ফিলিস্তিন

তুফানুল আকসা কি বর্বরোচিত ঘটনা ছিল?

অপারেশন আল-আকসা ফ্ল্যাড বা তুফানুল আকসাকে বুঝতে হলে প্রথমেই চিন্তার ফ্রেমওয়ার্ক বদলাতে হবে। সিভিলিয়ান, যুদ্ধ, গাজার পরিস্থিতি এগুলোকে যদি আমরা পশ্চিমা ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে বুঝতে যাই, তাহলে বারবারই ভুল হবে। যেই ছকের শেষ গুটি শত্রু চালে, সেই ছকে আপনি কখনো জিততে পারবেন না।

শুরুর আলাপ

চলুন, হামাসকে আগে বুঝে দেখি। হামাসের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৭ সালে, মুসলিম ব্রাদারহুডের একটি শাখা হিসেবে। সংগঠনটি ইসরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করে না; তাদের কথা হলো, এটি ফিলিস্তিনিদের ভূমি। ইসরায়েলের বদলে তারা পুরো ফিলিস্তিন এলাকা—অর্থাৎ দখলকৃত পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম এবং গাজা জুড়ে একটি ইসলামি রাষ্ট্র গড়তে চায়।[1]What is Hamas and why is it fighting with Israel in Gaza?

হামাসের হাই-কমান্ড ৭ অক্টোবরের হামলাকে প্রকাশ্যে সমর্থন করে এটিকে একটি ‘সোনালী মুহূর্ত’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাদের মতে, এই হামলা ফিলিস্তিন ইস্যুকে আবার নতুন জীবন দিয়েছে এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের দিকে পুরো বিশ্বের নজর ফেরাতে বাধ্য করেছে।

তুফানুল আকসা কি বর্বরোচিত ঘটনা ছিল?
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পবিত্র প্রতিরোধ যুদ্ধে শহিদ হওয়া চার বিখ্যাত হামাস যোদ্ধা।

হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা গাজী হামাদ এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে দীর্ঘদিন ধরে চলা অবরোধ ভাঙতে, মধ্যপ্রাচ্যের থমকে থাকা পরিস্থিতি নাড়া দিতে এবং বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা দখলদারিত্বের বিষয়ে বিশ্বজুড়ে যে উদাসীনতা তৈরি হয়েছিল, তা ভাঙতেই এই অভিযানের প্রয়োজন ছিল।[2]Senior Hamas official defends ‘high price’ of Oct 7 for Palestinians, saying attack created ‘golden moment’

দলটির সমর্থক ও শীর্ষ নেতারা মনে করেন—হামাসের ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’ নামে চালানো এই আকস্মিক ও বহুমুখী হামলাটি বছরের পর বছর ধরে চলা কূটনৈতিক স্থবিরতার পর বিশ্বকে আবার মনে করিয়ে দিয়েছে যে, এই রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত সংঘাতের সমাধান এখনো হয়নি। তারা এও বলেছে যে, জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণ দখল করার যে চেষ্টা ইসরায়েল চালাচ্ছিল এই হামলা ছিল তারই একটি প্রতিক্রিয়া।

ফিলিস্তিনে হামাসের সমর্থন

অনেক বড় একটা দাবি হলো, ফিলিস্তিনের অধিকাংশ মানুষই হামাসকে সমর্থন করেন না। দাবিটা এক দিক থেকে সঠিক, কিন্তু এর পরেই যেই সিদ্ধান্তে সবাই পৌঁছায় অর্থাৎ অধিকাংশ ফিলিস্তিনিই হামাসকে অপচ্ছন্দ করে–এটা পুরোপুরি ভুল। আমি আপনাদেরকে জরিপ ও পরিসংখ্যান দিয়ে বুঝাবো ব্যাপারটা।

পিসিপিএসআর-এর ২০২৬ সালের আগষ্টের জরিপে পশ্চিম তীর ও গাজার ১,২৭০ জন অংশ নেয়। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক দল হিসেবে হামাসকে সমর্থন করেন ২৪% উত্তরদাতা; ফাতাহকেও সমর্থন করেন ২৪%। ৩৮% কোনো দলকে সমর্থন করেননি অথবা মত জানাতে পারেননি। এখন ৩৮% যে কাউকেই সমর্থন করেনি, এর মানেই এই না যে তারা সবাই হামাসবিরোধী। মূলত তারা সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি বলেই সমর্থন বা কোনো পক্ষের প্রতি মত জানানোর মধ্যে যাননি। [3]Palestinian Politics After the Gaza War: Elections, the Decline of Hamas, and Changing Prospects for Israeli-Palestinian Peace

