ইসলামবিরোধীদের প্রতি জবাববিজ্ঞানমুসলিম

কুরআন-সুন্নাহতে কি পৃথিবীকে সমতল বলা হয়েছে? – পর্ব ১

পৃথিবী সমতল বলা লোকদের খণ্ডন

  1. কুরআন-সুন্নাহতে কি পৃথিবীকে সমতল বলা হয়েছে? – পর্ব ১
  2. কুরআন-সুন্নাহতে কি পৃথিবীকে সমতল বলা হয়েছে? – পর্ব ২

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।
সকল প্রশংসা আল্লাহ তা’আলার। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক তার হাবিব মুহাম্মদ ﷺ এর উপর।


কতিপয় ব্যক্তির মুফাসসির জালিল ইমাম ত্বাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) এর একটি উক্তি দিয়ে পৃথিবীকে সমতল প্রমাণ করার চেষ্টা করছে আর যুক্তি দিচ্ছে যেহেতু দৈর্ঘ্য, প্রস্থ পরিভাষাগুলো গোলক বা গোলাকৃতি বস্তুর ক্ষেত্রে নয় বরং সমতল বা চতুর্ভুজাকার বস্তুর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, তাই এখানে তিনি পৃথিবী সমতল হবার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

এই মতকে কয়েকভাবে খণ্ডন করা যায়:

প্রথমত তিনি দৈর্ঘ্য প্রস্থ প্রসারিত হবার কথা বলেছেন। এখানে তিনি বাসিত প্রশস্ত/প্রসারিত কথার অর্থ কীরূপ নিয়েছেন তা বিবেচনা করতে হবে। আল্লাহ বলেন,

وَجَعَلۡنَا جَہَنَّمَ لِلۡکٰفِرِیۡنَ حَصِیۡرًا

আর আমি জাহান্নামকে করেছি কাফিরদের জন্য কয়েদখানা।সূরা আল ইসরা ৮

ইমাম ত্বাবারি এই আয়াতে حصير এর অর্থ সম্পর্কে বলেন,

আমার মতে এই আয়াতে (হাস্বির এর মানে সম্পর্কে) সঠিক অনুবাদ হলো: আমরা জাহান্নামকে কাফিরদের জন্য এমন বিছানা বা শয্যাস্থান রূপে তৈরি করেছে যা সেখান থেকে সড়বে না। حصير এর সমার্থক অর্থের মধ্যে রয়েছে بساط (বিছানা)। তাহলে এর মানে হচ্ছে হাসির দিয়ে বন্দীকরণ এবং বিস্তৃত করণের সমন্বিত অর্থ হবে।

والصواب من القول في ذلك عندى أن يقال: معنى ذلك: وجعلنا جهنم للكافرين فراشا ومهادا لا يزايله. من الحصير الذي هو بمعنى البساط؛ لأن ذلك إذا كان كذلك كان جامعا معنى الحبس والامتهاد[1]তাফসির আত্ব-ত্বাবারি, ১৪/৫১০, মাক্তাবা শামেলা

আর বিশেষ দ্রষ্টব্য যে, আল্লাহ কুরআনে পৃথিবীকে বিস্তৃত/প্রশস্ত করা বুঝাতে ক্ষেত্রে مَدَّ, بساط উভয় শব্দই ব্যবহার করেছেন।

তাহলে مَدَّ الارض দ্বারা পৃথিবীকে বিছানোর অর্থ স্বরূপ পৃথিবীকে সমতল বলার দলিল নেয়া হয়। তাহলে বিসাত/بساط কে যে ইমাম ত্বাবারী যে কয়েদখানা বা হাসির এর সমার্থক রূপে ব্যবহার করেছেন, সেক্ষেত্রে বিসাত দিয়ে কি তার বক্তব্য অনুযায়ী পৃথিবীকে কয়েদখানা ধরতে হবে?

ইহা আমার ইলযামি জবাব।

দ্বিতীয়ত ইমাম তাবারি বাদে যেসব মুফাসসির প্রশস্ততার কথার ক্ষেত্রে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ বুঝিয়েছেন তারা এটাও উল্লেখ করেছেন যে পৃথিবী সত্তাগতভাবে গোল ছিল সেই অবস্থা থেকে প্রশস্তিত হয়েছে। যেমন:

ইমাম ওয়াহিদী আন নিসাপুরী (মৃত্যু: ৪৬৮ হি.) রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন,

“তিনিই যমিনকে প্রশস্ত করেছেন।” – এই আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে:

এটি প্রথমে গোল ছিল, তাই একে প্রশস্ত করা হয়।

প্রশস্ত করার অর্থ সম্পর্কে ভাষাবিদরা বলেছেন, এর মানে হলো: দীর্ঘ এবং বিস্তৃত করে সৃষ্টি করার মাধ্যমে একত্রিত করা। এজন্যই ভাষাবিদ আবু যাকারিয়া আল ফাররা বলেছেন, পৃথিবী দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থে প্রশস্ত করা হয়েছে।

روي في التفسير: أنها كانت مدوره فمدت.
قال أهل اللغة (5): معنى المد: أخذ المجتمع بجعله على الطول والعرض، ولذلك قال الفراء (6): أي بسط الأرض طولا وعرضا.

