ইসলামবিরোধীদের প্রতি জবাব

রাসূল (সাঃ) কি অকারণে গাছ কেটে এবং জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন?

প্রসঙ্গ-প্রেক্ষাপট ছাড়া চেরিপিকিং করা ইসলামবিদ্বেষীদের মনোরোগগত স্বভাব।
তারই অংশ হিসেবে তারা প্রসঙ্গ প্রেক্ষাপট লুকিয়ে রেখে রাসূল (সাঃ)-এর দু-একটি হাদিস দেখিয়ে বলে, রাসূল (সাঃ) অকারণে গাছ-পালা কাটার নির্দেশ দিতেন, অকারণে জ্বালিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিতেন।
সেই অভিযোগের খণ্ডন সবার শেষে আনছি। আগে দেখি গাছপালার ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান।

কুরআনে বৃক্ষের কথা

বৃক্ষরাজি আমাদের জন্য নিয়ামতবিশেষ…

“আর তিনিই আসমান থেকে বর্ষণ করেছেন বৃষ্টি। অতঃপর আমি এ দ্বারা উৎপন্ন করেছি সব জাতের উদ্ভিদ। অতঃপর আমি তা থেকে বের করেছি সবুজ ডাল-পালা। আমি তা থেকে বের করি ঘন সন্নিবিষ্ট শস্যদানা। আর খেজুর বৃক্ষের মাথি থেকে (বের করি) ঝুলন্ত থোকা। আর (উৎপন্ন করি) আঙ্গুরের বাগান এবং সাদৃশ্যপূর্ণ ও সাদৃশ্যহীন যয়তুন ও আনার। দেখ তার ফলের দিকে, যখন সে ফলবান হয় এবং তার পাকার প্রতি। নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে এমন কওমের জন্য যারা ঈমান আনে।” – কুরআন ৬:৯৯

“তার মাধ্যমে তিনি তোমাদের জন্য উৎপন্ন করেন ফসল, যাইতুন, খেজুর গাছ, আঙ্গুর এবং সকল ফল-ফলাদি। নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে এমন কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে।” – কুরআন ১৬:১১

“তারা কি লক্ষ করে না যে, আমি শুকনো ভূমিতে পানি প্রবাহিত করি। অতঃপর তা দিয়ে শষ্য উদগত করি, যা থেকে তাদের গবাদি পশু ও তারা নিজেরা খাদ্য গ্রহণ করে? তবুও কি তারা লক্ষ্য করবে না।” – কুরআন ৩২:২৭

“যিনি সবুজ বৃক্ষ থেকে তোমাদের জন্য আগুন তৈরী করেছেন। ফলে তা থেকে তোমরা আগুন জ্বালাও।” – কুরআন ৩৬:৮০

“তোমরা যে আগুন জ্বালাও সে ব্যাপারে আমাকে বল, তোমরাই কি এর (লাকড়ির গাছ) উৎপাদন কর, না আমি করি? একে আমি করেছি এক স্মারক ও মরুবাসীর প্রয়োজনীয় বস্তু।” – কুরআন ৫৬:৭১-৭৩

“মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ করুক। আমিই প্রচুর বারি বর্ষণ করি, অতঃপর আমি ভূমিকে প্রকৃষ্টরূপে বিচূর্ণ করি এবং আমি উৎপন্ন করি শস্য, আঙুর, শাকসবজি, জইতুন, খেজুর এবং বহু বৃক্ষবিশিষ্ট উদ্যান, ফল ও গবাদিপশুর খাদ্য, এটা তোমাদের এবং তোমাদের পশুগুলোর জীবনধারণের জন্য।” – কুরআন ৮০:২৪-৩২

হাদিসে বৃক্ষের কথা

রাসূল (সাঃ) আমাদের বেশি বেশি বৃক্ষরোপণের নির্দেশ দিয়েছেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
যে কোন মুসলিম ফলবান গাছ রোপণ করে কিংবা কোন ফসল ফলায় আর তা হতে পাখী কিংবা মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু খায় তবে তা তার পক্ষ হতে সদাকাহ্ বলে গণ্য হবে।
দেখুনঃ বুখারী (তাওহীদ ২৩২০, আধুনিক প্রকাশনীঃ ২১৫২, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২১৬৯, তাওহীদ ৬০১২, ইফাবা ৫৪৭৪); মুসলিম ২২/২, হাঃ ১৫৫৩; আহমাদ ১২৪৯৭
এ হাদিসটি আরও স্পষ্ট করে অন্য জায়গায় বলা হয়েছে,

‘কোনো ব্যক্তি বৃক্ষরোপণ করে তা ফলদার হওয়া পর্যন্ত তার পরিচর্যা ও সংরক্ষণে ধৈর্য ধারণ করে, তার প্রতিটি ফল যা নষ্ট হয়, তার বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তাকে সদকার নেকি দেবেন। ’ (মুসনাদ আহমাদ: ১৬৭০২)

অন্য হাদিসে বলা হয়েছে,

‘যে ব্যক্তি কোনো বৃক্ষ রোপণ করে, আল্লাহ তাআলা এর বিনিময়ে তাকে ওই বৃক্ষের ফলের সমপরিমাণ প্রতিদান দান করবেন। ’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৩৫৬৭)

আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ
যদি কিয়ামত এসে যায় এবং তখন তোমাদের কারো হাতে একটি চারাগাছ থাকে, তবে কিয়ামত হওয়ার আগেই তার পক্ষে সম্ভব হলে যেন চারাটি রোপন করে।
দেখুনঃ আদাবুল মুফরাদ ৪৮১, আহমাদঃ ১২৯৩৩ ও ১৩০১২

অপ্রয়োজনে গাছ-কাটা নিষেধ

আব্দুল্লাহ ইবনু হুবশী (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কুল গাছ কাটবে, আল্লাহ তাকে মাথা উপুড় করে জাহান্নামে ফেলবেন। ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ)-কে এ হাদীসের তাৎপর্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এটি দীর্ঘ হাদিসের সংক্ষিপ্ত রূপ। এই হাদিস দ্বারা উদ্দেশ্য, খোলা ময়দানের কুল গাছ, যার ছায়ায় পথচারী ও চতুস্পদ প্রাণী আশ্রয় নিয়ে থাকে তা কোনো ব্যক্তি নিজ মালিকানাহীন, অপ্রয়োজনে ও অন্যায়ভাবে কেটে ফেললে আল্লাহ তাকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।
দেখুনঃ আবু দাউদ ৫২৩৯
সাধারণত নবীজি (সা.)সহ পরবর্তী সব খলিফা সেনাদের প্রতিপক্ষের কোনো গাছপালা বা শস্যক্ষেত্র ধ্বংস না করতে নির্দেশ দিতেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলতেন, ‘তোমরা কোনো বৃক্ষ উৎপাটন করবে না।’ (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ৯৪৩০)

মক্কা-মদিনাতে ‘রক্তপাতের’ পাশাপাশি গাছ-কাটাও নিষেধ!
মক্কাকে আল্লাহ্ হারাম করেছেন, কোন মানুষ তাকে হারাম করেনি। তাই যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে তার জন্য সেখানে রক্তপাত করা, সেখানকার গাছ কাটা বৈধ নয়।’
বুখারী ১০৪, ১৮৩২,৪২৯৫; মুসলিম ১৫/৮২, হাঃ ১৩৫৪, আহমাদ ১৬৩৭৩, ২৭২৩৪
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

মদিনা এখান হতে ওখান পর্যন্ত হারাম (রূপে গণ্য)। সুতরাং তার গাছ কাটা যাবে না এবং এখানে কোন ধরনের অঘটন (বিদ‘আত, অত্যাচার ইত্যাদি) ঘটানো যাবে না। যদি কেউ এখানে কোন অঘটন ঘটায় তাহলে তার প্রতি আল্লাহ্‌র এবং ফেরেশতাদের ও সকল মানুষের লা’নত (অভিশাপ)। (বুখারী ১৮৬৭, ৭৩০৬, মুসলিম ১৫/৮৫, হাঃ ১৩৬৬)  (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৭৩২, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৭৪৩ )

প্রয়োজনে গাছপালা কাটা যাবে

উপরে উল্লেখিত কুরআনের আয়াতগুলোও প্রয়োজন নির্দেশ করে, আগুন জ্বালানো, খাদ্য ইত্যাদি। গাছপালা আমাদের প্রয়োজনের জন্যই সৃষ্টি। যেমনঃ

“তোমরা যে আগুন জ্বালাও সে ব্যাপারে আমাকে বল, তোমরাই কি এর (লাকড়ির গাছ) উৎপাদন কর, না আমি করি? একে আমি করেছি এক স্মারক ও মরুবাসীর প্রয়োজনীয় বস্তু।” – কুরআন ৫৬:৭১-৭৩

মুহাম্মাদ ইবনু হাতিম (রহঃ) ….. আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একটি গাছ মুসলিমদের (পথ গমন করার সময়) কষ্ট দিত। এক ব্যক্তি এসে সে গাছটি কেটে ফেললো, এরপর সে জান্নাতে প্রবেশ করলো।

সূত্রঃ সহিহ মুসলিম (হাদিস একাডেমী ৬৫৬৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৪৩৪, ইসলামিক সেন্টার ৬৪৮৪)

