাব্বাব ইবনুল আরাত (রা.) বলেন:
شكونا إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم وهو متوسد بردة له في ظل الكعبة، فقلنا: ألا تستنصر لنا؟ ألا تدعو الله لنا؟
আমরা কাবার ছায়ায় চাদরকে বালিশ বানিয়ে শুয়ে থাকা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে আমাদের নির্যাতনের অভিযোগ করলাম। আমরা বললাম, “আপনি কি আমাদের জন্য আল্লাহর সাহায্য চাইবেন না? আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন না?”
তখন তিনি বললেন:
قد كان من قبلكم يؤخذ الرجل فيحفر له في الأرض، فيجعل فيها، فيجاء بالمنشار فيوضع على رأسه فيجعل نصفين، ويمشط بأمشاط الحديد ما دون لحمه وعظمه، فما يصده ذلك عن دينه…
“তোমাদের আগে এমন লোক ছিল, যাদের ধরে মাটিতে গর্ত খুঁড়ে তাতে বসানো হতো। তারপর করাত এনে তার মাথায় বসিয়ে তাকে দুই টুকরো করে ফেলা হতো। লোহার চিরুনি দিয়ে তার গোশত ও হাড়ের মধ্যবর্তী অংশ ছিঁড়ে ফেলা হতো। এত নির্যাতনও তাকে তার দ্বীন থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারত না।”
এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
والله ليتمن هذا الأمر…
“আল্লাহর শপথ! আল্লাহ অবশ্যই এই দ্বীনকে পূর্ণতা দেবেন…”[26]সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৯৪৩
রাসুলুল্লাহর ত্যাগ, দুঃখ, কষ্ট, দ্বীনের জন্য অক্লান্ত প্রচেষ্টা ইত্যাদি সংক্রান্ত অসংখ্যা দলিলাদি আমাদের নিকট রয়েছে, তিনি বলতেন, আমার কাছে উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকলেও তা আমার কাছে তিন দিন পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকুক—এটা আমি পছন্দ করব না,[27]সহিহ বুখারি, ৬৪৪৪ মুহাম্মদ ﷺ-এর পরিবার তাঁর ইন্তেকাল পর্যন্ত কখনো টানা তিন দিন গমের রুটি পেট ভরে খেতে পারেনি,[28]সহিহ বুখারি, ৬৪৫৪ ঘরে কখনো টানা দুই মাস চুলা জ্বলত না, খাবার হতো খেজুর ও পানি,[29]সহীহ বুখারী, ৬৪৫৮ ইন্তেকালের সময় তাঁর বর্ম একজন ইহুদির কাছে বন্ধক ছিল।[30]সহিহ বুখারি, ২৯১৬ এমন আরো অগণিত বিষয়াদি উল্লেখ করা সম্ভব। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর সাথে রাসুলের একটি ঘটনা উল্লেখ করে এই সংক্রান্ত বিষয়ের দলিলাদির ইতি টানছি,
ইবন আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, একবার উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে প্রবেশ করলেন। তিনি তাঁকে একটি খেজুরপাতার পাটির ওপর শুয়ে থাকতে দেখলেন। পাটির ওপর কোনো বিছানা ছিল না; সেটি তাঁর শরীরে দাগ ফেলে দিয়েছিল। তাঁর মাথার নিচে ছিল খেজুরের আঁশে ভর্তি চামড়ার বালিশ।
উমর (রা.) ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সেখানে সামান্য কিছু যব ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো আসবাবপত্র বা সম্পদ নেই। এ অবস্থা দেখে তিনি কেঁদে ফেললেন। রাসুলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন তুমি কেন কাঁদছ? তখন তিনি বললেন:
«يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّ كِسْرَى وَقَيْصَرَ فِيمَا هُمَا فِيهِ، وَأَنْتَ رَسُولُ اللَّهِ»
“হে আল্লাহর রাসূল! কিসরা ও কায়সার পার্থিব ভোগ-বিলাসের মধ্যে ডুবে আছে, অথচ আপনি আল্লাহর রাসূল।!”
তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন:
«أَمَا تَرْضَى أَنْ تَكُونَ لَهُمُ الدُّنْيَا وَلَنَا الْآخِرَةُ؟»
“তুমি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তারা দুনিয়া লাভ করুক, আর আমরা আখিরাত লাভ করি?”[31]সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯১৩
যিনি নিজের জীবনের আরাম-আয়েশ, মক্কার নেতৃত্ব ও অফুরন্ত সম্পদ ত্যাগ করে দীর্ঘ ১৩ বছর বয়কট, সামাজিক অবরুদ্ধতা, পাথরের আঘাত এবং নিজ শহর থেকে বহিষ্কারের শিকার হলেন, তিনি কীভাবে নিজের তৈরি কোনো গ্রন্থে নিজের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে কঠোর শাস্তির হুমকি বা ভুলত্রুটির তিরস্কার যুক্ত করবেন? কেন নিজের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে, নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোরআনের আয়াত তৈরী করবেন? লোভী বা ক্ষমতার পূজারিরা কখনো নিজের জন্য ক্ষমতার পথ কঠিন করে না, বরং নিজেদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বা ছাড়ের বিধান রাখে।
যদি নবীজির মূল উদ্দেশ্য হয়ে থাকে ভয় দেখিয়ে মানুষের মুখ বন্ধ করা, যাতে কেউ তাঁর সমালোচনা করার বা তাঁর বিরুদ্ধে কোনো কথা বলার সাহস না পায়, তবে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আচরণ এমন হওয়ার কথা ছিল যে, সামান্যতম সমালোচনা করলেই কাউকে চাবুক মারা হবে, দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।
বুখারি ও মুসলিম শরিফের বিশুদ্ধ হাদিসে এসেছে, এক বেদুইন মসজিদে নববীতে পেশাব করে দিয়েছিল। সাহাবিরা তাকে মারতে উদ্যত হলে নবীজি তাঁদের থামিয়ে দেন এবং তাকে শান্ত করে বিষয়টি বুঝিয়ে বলেন।[32]সহিহ বুখারী, ২১৯ যদি ভয় দেখিয়ে মুখ বা আচরণ বন্ধ করাই উদ্দেশ্য হতো, তবে সেই বেদুইনকে কঠোর শাস্তি দিয়ে জনসমক্ষে উদাহরণ তৈরি করা হতো।
বুখারির অন্য একটি বিখ্যাত হাদিসে এসেছে, এক ইহুদি নবীজিকে সালাম দেওয়ার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে বলেছিল “আস-সামু আলাইকা” (মৃত্যু হোক তোমার ওপর)। হযরত আয়েশা (রা.) তখন চটে গিয়ে এর কঠোর প্রতিবাদ করেন। কিন্তু নবীজি আয়েশা (রা.)-কে শান্ত করে বলেন, “হে আয়েশা, আল্লাহ নম্রতা পছন্দ করেন।”[33]সহীহ বুখারী, ৬০২৪
যদি ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করাই উদ্দেশ্য হতো, তবে নবীজি সামান্য কটূক্তি বা কটাক্ষ সহ্য করতেন না এবং বিরোধিতাকারীদের তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর শাস্তি দিতেন। হাদিসের এই দলিলগুলো প্রমাণ করে যে, তাঁর উদ্দেশ্য ভীতি প্রদর্শন ছিল না, বরং ছিল ধৈর্য, সহনশীলতা ও ইনসাফ।
যদি ভয় দেখিয়ে মানুষের বিরোধিতাকে দমন করা রাজনৈতিক কৌশল হতো, তবে মদিনার ভেতরে যারা গোপনে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত এবং নবীজির ব্যক্তিগত সমালোচনা করত (যাদের ‘মুনাফিক’ বলা হয়), তাদের তালিকা প্রকাশ করে জনসমক্ষে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা হতো, যাতে আর কেউ কথা বলার সাহস না পায়।
অথচ মদিনার মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুল প্রকাশ্যে ও গোপনে নবীজির বিরুদ্ধে নানাবিধ কুৎসা রটাত এবং অপমানজনক কথা বলত। একবার মুজাহির ও আনসারদের মাঝে ঘটা ছোট একটি বিতর্কের কথা তার কানে গেলে সে বলেছিল, “আচ্ছা, মুহাজিররা এমন কাজ করেছে? ’’আল্লাহর কসম! আমরা মদিনা্য় ফিরলে সেখান থেকে প্রবল লোকেরা দুর্বল লোকেদেরকে অবশ্যই বের করে দিবে।’ এ কথা নবী ﷺ-এর কাছে পৌঁছল। তখন ’উমার (রাঃ) উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে অনুমতি দিন। আমি এক্ষুণি এ মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিচ্ছি। নবী ﷺ বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। ভবিষ্যতে যাতে কেউ এ কথা বলতে না পারে যে, মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর সঙ্গী-সাথীদেরকে হত্যা করেন।[34]সহীহ বুখারি, ৪৯০৫
এমনকি নবীজি মুনাফিকদের সুনির্দিষ্ট তালিকা কেবল তাঁর বিশ্বস্ত সাহাবি হযরত হুযাইফা বিন ইয়ামান (রা.)-কে বলে দিয়েছিলেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভীতি বা মুখ বন্ধ করার জন্য তা কখনো প্রকাশ করেননি।[35]সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৭৪২–৩৭৪৩; ফাতহুল বারি, সংশ্লিষ্ট হাদিসের ব্যাখ্যা
ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করার উদ্দেশ্য থাকলে নবীজি মুনাফিকদের সেই তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করে চরম ত্রাস সৃষ্টি করতেন। কিন্তু তিনি তা না করে চরম ধৈর্য ও উদারতা প্রদর্শন করেছেন, যা নাস্তিকদের দাবির ঠিক উল্টো প্রমাণ দেয়।
শাস্তিগুলো যদি রাজনৈতিক ভীতি ছড়ানোর হাতিয়ার হতো, তবে তা বিচারবহির্ভূতভাবে এবং ইচ্ছামতো ব্যবহার করা যেত। কিন্তু হাদিসে শাস্তির ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিরমিজি শরিফের একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
“যতদূর সম্ভব মুসলিমদের ওপর থেকে শাস্তি (হুদুদ) দূর করো (সন্দেহ থাকলে শাস্তি দিয়ো না)। কারণ, ইমামের ভুল ক্ষমা করার ক্ষেত্রে ভুল করা, শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে ভুল করার চেয়ে উত্তম।”[36]আত-তিরমিযি, হাদিস ১৪২৪, সনদ যয়িফ
অন্য এক হাদিসে তিনি বলেন, (একাদিক সনদে, একাধিক সাহাবি হতে)
«ادْرَؤُوا الْحُدُودَ بِالشُّبُهَاتِ»
“সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে শাস্তি বাতিল করে দাও।”[37]ইমাম শাওকানি (রহ.) আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত হাদিসকে সহিহ বলেছেন – নাইলুল আওতার ৭/১২৩; শেখ বিন বায (রহ) এটিকে হাসান লি গাইরিহি বলেছেন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবন বায, ২৫/২৬৩; ইমাম আয-যুরকানি (রহ)-ও একই কথা বলেছেন মুখতাসারুল মাকাসিদ, পৃষ্ঠা ৪২; মুহাম্মদ জারুল্লাহ আস-সা‘দি (রহ.)-ও একই কথা বলেছেন আন-নাওয়াফিহুল ‘আতিরাহ, পৃ. ২৫
অতএব ভীতি তৈরি করাই যদি মূল লক্ষ্য হতো, তবে নবীজি কখনোই বিচারক বা শাসকদের “সন্দেহ পেলেই শাস্তি কমিয়ে দিতে বা বাতিল করতে” নির্দেশ দিতেন না। ভীতি সৃষ্টির হাতিয়ারে তো সন্দেহ থাকলেই বরং আরও কঠোরভাবে শাস্তি কার্যকর করার কথা।
যদি নবীজির মূল উদ্দেশ্য হতো ভয় দেখিয়ে মানুষের মুখ বন্ধ করা এবং কোনো ধরনের বিরোধিতা বা প্রশ্ন করার পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দেওয়া, তবে তাঁর মজলিসে বা সাধারণ জনসমক্ষে কেউ কখনো সাহসিকতার সঙ্গে আপত্তি জানানোর, সরাসরি প্রশ্ন করার বা তর্কে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ পেত না।
বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, একবার এক বেদুইন মসজিদে নববীতে এসে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চাদর এত জোরে টেনে ধরেছিল, আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বলেন, আমি দেখলাম, জোরে টানার কারণে নবী ﷺ-এর স্কন্ধে চাদরের পাড়ের দাগ বসে গেছে। অতঃপর বেদুঈন বলল, ‘আল্লাহর যে সম্পদ আপনার নিকট আছে তা হতে আমাকে কিছু দেয়ার আদেশ দিন।’ আল্লাহর রাসূল ﷺ তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিলেন, আর তাকে কিছু দেয়ার আদেশ দিলেন।[38]সহিহ বুখারি: ৩১৪৯
যদি ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করাই উদ্দেশ্য হতো, তবে নিজের ওপর এমন শারীরিক আস্ফালন ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শনের পর সেই বেদুইনের রক্ষা পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু নবীজি মুচকি হেসে তাকে মাল দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করার রাজনীতি থাকলে সাধারণ কোনো গ্রাম্য বেদুইন জনসমক্ষে নবীজির সঙ্গে এমন আচরণ করার দুঃসাহস পেত না এবং সঙ্গে সঙ্গেই তাকে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা হতো।
অনেকে বলে, রাসুল ﷺ মক্কায় এই বিধানগুলো কার্যকর করতে পারেননি।
যদি মদিনায় শক্তি অর্জনের পর উদ্দেশ্য আগ্রাসী হওয়া বা চারপাশ দখল করা হতো, তবে মদিনায় ক্ষমতা ও জনবল বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আশপাশের শান্ত ও স্বাধীন জনপদগুলোর ওপর বিনা উসকানিতে আক্রমণ চালিয়ে নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করা হতো।
মদিনার প্রথম দিকের যুদ্ধগুলো (যেমন বদর, উহুদ, খন্দক) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলোর একটিও নবীজির পক্ষ থেকে আগ্রাসী আক্রমণ ছিল না। বদরের যুদ্ধ হয়েছিল কুরাইশদের বাণিজ্যিক কাফেলাকে রক্ষার সূত্রে মক্কার কাফিরদের সশস্ত্র অভিযানের জবাবে, এ ছাড়াও
যেমন IslamQA-তে বলা হয়েছে:
«وإنما خرج هو والصحابة الكرام رضوان الله عليهم ليستردوا بعض ما نهبه كفار قريش منهم في مكة، من خلال اعتراض قافلة من القوافل التجارية المحملة بالبضائع والأموال لقريش».