«التفسير البسيط» (12/ 286):[2]আত তাফসিরুল বাসিত্ব, ১২/২৮৬, মাক্তাবা শামেলা

অন্যত্রও একই কথা বলেছেন,

«التفسير الوسيط للواحدي» (3/ 4):
«{وهو الذي ‌مد ‌الأرض} [الرعد: 3] قال الفراء: بسطها طولا وعرضا»[3]আত তাফসিরুল ওয়াসিত্ব লিল ওয়াহিদী, ৪/৩, মাক্তাবা শামেলা

তিনি অন্যত্র তার তাফসিরে বলেছেন,

আল্লাহর বাণী: (আমি কি পৃথিবীকে শয্যা রূপে সৃষ্টি করিনি? সূরা নাবা আয়াত ৬) – এখানে শয্যা অর্থ হলো বিছানা, আস্তরণ, নিচু ভূমি।

এই কথার মানে হচ্ছে, সৃষ্টিকুল যাতে এর উপর বসবাস এবং চলাচল করতে পারে তার জন্য একে আয়ত্তে এনে দিয়েছি।

«التفسير البسيط» (23/ 115):
«‌‌6 – قوله تعالى: {ألم نجعل الأرض مهادا} أي ‌فراشا، وبساطا، ووطاء (1). (والمعنى: ذللناها للخلق حتى سكنوها، وساروا في مناكبها)»[4]আত তাফসিরুল বাসিত্ব, ২৩/১১৫, মাক্তাবা শামেলা

বিঃ দ্রঃ আয়াতে مهادا শব্দটি শয্যা অর্থ নিলেও এটি বিছানা এর সমার্থক, যা তিনি নিজেই উল্লেখ্য করেছেন। তিনি পূর্বে বিছানা অর্থকে দৈর্ঘ্য প্রস্থের বিস্তার অর্থে গ্রহণ করলেও এখানে জমিনকে চলাচলের উপযোগী অর্থে নিয়েছেন।

ইমাম সামাআনিও (মৃত্যু ৪৮৯ হি) তার তাফসিরে লিখেছেন,

আল্লাহ তা’আলার বাণী: (তিনি যমীনকে বিস্তৃত করেছেন – সূরা রা’দ: ৩)
আয়াতটির মানে হলো: পৃথিবী গোল এবং গোলাকৃতির ছিল। তাই আল্লাহ একে বিস্তৃত করে প্রশস্ত করলেন।

«تفسير السمعاني» (3/ 76):
«قوله تعالى: {وهو الذي ‌مد ‌الأرض} الآية قد كانت الأرض مدرة مدورة، فبسطها الله تعالى ومدها[5]তাফসিরুস সামআনি, ৭৬/৩, মাক্তাবা শামেলা

এখানে মুফাসসির হাফিয সামআনি (রাহিমাহুল্লাহ) এর কথা দ্বারাও প্রমাণিত হয় পৃথিবী সত্তাগতভাবেই গোল ছিল, অতঃপর একে বিস্তৃত করা হয়।

আর কিছু মুফাসসির مدَّ, بساط কে বিস্তৃত করার যাহিরী বা বাহ্যিক অর্থে গ্রহণ করে পৃথিবী গোলাকার বলতে চেয়েছেন। যেমন:

ইবন আতিয়্যাহ আল মালিকী আল আশ’আরী (মৃত্যু ৫৪১ হি.) তার তাফসিরে লিখেছেন,

আল্লাহ তা’আলার বাণী “প্রশস্ত করা” পৃথিবীর আকারের বাহ্যিক অর্থের দিকে ইঙ্গিত করে। সমতল কিংবা গোলাকার হওয়া উভয় মতের যে কোনো একটি উপর বিশ্বাস করাটা ততক্ষণ পর্যন্ত নিন্দনীয় নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না “গোলাকৃতি” বলাটা বাতিল মত বলে প্রতীয়মান হয়।

আর পৃথিবী সমতল হওয়ার আকীদাহ হচ্ছে আল্লাহ তা’আলা এর বাণীর বাহ্যিক অর্থ; যার মাধ্যমে কোনো বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে না। ইবন মুজাহিদ এই মতটিকে সঠিক প্রমাণ করতে সমুদ্রের পানি যে পৃথিবীর চতুর্দিককে বেষ্টিত করে থাকে তার উদাহরণ দেন এবং বলেন,

যদি পৃথিবী গোলাকার হতো তাহলে পানি এর উপর স্থির থাকতে পারতো না।

«تفسير ابن عطية = المحرر الوجيز في تفسير الكتاب العزيز» (5/ 375): «وقوله تعالى: بساطا يقتضي ظاهره أن ‌الأرض بسيطة ‌كروية واعتقاد أحد الأمرين غير قادح في نفسه اللهم إلا أن يتركب على القول بالكروية نظر فاسد، وأما اعتقاد كونها بسيطة فهو ظاهر كتاب الله تعالى، وهو الذي لا يلحق عنه فساد البتة. واستدل ابن مجاهد على صحة ذلك بماء البحر المحيط بالمعمور، فقال: لو كانت ‌الأرض ‌كروية لما استقر الماء عليها.[6]তাফসির ইবন আত্যিয়াহ, ৫/৩৭৫, মাক্তাবা শামেলা

এছাড়া তিনি আরো বলেছেন,

আল্লাহর বাণী: “যমীনকে প্রশস্ত করেছেন” দ্বারা বোঝা যায় যে এটি সমতল এবং গোলাকার নয় – এটিই শরঈ নস এর বাহ্যিক অর্থ। আর مَدَّ এবং بساط শব্দ দুটিকে গোলাকার শব্দের সাথে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। আল্লাহ ভালো জানেন।

«تفسير ابن عطية = المحرر الوجيز في تفسير الكتاب العزيز» (3/ 293): «وقوله: مد الأرض يقتضي أنها بسيطة لا كرة- وهذا هو ظاهر الشريعة وقد تترتب لفظة المد والبسط مع التكوير والله أعلم[7]তাফসির ইবন আত্যিয়াহ, ৩/২৯৩, মাক্তাবা শামেলা।

ইমাম ইবন কাছির (মৃত্যু ৭৭৪ হি.) বলেন,

“তিনি পৃথিবীকে প্রশস্ত করেছেন” এর অর্থ হলো তিনি একে বিশালাকার করেছেন দৈর্ঘ্য ও প্রস্থকে বিস্তৃত করে।

