ইসলামবিরোধীদের প্রতি জবাবমুসলিম

কুরআন-সুন্নাহতে কি পৃথিবীকে সমতল বলা হয়েছে? – পর্ব ২

পৃথিবী গোলাকার হওয়ার ব্যাপারে ইমামদের ইজমাহ এবং এ ব্যাপারে ইজতিহাদের বিধান

  1. কুরআন-সুন্নাহতে কি পৃথিবীকে সমতল বলা হয়েছে? – পর্ব ১
  2. কুরআন-সুন্নাহতে কি পৃথিবীকে সমতল বলা হয়েছে? – পর্ব ২

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।
সকল প্রশংসা আল্লাহ তা’আলার। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক তার হাবিব মুহাম্মদ ﷺ এর উপর।


বিগত পর্বে আমি পৃথিবী সমতল হবার কিছু মত খণ্ডন করেছি। এবার পৃথিবী গোলাকার হবার ব্যাপারে মুসলিম ইমামদের ইজমা ও মতামত তুলে ধরছি। প্রাচীনকালে মুসলিমদের একাধিক প্রসিদ্ধ ইমাম, মুফাসসির, ইতিবাসবিদ, গণিতবিদরা পৃথিবীকে গোলাকার বলে গেছেন, অনেকে ইজমা দাবি করেছেন:

ইমাম ইবনু হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

এখন আমরা তাদের কিছু আপত্তির ব্যাপারে পর্যালোচনা করবে ইন শা আল্লাহ, যার মধ্যে একটি হচ্ছে – তারা বলে থাকে যে পৃথিবী গোলাকার হবার প্রমাণগুলো স্পষ্ট তবে জনমত তো এক্ষেত্রে ভিন্ন কথা বলছে। আল্লাহ তা’আলা আমাদের তৈফিক দান করুন, তাদের ব্যাপারে আমাদের জবাব হবে যে, মুসলিমদের ইমামগণ যারা তাদের জ্ঞানের দরুন ইমাম উপাধি লাভ করেছে (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম), তাদের মাঝে কেউই পৃথিবীর গোলাকৃতি হওয়াকে অস্বীকার করেনি।

«الفصل في الملل والأهواء والنحل» (2/ 78):
«وهذا حين نأخذ إن شاء الله تعالى في ذكر بعض ما اعترضوا به وذلك أنهم قالوا إن البراهين قد صحت بأن ‌الأرض ‌كروية والعامة تقول غير ذلك وجوابنا وبالله تعالى التوفيق إن أحد من أئمة المسلمين المستحقين لاسم الإمامة بالعلم رضي الله عنهم لم ينكروا تكوير ‌الأرض»[1]আল ফাস্বল ফিল মিলালি ওয়াল আহওয়ায়ি ওয়ান নিহালি, ৭৮/২

ইমাম ইবনু হাযম আয যাহিরী (রাহিমাহুল্লাহ) এই ব্যাপারে ইজমার দাবি করেছেন।

শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

আমার জানামতে পৃথিবী গোলাকৃতি হবার ব্যাপারে ঐক্যমত রয়েছে এবং এর অধিকাংশ স্থান পানি দ্বারা বেষ্টিত রয়েছে। যেহেতু এর শুষ্ক ভূমির পরিমাণ এক ষষ্ঠমাংশ বা তারও কিছুটা বেশি এবং পানি পৃথিবীর প্রত্যেক পার্শ্বকে আচ্ছাদিত করে রেখেছে। পৃথিবীর উপরে ধারণকৃত পানি যেমন পৃথিবীর পৃষ্ঠ এবং আসমানের মাঝ অবস্থানে রয়েছে, উল্লেখিতভাবে তেমনি আমরাও পৃথিবীর পৃষ্ঠ এবং আসমানের মাঝে রয়েছি। পৃথিবী পৃষ্ঠের নিচে কিছুই নেই কেবল এর কেন্দ্রস্থল এবং কেন্দ্রের নিম্নাংশ ছাড়া। আমাদের নিকট দুইটি দিক ব্যতীত স্পষ্ট দিক নেই, তা হলো উপর এবং নিচের দিক (যেহেতু আমরা আসমান এবং পৃথিবী পৃষ্ঠের মাঝে রয়েছি সে অনুযায়ী)। মানুষ পৃথিবীর পৃষ্ঠকে ঘুরে দেখেছে। এর পৃষ্ঠের নিচে রয়েছে এর কেন্দ্রস্থল এবং এর কেন্দ্রস্থলের মধ্যভাগ রয়েছে যা ভরকেন্দ্র নামে অভিহিত। তাই পৃথিবীর পৃষ্ঠ এবং পৃষ্ঠকে ঘিরে বেষ্টিত পানি থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত অংশ হচ্ছে অবতল আর কেন্দ্র থেকে পৃষ্ঠের উপরাংশ হচ্ছে উত্তল। যদি আসমান মহাবিশ্বের উপরে থেকে পৃথিবীকে বেষ্টিতে করে রাখে তবে দ্বিতীয় বস্তু তথা পৃথিবী গোলাকৃতি হবে।

