সুষ্ঠ জ্ঞান, মানব স্বভাব ও মৌলিক শিক্ষার মানদণ্ডে হিন্দুধর্ম

⌘K
  1. Home
  2. Docs
  3. সুষ্ঠ জ্ঞান, মানব স্বভাব ...
  4. ২০। কীভাবে জানলাম যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা রাসূল?

২০। কীভাবে জানলাম যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা রাসূল?

উত্তর: অসংখ্য অলৌকিক বিস্ময়কর দলীল, যেগুলো অর্থগত মুতাওয়াতির ও পরিপূর্ণ ইয়াকীন তথা নিশ্চিত বিশ্বাস জন্ম দেয়।
অ্যারিস্টটল তার সামগ্রিক কাজের দ্বারা প্রমাণ করেছেন, সে একজন দার্শনিক। তার দেওয়া একক বিবৃতি বা তার দ্বারা পরিচালিত একটি দার্শনিক বিশ্লেষণ দ্বারা নয়।
এবং হিপোক্রেটিস তার সামগ্রিক চিকিৎসা প্রকল্পের দ্বারা প্রমাণিত সে একজন চিকিৎসক। তিনি একটি একক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নয়।
একইভাবে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে বর্ণিত অলৌকিকতার বিভিন্ন প্রমাণ, যা অর্থগত মুতাওয়াতির এবং পরিপূর্ণ ইয়াকীন বা নিশ্চিত বিশ্বাসের জন্ম দেয় যে, তিনি একজন নবী।
তুমি যদি তার তথা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী লক্ষ্য কর, তাহলে দেখতে পাবে যে, তিনি সত্যবাদী ছিলেন এবং তার সত্যবাদিতার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলে। যারা তার প্রতি সবচেয়ে বিদ্বেষী ছিল তাদের স্বীকারোক্তি দ্বারাই এবং তিনি কখনোই মিথ্যা বা অনৈতিকতার অভিযোগে অভিযুক্ত হননি। তারপরে তিনি অদৃশ্যের ব্যাপারে খবর দিতে লাগলেন, আর তা হুবহু ঘটতেও লাগল। তার আগে প্রথম দিন থেকে যে বিশ্বাসের আহ্বান জানিয়েছিলেন তা সকল নবীদের বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। এবং তুমি এটাও দেখতে পাচ্ছ যে, তিনি সেই ব্যক্তি যার আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন সকল নবীগণ। এছাড়াও হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলো তার আগমণের শত শত বছর আগে থেকে তার ব্যাপারে সুসংবাদ দিচ্ছে। এ সবই তার রিসালাতের সত্যতা সম্পর্কে মুতাওয়াতির পর্যায়ের সংবাদ এবং পরিপূর্ণ ইয়াকীন বা নিশ্চিত বিশ্বাসের জন্ম দেয়।
তারপরেও তিনি যা নিয়ে এসেছেন তথা আল-কুরআনুল কারীম, তার থেকে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে?
আল-কুরআন হচ্ছে এমন গ্রন্থ, যার মাধ্যমে আল্লাহ বাক-রীতিতে পারদর্শী জাতিকে চ্যালেঞ্জ করেছেন এ মর্মে যে, তারা যেন এর মত একটি গ্রন্থ নিয়ে আসে, অথবা কমপক্ষে একটি সূরা নিয়ে আসো; অথচ তারা তাতে সক্ষম হয়নি।