«تفسير ابن كثير – ت السلامة» (4/ 431):
فقال: {وهو الذي مد الأرض} أي: جعلها متسعة ممتدة في الطول والعرض»[8]তাফসির ইবন কাছির, ৪/৪৩১, মাক্তাবা শামেলা

মুফাসসির আবু বকর আল হাদ্দাদ (মৃত ৮০০ হিজরি) এর তাফসিরেও একই কথা এসেছে:

«تفسير الحداد المطبوع خطأ باسم التفسير الكبير للطبراني» (4/ 6): «قوله تعالى: {وهو الذي ‌مد ‌الأرض؛} بسطها طولا وعرضا»[9]তাফসিরুল হাদ্দাদ ৬/৪, মাক্তাবা শামেলা

যারা উক্ত আয়াত থেকে সমতল হবার দলিল নিয়েছেন তাদের ঐ সকল মতামতকে পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী মুফাসসিরগণ গ্রহণ করেননি। বরং তাদেরকে খণ্ডন করেছেন। আর যারা দৈর্ঘ্য, প্রস্থে বিস্তৃত করার কথা বলেছেন তাদের কথানুযায়ীও সমতল পৃথিবী প্রমাণিত হবে না, যা আমরা সামনে প্রমাণ করবো।

উক্ত আয়াত থেকে সমতল হবার ইস্তিদালাল করাকে যারা গ্রহণ করেননি:

ইবন আতিয়্যাহ এর মতকে খণ্ডন করে মুফাসসির, নাহুশাস্ত্রবিদ, আল্লামা আবু হাইয়্যান আল ঘারনাতি আয-যাহিরী (মৃত্যু ৭৪৫ হি.) রাহিমাহুল্লাহ লিখেছেন,

ইবন আতিয়্যাহ বলেছেন, “পৃথিবীকে প্রশস্ত করা হয়েছে (সূরা আন-নাবা ৭)” আল্লাহর এই বাণীই ইঙ্গিত প্রদান করে যে এটি সমতল এবং গোলাকার নয়। এটিই শরঈ ওহীর বাহ্যিক অর্থ।

আবু আব্দুল্লাহ আদ-দারানি বলেন,

দলিলাদির আলোকে পৃথিবীর গোলাকার হওয়াটা প্রমাণিত আর পৃথিবীকে প্রশস্ত করার ব্যাপারে আল্লাহর বাণীর সাথে উক্ত মতটি সাংঘর্ষিক নয়। তার কারণ, পৃথিবী অবয়ব বিশালাকার। কোনো বল বিশালাকার হলে তার প্রত্যেকটি অংশই পৃষ্ঠের মতো হতে পারে। মানুষ এবং সেই পৃষ্ঠের মধ্যকার অসমতার ব্যাপারে জ্ঞান আল্লাহ তা’আলা ছাড়া কারো কাছে নেই। (অর্থাৎ তিনিই ভালো জানেন কীভাবে গোলাকৃতি হওয়া সত্ত্বেও মানুষ স্থির থাকে)। তুমি কি দেখো না যে আল্লাহ পাহাড়কে পেরেকের ন্যায় বলেছেন কিন্তু আলেম আর সাধারণ মানুষও তার উপর দিয়ে স্বাচ্ছন্দে চলাচল করতে পারে, এটিও তেমন।

«البحر المحيط في التفسير» (6/ 346):
قال ابن عطية: وقوله مد الأرض، يقتضي أنها بسيطة لا كرة، وهذا هو ظاهر الشريعة. قال أبو عبد الله الداراني:
ثبت بالدليل أن ‌الأرض ‌كرة، ولا ينافي ذلك قوله: مد الأرض، وذلك أن الأرض جسم عظيم. والكرة إذا كانت في غاية الكبر كان كل قطعة منها تشاهد كالسطح، والتفاوت بينه وبين السطح لا يحصل إلا في علم الله تعالى. ألا ترى أنه قال: والجبال أوتادا «1» مع أن العالم والناس يسيرون عليها فكذلك هنا.[10]আল বাহরুল মুহিত্ব ফিত্ব তাফসির, ৬/৩৪৬, মাক্তাবা শামেলা

শাইখুল ইসলাম ইবন হাজার আসকালানী (রাহিমাহুল্লাহ) এর ছাত্র বুরহান উদ্দীন বিকাঈ (মৃত্যু ৮৮৫ হি.) তার তাফসিরে লিখেছেন,

আল্লাহ চাইলেই পৃথিবীকে দেয়াল বা ধনুকাকৃতির খিলান রূপে তৈরি করতে পারতেন, তখন এর উপর দাঁড়ানো সম্ভব হতো না। তবে এর পৃষ্ঠকে প্রশস্ততা করাটা এর গোলাকৃতি হবার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কারণ, গোলাকৃতি বস্তু যদি বিশালাকার হয় তবে এর প্রত্যেকটি অংশ একেকটি পৃষ্ঠরূপে প্রতীয়মান হয়। তদ্রুপ পাহাড়কেও আল্লাহ পৃথিবীর জন্য পেরেক বলেছেন তবুও প্রাণীকূল তার উপর আশ্রয় নিতে পারে।

«نظم الدرر في تناسب الآيات والسور» (10/ 274):
«{الذي ‌مد ‌الأرض} ولو شاء لجعلها كالجدار أو الأزج لا يستطاع القرار عليها، وهذا لا ينافي أن تكون كرية، لأن الكرة إذا عظمت كان كل قطعة منها تشاهد كالسطح، كما أن الجبال أوتاد والحيوان يستقر عليها»[11]নাজমুদ দুরারি ফি তানাসুবিল আয়াতি ওয়াস সুরি, ১০/২৭৪, মাক্তাবা শামেলা

