ইতিহাস

রাজা রামমোহন রায় – ভিন্ন চোখে

রাজা রামমোহন রায়কে বাংলার নবজাগরণের পথিক বলা হয়। তিনি একজন আধুনিক সমাজ সমাজ সংস্কারকও। তাঁকে Father of Modern India উপাধিও দেওয়া হয়েছে।
তিনি ব্রাহ্মণ্যধর্মের কুপ্রথাগুলোর বিরোধিতা করে ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করে পিতার সম্পত্তি থেকে বেদখলও হন । সতীদাহ প্রথাকে নিষিদ্ধ করার জন্য তাঁকে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয় ইতিহাসে।
উপরের বিষয়গুলো মোটামুটি আমরা সকলেই জানি। যাইহোক
মোটাদাগে তিনটা বিষয়ে আলোকপাত করবো এখানে,

  • তিনি ছিলেন আধুনিক, মডার্ন ও নবজাগরণের পথিক।
  • তিনি নিজের ধর্মের বিরোধিতা করে নতুন ধর্ম ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
  • সতীদাহ প্রথা।

নবজাগরণ ও মডার্ন রামমোহন

এই বাংলার নবজাগরণ আসলে ছিলো কলকাতার বাবুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এটা কিন্তু সামগ্রিক বাংলার মানুষের জন্য ছিলোনা।
জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন,

..এই ‘নবজাগরণ’ কলকাতা শহরের অল্প কয়েকজন ভূস্বামী, ধনপতি, সমাজপতি ও শিক্ষিত মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কখনও গণজাগরণের রূপ নেয়নি। ইউরোপের নবজাগরণ এবং ধর্মসংস্কার আন্দোলনের চেয়েও এদেশের ‘নবজাগরণ’ ছিল অনেক বেশী পরিমাণে অভিজাত শ্রেণীর নবজাগরণ।[1]বিকল্প নবজাগরণ, জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়

আর এই নবজাগরণের প্রায় সকল নায়ক ইংরেজ শাসনকে ঈশ্বরের আশীর্বাদ ভাবতেন। বিশেষ করে নবজাগরণের পথিক রাজা রামমোহন রায় তো খোলাখুলি বলেছেন,

ভারতবাসীর পরম সৌভাগ্য যে তাহারা ভগবত করুণায় সমগ্র ইংরেজ জাতির রক্ষণাবেক্ষণে রহিয়াছে এবং ইংল্যান্ডের রাজা, ইংল্যান্ডের লর্ডগণ ভারতবাসীগণের জন্য আইন প্রণয়নের কর্তা।[2]রামমোহন রচনাবলী, ১৯৭৩, হরফ প্রকাশনি ; Rammohan Ray — Appeal to the King in Council.

তিনি জমিদার প্রথার সমর্থক ছিলেন, এমনকি নীলকরদের পক্ষেও কথা বলেছেন।[3]উনিশ শতাব্দীর নারী প্রগতি ও রামমোহন- বিদ্যাসাগর, নারায়ণ চৌধুরী

তিনি হিন্দুধর্মের আচার-আচরণের বিরোধিতা করলেও সারাজীবন পৈতে ধারণ করেছেন। ব্রাহ্মণদের রান্না ছাড়া অন্য কোন রান্না স্পর্শ করতেন না। ইংল্যান্ড যাওয়ার সময় একজন ব্রাহ্মণ বাবুর্চি সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি রেনেসাঁসের নায়ক কিন্তু তিনি বর্ণপ্রথা ভেঙে ফেলতে চাননি, পারেননি।
তিনি যে ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেখানে বেদপাঠ করতো তেলেগু ব্রাহ্মণ। কোন অব্রাহ্মণ স্থান পেতো না।

যারা রামমোহনকে Father of Modern India উপাধি দিয়েছেন তাদেরকে উদ্দেশ্য করে ঐতিহাসিক অমলেশ ত্রিপাঠি বলেন,

যারা তাঁকে আধুনিক সেকুলারিজমের জনক বলতে চান তাঁরা ভুলে যান যে বেদান্ত প্রতিপাদিত সত্যধর্ম ছিলো তাঁর সব কর্মের কেন্দ্র।[4]স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস, অমলেশ ত্রিপাঠী

ইতিহাস বিজ্ঞানী রজত রায় বলেন,

রামমোহনের মতাদর্শ ও ভূমিকা এমনই ছিলো যা তাঁকে স্পষ্টভাবে মুৎসুদ্দিরূপে চিত্রিত করে।[5]পতিত, দেবী চ্যাটার্জি গ্রন্থে উদ্ধৃত

ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিরোধিতা?