﴿أَمۡ يَقُولُونَ ٱفۡتَرَىٰهُۖ قُلۡ فَأۡتُواْ بِسُورَةٖ مِّثۡلِهِۦ وَٱدۡعُواْ مَنِ ٱسۡتَطَعۡتُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ إِن كُنتُمۡ صَٰدِقِينَ ٣٨﴾ [يونس: 38] “নাকি তারা বলে, ‘তিনি এটা রচনা করেছেন?’ বলুন, ‘তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা নিয়ে আস এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্য যাকে পার ডাক, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” সূরা ইউনুস, আয়াত: ৩৮।
মহিমান্বিত কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿وَإِن كُنتُمۡ فِي رَيۡبٖ مِّمَّا نَزَّلۡنَا عَلَىٰ عَبۡدِنَا فَأۡتُواْ بِسُورَةٖ مِّن مِّثۡلِهِۦ وَٱدۡعُواْ شُهَدَآءَكُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ إِن كُنتُمۡ صَٰدِقِينَ٢٣ فَإِن لَّمۡ تَفۡعَلُواْ وَلَن تَفۡعَلُواْ فَٱتَّقُواْ ٱلنَّارَ ٱلَّتِي وَقُودُهَا ٱلنَّاسُ وَٱلۡحِجَارَةُۖ أُعِدَّتۡ لِلۡكَٰفِرِينَ ٢٤﴾ [البقرة: 23-24] “আর আমরা আমাদের বান্দার উপর যা নাযিল করেছি, যদি তোমরা সে সম্পর্কে সন্দেহে থাক, তবে তোমরা তার মত একটি সূরা নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সাক্ষীসমূহকে ডাক; যদি তোমরা সত্যবাদী হও। (২৩) অতএব যদি তোমরা তা করতে না পারো আর কখনই তা করতে পারবে না, তাহলে তোমরা সে আগুন থেকে বাঁচার ব্যবস্থা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যা প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে কাফেরদের জন্য।” (২৪) সূরা আল-বাকারা: ২৩-২৪। আল্লাহ তা‘আলার বাণী খেয়াল কর-
﴿فَإِن لَّمۡ تَفۡعَلُواْ وَلَن تَفۡعَلُواْ فَٱتَّقُواْ ٱلنَّارَ ٱلَّتِي وَقُودُهَا ٱلنَّاسُ وَٱلۡحِجَارَةُۖ أُعِدَّتۡ لِلۡكَٰفِرِينَ ٢٤﴾ [البقرة: 24] “তারা পারেওনি আর কখনো পারবেও না।” সূরা আল-বাকারা: ২৪।
তারা করতে পারেনি, আর সক্ষমও হয়নি।
কুরআন আজ অবধি মুশরিকদের বাগ্মী ও বাক-পারঙ্গম বিদ্বানদেরকে চ্যালেঞ্জ করেই চলেছে; অথচ তারা এর মোকাবিলা করতে এখন পর্যন্ত অপারগ এবং এর সদৃশ কোন গ্রন্থ আনতেও অক্ষম।
ড. আব্দুল্লাহ দিরাজ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী আশঙ্কা বোধ করেননি যে, এ চ্যালেঞ্জ তাদের সাহিত্যিক উত্তেজনাকে প্ররোচিত করবে?
যার ফলে, তারা সকলেই একসাথে উদ্বিগ্ন হয়ে তার বিপরীতে প্রতিযোগিতা ঝাপিয়ে পড়বে, আর তিনি কী করতে পারতেন যদি তাদের বাগ্মীদের একদল লোকেরা একত্রিত হয়ে এমন একটি বাণী রচনায় তার সাথে প্রতিদ্বন্দিতায় লিপ্ত হত, যদিও তা কতিপয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে হোক না কেন!
তদুপরি, যদি তিনি এই চ্যালেঞ্জটি তার সময়ের লোকদের কাছে ঘোষণা করার জন্য নিজে থেকেই উৎসাহী হয়ে থাকেন, তবে কীভাবে তিনি তা আগামী প্রজন্মের কাছে তা পেশ করবেন?