«مجموع الفتاوى» (5/ 150):
«‌اعلم ‌أن ” ‌الأرض ” ‌قد ‌اتفقوا على أنها كروية الشكل وهي في الماء المحيط بأكثرها؛ إذ اليابس السدس وزيادة بقليل والماء أيضا مقبب من كل جانب للأرض والماء الذي فوقها بينه وبين السماء كما بيننا وبينها مما يلي رءوسنا وليس تحت وجه الأرض إلا وسطها ونهاية التحت المركز؛ فلا يكون لنا جهة بينة إلا جهتان: العلو والسفل وإنما تختلف الجهات باختلاف الإنسان. فعلو الأرض وجهها من كل جانب. وأسفلها ما تحت وجهها – ونهاية المركز – هو الذي يسمى محط الأثقال فمن وجه الأرض والماء من كل وجهة إلى المركز يكون هبوطا ومنه إلى وجهها صعودا وإذا كانت سماء الدنيا فوق الأرض محيطة بها فالثانية كروية وكذا الباقي. والكرسي فوق الأفلاك كلها والعرش فوق الكرسي ونسبة الأفلاك وما فيها بالنسبة إلى الكرسي كحلقة في فلاة والجملة بالنسبة إلى العرش كحلقة في فلاة»[2]মাজমুউ ফাতাওয়া, ৫/১৫০, মাক্তাবা শামেলা

ইমাম ইবনুল জাওযি (মৃত ৫৯৭ হি.) রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

একইভাবে ইমামগণ একমত হয়েছেন যে পৃথিবীর সকল পার্শ্বের অবয়ব গোলাকার। এর প্রমাণ হচ্ছে যে সূর্য, চন্দ্র এবং গ্রহসমূহ পৃথিবীর সকল অংশে একই সাথে একই সময়ে উদিত এবং অস্তমিত হয় না। বরং পশ্চিমদিকের আগে পূর্বদিকে উদিত হয়।

«المنتظم في تاريخ الملوك والأمم» (1/ 184): «وكذلك أجمعوا على أن الأرض بجميع أجرامها من البرد مثل الكرة، ويدل عليه أن الشمس والقمر والكواكب لا يوحد طلوعها وغروبها على جميع من في نواحي الأرض في وقت واحد بل على المشرق قبل المغرب»[3]আল মুনতাযিমু ফি তারিখিল মুলুকি ওয়াল উমামি, ১/১৮৪, মাক্তাবা শামেলা

নিজামউদ্দীন হাসান আন নিসাপুরী আশ শাফেঈ আল আশ’আরী (মৃত ৭৩০ হি.) বলেন,

ইসলামের প্রাজ্ঞ ব্যক্তিগণ বলেছেন, দলিল-প্রমাণাদির আলোকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে পৃথিবী তার মধ্যভাগের দিকে গোলাকৃতির। আকাশ একে চতুর্দিক থেকে পরিবেষ্টন করে আছে। আর সূর্য তার নিজস্ব পরিক্রমণপথে তার নিজ অক্ষকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।

فقال حكماء الإسلام: ‌قد ‌ثبت ‌بالدلائل ‌اليقينية ‌أن ‌الأرض كروية في وسط العالم، وأن السماء محيطة بها من جميع الجوانب، وأن الشمس في فلكها تدور بدوران الفلك. وأيضا قد وضح أن جرم الشمس أكبر من جرم الأرض بمائة وست وستين مرة تقريبا،