“বরং তিনি ও সম্মানিত সাহাবিরা মক্কায় কুরাইশ কাফিররা তাঁদের কাছ থেকে যে সম্পদ লুট করে নিয়েছিল, তার কিছু অংশ পুনরুদ্ধারের জন্য কুরাইশদের পণ্য ও অর্থবাহী বাণিজ্যিক কাফেলাগুলোর একটি আটকাতে বের হয়েছিলেন।”
এ ছাড়াও বদরের যুদ্ধের আগে কুরাইশদের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগগুলো হলো: মুসলিমদের নির্যাতন করা, তাদের ইসলাম থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা, মুসলিমদের মক্কা থেকে বিতাড়িত করা, বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের বিরুদ্ধে সামাজিক-অর্থনৈতিক বয়কট চালানো, মসজিদুল হারামে প্রবেশ ও আল্লাহর পথে চলতে বাধা দেওয়া।
উহুদ এবং খন্দক (আহযাব) যুদ্ধগুলো ছিল কুরাইশ ও আরব গোত্রগুলোর সম্মিলিত বাহিনী কর্তৃক মদিনা আক্রমণের বিরুদ্ধে নিছক আত্মরক্ষা। খন্দক যুদ্ধে তো খোদ মদিনা শহরকে রক্ষা করার জন্য মদিনার চারপাশে পরিখা খনন করা হয়েছিল। যদি তিনি আগ্রাসী হতেন, তবে ঘরের ভেতরে বসে পরিখা খনন করে আত্মরক্ষার কৌশল নিতেন না, বরং বাইরে গিয়ে আক্রমণ করতেন।
যদি মদিনায় গিয়ে ক্ষমতা পাওয়ার জন্যই নবীজি এই আইনগুলোর ওপর ভর করে থাকেন এবং এগুলোকে ভীতি প্রদর্শনের হাতিয়ার বানিয়ে থাকেন, তবে মদিনার রাষ্ট্রে যখনই কোনো অপরাধ সংঘটিত হতো, তখনই সাধারণ মানুষ বা বিরোধীদের ওপর অত্যন্ত নির্মম ও বিচারবহির্ভূত শাস্তি নেমে আসার কথা ছিল।
মদিনায় হুদুদ বা শাস্তির বিধান কার্যকর হওয়ার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এটি কোনো ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা ক্ষমতার আস্ফালন ছিল না। বরং অপরাধ প্রমাণ হওয়ার পর অত্যন্ত কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তা কার্যকর করা হতো।
উদাহরণস্বরূপ, মাখজুম গোত্রের এক নারী চুরির অপরাধ করার পর সাহাবিরা সুপারিশ নিয়ে গেলে নবীজি অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে বলেছিলেন, “পূর্বের জাতিগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে, কারণ তারা সাধারণ মানুষের বেলায় আইন প্রয়োগ করত আর প্রভাবশালীরা অপরাধ করলে ছেড়ে দিত। আল্লাহর কসম! যদি আমার মেয়ে ফাতেমাও চুরি করত, তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম।”[39]সহিহ বুখারি, ৩৪৭৫
উসামা (রা.) সুপারিশ করলে রাসুলুল্লাহ ﷺ অসন্তুষ্ট হন এবং বলেন:
«أَتَشْفَعُ فِي حَدٍّ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ؟»
অর্থ: “তুমি কি আল্লাহর নির্ধারিত দণ্ডের ব্যাপারে সুপারিশ করছ?”
এরপর তিনি ঘোষণা করেন:
«وَايْمُ اللَّهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا»
অর্থ: “আল্লাহর শপথ! মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করত, তবে আমি অবশ্যই তার হাত কাটতাম।”
এরপর ওই নারীর ওপর চুরির দণ্ড কার্যকর করা হয়।[40]সূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৭৫, ৪৩০৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৮৮।
এই ঘটনা থেকে কী বোঝা যাচ্ছে?
উসামা (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রিয় সাহাবি, কিন্তু তাঁর সুপারিশ গ্রহণ করা হয়নি। অপরাধী নারীকে সামাজিক মর্যাদার কারণে দণ্ড থেকে রেহাই দেওয়া হয়নি।
ফাতিমা (রা.)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে আইনের সমান প্রয়োগের নীতি বোঝাতে; ফাতিমা (রা.) নিজে কোনো অপরাধ করেননি এবং তাঁকে এই কারণে শাস্তিও দেওয়া হয়নি।
ক্ষমতা পাওয়ার পর যদি নিজের আধিপত্য টিকিয়ে রাখাই উদ্দেশ্য হতো, তবে স্বজনপ্রীতি বা গোত্রীয় প্রভাবকে প্রশ্রয় দেওয়া হতো অথবা নিজের রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর এই আইনগুলো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু নবীজি নিজের পরিবারের ক্ষেত্রেও আইনকে সমানভাবে প্রয়োগ করেছেন।
মায়িয ইবনু মালিক (ماعز بن مالك)-এর ব্যভিচারের দণ্ড, তিনি অবৈধ যৌনসম্পর্কের কথা স্বীকার করেছিলেন।
রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর স্বীকারোক্তি যাচাই করার পর তাঁকে পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দেন।[41]সূত্র: সহিহ মুসলিমে ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে। মিশকাতুল মাসাবিহের ৩৫৬৬ নম্বর হাদিসেও এর বিবরণ আছে।
যদি আইনগুলোর উদ্দেশ্য নিছক ভয় দেখানো বা দমনপীড়ন হতো, তবে তো মক্কা ও মদিনা উভয় স্থানেই আইনের প্রয়োগের পদ্ধতি এক ও অভিন্ন হওয়ার কথা ছিল এবং মক্কার দুর্বল মুসলিমদের ওপর যখন অত্যাচার হচ্ছিল, তখন তাদের রক্ষার জন্য শাস্তির বিধান প্রয়োগ করা হতো।
মক্কার যুগে মুসলমানরা ছিল দুর্বল, নিপীড়িত এবং সংখ্যায় কম। সেখানে তাদের নিজস্ব কোনো রাষ্ট্র বা ভূখণ্ড ছিল না। তাই সেখানে দণ্ডবিধি বা হুদুদ (যা বাস্তবায়নের জন্য একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থা প্রয়োজন) কার্যকর করার কোনো অবকাঠামোই ছিল না।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং অপরাধবিজ্ঞানের মূলনীতি অনুযায়ী, যেকোনো দেশের আইন বা দণ্ডবিধি (Penal Code) বাস্তবায়নের জন্য একটি সার্বভৌম ক্ষমতার (Sovereignty) প্রয়োজন হয়। মদিনা সনদ স্বাক্ষরের মাধ্যমে যখন প্রথম ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো, কেবল তখনই সমাজ থেকে অপরাধ (যেমন চুরি, খুন, রাহাজানি) নির্মূল করার জন্য আইনগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্র তৈরি হলো। ঠিক যেমন বর্তমানকালেও কোনো দেশে নতুন আইন বা সংবিধান পাস হলে তা কার্যকর করার জন্য নির্দিষ্ট প্রশাসনিক এখতিয়ার বা রাষ্ট্রক্ষমতা লাগে। রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত না থাকায় মক্কায় হুদুদ বা দণ্ডবিধি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি, এটি সাধারণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নিয়ম। এটাকে যারা “মক্কায় করতে পারেনি, তাই মদিনায় গিয়ে মারধর শুরু করেছে” বলে চালিয়ে দেয়, তারা হয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বোঝে না, অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বাটপারি বা অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে। তবুও মক্কায় কিছু হুকুম, নিয়ম-নিষেধ ছিল, যা ইমাম বায়হাকি তাঁর কিতাবে আলোচনা করেছেন।
এ ছাড়াও কুরআনের অনেক আয়াত তাঁর ﷺ নবুয়তের প্রমাণ। ইসলামের প্রাথমিক যুগে এক অন্ধ সাহাবি (আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম) রাসূল (সা.)-এর কাছে আসার পর তিনি কুরাইশ নেতাদের ইসলামে আকর্ষণের চেষ্টায় ব্যস্ত থাকায় তাঁকে কিছুটা উপেক্ষা করেছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে কুরআনে সরাসরি তাঁর সমালোচনা করা হয়:
“সে ভ্রূকুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল, কারণ তার কাছে এক অন্ধ ব্যক্তি এসেছে।” (সূরা আবাসা, আয়াত ১-২)
কোনো ব্যক্তি যদি নিজের মাহাত্ম্য প্রচার বা নিজের বিরুদ্ধে কথা বলা রোধ করার উদ্দেশ্যে গ্রন্থ রচনা করতেন, তবে তিনি সাধারণ মানুষের সামনে নিজের ছোটখাটো ভুলের এমন প্রকাশ্য ও স্থায়ী সমালোচনা নিজের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করতেন না।
এমনই আরো ঘটনা রয়েছে, যেমন একটি ঘটনা রয়েছে, ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত,
حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ الْقَاسِمِ بْنِ عَطِيَّةَ، حَدَّثَنِي أَحْمَدُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ الدَّشْتَكِيُّ، حَدَّثَنِي أَبِي، عَنْ أَبِيهِ، ثَنَا الْأَشْعَثُ بْنُ إِسْحَاقَ، عَنْ جَعْفَرِ بْنِ أَبِي الْمُغِيرَةِ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ، أَنَّهُ كَانَ يَأْمُرُ بِأَلَّا يُصَدَّقَ إِلَّا عَلَى أَهْلِ الْإِسْلَامِ، حَتَّى نَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ: ﴿لَيْسَ عَلَيْكَ هُدَاهُمْ﴾ إِلَى آخِرِهَا، فَأَمَرَ بِالصَّدَقَةِ بَعْدَهَا عَلَى كُلِّ مَنْ سَأَلَكَ مِنْ كُلِّ دِينٍ.
