জিহাদ সম্পর্কিত প্রশ্ন

প্রশ্নোত্তর (Q&A)Category: ইসলামজিহাদ সম্পর্কিত প্রশ্ন
কতিপয় ওরিয়েন্টালিস্টের দাবি,  ইসলামের প্রাথমিক যুগে সংঘটিত জিহাদ সমূহ কোন ঐশ্বরিক বিশ্বাসের দ্বারা সংঘটিত হয় নি। উইকিপিডিয়ার তথ্যসমূহও সেরকমই বর্ননা করে। নাখলা অভিযান সহ অন্যান্য অভিযান গুলো লুটতরাজ আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। ইসলামের ইতিহাসের জিহাদ সমূহের উদ্দেশ্যই ছিল নাকি উর্বর ভূমি সমূহ ও মালে গনীমত দখল কারণ মদিনার আরবেরা যথেষ্ট অভাবগ্রস্থ ছিল। আমরা মালে গনীমতের সংজ্ঞা জানতে চাই। ইসলামের ইতিহাসের যুদ্ধ সমূহের সঠিক ও সহীহ বর্ণনা সহকার সংক্ষিপ্ত আলোচনা হলে ভাল হয়। কারণ এই যুদ্ধ সমূহকে অনেক বিতর্কিত করা হয়। তাবূক যুদ্ধ সম্পর্কেও অপপ্রচার চালানো হয় যে মদিনার অভাব দূর করার জন্য রোম সাম্রাজ্য আক্রমণ করা হয়,কিন্তু যখন বিনা যুদ্ধেই যথেষ্ট জিজিয়া আদায় হয়ে যায় তখন তাবূক অভিযানের প্ল্যান ক্যান্সেল করা হয়। তাবূক অভিযান থেকে কি প্রমাণ পাওয়া যায় না যে জিহাদের উদ্দুশ্য শুধু ভূমি দখল, জিজিয়া বা গনীমত? তাবূক অভিযান কি রোমদের পক্ষ থেকে শুরু হয় না মুসলিমদের? যদি দ্বীনি ভাইয়েরা একটু বিভ্রান্তির অপনোদন করতেন। 
1 Answers
Ashraful Nafiz Staff answered 7 months ago

(১) ওরিয়েন্টালিস্টরা কি ইসলামকে সত্য মেনে নিয়েছিল? রাসূলকে আল্লাহর নবী মেনে নিয়েছিল? তারা কি ইসলামকে আল্লাহর এক মাত্র মনোনিত ধর্ম বলে বিশ্বাস করেছিল? করে নি।

তাহলে তারাতো এটা বলবেই যে ইসলামের প্রাথমিক যুগে সংঘটিত জিহাদ সমূহ কোন ঐশ্বরিক বিশ্বাসের দ্বারা সংঘটিত হয় নি। আপনি বললেন প্রাথমিক যুগের গুলোকে তারা ঐশ্বরিক বিশ্বাসের দ্বারা সংঘটিত হয় নি বলেছে তার মানে কি তারা পরবর্তি যুগের গুলোকে ঐশ্বরিক বিশ্বাসের দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল? অবশ্যই না। তারা যেখানে ইসলামকেই সত্য মানে না সেখানে তারা যে এগুলোকে আল্লাহর আদেশে বা দেওয়া বিদ্বানের ভিত্তিতে হয়েছে এটা কি করে বিশ্বাস করবে? বা স্বীকৃতি দিবে!? তাদের কথায়, দাবিতে অবাক হওয়ার বা চিন্তিত আদো কিছু আছে? কোন উহুদি খ্রিষ্টান কি রাসূল (ﷺ)-কে শেষ নবী, আল্লাহর প্রেরিত নবী মানবে? অবশ্যই না। কারন তারা যদি মানতো এটা তাহলেতো তারা ইসলামই গ্রহন করে নিত! একই ভাবে ওরিয়েন্টালিস্টরা যদি আসলেই ইসলামকে সত্য মেনে নিত তাহলেতো আর এমন কোন মন্তব্য করতো না। কোরআন হাদিসে জিহাদের কথা আছে, ওরিয়েন্টালিস্টরাতো দাবি করবেই এগুলো মুসলিমদের বানানো বিধান।

প্রেক্ষাপট ও বিস্তারিত তথ্য দেওয়া ছাড়া ইতিহাসের খন্ড খন্ড অংশ দেখিয়ে যে কেউই দাবি করতে পারে বিভিন্ন অভিযান বা যুদ্ধে নির্দিষ্ট দোষী বা তারাই অপরাধী। ঠিক একই কাজ মুসলিমদের বিভিন্ন অভিজানের ক্ষেত্রেও করা হয়ে থাকে, বিস্তারিত প্রেক্ষাপট না জানিয়ে খন্ডাংশ ইতিহাস দেখিয়ে বিভিন্ন অভিজানতে বহু মুর্খ লুটতরাজ আখ্যায়িত করেছে।