স্বঘোষিত নাস্তিকদের চেরিপিকিং

তাদের পরিচালিত একটি ব্লগসাইটে নিচের দু-তিনটি হাদিসের উল্লেখ করে অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়ায়।
হাদিসগুলো হলোঃ
গ্রন্থঃ সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ বর্গাচাষ (كتاب المزارعة)
হাদিস নম্বরঃ ২১৭৫
১৪৫০. খেজুর গাছ ও অন্যান্য গাছ কেটে ফেলা। আনাস (রা.) বলেন, নবী (সঃ) খেজুর গাছ কেটে ফেলার আদেশ দেন এবং টা কেটে ফেলা হয়।
২১৭৫। মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) … আবদুল্লাহ‌ ইবনু উমর (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ নযির গোত্রের বুওয়াইরা নামক স্থানে অবস্থিত বাগানটির খেজুর গাছ জ্বালিয়ে দিয়েছেন এবং বৃক্ষ কেটে ফেলেছেন। এ সম্পর্কে হাস্‌সান (রাঃ) (তাঁর রচিত কবিতায়) বলেছেন, বুওয়াইরা নামক স্থানে অবস্থিত বাগানটিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে আর বনূ লূয়াই গোত্রের সর্দাররা তা সহজে মেনে নিল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih) http://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=2254
গ্রন্থঃ সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৩৩। জিহাদ ও সফর (كتاب الجهاد والسير)
হাদিস নম্বরঃ ৪৪৪৪
১০. কাফিরদের গাছ-পালা কাটা ও জ্বালিয়ে দেয়া বৈধ
৪৪৪৪-(২৯/১৭৪৬) ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া, মুহাম্মাদ ইবনু রুমূহ ও কুতাইবাহ ইবনু সাঈদ (রহঃ) ….. ‘আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাযীর গোত্রের খেজুর বাগান জ্বালিয়ে দিলেন এবং কেটে দিলেন। বুওয়াইরাহ ছিল সে বাগানের নাম। কুতাইবাহ এবং ইবনু রুমূহ (রহঃ) উভয়েই তাদের হাদীসে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন। এরপর মহান আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করেনঃ “তোমরা যেসব খেজুর বৃক্ষ কেটে ফেলেছে কিংবা তার কাণ্ডের উপর খাড়া রেখেছ, সবই ছিল আল্লাহর নির্দেশে, যাতে তিনি পাপাচারীদের অপদস্থ করেন।” (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৪০২, ইসলামিক সেন্টার ৪৪০২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih) http://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=51527
গ্রন্থঃ সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৩৩। জিহাদ ও সফর (كتاب الجهاد والسير)
হাদিস নম্বরঃ ৪৪৪৫
১০. কাফিরদের গাছ-পালা কাটা ও জ্বালিয়ে দেয়া বৈধ
৪৪৪৫-(৩০/…) সাঈদ ইবনু মানসূর … ইবনু উমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাযীর গোত্রের খেজুর বাগান কেটেছিলেন এবং জ্বলিয়ে দিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে কবি হাস্‌সান (রাযিঃ) বলেন, “বনী লুওয়াই (অর্থাৎ- কুরায়শ) এর নেতাদের কাছে বুওয়াইরায় আগুনের লেলিহান শিখা খুব সহজ হয়ে গেছে।” আর এ সম্পর্কেই নাযিল হয়েছে এ আয়াতঃ (অর্থ) “তোমরা যেসব খেজুর গাছ কেটেছে অথবা তা কাণ্ডের উপর রেখে দিয়েছ” আয়াতটির শেষ পর্যন্ত। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৪০৩, ইসলামিক সেন্টার ৪৪০৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih) http://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=51528

চেরিপিকিং খণ্ডন এবং হাদিসের বিস্তারিত ব্যাখ্যা

এই হাদিসটিই আমি আবার উল্লেখ করতে চাই,

গ্রন্থঃ সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ জিহাদ ও এর নীতিমালা (كتاب الجهاد والسير)
হাদিস নম্বরঃ ৪৪০২

১০. (যুদ্ধ পরিস্থিতিতে) কাফিরদের বৃক্ষাদি কাটা ও জ্বালান বৈধ

৪৪০২। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া, মুহাম্মদ ইবনু রুমহ ও কুতাইবা ইবনু সাঈদ (রহঃ) … আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাযীর গোত্রের খেজুর বাগান জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন এবং কেটে দিলেন। সে (বাগানের নাম) ছিল ‘বুওয়ারা’। কুতায়বা এবং ইবনু রুমহ (রহঃ) উভয়েই তাঁদের হাদীসে আরো বর্ণনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ (এই আয়াত) নাযিল করেনঃ “তোমরা যে সব খেজুর গাছ কেটে ফেলেছো কিংবা তার মুলের উপর খাড়া রেখেছো, সবই ছিল আল্লাহর নির্দেশে, যাতে তিনি অবাধ্যদের লাঞ্ছিত করেন।”

হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih) http://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=14013

গ্রন্থঃ সূনান আত তিরমিজী [তাহকীককৃত] অধ্যায়ঃ ১৯/ যুদ্ধাভিযান (كتاب السير عن رسول الله ﷺ)
হাদিস নম্বরঃ ১৫৫২

৪. অগ্নিসংযোগ ও (বাড়িঘর) ধ্বংস সাধন

১৫৫২। ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, বানু নাযীরের বুওয়ায়রাস্থ খেজুর বাগানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অগ্নিসংযোগ করেন এবং গাছগুলো কেটে ফেলেন। আল্লাহ তা’আলা এই বিষয়ে আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “তোমরা যেসব খেজুরের গাছ কেটেছ বা এদের কাণ্ডের উপর যেগুলোকে স্বঅবস্থায় দাড়িয়ে থাকতে দিয়েছ, তা সবই আল্লাহ্‌ তা’আলার অনুমতিক্রমেই করেছ, যাতে তিনি ফাসিকদের লাঞ্ছিত করতে পারেন”(সূরাঃ হাশর– ৫)।

