সুষ্ঠ জ্ঞান, মানব স্বভাব ও মৌলিক শিক্ষার মানদণ্ডে হিন্দুধর্ম

⌘K
  1. Home
  2. Docs
  3. সুষ্ঠ জ্ঞান, মানব স্বভাব ...
  4. ১০। হিন্দু সমাজের বাস্তব চিত্র কী?

১০। হিন্দু সমাজের বাস্তব চিত্র কী?

হিন্দু সমাজ পুনর্জন্মের ধারণা এবং কর্মের ধারণায় বিশ্বাসের কারণে নিশ্চিতভাবে এটি একটি বর্ণবাদী সমাজ।
যেহেতু [এ বিশ্বাস মতে] অনাচারী ব্যক্তি পরের জন্মে আগের থেকে নিচু শ্রেণিতে জন্ম নেবে।
ফলতঃ দুঃখে-কষ্টে নিপতিত ব্যক্তি তার প্রাপ্য কষ্টই ভোগ করে…
এটি দরিদ্র ও পীড়িতদের বিরুদ্ধে হৎকারীদের সম্পূর্ণ নিপীড়ন এবং তাদের প্রতি উদাসীনতা। এটি হৎকারীদের সাথে এক প্রকার নমনীয়তা প্রদর্শন করা।
হিন্দুধর্মে মানুষ চার শ্রেণীতে বিভক্ত:
১- ব্রাহ্মণ: শিক্ষক এবং পুরোহিত সম্প্রদায়।
২- ক্ষত্রিয়: যোদ্ধা এবং রাজ-রাজন্য সম্প্রদায়।
৩- বৈশ্য: কৃষক এবং বণিক সম্প্রদায়।
৪- শূদ্র: শ্রমিক সম্প্রদায়।
সর্বনিম্ন শ্রেণী হল: শূদ্র অস্পৃশ্য যারা অপবিত্র কর্মে লিপ্ত – তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে – যেমন পরিচ্ছন্নতা এবং সেবা।
প্রতিটি ব্যক্তির শ্রেণী তার কাজের ধরণ, পোশাক এবং খাবার নির্ধারণ করে।
আর (তাদের) বিবাহ একই শ্রেণীতে হয়।
একজন ব্যক্তি যে শ্রেণীতে জন্মগ্রহণ করেছিল, সেই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হওয়াটা তার আমৃত্যু বলবৎ থাকে।
এই শ্রেণী ধারণার উদ্ভব, যেমনটি আমি বলেছি, আত্মার স্থানান্তর বা পূনর্জন্মের মতবাদ এবং কর্ম -শাস্তি ও পুরস্কার- এর মতবাদের বিশ্বাস থেকে উদ্গত। সুতরাং শূদ্র অস্পৃশ্যদের মধ্যে গণ্য হওয়ার যোগ্য; কারণ সে অবশ্যই পূর্বজন্মে পাপী ছিল। তাই সে এই শ্রেণীর মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছে।
এই বিকৃত ভ্রান্ত ধারণা সমগ্র জীবনকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। এই এ ধারণা থেকে আমরা বিবেচনা করতে পারি যে, অস্পৃশ্যদের সাহায্য করা কর্মের প্রতি এক ধরনের অসম্মান।
নিশ্চিতভাবেই এটা পশ্চাৎপদতা, অন্যায়, শ্রেণী বৈষম্য (বর্ণবাদ) ও সীমালঙ্ঘনের প্রতি এক ধরণের আপোশকামিতা।
পুনর্জন্মের দর্শন এবং কর্মের দর্শনের ফল হলো এই শ্রেণীবিন্যাস। আর এই ভ্রান্ত ধারণার ভুক্তভোগি হলো, কতক দরিদ্র, অসুস্থ, দুর্বল মানুষ যাদের হতে কিছুই নাই।
হিন্দুধর্ম তাদেরকে সাহায্য করা এবং তাদের দিকে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করার সুযোগ হারিয়ে ফেলছে।
হিন্দু ধর্মের এ দৃষ্টিভঙ্গি মানব স্বভাব ও মানবতার পরিপন্থী একটি দৃষ্টিভঙ্গি। মানবতা মানুষকে দুর্বল, অভাবী এবং অসুস্থদের প্রতি সহানুভূতির দিকে ধাবিত করে এবং তাদের প্রতি কর্তব্যবোধের কারণে তাদের সেবা প্রদান, এবং তাদের ক্ষতি ও দুর্দশা দূর করার চেষ্টা করার প্রতি উৎসাহ দেয়।
আমি জানি না, হিন্দুরা কিভাবে বেদে লেখা শেষ দিবসের বিশ্বাস থেকে দূরে সরে গেল, যে বিশ্বাসের দ্বারা মানুষের জীবন সংশোধিত হয় এবং দুনিয়া সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধিত হয়। পরকালে আল্লাহর সামনে মানুষের হিসাব-নিকাশ অনুষ্ঠিত হবে। প্রত্যেক মানুষই নিষ্পাপ হয়ে জন্মগ্রহণ করে, আর দুঃখী মানুষের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ালে পরকালে আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
সুতরাং, দুটির মধ্যে কোন দৃষ্টিভঙ্গিটি মানুষের জন্য উপযুক্ত এবং আরও উপকারী এবং তাদের স্বাভাবিক স্বভাবের কাছাকাছি?
কর্মের দর্শন (মতবাদ), নাকি বেদের বিশ্বাস?
ঋগবেদে এসেছে: “হে আল্লাহ (প্রভু), তুমি ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে সর্বোত্তম প্রতিদান দাও।” [৪৫] ঋগবেদে আরো এসেছে: “আমাকে এমন স্থানে স্থায়ী করে দিন, যেখানে সকল প্রকার উপভোগ্য বস্তু ও আনন্দ পাওয়া যায়, আর যেখানে অন্তরসমূহ যা কামনা করে তাই দেওয়া হয়।” [৪৬] এগুলোই হচ্ছে বেদের বিশ্বাস।