আল খাতিব আশ শিরবিনী আশ শাফেঈ (মৃত্যু ৯৭৭ হি.) রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

আমার উত্তর হবে যে, পৃথিবী বিশালাকার আর গোলক যদি অত্যন্ত বিশালাকার হয় তবে এর প্রত্যেক অংশই পৃষ্ঠকরূপে প্রতীয়মান হবে। যেমন, আল্লাহ পাহাড়কে পেরেকরূপে বানিয়েছেন (বাহ্যিক অর্থে) তবুও দুনিয়ার মানুষ তার উপর আশ্রয় নেয়। তবুও, আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে তিনি পৃথিবীকে প্রশস্থ, বিস্তৃত ও সম্প্রসারণ করেছেন যা সমতল পৃষ্ঠের ইঙ্গিত দেয়। আর আল্লাহ তা’আলার কথাই সত্য এবং ঐ সব আকার বিশেষজ্ঞদের চাইতে আল্লাহর তা’আলার প্রমাণই অধিক স্পষ্ট।

«السراج المنير في الإعانة على معرفة بعض معاني كلام ربنا الحكيم الخبير» (2/ 145):
أجيب: بأنّ الأرض جسم عظيم والكرة إذا كانت في غاية الكبر كان كل قطعة منها تشاهد كالسطح كما أنّ الله تعالى جعل الجبال أوتاداً مع أنّ العالم من الناس يستقرّون عليها، فكذلك ومع هذا فالله تعالى قد أخبر أنه ‌مدّ ‌الأرض ودحاها وبسطها، وكل ذلك يدل على التسطيح والله تعالى أصدق قيلاً وأبين دليلاً من أصحاب الهيئة هذا هو الدليل الأوّل من الدلائل الأرضية»[12]আস-সারাজুল মুনীরু ফীল ইয়ানাতি আলা মা’আরিফাতি মা’নি কালামি রব্বানাল হাকীমিল খাবির, ২/১৪৫, মাক্তাবা শামেলা

ব্যাকরণবিদ এবং মুতাযিলা মতবাদের একজন ইমাম – আবুল কাসিম আয-যামখাসরি (মৃত্যু ৫৩৪ হি.) তার তাফসিরে লিখেছেন,

প্রশস্ত করা মানে বিছিয়ে দেয়া, বিস্তৃত করা, মানবকূলের জন্য সমান করে দেয়া যাতে তারা এতে বসতে পারে, শুয়ে থাকতে পারে এবং গড়াগড়ি করতে পারে, যেমনিভাবে একজন ব্যক্তি তার বিছানা, চাদর এবং শয্যাস্থানে গড়াগড়ি খায়।

আপনি যদি বলেন, এতে কি এটা প্রমাণ হয় না যে পৃথিবী গোলাকৃতি নয় বরং সমতল?

তাহলে আমার জবাব হবে যে, এতে কোনো আপত্তি থাকবে না যদি মানুষ বিষয়টিকে সেভাবে বিবেচনা করে যেভাবে তারা চাদর বিছায়। যদিও বা বিছানার তোষকটি সমতল অবস্থায় থাকুক বা কিছু কিছু গোলাকার। এর বৃহদাকৃতি, অবয়বের প্রশস্ততা এবং কিনারাসমূহের দূরত্বের কারণে শয়নের ক্ষেত্রে কোনো বিপত্তি বা অনুৎসাহের সৃষ্টি হয় না।

«تفسير الكشاف – ومعه الانتصاف ومشاهد الإنصاف والكافي الشاف» (1/ 94): «طلحة: مهادا. ومعنى جعلها فراشا وبساطا ومهادا للناس: أنهم يقعدون عليها وينامون ويتقلبون كما يتقلب أحدهم على فراشه وبساطه ومهاده. فإن قلت: هل فيه دليل على أنّ الأرض مسطحة وليست بكرّية؟ قلت: ليس فيه إلا أن الناس يفترشونها كما يفعلون بالمفارش، وسواء كانت على شكل السطح. أو شكل الكرة، فالافتراش غير مستنكر ولا مدفوع، لعظم حجمها واتساع جرمها وتباعد أطرافها. وإذا كان متسهلا في الجبل وهو وتد من أوتاد الأرض، فهو في الأرض ذات الطول والعرض أسهل»[13]তাফসিরুল কাশশাফ, ১/৯৪, মাক্তাবা শামেলা

নিজাম উদ্দীন আন নিশাপুরী আশ শাফেঈ (মৃত্যু: ৮৫০ হি) রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

“তিনি যমীনকে প্রশস্ত করেছেন.” এর অর্থ সম্পর্কে আল আসাম বলেছেন, তিনি এর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত এমনভাবে সম্প্রসারণ করেছেন যা কল্পনাতীত। পৃথিবীর প্রান্তের অংশসমূহ বিশাল হবার দরুন বাহ্যিক অর্থে এই সম্প্রসারণ বলে যা প্রতীয়মান হয় তা পৃথিবী গোলাকার হবার মতের সাথে সাংঘর্ষিক নয়।

«تفسير النيسابوري = غرائب القرآن ورغائب الفرقان» (4/ 137):
«وهو الذي ‌مد ‌الأرض قال الأصم: أي بسطها إلى ما لا يدرك منتهاه، وهذا الامتداد الظاهر لحس البصر لا ينافي كريتها لتباعد أطرافها[14]তাফসিরুন নিসাবুরি, ৪/১৩৭, মাক্তাবা শামেলা

মুফাসসির বাঈদাউই (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃত্যু ৬৮৫ হি.) বলেন,