সহীহ, ইবনু মা-জাহ (২৮৪৪), নাসা-ঈ

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। এ হাদীসটি হাসান সহীহঁ। এ হাদীস মোতাবিক একদল অভিজ্ঞ আলিম মত দিয়েছেন। যুদ্ধাবস্থায় গাছপালা কর্তন এবং দুর্গসমূহের ধ্বংস করায় কোন সমস্যা নেই বলে তারা মনে করেন। কিছু আলিম তা মাকরূহ বলেছেন। এই মত দিয়েছেন ইমাম আওযাঈও। তিনি বলেন, ফলবান বৃক্ষ কাটতে এবং জনপদ ধ্বংস করতে আবূ বকর (রাঃ) বারণ করেছেন। মুসলিমগণও তার পরবর্তী সময়ে এই নীতির অনুসরণ করেছেন।

ইমাম শাফিঈ বলেন, শত্রু বাহিনীর কৃষিক্ষেত্রে আগুন লাগিয়ে দেওয়া এবং ফলবান বা যে কোন ধরনের গাছ কাটাতে কোন সমস্যা নেই।

ইমাম আহমাদ বলেন, প্রয়োজনবোধে তা করা যাবে, কিন্তু বিনা প্রয়োজনে আগুন লাগানো যাবে না।

ইমাম ইসহাক বলেন, শত্রুর প্রতি প্রবল আক্রমণের উদ্দেশ্যে এরূপ করাই সুন্নাত।

হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih) http://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=40347