নবী ﷺ প্রথমে নির্দেশ দিতেন, যেন কেবল মুসলিমদেরই সদকা দেওয়া হয়। এরপর যখন এই আয়াত নাজিল হলো— “তাদের সৎপথে পরিচালিত করার দায়িত্ব তোমার নয়” (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭২)—আয়াতের শেষ পর্যন্ত, তখন তিনি নির্দেশ দিলেন, এরপর থেকে যে কোনো ধর্মের মানুষ তোমার কাছে সদকা চাইলে তাকে সদকা দিতে।[42]শাইখ আলবানী (রহ.) সনদটিকে হাসান বলেছেন, আস-সিলসিলাতুস সহীহাহ, ৬/৬২৯
এই আপত্তিকারীর প্রশ্নটির দিকে লক্ষ করুন:
“৭ম শতাব্দীর আরবে এভাবে শাস্তি দেওয়াটা পেইনফুল একটা প্রসেস ছিল, তাই এভাবে তাদের ভয় দেখানো হয়েছে, যেন কেউ উনার বিরুদ্ধে কিছু দাবি না করে (নাউজুবিল্লাহ)।”
যদি নবীজির উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তৎকালীন শাস্তির প্রক্রিয়া ব্যবহার করে মানুষের মনে ভয় ঢুকানো, যাতে কেউ তাঁর বিরুদ্ধে কোনো দাবি বা প্রতিবাদ করতে না পারে, তাঁর নারী, সম্পদ, নেতৃত্ব লাভের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে?
তাহলে মক্কা ও মদিনার পুরো জীবনজুড়ে এবং নবুয়তের একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কাফির, মুনাফিক ও বিরোধীরা তাঁর চরম বিরোধিতা করতে পারত না। মদিনার মুনাফিকদের সর্দার আবদুল্লাহ ইবন উবাই প্রকাশ্যে এবং গোপনে নবীজির বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র ও বিরোধিতা করে গেছে, অথচ তাকে সেই কথিত “ভয় দেখিয়ে দমন” করা হয়নি। কুরাইশদের বড় বড় নেতারা (যেমন আবু লাহাব, আবু জেহেল) আজীবন তাঁর বিরোধিতা করে গেছে। এমনকি মক্কা বিজয়ের পরও অনেক শত্রু ক্ষমা পেয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করেছে।
যদি শাস্তিগুলো নবীজির নিজস্ব ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার বা বিরোধীদের শায়েস্তা করার রাজনৈতিক হাতিয়ার হতো, তবে সেই শাস্তিগুলো সাধারণ নিরীহ মানুষ, বিরোধিতাকারী বা সমালোচকদের ওপর যত্রতত্র প্রযুক্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইসলামে শাস্তির বিধান (যেমন: চোরাই মাল চুরির ক্ষেত্রে হাত কাটা, ব্যভিচারের শাস্তি কিংবা ডাকাতদের শাস্তি) কেবল নির্দিষ্ট কিছু সামাজিক অপরাধ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী যালেম, চোর ও ডাকাতদের জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে। সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং মানুষের জীবন-সম্পদের নিরাপত্তা দিতে যেকোনো রাষ্ট্রেই সুনির্দিষ্ট অপরাধের জন্য কঠোর আইনের প্রয়োজন হয়।
অতএব অপরাধ দমন এবং নির্দোষ মানুষের অধিকার সুরক্ষার জন্য প্রবর্তিত এই আইনগুলোকে “নবীজির ব্যক্তিগত ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার ভীতি প্রদর্শন” বলা চরম মানসিক হীনম্মন্যতা ও অন্ধত্বের বহিঃপ্রকাশ। যদি আইনগুলো ভয় দেখানোর জন্যই হতো, তবে তা নির্দোষ সমালোচকদের দমনে সবার আগে ব্যবহার করা হতো, অপরাধীদের দমনে নয়।
যদি শাস্তিগুলোর উদ্দেশ্য হতো নিজের বিরোধিতাকারীদের শায়েস্তা করা বা নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে পাকাপোক্ত করা, তবে তো ইসলামের বিচারব্যবস্থা কখনোই নিজের পরিবার বা স্বজনদের জন্য কঠিন হতে পারত না। ইসলাম তো অপরাধের ক্ষেত্রে এমন এক আপসহীন ও নিখুঁত ন্যায়বিচারের মাপকাঠি স্থাপন করেছে, যেখানে স্বয়ং নবীজি ঘোষণা করেছিলেন যে, তাঁর নিজের কন্যা ফাতেমা (রা.)-ও যদি চুরি করতেন, তবে তিনি তাঁর হাত কেটে দিতেন। এখানে নবীজির সত্যতাই প্রমাণ হয়, কারণ সবার জন্যই সমান আইন তিনি প্রয়োগ করেছেন।
অতএব তাদের জিজ্ঞাসা করুন, ‘হে ইসলামবিদ্বেষী গাধারা! এবার আমাদের বুঝিয়ে বলো, সপ্তম শতাব্দীর একজন নিরক্ষর ব্যক্তি, যিনি একটি বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে বসবাস করতেন, কীভাবে এমন একটি তথ্য জানলেন, যা ঐতিহাসিক ও প্রাচ্যবিদদেরও অজানা ছিল? তিনি কেন সেই শান-শওকত ছেড়ে নির্যাতন-নিপীড়নের জীবন বেছে নিলেন?’
ফেরাউনের শূলে চড়িয়ে হত্যা করা কি জুলুম, অথচ কুরআন ৫:৩৩-এ একই ধরনের শাস্তি ন্যায়বিচার?
আপনার এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ, তবে কিছু ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে।
ফেরাউন মূসা (আ.)-এর জাদুকরদের ঈমান গ্রহণের পর তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে খেজুরগাছের কাণ্ডে শূলে চড়ানোর হুমকি দিয়েছিল (সূরা ত্বহা ২০:৭১)।
আপনার মতে, কুরআন এই ঘটনাকে ফেরাউনের অত্যাচারী শাসনের প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করেছে।
অন্যদিকে, সূরা মায়িদা ৫:৩৩-এ আল্লাহ কিছু অপরাধের শাস্তি হিসেবে হত্যা, শূলে চড়ানো, বিপরীত দিক থেকে হাত-পা কেটে ফেলা কিংবা নির্বাসনের কথা উল্লেখ করেছেন।
এখানেই আপনার প্রশ্নটি হলো: একই ধরনের শাস্তি এক পরিস্থিতিতে জুলুম, অথচ অন্য পরিস্থিতিতে ন্যায়বিচার হতে পারে, এই পার্থক্যের নৈতিক ভিত্তি কী?
শাস্তির পদ্ধতি কি নিজেই অন্যায় বা অবিচার, নাকি শাস্তির নৈতিক মূল্যায়ন নির্ভর করে অপরাধের প্রকৃতি, শাস্তির উদ্দেশ্য, বিচারপ্রক্রিয়া এবং শাস্তি প্রয়োগের বৈধতার ওপর?
আর যদি বলা হয়, আল্লাহর বিধান ন্যায়সংগত, কিন্তু ফেরাউনের বিধান জুলুমপূর্ণ, তাহলে এই পার্থক্যটি কীভাবে যুক্তি ও প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা যায়?
জবাব: ইতিমধ্যে অনেকেই উত্তরটা বুঝে গেছেন। নৈতিকতা স্বয়ং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, অতএব তিনি যা কিছু তাঁর বান্দাদের জন্য নির্ধারণ করবেন, সেটা তাদের জন্য তাঁর পক্ষ থেকে ন্যায়বিচার। এটা তাদের জন্য, যারা তাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছে।
এবার আসুন, কীভাবে অমুসলিমদের এই বিষয়টি সহজভাবে যুক্তি দিয়ে বোঝাবেন।
প্রথমে আপনার উত্থাপিত আপত্তিটি কয়েকটি ভাগে বিশ্লেষণ করা দরকার:
১. সূরা ত্বহা ২০:৭১-এ ফেরাউন কেন শূলে চড়িয়ে হত্যার হুমকি দিয়েছিল?
২. সূরা মায়িদা ৫:৩৩-এ কেন শূলে চড়িয়ে হত্যার বিধান রয়েছে?
৩. দুটি ঘটনার অপরাধ, উদ্দেশ্য ও পরিস্থিতির মধ্যে প্রকৃত পার্থক্য কী?
৪. শাস্তির নৈতিক বৈধতা নির্ধারণে অপরাধীর কাজ, বিচারপ্রক্রিয়া ও শাস্তির মাত্রা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
৫. এই ব্যাখ্যা কি নাস্তিক বা সমালোচকদের আপত্তির পূর্ণ উত্তর দিতে পারে?
নিচে আপনার আপত্তিগুলোর উত্তর দেওয়া হলো।
১. দুটি ঘটনায় নৈতিক ভিত্তি
ক. সূরা ত্বহা ২০:৭১: ফেরাউনের শাস্তির হুমকি
আল্লাহ বলেন:
قَالَ آمَنتُمْ لَهُ قَبْلَ أَنْ آذَنَ لَكُمْ إِنَّهُ لَكَبِيرُكُمُ الَّذِي عَلَّمَكُمُ السِّحْرَ فَلَأُقَطِّعَنَّ أَيْدِيَكُمْ وَأَرْجُلَكُم مِّنْ خِلَافٍ وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ النَّخْلِ
ফেরাউন বলল, “আমি তোমাদের অনুমতি দেওয়ার আগেই তোমরা তার প্রতি ঈমান আনলে! নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রধান, যে তোমাদের জাদু শিখিয়েছে। সুতরাং আমি অবশ্যই তোমাদের হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলব এবং তোমাদের খেজুরগাছের কাণ্ডে শূলে চড়াব।” [সূরা ত্বহা ২০:৭১]
মূসা (আ.)-এর সঙ্গে জাদুকরদের প্রতিযোগিতায় ফেরাউন তাদের একত্র করেছিল। কিন্তু মূসা (আ.)-এর নিদর্শন দেখে জাদুকরেরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে। ফেরাউন তাদের এই ঈমানকে মেনে নেয়নি। বরং সে অভিযোগ করে যে, মূসা তাদের নেতা এবং তাদের মধ্যে পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র রয়েছে।
এরপর সে তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে শূলে চড়িয়ে হত্যার হুমকি দেয়। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়, ফেরাউন নিজেই বলছে:
«قَبْلَ أَنْ آذَنَ لَكُمْ» “আমি তোমাদের অনুমতি দেওয়ার আগে।”
অর্থাৎ, তার বক্তব্যে ঈমান আনার বিষয়টি তার অনুমতির অধীন বলে প্রতীয়মান হয়। সে নিজের কর্তৃত্বকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে যে, মানুষ কী বিশ্বাস করবে, সেটিও তার অনুমতির ওপর নির্ভরশীল।
এই বিষয়টা তো নাস্তিকদের কাছেও স্বীকৃত: সবার নিজের স্বাধীন ইচ্ছা এবং স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করার অধিকার থাকা উচিত। তাহলে তাদের মূলনীতি অনুযায়ীই প্রমাণ হচ্ছে, ফেরাউন এখানে অন্যায় করেছে।
এখানে আরও কিছু যুক্তি রয়েছে, যেটা পরবর্তী আয়াতের আলোচনায় শেষের দিকে আলোচনা করব।
খ. সূরা মায়িদা ৫:৩৩: শূলে চড়িয়ে হত্যার বিধান
আল্লাহ বলেন:
إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خِلَافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ
“যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির চেষ্টা করে, তাদের শাস্তি হলো, তাদের হত্যা করা হবে, অথবা শূলে চড়ানো হবে, অথবা তাদের হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলা হবে, অথবা তাদের দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে।” [সূরা আল-মায়িদা, ৫:৩৩]
প্রথমত, এখানে নিঃসন্দেহে শূলে চড়িয়ে হত্যার কথা রয়েছে, তবে “ইয়ুসাল্লাবু”-এর পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে, যেমনটা পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।
তাহলে প্রশ্নটি হলো: ফেরাউনের শাস্তির পদ্ধতিকে কুরআন নিন্দনীয় হিসেবে উপস্থাপন করছে, অথচ একই ধরনের শাস্তির উল্লেখ আল্লাহর বিধানেও রয়েছে। এর ব্যাখ্যা কী?