তিনি যমীনকে প্রশস্ত করেছেন দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ বরাবর যাতে পা এর উপর স্থির থাকতে পারে এবং প্রাণীরা এর উপর আবর্তন করতে পারে।

«تفسير البيضاوي = أنوار التنزيل وأسرار التأويل» (3/ 181):
«وهو الذي ‌مد ‌الأرض بسطها طولا وعرضا لتثبت عليها الأقدام وينقلب عليها الحيوان»[15]তাফসিরুল বাইদাউই, ৩/১৮১, মাক্তাবা শামেলা

মুফাসসিরদের ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায় তাদের কাছে এটা স্পষ্ট ছিল যে গোলাকার বস্তু বৃহদাকার হলেও সেটার পৃষ্ঠ প্রশস্ত হতে পারে। জরুরি নয় যে প্রশস্ত হলে সেটাকে সমতলই হতে হবে। দৈর্ঘ্য প্রস্থ সমতল বস্তুর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, তবে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এসব পরিভাষা ইমাম ত্ববারীর যুগে বা তার পরে কি লুগাত এর ইমামরা বৃত্তের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করেছেন কিনা? যদি করে থাকেন তাহলে এই দলিল প্রতিষ্ঠিত হয় না যে দৈর্ঘ্য প্রস্থ কেবল বৃত্তের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হবে। কারণ, এটা বর্তমান সময়ে আমরা জানি। তবে অতীতে এই পরিভাষা আরবদের মাঝে বৃত্তের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হলে তখন আর এই দাবি সঠিক থাকবে না। দ্বিতীয়ত আল্লাহ তা’আলা পৃথিবীকে প্রশস্ত করেছেন, তা কীভাবে কীরূপে সেটার ধরনের জানতে হলে বিশুদ্ধ সনদে তাফসির প্রয়োজন। কারণ, মুফাসসিরগণ প্রায়ই দুর্বল সনদে আসা বর্ণনাকে দলিল হিসেবে পেশ করেন। তবে সবসময় দুর্বলতার বিষয়টি উল্লেখ করেন না, আবার অনেক সময় তার নিকট সহীহ হলেও সেই বর্ণনাটি সহীহ হয় না।

ইমাম ত্বাবারি مَدَّ الارض এর তাফসিরে লিখেছেন,
আবু জাফর মুহাম্মদ বিন জারির আত তাবারী বলেন,

আল্লাহ পৃথিবীকে প্রশস্ত করেছেন এর অর্থ হলো দৈর্ঘ্যে এবং প্রস্থে প্রশস্ত করেছেন।

«تفسير الطبري» (16/ 328 ط التربية والتراث):
«قال أبو جعفر: يقول تعالى ذكره: والله الذي ‌مد ‌الأرض، فبسطها طولا وعرضا»[16]তাফসীরে ত্বাবারি, ১৬/৩২৮, মাক্তাবা শামেলা

এখানে লক্ষণীয় হলো তিনি عرض এবং طول এই দুটো শব্দ ব্যবহার করেছেন। তাহলে প্রশ্ন হতে পারে, দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ পরিভাষা কি আরবদের মাঝে গোলাকৃতি বস্তুর বা গোলকের ক্ষেত্রে প্রচলিত ছিল না? আসলে দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ পরিভাষাই গোলকের ক্ষেত্রে আরবরা বেশি ব্যবহার করেছেন কারণ ব্যাস, পরিধি, ব্যাসার্ধ এসব পরিভাষা ইমামদের মাঝে প্রচলিত কম ছিল। এগুলো গণিতবিদদের মাঝে প্রচলিত ছিল। অনেক উলামাগণ এবং নাহুবিদ গোলাকৃতি বস্তুর ক্ষেত্রেও দৈর্ঘ্য, প্রস্থ পরিভাষাদ্বয় ব্যবহার করেছেন। কিছু উদাহরণ:

সারওয়া (السروة) বলতে ছোট্ট তীক্ষ্ম ধনুককে বোঝানো হতো যার প্রস্থ খুব কম বা নেই বললেই চলে।

নাশওয়ান আল হিমারি (মৃত্যু ৫৭৩ হি.) একজন ব্যাকরণবিদ ছিলেন। তার রচিত অভিধানে সারওয়া এর অর্থ সমন্ধে তিনি লিখেছেন:

একটি গোলাকৃতি তীক্ষ্ম ধনুক যার কোনো প্রস্থ নেই।

«شمس العلوم ودواء كلام العرب من الكلوم» (5/ 3043):
«و ‌‌[السروة]: نصل ‌مدور ليس له ‌عرض،[17]শামসুল উলুমি ওয়া দাওয়াউ কালামিল আরাব্যি মিনাল কুলুমি, ৫/৩০৪৩, মাক্তাবা শামেলা

ভাষাবিজ্ঞানী আবুল হাসান আলী বিন ইসমাঈল (মৃত ৪৯৮ হিজরি) তার অভিধানে বলেন,

আস-সারিয়্যাহ হচ্ছে একটি ছোট্ট, খাটো, গোলাকৃতির ধনুক যার প্রস্থ নেই।

«المحكم والمحيط الأعظم» (8/ 571):
«والسرية نصل صغير قصير ‌مدور مدملك لا ‌عرض له»[18]আল মুহকামু ওয়াল মুহিতুল আযাম, ৮/৫৭১, মাক্তাবা শামেলা

আরবি ভাষার প্রখ্যাত অভিধান লিসানুল আরব এ সারওয়াহ সম্পর্কে এসেছে:

“এটি গোলাকার প্রশস্ত তীর যার কোনো প্রস্থ নেই। যেটি লম্বা এবং প্রশস্ত সেটি মা’বালাহ নামে অভিহিত।”

«لسان العرب» (14/ 379):
وقيل: هو المدور المدملك الذي لا ‌عرض له، فأما العريض الطويل فهو المعبلة.[19]লিসানুল আরব ১৪/৩৭৯, মাক্তাবা শামেলা