এই গাছ কাটার ঘটনাটি ছিলো নিছক যুদ্ধকৌশল।
বনু নাযীর-দের সাথে যুদ্ধের সময়কার ঘটনা এটি। আল্লাহপাকের অনুমতি ছিলো এই কৌশল নেওয়ার। আর আমরা জানি যে, প্রয়োজন সাপেক্ষে গাছ কাটা যাবে।
আসুন অল্প জেনে নেওয়া যাক বনু নাযীরের যুদ্ধ সম্পর্কে,
সীরাতে ইবনে হিশাম থেকে প্রাসঙ্গিক কিছু অংশঃ
বনু নাযীরের বহিষ্কার (চতুর্থ হিজরী)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবী আমর ইবনে উমাইয়া (রা) কর্তৃক নিহত বনু আমেরের লোক দুটোর জন্য রক্তপণ আদায় করার ব্যাপারে সাহায্য চাইতে বনু নাযীরের কাছে গেলেন। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে অনাক্রমণ চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন। বনু নাযীর ও বনু আমেরের মধ্যেও অনরূপ চুক্তি ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বনু নাযীরের কাছে গেলেন তখন তারা তাঁকে স্বাগত  জানালো এবং রক্তপণের ব্যাপারে তাঁকে সাহায্য করতে সম্মত হলো।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তাদের মাথায় চাপলো এক কুটিল ষড়যন্ত্র। তারা গোপনে সলাপরামর্শ করতে লাগলো কিভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করা যায়। তারা মনে করলো, এমন মোক্ষম সুযোগ আর কখনো পাওয়া যাবে না। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটা প্রাচীরের পার্শ্বে বসে ছিলেন। তাঁর সাথে ছিলেন আবু বাক্র, উমার ও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম। বনু নাযীরের লোকেরা পরস্পর সলাপরামর্শ করলো। তারা বললো, “কে আছ যে পাশের ঘরের ছাদে উঠে বড় একটা পাথর মুহাম্মাদের ওপর গড়িয়ে দিতে পারবে এবং তার কবল থেকে আমাদেরকে রেহাই দেবে?” বনু নাযীরের এক ব্যক্তি আমর ইবনে জাহাশ ইবনে কা’ব এ কাজের জন্য ছাদের ওপর আরোহণ করলো।
ঠিক এই মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহীর মাধ্যমে তাদের ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পেরে যেখানে বসেছিলেন সেখান থেকে উঠলেন এবং মদীনায় ফিরে গেলেন। তাঁর সঙ্গী সাহাবীগণ তখনো টের পাননি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোথায় গিয়েছেন। তাঁরা অনেক্ষণ অপেক্ষা করেও যখন দেখলেন তিনি ফিরছেন না, তখন তাঁরা তাঁর খোঁজে বেরুলেন। পথে এক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে মদীনা থেকে আসছে। তাঁরা তাঁর কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্ধান চাইলেন। সে বললো, “ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি মদীনায় প্রবেশ করতে দেখেছি।” সাহাবীগণ তৎক্ষনাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পৌঁছে গেলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদেরকে বনু নাবীরের ওপর আক্রমণ করা জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। অতঃপর মুসলমানদেরকে নিয়ে তিনি বনু নাযীরের ওপর আক্রমণ চালালেন। তারা তাদের দুর্গসমূহে আশ্রয় নিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে খেজুরের গাছসমূহ কেটে ফেলতে ও তা জ্বলিয়ে দিতে আদেশ দিলেন। তা দেখে বনু নাযীরের লোকেরা দূর থেকে চিৎকার করে বলতে লাগলো, “মুহাম্মাদ, তুমি তো বিপর্যয় সৃষ্টি করতে নিষেধ করতে এবং যে তা করতো তার নিন্দা করতে এখন কেন তুমি খেজুর গাছ কাটছো এবং জ্বালিয়ে দিচ্ছো?”
এই সময় বুন আওফ ইবনে খাযরাজ গোত্রের কতিপয় ব্যক্তি যথা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই সুলুল, তার আমানত রক্ষক মালিক ইবনে আবু কাওফাল সুওয়াইদ ও দায়িম বনু নাযীরকে এই মর্মে বার্তা পাঠালো যে, “তোমরা ভয় পেয়ো না বা, আত্মসমর্পণ করো না। আমরা কিছুতেই তোমাদেরকে মুসলমানদের হাতে পরাজিত হতে দেব না। তারা যদি তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে তাহলে আমরাও তোমাদের সাথে যাবো।” বনু নাযীর তাদের সাহায্যের অপেক্ষায় থেকে আত্মসমর্পন বা মুকাবিলা কোনটাই করলো না। আর শেষ পর্যন্ত কোন সাহায্যও এলো না। আল্লাহ তাদের মনে ভীতি সৃষ্টি করে দিলেন। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুরোধ করলো, “রক্তপাত করবেন না। বরং আমাদেরকে বহিষ্কার করুন, আমরা আমাদের সব অস্ত্রশস্ত্র রেখে যাবো। অস্তাবর সম্পত্তির যতটুকু প্রত্যেকের উট বহন করে নিয়ে যেতে পারে, ততটুকু নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিন।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অনুরোধ রক্ষা করলেন। বুন নাযীরের প্রস্তাব অনুসারেই কাজ করা হলো। তারা উটের পিঠে বহনোপযোগী অস্থাবর সম্পদ নিয়ে গেল। এই সময় কেউ কেউ তার ঘরের দরজার ওপরের অংশ ভেঙ্গে উটের পিঠে করে নিয়ে যেতে লাগলো। কতক লোক খাইবারে এবং কতক সিরিয়ায় বলে গেল। যারা খাইবার গিয়েছিলো তাদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিল সালাম ইবনে আবুল হুকাইক, কিনানা ইবনে রাবী ইবনে আবুল হুকাইক ও হুয়াই ইবনে আখতাব। খাইবারের অধিবাসীরা তাদের সাথে পূর্ণ সহযোগিতা করলো।
………
তারা অবশিষ্ট সমস্ত সম্পত্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য রেখে গিয়েছিলো। এই সমস্ত সম্পত্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছিলো। সেটা তিনি যেভাবে খুশী কাজে লাগাতে পারতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই সম্পত্তি শুধুমাত্র প্রথম হিজরাতকারী সাহাবাদের মধ্যে বণ্টন করেন। আনসারদের সাহল ইবনে হুনাইক ও আবু দুজানা সিমাক ইবনে খারাশা তাদের দারিদ্রের কথা জানালে তাদেরকেও কিছু দান করেন। বনু নাযীরের প্রসঙ্গে সমগ্র সূরা আল হাশর নযিল হয়। আল্লাহ বনু নাযীরের ওপর যে ভয়াবহ প্রতিশোধ গ্রহণ করেন এবং তাঁর রাসূলকে দিয়ে তাদের ওপর সৈন্য অভিযান পরিচারনা করিয়ে তাদে বিরুদ্ধে যে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করান, এই সূরায় তার বিবরণ রয়েছে। আল্লাহ বলেন, “তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি আহলে কিতাব কাফিরদেরকে (মুসলিম মুজাহিদদের) প্রথম হানাতেই তাদের ঘরবাড়ী থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। তোমরা ধারণা করতে পারনি যে, তারা বেরিয়ে যাবে। আর তারা মনে করেছিল যে, তাদের দুর্গগুলো তাদেরকে আল্লাহর হাত থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু আল্লাহ তাদের ওপর এমনভাবে চড়াও হলেন যে, তারা তা কল্পনাও করতে পারেনি। আল্লাহ তাদের মনের মধ্যে ভীতি সঞ্চর করে দিলেন। (ফলে) তারা তাদের ঘরবাড়ী নিজেদের হাতেও ভেঙ্গেছে আবার মুমিনদের হাত দিয়েও বঙ্গিয়েছে।  কেননা তারা নিজেরাই তাদের ঘরের দরজায় উপরের অংশ ভেঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল।)
অতএব, হে বুদ্ধিমান লোকেরা, শিক্ষা গ্রহণ কর। আল্লাহ যদি তাদের জন্য বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত না দিয়ে থাকতেন (যা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের প্রতি প্রতিশোধই বটে) তাহলে দুনিয়াতেই তাদের শাস্তি দিতেন (তরবারী দ্বারা), অধিকন্তু তাদের জন্য পরকালে রয়েছে দোজখের শাস্তি (বহিষ্কার ছাড়াও)। তোমরা যেসব সতেজ খেজুর গাছ কেটে ফেলেছো অথবা শিকড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দিয়েছো উভয় কাজই আল্লাহর অনুমোদিত এবং তা শুধু নাফরমানদের অপদস্ত করার জন্যই। আর তাদের (বনু নাযীরের) যা কিছু সম্পদ আল্লাহ তাঁর রাসুলের দখলে ফিরিয়ে দিয়েছেন, তা তোমাদের উট ও ঘোড়া দৌড়িয়ে অর্জন করা জিনিস নয়, বরং আল্লাহ তাঁর রাসূলগণকে যার ওপর ইচ্ছা পরাক্রান্ত করে দেন। আর আল্লাহ তাঁর রাসূলের নিকট জনপদের লোকদের থেকে যে সম্পদ ফিরিয়ে দিয়েছেন ( অর্থাৎ উট, ঘোড়া চালিয়ে যুদ্ধ ও শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দখলে এসেছে। তা আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলের জন্য, আত্মীয় স্বজনের জন্য, ইয়াতীম মিসকীন ও পথিকের জন্য, যাতে সম্পদ শুধু তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যেই আবর্তিত হতে না থাকে। আর রাসূল তোমাদের কে যা দিয়েছেন তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে নিবৃত্ত করেছেন তা থেকে নিবৃত্ত হও।”
এখানে আল্লাহ তায়ালা যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ মুসলমানদের মধ্যে বিতরণের বিধান বর্ণনা করেছেন।
সূত্রঃ সীরাতে ইবনে হিশাম, শিবির অনলাইন লাইব্রেরি, বনু নাযীরের বহিষ্কার অংশ
আল্লাহর রাসূল কতটা দয়াশীল হলে শত্রুকে তাদের সাধ্যমতো অস্থাবর সম্পত্তি নিয়ে যেতে দেন? অথচ, যুদ্ধনীতি সম্পূর্ণ উল্টো।
জি, ভাই, মুহাম্মদ (সাঃ) সর্বশ্রেষ্ট মানুষ ছিলেন।
যাই হোক, এখন লেখার মূল টপিক ‘গাছ কাটা নিয়েই আলোচনা করবো’।
আল্লাহ তা’আলা এ প্রসঙ্গে আয়াত নাজিল করেছিলেন,