প্রথম পার্থক্য হলো, শাস্তির পদ্ধতি এক হওয়া মানেই শাস্তির নৈতিক ভিত্তি এক হওয়া নয়।
ধরা যাক, দুটি শাসক একই পদ্ধতিতে দুজন ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দিলেন।
প্রথম ব্যক্তি কাউকে হত্যা করেননি, ডাকাতি করেননি কিংবা কোনো সহিংস অপরাধ করেননি। শাসক কেবল তাঁর মতাদর্শ বা ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে তাঁকে হত্যা করলেন।
দ্বিতীয় ব্যক্তি সশস্ত্র ডাকাতির সময় মানুষ হত্যা করেছেন, মানুষের সম্পদ লুট করেছেন এবং জনপথে সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছেন। বিচারপ্রক্রিয়ায় অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর তাঁকে আইন অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হলো।
এখানে শাস্তির পদ্ধতি একই হলেও দুটি ঘটনার নৈতিক ভিত্তি এক নয়।
প্রথম ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠবে, ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার ন্যায়সংগত কারণ ছিল কি না।
দ্বিতীয় ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠবে, অপরাধটি কতটা গুরুতর, প্রযোজ্য আইন কী, বিচার যথাযথ হয়েছে কি না এবং শাস্তি অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
অর্থাৎ, কোনো শাস্তির পদ্ধতি নিজে থেকেই প্রতিটি পরিস্থিতিতে ন্যায়সংগত বা অন্যায় হয়ে যায় না; তার নৈতিক মূল্যায়নে শাস্তির কারণ ও প্রয়োগের পরিস্থিতিও বিবেচ্য।
কোনো শাসক কাউকে অপরাধী আখ্যা দিলেই তাঁর শাস্তি ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। অপরাধের বাস্তবতা, প্রমাণ, বিচারপ্রক্রিয়া এবং প্রযোজ্য বিধানের বৈধতাও প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
যেহেতু স্বয়ং মহাবিশ্বের রব উক্ত বিধান দিয়েছেন এবং তিনিই অবজেক্টিভ নৈতিকতার ভিত্তি, যা তিনি ইসলামের মাধ্যমে আমাদের কাছে তাঁর রাসূলের মাধ্যমে পৌঁছে দিয়েছেন, অতএব তাঁর দেওয়া বিধানও অবজেক্টিভ মোরালিটি হবে। এটাই সবচেয়ে বড় যুক্তি।
২. ফেরাউনের হুমকি ও সূরা মায়িদা ৫:৩৩-এর মধ্যে অপরাধগত পার্থক্য কী?
ফেরাউনের ঘটনায় কী ঘটেছিল?
সূরা ত্বহা ২০:৭১-এর বিবরণ অনুযায়ী, জাদুকরেরা মূসা (আ.)-এর নিদর্শন দেখার পর ঈমান এনেছিল। ফেরাউন তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলে এবং তাদের হাত-পা কেটে শূলে চড়ানোর হুমকি দেয়। সে আরও দাবি করে, কেন তারা মুসলিম হওয়ার আগে তার অনুমতি নিল না!
ফেরাউন তাদের বিরুদ্ধে এমন কোনো হত্যাকাণ্ড বা ডাকাতির অভিযোগের ভিত্তিতে এই শাস্তির উল্লেখ করে না, যার কারণে তাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের দাবি করা হচ্ছে। তাদের একমাত্র দোষ হলো, কেন তারা ইসলাম গ্রহণ করল! কেন তারা একমাত্র সত্য দ্বীন কবুল করলো! কেন ফেরাউনের হুকুমের বিরুদ্ধে গিয়ে সত্যকে গ্রহণ করলো!
তাই পরবর্তী আয়াতে ঈমানদাররা বলে:
فَاقْضِ مَا أَنْتَ قَاضٍ إِنَّمَا تَقْضِي هَذِهِ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا
অর্থাৎ, তুমি যা সিদ্ধান্ত দেওয়ার দাও। তুমি তো কেবল এই পার্থিব জীবনেই সিদ্ধান্ত দিতে পারো। [সূরা ত্বহা, ২০:৭২।]
এখানে জাদুকরেরা ফেরাউনের হুমকির মুখেও তাদের বিশ্বাস থেকে সরে আসতে অস্বীকৃতি জানায়।
সূরা মায়িদা ৫:৩৩-এ কী বলা হয়েছে?
আয়াতটি আসলে কোন অপরাধের কথা বলছে?
আল্লাহ বলেন:
إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا…
“যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির চেষ্টা করে, তাদের শাস্তি হলো, তাদের হত্যা করা হবে, অথবা শূলে চড়ানো হবে, অথবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হবে, অথবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে…” [সূরা আল-মায়িদা, ৫:৩৩।]
এখানে দুটি বাক্যাংশ লক্ষণীয়:
يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ: ইউহারিবূনাল্লাহা ওয়া রাসূলাহু: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।
وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا: ওয়া ইয়াস’আওনা ফিল-আরদি ফাসাদান: পৃথিবীতে ফাসাদ বা বিপর্যয় সৃষ্টি করার চেষ্টা করে।
প্রথমত, হিরাবাহ (حرابة) বলতে কী বোঝায়?
অধিকাংশ ফকীহ (الفقهاء) الحرابة অধ্যায়ে قطع الطريق পরিভাষাটি ব্যবহার করেছেন। সহজ ভাষায়, الحرابة বলতে এমন অপরাধকে বোঝায়, যেখানে কেউ শক্তি প্রয়োগ করে প্রকাশ্যে মানুষের সম্পদ লুট করে, কাউকে হত্যা করে অথবা মানুষকে ভয়ভীতি ও আতঙ্কের মধ্যে ফেলে।
উদাহরণস্বরূপ: অস্ত্র নিয়ে রাস্তা আটকে মানুষের সম্পদ লুট করা। শক্তি প্রয়োগ করে কাউকে হত্যা করা। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা।
বিস্তারিত পড়ুন[43]٢٣ – قطع الطريق (الحرابة)
يستعمل أكثر الفقهاء مصطلح (قطع الطريق) تحت باب الحرابة.
والحرابة لغة: من الحرب التى هى نقيض السلم، يقال: حاربه محاربة، وحرابا، أو من الحرَب بفتح الراء- وهو السلّب. يقال: حرب فلانا ماله أى: سلبه فهو محروب وحريب. (١)
واصطلاحا: الحرابة: قطع الطريق وهو البروز لأخذ مال أو لقتل أو لإرعاب على سبيل المجاهرة مكابرة اعتمادا على القوة مع البعد عن الغوث (٢).
وزاد المالكية: محاولة الاعتداء على العرض مغالبة.
وقيل من كابر رجلا على ماله بسلاح أو غيره فى زقاق أو دخل على حريمه فى المصر حكم عليه بحكم الحرابة.
الحكم التكليفى لقطع الطريق (الحرابة):
الحرابة كبيرة من الكبائر، وهى من الحدود باتفاق الفقهاء وسمى القرآن الكريم مرتكبيها محاربين لله ولرسوله – ﷺ – قال تعالى ﴿إنما جزاء الذين يحاربون الله ورسوله ويسعون فى الارض فسادا أن يقتلوا أو يصلبوا أو تقطع أيديهم وأرجلهم من خلاف أوينفوا من الارض﴾ (المائدة ٣٣).
ونفى عنهم رسول الله – ﷺ – انتسابهم للإسلام فقال: (من غشنا فليس منا، ومن حمل علينا السلاح فليس منا) (رواء البخارى ومسلم فى صحيحيهما). وقاطع الطريق (المحارب) عند الفقهاء هو كل ملتزم مكلف أخذ المال بقوة فى البعد عن الغوث. إذًا فلابد من توافر عدة شروط حتى يحدّ حد الحرابة على قاطع الطريق وهى:
(أ) الالتزام: أن يكون قاطع الطريق (المحارب) ملتزما بأحكام الشريعة بأن يكون مسلما أو ذميا أو مرتدا، فلا يحد الحربى، ولا المعاهد ولا المستأمن (٣).
https://app.turath.io/book/433?page=535
অতএব আয়াতের দ্বিতীয় অংশ নিয়ে ইসলামবিদ্বেষীদের কোনো আপত্তি আসার সুযোগ নেই, কারণ আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে, যারা সাধারণ মানুষদের রাস্তাঘাটে শক্তি প্রয়োগ করে প্রকাশ্যে মানুষের সম্পদ লুট করে, কাউকে হত্যা করে অথবা মানুষকে ভয়ভীতি ও আতঙ্কের মধ্যে ফেলে, তাদের জন্য উক্ত শাস্তি নির্ধারিত।
আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের সঙ্গে যুদ্ধ” বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
তবে আয়াতের প্রথম অংশে আপত্তি আসতে পারে, কারণ আয়াতের প্রথম অংশে উল্লেখ করা হয়েছে যে “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে… তার জন্য শাস্তি রয়েছে।”
এখন আমরা কীভাবে বুঝব, কোনটার কারণে আসলে উক্ত শাস্তি প্রযোজ্য হবে?
তার আগে আরেকটি আলোচনা করে নেওয়া জরুরি: “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের সঙ্গে যুদ্ধ” বলতে কী বোঝানো হয়েছে? তাঁদের সঙ্গে যুদ্ধ করলে কেন শাস্তি দেওয়া হবে?
জবাব: প্রথমত, আমরা আলোচনা করব এই আয়াতে আল্লাহ ও রাসূলের সঙ্গে যুদ্ধ করা বলতে কী বোঝানো হয়েছে, এরপর মূল আলোচনায় প্রবেশ করব।
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-মায়িদাহর ৩৩ নম্বর আয়াতে উল্লেখিত «يُحَارِبُونَ اللهَ وَرَسُولَهُ» (যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে) এই বাক্যাংশের তাফসির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মুফাসসির ও ফকীহগণ স্পষ্ট করেছেন যে, আল্লাহর সঙ্গে মানুষের প্রত্যক্ষ বা আক্ষরিক যুদ্ধ সংঘটিত হওয়া অসম্ভব; কারণ আল্লাহ তাআলা স্থান, দেহ ও সৃষ্টিজগতের সীমাবদ্ধতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র এবং কারও পক্ষে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা প্রাধান্য বিস্তার করা সম্ভব নয়।
ইমাম আবু বকর আল-জাসসাস ও অন্যান্য মুফাসসিরদের মতে, এখানে যুদ্ধ শব্দটি রূপক (মাজায) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যখন কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্ধারিত বিধান অমান্য করে, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করে অবাধ্যতা দেখায় এবং জননিরাপত্তা ধ্বংস করে, তখন তার এই চরম বিদ্রোহকে রূপকভাবে ‘আল্লাহ ও রাসুলের সঙ্গে যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। একইভাবে যারা সুদের লেনদেনে অবিচল থাকে, তাদের ব্যাপারেও কুরআনে বলা হয়েছে:
﴿ فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللهِ وَرَسُولِهِ ﴾
“তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা জেনে নাও।” [সূরা আল-বাকারা: ২৭৯]
এই ধরনের ভাষাগত ব্যবহার বোঝার জন্য কুরআনের অন্য একটি আয়াতের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
مَنْ ذَا الَّذِي يُقْرِضُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا
“কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে?” [সূরা আল-বাকারা, ২:২৪৫]
এখানে আল্লাহর ঋণের প্রয়োজন নেই; বরং তিনি এই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, এসব কিছু থেকে অমুখাপেক্ষী। বরং তাঁর পথে সম্পদ ব্যয় করার গুরুত্ব বোঝাতে এই ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।
একইভাবে, আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কথাটি বাস্তব অর্থে তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ বোঝায় না; বরং এর মাধ্যমে রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং আয়াতের বিধানের আওতাভুক্ত ব্যক্তিদের ওপর গুরুতর আক্রমণের ভয়াবহতা প্রকাশ করা হয়েছে।
ইবন আশুর আয়াতের তাফসিরে লিখেছেন:
ومعنى محاربة الله محاربة شرعه وقصد الاعتداء على أحكامه، وقد عُلم أنّ الله لا يحاربه أحد فذكره في المحاربة لتشنيع أمرها بأنّها محاربة لمن يغضب الله لمحاربته، وهو الرسول صلى الله عليه وسلم
আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অর্থ হলো তাঁর শরিয়তের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং তাঁর বিধানগুলোর ওপর আক্রমণ করার উদ্দেশ্য গ্রহণ করা। এটা জানা যে, আল্লাহর বিরুদ্ধে কেউ যুদ্ধ করতে পারে না। তাই এই যুদ্ধের প্রসঙ্গে আল্লাহর নাম উল্লেখ করা হয়েছে অপরাধটির ভয়াবহতা প্রকাশ করার জন্য। কারণ, এটি এমন একজনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, যাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন; তিনি হলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ।
সাইয়্যিদ কুতুব লিখেছেন:
فهم قطعا لا يحاربون الله سبحانه بالسيف، وقد لا يحاربون شخص رسول الله — بعد اختياره الرفيق الأعلى — ولكن الحرب لله ورسوله متحققة، بالحرب لشريعة الله ورسوله، وللجماعة التي ارتضت شريعة الله ورسوله، وللدار التي تنفذ فيها شريعة الله ورسوله
নিশ্চয়ই তারা (ফাসাদ সৃষ্টিকারীরা) তলোয়ার দিয়ে আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না। আর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর রবের সান্নিধ্যে চলে যাওয়ার পর তাঁর ব্যক্তিসত্তার বিরুদ্ধেও তারা হয়তো সরাসরি যুদ্ধ করে না। কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বাস্তবায়িত হয় তাঁদের শরিয়তের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মাধ্যমে, সেই জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মাধ্যমে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শরিয়তকে গ্রহণ করেছে, এবং সেই ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মাধ্যমে যেখানে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শরিয়ত কার্যকর করা হয়।
রশিদ রিদার তাফসিরে বিষয়টি আরও বিস্তৃত সামাজিক ও আইনগত পরিপ্রেক্ষিতে এসেছে। তিনি লিখেছেন:
«أما كون هذا النوع من العدوان محاربة لله ولرسوله فلأنه اعتداء على شريعة السلم والأمان والحق والعدل الذي أنزله الله على رسوله»
“এই ধরনের আক্রমণকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বলার কারণ হলো, এটি সেই শান্তি, নিরাপত্তা, অধিকার ও ন্যায়বিচারের বিধানের বিরুদ্ধে আক্রমণ, যা আল্লাহ তাঁর রাসূলের ওপর অবতীর্ণ করেছেন।”
মওলানা মওদূদীর ব্যাখ্যা আগের তিনজনের তুলনায় রাষ্ট্রব্যবস্থাকেন্দ্রিক। তিনি তাঁর তাফসিরে লিখেছেন:
“To wage war against Allah and His Messenger” is to wage war against the righteous system of government established by the Islamic State.