এটা এমন এক দুঃসাহসিক কাজ যে, একজন মানুষ যে তার নিজের অবস্থান সম্পর্কে জানে, সে কখনো এ দিকে অগ্রসর হবে না, যতক্ষণ না তার দুটি হাত ভাগ্যের ফয়সালা পরিবর্তন অথবা আসমানী সংবাদ দ্বারা পূর্ণ থাকে। আর এভাবেই তিনি মানুষের মধ্যে তা ছুড়ে দেন, আর সেটাই চূড়ান্ত ভাগ্য হয়ে দাড়ায়। সুতরাং যুগ যুগ ধরে সময়ের আবর্তনে এর পরে যেই তার বিরোধিতা করবে সকলেই স্পষ্ট অপারগতা ও চরম ব্যর্থতার দ্বারা লাঞ্চিত হবে।”[৭৮] তখন এই মুশরিকরা দেখতে পেল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সৈন্যদল ও দলসমূহ একত্রিত করা কুরআনের বিরোধিতা এবং চ্যালেঞ্জ গ্রহণের চেয়ে সহজতর। সুতরাং এটাই তাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ছিল। আর কাফিররা বলে,
﴿وَقَالَ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ لَا تَسۡمَعُواْ لِهَٰذَا ٱلۡقُرۡءَانِ وَٱلۡغَوۡاْ فِيهِ لَعَلَّكُمۡ تَغۡلِبُونَ٢٦﴾ [فصلت: 26] ‘তোমরা এ কুরআনের নির্দেশ শোন না এবং তা পাঠকালে শোরগোল সৃষ্টি কর, যাতে তোমরা জয়ী হতে পার।’ সূরা ফুসসিলাত: ২৬।
সমস্ত আরব বা অন্যান্য জাতি যাদের কাছে চ্যালেঞ্জ পৌঁছেছে, তারা এমন কিছু তৈরি করতে পারেনি যার মাধ্যমে নাস্তিক বা অন্যান্যরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে।
আলূসী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “আমাদের আজকের দিন পর্যন্ত কেউ তার মুখ থেকে এমন কিছুই উচ্চারণ করেনি, অথবা এমন বৈশিষ্ট্যাবলী সম্পন্ন কিংবা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও কেউ কিছু প্রকাশ করেনি।”
ইসলাম গ্রহণের পূর্বে জুবাইর ইবনু মুত‘ইম (রা.) বলেছেন: আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মাগরিবের সালাতে সূরা আত-তূর পড়তে শুনেছি, যখন তিনি এ আয়াতে পৌঁছালেন:
﴿أَمۡ خُلِقُواْ مِنۡ غَيۡرِ شَيۡءٍ أَمۡ هُمُ ٱلۡخَٰلِقُونَ ٣٥ أَمۡ خَلَقُواْ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَۚ بَل لَّا يُوقِنُونَ٣٦ أَمۡ عِندَهُمۡ خَزَآئِنُ رَبِّكَ أَمۡ هُمُ ٱلۡمُصَۜيۡطِرُونَ٣٧﴾ [الطور: 35-37] ”তারা কি স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি হয়েছে, না তারা নিজেরাই স্রষ্টা? (৩৫) নাকি তারা আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছে? বরং তারা দৃঢ় বিশ্বাস করে না। (৩৬) আপনার রবের গুপ্তভাণ্ডার কি তাদের কাছে রয়েছে, নাকি তারা এ সবকিছুর নিয়ন্তা? (৩৭) সূরা আত্ব-তূর: ৩৫-৩৭।
জুবাইর বলেন: “আমার অন্তর প্রায় উড়তে শুরু করল।” [৭৯] সুতরাং কুরআনের মধ্যে অলৌকিক সব রহস্য রয়েছে, যা মানুষের অন্তরের মধ্যে পৌঁছে যায়।
ভেবে দেখ! মুশরিক নারীরা কুরআনের দ্বারা আকৃষ্ট ও প্রভাবিত হয়ে কিভাবে আবু বাকরের বাড়ীর চারপাশে ভিড় জমাত, যখন তিনি কুরআন তিলাওয়াত করতেন। যা কুরাইশদেরকে ভীত করে তোলে। [৮০] আর এ কারণেই আরব প্রতিনিধিরা সম্মত হয়েছিল যে, তারা কুরআন শুনবে না এবং তাদের পরিবারের সদস্যদেরও শুনতে দেবে না; কারণ কুরআন অস্বীকার করে কুফুরীর উপর টিকে থাকার এই একটি মাত্র উপায়ই ছিল।