রামমোহন রায়ের ধর্মসংস্কার আন্দোলনকে ব্রিটিশ শাসনের পরিপূরক বলে মনে করেন জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়।
তিনি লিখেন,

ব্রাহ্ম সমাজের ধর্মসংস্কার আন্দোলন জমিদার শ্রেণীর বিত্ত সম্পত্তি সুরক্ষিত করেছে এবং তাদের সার্বিক শ্রীবৃদ্ধি সুনিশ্চিত করেছে। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্থিতিশীল করেছে।[6]বিকল্প নবজাগরণ, জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়

এদিকে রামমোহন রায় নিজেই লিখেছেন,

আমার সমস্ত বিতর্কে আমি ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরোধিতা করিনি। বিরোধিতা করেছি তার বিকৃতির বিরুদ্ধে।[7]রামমোহন রচনাবলী, ১৯৭৩, হরফ প্রকাশনি

রামমোহন রচনাবলীর ভূমিকায় অজিতকুমার ঘোষ লিখেছেন,

তিনি ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরোধী ছিলেন না, এবং তিনি দেখাতে চাইলেন যে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পৌত্তলিকতার সাথে এই ধর্মের প্রাচীন ধর্মাচারণের কোন সম্পর্ক নেই।[8]রামমোহন রচনাবলী, ১৯৭৩, হরফ প্রকাশনি

সুতরাং দেখায় যাচ্ছে ব্রাহ্ম ধর্ম আসলেই কোন ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না, এটা ব্রাহ্মণ্য ধর্মেরই একটা নব রূপ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবিষয়ে লিখেছেন,

কিন্তু বর্তমানে বঙ্গসমাজে বিপ্লবের আগ্নেয় উচ্ছাস সর্বপ্রথম যিনি উৎসাহিত করিয়া দিলেন সেই রামমোহন রায় বিপুলায়তন প্রাচীন মন্দির জীর্ণ হইয়া প্রতিদিন ভাঙিয়া পড়িতেছিলো, অবশেষে হিন্দু ধর্মের দেবপ্রতিমা আর দেখা যাইতেছিলো না, রামমোহন সেই ভগ্নমন্দির ভাঙিলেন। সকলে বলিল তিনি হিন্দু ধর্মের উপরে আঘাত করিলেন। কিন্তু তিনিই হিন্দু ধর্মের জীবন রক্ষা করিলেন।[9]রামমোহন, উত্তরপক্ষ,  অরবিন্দ পোদ্দার, উচ্চারণ কলকাতা

সতীদাহ প্রথা

সতীপ্রথা সম্পর্কে স্বপন বসু বলেছেন,

যেসব অঞ্চলে মুসলিম প্রভসব বেশি সেসব অঞ্চলে সতীপ্রথা কম আর যেসব অঞ্চলে ব্রাহ্মণ্য প্রভাব বেশি সেসব অঞ্চলে সতীপ্রথাও বেশি।

রামকান্ত তাঁর পুত্র রামমোহনকে ফার্সী উচ্চ শিক্ষাকেন্দ্র পাটনায় পাঠান। সেখানে তিনি ফার্সীতে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

কোরানে নারীজাতির প্রতি সুবিচার এবং সদ্ব্যবহারের যে সব কথা আছে সেগুলোও রামমোহনকে যথেষ্ট আকৃষ্ট করে। হিন্দু সমাজে সে আমলে নারীজাতির প্রতি সুবিচার করা হোত না। পণ্ডিত নামে পরিচিত এক শ্রেণীর গোঁড়া লোক তখন হিন্দুসমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। এঁরা নানারকম বাধানিষেধের বেড়াজালে নারীজাতিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন। শুধু তাই নয়, কোন নারী বিধবা হলে সমাজপতিরা জোর করে তাকে স্বামীর চিতায় তুলে দিয়ে জীবন্ত দগ্ধ করে হত্যা করতেন এবং সবচেয়ে আশ্চর্য কথা, এই ভয়াবহ নৃশংস কার্যটি ধর্মের নামে সম্পন্ন করা হোত। কোরান পড়বার পরে রামমোহনের মন হিন্দুসমাজের এই নৃশংস প্রথার বিরুদ্ধে বিরাগ হয়ে ওঠে।[10]রামমোহন-বিদ্যাসাগর-মাইকেল, ইন্দুভূষণ দাস

দেখা যাচ্ছে সতীদাহপ্রথার বিরুদ্ধে তাঁর এই বিরোধিতা আসলে ইসলামের প্রভাবে।
তবে হ্যাঁ সতীদাহপ্রথার বিরুদ্ধে রামমোহনের অনেক বড় সামাজিক অবদান আছে, তবে এখানে কিছু কথা আছে…
রামমোহন রচনাবলীর ভূমিকাকার অজিতকুমার ঘোষ ‘সতীদাহ প্রথা-বিরোধী আন্দোলন’ প্রসঙ্গে লিখেছেন,