“’আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা’ বলতে ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত ন্যায়সংগত শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে বোঝানো হয়েছে।”[44]মাওলানা মওদূদীর তাফসির তাফহিমুল কুরআন, আল-মায়িদাহ ৫:৩৩-এর তাফসিরে
কুরতুবী (রহ.) লিখেছেন:
«وفي قوله تعالى: إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ استعارة ومجاز؛ إذ الله سبحانه وتعالى لا يحارب ولا يغالب لما هو عليه من صفات الكمال، ولما وجب له من التنزيه عن الأضداد والأنداد، والمعنى: يحاربون أولياء الله؛ فعبر بنفسه العزيزة عن أوليائه إكبارًا لإيذائهم»
আল্লাহ তাআলার বাণী ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে’, এখানে ইস্তিআরা (استعارة) ও মাজায (مجاز) রয়েছে। কারণ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর পূর্ণাঙ্গ গুণাবলির অধিকারী হওয়ার কারণে যুদ্ধ করেন না, পরাজিতও হন না। আর তিনি যাবতীয় সমকক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে পবিত্র। এর অর্থ হলো, তারা আল্লাহর আওলিয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। তাদের ওপর আক্রমণের গুরুত্ব বোঝাতে আল্লাহ তাঁর সম্মানিত সত্তার উল্লেখ করেছেন।
যামাখশারি (রহ.) লিখেছেন:
يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ: يُحَارِبُونَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ، وَمُحَارَبَةُ الْمُسْلِمِينَ فِي حُكْمِ مُحَارَبَتِهِ
‘তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে’, এর অর্থ, তারা আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। আর মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে বিধানগতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হয়।
ইমাম তাবারী (রহ.) লিখেছেন:
المحارب لله ورسوله من حارب في سابلة المسلمين وذمتهم، والمغير عليهم في أمصارهم وقراهم حرابة
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী হলো সেই ব্যক্তি, যে মুসলিমদের এবং তাদের নিরাপত্তার আওতাভুক্ত লোকদের চলাচলের পথে যুদ্ধ করে, কিংবা তাদের শহর ও গ্রামে তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। এটিও হিরাবাহ।
সূরা মায়িদা ৫:৩৩-এ কয়েকটি শাস্তির উল্লেখ রয়েছে:
১. হত্যা; ২. শূলে চড়ানো; ৩. বিপরীত দিক থেকে হাত-পা কেটে ফেলা; ৪. নির্বাসন।
প্রথমত, ফাসাদ সৃষ্টিকারী সবার ক্ষেত্রে শাস্তি এক হবে না। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাসক নির্ধারণ করবেন, তার জন্য কোন শাস্তি উপযুক্ত। যেমন,
ইবনে কুতাইবাহ বলেন,
في سورة المائدة
إِنَّما جَزاءُ الَّذِينَ يُحارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خِلافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذابٌ عَظِيمٌ (٣٣) [المائدة: ٣٣] .
المحاربون لله ورسوله: هم الخارجون على الإمام وعلى جماعة المسلمين، يخيفون السّبل، ويسعون في الأرض بالفساد. وهم ثلاثة أصناف:
رجل قتل النفس ولم يأخذ مالا.
ورجل قتل النفس وأخذ المال.
ورجل أخذ المال ولم يقتل النفس.فإذا قدر الإمام عليهم فإنّ بعضهم يقول: هو مخيّر في هذه العقوبات، بأيّها شاء عاقب كل صنف منهم.
وكان بعضهم يجعل لكل صنف منهم حدّا لا يتجاوزه إلى غيره:
فمن قتل النفس ولم يأخذ المال قتل، لأن النفس بالنفس.ومن قتل وأخذ المال: صلب إلى أن يموت، فكان الشّهر له بالصّلب جزاء له بأخذه المال، وقتله جزاء له بقتله للنفس.
ومن أصاب المال ولم يقتل، فإن شاء الإمام قطع يده اليمنى جزاء بالسّرق، ورجله اليسرى جزاء بالخروج والمجاهرة بالفساد. وإن شاء نفاه من الأرض.
আর কোনো কোনো আলেম প্রত্যেক শ্রেণির জন্য নির্দিষ্ট শাস্তি নির্ধারণ করেছেন, যা অতিক্রম করে অন্য শাস্তি দেওয়া যাবে না।
যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করেছে, কিন্তু কোনো সম্পদ গ্রহণ করেনি: তাকে হত্যা করা হবে। কারণ, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ নেওয়া হয়।
যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করেছে এবং সম্পদও গ্রহণ করেছে: তাকে মৃত্যুবরণ করা পর্যন্ত শূলে চড়ানো হবে। সম্পদ গ্রহণের শাস্তি হিসেবে শূলে চড়ানো হবে এবং কাউকে হত্যা করার কারণে তার প্রাণ নেওয়া হবে।
যে ব্যক্তি সম্পদ গ্রহণ করেছে, কিন্তু কাউকে হত্যা করেনি: শাসক চাইলে চুরির শাস্তি হিসেবে তার ডান হাত এবং রাস্তায় বেরিয়ে প্রকাশ্যে ফাসাদ সৃষ্টির শাস্তি হিসেবে তার বাম পা কেটে দিতে পারেন। আর যদি চান, তাহলে তাকে দেশ থেকে নির্বাসিত করতে পারেন।[45]দেখুন, https://app.turath.io/book/23596?page=226
একই তাফসীর আল-মাউসুয়া আল-ফিকহিয়া আল-কুওয়াইতিয়াতেও করা হয়েছে।
عُقُوبَةُ الْمُحَارِبِينَ:
١٦ – لاَ خِلاَفَ بَيْنَ الْفُقَهَاءِ فِي أَنَّ عُقُوبَةَ الْمُحَارِبِ حَدٌّ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ لاَ تَقْبَل الإِْسْقَاطَ وَلاَ الْعَفْوَ مَا لَمْ يَتُوبُوا قَبْل الْقُدْرَةِ عَلَيْهِمْ.
وَالأَْصْل فِي ذَلِكَ قَوْله تَعَالَى: ﴿إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الأَْرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خِلاَفٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الأَْرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الآْخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ إِلاَّ الَّذِينَ تَابُوا مِنْ قَبْل أَنْ تَقْدِرُوا عَلَيْهِمْ فَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ ٣﴾ .
١٧ – وَاخْتَلَفَ الْفُقَهَاءُ فِي هَذِهِ الْعُقُوبَاتِ: أَهِيَ عَلَى التَّخْيِيرِ أَمْ عَلَى التَّنْوِيعِ. فَذَهَبَ الشَّافِعِيَّةُ وَالْحَنَابِلَةُ وَالصَّاحِبَانِ مِنَ الْحَنَفِيَّةِ إِلَى أَنَّ «أَوْ» فِي الآْيَةِ عَلَى تَرْتِيبِ الأَْحْكَامِ، وَتَوْزِيعِهَا عَلَى مَا يَلِيقُ بِهَا فِي الْجِنَايَاتِ:
فَمَنْ قَتَل وَأَخَذَ الْمَال، قُتِل وَصُلِبَ. وَمَنِ اقْتَصَرَ عَلَى أَخْذِ الْمَال قُطِعَتْ يَدُهُ الْيُمْنَى وَرِجْلُهُ الْيُسْرَى.
وَمَنْ أَخَافَ الطَّرِيقَ، وَلَمْ يَقْتُل، وَلَمْ يَأْخُذْ مَالًا نُفِيَ مِنَ الأَْرْضِ (١) .
وَالنَّفْيُ فِي هَذِهِ الْحَالَةِ عِنْدَ الشَّافِعِيَّةِ تَعْزِيرٌ وَلَيْسَ حَدًّا، فَيَجُوزُ التَّعْزِيرُ بِغَيْرِهِ وَيَجُوزُ تَرْكُهُ إِنْ رَأَى الإِْمَامُ الْمَصْلَحَةَ فِي ذَلِكَ.
وَقَالُوا: بِهَذَا فَسَّرَ ابْنُ عَبَّاسٍ الآْيَةَ فَقَال: الْمَعْنَى: أَنْ يُقَتَّلُوا إِنْ قَتَلُوا. أَوْ يُصَلَّبُوا مَعَ الْقَتْل إِنْ قَتَلُوا وَأَخَذُوا الْمَال. أَوْ تُقَطَّعُ أَيْدِيهمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خِلاَفٍ، إِنِ اقْتَصَرُوا عَلَى أَخْذِ الْمَال، أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الأَْرْضِ، إِنْ أَرْعَبُوا، وَلَمْ يَأْخُذُوا شَيْئًا وَلَمْ يَقْتُلُوا، وَحَمَلُوا كَلِمَةَ «أَوْ» عَلَى التَّنْوِيعِ لاَ التَّخْيِيرِ، كَمَا فِي قَوْله تَعَالَى: ﴿وَقَالُوا كُونُوا هُودًا أَوْ نَصَارَى﴾ أَيْ قَالَتْ الْيَهُودُ: كُونُوا هُودًا وَقَالَتِ النَّصَارَى: كُونُوا نَصَارَى وَلَمْ يَقَعْ تَخْيِيرُهُمْ بَيْنَ الْيَهُودِيَّةِ، وَالنَّصْرَانِيَّة.
আব্দুল্লাহ খাদর হামাদ তাঁর আল-কিফায়া ফি আল-তাফসির বিল-মাথুর ওয়া আল-দিরায়াতে বলেন,
القرآن ﴿إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خِلَافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ ٣٣﴾ [المائدة: ٣٣]
التفسير:
إنما جزاء الذين يحاربون الله، ويبارزونه بالعداوة، ويعتدون على أحكامه، وعلى أحكام رسوله، ويفسدون في الأرض بقتل الأنفس، وسلب الأموال، أن يُقَتَّلوا، أو يُصَلَّبوا مع القتل (والصلب: أن يُشَدَّ الجاني على خشبة) أو تُقْطَع يدُ المحارب اليمنى ورجله اليسرى، فإن لم يَتُبْ تُقطعْ يدُه اليسرى ورجلُه اليمنى، أو يُنفَوا إلى بلد غير بلدهم، ويُحبسوا في سجن ذلك البلد حتى تَظهر توبتُهم. وهذا الجزاء الذي أعدَّه الله للمحاربين هو ذلّ في الدنيا، ولهم في الآخرة عذاب شديد إن لم يتوبوا.