কুরআনের বিস্ময়কর ও অলৌকিক বিষয়সমূহের মধ্যে আরো রয়েছে -আর এর আশ্চর্যের কোন শেষ নেই-: যা ড. আব্দুল্লাহ দিরাজ রাহিমাহুল্লাহ কুরআনের আয়াতসমূহ বিভিন্ন সময়ে নাযিল হওয়া। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ইঙ্গিত দেওয়া যে, কতিপয় আয়াত এ সূরার নির্দিষ্ট স্থানে, আবার অন্য আয়াত অন্য সূরার অন্য স্থানে রাখা। এরপরে সবশেষে প্রতিটি সূরা আলাদাভাবে একটি স্থাপনার মত প্রকাশিত হওয়া ইত্যাদির আলোচনাতে উল্লেখ করেছেন। তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “কুরআন অবতরণের সময়ে কুরআনের কতিপয় অংশ বিচ্ছিন্নভাবে অন্যস্থানের সাথে অতিরিক্ত হিসেবে নাযিলকৃত অংশের মাধ্যমে বৃদ্ধি পাচ্ছিল, পরবর্তীতে নাযিল হওয়া অন্যান্য আয়াতসমূহ যোগ হয়ে ধারাবাহিকভাবে পর্যায়ক্রমিক স্বতন্ত্র অধ্যায় (সূরা) হিসেবে গঠিত হচ্ছিল। নাযিলকৃত একটি অংশ একবার এখানে যোগ হচ্ছিল, আবার অন্য একটি অংশ সেখানে অন্যান্য অংশের সাথে প্রবেশ করছিল, [আর তা হচ্ছিল] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ অনুসারে, যা তিনি গ্রহণ করেছিলেন পবিত্র আত্মা জিবরীলের কাছ থেকে পর্যায়ক্রমিক পঠনের মাধ্যমে।
যদি আমরা অসংখ্য তারিখসমূহ বিবেচনা করি –মহিমান্বিত কুরআনের আয়াত নাযিলের তারিখগুলো- এবং আমরা লক্ষ্য করি যে এই অহী সাধারণত বিশেষ পরিস্থিতিতে এবং উপলক্ষগুলোর সাথে সম্পর্কিত ছিল, তাহলে এটি আমাদের সেই সময় সম্পর্কে জিজ্ঞাসার দিকে নিয়ে যায়, যখন প্রতিটি সূরাকে একটি স্বাধীন অধ্যায়ে সংগঠিত করার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছিল।
যেন কুরআন মূলত একটি পুরাতন স্থাপনার বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত টুকরাসমূহ, যাকে অন্য একটি স্থানে ঠিক তার আগের রূপে পুনরায় স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। অন্যথায় একই সাথে এতটা দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই তারতীব (ক্রমধারা) ও পদ্ধতির ব্যাখ্যা করা কিভাবে সম্ভব, যা অধিকাংশ সূরার সাথেই সম্পৃক্ত ছিল?
কিন্তু ভবিষ্যতের ঘটনাবলী, তাদের শরয়ী (আইনী) প্রয়োজনীয়তা এবং তার কাঙ্খিত সমাধান, সেইসাথে এগুলোকে আবশ্যকীয়ভাবে এমন ভাষাগত উপস্থাপন করতে হবে, যা সেগুলোর সমাধান বাতলে দেয় এবং এই সূরার সাথে তার শৈলীগত সামঞ্জস্যতা থাকতে হবে, যা ঐ সূরার সাথে নেই, এই সার্বিক পরিকল্পনা তৈরি করার সময় একজন ব্যক্তি কী কোন ঐতিহাসিক গ্যারান্টি পেতে পারেন?
আমরা কি তাহলে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই না যে, এই পরিকল্পনার সমাপ্তি এবং কাঙ্ক্ষিত উপায়ে এর বাস্তবায়নের জন্য একজন মহান স্রষ্টার হস্তক্ষেপ প্রয়োজন, যিনি এই কাঙ্খিত সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করার ক্ষমতা রাখেন?”[৮১] সুতরাং কুরআন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতের সত্যতার একটি স্বতন্ত্র অলৌকিক প্রমাণ।
নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে সংঘটিত হাজারেরও অধিক মুজিযা রয়েছে। তাদের যুগ খুব কাছাকাছি ছিলো এবং এগুলোর বর্ণনাকারীগণও সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে সত্যবাদী এবং পরহেযগার লোক ছিলেন।
আর এ সমস্ত বর্ণনাকারীগণ, যারা আমাদের কাছে এ সমস্ত মুজিযাগুলো বর্ণনা করেছেন, তারা ছোট খাটো সূক্ষ্ম বিষয়েও মিথ্যা বলাকে বৈধ মনে করতেন না। তাহলে কিভাবে তারা রাসূলের উপরে মিথ্যা আরোপ করবেন? অথচ তারা এ কথা জানেন যে, “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে তার উপরে মিথ্যা আরোপ করবে, সে যেন জাহান্নামে স্থান নির্দিষ্ট করে নেয়।” যেমনটি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করেছেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন অনেক মুজিযা রয়েছে, যেগুলো তার পাশে থাকা হাজার হাজার সাহাবী দেখেছেন। আবার কিছু এমন রয়েছে যেগুলো ডজন-ডজন সাহাবী দেখেছেন। কিভাবে তারা এ ব্যাপারে মিথ্যা আরোপ করার জন্য একমত হতে পারে?