«تفسير النيسابوري = غرائب القرآن ورغائب الفرقان» (4/ 459):[4]তাফসিরুন নিসাবুরী, ৪/৪৫৯, মাক্তাবা শামেলা

মুহাম্মাদ বিন আব্বাস আল খাওরাযিমি (মৃত ৩৮৩ হি.) বলেন,

কিছু কথকদের দাবি হচ্ছে যে পৃথিবী গোলাকার আর অন্যান্যদের দাবি হচ্ছে পৃথিবী সমতল। তন্মধ্যে সবচেয়ে সঠিক মত হচ্ছে পৃথিবী ৫০০ বছর যাবত তার ভ্রমণপথে গোলাকারভাবে রয়েছে। এটির গোলাকার গোলার্ধ সম্পন্ন, তাই এর পৃষ্ঠ পুরু। এজন্য পৃথিবীর মাঝখানে অবস্থিত দ্বীপগুলো পৃথিবীর পৃষ্ঠের উপর অধিক উঁচু থাকে আর পৃথিবীর ব্যাস গভীর।

قال قائلون الأرض كرة مدورة وقال آخرون مسطحة وأصحها أن الأرض مدورة مسيرة خمسمائة عام كأنها نصف كرة مدورة فيكون سطحها أرفع ولذلك كانت الجزيرة التي وسط الارض أعلى الارض وأقطارها أعمق

«مفيد العلوم ومبيد الهموم» (ص214)[5]মুফীদুল উলুম ওয়া মাবিদুল হুমুম, ২১৪ পৃষ্ঠা, মাক্তাবা শামেলা।

যারা পৃথিবীকে সমতল এবং গোল হবার দুটো মতের উল্লেখ্য করেছেন তন্মধ্যে একজন ইবন আরাফাহ আল মালিকী আল আশআরী (মৃত্যু ৮০৩ হি.)। তিনি বলেছেন পূর্ববর্তীদের মতে এটি সমতল হলেও পরবর্তী যুগের লোকেদের মতে এটি গোলাকার। কিন্তু তিনি স্পষ্ট করেননি তিনি কাদের বুঝিয়েছেন আর না কোনো দলিল পেশ করেছেন। তিনি পূর্ববর্তীদের মতে পৃথিবীর সমতল হবার দাবি করলেও একে ইমান বা কুফরের বিষয় বলে দাবি করেননি। তিনি এই প্রসঙ্গে ইমাম গাজ্জালি (রাহিমাহুল্লাহ) এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন,

(পৃথিবী গোলাকার নাকি সমতল) এই বিশ্বাসের উপর ঈমান বা কুফর নির্ভর করে না।

«تفسير ابن عرفة» (2/ 800): وأجيب: بأن ذكرها بالمطابقة أولى من ذكرها بالتضمن والالتزام، لأنها مشاهدة مرئية، ومذهب (المتقدمين أنها بسيطة ومذهب) المتأخرين أنها كروية.قال الغزالي في النهاية ولا ينبني على ذلك الكفر ولا إيمان.[6]তাফসির ইবন আরাফাহ, ২/৮০০, মাক্তাবা শামেলা

হাফিয জালালুদ্দীন সুয়ূতি (মৃত ৯১১ হি.) রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

“তিনি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন, প্রশস্ত করেছেন” – এই কালাম সে সকল লোকেরা দলিল গ্রহণ করে, যারা পৃথিবীকে গোলাকার নয় বরং সমতল বলে। তবে এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে পৃথিবীকে আকাশের পূর্বে সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে আরেকটি আয়াতে এসেছে যে তার আগেই আসমানকে আলাদা করা হয়েছিল। এদের সমন্বয় করলে বোঝা যায় যে আল্লাহ আসমানের পূর্বে পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছিলেন অতঃপর একে বিস্তৃত করে দেন।

«معترك الأقران في إعجاز القرآن» (2/ 174): «(دحاها) : بسطها، وبهذا استدل من قال: إن ‌الأرض ‌بسيطة غير كروية، ولكن يفهم من هذه الآية أن ‌الأرض خلقت قبل السماء. وفي آية فصلت السماء قبلها، والجمع بينهما أن الله خلقها قبل السماء، ثم دحاها بعد ذلك»[7]মু’তারাকুল আকরানি ফী ইজাযিল কুরআনি, ২/১৭৪, মাক্তাবা শামেলা।