এই আন্দোলনের প্রবর্তক রামমোহন নয়। বহুদিন আগে থেকেই ফরাসি, ওলন্দাজ ও পোর্তুগিজ শাসকরা এই কুপ্রথা বন্ধ করবার জন্য চেষ্টা করে আসছিলেন। ইংরেজরাও এটা বন্ধ করার জন্য অনেকদিন থেকেই চেষ্টা করে আসছিলেন, তবে আইনের দ্বারা এই প্রথা বন্ধ করতে গেলে এ-দেশীয় লোকেরা তাদের ধর্মে হস্তক্ষেপ হয়েছে বলে অসন্তুষ্ট হতে পারে ভেবে তাঁরা দ্রুত কোনও ব্যবস্থা অবলম্বন করেননি। ১৯১৭ সালে রামমোহন ইংরেজ শাসকদের পক্ষে এই আন্দোলনে যোগদান করেন। রামমোহন সতীদাহ প্রথার ঘোর বিরোধী হলেও উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক যখন আইনের দ্বারা এই প্রথা বিলুপ্ত করতে চেয়েছিলেন তখন তিনি তার বিরোধিতা করেছিলেন। এই বিরোধিতা সমর্থন করতে পারা যায় কি না সন্দেহ।[11]রামমোহন রচনাবলী, ১৯৭৩, হরফ প্রকাশনি

তবে, সতীদাহ প্রথা রদ করে আইন প্রণয়নের পরে রামমোহন বেন্টিঙ্ককে অভিবাদন জানিয়েছিলেন।
তাহলে দেখা যাচ্ছে তিনি আইন বানিয়ে এই প্রথা বন্ধ করার বিরোধী ছিলেন কিন্তু বেন্টিংক আইন বানিয়ে নিষিদ্ধ করলে তিনি সমর্থন করেন।
আরো জানলে আশ্চর্য হতে হয় যে নবজাগরণের নায়ক বিধবা বিবাহের বিরোধী ছিলেন। তিনি লিখেছিলেন,

বিধবার বিবাহ তাবৎ সম্প্রদায়ে অব্যবহার্য হইয়াছে সুতরাং উহা সদ্ব্যবহার কহাইতে পারেনা।[12]রামমোহন গ্রন্থাবলি, সাহিত্য পরিষদ (৬), পথ্যপ্রদান, কলকাতা। আরোও দেখতে পারেন, বাংলার রেনেসাঁস ও রামমোহন, দীপঙ্কর চক্রবর্তী

যৌবনে তিনি মাদ্রাসায় আরবি ও ফারসি শিক্ষালাভ করেছিলেন সেই তিনিই দেশের অধঃপতনের জন্য মুসলমানদের দায়ী করেছেন আর ব্রিটিশদের উদ্ধারকর্তা হিসেবে দেখেছিলেন।[13]এ ক্রিটিক অব কলোনিয়াল ইন্ডিয়া, সুমিত সরকার

তিনি রাজা উপাধি পেয়েছিলেন বাদশাহ দ্বিতীয় আকবর শাহের থেকে। সমস্ত খরচও জুগিয়েছিলেন বাদশাহ। আর তিনি ইংল্যান্ডে গিয়ে কি করলেন?
তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে চিঠি লিখে কয়েকটি দাবী করেন, দাবীগুলি ছিলো,
‘ভারতে ফারসি ও আরবির পরিবর্তে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। কাজকর্মের ভাষাও ইংরেজিতে করতে হবে।’ ফলে ভারতের মুসলিম সমাজ মুর্খ ও বেকারে পরিণত হলো।[14]রামমোহন-বিদ্যাসাগর-মাইকেল, ইন্দুভূষণ দাস

    Footnotes

    Footnotes
    1, 6বিকল্প নবজাগরণ, জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়
    2রামমোহন রচনাবলী, ১৯৭৩, হরফ প্রকাশনি ; Rammohan Ray — Appeal to the King in Council.
    3উনিশ শতাব্দীর নারী প্রগতি ও রামমোহন- বিদ্যাসাগর, নারায়ণ চৌধুরী
    4স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস, অমলেশ ত্রিপাঠী
    5পতিত, দেবী চ্যাটার্জি গ্রন্থে উদ্ধৃত
    7, 8, 11রামমোহন রচনাবলী, ১৯৭৩, হরফ প্রকাশনি
    9রামমোহন, উত্তরপক্ষ,  অরবিন্দ পোদ্দার, উচ্চারণ কলকাতা
    10, 14রামমোহন-বিদ্যাসাগর-মাইকেল, ইন্দুভূষণ দাস
    12রামমোহন গ্রন্থাবলি, সাহিত্য পরিষদ (৬), পথ্যপ্রদান, কলকাতা। আরোও দেখতে পারেন, বাংলার রেনেসাঁস ও রামমোহন, দীপঙ্কর চক্রবর্তী
    13এ ক্রিটিক অব কলোনিয়াল ইন্ডিয়া, সুমিত সরকার
    0 0 votes
    Article Rating
    Subscribe
    Notify of
    guest
    0 Comments
    Inline Feedbacks
    View all comments
    Back to top button