মানুষের মধ্য হতে বড় একটি দল প্রত্যক্ষ করেছেন এমন একটি মুজিযা হচ্ছে: খেজুর গাছের কান্না করার হাদীস। এটি একটি প্রসিদ্ধ মুতাওয়াতির হাদীস, যেখানে রয়েছে: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি খেজুর গাছের উপরে খুতবা দিতেন, যখন তার জন্য মিম্বারের ব্যবস্থা করা হল, এবং তিনি মিম্বারের উপরে উঠে খুতবা দিতে লাগলেন, তখন খেজুর গাছটি কান্না শুরু করল, একদম শিশু বাচ্চাদের ন্যায় কাঁদতে থাকল, আর শব্দ করতে থাকল যতক্ষণ না নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জড়িয়ে ধরলেন, তখন সেটি চুপ হয়ে গেল।
এ হাদীসটি সাহাবীদের মধ্য থেকে যারা বর্ণনা করেছেন, তারা হচ্ছেন: আনাস ইবনু মালিক, জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার, উবাই ইবনু কা‘ব, আবূ সা‘ঈদ, সাহল ইবনু সা‘দ, আয়িশাহ বিনতু আবী বাকর এবং উম্মু সালামাহ রদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুম।
সুতরাং সাহাবীদের এত বড় একটি সংখ্যা এ জাতীয় সংবাদ বর্ণনার ক্ষেত্রে কী একমত হতে পারেন?
বরং তার কতিপয় মুজিযা প্রত্যক্ষ করেছেন হাজার হাজার সাহাবী, যেমন: তার আঙুল হতে পানি বের হওয়া, এমনকি তা দ্বারা ১৫০০ সাহাবী অযু করেছেন এবং তা থেকে পান করেছেন। এ হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন, যা একটি মুতাওয়াতির হাদীস।
স্বল্প খাদ্যকে বৃদ্ধি করে বড় একটি সৈন্যদলকে তা দ্বারা খাওয়ানো। এটিও সাহাবীদের থেকে মুতাওয়াতির সংবাদ হিসেবে এসেছে। শুধুমাত্র ইমাম বুখারীই তার সহীহ নামক গ্রন্থে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে খাদ্যসমূহ বৃদ্ধি হওয়ার এ মুজিযার বর্ণনা পাঁচটি স্থানে এনেছেন। [৮২] সুতরাং যখন সত্যতার দলীলসমূহ প্রতিষ্ঠিত আর অসংখ্য মুজিযা তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) নবুওয়তের প্রমাণ হিসেবে বিদ্যমান, তাহলে কীভাবে একজন বিবেকবান ব্যক্তি এসব অস্বীকার করতে পারে?
এখানে তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) অলৌকিক কাজের আরও কিছু উদাহরণ দেওয়া হল:
কোন একরাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দিয়েছিলেন যে, প্রচণ্ড বাতাস বইবে এবং তিনি কাউকে দাঁড়াতে নিষেধ করলেন। তারপরও একজন লোক তখন দাঁড়ালে বাতাস তাকে অনেক দূরে নিয়ে নিক্ষেপ করেছিল। [৮৩] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজাশীর মৃত্যুর সংবাদ দিয়েছিলেন, ঠিক নাজাশীর মৃত্যুর দিনেই এবং চার তাকবীরে তার জানাযা আদায় করেছিলেন। [৮৪] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমার, উসমান, আলী, ত্বালহা এবং যুবাইর রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের শাহাদাতের সংবাদ দিয়েছিলেন। আর তারাও স্বাভাবিকভাবে তাদের বিছানাতে (বাড়ীতে) অন্যান্য মানুষদের ন্যায় মারা যাননি।
একদা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বাকর, উমার, উসমান, আলী, ত্বালহা এবং যুবাইরকে সাথে নিয়ে পাহাড়ের উপরে আরোহন করলেন, তখন পাথর নড়াচাড়া শুরু করলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাহাড়কে বলেছিলেন: “থাম, তোমার উপরে অবশ্যই একজন নবী, সিদ্দীক এবং শহীদ রয়েছেন।” [৮৫] তিনি তার নিজের জন্য নবুওয়তের সিদ্ধান্ত দেন। আবূ বাকরকে সত্যবাদিতার ফায়সালা দেন। আর অন্যান্যদেরকে অচিরেই শাহাদাতপ্রাপ্ত হবেন বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে বলেছেন, তা সেভাবেই ঘটেছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রবের কাছে দু‘আ করা মাত্রই তার দু‘আর জবাব (ফল) দেওয়া হয়েছে, আর মানুষ তা প্রত্যক্ষ করেছে এমন (প্রায়) ১৫০ হাদীস রয়েছে। [৮৬] মক্কার লোকেরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটি নিদর্শন দেখাতে বললে, তিনি চাঁদকে দুটি অংশে বিভক্ত করে দেখালেন, ফলে তারা উভয়ের মাঝখানে হীরা পর্বত দেখতে পেল। এ হাদীসটি মুতাওয়াতির, তথা: এটা সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিশুদ্ধ বর্ণনা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বড় বড় সমাবেশে যেমন: শুক্রবার এবং ঈদের ময়দানে সূরা আল-কামার পাঠ করতেন, যেখানে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা রয়েছে, যাতে লোকেরা এতে বর্ণিত আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অলৌকিক ঘটনা শুনতে পায়, তিনি এটা দ্বারা তার নবুওয়তের সত্যতার প্রমাণ দিতেন।
তারপর নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন যে, আদম ছিলেন জীবন্ত প্রাণীদের মধ্যে সর্বশেষ সৃষ্টি: “আদমকে সৃষ্টির শেষ সময়ে শুক্রবার আসরের নামাজের পর। সর্বশেষ সৃষ্টি।”[৮৭] এবং এ সত্যটি এখন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, মানুষই পৃথিবীতে আবির্ভূত হওয়া শেষ জীবিত প্রাণী। তাহলে তিনি (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কিভাবে জানলেন যে, পৃথিবীতে উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবির্ভাবের পর আদম আলাইহিস সালামই সর্বশেষ জীবিত সৃষ্টি?
মহান আল্লাহর কথার দিকে লক্ষ্য কর:
﴿وَجَعَلۡنَا ٱلَّيۡلَ وَٱلنَّهَارَ ءَايَتَيۡنِۖ فَمَحَوۡنَآ ءَايَةَ ٱلَّيۡلِ وَجَعَلۡنَآ ءَايَةَ ٱلنَّهَارِ مُبۡصِرَةٗ لِّتَبۡتَغُواْ فَضۡلٗا مِّن رَّبِّكُمۡ وَلِتَعۡلَمُواْ عَدَدَ ٱلسِّنِينَ وَٱلۡحِسَابَۚ وَكُلَّ شَيۡءٖ فَصَّلۡنَٰهُ تَفۡصِيلٗا١٢﴾ [الإسراء: 12] “আর আমরা রাত ও দিনকে করেছি দুটি নিদর্শন তারপর রাতের নিদর্শনকে মুছে দিয়েছি এবং দিনের নিদর্শনকে আলোকজ্জল করেছি।” সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ১২।
“তারপর রাতের নিদর্শনকে মুছে দিয়েছি”: তথা চাঁদ হচ্ছে রাতের নিদর্শন, যা আলোকিত ছিল তারপর তার আলো মুচে দেয়া হয়।
এবং প্রকৃতপক্ষে সাহাবীগণ এটাই এ আয়াতে কারীমার ব্যাখ্যা করেছেন। ইমাম ইবনে কাসীর তার তাফসীরে বর্ণনা করেছেন যে, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন: “চাঁদ সূর্যের মতো জ্বলজ্বল করত, যা ছিল রাতের নিদর্শন। তারপরে তার আলো মুছে দেওয়া হয়েছে।”
আশ্চর্যের বিষয় হল এই যে, বিজ্ঞান আজ এই উপসংহারে পৌঁছেছে, NASA তার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট এবং অফিসিয়াল চ্যানেলে প্রকাশ করেছে: চাঁদের জীবনের প্রথম যুগ, এবং তখন এটি ছিল প্রজ্জলিত আলোকজ্জল। [৮৮] মুতাওয়াতির বর্ণনার মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, গায়িবের নিদর্শন, খবরসমূহ এবং পৃথিবী ও আসমানের অগণিত ক্ষুদ্র রহস্য এক ব্যক্তির (রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) হাতে ছিল, এবং তাঁর কাছে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তার পূর্বের নবীরা যা নিয়ে এসেছিলেন, তিনি তাই নিয়ে এসেছিলেন এবং তিনি আল্লাহর কাছ থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। আর তিনি শরী‘আত পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ হওয়ার আগ পর্যন্ত মারা যাননি।