في سبب نزول الآية بعدها خمسة أقوال:
أحدها: قال أنس:»قدم أناس من عكل أو عرينة فاجتووا المدينة، فأمرهم النبي – ﷺ – بلقاح، وأن يشربوا من أبوالها وألبانها، فانطلقوا، فلما صحّوا قتلوا راعي النبي – ﷺ -، واستاقوا النعم، فجاء الخبر في أول النهار، فبعث في آثارهم فلما ارتفع النهار جيء بهم؛ فأمر؛ فقطع أيديهم وأرجلهم، وسمرت أعينهم، وألقوا في الحرة يستسقون فلا يسقون.
যারা আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, প্রকাশ্যে তাঁর প্রতি শত্রুতা প্রদর্শন করে, তাঁর বিধান এবং তাঁর রাসূলের বিধান লঙ্ঘন করে, আর মানুষ হত্যা ও সম্পদ লুণ্ঠনের মাধ্যমে পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করে, তাদের শাস্তি হলো, তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে অথবা হত্যা করার পাশাপাশি ক্রুশবিদ্ধ করা হবে।
সালব (صَلْب) অর্থ হলো অপরাধীকে কাঠের কোনো দণ্ড বা কাঠামোর সঙ্গে বেঁধে রাখা।
বিকল্পভাবে, হিরাবাহ (حرابة)-এর অপরাধীর ডান হাত ও বাম পা কেটে ফেলা হতে পারে। অপরাধী তওবা না করলে তার বাম হাত ও ডান পা কেটে ফেলা হবে। অথবা তাকে তার নিজ দেশ থেকে অন্য কোনো দেশে নির্বাসিত করা হবে এবং সেই দেশে কারাগারে বন্দি রাখা হবে, যতক্ষণ না তার তওবা প্রকাশ পায়।
আল্লাহ হিরাবাহকারীদের জন্য যে শাস্তি নির্ধারণ করেছেন, তা দুনিয়ায় তাদের জন্য লাঞ্ছনা। আর তারা তওবা না করলে আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।
যাদের ওপর এই শাস্তি প্রযোজ্য নয়[46]شروط الحرابة (قطع الطريق):
يشترط لإقامة الحرابة شروط:
١ – التكليف:
(البلوغ والعقل) اتفق الفقهاء على أن التكليف شرط في اعتبار الحرابة، واختلفوا في حد من اشترك مع الصبي والمجنون في قطع الطريق.
أ- فذهب الأحناف إلى أن الحد يسقط عن الجميع لأنه إذا سقط عن البعض فإنه يسقط عن الجميع لأنها جناية واحدة وهم متضامنون في المسؤولية.
ب- وذهب الجمهور من المالكية والشافعية والحنابلة إلى أن الحد إذا سقط عن الصغير والمجنون فإنه لا يسقط عن غيره من المكلفين بل يحدون حد قاطع الطريق (٣).
٢ – أن يكون مع المحاربين سلاح:
أ- يشترط الحنفية والحنابلة أن يكون مع المحارب سلاح ولو كان حجارة أو عصى.
ب- ولا يشترط المالكية والشافعية حمل السلاح بل يكفي عندهم القهر والغلبة وأخذ المال ولو باللكز والضرب (١).
অপরাধীর শরয়ি দায়বদ্ধতা: এখানে দুই ধরনের ব্যক্তির কথা এসেছে:
الصبي (সাবিয়্য): নাবালক শিশু।
المجنون (মাজনূন): মানসিক ভারসাম্যহীন বা উন্মাদ ব্যক্তি, যে শরয়ি দায়বদ্ধতার উপযুক্ত নয়।
মাওসুআত আল-ফিকহ আলা আল-মাযাহিব আল-আরবাআ-তে ইয়াসের আল-নাজ্জার বিস্তারিত আলোচনা করেছেন[47]الشَّرطُ السادِسُ: المجاهَرةُ:
نَصَّ جُمهورُ الفُقهاءِ الحَنفيةُ والمالِكيةُ والشافِعيةُ والحَنابلةُ على أنه يُشترطُ في قُطَّاعِ الطريقِ أنْ يَأتُوا مُجاهَرةً ويأخُذوا المالَ قَهرًا ومُكابَرةً، فأما إنْ أخَذُوه مُختَفينَ فهُم سُرَّاقٌ، وإنْ اختَطَفوهُ وهَرَبوا فهُم مُنتهِبونَ لا قطْعَ عليهِم، وحُكمُهم في القِصاصِ والضَّمانِ كغَيرِهم.
وكذلكَ إنْ خرَجَ الواحدُ والاثنانِ على آخِرِ قَافلةٍ فاستَلَبوا منها شَيئًا وهَرَبوا فلَيسُوا بمُحارِبينَ؛ لأنهُم لا يَرجعونَ إلى مَنعةٍ وقُوةٍ، وإنْ خَرَجوا على عَددٍ يَسيرٍ فقَهَروهُم فهُم قطَّاعُ طَريقٍ؛ لاعتِمادِهم على الشَّوكةِ بالنسبةِ إليهِم (٣).
هل يُشترطُ عَددٌ مُعيَّنٌ في الحِرابةِ؟ أم تَحصلُ الحِرابةُ ولو مِنْ واحدٍ؟
نَصَّ جُمهورُ الفُقهاءِ الحَنفيةُ والمالِكيةُ والشافِعيةُ على أنه لا يُشترطُ العَددُ، بل الواحِدُ إذا كانَ له فَضلُ قُوةٍ يَغلبُ بها الجَماعةَ وتَعرَّضَ للنُّفوسِ والأموالِ مُجاهَرةً فهو قاطِعُ طَريقٍ (١).
গোপন চোর ও ছোঁ মেরে পালানো ব্যক্তি: যারা অস্ত্র ও শক্তির মহড়া দেখিয়ে প্রকাশ্যে আধিপত্য বিস্তার না করে, বরং গোপনে চুরি করে কিংবা সুযোগ বুঝে ছোঁ মেরে পালিয়ে যায়, তাদের অপরাধ ডাকাতি বা হিরাবাহ নয়; তাদের ক্ষেত্রে চুরির সাধারণ বিধি বা তা’যীর (প্রশাসনিক শাস্তি) প্রযোজ্য হবে।[48]https://app.turath.io/book/30065?print_page=22%2C500
অন্যদিকে, আরও অনেক ফকিহ অপরাধের ধরন অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারণের পক্ষে মত দিয়েছেন।
১. ফেরাউনের শাস্তির হুমকি ছিল এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে, যারা মূসা (আ) এর নিদর্শন দেখে ঈমান এনেছিল।
২. সূরা মায়িদা ৫:৩৩ এ নির্দিষ্ট ধরনের গুরুতর অপরাধ ও পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির প্রসঙ্গে শাস্তির বিধান এসেছে।
৩. সুতরাং, দুটি ঘটনার শাস্তির পদ্ধতি একই হলেও তাদের অপরাধগত প্রেক্ষাপট এক নয়।
কেন আল্লাহ এবং রাসূলের বিধান জেনেশুনে অস্বীকার করা কুফরি?
মহান রব এই গোটা সৃষ্টিজগৎ তৈরি করেছেন এবং দুনিয়ায় আমাদের পাঠিয়েছেন তাঁর হুকুম পালন করার জন্য, এটা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস। এখন যারা স্রষ্টায় বিশ্বাস করে না, তাদের সঙ্গে প্রথমে সেটা নিয়ে আলোচনা করা হবে: মহাবিশ্বের পেছনে কোনো কারণ আছে কি না, সেটা স্রষ্টা কি না!
অতঃপর আসবে ভালো-মন্দের ভিত্তি কী?
যেহেতু আপনার প্রশ্নটা নৈতিকতাকে কেন্দ্র করে, তাই আমি আমাদের ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে বলছি, যেটা সত্যের আলোকে প্রমাণিত হয়েছে যে, আল্লাহই সর্বোচ্চ ন্যায়বিচারক এবং নৈতিক সত্যের চূড়ান্ত ভিত্তি। তাঁর জ্ঞান পূর্ণাঙ্গ, তাঁর প্রজ্ঞা পরিপূর্ণ এবং তিনি অন্যায় থেকে পবিত্র। অতএব, তাঁর বিধান নিছক কোনো মানবীয় মতামত নয়; বরং তা ঐশী জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো বিধান প্রমাণিত হলে, সেটি সবার কাছে নৈতিক হিসেবে কর্তৃত্ব লাভ করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আল্লাহর বিধানকে নৈতিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত করার অর্থ এই নয় যে, মানুষ নিজের সীমিত বিচারবুদ্ধি দিয়ে প্রতিটি বিধানের সম্পূর্ণ প্রজ্ঞা উপলব্ধি করতে পারবে। বরং ইসলামের দাবি হলো, আল্লাহর জ্ঞান মানুষের জ্ঞানের ঊর্ধ্বে এবং তাঁর বিধান তাঁর পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।
এই ভিত্তি থেকে পরবর্তী যুক্তিটি আসে: যদি কোনো ব্যক্তি জেনেশুনে আল্লাহর প্রমাণিত বিধানকে প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে তার আপত্তি কেবল একটি নির্দিষ্ট বিধানের বিরুদ্ধে আপত্তি নয়; বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী তা আল্লাহর বিধান প্রদানের কর্তৃত্ব, তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা কিংবা তাঁর রাসূলের মাধ্যমে প্রেরিত নির্দেশনার প্রতিও আপত্তি প্রকাশ করতে পারে।
কোনো বিধানের প্রকৃত অর্থ বুঝতে না পারা, তার প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা, কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা এবং আল্লাহর বিধানকে জেনেশুনে প্রত্যাখ্যান করা, এগুলো এক বিষয় নয়। একইভাবে, কোনো বিধান সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করা আর জেনেশুনে সত্যকে অস্বীকার করাও এক নয়।
সুতরাং, মূল কারণটা এভাবে দাঁড়ায়: যদি আল্লাহর কোনো বিধান সত্যিই তাঁর পক্ষ থেকে প্রমাণিত হয় এবং কেউ তার ঐশী কর্তৃত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করার পরও অহংকার, অবাধ্যতা কিংবা সত্য প্রত্যাখ্যানের কারণে সেটিকে অস্বীকার করে, তাহলে তার অবস্থান কেবল একটি নৈতিক মতভেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা ঐশী কর্তৃত্বের প্রতি সচেতন প্রত্যাখ্যানের রূপ নেবে এবং এর মাধ্যমে উক্ত ব্যক্তি সত্য অস্বীকারকারী হিসেবে গণ্য হবে। যেহেতু স্রষ্টার পক্ষ থেকেই একমাত্র অবজেক্টিভ নৈতিকতা আসা সম্ভব, অতএব তাঁর বিধান জেনে অস্বীকার করে কেউ যদি উক্ত বিধান নিশ্চিহ্ন করতে চায়, তাহলে বাই ডিফল্ট সে অন্যায়ের পক্ষ নিল। কারণ মহান রবের কাছ থেকে আসা বিধান হলো অবজেক্টিভ মোরালিটি, আর এর বিরোধিতা করা মানে হলো সেই ব্যক্তি অন্যায়ের পক্ষে, জুলুমের পক্ষে, খারাপের পক্ষে। যার কারণে আল্লাহ এবং রাসূলের সঙ্গে যুদ্ধ করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে।
ইসলামি দৃষ্টিতে এই প্রত্যাখ্যানের গুরুত্ব এখানেই যে, আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর সত্যতা স্বীকার করার অর্থ তাঁর মাধ্যমে প্রমাণিত আল্লাহর নির্দেশনাকেও কর্তৃত্বপূর্ণ বলে গ্রহণ করা। অতএব, কোনো ব্যক্তি যদি জেনেশুনে রাসূলের সত্যতা ও তাঁর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত আল্লাহর নির্দেশনাকে প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে সে মিথ্যাকে গ্রহণ করে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করল।
অতএব, ফেরাউনের দেওয়া শাস্তি ছিল সব দিক থেকেই ঘৃণ্য ও অপরাধ। আর যিনি মহাবিশ্বের রব, ভালো-মন্দের সৃষ্টিকর্তা, তিনিই আমাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন সূরা মায়িদার উক্ত আয়াত। অতএব, এর চেয়ে বড় পার্থক্য আর কী হতে পারে?
জীনের কথা আরবে লোককাহিনি হতে নেওয়া?