ইতিহাসবিদ ইবন খালদুন আল মালিকী আল আশআরী (মৃত্যু ৮০৮ হিজরি) লিখেছেন,

জেনে রাখুন প্রজ্ঞাবান লেখকগণ যারা পৃথিবীর অবস্থা নিয়ে পর্যালোচনা করে থাকেন তাদের বই-পুস্তক থেকে পৃথিবী আকার গোল হবার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে

اعلم أنّه قد تبيّن في كتب الحكماء النّاظرين في أحوال العالم أنّ ‌شكل ‌الأرض ‌كرويّ وأنّها محفوفة بعنصر الماء

«تاريخ ابن خلدون» (1/ 57):[8]তারীখু ইবনি খালদুন, ১/৫৭, মাক্তাবা শামেলা।

ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (মৃত ৭৪৮ হি.) রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আহলে ইলম পরিমিতি অনুযায়ী বিধান প্রণয়ন করেছেন এবং এই বিধান সঠিক কারণ এটা দলিলের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আল হাসান এই মতবাদকে তাচ্ছিল্য করেননি যে জমিন পৃথিবীর উপরাংশে রয়েছে। আর পৃথিবী আকাশের মাঝখানে রয়েছে যার উদাহরণ এমন একটি তরমুজের ন্যায় যা অন্য আরেকটি তরমুজ ভেতরে রয়েছে (অর্থাৎ তরমুজের ন্যায় গোলাকৃতি পৃথিবী একে বেষ্টিত করে রাখা গোলাকৃতি আকাশ এর ভেতরে রয়েছে)। আর আকাশ একে চতুর্দিক থেকে পরিবেষ্টিত করে রেখেছে।

لا ريب أن أهل العلم حكموا بما اقتضته الهندسة، وحكمها صحيح لأنه ببرهان، لا يكابر الحسن فيه بأن الأرض في جوف العالم العلوي، وأنكرة الأرض في وسط السماء كبطيخة في جوف بطيخة، والسماء محيطة بها من جميع جوانبها، وأن سفل العالم هو جوف كرة الأرض، وهو المركز،

«مختصر العلو للعلي العظيم» (ص74):[9]মুখতাসারুল উলু লিল আল্যিয়িল আযিম, ৭৪ পৃষ্ঠা

সুতরাং, একাধিক ইমাম, মুফাসসিরুল কুরআন, ফকিহ, ইতিহাসবিদ, গণিতবিদদের সাক্ষ্য অনুযায়ী পৃথিবী গোলাকার। অনেকে ইজমার দাবিও করেছেন।


লেখা: সাফিন চৌধুরী
রচনাকাল: ২৭/০৬/২০২৪ ঈসায়ী
ফেইসবুক: Shafin Chowdhury

    Footnotes

    Footnotes
    1আল ফাস্বল ফিল মিলালি ওয়াল আহওয়ায়ি ওয়ান নিহালি, ৭৮/২
    2মাজমুউ ফাতাওয়া, ৫/১৫০, মাক্তাবা শামেলা
    3আল মুনতাযিমু ফি তারিখিল মুলুকি ওয়াল উমামি, ১/১৮৪, মাক্তাবা শামেলা
    4তাফসিরুন নিসাবুরী, ৪/৪৫৯, মাক্তাবা শামেলা
    5মুফীদুল উলুম ওয়া মাবিদুল হুমুম, ২১৪ পৃষ্ঠা, মাক্তাবা শামেলা।
    6তাফসির ইবন আরাফাহ, ২/৮০০, মাক্তাবা শামেলা
    7মু’তারাকুল আকরানি ফী ইজাযিল কুরআনি, ২/১৭৪, মাক্তাবা শামেলা।
    8তারীখু ইবনি খালদুন, ১/৫৭, মাক্তাবা শামেলা।
    9মুখতাসারুল উলু লিল আল্যিয়িল আযিম, ৭৪ পৃষ্ঠা
    5 1 vote
    Article Rating
    Subscribe
    Notify of
    guest
    0 Comments
    Oldest
    Newest Most Voted
    Inline Feedbacks
    View all comments
    Back to top button