সুতরাং নিশ্চিতভাবেই তিনি একজন নবী, এটাই বিবেকের প্রতিষ্ঠিত সাক্ষ্য।
সুতরাং তার (রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) গায়িবের নিদর্শনসমূহ হাজারেরও অধিক।
আর তার এসব নিদর্শনের (মুযিজাসমূহের) বর্ণনাকারী হচ্ছেন তাঁর সাহাবীগণ, যারা তারপরেই সবচেয়ে সত্যবাদী এবং সবচেয়ে ন্যায়বান।
আশ্চর্যের বিষয় হল যে, মহান সাহাবীরা অলৌকিক ঘটনা দেখার আগেই ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। তারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন; কারণ তারা জানতেন যে, নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যবাদী এবং তিনি কখনো মিথ্যা বলেননি।
মহান সাহাবীদের এই অবস্থান একটি বিজ্ঞ বুদ্ধিমত্তার অবস্থান। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যবাদীতাই তাঁর নবুওয়তের সত্যতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট দলীল।… এর কারণ: যে ব্যক্তি নবুওয়তের দাবি করেন, হয়তো মানুষের মধ্যে তিনি সবচেয়ে সত্যবাদী। কারণ তিনি একজন নবী… যেহেতু নবী মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সত্যবাদী।
নয়তো সে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী; কেননা সে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বড় একটি বিষয়ে মিথ্যা দাবী করে থাকে।
একান্ত নিরেট অজ্ঞ ব্যক্তির কাছে ছাড়া অন্য কারো কাছে সবচেয়ে সত্যবাদী ব্যক্তি ও সবচেয়ে মিথ্যাবাদী এক মনে হতে পারে না। [৮৯] সুতরাং একজন বিবেকবান মানুষের পক্ষে সত্যবাদী মানুষ এবং মিথ্যুক মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা খুবই সহজ।
মুশরিকরা তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নবুওয়তের প্রথম দিনেই স্বীকার করেছিল যে, তিনি কখনো মিথ্যা বলেননি। তারা তাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিল: “তোমার থেকে আমাদের কোন মিথ্যার অভিজ্ঞতা হয়নি।” [৯০] এবং যখন হেরাক্লিয়াস ইসলাম গ্রহণের আগে আবূ সুফিয়ানকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “তিনি যা বলেছেন, তা বলার আগে আপনারা কি তাকে মিথ্যা বলার ব্যাপারে অভিযুক্ত করেছিলেন?”
তখন আবূ সুফিয়ান বলেছিলেন: “না।”
তখন হেরাক্লিয়াস বলেছিল: “মানুষের ব্যাপারে মিথ্য ত্যাগ করা ব্যক্তি আল্লাহর উপরে মিথ্যাচার করতে পারে না।”
তারপর হেরাক্লিয়াস তার বিখ্যাত উক্তিটি করেছিল: “আমি যদি তার সাথে থাকতাম তবে আমি তার দুই পা ধুয়ে দিতাম।”[৯১] কাফেররা তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সমগ্র জীবনে একটি মিথ্যাও খুঁজে পেতে অক্ষম হয়েছে। সে কারণেই কুরআন তাদের কুফুরী বা অস্বীকার করাকে নাকচ করেছে; কেননা তারা নবুওয়তের আগে তার অবস্থা সম্পর্কে জানত। আমাদের সুমহান রব বলেছেন:
﴿أَمۡ لَمۡ يَعۡرِفُواْ رَسُولَهُمۡ فَهُمۡ لَهُۥ مُنكِرُونَ٦٩﴾ [المؤمنون: 69] ”নাকি তারা তাদের রাসূলকে চিনে না বলে তাকে অস্বীকার করছে?” সূরা আল-মুমিনূন: ৬৯।
সুতরাং নবীর অবস্থা এবং তাঁর জীবনীই একটি স্বতন্ত্র প্রমাণ যে, তিনি একজন নবী।
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
সুতরাং যখন সততার কারণগুলো সাধারণত পারস্পরিকভাবে তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নবুওয়াত প্রমাণে সমর্থন করে, তখন একজন বিবেকবান হিন্দু কীভাবে এই সমস্ত অস্বীকার করতে পারে?

    How can we help?