আর আরব ব্যারোমিটার-এর ২০২৫ সালের অক্টোবরের এক জরিপে দেখা যায়, রাজনৈতিক পক্ষ সমর্থনের ক্ষেত্রে ২৪% হামাসের কথা বলেছেন, ১৮% ফাতাহর কথা বলেছেন। ৫১% বলেছেন, তাঁরা কোনো দলকে সমর্থন করেন না, জানেন না অথবা উত্তর দিতে চাননি। এই জরিপ দিয়েও প্রমাণিত হয় না যে অধিকাংশ হামাসবিরোধী। এমনকি জরিপ পরিচালনাকারীরাই জানিয়েছে যে এই অল্প সংখ্যক প্রশ্ন দিয়ে আসলে গাজার মানুষের রাজনৈতিক চিন্তা পুরোপুরি বুঝা সম্ভব না। [4]Palestinians Want a Two-State Solution – Arab Barometer

তুফানুল আকসা কি বর্বরোচিত ঘটনা ছিল?
হামাসের সমর্থন বিষয়ক দুটো জরিপের ফলাফল। ইনফোগ্রাফিক: তাহসিন আলম উৎস

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ করুন: পশ্চিম তীরে হামাসের রাজনৈতিক সমর্থন গাজার তুলনায় কম হলেও, ইসরায়েল সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার আগে হামাসের অস্ত্র ত্যাগের বিরোধিতা করেন সেখানকার আরও বেশি মানুষ।

এখন পরিসংখ্যানিকভাবেও নিপীড়ত মানুষগুলো যে একেবারে হামাসের বিরুদ্ধে চলে গেছে, ব্যাপারটা এমন না। আর তাছাড়া জনগনের মতের শতাংশ দেখে কোনো সংগঠনকে একতরফাভাবে ভালো বা মন্দ বলা যেতে পারে না। এটার উপর ভিত্তি করে কোনো গোষ্ঠীর কোনো মিশন বা অপারেশন ভালো বা খারাপ হয়ে যেতে পারে না।

হামাস কি ইহুদি নারী ধর্ষণ করেছিল?

আচ্ছা, আপনার উপরে একটা প্রশ্ন ছেড়ে দিই। ধরুন, আমি, আপনি, আপনার ভাই আর আমার বন্ধু মিলে আমরা একটা অপারেশনে গেলাম। আমাদেরকে শত্রুর বাঙ্কারে ঢুকে হামলা চালিয়ে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে আবার ফিরে আসতে হবে। তা না হলে আশেপাশের ঘাঁটি থেকে আমাদের উপর হামলা করে সাথে সাথেই ঘায়েল করা হবে। আর একবার যদি গ্রেফতার করতে পারে, তাহলে হেডকোয়ার্টারে নিয়ে গিয়ে এই অপারেশনের মাস্টারমাইন্ড কে বা কারা সেটা বের করার জন্য পাশবিক নির্যাতন চালাবে।

এখন আপনি বলুন, এই পরিমাণ চাপ নিয়ে আমার বন্ধু কি কোনো নারীর পোশাক খুলে, নিজের পোশাক খুলে অপকর্ম করবার মতো সুযোগ বা সময় কি পাবে? সুযোগ পেলেও কি তার ফিরে যাওয়ার চিন্তা থেকে যৌন লালসা পূরণ করার চাহিদা বেশি ভারী হবে? আজ রাতে ঘুমানোর আগে প্রশ্নটা নিয়ে চিন্তা করবেন।

যাহোক, এবার আসি জাতিসংঘ [5]Following visit to Israel and the occupied West Bank, UN Special Representative of the Secretary-General on Sexual Violence in Conflict, Ms. Pramila Patten, finds sexual violence occurred on 7 October, and against hostages and calls for a fully-fledged investigation – Press Release আর হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কথায়। তাদের আলাদা আলাদা প্রতিবেদনে একটা কথা বলা হয়েছে যে ইসরায়েলে ঐদিন ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সেটা যে হামাসের হাই-কমান্ডের নির্দেশনায় হয়েছে বা হামাসের কেউ করেছে এমন প্রমাণ দুই সংস্থার কোনটিই পায়নি। আর হিউম্যান রাইটস ওয়াচ স্পষ্ট করেছে, তাদের তদন্তকারীরা ৭ অক্টোবরের হামলার সময় সংঘটিত ধর্ষণের কোনো ভুক্তভোগী বা প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে নিজেরা যাচাইযোগ্য সাক্ষ্য সংগ্রহ করতে পারেননি। [6]Questions and Answers: The Hamas-Led Armed Groups’ October 7, 2023 Assault on Israel