আপনার শেষ প্রশ্নের উত্তর
জীনের কথা নাকি ক্রিশ্চিয়ানিজম বা জুডাইজমের কোথাও নেই। তখনকার আরবে যে ফোকলোর (লোককাহিনি) প্রচলিত ছিল, সেখানে জীনের কথা ছিল, তাই নাকি নবীজি কুরআনে জীনের কথা এনেছেন।
এর জবাব হলো: কুরআনে জিনের কথা থাকার সঙ্গে তখনকার আরবের লোককাহিনিতে কিছু প্রচলিত থাকা কিংবা ইহুদি-খ্রিস্টানদের কিতাবে উল্লেখ থাকার কোনো সম্পর্ক নেই।
এই প্রশ্ন পরোক্ষভাবে ধরে নিচ্ছে, রাসুল ﷺ সত্য নবী ছিলেন না, বরং তিনি লোকমুখে কথা প্রচার করতেন, যেটা একটা ধারণা মাত্র। আমরা মুসলিমরা অনেক প্রমাণ পেশ করেছি যে, রাসূলের পক্ষ থেকে কুরআন আসা পসিবল না।
এরপরও আমি বিষয়টি নিয়ে কিছু আলোচনা করছি।
যদি ধরেও নেই যে রাসুল ﷺ তাওরাত বা ইঞ্জিল থেকে এইগুলা নিয়েছেন অথবা তৎকালীন লোক মুখে প্রচার হওয়া কথা থেকে এইগুলি নিয়েছেন তাহলে ৩ টি বিষয় সামনে আসছে।
১. তাওরাত ও বাইবেলে জিনের সঙ্গে তুলনীয় অতিপ্রাকৃত সত্তা সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?
২. ইসলাম-পূর্ব আরবদের মধ্যে জিন সম্পর্কে কী ধরনের বিশ্বাস প্রচলিত ছিল?
৩. কুরআনের জিন-সংক্রান্ত ধারণা কি সেই বিশ্বাসগুলোর নিছক অনুলিপি, নাকি সেখানে মৌলিক পার্থক্যও রয়েছে?
আর কোনো কিছুর সাথে কোনো কিছু মিলে যাওয়ায় অর্থ কি এই যে দুইটির মধ্যে থেকে কেউ কারোর নকল করেছে?
উদাহরণস্বরূপ, কোনো সমাজে সৃষ্টিকর্তার ধারণা আগে থেকেই প্রচলিত থাকলে পরবর্তী কোনো ব্যক্তি সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে প্রচার করা শুরু করলেন। অতঃপর কেউ যদি দাবি করে, সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে বক্তব্য সেই সমাজ থেকেই নেওয়া হয়েছে, এ সিদ্ধান্ত শুধু ধারণার পূর্ববর্তী অস্তিত্বের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয় না। তাঁর বক্তব্যের উৎস নির্ধারণ করতে আরও প্রমাণ দরকার।
জিন এবং শয়তানের অস্তিত্ব সব ধর্মেই বিদ্যমান আছে। এখন কি আপত্তিকারীরা এই আপত্তি করবে যে নবীজি তাদের ধর্মগ্রন্থ থেকে এগুলো নিয়েছেন? (আল্লাহ মাফ করুন)
মূলত আপনাকে আগে মূল বিষয়টা বুঝতে হবে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহির মাধ্যমে যা যা নাযিল করা হয়েছে, তিনি শুধু তা-ই বলতেন। জিনের বিষয়টাও তা-ই। নাস্তিকদের বিষয়ে উত্তর হলো, তারা এর প্রমাণ দিতে পারবে না; বরং এটা একটা সম্ভাবনা যে এমনটা “হতেও পারে” যে তিনি তাদের কাছ থেকে কপি করেছেন!
তাদের এই “হতেও পারে” কল্পনা ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই। তাই এটা খণ্ডন করতে শুরু করলে এই লেখাটা আরও বড় হয়ে যাবে। তাই আমি বিস্তারিত কিছু বইয়ের সাজেশন দিচ্ছি।
আপনার প্রশ্নের উত্তরের জন্য বিস্তারিত এখানে পড়ুন! – https://bayanelislam.net/Suspicion.aspx?id=01-03-0019&type=&value=
أحمد بن علي الصميلي (আহমদ ইবন আলী আস-সুমাইলি)
গবেষণাপত্রের শিরোনাম: الجن في ضوء فقه الكتاب وصحيح السنة
বাইবেলীয় ধর্মগ্রন্থের অধ্যয়ন ও বিশুদ্ধ সুন্নাহর আলোকে জিন। প্রকাশিত হয়েছে ২০২২ সালে। গবেষণাটিতে জিনের পরিচয়, ইহুদি ও খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় বিশ্বকোষে জিন-সম্পর্কিত ধারণা, কুরআন-সুন্নাহতে জিনের বিবরণ এবং জিন ও ফেরেশতার পার্থক্য আলোচনা করা হয়েছে।
এ ছাড়াও দেখুন, ইহুদি-খ্রিস্টান ধর্মে জিনের অস্তিত্ব সম্পর্কে দলিল:
১. দ্বিতীয় বিবরণ ৩২:১৭ (Deuteronomy 32:17)
“They sacrificed to demons, not to God.”
অনুবাদ: “তারা ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নয়, বরং ডেমনদের উদ্দেশ্যে বলি দিয়েছে।”
২. গীতসংহিতা ১০৬:৩৭ (Psalm 106:37)
“They even sacrificed their sons and their daughters to demons.”
অনুবাদ: “এমনকি তারা তাদের পুত্র ও কন্যাদেরও ডেমনদের উদ্দেশ্যে বলি দিয়েছিল।”
৩. লেবীয় পুস্তক ১৭:৭ (Leviticus 17:7)
এই আয়াতে হিব্রু শব্দ שְׂעִירִים (Se’irim) ব্যবহৃত হয়েছে, যাকে কিছু অনুবাদে ডেমনসদৃশ সত্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
৪. যিশাইয় ৩৪:১৪ (Isaiah 34:14)
এই আয়াতে হিব্রু শব্দ לִילִית (Lilit) রয়েছে, যাকে কিছু অনুবাদে রাত্রির দানবী বা অতিপ্রাকৃত সত্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
৫. লূক ৪:৩৩ (Luke 4:33)
“possessed by a demon, an impure spirit.”
অনুবাদ: “এক ব্যক্তি একটি ডেমন, অর্থাৎ অপবিত্র আত্মার অধিকারাধীন ছিল।”
৬. প্রেরিতদের কার্যবিবরণী ১৬:১৬ (Acts 16:16)
“a spirit of divination”
অনুবাদ: “ভবিষ্যৎ গণনার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি আত্মা।”
কুরআন কি ইহুদি-খ্রিস্টানদের কিতাব থেকে নকল করা হয়েছে?
هل القرآن الكريم مقتبس من كتب اليهود والنصارى؟
লেখক: ড. সামি আমেরি (سامي عامري)
প্রকাশক: مركز رواسخ (Rawasekh)
প্রকাশকাল: ২০১৮
আয়তন: সংস্করণভেদে প্রায় ৫১৬–৫২০ পৃষ্ঠা।
مصدر القرآن الكريم في رأي المستشرقين: عرض ودراسة ونقد
লেখক: মুহাম্মাদ আস-সাইয়্যিদ রাদি জিবরিল (محمد السيد راضي جبريل)
প্রকাশক: مجمع الملك فهد لطباعة المصحف الشريف
প্রকাশকাল: ২০০৬।
دحض دعوى المستشرقين أن القرآن من عند النبي ﷺ
লেখক: সৌদ ইবন আবদুল আজিজ আল-খালাফ (سعود بن عبد العزيز الخلف)।
এটি একটি সমালোচনামূলক গবেষণা, যেখানে কুরআন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিজের রচনা এবং তিনি ইহুদি-খ্রিষ্টীয় উৎস থেকে উপাদান গ্রহণ করেছেন, এই দুই ধরনের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
مصدريّة القرآن عند المستشرق سانت كلير تيسدال: قراءة نقديّة في المنهج والفكر
লেখক: ড. মাহমুদ কিশানা محمود كيشانة
প্রকাশনা: دراسات استشراقية, সংখ্যা ৪৪, ২০২৫
প্রকাশক: المركز الإسلامي للدراسات الاستراتيجية
الإعجاز القرآني: قراءة تأصيليّة نقديّة في شبهات المستشرقين
লেখক: ড. সামের তাওফিক আজমি سامر توفيق عجمي
প্রকাশনা: دراسات استشراقية, সংখ্যা ৩৭, শীতকাল ২০২৪।
এই প্রবন্ধে প্রাচ্যবিদদের কুরআনের ই’জায বা অতুলনীয়তা অস্বীকারের যুক্তি এবং সেগুলোর সমালোচনা করা হয়েছে।
সামি আমেরির ৩০টি বই খুবই গুরুত্বপূর্ণ
ঈমান, কুরআনের সত্যতা, আল্লাহর অস্তিত্ব ও নাস্তিক্যবাদ
১. براهين وجود الله — আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ
২. الإلحاد يهزم نفسه — নাস্তিক্যবাদ নিজেকেই পরাজিত করে
৩. الإلحاد في مواجهة نفسه — নাস্তিক্যবাদ নিজের মুখোমুখি
৪. العلموية — সায়েন্টিজম বা বিজ্ঞানবাদ
৫. العلم وحقائقه — বিজ্ঞান ও তার বাস্তবতা
৬. مشكلة الشر ووجود الله — অশুভের সমস্যা ও আল্লাহর অস্তিত্ব
৭. هل يوجد إله؟ — আল্লাহ কি আছেন?
৮. فمن خلق الله؟ — তাহলে আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছেন?
৯. لماذا يطلب الله من البشر عبادته؟ — আল্লাহ কেন মানুষের কাছে তাঁর ইবাদত চান?
১০. الإنسانوية: الإنسان المتأله بين الوهم والانتحار — মানবতাবাদ: উপাস্যসদৃশ মানুষ, বিভ্রম ও আত্মবিনাশ।
নবুওয়াত ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সত্যতা
১১. البشارة بنبي الإسلام — ইসলামের নবীর আগমনের সুসংবাদ
১২. براهين النبوة والرد على اعتراضات المستشرقين والمنصرين — নবুওয়াতের প্রমাণ এবং প্রাচ্যবিদ ও খ্রিষ্টান মিশনারিদের আপত্তির জবাব
১৩. ما كنت تعلمها أنت ولا قومك — এসব তথ্য আপনি ও আপনার জাতি আগে জানতেন না
১৪. الوجود التاريخي للأنبياء وجدل البحث الأركيولوجي — নবীদের ঐতিহাসিক অস্তিত্ব ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার বিতর্ক
১৫. هل كان آريوس مسلمًا؟ — আরিয়ুস কি মুসলিম ছিলেন?
১৬. Is Muhammad ﷺ Truly a Prophet of God? — মুহাম্মদ ﷺ কি সত্যিই আল্লাহর নবী? [ইংরেজি]
কুরআনের উৎস ও ঐতিহাসিক আপত্তি
১৭. هل القرآن الكريم مقتبس من كتب اليهود والنصارى؟ — কুরআন কি ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের গ্রন্থ থেকে নেওয়া? [প্রথমে এটা দিয়েছিলাম]
১৮. شبهات تاريخية حول القرآن الكريم: عرض ونقد — কুরআন সম্পর্কে ঐতিহাসিক আপত্তি: উপস্থাপন ও সমালোচনা
১৯. براءة القرآن الكريم من القول المشين — আপত্তিকর অভিযোগ থেকে কুরআনের নির্দোষতা
২০. سرقات وأباطيل — চৌর্য ও অসত্য দাবি; খাজাল আল-মাজদির বইয়ের সমালোচনামূলক পাঠ।
বাইবেল, খ্রিষ্টধর্ম ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব
২১. تحريف الإنجيل — ইঞ্জিলের পাঠগত বিকৃতি
২২. استعادة النص الأصلي للإنجيل — ইঞ্জিলের মূল পাঠ পুনরুদ্ধার
২৩. من اختار الأناجيل الأربعة؟ — চারটি সুসমাচার কে নির্বাচন করেছিলেন?