ইমাম গাজ্জালি (মৃত্যু ৫০৫ হি.) তার বইয়ে গোলাকৃতি এর ক্ষেত্রে প্রশস্ত/বিস্তৃত পরিভাষা ব্যবহার করেছেন:

أن أحوى الأشكال وأوسعها الشكل المستدير المنفك عن الزوايا الخارجة عن الاستقامة، والثاني، أن الأشكال المستديرة إذا وضعت متراصة بقيت بينها فرج معطلة لا محالة،
«الاقتصاد في الاعتقاد للغزالي» (ص54):

সবচেয়ে স্তূপীকৃত এবং প্রশস্ত আকৃতি হচ্ছে গোলাকার আকৃতি যা সমকোণ থেকে মুক্ত। যদি গোলাকৃতি বস্তুসমূহ পর-পর ঠাসাঠাসি করে রাখা হয় তাহলে এদের মাঝে নিজে থেকেই একটা ফাঁকা স্থান তৈরি হবে (যেহেতু সামন্তরিকের ন্যায় পরস্পর সমান্তরাল বাহুগুলো সমান না)…[20]আল ইকতিসাদ ফি আল ইতিকাদ, ৫৪ পৃষ্ঠা

ইমাম ইবনু হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

যেকোনো ধরনের আকার, হোক সেটা গোলাকার বা বর্গাকার, গতিশীল বা স্থির, বড় বা ছোট বা অনুরূপ কিছু, যখন দেখবে তাদের রঙের পরিসীমার সমাপ্তি ঘটেছে বা ব্যত্যয় ঘটেছে, তখন বুঝে নিবে সেই রঙ ধারণকারীর সমাপ্তি ঘটেছে এবং তার দৈর্ঘ্যেরও সমাপ্তি ঘটেছে।

(অর্থাৎ, যেখানে কোনো বস্তুর রঙের পরিসীমা শেষ হয় সেখানেই তার অবয়বের দৈর্ঘ্য শেষ হয়।)

وشكل كل ذي ‌شكل من ‌مدور ومربع وغير ذلك، والحركة أو السكون أو ضخم الجسم وضؤولته وما أشبه ذلك. فإنك لما رأيت اللون قد انتهى وانقطع، علمت أن حامله قد تناهى فانتهى طوله،

«رسائل ابن حزم» (4/ 158):[21]রাসাঈলু ইবন হাযম, ৪/১৫৮

বোঝা গেলো, ইবনু হাযম রাহিমাহুল্লাহ গোলাকার, বর্গাকার বা যেকোনো আকৃতির বস্তুর ক্ষেত্রেই দৈর্ঘ্য ব্যবহার করেছেন।

ইতিহাসবিদ ও ভূগোলবিদ ইবনুল ওয়ারদি (মৃত্যু ৭৪৯ হিজরি) বলেন,

বলা হয়ে থাকে, এই সাগরের গভীরতা ২৫০০ ফারসাখ। এর দৈর্ঘ্য ৮০০ ফারসাখ এবং প্রস্থ ৬০০ ফারসাখ। এটি আকারে গোলাকৃতি এবং এর স্বতন্ত্র দৈর্ঘ্য আছে।

(দৈর্ঘ্য মাপের ইরানী একক ছিল ফারসাখ। – অনুবাদক)

«خريدة العجائب وفريدة الغرائب» (ص243):
«وقيل: إن دور هذا البحر ألفان وخمسمائة فرسخ، وطوله ثمانمائة فرسخ وعرضه ستمائة فرسخ، وهو ‌مدور الشكل، إلى الطول أميز»।[22]খারিদাতুল আজায়িব ওয়া ফারিদাতুল গারায়িব, ২৪৩ পৃষ্ঠা, মাক্তাবা শামেলা

অতএব, طول/عرض বা দৈর্ঘ্য/প্রস্থ পরিভাষা আদিমকালে গোলাকৃতি/গোলকের ক্ষেত্রেই আরবরা বেশি ব্যবহার করেছে। যা নাহুবিদ, ইতিহাসবিদ এবং ইমামদের উদ্ধৃতির মাধ্যমে স্পষ্ট। আর কেউ যদি বলে যে দৈর্ঘ্য প্রস্থ দিয়ে শুধু সমতল বস্তুকে বোঝানো হয় তবে সে মূর্খ, কেননা এসব পরিভাষা তো গোলাকার বস্তুর ক্ষেত্রেও আরবরা ব্যবহার করেছেন। তাহলে তার সেই দলিল তার পক্ষেই বা কীভাবে থাকলো? এটা তো গোলাকার হবার পক্ষেও দলিল দেয়।

দ্বিতীয়ত ইমাম তাবারী যে আয়াতে প্রশস্ত করার যে অর্থ করেছেন বা এছাড়াও অন্যান্য মুফাসসির যারা দৈর্ঘ্য প্রস্থ এর বিষয়টি বলেছেন তারা এর স্বপক্ষে একটি বর্ণনা পেশ করেছেন। যেমন মুফাসসির ওয়াহিদী ইমাম হাকিম থেকে বর্ণনা করেছেন:

ইবন আব্বাস বলেন,

যখন আল্লাহ সৃষ্টিকে সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি পৃথিবীকে প্রসারিত করতে থাকলেন যতক্ষণ না তা আল্লাহর ইচ্ছা মোতাবেক দৈর্ঘ্য বা প্রস্থে পৌছাচ্ছে। ইবন আব্বাস বললেন: এভাবেই একে প্রসারিত করা হয়েছিল। (সংক্ষিপ্ত)

«التفسير الوسيط للواحدي» (4/ 412):