এদিকে আল-জাজিরার অনুসন্ধানে বলা হয় যে সিসিটিভি, ড্যাশক্যাম, ব্যক্তিগত ফোন এবং নিহত হামাস যোদ্ধাদের হেডক্যামের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ধারণকৃত ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আক্রমণের পরবর্তী দিনগুলোতে যেসব গল্প বা দাবি ছড়িয়ে পড়েছিল তার অনেকগুলোই মিথ্যা ছিল। এসবের মধ্যে রয়েছে শিশুদের গণহারে হত্যা ও শিরশ্ছেদের দাবি এবং ব্যাপক ও নিয়মতান্ত্রিক ধর্ষণের অভিযোগ। এসব গল্পকে ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্বের রাজনীতিবিদরা বারবার ব্যবহার করেছিলেন গাজা ভূখণ্ডে তাঁদের পরবর্তী ভয়াবহ বোমা হামলাকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে। [7]October 7: Forensic analysis shows Hamas abuses, many false Israeli claims

তুফানুল আকসা কি বর্বরোচিত ঘটনা ছিল?
হামাসযোদ্ধাদের ইসরায়েলের দখল করা ভূখন্ডে প্রবেশের পরের একটি দৃশ্য

এখন কথা হলো, তাহলে যেই নারীরা ইসরায়েলের ভূমিতে ধর্ষণের শিকার হয়েছে, তাদেরকে কারা ধর্ষণ করলো? এই প্রশ্নের অনেক কন্সপিরেসি থিওরি আছে, অনেক সম্ভাবনার কথাও আছে। তবে সেগুলো উদ্ঘাটন না হওয়া দিয়ে হামাসকে কোনোভাবেই দায়ী করা যায় না।

সিভিলিয়ান হত্যা কীভাবে স্বাধীনতা আন্দোলন হয়?

এরপর অনেকের দাবি, হামাস সিভিলিয়ান বা বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করে কেমন স্বাধীনতা আন্দোলন চালালো? এখানেও চিন্তার জটলা। সিভিলিয়ান কারা? রাষ্ট্রকে কর দেয় এমন কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ যুদ্ধের সময় সিভিলিয়ান হিসেবে বিবেচিত হয় না। কারণ তারা প্রত্যেকেই যোদ্ধার সমতুল্য।

এবার আসি নারীদের কথায়। হ্যাঁ, হামাসের হামলায় অনেক ইহুদি নারী মারা গিয়েছিল। কিন্তু এখানে যুদ্ধের নীতি বুঝতে হবে। প্রথমত, যেই স্থানে অপারেশন চালানো হয়েছে, সেটা কিন্তু ইসরায়লের নিজস্ব কোনো ভূখন্ড না। বরং ফিলিস্তিনের কাছ থেকে জোর করে কেড়ে নেওয়া একটা অঞ্চল। তার উপর আবার অসভ্য ইহুদিরা এসে অবৈধ বসতি স্থাপন করেছে। তাহলে সেখানে বসতি স্থাপন করা নারীরা কীভাবে নিরাপরাধ বা নিরীহ হয়?

আরও একটা কথা আছে। দিফায়ী জিহাদ বা আত্মরক্ষামূলক জিহাদের ক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের উপর হামলা করতে গিয়ে যদি সেখানকার কোনো নারী বা শিশু নিহত হয়, তবে সেই দায়ভার মুজাহিদদের নয়। কারণ সেই নারী-শিশুদের সুরক্ষা প্রদান করা ঐ শত্রুপক্ষের দায়িত্ব। কিন্তু তারা যদি নারী-শিশুদেরকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এবং সেই সুযোগ নিয়ে দিনকে দিন আগ্রাসী হয়ে উঠতে থাকে, তখন মুজাহিদদের অধিকার আছে তারা যেকোনো স্বসস্ত্র পদক্ষেপ নিবে, তবে এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট করে কোনো নারী বা শিশুকে টার্গেট করা যাবে না। হামাস এমন করে টার্গেট করেওনি।

Read More...  ইসরায়েলি কারাগারে কুকুর দিয়ে ধর্ষণ

ইসরায়েলি সোর্স অনুযায়ী, হামাসের হামলার বড় একটা অংশ ছিল মর্টার আর রকেট নিক্ষেপ। [8]Detailed findings on attacks carried out on and after 7 October 2023 in Israel আর এখানে নারী-শিশু বা নারীদের থাকার জায়গা কিংবা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করা হয়নি, যেমনটা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল করে।