“তোমরা যে সব নতুন খেজুর গাছ কেটে ফেলছ অথবা সেগুলোকে তাদের মূলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দিয়েছ। তা তো ছিল আল্লাহর অনুমতিক্রমে এবং যাতে তিনি ফাসিকদের লাঞ্ছিত করতে পারেন।” – কুরআন ৫৯:৫

এ আয়াতের তাফসীরে ইবনে কাসীর (রহঃ) উল্লেখ করেছেন,
“ইয়াহূদীরা যে তিরস্কারের ছলে বলেছিল যে, তাদের খেজুরের গাছগুলো কাটিয়ে দিয়ে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) নিজের উক্তির বিপরীত কাজ করতঃ ভূ-পৃষ্ঠে কেন বিপর্যয় সৃষ্টি করছেন? এটা তাদের ঐ প্রশ্নেরই জবাব যে, যা কিছু হচ্ছে সবই প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে তার শত্রুদেরকে লাঞ্ছিত ও অকৃতকার্য করে দেয়ার লক্ষ্যেই হচ্ছে। যেসব গাছ বাকী রেখে দেয়া হচ্ছে সেটাও তাঁর
অনুমতিক্রমেই হচ্ছে এবং যেগুলো কাটিয়ে ফেলা হচ্ছে সেটাও যৌক্তিকতার সাথেই হচ্ছে।
এটাও বর্ণিত আছে যে, মুহাজিরগণ একে অপরকে ঐ গাছগুলো কেটে ফেলতে নিষেধ করছিলেন এই কারণে যে, শেষে তো ওগুলো গানীমাত হিসেবে মুসলমানরাই লাভ করবেন, সুতরাং ওগুলো কেটে ফেলে লাভ কি? তখন আল্লাহ্ তা’আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন যে, বাধাদানকারীরাও একদিকে সত্যের উপর রয়েছে এবং কর্তনকারীরাও সত্যের উপর রয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য হলো মুসলমানদের উপকার সাধন করা এবং তাদের উদ্দেশ্য হলো কাফিরদেরকে রাগান্বিত করে তোলা এবং তাদের দুষ্কার্যের স্বাদ গ্রহণ করানো। এটাও এদের উদ্দেশ্য যে, এর ফলে এই শত্রুরা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবে এবং এরপর যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে যাবে, তখন তাদের মন্দ কার্যের শাস্তি হিসেবে তাদেরকে তরবারী দ্বারা দ্বিখণ্ডিত করে দেয়া হবে।
সাহাবীগণ এ কাজ তো করলেন বটে, কিন্তু পরক্ষণেই ভয় পেলেন যে, না জানি হয়তো ঐ খেজুর বৃক্ষগুলো কেটে ফেলা অথবা বাকী রেখে দেয়ার কারণে তাদেরকে আল্লাহ্ তা’আলার নিকট জবাবদিহি করতে হবে। তাই তারা এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আল্লাহ্ তা’আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ দু’টোতেই প্রতিদান বা সওয়াব রয়েছে, কর্তন করার মধ্যেও এবং বাকী রেখে দেয়ার মধ্যেও।  কোন কোন রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, কেটে ফেলা এবং জ্বালিয়ে দেয়া। উভয়েরই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।”
সূত্রঃ তাফসীরে ইবনে কাসীর, বঙ্গানুবাদ, কুরআন ৫৯:৫ এর তাফসীর; জামে আত তিরমিজি ৩৩০৩