«- أخبرنا أبو بكر محمد بن علي الواعظ، أنا محمد بن عبد الله الحافظ، أنا محمد بن يعقوب الشيباني، نا حامد بن أبي حامد المقرئ، نا إسحاق بن سليمان، نا طلحة بن عمرو، عن عطاء، عن ابن عباس، قال: لما أراد الله أن يخلق الخلق ‌مد ‌الأرض حتى بلغت ما شاء الله من الطول والعرض، قال: وكانت هكذا تميد، وأراني ابن عباس بيده هكذا وهكذا قال: فجعل الله {والجبال أوتادا} [النبأ: 7] وكان أبو قبيس من أول جبل وضع على الأرض»[23]আত-তাফসিরুল ওয়াসিত্ব লিল ওয়াহিদী, ৪/৪১২

এই বর্ণনার সনদে তালহা বিন আমর নামে এক মাতরুক পর্যায়ের এবং খুবই দুর্বল রাবী রয়েছে। মুহাদ্দিসগণ তার বর্ণনাকে পরিত্যাগ করেছেন। ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) ইমাম হাকিম (রাহিমাহুল্লাহ) এর মুস্তাদারাক আলা সহীহাইন কে সংক্ষেপায়ন করে সেখানের হাদিসগুলোর সনদের ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন। ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) এই হাদিসটির সনদের ব্যাপারে মন্তব্য করতে যেয়ে বলেন,

তালহা বিন আমর দুর্বল।

«المستدرك على الصحيحين» (2/ 556):
[التعليق – من تلخيص الذهبي]3889 – طلحة بن عمرو ضعفوه[24]আল মুস্তাদারাক আলা সহীহাইন, ২/৫৫৬

এই বর্তমান সময়ের আরেকজন মুহাক্কিক এর মন্তব্য পেশ করছি। অতঃপর জারাহ তাদীল এর আলোকে তালহা বিন আমর এর অবস্থা তুলে ধরছি:

ডক্টর আব্দুল্লাহ বিন হামাদ আল লুহাইদান এর সনদ সম্পর্কে মন্তব্য করে টীকায় লিখেছেন:

এই হাদিসটির সনদে আল হাকিমের সূত্রে তালহা বিন আমর বিন উছমান আল হাদ্বরামি আল মাক্কি রয়েছেন, তার অবস্থা সম্পর্কে পূর্বে ৩৩৭ নং হাদিসের অধীনে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করে হয়েছে। তিনি মাতরুক পর্যায়ের রাবী। তাই এই সনদ মারেফত আসা হাদিসটি খুবই দুর্বল। আল্লাহ ভালো জানেন।

«مختصر تلخيص الذهبي لمستدرك الحاكم» (2/ 972):
«هذا الحديث في سنده عند الحاكم طلحة بن عمرو بن عثمان الحضرمي المكي، وقد سبق بيان حاله عند حديث رقم (337) وأنه متروك، فعليه يكون الحديث بهذا الِإسناد ضعيفاً جداً -والله أعلم-»[25]মুখতাসার তালখীসীয যাহাবী লিমুস্তাদারাকিল হাকিম, ২/৯৭২

এবার আমরা রাবী তালহা বিন আমর সম্পর্কে জারাহ-তাদীল এর ইমামদের মত দেখি:

ইমাম আহমাদ এর পুত্র আব্দুল্লাহ ইমাম আহমাদ হতে বর্ণনা করেন:

ইমাম আহমাদ বলেছেন, তালহা বিন আমর মাতরুকুল হাদিস।

«الكامل في ضعفاء الرجال» (5/ 171):
طلحة بن عمرو لا شيء متروك الحديث»[26]আল কামিল ফি দ্বুয়াফাঈর রিজাল, ৫/১৭১

ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) তার ব্যাপারে ব্য্যাপারে ইয়াহইয়া বিন মাঈন (রাহিমাহুল্লাহ) এর মন্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন,

«التاريخ الكبير للبخاري بحواشي محمود خليل» (4/ 350):
«‌‌3104- ‌طلحة ‌بن ‌عمرو، ‌الحضرمي.
عن بكير المكي، عن عطاء.
هو لين عندهم.
قال يحيى: ليس بشيء»

ইহাইয়া বিন মাঈন বলেছেন, লাইসা বিশাইয়্যুন।[27]আত তারিখুল কাবির লিল বুখারি, ৪/৩৫০; অন্য নুসখায় ৫/৬২০

ইমাম উকাইলী ও এই জারাহ নকল করেছেন:

«الضعفاء الكبير للعقيلي» (2/ 224):
«سألت يحيى بن معين عن ‌طلحة ‌بن ‌عمرو ‌الحضرمي المكي، فقال: ليس بشيء»[28]আদ্ব দ্বুয়াফাউল কাবির লিল উকাইলি, ২/২২৪

ইমাম ইবন হিব্বান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

সে ঐ সকল লোকদের অন্তর্ভুক্ত যারা ছিকাহ ব্যক্তিদের থেকে এমন সব হাদিস বর্ণনা করে, যেসব হাদিস তাদের দ্বারা বর্ণিত নয়। তার বর্ণিত হাদিস লিখে রাখা বা বর্ণনা করা জায়েজ নয়….