এবার আসি, এটা কীভাবে স্বাধীনতা আন্দোলন হলো সেই প্রসঙ্গে। দেখুন, ২০২৩ সালে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সৌদি আরবের আজকের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান বলেন যে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে দুই দেশ প্রতিদিন আরও কাছাকাছি যাচ্ছে।[9]Saudi Crown Prince interview with Fox News – Al Arabiya English কিন্তু তুফানুল আকসার পরে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। গাজায় যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর তার প্রভাব সৌদি আরবের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার বদলে দেয়। [10]Saudi Arabia puts Israel deal on ice amid war, engages with Iran: Report

তুফানুল আকসা কি বর্বরোচিত ঘটনা ছিল?
ফক্স নিউজ-এ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাক্ষাৎকার। ছবি: Al Arabiya English

হামাসের এই হামলা নিঃসন্দেহে স্বাধীনতা আন্দোলনের অংশ ছিল। ইসরায়লের আধিপত্যকে আঘাত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে এই অপারেশনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। অনেকের মতে, এই হামলা না হলে স্বয়ং সৌদি আরব ইসরায়েললে স্বীকৃতি দিয়ে দিতো। এরপর ধীরে ধীরে অন্য আরব রাষ্ট্রগুলোও সেই পথে পা বাড়াতো। তখন মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের অবস্থান, আগ্রাসন এবং অর্থনৈতিক বলয় আজকের তুলনায় বহুগুণ শক্তিশালী হতো।

ফিলিস্তিনিদের উপর নিপীড়ন বেড়েছে?

অনেকের দাবি, হামাস যদি ৭ই অক্টোবরের হামলা না করতো, তাহলে ইসরায়েল এতো বর্বর হতো না। আপাতদৃষ্টিতে এই যুক্তিকে যৌক্তিক মনে হলেও এটা ভূরাজনৈতিক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ছাড়া কিছুই না।

প্রথমত, ইসরায়েল আগাগোড়াই গ্রেটার ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে অনেক আগে থেকেই। এটার জন্য তারা যেকোন আগ্রাসন চালাতে পারে। আমরা আগেই দেখলাম যে তুফানুল আকসা না হলে ইসরায়েল কীভাবে বিভিন্ন আরব রাষ্ট্রের কাছ থেকে স্বীকৃতি পেতো। এই স্বীকৃতির পরে তাদের হামলার গতি আরও বাড়তো এবং গাজা আরও দ্রুত ধ্বংস হতো।

পরিসংখ্যান অন্তত তাইই বলছে। ২০২২ সালে ১৪৬ জনকে হত্যা করে দখলদার ইসরায়েল। আর জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তর (OCHA)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ইসরায়েলিদের হাতে মোট ২৩৭ জন ফিলিস্তিনি শহিদ হয়েছিলেন।[11]2023 Report on International Religious Freedom: Israel, West Bank and Gaza: West Bank and Gaza যদিও এই সংখ্যা নিয়ে মতপার্থক্য আছে, তবে এই সংখ্যা কোনোভাবেই ২০৫ এর কম না। আর কারো কারো মতে এটা ২৪৭ পর্যন্তও হতে পারে।

তাহলে যদি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছ থেকে ইসরায়েল স্বীকৃতি পেয়ে যেতো এবং তাদেরকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো কোনো শক্তির আবির্ভাব না ঘটতো তাহলে কি এই হামলা বন্ধ হয়ে যেতো নাকি আরও বাড়তো? উপরন্তু, আল-আকসার পরিচালনাপদ্ধতি থেকে শুরু করে অনেক কিছুই আমূল বদলে ফেলতো দখলদার ইসরায়েল। ফিলিস্তিনিদের উপর সুস্পষ্ট হামলার ইতিহাস ২০২৩ থেকে নয়, বরং ১৯৪৮ থেকে শুরু হয়েছে।

১৯৪৮ সালের এপ্রিলে দেইর ইয়াসিন গ্রামে ইরগুন ও লেহির মতো ইহুদি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে ফিলিস্তিনি আরবরা নিহত হন।[12]Historical timeline on the question of Palestine একই সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ, উচ্ছেদ ও পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। একই বছর মে মাসে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোর সেনাবাহিনী যুদ্ধে প্রবেশ করে। এসময় প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে তাদের নিজ ঘরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয় এবং ৫০০টিরও বেশি গ্রাম ধ্বংস করা হয়।[13]Israel-Palestine conflict: A brief history in maps and charts – Al Jazeera