তাফসীরে আহসানুল বয়ান,

“কিছু গাছ কেটে দিয়েছিলেন এবং কিছু গাছ নিজ অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছিলেন। এ রকম করার লক্ষ্য ছিল, শত্রুর আড়কে ভেঙ্গে দেওয়া এবং এ কথা পরিষ্কার করে দেওয়া যে, মুসলিমরা এখন তোমাদের উপর সম্পূর্ণরূপে জয়যুক্ত হয়েছেন।……

মহান আল্লাহও মুসলিমদের এই কৌশলভিত্তিক কাজকে সঠিক বলে অনুমোদন করেন…”

তাফসীরে ফাতহুল মজিদ,

“অবরোধকালে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশে সাহাবীরা বনু নাযীরের খেজুর গাছ কেটে ফেলেছিল ও আগুন লাগিয়ে দিলেছিল। কিছুৃ গাছ বাকী ছিল। এ কাজ আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশেই হয়েছিল। এ রকম করার লক্ষ্য ছিল শত্রুর আড়ালকে ভেঙ্গে দেওয়া যাতে আত্মরক্ষা করতে না পারে। “

(ইমাম কুরতুবিও এই মতটি গ্রহণ করেছেন – তাফসীরে কুরতুবিতে উল্লেখ আছে)

মা’আরিফুল কুরআনে আছে,
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বনূ নাজীরের দূর্গ অবরোধ করেন, তখন আশপাশের কিছু খেজুর গাছ কাটতে হয়েছিল। এতে কিছু লোক এই বলে আপত্তি জানায় যে, ফলের গাছ কাটা সমীচীন হয়নি। তারই জবাবে এ আয়াত নাযিল হয়েছে। এতে বলা হচ্ছে, যেসব গাছ কাটা হয়েছে, তা আল্লাহ তাআলার হুকুমেই কাটা হয়েছে। কোন ন্যায়সঙ্গত জিহাদে যুদ্ধ কৌশল হিসেবে যদি এরূপ করতে হয়, তবে তা দোষের নয়।
সূত্রঃ তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন (সংক্ষিপ্ত বঙ্গানুবাদ), ৫৯:৬ এর তাফসীর
ইংরেজি অনুবাদে সম্পূর্ণই উল্লেখিত আছে,

…it was explained that the act of cutting or burning down the trees cannot be construed as disorderliness. But it was done to degrade the unbelievers, and therefore it carries reward in the Hereafter.

Ruling

Is it legitimate to demolish or burn down the homes of the infidels, or cut or burn down their trees, or destroy their fields and farms? The leading authorities on Islamic Jurisprudence are not unanimous on this question. Imam A’zam Abu Hanifah (رح) rules that all of these actions are permitted. Shaikh Ibn Humam (رح) ، however, qualifies the ruling and restricts it. He rules that all of the above are permitted if and only if the enemies cannot be vanquished or overpowered without resorting to the above measures, or if the victory of Muslims is not probable or likely. The whole purpose of this ruling is to break the might and power of the enemy. In the case where Muslims do not win the struggle, destruction of their moveable and immovable properties may be included in weakening their might and main. [ Mazhari ]

অর্থাৎ, সেই গাছ কাটা উচ্ছৃঙ্খলতার কারণে ছিলো না, বরং বানু নাযীর গোত্রকে হেয় ও লাঞ্ছিত করার জন্য ছিলো। এবং শর্তসাপেক্ষে, যেখানে জয়ের সম্ভাবনা কম, সেখানে কাফিরদের দুর্বল করার উদ্দেশ্যে তাদের অস্থাবর সম্পত্তি নষ্ট করা যাবে। – এই যুদ্ধকৌশল পৃথিবীর প্রায় সব সিস্টেমেই আছে!
তাফসীরে মাউদূদীতে সুন্দরভাবে এসেছে। প্রাসঙ্গিক অংশঃ
প্রসঙ্গটি এই যে, মুসলমানরা অবরোধের সুবিধার্থে বনী নাদিরের বসতির আশেপাশে মরুদ্যানে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক খেজুর গাছ কেটে ফেলেছিল বা পুড়িয়েছিল। তবে সেই গাছগুলিকে  অক্ষত রেখেছিলো যেগুলো যুদ্ধকাজে বাঁধা দেয় নি। এতে মদীনার মুনাফিকরা এবং বনী কুরাইযা এবং খোদ বনী নাদিররা হৈচৈ করে বলেছিল যে, একদিকে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা ছড়ানো নিষেধ করেছেন, কিন্তু, অন্যদিকে তার আদেশে ফলের গাছ কেটে ফেলা হচ্ছিল, যা বিশ্বে বিশৃঙ্খলা ছড়ানোর শামিল।

এই আল-হাশরে আল্লাহ নির্দেশ নাযিল করলেনঃ ‘তোমরা যে গাছ কেটে ফেলো বা যা কিছু দাঁড় করিয়ে রেখেছ, তোমাদের কোন কাজই হারাম ছিল না, তবে তাতে আল্লাহর অনুমতি ছিল।’