যেমন বঙ্গবন্ধুন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার উদাহরন টানতে পারি আমরা, তিনি সেখানে গিয়েছিলেন, ভারতিয় ‘র’ এবং বিভিন্ন সামরিক বাহিনির অফিসারসহ বিভিন্ন নেতা-কর্মীদের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন, দেশকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। মামলা ষড়যন্ত্র সবই কিন্তু সত্য, কিন্তু তারপরও বঙ্গবন্ধুর কাজটাকে আমরা বেঠিক বলছি না, আমাদের কাছে এইটা খারাপ নয়, অন্যায় কাজ নয়, আমরা এটাকে ষড়যন্ত্র মামলা বলতে চাই না। পাকিস্তানের কাছে এই কাজ খারাপ, অন্যায়, ষড়যন্ত্র, দেশদ্রোহিতা হলেও কিন্তু আমাদের কাছে এসব কিছুই না, বরং আমাদের কাছে ঠিক বিপরীত, কিন্তু কেন? কারন পকিস্তান-বাংলাদেশের বিস্তারিত ইতিহাস, প্রেক্ষাপট দেখলেই আমরা বুঝতে পারি বঙ্গবন্ধুর কাজটা যৌক্তিক ছিল, অন্যায় ছিল না, এমনকি আবশ্যক ছিল বলা যায়। আমাদের ও পরিস্থিতির সাপেক্ষে তিনি ভুল করেন নি, তিনি সঠিকটাই করেছিলেন। ঠিক একই ভাবে বিস্তারিত ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট দেখলে আপনি ইসলামের অভিজানগুলোকে লুটতরাজ আখ্যায়িত করতে পারবে না। (যেগুলো রাসূল ও খলিফারা নিজে করিয়েছিলেন)

(২) দারুল হরবে অভিযান চালিয়ে যুদ্ধের মাধ্যমে হারবিদের যে সম্পদ জব্দ করা হয় তাকে গনিমত বলে। গনিমত থেকে খুমুস নেয়া হবে। তথা এর এক পঞ্চমাংশ বাইতুল মালে জমা নেয়া হবে। গনিমত থেকে যে খুমুস নেয়া হবে, সেটার হকদার মূলত গরীব ও অভাবি মুসলমানগণ।

মানুষের ঘরে প্রবেশ করে তাদের থেকে তাদের সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া গণিমত নয়। ইসলাম যদি অর্থ-সম্পদের জন্যই যুদ্ধ করত তাহলে প্রপার নিয়মে যুদ্ধ না করে কাপুরুষদের মত আক্রমন করে সম্পদ নিয়ে চলে গেলেইতো হত। তাহলে তো আর কারো জীবন হারাতে হত না কখনো!

(৩) অহংকার, বীরত্ব প্রকাশ ও সুনাম-সুখ্যাতি লাভের জন্য জিহাদ করলে, তার যে ইমাম বা নেতা থাকবে সেই নেতার আনুগত্যের খিলাফ গিয়ে কোন কিছু করলে, অন্যায়, অনিয়ম অরাজকতার সৃষ্টি করলে সে মুজাহিদ হিসেবে গণ্য হবে না, সে জিহাদের কোন সওয়াব পাবে না, সে যুদ্ধরত অবস্থায় মারা গেলেও সে শহিদ হিসেবে গণ্য হবে না কারন তার করা যুদ্ধ জিহাদ হিসেবে গণ্য হবে না। [1] একই কথা যে অর্থ, গণিমত ইত্যাদি লাভের উদ্দেশ্যে, গণিমতের লোভে জিহাদের অংশ ন্যায় তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, তার জিহাদ কবুল হবে না। [2]

আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোন নিয়তে যুদ্ধ করলে সেটা জিহাদ হিসেবে কবুল হবে না।

(৪) ইসলামে যুদ্ধ নিয়ে বহু বই পাবেন মার্কেটে, সেগুলোর কয়েকটা পড়ার উপদেশ থাকবে। যেমন ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ, ইসলামের ইতিহাস : নববী যুগ থেকে বর্তমান, লস্ট ইসলামিক হিস্ট্রি, মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো? ইত্যাদি।