তুফানুল আকসা কি বর্বরোচিত ঘটনা ছিল?
নাকবা গণহত্যার পর ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত হওয়ার দৃশ্য। ছবি: Institution for Palestine Studies

তুফানুল আকসার ব্যাপারে আমাদের মূল্যায়ন

অনেকেই জানতে চান যে ৭ই অক্টোবরের ঘটনার প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে। এ ব্যাপারে প্রখ্যাত দাঈ, গবেষক ও লেখক প্রফেসর ড. ইয়াদ কুনাইবি বলেন, “আল-আকসা ফ্ল্যাড বা মর্যাদার প্লাবনের অন্যতম প্রধান প্রভাব হলো—এটি জায়নবাদীদের অহংকার চূর্ণ করেছে, তাদের লজ্জিত ও শোকাচ্ছন্ন করেছে এবং চূড়ান্তভাবে বিভ্রান্ত ও অসহায় করে তুলেছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমার ভাইয়েরা, ‘আল-আকসা ফ্ল্যাড’ জায়নবাদী শক্তির ভেতরে এমন এক ফাটল তৈরি করেছে যা আর কখনো মেরামত করা সম্ভব নয়। আর আল্লাহর হুকুমে, এটিই বিজয়ের পথের আসল সূচনা। আমরা হয়তো তীব্র কষ্ট ও বেদনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি এবং অধৈর্য মানুষদের প্রত্যাশার চেয়ে বিজয়ের আগমন কিছুটা বিলম্বিত হতে পারে, কিন্তু আমরা বিজয়ের পথের শুরুতেই আছি। তাই আনন্দিত হোন, সুসংবাদ ছড়িয়ে দিন এবং এই বিজয়ের অংশীদার হতে কাজ করে যান।” [14]To Disfigure Your Faces – Eyad Qunaibi, November 6, 2023

শেষ কথা

আচ্ছা, একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন? আমরা যারা ৭ই অক্টোবরের ঘটনা নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগি, তারা ভাবি যে হামাস এভাবে কেন হামলা করলো? ইসরায়েল খারাপ বলেই কি ‘সিভিলিয়ান’ মারতে হবে? কিন্তু আমরা কি প্রশ্ন করি যে হামাস তাদের নিজেদের ভূমিতে অবৈধভাবে বসবাসকারী মাত্র ১২০০ (ইসরায়েলি হিসাবে) মানুষ মারলো বলে ইসরায়েল কোন অধিকারে ৭৪০০০ এর বেশি মানুষকে মেরে ফেললো?

আমরা ভাবি যে হামাস হয়ত ঐ বরকতময় দিনে নারী ও শিশুদেরকে টার্গেট করে মেরেছিল, যার কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু ইসরায়েল তো টার্গেট করে স্নাইপারের মাধ্যমে শিশুদেরকে মেরেছে, আমাদের বোনদেরকে কারাগারে কুকুর দিয়ে ধর্ষণ করিয়েছে। হামাস যুদ্ধবন্দিদেরকে সহীহ সালামত মুক্তি দিলেও ইসরায়েল মানসিকভাব বা শারীরিকভাবে অসুস্থ করে ছাড়ে কেন? আমরা এই প্রশ্নগুলো কি করতে পারি?

হ্যাঁ, হামাসের কর্মপদ্ধতি নিয়ে সমালোচনার জায়গা আছে। এমনকি শুরুর দিকে তাদের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগও ছিল। আল-কায়েদার সাথে তাদের বিশাল সংঘাতও চলেছে এক কালে। কিন্তু এগুলো আসলে কোনটাই অপারেশন আল-আকসা ফ্ল্যাড বা তুফানুল আকসার গুরুত্বকে নাকচ করে দেয় না। এগুলোর কোনটা দিয়েই গাজার প্রতিরোধ যোদ্ধাদের অবদান ধুলিস্যাৎ হয় না।

তুফানুল আকসা কি বর্বরোচিত ঘটনা ছিল?

আসলে আমাদের চিন্তার কাঠামোতে সমস্যা। এর ফলে নাস্তিক, ইসলামবিদ্বেষী বা সেক্যুলারদের সামান্য আঙুল তোলাতেই আমরা বেঁকে যাই, ভড়কে যাই। আমাদের শিকড় সম্পর্কে আমরা অবগত নই, জানি না মুক্তির পথ। আত্মপরিচয়ের এই সংকট থেকে দ্রুতই বেরোতে হবে। এখনো যে অনেক দূর যাওয়ার বাকি!

খায়বার খায়বার, ইয়া ইয়াহুদ।
জায়শু মুহাম্মদ, সাউফা ইয়াউদ!

Citation is loading...
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Back to top button