২৪. محمد ﷺ في الكتب المقدسة — পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলোতে মুহাম্মদ ﷺ
২৫. الحجاب شريعة الله في الإسلام واليهودية والنصرانية — ইসলাম, ইহুদিধর্ম ও খ্রিষ্টধর্মে হিজাবের বিধান
২৬. المرأة بين الإسلام والإلحاد والنصرانية — ইসলাম, নাস্তিক্যবাদ ও খ্রিষ্টধর্মের আলোকে নারী
২৭. Hunting for the Word of God — ঈশ্বরের বাণীর অনুসন্ধান [ইংরেজি]।
مبادرة البحث العلمي 1
আধুনিক মতবাদ ও সমসাময়িক বিতর্ক
২৮. العَلمانية طاعون العصر — ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ: যুগের মহামারি
২৯. النسوية الإسلامية — ইসলামি নারীবাদ
৩০. الحداثيون العرب والعدوان على السنة النبوية — আরব আধুনিকতাবাদীরা ও সুন্নাহর ওপর আক্রমণ।
আরও পড়তে পারেন,
The Divine Reality: God, Islam and the Mirage of Atheism, Hamza Andreas Tzortzis
এ ছাড়াও বাংলায় পড়তে পারেন শামসুল আরেফিন শক্তি ভাইয়ের কিতাবগুলো:
ডাবল স্ট্যান্ডার্ড সিরিজ
১. ডাবল স্ট্যান্ডার্ড
২. ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ২
৩. ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ৩
৪. ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ২.০
কষ্টিপাথর সিরিজ
৫. কষ্টিপাথর
৬. মানসাঙ্ক (কষ্টিপাথর–২)
৭. কাঠগড়া (কষ্টিপাথর–৩)
ইসলাম, নাস্তিক্যবাদ ও সমসাময়িক বিতর্ক
৮. অবাধ্যতার ইতিহাস
১০. ইসলামে দাস-দাসী ব্যবস্থা: যুদ্ধমনস্তত্ত্ব, জেনেভা কনভেনশন ও বাস্তবতা
ড. রাফান আহমেদের বই
১. বিশ্বাসের যৌক্তিকতা
২. অবিশ্বাসী কাঠগড়ায়
৩. হোমো স্যাপিয়েন্স: রিটেলিং আওয়ার স্টোরি
Footnotes
| ⇧1 | https://scholar.google.com/citations?view_op=view_citation&hl=en&user=BQXlnXoAAAAJ&citation_for_view=BQXlnXoAAAAJ:9yKSN-GCB0IC |
|---|---|
| ⇧2 | كتاب المفردات في غريب القرآن – 489 https://shamela.ws/book/23636/471 |
| ⇧3 | كتاب التوقيف على مهمات التعاريف – 217 https://shamela.ws/book/10640/211 |
| ⇧4 | كتاب البحر المحيط في التفسير – ط الفكر – 5/141 https://shamela.ws/book/23591/2984 |
| ⇧5 | https://www.islamic-awareness.org/quran/contrad/external/crucify |
| ⇧6 | https://biblehub.com/lexicon/genesis/40-19.htm? |
| ⇧7 | https://stronger.encyclopaediabiblica.com/en/lexeme/H8518 |
| ⇧8 | https://www.biblegateway.com/passage/?search=Genesis%2040%3A18-20&version=KJV |
| ⇧9 | https://www.biblehub.com/commentaries/pulpit/genesis/40.htm |
| ⇧10 | https://www.sefaria.org/Ezra.6.11?lang=bi |
| ⇧11 | https://afii.org/tanakhinterlinear/he/H4223.html |
| ⇧12 | https://www.sefaria.org/Onkelos_Genesis.40?lang=bi |
| ⇧13 | https://daf-yomi.com/Dictionary.aspx?id=8&wordId=75414 |
| ⇧14 | https://en.wikisource.org/wiki/A_Dictionary_of_the_Targumim%2C_the_Talmud_Babli_and_Yerushalmi%2C_and_the_Midrashic_Literature/%D7%A6%D7%9C%D7%90_-_%D7%A6%D7%9C%D7%95%D7%A0%D7%94%D7%90 |
| ⇧15 | https://benyehuda.org/dict/24412/54043 |
| ⇧16 | সূত্র: সহিহ বুখারি, ৪৯৯৪ |
| ⇧17 | ইবনে হাজার, ফাতহুল বারি ৮/৬৫৮ |
| ⇧18 | كتاب مختصر التبيين لهجاء التنزيل – 4/840 |
| ⇧19 | সূত্র: আসবাবুন নুযূল, ওয়াহিদী, সূরা ত্বা-হা ২০:১৩১। – https://quranpedia.net/tafsir/ta-ha/131 |
| ⇧20 | مجمع الزوائد ١/ ١٨٦ |
| ⇧21 | كتاب تفسير القرطبي = الجامع لأحكام القرآن 11/ 262 https://shamela.ws/book/20855/4401 |
| ⇧22 | كتاب مناهل العرفان في علوم القرآن – 2/428 https://shamela.ws/book/7249/1036 |
| ⇧23 | السيرة النبوية (ابن هشام) – 1/293 – সনদ মুনতাকি |
| ⇧24 | সিলসিলাতুল আহাদীস আদ-দাঈফাহ, হাদিস নং ৯০৯, সনদ মুনতাকি |
| ⇧25 | আবু জা‘ফর আল-বুখতারি হাদিসু আবিল ফাদল আহমদ ইবন মুলা‘ইব (৪৭/১–২) এবং ইবন আসাকির (১/১১/৩৬৩; ১৯/৪৪/২০১)-এ আবু ইয়া‘লা প্রমুখের সূত্রে |
| ⇧26 | সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৯৪৩ |
| ⇧27 | সহিহ বুখারি, ৬৪৪৪ |
| ⇧28 | সহিহ বুখারি, ৬৪৫৪ |
| ⇧29 | সহীহ বুখারী, ৬৪৫৮ |
| ⇧30 | সহিহ বুখারি, ২৯১৬ |
| ⇧31 | সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯১৩ |
| ⇧32 | সহিহ বুখারী, ২১৯ |
| ⇧33 | সহীহ বুখারী, ৬০২৪ |
| ⇧34 | সহীহ বুখারি, ৪৯০৫ |
| ⇧35 | সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৭৪২–৩৭৪৩; ফাতহুল বারি, সংশ্লিষ্ট হাদিসের ব্যাখ্যা |
| ⇧36 | আত-তিরমিযি, হাদিস ১৪২৪, সনদ যয়িফ |
| ⇧37 | ইমাম শাওকানি (রহ.) আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত হাদিসকে সহিহ বলেছেন – নাইলুল আওতার ৭/১২৩; শেখ বিন বায (রহ) এটিকে হাসান লি গাইরিহি বলেছেন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবন বায, ২৫/২৬৩; ইমাম আয-যুরকানি (রহ)-ও একই কথা বলেছেন মুখতাসারুল মাকাসিদ, পৃষ্ঠা ৪২; মুহাম্মদ জারুল্লাহ আস-সা‘দি (রহ.)-ও একই কথা বলেছেন আন-নাওয়াফিহুল ‘আতিরাহ, পৃ. ২৫ |
| ⇧38 | সহিহ বুখারি: ৩১৪৯ |
| ⇧39 | সহিহ বুখারি, ৩৪৭৫ |
| ⇧40 | সূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৭৫, ৪৩০৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৮৮। |
| ⇧41 | সূত্র: সহিহ মুসলিমে ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে। মিশকাতুল মাসাবিহের ৩৫৬৬ নম্বর হাদিসেও এর বিবরণ আছে। |
| ⇧42 | শাইখ আলবানী (রহ.) সনদটিকে হাসান বলেছেন, আস-সিলসিলাতুস সহীহাহ, ৬/৬২৯ |
| ⇧43 | ٢٣ – قطع الطريق (الحرابة)
يستعمل أكثر الفقهاء مصطلح (قطع الطريق) تحت باب الحرابة. والحرابة لغة: من الحرب التى هى نقيض السلم، يقال: حاربه محاربة، وحرابا، أو من الحرَب بفتح الراء- وهو السلّب. يقال: حرب فلانا ماله أى: سلبه فهو محروب وحريب. (١) واصطلاحا: الحرابة: قطع الطريق وهو البروز لأخذ مال أو لقتل أو لإرعاب على سبيل المجاهرة مكابرة اعتمادا على القوة مع البعد عن الغوث (٢). وزاد المالكية: محاولة الاعتداء على العرض مغالبة. وقيل من كابر رجلا على ماله بسلاح أو غيره فى زقاق أو دخل على حريمه فى المصر حكم عليه بحكم الحرابة. الحكم التكليفى لقطع الطريق (الحرابة): الحرابة كبيرة من الكبائر، وهى من الحدود باتفاق الفقهاء وسمى القرآن الكريم مرتكبيها محاربين لله ولرسوله – ﷺ – قال تعالى ﴿إنما جزاء الذين يحاربون الله ورسوله ويسعون فى الارض فسادا أن يقتلوا أو يصلبوا أو تقطع أيديهم وأرجلهم من خلاف أوينفوا من الارض﴾ (المائدة ٣٣). ونفى عنهم رسول الله – ﷺ – انتسابهم للإسلام فقال: (من غشنا فليس منا، ومن حمل علينا السلاح فليس منا) (رواء البخارى ومسلم فى صحيحيهما). وقاطع الطريق (المحارب) عند الفقهاء هو كل ملتزم مكلف أخذ المال بقوة فى البعد عن الغوث. إذًا فلابد من توافر عدة شروط حتى يحدّ حد الحرابة على قاطع الطريق وهى: (أ) الالتزام: أن يكون قاطع الطريق (المحارب) ملتزما بأحكام الشريعة بأن يكون مسلما أو ذميا أو مرتدا، فلا يحد الحربى، ولا المعاهد ولا المستأمن (٣). |
| ⇧44 | মাওলানা মওদূদীর তাফসির তাফহিমুল কুরআন, আল-মায়িদাহ ৫:৩৩-এর তাফসিরে |
| ⇧45 | দেখুন, https://app.turath.io/book/23596?page=226 |
| ⇧46 | شروط الحرابة (قطع الطريق):
يشترط لإقامة الحرابة شروط: ١ – التكليف: (البلوغ والعقل) اتفق الفقهاء على أن التكليف شرط في اعتبار الحرابة، واختلفوا في حد من اشترك مع الصبي والمجنون في قطع الطريق. أ- فذهب الأحناف إلى أن الحد يسقط عن الجميع لأنه إذا سقط عن البعض فإنه يسقط عن الجميع لأنها جناية واحدة وهم متضامنون في المسؤولية. ب- وذهب الجمهور من المالكية والشافعية والحنابلة إلى أن الحد إذا سقط عن الصغير والمجنون فإنه لا يسقط عن غيره من المكلفين بل يحدون حد قاطع الطريق (٣). ٢ – أن يكون مع المحاربين سلاح: أ- يشترط الحنفية والحنابلة أن يكون مع المحارب سلاح ولو كان حجارة أو عصى. ب- ولا يشترط المالكية والشافعية حمل السلاح بل يكفي عندهم القهر والغلبة وأخذ المال ولو باللكز والضرب (١). |
| ⇧47 | الشَّرطُ السادِسُ: المجاهَرةُ:
نَصَّ جُمهورُ الفُقهاءِ الحَنفيةُ والمالِكيةُ والشافِعيةُ والحَنابلةُ على أنه يُشترطُ في قُطَّاعِ الطريقِ أنْ يَأتُوا مُجاهَرةً ويأخُذوا المالَ قَهرًا ومُكابَرةً، فأما إنْ أخَذُوه مُختَفينَ فهُم سُرَّاقٌ، وإنْ اختَطَفوهُ وهَرَبوا فهُم مُنتهِبونَ لا قطْعَ عليهِم، وحُكمُهم في القِصاصِ والضَّمانِ كغَيرِهم. وكذلكَ إنْ خرَجَ الواحدُ والاثنانِ على آخِرِ قَافلةٍ فاستَلَبوا منها شَيئًا وهَرَبوا فلَيسُوا بمُحارِبينَ؛ لأنهُم لا يَرجعونَ إلى مَنعةٍ وقُوةٍ، وإنْ خَرَجوا على عَددٍ يَسيرٍ فقَهَروهُم فهُم قطَّاعُ طَريقٍ؛ لاعتِمادِهم على الشَّوكةِ بالنسبةِ إليهِم (٣). هل يُشترطُ عَددٌ مُعيَّنٌ في الحِرابةِ؟ أم تَحصلُ الحِرابةُ ولو مِنْ واحدٍ؟ نَصَّ جُمهورُ الفُقهاءِ الحَنفيةُ والمالِكيةُ والشافِعيةُ على أنه لا يُشترطُ العَددُ، بل الواحِدُ إذا كانَ له فَضلُ قُوةٍ يَغلبُ بها الجَماعةَ وتَعرَّضَ للنُّفوسِ والأموالِ مُجاهَرةً فهو قاطِعُ طَريقٍ (١). |
| ⇧48 | https://app.turath.io/book/30065?print_page=22%2C500 |