এই আয়াত থেকে যে আইনগত নির্দেশ এসেছে তা হল যে সামরিক অভিযানের জন্য যে ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্ট হয় তা “বিশ্বে বিশৃঙ্খলা ছড়ানো” এর আওতায় আসে না। কিন্তু বিশ্বে বিশৃংখলা ছড়ানো হচ্ছে যুদ্ধের হিস্টিরিয়ায় ভুগতে থাকা সৈন্যবাহিনী শত্রু অঞ্চলে ঢুকে ফসল, গবাদিপশু ধ্বংস করা শুরু করবে, কোনো কারণ ছাড়াই বাগান, বাড়িঘর এবং সবকিছুই ধ্বংস করতে শুরু করবে।

হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) মুসলিম বাহিনীকে সিরিয়ায় পাঠানোর সময় সাধারণ নির্দেশনাটিই দিয়েছিলেন: “ফলের গাছ কাটবেন না, ফসল নষ্ট করবেন না, বসতি ধ্বংস করবেন না।”

এটা ছিল ঠিক কুরআনের শিক্ষা অনুসারে, যেখানে যারা বিশৃঙ্খলা ছড়ায় তাদের নিন্দা করে; ‘আর যখন সে ফিরে যায়, তখন যমীনে প্রচেষ্টা চালায় তাতে ফাসাদ করতে এবং ধ্বংস করতে শস্য ও প্রাণী। আর আল্লাহ ফাসাদ ভালবাসেন না।” (সূরা আল বাকারাহ ২০৫)। কিন্তু যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ হল যে, শত্রুর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের জন্য যদি ধ্বংসের প্রয়োজন হয় তবে তা বৈধ। এভাবে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এই আয়াতের তাফসীরে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন: ‘মুসলিমরা বনী নাদিরের সেই গাছগুলোই কেটে ফেলেছিল যেগুলো যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে ছিল।‘ (তাফসির নিসাবুরী)। কোন কোন মুসলিম ফকীহ বিষয়টির এ দিকটিকে উপেক্ষা করেছেন এবং অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, বনী নাদীরের গাছ কাটার অনুমতি শুধুমাত্র ঐ বিশেষ ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এটি সাধারণত জায়েয করে না যে যখনই যুদ্ধের প্রয়োজন হয় তখনই শত্রুদের গাছ কেটে পুড়িয়ে ফেলা হয়। ইমাম আওযায়ী, লাইছ ও আবু সাউরও একই মত পোষণ করেন। কিন্তু অধিকাংশ ফকীহ মনে করেন যে, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযানের জন্য এটা জায়েজ। তবে নিছক ধ্বংস ও লুটপাটের উদ্দেশ্যে এটা জায়েয নয়।

কেউ প্রশ্ন করতে পারে: কুরআনের এই আয়াতটি মুসলমানদের সন্তুষ্ট করতে পারে, কিন্তু যারা কুরআনকে আল্লাহর বাণী হিসাবে গ্রহণ করে নি তারা কীভাবে তাদের আপত্তির এই উত্তরে সন্তুষ্ট হতে পারে যে উভয় কাজই জায়েজ ছিল কারণ তাদের কাছে এর জন্য আল্লাহর অনুমতি ছিল?

উত্তর হলঃ কুরআনের এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল শুধুমাত্র মুসলমানদের সন্তুষ্ট করার জন্য; এটা কাফেরদের সন্তুষ্ট করার জন্য অবতীর্ণ হয়নি। যেহেতু ইহুদী ও মুনাফিকদের আপত্তির কারণে, অথবা তাদের নিজস্ব চিন্তাধারার কারণে, তারা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা ছড়ানোর জন্য দোষী কিনা তা নিয়ে বিভ্রান্তির সাথে জড়িত ছিল, তাই আল্লাহ তাদের সন্তুষ্টি দিয়েছিলেন যে উভয় কাজই, অবরোধের সুবিধার্থে কিছু গাছ কেটে ফেলা এবং অবরোধকে বাধা দেয়নি এমন আরও কিছু গাছ কে দাঁড় করিয়ে রাখা, যা অবরোধে বাধা সৃষ্টি করে নি,  সেগুলো আল্লাহর আইন অনুযায়ী ছিল।

সূত্রঃ তাফসীরে মাউদূদী ইংরেজি অনুবাদ https://www.alim.org/quran/tafsir/maududi/surah/59/5

আশা করি অজ্ঞদের বোকামি ধরতে পেরেছেন। তারা আর কতোদিন জোর করে অবিশ্বাস করে থাকবে? – আল্লাহই সবকিছু সবচেয়ে ভালো জানেন।
আমি একটা চেরিপিকিং+রূপকথা মেশাইঃ
জন একদিন খুন করে হাতেনাতে ধরা পড়লো। তো সেই দেশের শাসক ‘ক” তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেন।
এখন, আমি সেই বিচারককে অপছন্দ করি। তাই ফেইসবুকে ওয়েবসাইটে পোস্ট করতে লাগলাম, এমনকি জনও “ক” এর হিংস্র আক্রমণ থেকে রক্ষা পায় নি, তার প্রমাণ তার রায় থেকেই মিলে…
(প্রেক্ষাপট, প্রসঙ্গ সবকিছু লুকানো)
যেটা স্বঘোষিত নাস্তিকরা করে থাকেঃ
    Show More
    5 1 vote
    Article Rating
    Subscribe
    Notify of
    guest
    0 Comments
    Inline Feedbacks
    View all comments
    Back to top button