(৫) তাবুক যুদ্ধের বহু আগে মুতার যুদ্ধ সংঘঠিত হয়, যদিও এই যুদ্ধ কেন সংঘঠিত হয়েছিল এই বিষয়ে গ্রহনযোগ্য কোন বর্ণনা উঠে আসে নি। যুদ্ধ সংঘঠিত হওয়ার মূল কারন কি ছিল তা আমাদের অজানা, যদিও কিছু বর্ণনা মতে যুদ্ধ মুসলিম দূতকে হত্যা করার কারনে হয়েছিল বলে বলা হয়েছে, কিন্তু তা মাতরুক হাদিস হওয়ায় গ্রহনযোগ্য না। যাইহোক সেই যুদ্ধে যদিও মুসলিমরা ঠিক জয় লাভ করে বলা যায় কিনা আমার জানা নেই, কিন্তু রোমান বাহিনির জন্যও ঠিকই যুদ্ধটা পরাজয়ের সমতুল্য ছিল। ২ লক্ষ বাহীনি নিয়ে মুসলিমদের শুধু ৩ হাজার বাহিনিকে ঠেকাতে না পারাটা পরাজয়ের চাইতে কোন অংশে কম নয়। এছাড়া রোমাররা যেভাবে প্রস্তুত ছিল আগ থেকে রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াস এসময় এক লাখ সৈন্য, লাখাম, জুযাম, ক্বাইন, বাহরা ও বালী প্রভৃতি আরব-খ্রিষ্টান গোত্র সমূহের আরো এক লাখ যোদ্ধা নিয়ে তা থেকে এমনটাই মনে হয় যে যুদ্ধটা মূলত তাদের পক্ষ থেকেউ উসকানির কারনে শুরু হয়েছিল। [3]

এই ঘটনার পরে পরবর্তিতে বিভিন্ন জন রোমান ও খ্রিষ্টানদেরকে বিভিন্ন ভাবে উচকাতে থাকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার, আশ্বাস দেয় তারা জয় লাভ করবে। সেগুলোর পর ৯ম হিজরিতে রোমানরা গোপনে ৪০ হাজারের এক বিশাল বাহিনি নিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। তার খবর মদিনায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন এমনিতেই আবহাওয়া সেইরকম ছিল যার কারনে মুসলিমদের অভাব চলছিল তখন। এই সংবাদের পর মদিনা বাসি আরো অস্থির হয়ে পড়ে, চারিদিকে চিন্তা, দুঃচিন্তা বেড়ে যায়। যার কারনে পরিস্থিতি সামলাতে আরব এলাকায় রোমকদের প্রবেশ করার আগেই তাদেরকে তাদের সীমানার মধ্যেই তাদেরকে আটকে দিয়ে আরব ও মুসলিম এলাকাকে রক্ষা করতে রাসূল যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রকাশ্যে যুদ্ধের প্রস্তুতির ঘোসনা দেওয়া হয়, পরবর্তিতে প্রস্তুতি শেষে রোমান বাহিনির দিকে অগ্রসর হয় ৩০ হাজারের এক বিশাল মুসলিম বাহিনি।

তাবুকে অবতরণ করার পর রোমান বাহিনি ও তাদের মিত্র বাহিনি এ সংবাদ পেয়ে ভীত হয়ে পরে, মোকাবেলা করার সাহস তারা হারিয়ে ফেলে ও বিভিন্ন যায়গায় পালিয়ে যেতে থাকে। এসব ঘটার পরে আয়লা, জারবা এবং আজরুহ, দুমাতুল জান্দালের প্রশাসকদের সাথে নাবী কারীম (ﷺ) কর দানের স্বীকৃতি নিলেন ও বিভিন্ন সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করলেন। [4]

তথ্যসূত্রঃ-

[1] আবূ দাঊদ ২৫১৫, নাসায়ী ৩১৮৮, সহীহাহ্ ১৯৯০, সহীহ আত্ তারগীব ১৩৩৩

[2] আবূ দাঊদ ২৫১৬-১৮, ২৫২৭; সহীহ আত্ তারগীব ১৩২৯

[3] ডঃ মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, “নবীদের কাহিনী”, হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) - মাদানী জীবন, অনুচ্ছেদ:- মুতার যুদ্ধ ৮ম হিজরীর জুমাদাল ঊলা

[4] আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী, “আর-রাহীকুল মাখতূম”, অনুচ্ছেদ:- তাবুক যুদ্ধ নবম হিজরীর রজব মাসে ; ডঃ মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, “নবীদের কাহিনী”, হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) - মাদানী জীবন, অনুচ্ছেদ:- ‘তাবূক যুদ্ধ ৯ হিজরি রজম মাস’ - ‘বিনা যুদ্ধে শহীদ, যুল বিজাদায়েন’

Back to top button