«المجروحين لابن حبان» (1/ 489):
«كان ممن يروي عن الثقات ما ليس من أحاديثهم، لا تحل كتابة حديثه ولا الرواية عنه[29]আল মাজরুহীন লি ইবন হিব্বান, ১/৪৮৯, মাক্তাবা শামেলা

ইমাম দারাকুতনি (রাহিমাহুল্লাহ) আল মাজরুহীন এর টীকায় বলেন,

তালহা বিন আমর আল হাদরামি আল মাক্কি হতে আতা বিন ইয়াসার এর সূত্রে বর্ণিত হাদিসগুলো মুনকার।

«تعليقات الدارقطني على المجروحين لابن حبان» (ص140):
«يقول إبراهيم بن أحمد: ‌طلحة ‌بن ‌عمرو ‌الحضرمي المكي، روى عن عطاء بن يسار أحاديث مناكير.[30]তা’আলিকাতুদ দারাকুত্বনি আলা মাজরুহীন লি ইবন হিব্বান, ১৪০ পৃষ্ঠা

অতএব, প্রমাণিত হলো তালহা বিন আমর একজন মাতরুক পর্যায়ের দ্বঈফ রাবি। আর তিনি সনদে থাকায় ইবন আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) এর সূত্রে বর্ণিত তাফসিরটি গ্রহণযোগ্য নয়।

কাজেই দৈর্ঘ্য প্রস্থে প্রশস্ত করার বিষয়টা সাহাবীদের থেকে আসেনি। একে পরবর্তীকালে কিছু মুফাসসির উক্ত আয়াতের ব্যাখায় ব্যবহার করেছেন তবে দৈর্ঘ্য প্রস্থ দিয়ে তারা সমতল বুঝিয়েছেন কিনা তার স্পষ্ট প্রমাণ নেই, যেহেতু প্রাচীনকালে আরবরা দৈর্ঘ্য প্রস্থ গোলাকৃতি এর ক্ষেত্রেও ব্যবহার করতো। অন্যান্য মুফাসসিরদের মতানুযায়ী জমিনকে প্রশস্ত করাটাও গোলাকৃতি হবার সাথে সাংঘর্ষিক নয়।

আল্লাহু আ’আলাম।


লেখা: সাফিন চৌধুরী
রচনাকাল: ২৭/০৬/২০২৪ ঈসায়ী
ফেইসবুক: Shafin Chowdhury

    Footnotes

    Footnotes
    1তাফসির আত্ব-ত্বাবারি, ১৪/৫১০, মাক্তাবা শামেলা
    2আত তাফসিরুল বাসিত্ব, ১২/২৮৬, মাক্তাবা শামেলা
    3আত তাফসিরুল ওয়াসিত্ব লিল ওয়াহিদী, ৪/৩, মাক্তাবা শামেলা
    4আত তাফসিরুল বাসিত্ব, ২৩/১১৫, মাক্তাবা শামেলা
    5তাফসিরুস সামআনি, ৭৬/৩, মাক্তাবা শামেলা
    6তাফসির ইবন আত্যিয়াহ, ৫/৩৭৫, মাক্তাবা শামেলা
    7তাফসির ইবন আত্যিয়াহ, ৩/২৯৩, মাক্তাবা শামেলা।
    8তাফসির ইবন কাছির, ৪/৪৩১, মাক্তাবা শামেলা
    9তাফসিরুল হাদ্দাদ ৬/৪, মাক্তাবা শামেলা
    10আল বাহরুল মুহিত্ব ফিত্ব তাফসির, ৬/৩৪৬, মাক্তাবা শামেলা
    11নাজমুদ দুরারি ফি তানাসুবিল আয়াতি ওয়াস সুরি, ১০/২৭৪, মাক্তাবা শামেলা
    12আস-সারাজুল মুনীরু ফীল ইয়ানাতি আলা মা’আরিফাতি মা’নি কালামি রব্বানাল হাকীমিল খাবির, ২/১৪৫, মাক্তাবা শামেলা
    13তাফসিরুল কাশশাফ, ১/৯৪, মাক্তাবা শামেলা
    14তাফসিরুন নিসাবুরি, ৪/১৩৭, মাক্তাবা শামেলা
    15তাফসিরুল বাইদাউই, ৩/১৮১, মাক্তাবা শামেলা
    16তাফসীরে ত্বাবারি, ১৬/৩২৮, মাক্তাবা শামেলা
    17শামসুল উলুমি ওয়া দাওয়াউ কালামিল আরাব্যি মিনাল কুলুমি, ৫/৩০৪৩, মাক্তাবা শামেলা
    18আল মুহকামু ওয়াল মুহিতুল আযাম, ৮/৫৭১, মাক্তাবা শামেলা
    19লিসানুল আরব ১৪/৩৭৯, মাক্তাবা শামেলা
    20আল ইকতিসাদ ফি আল ইতিকাদ, ৫৪ পৃষ্ঠা
    21রাসাঈলু ইবন হাযম, ৪/১৫৮
    22খারিদাতুল আজায়িব ওয়া ফারিদাতুল গারায়িব, ২৪৩ পৃষ্ঠা, মাক্তাবা শামেলা
    23আত-তাফসিরুল ওয়াসিত্ব লিল ওয়াহিদী, ৪/৪১২
    24আল মুস্তাদারাক আলা সহীহাইন, ২/৫৫৬
    25মুখতাসার তালখীসীয যাহাবী লিমুস্তাদারাকিল হাকিম, ২/৯৭২
    26আল কামিল ফি দ্বুয়াফাঈর রিজাল, ৫/১৭১
    27আত তারিখুল কাবির লিল বুখারি, ৪/৩৫০; অন্য নুসখায় ৫/৬২০
    28আদ্ব দ্বুয়াফাউল কাবির লিল উকাইলি, ২/২২৪
    29আল মাজরুহীন লি ইবন হিব্বান, ১/৪৮৯, মাক্তাবা শামেলা
    30তা’আলিকাতুদ দারাকুত্বনি আলা মাজরুহীন লি ইবন হিব্বান, ১৪০ পৃষ্ঠা
    5 1 vote
    Article Rating
    Subscribe
    Notify of
    guest
    1 Comment
    Oldest
    Newest Most Voted
    Inline Feedbacks
    View all comments
    মুসাফির
    মুসাফির
    25 days ago

    ভাল

    Back to top button