জান্নাতের (স্বর্গের) কথাও রয়েছে, যেখানে ধার্মিক বা ন্যায়পরায়ণদেরকে নিআমাত দেওয়া হবে।
এছাড়াও, বেদ অনুসারে, পাপীদের জন্য একটি যন্ত্রণার স্থান প্রস্তুত করা হয়েছে।
ঋগবেদ বলে: “একটি চূড়ান্ত গভীর স্থান, পাপীদের জন্য, যার গহ্বর অনেক দূরে।” [৪৭] তাহলে বারবার জন্ম ও আত্মার স্থানান্তরের ধারণার ভিত্তিতে এই স্থানগুলো কোথায়?
কর্মের দর্শনে পাপীদের গভীরতম সেই স্থান কোথায়?
সুতরাং সামগ্রিকভাবে কর্মের দর্শন বেদের চেতনার বিপরীত একটি মানবিক উদ্ভাবন ও ধারণা মাত্র।
সমস্ত নবীর বিশ্বাস ছিল: শেষ দিবস, স্বর্গ ও নরকে [জান্নাত ও জাহান্নামে] বিশ্বাস করা এবং মানুষ পাপ ছাড়াই নিষ্পাপ অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে।
এটি সেই ধর্ম-বিশ্বাস, যা স্বভাব ও তা কল্যাণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অন্যায়, পশ্চাদপদতা, শ্রেণীবৈষম্য ও সীমালঙ্ঘনের বিরোধী।
সুতরাং নবীদের ধর্ম মানুষকে উন্নত করতে চায় এবং মানুষকে সমান হিসেবে বিবেচনার প্রতি আহ্বান জানায়।
ইসলামে মানুষের মূল্য তার শ্রেণীতে, তার আকারে, তার স্বাস্থ্যের অবস্থাতে বা তার বস্তুগত স্তরের ভিত্তিতে নয়; বরং মানুষের মূল্য নির্ধারিত হয় তার ভালো কাজের ভিত্তিতে।
এছাড়াও ইসলাম বংশ ও সামাজিক মর্যাদা উপেক্ষা করে সকলকে উন্নত হওয়ার আহ্বান জানায়।
বরং দৃঢ়ভাবে অস্পৃশ্য ধারণা এবং সার্বিকভাবে শ্রেণীবৈষম্য চিন্তাধারাকে প্রত্যাখ্যান করে।
মহিমান্বিত কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنَّا خَلَقۡنَٰكُم مِّن ذَكَرٖ وَأُنثَىٰ وَجَعَلۡنَٰكُمۡ شُعُوبٗا وَقَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوٓاْۚ إِنَّ أَكۡرَمَكُمۡ عِندَ ٱللَّهِ أَتۡقَىٰكُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٞ١٣﴾ [الحجرات: 13] “হে মানুষ! আমরা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, আর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমারা একে অন্যের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যাক্তিই বেশী মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে বেশী তাকওয়াসম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।” সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১৩।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর বলেন: “যাকে তার আমল পিছিয়ে দেবে, তার বংশ পরিচয় তাকে অগ্রগামী করবে না।” [৪৮] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন, লোকজন আমার নিকট তাদের আমল নিয়ে আসবে না; অথচ তোমরা আসবে তোমাদের বংশ পরিচয় নিয়ে?” [৪৯] সুতরাং ইসলামে বংশের কোন মূল্য বা ওযন নেই।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, “হে মানুষেরা! নিশ্চয় তোমাদের রব একজন, আরব ব্যক্তির উপর অনারব ব্যক্তির এবং অনারব ব্যক্তির উপর আরব ব্যক্তির, কালোবর্ণের উপর সাদাবর্ণের এবং সাদাবর্ণের উপর কালোবর্ণের একমাত্র তাকওয়া ছাড়া অন্য কোন মর্যাদা নেই।” [৫০] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন: “তোমরা আমার কাছে দুর্বলদেরকে খুঁজে নিয়ে আস; কেননা তোমাদের দুর্বলদের মাধ্যমেই তোমাদেরকে রিযিক দেওয়া হয় এবং সাহায্য করা হয়।” [৫১] সুতরাং “তোমরা আমার কাছে দুর্বলদেরকে খুঁজে নিয়ে আস; কেননা তোমাদের দুর্বলদের মাধ্যমেই তোমাদেরকে রিযিক দেওয়া হয় এবং সাহায্য করা হয়।” এ দৃষ্টিভঙ্গি এবং দুর্বলদের ব্যাপারে হিন্দুদের দৃষ্টিভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করে দেখুন।
মানুষের আত্মাকে সৃষ্টি করা হয়েছে গরীব, দুর্বল, সরল এবং নির্বোধ মানুষের প্রতি স্নেহ প্রদর্শণের জন্য। এই স্বভাবজাত স্বাভাবিক প্রকৃতির প্রতি বর্তমান হিন্দুধর্মের বিরোধিতা একটি বাস্তব সমস্যা।

    How can we help?